তিন তালাক : ইসলামী শরীয়াহ বনাম আইয়ূব খানের পাশকৃত আইন – ১ম পৃষ্ঠা

Spread the love
image_pdfimage_print

তিন তালাক : ইসলামী শরীয়াহ বনাম আইয়ূব খানের পাশকৃত আইন

[লেখক: শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাক্বী উসমানী দা:বা:]

 

তালাকের বিধান

তালাকের বিধিবিধান সম্পর্কে অর্ডিনেন্স যেসব আইন-কানুন রচনা করেছে, সেগুলো ‘কুরআন কারিম’ ও ‘সুন্নতে-নববী’র সাথে প্রায় প্রত্যেক পদে পদে সাংঘর্ষিক। এজন্য এ দফাগুলির উপর বিস্তারিত খতিয়ান পেশ করার পূর্বে আমরা যেটা মুনাসেব মনে করছি, তা এই যে, ‘বিয়ে’ ও ‘তালাক’ সম্পর্কে ‘কুরআন-সুন্নাহ’র অবস্থানটা কি সেটাই আগে পরিষ্কার হয়ে যাক, সাথে এর ক্রমধারায় কিছু মূলনীতিগত কথাও সামনে এসে যাক, যাতে করে বক্তব্য বোঝার প্রশ্নে কোনো প্রকার সন্দেহ সংশয় অবশিষ্ট না থাকে।

(১) কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে ‘বিয়ে’ এবং তালাক’

তিন তালাক ইসলামী শরীয়াহ বনাম আইয়ূব খানের পাশকৃত আইন  devorceইসলাম -‘বিয়ে’কে সাধারণসব মুআমালাত/লেনদেনগুলির ন্যায় নিছক একটি চুক্তি’র বৈশিষ্ট দান করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি। বরং বিবাহ কার্যের মধ্যে যেমন (স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আজীবন উভয়ে উভয়ের হক্ব আদায় করবে মর্মে একটি) ‘চুক্তি’র বৈশিষ্ট রয়েছে, তেমনি এতে আরেকটি বৈশিষ্ট রয়েছে ইবাদাতের(২)। (বিয়ে কেবল একটি চুক্তিই নয়, একটি ইবাদতও)। আর এ কারণেই অন্য আর কোনো ‘লেনদেন’ বা ‘চুক্তি’কে এখতিয়ার করে নেয়ার প্রতি (কুরআন সুন্নাহ’র) কোথায়ও উৎসাহ প্রদান করা হয় নি। উৎসাহ দানের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিয়ের ক্ষেত্রে যতটা এখতিয়ার করা হয়েছে, ততটা ক্রয়-বিক্রয়, অংশীদারী কারবার ইত্যাদি বিভিন্ন লেনদেনের বেলায় করা হয় নি। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর  النكاح من سنتى – ‘বিয়ে আমার সুন্নহ’র মধ্যে (একটি সুন্নাহ)’(৩) এবং مَنْ اسْتَطَاعَ منكُم الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ ‘তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ রয়েছে, সে যেন অবশ্যই বিয়ে করে নেয়।’(৪) -এসকল বাণীই একথার জ্বলন্ত প্রমাণ।

বরং ইমাম আবু হানীফা রহ. (৮০-১৫০হি:) তো একথাও বলেন যে, বিয়ে’র মধ্যে ইবাদাতের বৈশিষ্টটিই অধিক প্রতিয়মান, অপরদিকে লেনদেনের বৈশিষ্টটি ক্ষিন। বিয়ে যে নিছক একটি লেনদেন ও চুক্তি নয়, বরং এটা একটি ইবাদাতও -এব্যপারে উম্মাহ’র কোনো আলেম বা ফকিহ কেউই দ্বিমত পোষন করেন না। আর তাই বিয়ের শর্তগুলো অন্যান্য যাতীয় লেনদেন ও চুক্তি থেকে ভিন্নতর। উদাহরণ স্বরুপ: যতক্ষন পর্যন্ত দু’জন সাক্ষির সামনে বিয়ের চুক্তি সম্পাদিত না হয়, ততক্ষন পর্যন্ত বিয়েটি অসম্পাদিতই রয়ে যায়। অপরদিকে অন্যান্য লেনদেনগুলোর ক্ষেত্রে ‘চুক্তি’র সময় সাক্ষিদের উপস্থিতি কোনো অপরিহার্য শর্ত নয়। এমনিভাবে বিয়ের সময় খুৎবা পাঠ করা, তাতে সাধারণ ই’লান (ঘোষনা) মাসনুন হওয়া -এসব বিষয়ও ‘বিবাহচুক্তি’কে একটি ইবাদাতের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট দানের পাশাপাশি একে সাধারণ লেনদেনের স্তর থেকে আরও উচচতর লেনদেন হিসেবে প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

যেহেতু ‘বিবাহচুক্তি’ তার নিজের ভিতরে ইবাদাতের একটি শান বা মর্যাদা ধারন করে, এজন্য এ চুক্তির বিলোপ সাধন তথা তালাকও অন্যান্য সাধারণ চুক্তিগুলোর বিলোপ প্রক্রিয়ার ন্যয় নয়। বরং এর জন্য বিশেষ বিশেষ শর্ত-শরায়েত এবং উসূল (মূলনীতি) সন্নিবেশিত রাখা হয়েছে, যা নিম্নোরূপ:-

(১) যেহেতু বিয়ে একটি ইবাদাতও, তাই ইসলাম চায়, এ চুক্তিটি স্থায়ী হোক; একে টুকরো করার সুযোগ না আসুক। এ কারণে যতগুলি ছিদ্র এ কাজে বিদ্যমান থাকার সম্ভাবনা ছিল এবং যতগুলো ক্ষতি বা অনিষ্টতা এ চুক্তিটিকে নষ্ট করে দেয়ার উপযোগ পরিগ্রহ করতে পারতো, কুরআন কারিম তার সবগুলোর প্রতিবিধান করার জন্য বিশেষ বিশেষ পথ দেখিয়ে দিয়েছে। সেটা এভাবে যে, প্রথমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, প্রয়োজন হলে কিছুটা সাবধানবাণী ও ধমক প্রদর্শনপূর্বক এ লেনদেনটিকে অটুট রাখবে। যদি তাতেও কাজ না হয়, তাহলে শালিশী’র মাধ্যমে উভয়ের মাঝে সংশোধনের চিন্তা-ফিকির করতে হবে। যেমন, এরশাদ হয়েছে-

وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا

‘আর তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার অশংকাবোধ করো, তাহলে তোমরা স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে একজন শালিশ এবং স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে একজন শালিশ পাঠিয়ে দাও। তারা উভয়ে যদি সংশোধনের ইচ্ছে করে, তাহলে আল্লাহ তাদের উভয়ের মাঝে আনুকূল্যতার তৌফিক দান করবেন। [সূরা নিসা ৩৫]

কিন্তু সংশোধন ও মিলমিশের এ সকল পন্থাগুলির প্রয়োগ ঘটানোর পরও যদি এমন কোনো অপারোগতা জনিত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে যায় যে, উভয়ের মাঝে অনুকূল সম্পর্ক গড়ে ওঠার আর কোনো পথই অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে এমতাবস্থায় বিয়ের ওই চুক্তিটিকে তাদের উপর জোর করে স্তুপাকৃত করে রাখাটাও দু’জনের উপর জুলুমই হবে বৈকি, যার মধ্যে পারিবারিক উপকারের পরিবর্তে শত শত ক্ষতি ও বিপদাশংকাই (নিহীত) রয়েছে। এজন্য এক্ষেত্রে স্বামীকে ‘তালাক’ দানের এখতিয়ার দিয়ে একথা বলে দেয়া হয়েছে যে- ابغض الحلال الى الله الطلاق ‘‘আল্লাহ’র কাছে বৈধ কাজ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃনীত বৈধ কাজ হচ্ছে তালাক দান(৫); যা নিতান্ত অনন্যপায় অবস্থা ব্যতীত প্রয়োগ করা বাঞ্চনীয় নয়।

(২) গোটা দুনিয়ায় সাধারণ লেনদেনগুলোর নিয়ম হল, চুক্তি বিলোপের বিভিন্ন শর্ত মোতাবেক জবান বা কলম থেকে একবার বিলোপের কথা কার্যকর করে ফেললেই চুক্তিটি নাকোচ হয়ে যায়। আর চুক্তিটি কারো সাথে একবার বাতিল হয়ে গেলে পরক্ষনই অন্য কারো সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়াও সম্পুর্ণ বৈধ। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত যেহেতু ‘বিবাহ-বিচ্ছেদ’কে ابغض الحلال (সবচেয়ে ঘৃনীত বৈধ কাজ) বলে অবিহিত করে এবং শুধুমাত্র চরম অনন্যপায় অবস্থায়ই এর প্রয়োগ ঘটানোকে মুনাসেব গণ্য করে, তাই সে একে সাধারণ লেনদেনগুলো থেকে উচ্চে রাখার উদ্দেশ্যে এর একটি ‘বিবাহ বিচ্ছিন্ন করণ’ আইনও বানিয়ে দিয়েছে। এতে এদিকেও লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, যাতে সাময়িক-ঘৃনাবোধ বা মনমালিন্য নির্ভর ঝগড়াঝাটির উপর ভিত্তি করে কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই এ ‘বিবাহ-বিচ্ছেদ’কে তড়িৎ কার্যকর হয়ে যেতে না পারে। এজন্য সব সময় সর্বাবস্থায় এর অনুমতি দেয়া হয়নি বরং কুরআন কারিম- فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ – ‘স্ত্রীদের ইদ্দতের(৬) প্রতি লক্ষ্য রেখে তাদেরকে তোমরা তালাক দিও’(৭)-এ কথা বলে একটি বিশেষ অবস্থা ও সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, ওই সময় ‘তালাক’ দান করা যাবে, যখন স্ত্রী ‘হায়েয’ অবস্থায় থাকবে না, (যাতে সেটা নিছক সাময়িক ঘৃনাবোধের ফল স্বরূপ না ঘটতে পারে)। এমনকি তা এমন ‘তুহরে’(৮) হতে হবে, যার মধ্যে ‘সহবাস’ সেড়ে ফেলার বিষয়টি ঘটে নি, (যাতে করে ‘ইদ্দত’ গণনা করার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে না পারে)।

এর সারার্থ এই যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বামীর জন্য ‘তালাক’ এমন কোনো লাঠি নয় যে, যাকে যখন ইচ্ছা ঘাঁ বসিয়ে দিবে। বরং স্বামীকে এই বিষয়ে দায়িত্বভার দেয়া হয়েছে যে, সে তালাকে’র শরয়ী মুহুর্তের অপেক্ষা করবে(৯)। শরয়ী মূহূর্তেও অপেক্ষা করার রহস্য এই যে, তাতে খুবই সম্ভাবনা রয়েছে যে, আপেক্ষার ওই বিরতি মুহূর্তে দুজনের রাগ ও ক্ষোভ দমিত হয়ে আসবে এবং অবস্থা সংশোধন ও মিলমিশ পর্যায়ের দিকে গড়াতে থাকবে; ফলতঃ ওই মাকরূহ (অপছন্দনীয়) কাজটির আর প্রয়োজনই দেখা দিবে না।

