বহু বিবাহ আইন : ইসলামী শরীয়াহ বনাম আইয়ূব খানের পাশকৃত আইন

Spread the love
image_pdfimage_print

বহু বিবাহ আইন : ইসলামী শরীয়াহ বনাম আইয়ূব খানের পাশকৃত আইন

[লেখক: শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাক্বী উসমানী দা:বা:]

 

বহু বিবাহ 

ইসলামী শরীয়তে বহু বিবাহ বনাম আইয়ূব খানের পাশকৃত আইন poligamy merraige in islam shariahএ দফায় বলা হয়েছে, ‘কেউ যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তাহলে সালিশী কাউন্সিলের কাছ থেকে লিখিত অগ্রিম অনুমতি ব্যতীরেকে সে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না; সাথে তাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার কারনণও বর্ণনা করতে হবে। এপর সালিশী কাউন্সিল বিষয়টি খতিয়ে দেখবে যে, (ওই লোকের) ওই দ্বিতীয় বিয়েটি তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমে হচ্ছে কি-না? যে ব্যক্তি এভাবে অনুমতি নেয়া ব্যতীরেকে বিয়ে করবে, সে এক বৎসর পর্যন্ত জেল অথবা পাঁচ হাজার (রুপী) পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয়বিধ শাস্তি’র উপযুক্ত বিবেচিত হবে। এমনকি তাকে তার পূর্বের স্ত্রী বা স্ত্রীদেরকে অনতিবিলম্বে দেনমোহর পরিশোধ করে দিতে হবে -চাই তা নগদে হোক বা সামান্য বিলম্বেই হোক না কোনো’।

একাধিক স্ত্রী গ্রহনের উপর এই অমূলক পদরুদ্ধতা এই মনমানসিকতারই সাক্ষ্য বহন করে যে, আইন রচয়িতাদের দৃষ্টিতে একাধিক বিয়ে করাটা একটি খারাপ কাজ, যেটাকে নিছক অনন্যপায় পরিস্থিতিতেই অবলম্বন করা যেতে পারে !

এজাতীয় মনমানসিকতা কুরআন-সুন্নাহ এবং গোটা উম্মাহ’র পরমপরা আমলের দৃষ্টিকোণ থেকে কতটুকু সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ, তা নিম্নোক্ত দলিল প্রমাণ থেকেই জানা যাবে।

(১) কুরআন কারিমে এরশাদ হচ্ছে-

وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا
‘আর তোমরা যদি এই আশংকাবোধ করো যে, এতিম নারীদের মধ্যে ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে তোমরা বিয়ে করে নিতে পারো –(অন্য) নারীদের মধ্যে থেকে- যাদেরকে তোমাদের পছন্দ হয় -দুই, তিন, চার জনকে (পর্যন্ত)। পরন্তু (এতেও) যদি তোমরা আশংকাবোধ করো যে, তোমরা (দই,তিন, বা চার জন স্ত্রীর মাঝে) ন্যায়বিচার করতে পারবেনা, তাহলে একজন (-এর উপরই ক্ষ্যান্ত থাকো)’। [সূরা নিসা ৩]

উপরোক্ত এই আয়াতের ব্যাখ্যা পর্যায়ে আমরা এখানে হযরতে সাহাবায়ে কেরাম রা. এবং তাবেয়ীগণের কয়েকটি কথা উল্লেখ করছি, যাতে বিষয়টি সম্পূর্ণ পরিষ্কারভাবে বুঝে আসে।

(ক) এ আয়াতে এতিম নারীদের তত্ত্বাবধায়কদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে যে, তোমাদের যদি আশংকা হয় যে, তোমরা তোমাদের তত্ত্বাবধানে বিদ্যমান নারীদেরকে বিয়ে করে তাদের দেনমোহর সহ অপরাপর মুয়ামালাত ও লেনদেনগুলোর ক্ষেত্রে তাদের সাথে ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে তাদেরকে তোমরা বিয়ে করো না। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে অন্যান্য ‘না-মাহরাম’ নারীদেরকে বিয়ে করে নাও। আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য চার চারজন পর্যন্ত নারীকে বিয়ে করা হালাল বলে ঘোষনা দিয়েছেন; তবে শর্ত এই যে, তোমরা তাদের মাঝেও ন্যায়ানুগ ভারসাম্যতা রেখে চলবে। [তাফসীরে তাবারী, ইবনে জারীর ৪/১৪৩] উপরোক্ত আয়াতের অনুবাদটি এই ব্যাখ্যা মোতাবেকই করা হয়েছে। আর এ ব্যাখ্যাটি বর্ণিত হয়েছে হযরত আয়েশা রা. থেকে।

(খ) আরবরা একই সাথে দশজন স্ত্রীকেও তাদের বিবাহাধীনে রেখে দিত। পরে তাদেরকে অন্ন-বস্ত্র দিতে দিতে যখন নিঃস্ব হয়ে যেত, তখন যেসব এতীম মেয়ে তাদের তত্ত্বাবধানে বিদ্যমান থাকতো, তারা ওইসকল এতিমদের ধন সম্পদ থেকে খরচ করা শুরু করে দিত। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করলেন যে, তোমাদের যদি এতিমদের হক্ব নষ্ট করার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে অধিক সংখ্যক নারীকে বিয়ে করো না। বরং খুব বেশি হলে চারজন নারীকে বিয়ে করে নাও, (যাতে করে খরচপাতির আধিক্য এতিমদের হক্ব নষ্টের কারণে পরিণত না হয়)। [তাফসীরে তাবারী, ইবনে জারীর ৪/১৪৪] এই ব্যাখ্যাটি ইমামুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত।