(৩) এমনিভাবে (শরীয়তে) বিয়ের ‘চুক্তি’ ছিন্নের পন্থাটিও অপরাপর সাধারণ কোনো চুক্তির ছিন্নকরণ কার্যের ন্যায় এভাবে রাখা হয়নি যে, এদিকে ‘জবান’ বা ‘কলম’ থেকে কথাটি বেড়িয়ে গেল, আবার অন্যদিকে ‘চুক্তি’টিও সম্পূর্ণরূপে নিশ্বেঃস হয়ে গিয়ে আবার আরেক জনের সাথে (নতুনভাবে) চুক্তি করাও জায়েয হয়ে গেল। বরং (শরীয়তে) বিয়ের এই ‘চুক্তি’ ছিন্নকরনের উপর দু’টি পদশৃঙ্খল লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। (১) বিবাহ বিচ্ছেদের তিনটি পর্যায়কে তিনটি তালাকের আঙ্গিকে রাখা হয়েছে। (২) পর্যায় তিনটির ক্ষেত্রে জবান বা কলম থেকে (তালাক বা সমার্থক কথাটি) বেড়িয়ে যাওয়া মাত্রই বিবাহ বিচ্ছেদের যাবতীয় ক্রিয়া ও আহকাম পূর্ণতা লাভ করে না। অর্থাৎ, বিবাহ বিচ্ছেদের ঠিক পরপরই (উক্ত নারীর জন্য) অন্য কোনো পুরুষের সাথে ‘বিবাহ-চুক্তি’ সম্পাদন করে নেয়া যায় না। বরং এই অপেক্ষার ‘মুদ্দত কাল’ (সময়সীমা)  বিভিন্ন অবস্থার নারীর জন্য বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।

(বিবাহ বিচ্ছিন্নের) তিনটি পর্যায়কে যে তিনটি তালাকের আঙ্গিকে রাখা হয়েছে, তার অর্থ কখনোই এই নয় যে, ‘তালাক’ দেয়ার জন্য ওই তিনটি পর্যায়কে (একে একে) অতিক্রম করে যাওয়া অত্যাবশ্যক বা উত্তম কিছু । বরং এর মনশা যেটা মনে হয়, তা এই যে, প্রথমতঃ তো তালাকের প্রতি ধাবিত হওয়াই শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি মাকরূহ (অপছন্দনীয়) ও ঘৃনিত কাজ; তা সত্ত্বেও যদি অনন্য়পায় হয়ে এ পথে পা বাড়াতেই হয়, তাহলে এর সর্বনিম্ন পর্যায় তথা ‘এক-তালাক’ দিয়েই থেমে যাবে এবং ‘ইদ্দত’ অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকবে। ‘ইদ্দত’ শেষ হয়ে গেলেই এই একটি মাত্র তালাকই ‘বৈবাহিক সম্পর্ক’কে সম্পূর্ণ রূপে ছিন্ন করে দিবে এবং তখন ওই নারীর জন্য অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করাও জায়েয হয়ে যাবে।

এই পদ্ধতির মধ্যে বিশেষ হেকমত এই যে, তালাকের সুস্পষ্ট বাক্যের মাধ্যমে এক তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে দু’জনের জন্যেই সংশোধন ও মিলমিশের পথ সর্বাবস্থায়ই খোলা থাকে। ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেভাগে তো (স্ত্রীকে) শুধু ‘তালাক’ থেকে ফিরিয়ে নেয়াই(১০) যথেষ্ট হয়; আর ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে তখন ওই নারীর এখতিয়ার থাকে, সে চাইলে অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করে নিতে পারে, আবার চাইলে আগের স্বামীকেও বিয়ে করে নিতে পারে (যে তাকে এক তালাক দিয়েছে)। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি এতেও ক্ষ্যান্ত না হয়, বরং ইদ্দত চলাকালেই ওই নারী যখন দ্বিতীয়বার হায়েয থেকে পবিত্র হয়ে যায়, তখন যদি পরিষ্কার বাক্যে (দ্বিতীয় বারের মতো) আরও একটি তালাক দিয়ে ফেলে, তাহলে সে ব্যাক্তি যেভাবেই হোক ‘বিবাহবিচ্ছেদের’ দুটি পর্যায় শেষ করে ফেলছে, যা করার দরকার ছিলনা এবং শরয়ী দৃষ্টিতে একাজ পছন্দনীয়ও নয়, তবে এমতাবস্থায়ও (তার প্রদত্ত দ্বিতীয়) তালাকটি কার্যকর হয়ে গেছে। (সুতরাং, এপর্যন্ত এসে ওই ব্যাকির প্রদত্ত তালাকের সংখ্যা দাঁড়ালো মোট  দু’টি)। কিন্তু কথা এখনেও ওই একই; অর্থাৎ ইদ্দত চলাকালে (স্ত্রীকে) ফিরিয়ে নেয়া এবং ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে গেলে নতুন ভাবে বিয়ে করা -এ দুটোই স্বামীর জন্য জায়েয। পার্থক্য কেবল এতটুকু হল যে, দ্বিতীয় ধাপে স্বামী তার আয়ত্বাধীন আরও একটি কড়াকে ভেঙ্গে ফেললো এবং সে এত প্রান্তসীমায় গিয়ে উপনীত হল যে, এখন আর একটি বারও যদি ‘তালাক’ কথাটি বলে ফেলে, তাহলে এই বিবাহবন্ধনটি চিরদিনের জন্য ছিন্ন হয়ে যাবে; পরে আর তাকে (স্বাভাবিক ভাবে) বিয়ে করাও জায়েয হবে না।

এরপর স্বামী যদি এর উপরও ধৈর্য বজায় না রাখে, বরং তৃতীয় আরেকটি তালাকও দিয়ে দেয়, তাহলে সে নিজেই তার আয়ত্বাধীন সুযোগগুলোর উপর কুঠার চালিয়ে দিলো। এ কারণে (শরীয়ত প্রদত্ত) এখন তার শাস্তি এই যে, সে আর না তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার পাবে, আর না ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর (তাদের মাঝে) নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয হবে – যাবৎ না সেই নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করে, এরপর তাদের দু’জনের মাঝে কোনো কারণে বনিবনা না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে (দু’জনের সহবাস হওয়ার পর) ওই স্বামীর কাছ থেকেও ‘তালাক’ লাভ করে। কেবল তখনই সে তার পূর্বের স্বামীর সাথে পুণরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।

তালাকে সুন্নাহ

এর সারবত্তা হল, ইসলামী শরীয়তের মূল অভিপ্রায় তো এই ছিল যে, ‘তালাক’ দিতে বাধ্য হওয়া অবস্থায়ও যেন একটির বেশি তালাক দেয়া না হয়, যাতে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া এবং পারষ্পরিক সংশোধন ও মিল-মিশের বেশি থেকে বেশি সুযোগ বাকি থাকে। কিন্তু কেউ যদি এ কাজ করার ইচ্ছা পোষন করেই থাকে, তাহলে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তার উপর পদশৃঙ্খল রয়েছে যে, সে এক ‘তুহরে’ একটির বেশি তালাক দিবে না। যদি দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় তালাক দিতেই হয়, তাহলে (স্ত্রীর) দ্বিতীয়বার হায়েয আসার অপেক্ষায় থাকবে। অতঃপর স্ত্রী যখন (হায়েযের নাপাকী থেকে) পাকসাফ হয়ে যাবে, তখন ‘তালাক’ দিয়ে দিবে।

তালাকের পর্যায় তিনটিকে এভাবে শেষ করে দেয়াটাও যদিও-বা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে পছন্দনীয় নয়, কিন্তু তা তিন ‘তুহরে’ আলাদা আলাদা ভাবে সম্পাদিত হয়ে শরীয়তের বিধান মোতাবেক হয়ে যাওয়ার কারণে একে ‘তালাকে সুন্নাহ’ বলে অবিহিত করা হয়। এর অর্থ এই নয় যে, এমনটা করা মাসনুন (সুন্নত) ও মুস্তাহাব (নেকির কাজ)। (কেননা রাসুলুল্লাহ সা. থেকে একাজ পছন্দনীয় হওয়ার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, আর না খুলাফায়ে রাশেদীন রা. -যাঁদের সুন্নতকেও ‘সুন্নতে ইসলাম’ বলা হয়ে থাকে তাঁদের থেকে এর কোনো প্রমাণ আছে)।

বরং হাকীকত হল, ‘এক তুহরে একই সাথে দুই বা তিন তালাক দেওয়া’ কিংবা ‘হায়েয অবস্থায় তালাক দেওয়া’ -শরয়ী দৃষ্টিতে জায়েয নয়। সাহাবায়ে কেরাম একে ‘বিদআত’ বলেছেন। এজন্য উপরোক্ত পন্থাটিকে এই (বিদআত ও নাজায়েয ) পন্থাটির বিপরীতে ‘সুন্নত’ (আদর্শিক পন্থা) বলে অবিহিত করা হয়েছে। এর অর্থ এর বেশি কিছু নয় যে- ‘এরকম করাটা হারাম ,নাজায়েয বা বিদআত কিছু নয়’।

ইমাম দারাকুত্বনী রহ. এবং ইমাম ত্বাবরানী রহ. নিজ নিজ সনদে এই রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ হযরত ইবনে ওমর রা.-কে (১১)বলেছেন- السنة أن تستقبل الطهر فتطلق لكل قرء –‘সুন্নাহ (আদর্শিক পন্থা) হল, তুমি তুহরের অপেক্ষায় থাকবে, অতঃপর প্রত্যেক তুহরে তুহরে ‘তালাক’ দান করবে[দ্বারাকুতনী, ত্বাবরানী : নসবুর রায়া, যাইলায়ী- ৩/২২০; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৭/৩৩২, হাদিস ১৪৯৪৭; তালখিসুল হাবির, ইবনে হাজার- ৩/৪৬৪ হাদিস ১৮৯৮]

কুরআনের বিখ্যাত তাফসীরকার মাহমুদ আলুসী বাগদাদী রহ. এই হাদিসটিকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন- এখানে ‘সুন্নাহ’ দ্বারা রাসুলুল্লাহ সা.-এর এই উদ্দেশ্য ছিল না যে, এতে সওয়াব পাওয়া যায়। কেননা, এটা একটি মুবাহ কাজ; কোনো মুস্তাহাব বা ওয়াজীব কাজ নয়। বরং এর অর্থ হল, দ্বীন ইসলামে এই পদ্ধতিটিকে গ্রহন করে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এর উপর কোনো আযাব হবে না’। [তাফসীরে রুহূল মাআনী, আলুসী- ২/১৩৬]

এ থেকে একথার পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ফিকাহবীদগণ যে তালাককে ‘তালাকে সুন্নাহ’ বলে অবিহিত করেছেন, সেটা নিছক তাদের নিজ পক্ষ থেকে বলেননি দেননি, বরং তাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এরশাদ মোতাবেকই তা বলেছেন। আর এর দ্বারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যে উদ্দেশ্য ছিল, অর্থাৎ তিনি জায়েয পদ্ধতিটিকে যে ‘সুন্নাহ’ বলে অবিহিত করেছেন, ফিকাহবীদগণ সকলেই ওই একই অর্থ নিয়েছেন।

তালাকের ক্রিয়া ও ফলাফল দুটি

তালাকের ক্রিয়াও ফলাফল দু’টি। (১) তালাকদাতা (স্বামী)র ‘বিবাহবন্ধন’ থেকে বেড়িয়ে যাওয়া এবং (২) (তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য) অপর কোনো পুরুষের সাথে বিয়ে জায়েয হওয়া।

এদুটোর মধ্যে প্রথম ফলাফলটি তো ‘তালাক’ দানের সাথে সাথেই কার্যকর হয়ে যায় এবং ইদ্দত ‘অতিবাহিত’ হয়ে যাওয়ার পর তা পূর্ণতা লাভ করে। অর্থাৎ এমতাবস্থায় (১ বা ২ তালাকের ক্ষেত্রে ) সে চাইলেও উক্ত নারীর সম্মতি ব্যতীত এবং (৩ তালাকের ক্ষেত্রে) হালালাহ ব্যতীত তার সাথে পূর্বের (বৈবাহিক) সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে না। যদিও-বা ইদ্দতের আগে আগেই তালাকের প্রথম ক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, কিন্তু তালাকদাতা স্বামী যদি তার স্ত্রীর সাথে খুলুত (সহবাস) করে থাকে, তাহলে ‘রযঈ (১২) তালাকে’র ক্ষেত্রে তার একটুকু এখতিয়ার থাকে যে, সে তার তালাক থেকে (স্ত্রীকে ) ফিরিয়ে নিতে পারবে।