(গ) এতিম নারীদের হক্ব বিনষ্টন সম্পর্কে কঠোরতর বিধান নাজিল হবার পর আরববাসীদের কেউ কেউ তাদের হক্ব নষ্ট করা থেকে-তো খুবই ভয় করে চলা শুরু করে দিয়েছিল এবং এর ক্রমধারায় সাবধানতাও বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু তখনও পর্যন্ত তাদের বিবাহাধীনে দশজন পর্যন্ত স্ত্রী বিদ্যমান থাকতো, যাদের সাথে তারা ইনসাফ ও ন্যায়ানুগ ভারসাম্যতা বজায় রাখতো না। তখন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করে দিলেন যে, তোমরা যখন এতিমদের হক্ব নষ্ট করার ব্যাপারে (আল্লাহকে) ভয় করে চলছো, তখন অন্য নারীদের হক্ব নষ্ট করার ব্যাপারেও (তাঁকে) ভয় করে চলো এবং দুই-তিন-বা চারজন নারীর অধিক বিয়ে করো না। উপরন্তু তোমাদের যদি এব্যাপারেও ভয় হয় যে, (তাদের সবার সাথে) ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে একজন স্ত্রীর উপরই ক্ষ্যান্ত হও। [তাফসীরে তাবারী, ইবনে জারীর ৪/১৪৬] এই ব্যাখ্যাটি হযরত ইবনে আব্বাস রা. হযরত সাঈদ বিন যুবায়ের রহ., হযরত সুদ্দী রহ., হযরত কাতাদাহ রহ. এবং হযরত জাহহাক রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে।

এখানে কারো আবার যেন এমন সন্দেহ না হয় যে, উপরোক্ত এসব ব্যাখ্যা একটি আরেকটির সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ, মূলে এগুলোর মধ্যে কোনোই দ্বন্দ্ব নেই। আল্লাহ তাআলা-তো হলেন সর্বজ্ঞ ও সর্বজান্তা। তিনি ভাল করেই জানতেন যে, বহু মানুষ তাদের তত্ত্বাবধায়াধীন এতিম মেয়েদেরকে নিছক ধ্বনসম্পদ ও রুপ-সৌন্দর্যের খাতিরে বিয়ে করে নেয় বটে, কিন্তু পরে সাধারণ স্ত্রীদের ন্যায় তাদের সব হক্ব আদায় করে না। তাছাড়া তাদেরকে দেখাশোনা করার মতো অন্য আর কেউ যেহেতু থাকতো না, তাই এ সকল নারী কোনো ভাবেই ন্যায় বিচার লাভ করতে পারতো না। অন্য দিকে (আরবে) এমন সব লোকও বিদ্যমান ছিল, যারা দশজন নারীকে পর্যন্ত বিয়ে করে রাখতো। পরে তাদের সবাইকে অন্ন বস্ত্র দেওয়ার মত তাদের যখন আর স্বচ্ছলতা অবশিষ্ট থাকতো না, তখন তারা এতিমদের ধন সম্পদে অন্যয় হস্তক্ষেপ করে তাদের ধন সম্পদগুলো স্ত্রীদেরকে দিয়ে দিতো। আবার কিছু লোক এমনও ছিল, যারা এতিমদের হক্ব সমূহের ব্যাপারে-তো পুরাপুরি সজাগ ছিল বটে, কিন্তু একই সাথে যে দশজন স্ত্রী তাদের বিবাহাধীনে থাকতো, তারা তাদের হক্বসমূহ পুরাপুরি আদায় করতো না। বলা বাহুল্য, এরা সবাই ভুলের উপর ছিল এবং এতিম মেয়ে ও স্ত্রীদের মধ্যে কারো না কারো হক্ব তারা অবশ্যই নষ্ট করতো। এদেরকে হেদায়েতের উপর আনার জন্য আল্লাহ তাআলা এমন একটি ব্যাপক অর্থবোধক আয়াত নাজিল করে দিলেন, যা থেকে সমস্ত অনিষ্টতা ও চড়াই-উৎড়াইয়ের সমাধান বেড়িয়ে এলো। এতে এতিমদের হক্ব সমূহের প্রতি দৃষ্টিদানের পাশাপাশি স্ত্রীদের হক্ব সমূহের প্রতিও দৃষ্টি দান করা হল। পুরুষদেরকে চারজন পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহনের অনুমতি দেয়া হল, যাতে করে যেসব ব্যাক্তি তাদের তত্ত্বাবধায়াধীনে থাকা এমিত মেয়েদেরকে তাদের ধ্বন-সম্পদ ও সৌন্দর্যের কারণে বিয়ে করতো, তারা যেন (এতিম মেয়েদেরকে বিয়ে করার চিন্তা বাদ দিয়ে সমাজের) অপরাপর নারীদেরকে (স্ত্রী হিসেবে) খুঁজে নিতে পারে এবং এতে করে যাতে এতিমদের হক্বগুলোর সংরক্ষন সম্ভব হয়। আর যে ব্যাক্তি দশ বা দশাধিক নারীকে বিয়ে করে নেয়ার পর নিঃস্ব হয়ে যেত তাদেরকে (উপরোক্ত আয়াতে) এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ সীমা দেখিয়ে দেয়া হল, যেন তারা সেই সীমা অতিক্রম না করে, যাতে তাদের উপর অস্বাভাবিক বোঝা আরোপিত না হয় এবং এতীমদের ধ্বনসম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ না আসে।

যা হোক, সাহাবায়ে কেরামের এসকল তাফসীরের আলোকে একথা একেবারে চুড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, একজন ব্যক্তি চার’টি পর্যন্ত বিয়ে করতে পারে। একইসাথে তাকে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ করার প্রতি তাগিদ করা হয়েছে এবং এই দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, যদি (হক্ব নষ্ট করার ব্যপারে) নিজের উপর নিয়ন্ত্রন চালাতে না পারো, তাহলে একজন স্ত্রীকেই যথেষ্ট মনে করো।

চিন্তা করে দেখুন, আমাদের অর্ডিনেন্স এমন একটি জিনিসকে ‘খারাপ’ মনে করছে, যে জিনিসটিকে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য মন্দত্ব ও অনিষ্টতাকে টুকরো টুকরো করে দেয়ার উদ্দেশ্য বৈধ বলে ঘোষনা দান করেছেন।

(২) যে সকল নারীদের সাথে বিয়ে জায়েয নয়, তাদের বিস্তারিত বর্ণনা দান পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন-

وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ
‘আর এই যে, তোমরা দু’বোনকে একইভাথে বিবাহাধীনে রাখবে- (এ বিষয়টিও তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হল’। [সূরা নিসা ২৩]
 
একটু ভেবে দেখুন, কুরআন কারিম এখানে কি জন্য দু’বোনকে একই সাথে বিবাহাধীনে রাখতে নিষেধ করে দিলো? নববী যুগে যদি একই সঙ্গে দু’জন নারীকে বিয়ে করার ব্যাপক রেওয়াজ না-ই থাকতো, তাহলে এব্যাপারে সাবধান করার কি প্রয়োজন ছিল যে, ‘দেখো, (দুজন নারীকে বিবাহাধীনে রাখতে গিয়ে) আবার দু’বোনকে একই সঙ্গে বিবাহাধীনে রেখে দিওনা’। এই সাবধানবাণী থেকে একথা পরিষ্কার জানা যাচ্ছে যে, নববী যুগে বহু বিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল, যার ভিত্তিতে এরও সম্ভাবনা ছিল যে, কেউ দু’বোনকে (একই সাথে) বিয়ে করে নিবে। এজন্য এ কাজটিকে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দিলেন। 

আম্বীয়ায়ে কেরাম আ. এবং সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর আমলরীতি

এবারে আপনারা এ দৃষ্টিকোণ থেকেও চিন্তা করে দেখুন যে, আমাদের অর্ডিনেন্স গোটা জাতির মনমগজে একথা ঢুকিয়ে দিতে চাচ্ছে যে, ‘বহু বিবাহ’ একটি খারাপ কাজ, যেটাকে কেবল অনন্যপায় অবস্থাতেই অবলম্বন করা যেতে পারে। এই কথাটি যদি জাতির মনমগজে বসে যায়, আর অন্য দিকে যদি তারা দেখে যে, বহু আম্বীয়ায়ে কেরাম আ. বহু সাহাবায়ে কেরাম রা., খুলাফায়ে রাশেদীন রা., অসংখ্য তাবেয়ীন রহ., এবং মুজতাহীদ ইমাম সহ আমাদের ইতিহাসের গর্বিত মহাপুরুষগণ বহু বিবাহের উপর আমল করে গেছেন, তাহলে তারা এ থেকে যে ফলাফলটুকু বেড় করে নিবে, সেটা এছাড়া আর কি হবে যে, ইউরোপ আমেরিকার অমুসলীমরা যারা এই খারাপ (!)কাজটি করে না, তারা বড়ই নেককার, বড়ই পুণ্যবান, আর আমাদের পূর্বসূরীগণ (আল্লাহ’র পানাহ) শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এই খারাপ (!) কাজটির উপর আমল করে আসছেন! এজাতীয় চিন্তাধারা কি কোনো মুসলীমের পক্ষে সহনযোগ্য?

জেনা-ব্যভীচার জায়েয, আর বিয়ে করা হারাম !

আমাদের আইন প্রনেতারা ‘বহু বিবাহ’কে-তো একটি খারাপ কাজ হিসেবে গণ্য করেছেই বটে, কিন্তু জেনা-ব্যভীচারের উপর কোনো আইনানুগ পদরুদ্ধতা বা কোনো জেল-হাজত, শর্ত-শরায়েত আরোপ করেন নি! এবারে চিন্তা করে দেখুন, এক ব্যক্তি তার বিশেষ কোনো মানবীয় অবস্থার উপর ভিত্তি করে একজন স্ত্রীর উপর যথেষ্ঠ হতে পারছে না, এখন আমাদের আইনের দৃষ্টিতে সে যদি (স্ত্রীর) অনুমতি না নিয়ে আরেকটি বিয়ে করে নেয়, তাহলে সে একজন অপরাধী। কিন্তু সেই ব্যক্তিই যদি অনুমতি না নিয়ে ‘জেনা’ করে নেয়, তাহলে আইনের চোখে সে কোনোই অপরাধ করছে না! সে অনুমতি নিয়েই জেনা করুক বা
না নিয়েই করুক, কোনো অবস্থাতেই তার উপর কোনো আইনানুগ শাস্তি আরোপিত হবে না। এটা কি মুসলীম রাষ্ট্রের অধিবাসীদের জন্য ডুবে মড়ার পর্যায় নয়, যার আইনে বিয়ে করা হারাম, আর জেনা-ব্যভীচার করা সম্পূর্ণ বৈধ, অনুমদিত?!(১) 