তালাকের এই ক্রিয়া যে শুরু হয়ে গেছে, তার প্রমাণ এই যে, ‘তালাকদাতা স্বামী যদি (স্ত্রীর) ইদ্দত চলাকালিন সময়ের মধ্যেই তাকে ফিরিয়ে না নেয়, তাহলে তখন ওই তালাকপ্রাপ্তা নারীকে তার আর স্ত্রী হিসেবে গণ্য করা হয় না; তদুপরি (ইদ্দত চলাকালিন সময়ে) ওই ব্যাক্তির জন্য উক্ত নারীর সাথে (স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নেয়ার নিয়ত ব্যতীত) সহবাসে লিপ্ত হওয়াও জায়েয থাকে না; আর ইদ্দতের সময়ও গণ্য হতে থাকে তখন থেকেই, যখন থেকে সে তালাক দিয়ে ফেলেছে; এমনকি যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হয়নি, স্বামী যদি তাকে ‘তালাক’ দিয়ে দেয়, তাহলে যে মুহূর্তে তাকে ‘তালাক’ দেয়া হয়েছে, সে মুহূর্তেই ওই নারীর জন্য অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করা জায়েয হয়ে যায়, কোনো ইদ্দতেরও প্রয়োজন হয় না। তালাকের এই ক্রিয়ার কারণেই, যে মুহূর্তে স্বামী জবান থেকে ‘তালাক’ শব্দটি বেড় করেছে , সেই মূহূর্ত থেকেই সংশ্লিষ্ট নারীকে مطلقة (মুৎলাকাহ/ তালাক প্রাপ্তা) বলা হয়ে থাকে। কুরআন এ ধরনের নারীকে তার ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার আগেই مطلقات (মুৎলাকাত/ তালাক প্রাপ্তারা) নামে স্মরন করা হয়েছে। وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ – ‘আর ‘তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন হয়েয পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে’। [সূরা বাকারাহ ২২৮]

উপরোক্ত এসব আলোচনা থেকে জানা গেল যে, ‘তালাক’ কথাটি জবান থেকে বেড় হওয়া মাত্রই তালাকের ক্রিয়া ও ফলাফল শুরু হয়ে যায়। তবে দ্বিতীয় ক্রিয়া ও ফলাফলটি, অর্থাৎ অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করা হালাল হওয়াটা (তালাকপ্রাপ্তা নারীর) ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর কার্যকর হয়; ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নারীর জন্য অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করা হালাল হয় না।(১৩) 

ইদ্দতের মুদ্দত (সময়সীমা)

ইদ্দত শুধু ওই নারীকে পালন করতে হয়, যার সাথে তার স্বামী বিবাহিত অবস্থায় সহবাস করেছে। এ ধরনের নারীর জন্য প্রথমে দেখতে হবে যে, সে তালাকের সময় অন্তস্বত্তা অবস্তায় রয়েছে কি-না। সেক্ষেত্রে সর্বসম্মত মতে বাচ্চা প্রসব পর্যন্ত সময়কে তার ইদ্দতকাল বলে ধরা হবে -চাই তা নয় মাসে প্রসবিত হোক বা একদিনেই। এরশাদ হয়েছে-  وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ  –‘অন্তস্বত্তা নারীদের ইদ্দতের সময়সীমা হল তাদের (সন্তান) প্রসবকরণ পর্যন্ত[সূরা তালাক ৪]

আর যদি সে অন্তস্বত্তা না হয় এবং তার হায়েযও আসে, তাহলে তার ইদ্দতের সময়সীমা হল তিন হায়েয, যেমন উপরের (সূরা বাকারাহ ২২৮নং) আয়াত দ্বারা প্রমাণিত -চাই তার এই হায়েয তিন মাস বা নব্বই দিনের ভিতরেই হয়ে যাক কিংবা এসময়ের পূর্বে বা পরে হোক না কেনো।

আর সে যদি নাবালেগা (অপ্রাপ্ত বয়ষ্কা) হয়, (যার এখনো হায়েয আসে নি), কিংবা যদি এত প্রাপ্ত বয়ষ্কা হয় যে, তার হায়েয আসা বন্ধ হয়ে গেছে, তাহলে সেক্ষেত্রে তার ইদ্দতকাল তিন মাস বলে অবিহিত করা হয়েছে।  وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ – ‘আর তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ‘হায়েয’ আসার আশা নেই, তোমাদের যদি (তাদের ইদ্দত নিয়ে) সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে তাদের ইদ্দত কাল হল তিন মাস। আর (এই ইদ্দতকাল) তাদেরও জন্যও (প্রযোজ্য), যাদের (এখনও) হায়েয আসেনি। [সূরা তালাক ৪]

‘তালাকে বিদআত’ ও তার ক্রিয়া বা ফলাফল

এখন এখানে যে কথাটি রয়ে যায়, সেটি হল, কেউ যদি ইসলামের উল্লেখীত মূখ্য হিকমতসমূহ ও সহজতাগুলোর প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ না করে উপরোক্ত বিধানগুলোর বিপরীতে -স্ত্রী হায়েয অবস্থায় থাকা কালে কিংবা যে তুহরে সহবাস করে ফেলেছে ওই তুহরেই তাকে তালাক দিয়ে দেয়, অথবা যদি এক তুহরে একই সাথে দুই বা তিন তালাক দিয়ে দেয়, (যার কোনোটাই ‘তালাকে সুন্নাহ’ নয়), তাহলে (এভাবে সুন্নাহ পরিপন্থী তালাক গুলো) কার্যকর হয়ে যাবে কিনা? এবং এভাবে প্রদত্ত তালাকগুলিকে কি দুই বা তিন তালাক ধরে নেয়া হবে, নাকি (সবগুলোকে) এক তালাকই ধরা হবে?

এ ব্যপারে কুরআন সুন্নাহ’র সুস্পষ্ট বর্ণনা, সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐক্যমত) এবং ইমাম চতুষ্টয়ের সর্বসম্মত মতানুসারে একথা বোঝা যায় যে, ‘হায়েয অবস্থায়’ প্রদত্ত ‘তালাক’ যদিও একটি গোনাহ’র কাজ, কিন্তু তা সত্ত্বেও তালাক কার্যকর হয়ে যাবে এবং যে ভাবে ‘তালাক’ দেয়া হবে, সেভাবেই তা কার্যকর হবে। (অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্নভাবে তিন তালাক দিলে, তা ভিন্ন ভিন্ন ভাবেই কার্যকর হবে; আবার ) যদি একই সাথে তিন তালাক দেয়া হয়, তাহলে সেটা (মোট) তিন তালাক’ই গণ্য হবে এবং তাতে –জায়েয (সুন্নাহ) পন্থায় দেয়া তিন তালাকের ক্ষেত্রে (তালাকের) যে ক্রিয়া ও ফলাফল কার্যকর হয়, ঠিক একই ক্রিয়া ও ফলাফল এ ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে। 

একবার এক সাবেক জর্জ সাহেব এই নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন যে-  ‘এটা আবার কেমন কথা যে, একই সাথে তিন ‘তালাক’ দেয়া নাজায়েযও, আবার তাতে তালাকও কাযকর হয়ে যায়’ ! (এধরনের আপত্তি তার বিচারক সুলভ মর্যাদার সাথে কতটুকু মানানসই ছিল সে দিকে দৃষ্টি না দিয়ে বলতে চাই), এক্ষেত্রে আপনার বোঝা উচিৎ যে, কোনো কাজ নাজায়েয ও নিষিদ্ধ হওয়াটা তা কার্যকর হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। হত্যা একটি অন্যায় অপরাধ ও কবীরা গোনাহ। কিন্তু যাকে গুলি মেড়ে হত্যা করে ফেলা হল, তার ‘মরন’-তো এটা দেখতে যায় না যে, গুলিটিকে ন্যায় ভাবে ছোড়া হয়েছে, না অন্যয় ভাবে! এতে-তো সে মড়েই যায়। এমনটা তালাকের বেলায়ও ঘটে। অর্থাৎ, একই সাথে তিন তালাক দেয়াটা যদিও নাজায়েয ও গোনাহ’র কাজ, কিন্তু কেউ তা দিয়ে ফেললে তা কার্যকর হয়ে যায়।

শাইখুল ইসলাম ইমাম নববী রহ. সহিহ মুসলীম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে একথার উপর সমস্ত বরেন্য আলেমগণের ঐক্যমত্যতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন-

وقد اختلف العلماء فيمن قال لامرأته أنت طالق ثلاثا فقال الشافعي ومالك وأبو حنيفة وأحمد وجماهير العلماء من السلف والخلف : يقع الثلاث . وقال طاوس وبعض أهل الظاهر : لا يقع بذلك إلا واحدة 

 ‘যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলে যে ‘তোমাকে তিন তালাক’, এ সর্ম্পকে ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম আহমদ সহ পূর্বসূরী উত্তরসূরী জমহুর ওলামায়ে কেরাম বলেন যে, এতে তিন তালাকই কার্যকর হয়ে যাবে। অপরদিকে হযরত তাউস সহ কোনো কোনো জাহেরী আলেম বলেন যে, এতে কেবলমাত্র এক তালাক কার্যকর হবে’[শরহে মুসলীম, নববী- ১/৪৭৮]

কথা যখন এতদূর গড়ালো, তখন একথাও বুঝে নিন যে, ‘বিবাহ চুক্তি’কে ছিন্ন করার জন্য ইসলাম এর তিনটি পর্যায়কে তিন তালাকের আঙ্গিকে রেখেছে। এ পর্যায় গুলোকে তখনই তিন তালাক গণ্য করা হবে, যখন তালাকদাতা এই নিয়তে তালাক প্রদান করবে যে, আমি দুই বা তিন তালাক দিচ্ছি। (অর্থাৎ যখন দুই তালাকের নিয়তে দিবে, তখন দুই তালাক এবং যখন তিন তালাকের নিয়তে দিবে তখন তা তিন তালাক হিসেবেই গণ্য হবে -তালাকগুলো চাই ভিন্ন ভিন্নভাবে দিক বা একই সাথে দিক না কেনো)। কিন্তু সে যদি এক তালাকই দেয়, কিন্তু ওই (এক) তালাকটিকেই কয়েকবার উচ্চারণ করে অথবা তাগিদ বুঝাতে ওই একটি তালাককেই কয়েকবার করে বলে, তাহলে এভাবে ‘তালাক’ শব্দটি যদি দশবারও উচ্চারণ করে, তাহলে (সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির) দ্বীনদারীত্বের ভিত্তিতে সেটাকে এক তালাকই মনে করা হবে।

রাসুলে আকরাম , হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এবং হযরত ওমর রা.-এর জামারার প্রথম দিকে (সর্ব সাধারণ মুসলমানদের ব্যাপারে) তাঁদের সবারই অভিজ্ঞতা ছিল যে, দ্বীনদারীত্ব ব্যাপকভাবে বিরাজমান। সে সময় তালাক নিয়ে কারোর উপরই এমন সন্দেহ হত না যে, ‘সে তিন ‘তালাক’কে তিনবারের নিয়তেই দিয়ে ফেলেছে কিন্তু পরে নিজের সহজতার খাতিরে এই হিলা-বাহানার অবতারনা করছে যে, আমি ‘তালাক’ কথাটিকে তিন বা ততধিকবার বলেছি নিছক (এক তালাকের উপরই) জোর দান করার জন্য’ !