নারীর মজলুমী অবস্থা

একাধিক বিয়ের বিরোধীতা করতে গিয়ে যে কথাটিকে সর্বাধিক জোরে সোরে পেশ করা হয়ে থাকে, সেটা হল, ‘বহু বিবাহের কারণে বাস্তবে নারীদের উপর বিভিন্ন জুলুম ও অন্যয়-অত্যাচার চাপিয়ে দেয়া হয়। আর সংশ্লিষ্ট দফাটির উদ্দেশ্য হল, তাদের থেকে ওসব জুলুম ও অন্যয়-অত্যাচার দূর করা’। জন্য   মাসআলাটিকে  আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছুটা বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখতে চাই যে, দফাটি নারীদের উপর এসব জুলুম ও অন্যয়-অত্যাচারের মধ্যে আরও অতিরিক্ত মাত্রা যুক্ত করার উৎসে পরিণত হবে কি-না?

আমরা সামনের ছত্রগুলোতে যে কথাটি বলতে যাচ্ছি, সেটি যেহেতু পশ্চীমা সমাজ এবং তাদের সমমনারা বৎসরের পর বৎসর ধরে জোর-গলায় যেসব প্রপাগান্ডার প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে চলছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত, এজন্য সর্বসাধারন পাঠকদের সবাইকে এবং বিশেষ করে আমাদের বোনদেরকে একথা আন্তরিকতার সাথেই আরোজ করবো, তারা যেন আমাদের কথাকে সম্পূর্ন নিরপেক্ষ ভাবে শান্ত মনে শ্রবন করেন এবং আমাদের কাছে যেসব দলিল প্রমাণ রয়েছে, সেগুলোকে যেন তাদের মনের কষ্ঠি পাথড়ে পরোখ করে তবেই তা গ্রহন বা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা যেন এগুলোকে নিছক এজন্যই বর্জন করে না বসেন যে, এসব কথা পশ্চীমাদের থেক আগত সাধারণ চিন্তাধারার পরিপন্থী!

আমরা যে কথাটি বলতে চাই, সেটি কেবল এই এক ‘বহু বিবাহ’ সম্পর্কিত মাসআলাটির সাথেই সম্পর্কিত নয় বরং তা আমাদের জিন্দেগীর অধিকাংশ মাসআলার সাথে জড়িত। এজন্য এর উপর সম্পূর্ণ বুঝে শুনে গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখা একান্ত আবশ্যক।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলাম ছাড়া অপরাপর সব জাতিগুলো নারীর উপর যে পরিমান জুলুম, অন্যয়-অবিচার ও দুঃখ-দুর্দশা চাপিয়ে দিয়েছে, সম্ভবতঃ আমাদের সংসার জীবনে অন্য আর কেউ ততটা মজলুমীর শিকার হয়নি। এই দূর্বল দেহীর উপর অত্যাচার চালানেরা অভিপ্রায়ে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠি নিত্য-নতুন সব পন্থা বেড় করেছে। কোথাও-বা তাকে উত্তরাধিকারী সহায় সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, কোথাও নিজের স্বামীর চিতায় তাকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, কোথাও-বা তাকে এই অপরাধে নিজের জীবন গড়নের পথে বাঁধার সৃষ্টি করা হয়েছে যে- ‘কেনো তার স্বামী মড়ে গেল!?’ কোথাও-বা তাকে সমাজে জানোয়ারের চাইতেও নিকৃষ্ট জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করা হয়েছে। বস্তুতঃ পুরুষ তার থেকে সব রকম ফায়দাই লুটে নিয়েছে, সব ধরনের খেদমতই নিয়েছে; কিন্তু যখন যেভাবে মন চেয়েছে (পুরুষরা) তাকে কষ্টে ফেলেছে। তাকে বিভিন্ন রকম দুঃখ-কষ্ট দিয়েছে। এধরনের গরজে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠি এই ‘অবলা নারী’র উপর অগণিত জুলুম, অন্যয় অবিচার ও দুঃখ-দুর্দশা চাপিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তব সত্য হল, এই আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা যে পরিমাণ লোমহর্ষক, ভয়াবহ ও অমানবীক জুলুম ও অন্যয়-অবিচার নারী জাতির উপর চাপিয়ে দিয়েছে, সম্ভবতঃ এর আগে অন্য আর কোনো জাতি বা গোষ্ঠি সেই পরিমান চাপিয়ে দেয়নি। এই জুলুম ও অন্যয়-অবিচারটি এদিক থেকেও আরো বেশি ভয়ঙ্কর যে, এই জুলুম ও অন্যয় অবিচার সম্পর্কে খোদ নারীদের মধ্যেই কোনো অনুভুতি নেই। ওই বেচারী মনে করছে যে, ‘আমার সাথে ইনসাফই করা হচ্ছে’!