এজন্য উপরোক্ত ওই বরকতময় তিন জামানার এমন হত যে, কেউ যখন কসম খেয়ে এ কথা বলতো যে ‘এক তালাক দানই আমার নিয়ত ছিল, আর ‘তালাক’ কথাটিকে কয়েকবার আওড়ানোর উদ্দেশ্য ছিল নিছক কথাটির উপর জোর দান করা’, তখন তার নিয়ত (-এর মৌখিক স্বীকৃতি)কে গ্রহন করে নিয়ে সেটাকে ‘এক তালাক’ হিসেবেই গণ্য করা হত ।

কিন্তু হযরত ওমর ফারুকের খিলাফতের শেষ দিকে তাঁর দূরদর্শী দৃষ্টি অনুভব করলো যে, এখন লোকজনের দ্বীনদারীত্ব ও নিয়তের উপর ভরসা করে ‘তিন তালাক’কে ‘এক তালাক’ হিসেবে গণ্য করা মুনাসেব নয়। কেননা, এখন সত্যবাদীতা ও দ্বীনদারীত্বের মানদন্ড নিম্ন-মানের দিকে চলে যাচ্ছে, আর পরবর্তীতে তা একেবারেই থাকবে না। তাই তিনি সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করে একথা ঘোষনা করে দিলেন যে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত সহজতার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে একই সাথে তিনবার ‘তালাক’ কথাটি উচ্চারণ করবে, আমরা তার স্ত্রীকে তিন তালাকপ্রাপ্তা হিসেবেই গণ্য করবো’। যেহেতু এ কথাটি কুরআন সুন্নাহ মোতাবেকই ছিল, এজন্য সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বসম্মত ভাবে একে গ্রহন করে নিয়েছিলেন, যেমনটা ‘শরহে মুসলীম’-এ ইমাম নববী রহ. উল্লেখ করেছেন। যেসব জনাব একসাথে প্রদত্ত তিন তালাককে ‘এক তালাক’ হিসেবেও মানেন না, তারাও (সাহাবায়ে কেরামের) এই ‘ইজমা’ (ঐক্যমত)-কে অস্বীকার করতে পারবে না।

এখানে যে কথাটি খুবই ভেবে দেখার মত, তা এই যে, কুরআন-সুন্নাহ’র এমন কোনো বিধানকে -বিশেষ করে যে বিধানের উপর নববী যুগে, সিদ্দীকী যুগে, এমনকি খোদ হযরত ওমরের প্রথম যুগেও আমল হত, সেটাকে আজ হযরত ওমর রা. কি করে বদলিয়ে ফেলতে পারেন!?! আর যদি বদলাতেনও, তাহলে রাসুলুল্লাহ -এর কথার উপর জীবন উৎসর্গকারী এতসব সাহবায়ে কেরাম রা. কি করে সেটা মেনে নিতে পারতেন !?!

বস্তুতঃ উপরে এর গুঢ়রহস্য ও হাকীকত সম্পর্কে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা ছাড়া এই ইজমা বৈধ হওয়া’র আর কোনো কারণই থাকতে পারে না। মূলতঃ ফারুকী ফরমান এবং সাহাবাগণের ইজমা -কুরআন সুন্নাহ’য় সামান্যতম কোনো পরিবর্তনও আনায়ন করেনি; বরং সেটাকে অপ-স্থানে ব্যবহৃত হওয়া থেকেই বাঁধা দিয়েছে মাত্র। যতদিন পর্যন্ত মানুষের দ্বীনদারীত্বের উপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখা গেছে, ততদিন এর উপর আমল করা হয়েছে, এবং যখন সে দ্বীনদারীত্ব আর থাকেনি, তখন এর উপর আমল করাও ছেড়ে দেয়া হয়েছে। (সামনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত দলিল প্রমাণ আসছে)।

অর্ডিনেন্স

আমরা আলোচ্য মাসআলার মূল বিষয়বস্তুটিকে যথেষ্ট বিষদ আকারে বিদ্ধৃত করে দিয়েছি। এখন  বিয়ে ও তালাক সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের হাকেমানাহ মানশা আপনাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এবারে আপনারা অর্ডিনেন্সের দিকে তাকিয়ে দেখুন। অর্ডিনেন্সের এ দফাটির সারকথা হল:-

যখন তালাক প্রদান করা হবে, তখন স্বামীকে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের কাছে একথার খবর জানাতে হবে। এই খবর হস্তগত হলে চেয়ারম্যান সাহেব স্বামী স্ত্রী’র মুখপাত্রদের সহায়তায় সমঝোতা ও মিলমিশ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন। এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলে -চেয়ারম্যানকে খবরটি জানানোর সময় থেকে ৯০ দিন পর, কিংবা স্ত্রী অন্তস্বত্তা হওয়ার ক্ষেত্রে- ‘৯০ দিন ও সন্তান প্রসব’ -এ দুয়ের মধ্যে যে সময়সীমাটি অধিক দীর্ঘ হবে, সে সময়সীমার পর বিবাহবিচ্ছেদকে আমলে নিয়ে আসা হবে; এর আগে ‘তালাক’ কার্যকর হবে না। এই সময়সীমার মধ্যে শালিশ ছাড়াও তালাকের ফয়সালাটিকে বিলুপ্ত করে দেয়ার এখতিয়ার স্বামীরও থাবে। আর তিন মাস কিংবা সন্তান প্রসবের পর যখন বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকরী হয়ে যাবে, তখন স্বামী তার ওই স্ত্রীর সাথে দ্বিতীয় বারের মত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। কিন্তু তৃতীয়বার উপরোক্ত পন্থায় তালাক প্রয়োগীত হওয়ার ক্ষেত্রে এই অধিকার আর অবশিষ্ট থাকবে না। এছাড়াও এক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের কাছে তালাকের সংবাদ না জানানোটাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে অবিহিত করা হয়েছে, যার কারণে শুধুমাত্র জেল বা জরিমানা, অথবা উভয় শাস্তি দেয়া হতে পারে’ ।

অর্ডিনেন্সের কলমবন্ধ বাক্যগুলোকে উপরে উল্লেখীত আমাদের বিষদ আলোচনার সাথে পরখ করে দেখুন, তাতে জানতে পারবেন যে, অর্ডিনেন্স কুরআন সুন্নাহ’র সাথে ৬টি স্থানে সংঘর্ষ বাঁধাচ্ছে:-

(১) অর্ডিনেন্সে- তালাকের পর শালিশের মাধ্যমে পরষ্পরের মধ্যে সমঝোতা ও মিলমিশের পন্থাকে গ্রহন
করে নেয়া হয়েছে ! অথচ কুরআন কারিম তালাকের আগেই সমঝোতা ও সংশোধনের চিন্তা করতে বলেছে।

(২) অর্ডিনেন্সে- ইদ্দত অতিবাহিত না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তালাককে একদমই নিষ্ক্রিয় বলে অবিহিত করা হয়েছে! অথচ কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে তালাকের একটি ক্রিয়া (তালাকদাতা স্বামীর জন্য উক্ত নারী হারাম হওয়া) সর্বাবস্থায় ‘তালাক’ শব্দটি বলে ফেলা মাত্রই শুরু হয়ে যায়। আর স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস করার পূর্বেই তালাক দিয়ে থাকে, তখন (তালাকের ) দ্বিতীয় ক্রিয়া অর্থাৎ অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার বৈধতাও ততক্ষনাৎ কার্যকর হয়ে যায়।

(৩) অর্ডিনেন্সে -চেয়ারম্যানের কাছে তালাকের খবর পৌছানোর পর থেকে ‘‘ইদ্দতকে’’ গণনায় ধরা হয়েছে! অথচ কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে তালাক শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার ঠিক পর থেকেই ইদ্দতের গণনা শুরু হয়ে যায়।

(৪) অর্ডিনেন্স স্ত্রীর অন্তস্বত্তা না হওয়া অবস্থায় ইদ্দতের সময়সীমা রেখেছে ৯০ দিন! অথচ কুরআন কারিম তিন হায়েযের কথা বলেছে চাই তা যত দিনেই হোক না কেনো।

(৫) অর্ডিনেন্স -স্ত্রীর অন্তস্বত্তা হওয়া অবস্থায় ‘৯০ দিন এবং সন্তান প্রসব’ – এ দু’য়ের মধ্যে বেশি দীর্ঘতর সময়টিকে ইদ্দতকাল বলে অবিহিত করেছে! অথচ কুরআন কারিম কোনো শর্ত ছাড়াই ‘সন্তান প্রসব’কে অন্তস্বত্তা নারীর ইদ্দত বলে অবিহিত করছে -চাই তা এক দিনের ভিতরেই হয়ে যাক না কেনো।

(৬) অর্ডিনেন্সে -ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে সর্বাবস্থায় জায়েয রাখা হয়েছে, এমনকি যদি তিন বার পৃথক পৃথকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় -তবুও। অর্থাৎ, একবার তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়া হল অথবা তাকে নতুন করে বিয়ে করে নেয়া হল, এরপর দ্বিতীয় বারও এমনটাই করা হল, তারপর তৃতীয়বার তালাক দিয়ে ফেললে তাকে অন্য কাউকে বিয়ে করা ব্যতীরেকে (প্রথম স্বামীর সাথে) পুনরায় বিয়ে করা জায়েয হবে না । এই সুরতটি ছাড়া অর্ডিনেন্স সর্বক্ষেত্রেই প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে জায়েয রেখেছে। অথচ এর বিপরীতে আপনারা পড়ে এসেছেন যে, (শরীয়তের দৃষ্টিতে) যেভাবে আলাদা আলাদা ভাবে প্রদত্ত তালাক  প্রয়োগিত হয়, তেমনি ভাবে একই সাথে প্রদত্ত তিন তালাকের ক্রিয়াও ওইভাবেই প্রয়োগিত হয় । আর এ ব্যাপারে সাহাবাযে কেরাম রাঃ. এবং চার ইমামের ইজমা রয়েছে। কোনো কোনো ইসলামী ফেরকাহ যারা এ মাসআলার ক্ষেত্রে গোটা উম্মাহ’র রায় থেকে ভিন্নমত পোষন করে, তাদের মতেও যদি তিন তালাককে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তুহরে দেয়া হয়, তাহলেও প্রথম স্বামীর সাথে আর বিয়ে জায়েয থাকে না । কিন্তু অর্ডিনেন্সে এরকম অবস্থায়ও সেটাকে বৈধ রাখা হয়েছে !!!

এই ছয়’টি ভুলের মধ্যে পাঁচটি তো এমন, যা কুরআন কারিমের পরিষ্কার বক্তব্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং এগুলোর কোনো ব্যাখ্যাই চলতে পারে না। যারা ‘পারিবারিক আইনের’ ওকালতী করে প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখেছেন, তারাও এগুলোর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না। কেউ কেউ-তো এক্ষেত্রে নিরুপায় হয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, এগুলো বাস্তবেই কুরআন কারিমের পরিপন্থী।  কিন্তু কেউ কেউ এসব কথাকে মুন্ডু থেকেই পরিত্যাগ করে চলে গেছেন, এগুলোর উল্লেখ পর্যন্ত করেন নি।

যাহোক, প্রথমে আপনারা এ পাঁচটি বিষয়কেই নিন এবং কুরআন কারিমের সাথে খোলাখুলি ধৃষ্ঠতা ও   ঔদ্ধত্বের ভয়ঙ্কর দৃশ্যটুকু অবলোকন করুন:-

(১) শালিশী কাউন্সিল

আমাদের অর্ডিনেন্সের আলোকে উভয়ক্ষের মধ্যে সংশোধন ও মিলমিশের জন্য ‘শালিশী কাউন্সিল’ তার কাজ নিয়ে দাঁড়াবে তালাক হয়ে যাওয়ার পর ! অথচ কুরআন কারিম বলছে-

وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا

‘আর তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার অশংকাবোধ করো, তাহলে তোমরা স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে একজন শালিশ এবং স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে একজন শালিশ পাঠিয়ে দাও। তারা উভয়ে যদি সংশোধনের ইচ্ছে করে, তাহলে আল্লাহ তাদের উভয়ের মাঝে আনুকূল্যতার তৌফিক দান করবেন। [সূরা নিসা ৩৫]

 বিবেকও একথাই বলে যে, শালিশ গঠনের উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিৎ যে, সে (স্বামী-স্ত্রীর অ-মিল’কে) ‘তালাক’ পর্যন্ত গড়ানোর সুযোগই দিবে না। বলাই বাহুল্য, এ উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে তখন, যখন শালিশী কাউন্সিল তালাকের পূর্বেই প্রতিষ্ঠা লাভ করবে, যেমনটা বলেছে পবিত্র কুরআন। অথচ অর্ডিনেন্স বলছে যে, সংশোধনের চিন্তা করতে হবে ‘তালাকে’র পর। অর্থাৎ, দুই লড়াকুর লড়াইয়ের সময় বসে বসে লড়াই দেখতে থাকো, আর তাদের পরষ্পরের মধ্যে ঘটনা যখন পাক খেয়ে যাবে, তখন বুঝানো সমঝানো এবং দুজনের মাঝে সংশোধনের চিন্তাফিকির করো!!!

আমাদের বুঝে আসে না, বিবেক বা শরীয়তগত দিক থেকে এমন কোন প্রয়োজনটা দেখা দিলো, যা আমাদের আইন প্রনেতাদেরকে একথার দিকে ধাবিত করে নিয়ে গেলো?

(২,৩) তালাকের ক্রিয়া ও বিধান

আখলাকী দৃষ্টিকোণ থেকে যদিও-বা পরিবারের লোকদেও জন্য এ বিষয়টি জরুরী হওয়া উচিৎ যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে যখন ফাটোল ধরার সম্ভাবনা দেখা দিবে, তখন তারা সেটাকে মিটিয়ে ফেলার চিন্তা করবে। কিন্তু স্বামী’র জন্য এ বিষয়টিকে অত্যাবশ্যক করে দেয়া যে -সে ‘তালাক’ দানের সংবাদটিকে কাউন্সিলের গোচরীভূত করবে এবং পরে তালাকের ফলাফল ও বিধানগত কার্যোরিতাকে সংবাদ প্রদানের উপর ঝুলন্ত রাখা হবে -এটা কুরআন সুন্নাহ’র পরিষ্কার এরশাদাবলির পরিপন্থী। এর বিপরীতে অর্ডিনের্সে বলা হয়েছে যে, ইদ্দতের গণনা ধরা হবে ওই সময় থেকে, যখন থেকে তালাকের খবরটিকে চেয়ারম্যানের গোচরীভূত করা হবে! অর্থাৎ, খবর গোচরীভূত করার আগে তালাক’কে যেন সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয়, নিরর্থক ও অর্থহীন কাজ হিসেবে গণ্য করে নেয়া হয়েছে! অথচ ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনার আলোকে আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক তালাকের মূল ক্রিয়া ও ফলাফল ‘তালাক’ কথাটি উচ্চারিত হওয়ার পর পরই আরম্ভ হয়ে যায়। এ দিক থেকে অর্ডিনেন্সের একটি মাত্র ভুলই একই সাথে কুরআনের দু-দুটি আয়াতের বিরুদ্ধচারন করেছে।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِن قَبْلِ أَن تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا

‘হে ইমানদারগণ, তোমরা যখন মু’মিন নারীদেরকে বিয়ে করবে, অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ (সহবাস) করার পূর্বেই যদি তালাক দিয়ে দাও, তাহলে তোমাদেও জন্য তাদের উপর ওই ইদ্দতের কোনো বিধান নেই, যে ইদ্দত তোমরা (সহবাসকৃত স্ত্রীর বেলায়) গণনা করে থাকো। [সূরা আহযাব ৪৯]

উপরোক্ত আয়াতে কারিমাটি পরিষ্কারভাবে একথাই বলে দিচ্ছে যে, স্বামী তার যে স্ত্রীকে খুলুত/সহবাসের পূর্বেই ‘তালাক’ দিয়ে দেয়, সেই স্ত্রীর উপর ততক্ষনাৎ তালাকের দুটো ক্রিয়া ও ফলাফলই কার্যকর হয়ে যায়; এক্ষেত্রে ইদ্দতের জন্য একমুহূর্ত অপেক্ষা করাও অপরিহার্য নয়। অথচ অর্ডিনেন্স এই ‘তালাক’ কে ৯০ দিন পর্যন্ত একেবারে অনর্থক বলে ঘোষনা দিচ্ছে !!!

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ

‘আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন হায়েয পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে। [সূরা বাকারাহ ২২৮]

কুরআন কারিম এই আয়াতে বলেছে যে, যে স্ত্রীকে সহবাসের পর ‘তালাক’ দেয়া হয়েছে, তার কর্তব্য হল, সে তিন হায়েয পর্যন্ত ‘ইদ্দত’ অতিবাহিত করবে। এখানে এসব নারীর ইদ্দত অতবাহিত হওয়ার আগেই কুরআন তাদেরকে مُطَلَّقَاتُ (তালাক প্রাপ্তারা) শব্দ ব্যবহার করেছে, যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তালাকের মূল ক্রিয়া ও ফলাফল আরম্ভ হয়ে গেছে। (আর সেটা হল, পূর্বের স্বামী থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ)।এতে যদি কোনো ক্রিয়া’ই আরম্ভ না হত, তাহলে তাকে مُطَلَّقَة (তালাকপ্রাপ্তা) বলটাই অর্থহীন হত।

এই আয়াত দুটি ছাড়াও এব্যাপারে নিম্নোক্ত পরিষ্কার হাদিসগুলোর বিরোধীতা করা হয়েছে:- 

ثلاث جِدّهُن جِدّ وهَزْلُهن جِدّ : النكاح والطلاق والرَّجْعة

‘তিনটি বিষয় এমন আছে, যা বস্তুনিষ্ঠভাবে করলেও কার্যকর হয়ে যায়, আবার রসিকতা করে করলেও কার্যকর হয়ে যায়। সেগুলো হলঃ বিয়ে, তালাক এবং রযআত’[সুনানে আবু দাউদ- ১/৩০৫, হাদিস ২১৯৪; (১৪) জামে তিরমিযী- ১/২২৫, হাদিস ১১৮৪;  সুনানুল কুবরা, বাইহাকী, হাদিস ১৪৯৯৩; শারহু মাআনীল আছার, তাহাবী- ২/৫৮; শারহুস সুন্নাহ, বাগাভী- ৯/২১৯; তালখিসুল হাবির, ইবনে হাজার- ৩/২৩৬, হাদিসটি হাসান]

ইবনে মাজা’য় হযরত হাসান রা.-এর রেওয়ায়েতে এই আলফাযও উল্লেখ রয়েছে-

من طلق او حرم او نكح او انكح جادا او لاعبا فقد جاز عليه

‘যে ব্যক্তি (স্ত্রীকে) তালাক দেয় বা (তাকে নিজের জন্য) হারাম করে নেয়, অথবা (কাউকে) বিয়ে করে বা  বিয়ে করায় -চাই সেটা বস্তুনিষ্ঠভাবে করুক কিংবা রসিকতা করেই করুক, তা (সংশ্লিষ্ট) ব্যাক্তির উপর কার্যকর হয়ে যাবে’। [সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ২০৩৯; (১৫)ত্বাবরাণী: কাঞ্জুল উম্মাল- ৫/১৫৬ ; আবু হাতেম, ইবনে জারীর: ই’লাউস সুনান- ১১/১৭৯]

এসব ছাড়াও সাহাবায়ে কেরামগণের অসংখ্য ফয়সালা এ কথার সাক্ষ্য বহন করে যে, তালাকের ক্রিয়া ও ফলাফল (তথা স্বামী থেকে স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটা) ‘তালাক’ কথাটি জবান থেকে বেড় হওয়া মাত্রই কার্যকর হয়ে যায়। নিম্নে কয়েকটি ফয়সালার প্রতি লক্ষ্য করুন:-

(১) এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ‘কিনায়া’ (রূপক/পরোক্ষ) শব্দ যোগে ‘তালাক’ দিলো। তখন হযরত ওমর ফারুক রা. তাকে বায়তুল্লাহ’র দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে কসম দিয়ে বললেন: ‘সত্য সত্য বলো, ওই কথার দ্বারা তোমার উদ্দেশ্য কি ছিল? এতে সে স্বীকার করলো যে, তার উদ্দেশ্য ছিল ‘তালাক’। তখনই হযরত ওমর ফারুক রা. তাদের দুজনের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলেন। [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলীম]

(২) এক ব্যক্তি  ‘হারাম’ শব্দ যোগে তার স্ত্রীকে তালাক দিলো। তখন হযরত আলী মরতুযা রা. এই ফয়সালা দিলেন যে, এতে তার স্ত্রী সাথে মুবাশারাত (সহবাস) হারাম হয়ে গেছে। [মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: কান্জুল উম্মাল- ৫/১৬০]

এর বিপরীতে অর্ডিনেন্স -(তালাকের) খবর দানের পূর্বেই শুধু নয় বরং খবর দানের পরেও ৯০ দিন পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তালাকের কোনো ক্রিয়া বা ফলাফলকে গ্রহন করে নেয় নি! এজন্যই ৪ নং ধারায় ‘শালিশী কাউন্সিল’কে পরষ্পরের মাঝে সংশোধন ও মিলমিশ করিয়ে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এটা মূলতঃ শরয়ীভাবে কিছু হারাম প্রমাণিত হওয়ার পরও সেই হারাম কাজের প্রতি উৎসাহ দান করারই নামান্তর !

আর আইন-রচয়ীতাদের দৃষ্টিতে ‘সংশোধন’ দ্বারা যদি রযআত (স্ত্রীকে পুনরায় ফিরিয়ে নেয়া)
অথবা ‘মানসুখে তালাক’ (তালাক রহীতকরণ) উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেটা প্রত্যেক তালাকের ক্ষেত্রে হতে পারেনা। এটা কেবলমাত্র ‘রযঈ-তালাক’-এর ক্ষেত্রেই হতে পারে, যেক্ষেত্রে স্পষ্ট বাক্যে এক বা দু’বার পর্যন্ত তালাক দেয়া হয়ে থাকে। আরযে ক্ষেত্রে -বৈবাহিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণ রূপে ছিন্ন করে -এরকম কোনো কথাকে (তিন বা ততধিক) তালাকের নিয়তে (স্ত্রীর উপর) প্রয়োগ করা হয়, যেমন: ‘হারাম’, ‘বায়েন’ ইত্যাদি বলা, কিংবা ‘তালাক’ শব্দটিকে তিনবার বলা -এসব ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহ এবং মুসলীম উম্মাহ’র  ইজমার আলোকে ‘রযআত’ (স্ত্রীকে পুনরায় ফিরিয়ে নেয়া) কিংবা স্বামী স্ত্রী হিসেবে মিলমিশ করে দেয়ার কোনোই সুযোগ নেই। যেমনটা হযরত ওমর রাঃ. এবং হযরত আলী রা.-এর ফয়সালাগুলো থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। (সামনে এ সম্পর্কে আরও দলিল আসবে)। কিন্তু (তাদের বানানো মুসলীম) পারিবারিক আইনের দৃষ্টিতে উপরোক্ত এই সুরত তিনটির মাঝে কোনোই পার্থক্য নেই ! তালাক প্রয়োগিত হয়ে যাওয়ার পর তারা স্বাধীনভাবে উভয়ের মাঝে সমঝোতা ও মিলমিশের চেষ্টা-তদবির করছে!!!!