পুরুষের স্বার্থপরতা

পুরুষ সবসময়ই নারীর প্রতি লোভাতুর থেকেছে। তার খাহেশ সর্বদা এ-ই রয়ে গেছে যে, আমি নারী থেকে যতটুকু সম্ভব ফায়দা লুটবো, তার থেকে যত বেশি সম্ভব আস্বাদীত হবো -চাই এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তার উপর যত জুলুম ও অন্যয়-অবিচারই করা হোক না কেনো। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ’র ভয় এবং আখেরাতের ভীতি ছাড়া পুরুষের এই খাহেশকে অন্য আর কিছুই নিয়ন্ত্রন করতে পারেনি। ইসলামই এসে মানুষকে এই শিক্ষা দিয়েছে যে, ‘আল্লাহ তাআলা ‘নারী’কে প্রকৃতিগতভাবেই দূর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। তাই তোমাদের জন্য অপরিহার্য হল, তার সবরকম হক্ব ও অধিকারসমূহকে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থায় আদায় করো, তাকে আনন্দিত রাখার চেষ্টা করো, তাকে কোনো দুঃখ-কষ্ট দিও না। অন্যথায় তুমি যদি তার প্রতি জুলুম ও কষ্টদায়ক আচরন প্রদর্শন করো, তাহলে স্মরণ রেখো, এমন একদিন আসবে, যখন একজন জবরদস্ত শক্তিমান স্বত্তা প্রত্যেক জালেম থেকে তার জুলুম ও অন্যয়-অবিচারের চরম প্রতিশোধ নিবেন’।

রাসুলুল্লাহ  এ কথাটিকে মুসলমানদের হৃদয়ে পোক্ত করে বসিয়ে দেয়াটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী মনে করতেন সেটা এ থেকেই অনুমান করা যায় যে, তিনি তাঁর (ইন্তেকালের পূর্বে) সর্বশেষ কথা, যে কথার পর তাঁর জবান মুবারক থেকে আর কোনো বাক্য বেড়োয় নি, হযরত আয়েশা’র বর্ণনা মোতাবেক সেটা ছিল এই- الصَّلاَةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ‘নামায এবং তোমাদের হস্তগুলো যাদের মালিক হয়েছে (তাদের ব্যাপারে খেয়াল রেখো)(২) বস্তুতঃ এরই ফলপ্রভাবে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে এ বিষয়টির গুরুত্ব খুবই মজবুত ভাবে বসে গিয়েছিল। এই সেই আল্লাহ’র ভয় এবং আখেরাত-ভীতি, যা রাসুলুল্লাহ  (বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে) লোকজনের অন্তরে জন্মিয়ে দিয়েছিলেন। এটা ছিল এমন এক জিনিস, যা পুরুষের এই স্বার্থপরতামূলক খাহেশকে দাবিয়ে রেখেছিল। কিন্তু যেখানে যেখানে এই আল্লাহ ভীতিতে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে সেখানেই পুরুষের নফসানী খাহেশ উথলে উঠে তাকে পরাস্থ করে ছেড়েছে।

নারী জাতির মুক্তবিহঙ্গ জীবনের সূচনা হল কেনো ?

ইউরোপে অষ্টাদশ শতাব্দির যুগটি ছিল সেই যুগ, যখন সেখানকার অধিকাংশ মানুষের অন্তকরন থেকে আল্লাহ-ভীতির সর্বশেষ বীজটুকুরও মড়ন ঘটে গিয়েছিল। এর পূর্বে ইউরোপে কাজ বন্টনের এই ফিতরী (স্বাভাবিক) ব্যাবস্থা বিদ্যমান ছিল যে, পুরুষ কামাই-রোজগার করবে, অপর দিকে নারী গৃহের ব্যবস্থাপনা আনজাম দিবে। আর সে যুগে যেহেতু জমিদারি ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল এবং তখনও পর্যন্ত সভ্যতার নব্য-কাঠামো গড়ে ওঠে নি, এজন্য অধিকাংশ মানুষই ছিল কৃষিজীবী; জীবনের মাপকাঠিও ছিল সাদামাটা। তখন জীবন কাটিয়ে দেয়ার জন্য খুব বেশি ধনদৌলতের প্রয়োজন ছিল না। এ কারণে, পুরুষরা কাজ ভাগাভাগির এই ব্যবস্থাটিকে পরিবর্তন করার প্রয়োজন বোধ করেনি।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হওয়ার পর ইউরোপের ভিতরে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। এই শিল্প বিপ্লব ইউরোপবাসীদের জীবনের সকল অঙ্গনে অতীব গভীর মাত্রায় ছাপ ফেলে দেয়। ফলতঃ জমিদারি ব্যবস্থা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এবং তার পরিবর্তে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা (Capitalistic System) স্থান দখল করে নেয়। শহরগুলোতে বড় বড় কলকারখানা গঁজাতে আরম্ভ করে এবং যে সকল গ্রাম-গঞ্জের লোকজন জমিদারদের জুলুম-অত্যাচারে পিষ্ট হয়ে আসছিল, তারা শহরগুলোর দিকে স্থানান্তরিত হওয়া শুরু করে দেয়। ফলে জীবন জীবিকার এই গোটা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের প্রভাব ও পরিনতিফল এই দাঁড়ালো যে, এতে করে সাধারণ জনমানুষের জীবনের মানও বৃদ্ধি পেতে লাগলো। সোসাইটিতে নিজেদের ভাবগাম্ভীর্যতা বজায় রাখার জন্য সবারই প্রয়োজন দেখা দিলো পর্যাপ্ত ধনদৌলতের। ফলতঃ পয়সা কামানোর সম্ভাব্য সকল প্রকার চেষ্টা পরিশ্রম করা হতে লাগলো। সময় গড়ানোর সাথে সাথে জীবনযাপনের ধরন প্রকৃতিও বদলে যেতে শুরু করলো। এভাবে জীবনের প্রয়োজনাদি বেড়েই চললো। ফলতঃ রুজিরোজগার অর্জনের গতিধারা হয়ে উঠলো চরম থেকে চরমতর।

এসব পরিস্থিরিতর মাঝে পশ্চিমা পুরুষদের স্বার্থপরতামূলক খাসলত -যা কিনা সারাটা জীবন ধরে কোনো কিছু বিসর্জন দেয়া ছাড়াই নারী জাতি থেকে ফায়দা লুটে আসছিলো -সে এটা বরদাস্ত করতে পারেনি যে, নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য খুব কষ্ট করে যে সম্পদ অর্জন করতে হয়, সেই সম্পদের মধ্যে সে নারীকেও ভাগদার বানাবে, তার জন্য নিজের প্রয়োজনীয় ধনমালে ঘাটতি হতে দিবে কিংবা অতিরিক্ত পয়সা কামাতে গিয়ে খোদ নিজের উপর আরও একটা (অতিরিক্ত) বোঝা চাপিয়ে নিবে। জীবিকাব্যবস্থা ও সভ্যতারীতির এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের পর পুরুষের কাছে নারীদের ঘরে আবদ্ধ থাকাটাকে দু’টি কারণে মন্দ ঠেঁকলো।

ওগুলোর মধ্যে একটি ছিল পুরুষের সেই কামুক খাসলত, যা নারী থেকে আলাদা থাকাকে পছন্দ করতো না। জমিদারি ব্যবস্থার যুগে নারীদের ঘরোয়া কাজকারবার করা এবং ঘরের মধ্যে থাকাটা পুরুষের জন্য এজন্য লোকসানের কিছু ছিল না, যেহেতু তার বহিঃর্গত ব্যস্ততাগুলো এমন ছিল না, যার কারণে তাকে নারী থেকে দূরে অবস্থান করতে হবে। কিন্তু পুরো জীবনের ধাঁচটাই যখন বদলে গেল, তখন কেবল হাল টানা বা দোকানদারী করাটাই পুরুষের কাজ থাকলো না, বরং শিল্প-বানিজ্যে অস্বাভাবিক উন্নয়নের ফলশ্রুতিতে তাকে দিন-রাত কলকারখানা ও অফিস-আদালতে অবস্থান করতে হত। একাজের জন্য তাকে দূর-দূরান্তে সফর করতে হত। কাজেই (পুরুষের জন্য) নারীদের থেকে দূরে থাকাটা ছিল অবধারিত। দ্বিতীয় কারণ এই ছিল যে, জীবন মানে (Standard of Living) উন্নয়ন ঘটার কারণে খোদ পুরুষের নিজের ব্যয়ভার বহন করাটাই ছিল দুষ্কর। তাই তার নিজের সাথে সাথে আরেক জনের জন্যেও কষ্ট-পরিশ্রম করাটা নিজের উপর একটি অপ্রয়োজনীয় বোঝা অনুভুত হতে লাগলো।

এই দ্বিবিধ সমস্যার একটি সমাধানই (পশ্চিমা) পুরুষদের চোখে ধরা পড়লো, আর সেটা হল, এখন থেকে নারীদেরকেও কামাই রোজগারের কাজে নামিয়ে দাও, যাতে করে (তাদের জন্য অতিরিক্ত) সম্পদ উপার্জনের সমস্যাটাও মিটে যায়, আবার প্রত্যেক কদমে নারীরা পাশে থাকার দ্বারা প্রবৃত্তির ওই বাসনাও প্রশমিত হতে পারে, যা তাদের রগরেসায় জড়িয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু এ কাজটিকে যদি নারীদের দ্বারা সাদাসিদে ভাবে করিয়ে নেয়া হতো, তাহলে তারা পুরুষের এই মানুষ্য স্বার্থপরতার ব্যাপারে সাবধান হয়ে যেতো যে, পুরুষরা প্রত্যেক কদমে নারীকে পাশে রেখে একদিকে-তো নিজেদের মানবীয় অগ্নীকে ঠান্ডা রাখতে চায়, আবার অন্য দিকে যখন এই নারীর জন্যই রুটির কয়েকটি টুকরা যোগার করার অবস্থা আসে, তখন সেই কাজটিকে তার কাছে একটি কঠিন বোঝা অনুভুত হয়। এতে নারীরা মনে করতো যে, নিজেদের দৈহিক কষ্ট ক্লেশের ব্যাপারে-তো পুরুষদের খুব অনুভুতি রয়েছে যে, তারা এজন্য নারীকে ঘর থেকে বেড় করে আনতে চায় বটে, কিন্তু (অন্য দিকে আবার) নারীকে নিজেদের প্রবঞ্চনার জালে আবদ্ধ করতে গিয়ে তাদের এই চিন্তাও আসেনা যে, নারী’র ন্যায় এমন নাজুক ও কমনীয় মানুষ ‘পয়সা উপর্জন এবং ঘরের ব্যবস্থাপনা -এ দুকাজ (একই সাথে) কি করে আনজাম দিবে!?