(৪) অন্তস্বত্তা নয় -এমন নারীর ইদ্দত

অর্ডিনেন্স অন্তস্বত্তা নয় এমন নারীর ইদ্দতকাল নির্ধারন করেছে ৯০ দিন। অথচ কুরআন কারিম পরিস্কার করে এরশাদ করছে-

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ ۚ وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِنَّ إِن كُنَّ يُؤْمِنَّ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

‘আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন হায়েয পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে। (১৬)আর যদি তারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ইমান এনে থাকে, তাহলে তাদের জন্য এটা হালাল নয় যে, আল্লাহ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন, তারা তা গোপন করবে। [সূরা বাকারাহ ২২৮]

এ আয়াতটি অন্তস্বত্তা নয় -এমন নারীর ইদ্দতের সময়কাল ঘোষনা দিয়েছে তিন হায়েয। এক্ষেত্রে এটা জরুরী নয় যে, এ ইদ্দতকাল তিন মাসেই (বা ৯০ দিনেই) পূরণ হতে হবে। (কারণ, ইদ্দতকাল ৩ হায়েয, আর ৩ হায়েয শেষ হতে) তিন মাসের চেয়ে বেশিও লাগতে পারে, আবার কিছুটা কমও লাগতে পারে। জানি না, আইন-রচয়ীতারা কুরআন কারিমের সাথে এই খোলাখুলি বিরোধীতার মধ্যে কি রহস্য মাথায় রেখেছিলেন?!

হতে পারে, এসব জনাবরা ‘ইদ্দতকাল’ তিন হায়েযের স্থলে তিন মাস এজন্য নির্ধারন করেছেন যে, ‘তিন হায়েয কালটি একটি অনির্দিষ্ট সময়সীমা, (যা ঠিক কতদিনে হবে -তা নির্ধারিত নয়, তাই) কেনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারন করা যাবে ন ‘।    এই হয় যদি ব্যাপার, তাহলে তো এসকল জনাবরা ইদ্দতের উদ্দেশ্যই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইদ্দতের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হল, এই সময়সীমার মধ্যে একথা জানা যাবে যে, নারীটি অন্তস্বত্তা নয় তো? আর এ বিষয়টি ‘তিন হায়েযে’র মাধ্যমে যতটা সুনিশ্চিৎভাবে জানা সম্ভব, তা দিন মাসের দ্বারা জানা (সবসময়) সম্ভব নয়। এজন্যই কুরআন কারিম এই অনির্দিষ্ট সময়সীমাটিকে অবলম্বন করে নিয়েছে।

আবার এমনও হতে পারে যে, এসব জনাবরা নিজ নিজ ইজতেহাদের (উদ্ভাবনের) মাধ্যমে একথা ধরে নিয়েছেন যে, ‘কুরআন কারিমের মূল উদ্দেশ্য হল ‘তিন মাস’ অতিবাহিত করা; এখানে নিছক তা’বির (বিষয়টির বর্ণনা) হিসেবেই ‘তিন হায়েয কাল’কে অবলম্বন করে নেয়া হয়েছে’! ব্যাপার যদি এই হয়, তাহলে আমরা তাদের বোধদয়ের উদ্দেশ্যে নিবেদন করবো, যদি আপনাদের ধারনাটাই সঠিক হত, তাহলে অতিবয়ষ্ক হওয়ার কারণে কিংবা নাবালেগা (অপ্রাপ্ত বয়ষ্কা) হওয়ার কারণে যে সকল নারীদের হায়েয আসে না, কুরআন তাদের (তিন মাস) ইদ্দতকালের কথা আলাদাভাবে বর্ণনা করতো না।

وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ 

 ‘আর তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ‘হায়েয’ আসার আশা নেই, তোমাদের যদি (তাদের ইদ্দত নিয়ে) সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে তাদের ইদ্দত কাল হল তিন মাস। আর (এই ইদ্দতকাল) তাদেরও জন্যও (প্রযোজ্য), যাদের (এখনও) হায়েয আসেনি। [সূরা তালাক ৪]

এ আয়াতটি পরিষ্কার বলে দিচ্ছে যে, সাধারণ তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্য যে ‘তিন হায়েয’ নির্ধারন করা হয়েছে, তা বিভিন্ন মুসলেহাতের কারণে জেনে বুঝেই করা হয়েছে। এর দ্বারা তিন হায়েয’ই উদ্দেশ্য; তিন মাস নয়।

আবার এমনটা হওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয় যে, এ সকল জনাবদের মস্তিষ্কে এ দুটি বিষয়ের হয়তো একটিও ছিল না। বরং নিজেদের ‘কুরআন গবেষনা’র উপর তারা এতটাই গর্বিত যে, আইন রচনা করার সময় তারা হয়তো পবিত্র কুরআনকে উঠিয়েও দেখেননি, কিংবা যদি দেখেও থাকেন, তাহলে হয়-তো তাই قُرُوء (কুরু) শব্দটির অর্থ ও মর্ম বোঝার জন্য কোনো ডিকশনারীরও হয়তো প্রয়োজন অনুভব করেন নি, বরং এর মর্মার্থ তিন মাসই বুঝে নিয়েছেন। ব্যাপার যদি এই হয়, তাহলে আমরা অত্যন্ত আদবের সাথে আরোজ করবো, এরকম পরওয়াহীনতার চর্চা ক্ষেত্র বানানোর জন্য কি একমাত্র এই কুরআনটাই রয়ে গিয়েছিল? অন্য কোনো বই দিয়ে কি এই জাতীয় শখের উপসোম হত না?

(৫) অন্তস্বত্তা মহীলার ইদ্দত

স্ত্রী অন্তস্বত্তা হওয়া অবস্থায় অর্ডিনেন্স ইদ্দতের সময়কাল এভাবে নির্ধারন করেছে যে, ‘৯০ দিন এবং বাচ্চা প্রসবের সময় কাল’ এ দুটোর মধ্যে যে সময়টি অধিক দীর্ঘ হবে, সেটাকেই গ্রহন করে নেয়া হবে

অথচ কুরআন কারিম কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একদম পরিষ্কার ভাবে বলেছে

وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ 

‘অন্তস্বত্তা নারীদের ইদ্দতের সময়সীমা হল তাদের (সন্তান) প্রসবকরণ পর্যন্ত’[সূরা তালাক ৪]

এ আয়াতে বাচ্চা-প্রসবকে অন্তস্বত্তা নারীর ইদ্দতকাল হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে, যদি (তালাকের পর) এক দিনের মধ্যেও বাচ্চা প্রসবীত হয়ে যায়, তাহলে বাস এতেই ইদ্দত কাল অতিবাহিত হয়ে গেল। এর বিপরীতে অর্ডিনেন্স বাধ্য করছে যে, আরও ৯০ দিন নাকি অতিবাহিত করতে হবে !

এই পাচটি বিষয়-তো এমন, সেগুলোর ব্যাপারে অর্ডিনেন্সের পক্ষে কেউই ব্যাখ্যা দিতে পারেনি । এবারে আমরা ৬ষ্ঠ মাসআলাটিকে খতিয়ে দেখবো।

(৬) পূর্বের স্বামীর সাথে বিয়ে’র নবায়ন

আলোচনার শুরুতে আমরা ইমাম নববী রহ.-এর রেফারেন্স দিয়ে আরোজ করে এসেছি  যে, জমহুর সাহাবায়ে কেরাম এবং মুস্তাহীদ ইমাম চতুষ্টয় এ কথার উপর একমত যে,  ‘তিন তালাক’ চাই এক সাথেই দেয়া হোক, বা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পৃথক পৃথক ভাবে দেয়া হোক, (এর প্রথম সুরতটি নাজায়েয হওয়া সত্ত্বেও) তিন তালাকই প্রয়োগীত হয়ে যায় এবং এর পর সংশ্লিষ্ট স্বামীর সাথে বিয়ে জায়েয থাকে না যাবৎ না উক্ত নারী অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং পরে তার সাথে বনিবনা না হলে সেও তাকে তালাক দিয়ে দেয়, কিংবা তার মৃত্যু হয়ে যায়।

কিন্তু কতিপয় ‘আহলে জাহের’ প্রায় গোটা মুসলীম উম্মাহ’র বিপরীতে এ কথার প্রবক্তা যে, যদি এক বারেই ‘তিন তালাক’ দেয়া হয়, তাহলে শুধুমাত্র এক তালাকই প্রয়োগীত হয়; তিন তালাক প্রয়োগীত হয় না। তবে এসকল হযরতগণও একথা মানেন যে, যদি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তুহরে তিন ‘তালাক’ দেয়া হয়, তাহলে তিন তালাকই প্রয়োগীত হয়ে যায় এবং এর পর সাবেক স্বমীর সাথে বিয়ের নবায়ন জায়েয থাকে না।

আর আমাদের ‘ফেমিলী লজ অর্ডিনেন্স’ এ থেকেও চার পা অগ্রসর হয়ে একথা বলছে যে- ‘তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তুহরে প্রদত্ত তিন তালাকও (তাদের বানানো) বিশেষ বিশেষ শর্ত (পাওয়া যাওয়া) ব্যতীত প্রয়োগীত হবে না। তাই এমতাবস্থায় (উভয়ের স্বামী-স্ত্রী সুলভ আচরণের  মধ্যে) নিষিদ্ধতার কিছু নেই ! হ্যাঁ, স্বামী যদি একবার ‘তালাক’ দিয়ে (স্ত্রীকে) ফিরিয়ে নেয়, অথবা ইদ্দত অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর নতুন ভাবে বিয়ে করে নেয় এবং সে পরে তাকে আবারও ‘তালাক’ দিয়ে দেয়; এমনিভাবে তালাক দানের পরও যদি সম্পর্কে আনুকল্যতা সৃষ্টি না হয় এবং সে তৃতীয় তালাকও দিয়ে দেয় এবং তালাক দিয়ে তাকে ইদ্দত চলাকালিন সময়ে ফিরিয়ে না নেয়, তাহলে ইদ্দত অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর এই বিধান থাকবে যে, এবারে আর প্রথম স্বামীর সাথে বিয়ে জায়েয নয়’’। এই ক্ষেত্রটি ছাড়া বাদ বাকি সর্বক্ষেত্রে ‘অর্ডিনেন্স’ বিয়ের নবায়ন ঘাটানোকে জায়েয ও বৈধ রেখেছে !!!