নিজেদের এই স্বার্থপরতার উপর পর্দা টেনে দেয়ার উদ্দেশ্যে পশ্চিমা পুরুষদের প্রতারনা ও ভেলকিবাজিতা যে রঙ্গিন ভুমিজাল বানিয়েছিল, সেটা এতটাই চোখ ধাঁধাঁনো ছিল যে, বেচারী নারী জাতি
আজ অবধি ওই জালে ফেঁসে থাকার পরও তারা আত্বভোলায় নিমজ্জিত হয়ে আছে। এই চোখ ধাঁধাঁনো জালের মনভোলানো ও নিরপরাধ নামটি’ই হল- ‘‘নারী মুক্তি আন্দলন’’।

পুরুষ তার এই স্বার্থপরতার উপর আমল করার জন্য Liberalism (লিবারালিজম/ স্বাধীন-চেতা-মূলক মতাদর্শ)- এর উপর ভর করেছিল। আর এই লিবারালিজমের ধারক বাহকরা -যারা বহুদিন থেকেই ইউরোপের সামাজিক, অর্থনৈতিক, চারিত্রিক এবং চেতনাগত জীবনে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছিল, (তাদের কাছে) নারীরা এ কাজের জন্য যুৎসই প্রমাণিত হল। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য তারাই ‘নারী স্বাধীনতা’র শোড় উঠালো এবং এ ব্যাপারে ব্যপক দাবী তুললো যে— ‘‘নারীকে ঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ রাখাটা তার উপর অন্যয় অবিচার। বাস্তবিক পক্ষে স্তরের দৃষ্টিকোণ থেকে নারী পুরুষের মাঝে কোনোই পার্থক্য নেই। তার উচিৎ পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রত্যেক কর্মে অংশ গ্রহন করা। জীবিকা উপার্জনের প্রশ্নে তার কর্তব্য হল পুরুষের মুকাপেক্ষি থাকার পরিবর্তে স্বনির্ভর ও স্বাধীন (Independent) হওয়া’’।

যেহেতু এই আহবানটি ছিল প্রত্যেক ওই পুরুষেরই মনের ডাক, যারা অাধুনিক জীবনের (পর্বে পা দেয়ার) পর নিজেদের কামনা বাসনার সুবাদেই নারীর ঘরে থাকাটাকে ‘মন্দ’ মনে করে আসছিল; যেহেতু ‘লিবারাল চক্রে’র এই আহবানটি ইউরোপের প্রতিটি ভু-খন্ড থেকে উত্থিত হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাই বেচারী নারী জাতি পুরুষের এই প্রবঞ্চনামূলক চালাকিটিকে বুঝে উঠতে পারে নি। আর তাই সে স্বানন্দচিত্ত্বেই ঘরকে- ‘ভাল থেকো’ বলে পুরুষের ‘কামনা-বাসনা’কে নিতান্তই চুরচুর করে পূর্ণ করে দিয়েছে।

পরবর্তিতে পুরুষ তার এই চালের (নারী থেকে) সাহায্যে বড় বড় কাজ নিয়েছে। নারী জাতি যখন বাজারে বাজারে বেড়িয়ে পড়লো, বিভিন্ন অফিস-আদালতে প্রবেশ করলো, তখন পুরুষ তার কামুক চোখকে শীতল করা ছাড়াও নারীর মাধ্যমে নিজেদের ‘বিজনেস’কেও খুব করে চিত্মাকর্ষক করে তুলেছে। দোকান এবং হোটেলের কাউন্টারে কাউন্টারে, অফিস আদালতের টেবিলগুলোতে, সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনের পাতায় পাতায় নারীর এক একটি অংগকে খোলা বাজারে অপমানিত করা হয়েছে। কাস্টোমারদেরকে নারীর মাধ্যমেই ডাক দেয়া হয়েছে যে, ‘এসো, আমাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে নিয়ে যাও’। এমনকি ফিতরাত (তথা আল্লাহ’র সৃষ্টিগত প্রাকৃতিক স্বভাব)  যে নারীর মাথায় ইজ্জত-শরমের মুকুট রেখে দিয়েছিল, যার গলায় সতীত্ব ও পবিত্রতার গহনা পড়িয়ে দিয়েছিল, সেই নারীই আজ দোকানের চাকচিক্য ও শোভা বর্ধনের জন্য একটি ‘শোভাধার’ এবং পুরুষের অবসাদ ও কান্তি উড়িয়ে দেয়ার জন্য একটি বিনোদনপোকরনে পরিণত হয়ে গেছে। 

একজন স্ত্রী থাকার উপাখ্যান 

বর্তমান জামানায় এ সকল নারীদেরকে এই অবস্থার উপরই খুশি রাখা এবং তাদেরকে প্রবোধ দেয়ার উদ্দেশ্যে নিত্য-নতুন উপাখ্যান জন্ম লাভ করছে, যা থেকে নারীদের এই অনুভুতি জেগেছে যে, ‘আমাদের পুরুষ সমাজ বাস্তবেই আমাদের বড়ই সহমর্মী; তারা আমাদেরকে জুলুম ও অন্যয়-অবিচার থেকে মুক্তি দিতে চায়’। তাদের বিভিন্ন উপাখ্যানের মধ্যে একটি উপাখ্যানের শিরনাম হল-‘‘বহু বিবাহের ক্ষতি’’।