অর্ডনেন্সের এই ফয়সালা গোটা উম্মাহ’র পরিপন্থী। আজ পর্যন্ত গোটা মুসলীম উম্মাহ’র মধ্যে কোনো একজন আলেম বা ফকীহও এর স্বপক্ষে ফয়সালা দেন নি।

একটি হাস্যকর ব্যাখ্যাবাজী

এক্ষেত্রে অর্ডিনেন্সের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা মূলক ভূমীকা পালন করতে গিয়ে জনৈক সাহেব বড়ই হাস্যকর ফালাফালি ও লাফালাফি মূলক ব্যাখ্যাবজির আশ্রয় নিয়েছেন। মন-তো চাচ্ছিলই না যে, এরকম চরম লজ্জাকর ব্যাখ্যার (!) কোনো প্রতিউত্তর দিই। কিন্তু আক্ষেপ হল, আমাদের সর্বসাধারণ মানুষজন দ্বীনী শিক্ষা দিক্ষা থেকে এতটাই দূরে চলে গেছে যে, কেউ তাদের সামনে যত ভ্রান্ত দলিল-প্রমাণই বর্ণনা করে দিক না কেনো, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটারই অনুগামি হয়ে পড়ে। এজন্যই এই অমনপুতঃ ফরয দায়িত্বটুকু পালন করতে হচ্ছে।

অর্ডিনেন্সের উপরোক্ত ফয়সালাটি যেহেতু গোটা উম্মাহ’র একদমই পরিপন্থী, এজন্য এসব জনাবদের প্রথমে এই দাবী করতে হয়েছে যে- ‘চোদ্দত বছরে কোনো একজন আলেম, ফকিহ, তাবেয়ী এবং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কেউই তালাক দানের সহিহ পন্থাটুকু বুঝে উঠতে পারেন নি ! আজ পর্যন্ত যত সাহাবী, যত তাবেয়ীন, আলেম ও ফকিহ তালাক দিয়েছেন, তাঁদেও সবাই ভুল পন্থায় দিয়েছেন! এমন কি খোদ রাসুলুল্লাহ  যে পদ্ধতিটিকে ‘সুন্নত তালাক’ বলে অবিহিত করেছেন, সেটা (নাকি) একটি অনর্থক ও অপরিণামদশির্তামূলক পদক্ষেপ ছিল গোস্তাখের মুখে মাটি পড়ুক)! (এখন, তাদের ধারনা মতে) যেহেতু চোদ্দ’শ বৎসর পর্যন্ত তালাকের সহিহ পন্থাটিকে বুঝিয়ে দেয়া আল্লাহ তাআলার অভিপ্রায় ছিল না, তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপর নাজিলকৃত ওহীও তাঁকে এরকম অনর্থক ও অপরিণামদর্শিতামূলক পদক্ষেপ থেকে বাঁধা দান করেনি ! ফলতঃ রাসুলুল্লাহ থেকে নিয়ে শেষ জামানার সমস্ত ফুকাহায়ে কেরাম পর্যন্ত সকলেই এই ‘অনর্থক’ ও ‘অপরিণামদর্শিতা মূলক পদক্ষেপ’কেই ‘তালাকে সুন্নাহ’ বলে আসছেন! পরিশেষে আজ চোদ্দ’শ বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা এই ভেদটিকে একটি দুষ্প্রাপ্য ইলহামের মাধ্যমে ওই সমস্ত বুজুর্গদের (!) উপর উন্মোচন করে দিয়েছেন, যাদের সারটা জীবন পশ্চীমাদের কাছ থেকে আমদানী করা চিন্তা ধারা’র সেবা ও অনুসরণ করতেই অতিবাহিত হয়েছে’’ !

এই সারবত্তার ব্যাখ্যা এই যে, অর্ডিনেন্সকে সমর্থন করতে গিয়েে এই জনাবদের মধ্যে একজন শ্রদ্ধেয় সাহেব দাবী করেছেন যে, ‘তালাক দানের যে পন্থাটি ‘সুন্নত তালাক’ নামে চলে আসছে, সেটা বাস্তবে
একদমই অনর্থক কাজ ও অপরিণামদর্শিতা মূলক একটি পদক্ষেপ। একে ‘তালাকে সুন্নাহ’ বলাটা সম্পূর্ণ অতিরঞ্জিতা; এটা আসলে একটি ‘বিদআত-ই’। এর পর তিনি বলেছেন যে, ‘আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. এবং ‘আহলে জাহের’গণ ‘বিদআত’ তালাককে এক তালাকই মনে করেন। তাই তাঁদের মতে ‘তালাকে বিদআত’ -চাই এক সাথেই দেয়া হোক বা ভিন্ন ভিন্ন তিনটি তুহরে দেয়া হোক -সর্বাবস্থায় সেটাকে এক তালাকই গণ্য করা হবে’। এটাই হল এসব জনাবদের ব্যাখ্যার সারবত্তা।

এখন আপনারা তার এই বিষ্ময়কর আচরনটির দিকেও একবার লক্ষ্য করে দেখুন, একদিকে এই শ্রদ্ধেয় জনাব-তো নিজেই একথা স্বীকার করছেন যে, যদি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তুহরে তিন তালাক দেয়া হয়, তাহলে সেটা উম্মাহ’র (পূর্বাপর) সকল ওলামায়ে করোমের কাছে ‘তালাকে সুন্নাহ’ হিসেবে বিবেচিত; একে আজ পর্যন্ত কেউ-ই ‘বিদআত’ বলেন নি, আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. এবং ‘আহলে জাহের’গণও একে বিদআত বলেন না, বরং সুন্নতই বলে থাকেন। সুতরাং আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. ও ‘আহলে জাহের’গণ যখন ‘বিদআত তালাক’কে এক তালাক হিসেবেই গণ্য করে থাকেন, তখন বলাই বাহুল্য যে, তাঁরা এর দ্বারা নিজেদের ব্যাবহৃত পরিভাষাগত ‘বিদআত তালাক’ (তথা একই সাথে প্রদত্ত তিন তালাক দেওয়া )– কেই উদ্দেশ্য নিচ্ছেন 

কিন্তু এর বিপরীতে এই শ্রদ্ধেয় সাহেবের তরফদারী করতে গিয়ে ‘আহলে জাহের’গণের বক্তব্য দ্বারা দলিল পেশ করা কি করে সঠিক হতে পারে, যেখানে তাঁরা যে ‘তালাকে বিদআত’কে এক তালাক হিসেবে অবিহিত করছেন, তাতে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তুহরে প্রদত্ত (তিন) তালাক দানের বিষয়টি অন্তভূক্ত নেই, অথচ অর্ডিনেন্স এই ভিন্ন ভিন্ন তুহরে প্রদত্ত তিন তালাককেও এক তালাক গণ্য করে নিচ্ছে?!

আবার এই দুঃখজনক মশকরার দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, এই জনাবরা একদিকে-তো গোটা উম্মাহ’র আলেম সমাজের অতীব মজবুত ও শক্তিশালী মতটিকে রদ করে দিচ্ছেন, আবার অন্য দিকে হাতে গোণা কয়েকজন মাত্র আলেমের একটি দূর্বল মতকে কোনো রকম আপত্তি ছাড়াই শুধু যে চোখ বন্ধ করে গ্রহন করে নিচ্ছেন -ব্যাপার শুধু তাই নয়, বরং সে মতটিকে এমন এমন সব জায়গায় প্রয়োগ করছেন, যেখানে হয়তো ওই (হাতে গোণা কয়েকজন) আলেমের কখনও খেয়ালেও আসে নি।

তাহলে (একবার চিন্তা করে দেখুন-তো), নিছক দু’একজন আলেম যে ‘বিদআত-তালাক’টিকে এক তালাক হিসেবে গণ্য করেছেন, সেটাকে সম্পূর্ণ নির্ভূল হিসেবে গ্রহন করে নিয়ে তাদের পদে পদে চলা বরং তা থেকেও আরও চার পা অগ্রসর হওয়ার দৃশ্যটা বেশি দৃষ্টিকটু, নাকি  উম্মাহ’র সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও ফিকাহহীদ ওলামায়ে কেরাম, বরংচ খোদ রাসুলুল্লাহ  থেকে তালাকের যে পদ্ধতি ‘জায়েয’ হবার কথা বর্ণিত আছে, সেটাকে বিলকুল রদ করে দেয়ার দাবীটা বেশি দৃষ্টিকটু ?

এ থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, অর্ডিনেন্সের সমর্থনে আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. এবং ‘আহলে জাহের’গণের নাম পেশ করা এমন এক লজ্জাকর প্রচেষ্টা, যার কোনোই মাথামুন্ডু নেই। আর অর্ডিনেন্স যে কথা বলছে, মুসলীম উম্মাহ’র কেউই তা সমর্থন করোনি।

এই আলোচনার বাকি অংশ পড়তে >> এখানে  ক্লিক করুন >>>

 


-: টিকা:- (বক্ষমান ওয়েব পেজের টিকা)

((টিকা-১)) এখান থেকে প্যারার শেষ পর্যন্ত বিষয়বস্তুটি হযরত মওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী সাহেব রহ. এর একটি অপ্রকাশিত প্রবন্ধ ‘নিকাহ ও তালাক’ থেকে গৃহিত। -(লেখক)

((টিকা-২)) মুসলমানদের ‘বিয়ে’কে ইবাদত বলার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি ইবাদতগুলো যেমন মানুষের নিজ ইচ্ছা মত যেভাবে খুশি পালন করার কোনো অবকাশ নেই, বরং কেবলমাত্র কুরআন সুন্নাহ’র নির্দেশিত পন্থায়ই তা পালন করতে হয়, তা ছাড়া তা আদায় হয় না, কবুল হয় না, ঠিক তেমনিভাবে কুরআন সুন্নাহ’র নির্দেশিত পন্থা ব্যতীত ‘বিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করা কিংবা ‘বিয়ে ভাঙ্গা’ -এর কোনোটিই সম্পাদিত হয় না। কেউ এ যুক্তি দেখাতে পারে না যে, ‘আমি আজ থেকে ফজরের দু’রাকাত ফরয নামাযকে চার রাকাত করে পড়বো’, কিংবা ‘রমযান মাসে ফরয রোযার ক্ষেত্রে সূর্যদয়ের পর থেকে নিয়ে এশার প্রথম ওয়াক্ত পর্যন্ত রোযা আদায় করবো’ কিংবা জিলহজ্জ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে হজ্জ আদায় না করে সুবিধা মত কোনো মাসে করে নিবো’। সাধারণ যুক্তি তো বলে ‘এতে তেমন কি ক্ষতি’? কিন্তু যেহেতু এগুলো একেবারে নিরেট ও খাস ইবাদত, তাই এগুলোকে কুরআন-সুন্নাহ’র শর্ত মাফিক আদায় না করে নিজ ইচ্ছা মত শরীয়ত বহির্ভূত পন্থায় আদায় করলে এসব ফরয ইবাদত সারা জীবনই অনাদায়ী থেকে যাবে। তখন সেটা আল্লাহ’র ইবাদত হবে না, যা হবে, সেটা হল শয়তান ও নফসের ইবাদত। ঠিক একইভাবে ‘বিয়ে’ যেহেতু একটি ইবাদত, তাই- (১) একে কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত পন্থায় সম্পাদন করতে চাইলে, মূল বিয়েটাই সম্পাদিত হবে না; ফলতঃ সংশ্লিষ্ট ‘পুরুষ ও নারী’ ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীও গণ্য হবে না। (২) যদি কুরআন-সুন্নাহ’র নির্দেশিত পন্থায় কোনো পুরুষ ও নারীর মাঝে একবার বিয়ে সম্পাদিত হয়ে যায়, তাহলে সেই বিয়েটিকে কখনো ভাঙ্গার প্রয়োজন দেখা দিলে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সেটা ততক্ষন পর্যন্ত ‘ভেঙ্গেছে’ বলে গণ্য হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত না তা কুরআন-সুন্নাহ’র নির্দেশিত পন্থায় ভাঙ্গা হয়। কেননা, বিয়ে একটি ইবাদত, আর ইবাদতকে মানুষের ইচ্ছা মত করা বা না করা কিংবা নষ্ট করার কোনো এখতিয়ার দেয়া হয়নি। 

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যখন কোনো বিষয়ে কোনো ফয়সালা দিয়ে দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারীর জন্য তাদের নিজেদের বিষয়গুলোতে (ভিন্ন ফয়সালা দানের) কোনো এখতিয়ার থাকে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অমান্য করলো, সে মূলতঃ সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ঠতায় নিমজ্জিত হয়ে গেল’। [সূরা আহযাব ৩৬]

অপর দিকে অন্যান্য যে সব সামাজিক লেনদেন ও কায়কারবার রয়েছে, যেমন: পন্য দ্রব্য ও টাকা-পয়সা লেনদেন করা ইত্যাদি, সেগুলোর ক্ষেত্রেও কুরআন-সুন্নাহ মানতে হয় বলে ওগুলোকেও পারিভাষিক দৃষ্টি কোণ থেকে ‘ইবাদাত’ বলা হয় বটে, কিন্তু এগুলো নামায, রোযার ন্যায় হাকীকী ও খাস আবাদত নয়। এগুলোর ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ত মুসলমানদেরকে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপেরও বেশ সুযোগ দিয়েছে। এক হাদীসে বলা হয়েছে- وَالمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ، إِلَّا شَرْطًا حَرَّمَ حَلَالًا، أَوْ أَحَلَّ حَرَامًا -‘…অার মুসলমানরা তাদের (লেনদেনগুলোতে) তাদের (স্বরচিত) শর্তগুলোর উপর আমল করতে পারবে, শুধুমাত্র ওই শর্ত ছাড়া, যা কোনো হালালকে হারাম এবং কোনো হারামকে কে হালাল বানিয়ে দেয়’। [সুনানে তিরমিযী ১৩৫২, সুনানে ইবনে মাজাহ ২৩৫৩; মিশকাত ১/২৫৩]

সম্মানিত পাঠক! আপনি যদি ইবাদাতের উপরোক্ত শ্রেণি বিভাগ দুটিকে ভালভাবে বুঝতে পারেন, তাহলে একথাও পরিষ্কার বুঝতে পারবেন যে, মুসলীম নামধারী এক শ্রেণির মুনাফেক গোষ্ঠি ‘বিয়ে ও তালাক’ বিষয়ক কুরআন-সুন্নাহ’র আইনগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে এক পাশে রেখে দিয়ে তাদের স্বরচিত শরীয়ত বিরোধী আইনের মাধ্যমে সর্বসাধারণ মুসলমান নর-নারীদের ‘বিয়ে-দান’ এবং ‘বিবাহ-বিচ্ছেদ’ ঘটানোর যে চর্চা তারা করছেন, তাতে করে এ সকল মুসলীম নর-নারীরা মুর্খতাবসতঃ উপলব্ধিই করতে পারছেন না যে, ‘তারা স্বামী-স্ত্রী নন’ অথবা ‘তাদের বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন হয় নি’, কিংবা ‘বিবাহ ছিন্ন হয়ে গেছে’। শরীয়ত মতে গোড়াতে বিয়েই যদি না হয়, তাহলে তাদের স্বামী-স্ত্রী সুলভ আচরণের পরিণতি কি হবে? কিংবা শরীয়ত মতে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি অথচ হয়েছে মনে করে কোনো নারী যদি অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করে বসে, তাহলে এই দ্বিতীয় পুরুষের সাথে তার যে স্বামী স্ত্রী সুলভ সম্পর্ক সৃষ্টি হবে, তার পরিণতিটাই বা কি দাঁড়াবে? ওই মুনাফেকরা কি কল্যানের নাম করে এসব সর্বসাধারন মুসলমান নর-নারীদের দুনিয়া-আখেরাত সব বর্বাদ করছে না? -(অনুবাদক)

((টিকা-৩))  সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৮৪৬;  এই হাদিসের অনেক শাহেদ হাদিস বর্ণিত আছে, যেমন: হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, কিছু সাহাবী বৈরাগ্যতা এখতিয়ার করার ইচ্ছে করলে রাসুলুল্লাহ সা. তাদেরকে বলেছিলেন- أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي – আল্লাহ’র কসম, তোমাদের চাইতে আমি আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং (তাঁর নারাজি থেকে) আমি তোমাদের চাইতে বেশি পরহেজ হয়ে চলি। এতদসত্ত্বেও আমি রোযাও রাখি আবার রোযা ছেড়েও দেই, আমি নামাযও পড়ি আবার ঘুমাইও, আমি নারীকে বিয়েও করি। যে ব্যাক্তি আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো, সে আমার (উম্মত হওয়ার যোগ্য) নয়[সহিহ বুখারী ৫০৬৩, সহিহ মুসলীম ১৪০১]  -(অনুবাদক)

((টিকা-৪)) সহিহ বুখারী, হাদিস ৫০৬৬ ; সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৪০০  । -(অনুবাদক)

((টিকা-৫)) সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৭৮; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৭/৩২২; আল-কামেল, ইবনুল আদী- ৬/২৪৫৩; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বা- ৫/২৫৩; আল-ইলাল, দ্বারাকুতনী- ১৩/২২৫ । -(অনুবাদক)

((টিকা-৬))  কোনো স্ত্রীলোক তালাক প্রাপ্তা হলে অথবা তার স্বামী মারা গেলে, তাকে বিভিন্ন অবস্থা অনুপাতে (যার আলোচনা সামনে আসছে) নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্বাীর গৃহে অবস্থান করে শরীয়তের কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। একেই বলা হয় ওই মহীলার ‘ইদ্দত’। -(অনুবাদক)

((টিকা-৭))  সুরা তালাক, আয়াত নং ১। -(অনুবাদক) এই আয়াতের উল্লেখীত তাফসীর খোদ রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত আছে। -(লেখক)

((টিকা-৮)) ‘তুহর’ কথাটি ‘তাহারাত’ (পবিত্রতা অর্জন) থেকে আগত। এক্ষেত্রে ‘তুহর’ বলতে বুঝানো হয়েছে স্ত্রীর ‘হায়েয’ অবস্থা থেকে পাক-পবিত্র হওয়ার পরের সময়টিকে। অর্থাৎ, কোনো স্ত্রীকে ‘তালাক’ দেয়ার প্রয়োজন হলে তার হায়েয চলাকালিন সময়ে তাকে তালাক দেয়া জায়েয নয়। বরং সে যখন হায়েয থেকে পাক-পবিত্র হয়ে যাবে, তখন তাকে ‘তালাক’ দিবে। -(অনুবাদক)

((টিকা-৯)) ‘শরয়ী মুহূর্ত, বলতে তুহর’কেই বোঝানো হয়েছে। -(অনুবাদক)

((টিকা-১০)) ইদ্দত চলাকালীন সময়ে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার অর্থ এই যে, স্বামী এক তালাক দেয়ার পর থেকে শুরু করে নিয়ে ইদ্দতের শেষ সময় পর্যন্ত পরিধির মধ্যে কোনো এক সময় স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে ‘আমি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নিলাম’ অথবা ‘স্বামী যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নিয়তে স্ত্রীর সাথে এমন  কোনো আচরণ প্রদর্শন করে, যা শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীই করে থাকে’, তাহলে তারা পুনরায় নতুন করে বিয়ে করা ব্যতীরেকেই পরষ্পর ‘স্বামী-স্ত্রী, হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যদি ইদ্দতের সময়সীমা পেড়িয়ে যায়, তখন উভয়ে পুণরায় শরয়ী দুষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হতে চাইলে তাদেরকে শরয়ী পন্থায় নতুন করে বিয়ে সম্পাদন করতে হবে। এই দ্বিতীয় বিয়ের পর ওই স্বামীর হাতে ৩ তালাকের মধ্য থেকে অবশিষ্ট ২ তালাক দানের এখতিয়ার বাকি থাকবে। এবারে স্ত্রীকে দ্বিতীয় বার আরেকটি তালাক দিয়ে ফেললে তালাক দেয়ার পর থেকে শুরু করে নিয়ে ইদ্দতের শেষ সময় পর্যন্ত পরিধির মধ্যে কোনো এক সময় স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে ‘আমি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নিলাম’ অথবা ‘স্বামী যদি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নিয়তে স্ত্রীর সাথে এমন  কোনো আচরণ প্রদর্শন করে, যা শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীই করে থাকে’, তাহলে তারা পুনরায় নতুন করে বিয়ে করা ব্যতীরেকেই পরষ্পর ‘স্বামী-স্ত্রী, হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যদি ইদ্দতের সময়সীমা পেড়িয়ে যায়, তখন উভয়ে পুণরায় শরয়ী দুষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হতে চাইলে তাদেরকে শরয়ী পন্থায় নতুন করে বিয়ে সম্পাদন করতে হবে। এ সুযোগটি এই দ্বিতীয় তালাক পর্যন্তই। স্বামী ২টি তালাক দিয়ে ফেলার কারণে এখন তার হাতে মোট ৩ তালাকের মধ্য থেকে অবশিষ্ট ১টি তালাক দানের এখতিয়ার বাকি থাকবে। দ্বিতীয় তৃতীয় তালাক দিয়ে দিলে ‘হালালাহ’ ব্যতীত স্ত্রীকে আর কখনও ফিরিয়ে নেয়ার কোনো বিধান ইসলামী শরীয়তে নেই। -(অনুবাদক)

((টিকা-১১)) মূল কিতাবে আছে السنة ان تستقبل الطهر فتطلق لكل طهر , তবে আমি ‘নসবুর রায়া’য় হাদিসটির শেষ শব্দ طهر -এর পরিবর্তে قرء  পেয়েছি এবং সেটাই এই ওয়েব পেজে  লিখে দিয়েছি। হতে পারে. শায়েখ উসমানীর লিখতে গিয়ে কিংবা টাইপিষ্টের টাইপ করতে গিয়ে ভুল হয়ে গেছে, কিংবা শায়েখের কাছে যে নুসখাটি ছিল তাতেই হয়-তো طهر কথাটি ছিল। তাছাড়া সুনানুল কুবরা বাইহাকী ও ইমাম হাফেজ ইবনে হাজারের তালখিসুর হাবির -এর রেফারেন্স মূল কিতাবে ছিল না, আমি অতিরিক্ত সংযুক্ত হরে দিয়েছি।  -(অনুবাদক)

((টিকা-১২)) ‘রযঈ তালাক’ বলতে বুঝায় ওই তালাককে, যে তালাক দানের পর স্বামী তার স্ত্রীকে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে মধ্যে শরয়ী পন্থায় ফিরিয়ে নিতে চাইলে ফিরিয়ে নিতে পারে। আপনারা কিছুক্ষন আগেই ১০ নং টিকায় পড়ে এসেছেন যে, এটা কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট স্বামী কতৃক কোনো স্ত্রীকে প্রথম ও দ্বিতীয় তালাক দানের বেলায়ই সম্ভব; তৃতীয় তালাকের বেলায় নয়। -(অনুবাদক)

((টিকা-১৩)) এটা ওই স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার সাথে তার ওই তালাকদাতা ব্যাক্তি সহবাস করেছে। যদি ওই ব্যাক্তি সহবাস করার আগেই তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে কুরআনের নস্ অনুসারে তালাকের দু-প্রকার ফলাফল ততক্ষনাৎ কার্যকর হয়ে যায়। -(লেখক)

((টিকা-১৪)) মূল কিতাবে শুধুমাত্র আবু দাউদের রেফারেন্স দেয়া আছে। আমি বাকি রেফারেন্সগুলো সংযুক্ত করে দিয়েছি। -(অনুবাদক)

((টিকা-১৫)) মূল কিতাবে শুধুমাত্র ইবনে মাজাহ’র রেফারেন্স দেয়া আছে। আমি বাকি রেফারেন্সগুলো সংযুক্ত করে দিয়েছি। -(অনুবাদক)

((টিকা-১৬)) মূল কিতাবে আয়াতের পর্যন্ত অংশ দেয়া আছে। আমি আয়াতের বাকি অংশটুকুও সংযুক্ত করে দিয়ে তার বঙ্গানুবাদ পেশ করে দিয়েছি। -(অনুবাদক)

 

 

 


মুফতী মুহাম্মাদ তাক্বী উসমানী দা:বা: লিখিত ‘মুসলমি পারিবারিক আইন’ বিষয়ক আলোচনা পড়তে নিম্নে ক্লিক করুন।

# ইসলামী শরীয়ত বনাম আইয়ূব খানের মুসলিম পারিবারিক আইন