পশ্চিমা পুরুষরা জানতো যে, ‘সতীন’ বিষয়টি সম্পর্কে নারীদের দূর্বলতা রয়েছে এবং যে ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে যুক্তি ও আপক্তির উচ্চ আওয়াজ উঠাবে, নারীরা তাকেই নিজেদের প্রকৃত কল্যানকামী এবং সত্যিকার সহমর্মী মনে করবে। হলোও তাই। যে সকল জাতি বা গোষ্ঠির মধ্যে বহু বিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল, পশ্চিমারা তাদের মাঝে এই বলে ধিক্কার ও ভৎসনা দিতে শুরু করে দিলো যে— ‘‘দেখো, এসব জাতি নারীদের উপর কত অবিচার করে! সতীনদের কারণে তাকে স্বামীর অত্যাচার ও নিপিড়ন সইতে হয়। আর আমরা কত সুবিচারক ! আমাদের এখানে একাধিক বিয়ে বৈধ নয়। আমরা একজন স্ত্রী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি’! ……এবারে তাদেরকে আর জিজ্ঞেস করার কেউ রইলো না যে— ‘‘তোমরা যদি (কামনা-বাসনা অপস্থানে চরিতার্থ করণের প্রশ্নে এতই সুবোধ,) ধৈর্যশীল ও অল্পেতুষ্ট থাকার মানুষ হয়ে থাকো, তাহলে তোমাদের এক একটা হোটেল, এক একটা নাইট ক্লাব, পার্ক এবং বিশ্রামাগারে তোমাদের একজন নতুন বউয়ের উদ্ভব ঘটে কি করে’’?

অমরা যে পুরুষের স্বার্থপরতাকেই -‘নারী মুক্তি আন্দলনে’র ভিত্তি হিসেবে ঘোষনা দিয়েছি, যদি ঘটনা এটাই না হয়, তাহলে কেউ কি আমাদেরকে বলে দিবে যে, ‘‘এই যে লিবারালিজম -এটা তো নতুন কোনো কিছু ছিল না। ইউরোপে এই বিশাল চিন্তাধারার (!) কন্ঠটি-তো কম-বেশি পঞ্চদশ শতাব্দি থেকে হালে পানি পেয়ে আসছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অষ্টাদশ শতাব্দি থেকে তিন’শ বছর পূর্বে এই লিবারালিজমের ধারাক-বাহকরা সমস্ত প্রকার চিন্তা-চেতনা, চারিত্র ও বিশ্বাসগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক গিট্টিগুলোকে ছিড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে (সমাজকে) নবরূপদান ও সংশোধনের মুখোশ নিয়ে এই ময়দানের সবগুলোতেই উঠে পড়ে লেগেছিল। সে জামানায় শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে তারা গড়ে ওঠা জমে ওঠা গোলকের বাইরে পা রাখার উদ্দেশ্যে পাদ্রী পুরোহীতদের সাথে বড় বড় লড়াই লড়েছে, গীর্যার দেয়াল খন্ডবিখন্ড করেছে, জমিদারি ব্যবস্থার চিহ্নকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এসময় যখন জীবনের প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখায় (সমাজকে) নবরূপদান ও সংশোধনের শোড় তোলা হচ্ছিলো, তখন ‘নারী’র মজলুমী ও ‘অন্যয়-অত্যাচারিত’ অবস্থা ও তার ঘরে আবদ্ধ থাকার কল্পনাটা তাদের মনে দরদ সৃষ্টি করলো না কেনো? তখন কেনো তাদের এ খয়াল হল না যে, ‘আমরা নারীকে এই অন্যয়-অবিচার থেকে মুক্তি দানের ব্যবস্থা করি; অথচ একাজটি জমিদারি ব্যবস্থার সিংহাসন উল্টিয়ে দেয়া এবং গীর্যার গাম্ভীর্যতাকে তসনস করে দেয়ার চাইতে আরও বেশি সহজ ছিল!?…. নারীর আসামি হওয়ার দরদটা তিন’শ বৎসর পর আঠার শতাব্দিতে যখন শিল্প বিপ্লব এসে পড়লো, তখনই কেনো জন্ম লাভ করলো?

পশ্চিমারা বহুবিবাহের মাসআলাটির ক্ষেত্রে ইসলামের উপর যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছে, আমরা সেগুলিকে ‘নারী’কে ‘ফুসলানোর মাধ্যম’ বলে অবিহিত করেছি। এটা যদি আমাদের নিছক ধারনা হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের কে কেউ বুঝিয়ে দিক যে, ইসলামে একাধিক বিয়ের মূলনীতিটি-তো (তাদের সময় হিসেবে) বার’শ বৎসর ধরে চলে আসছে; এত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কেউই এতটা ধুমধামের সাথে এই মূলনীতিটির বিপক্ষে আপত্তি তুললো না কেনো? বার শতাব্দি অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরই এই মূলনীতির উপর এমন কোন পোকাটি পড়লো, যার কারণে পশ্চিমাদের তা নাকোচ করে দেয়ার এত শক্ত প্রয়োজন দেখা দিলো?

এসব বিষয়কে দৃষ্টির সামনে রাখলে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য যে, পশ্চিমা পুরুষরা শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যেই ‘নারী মুক্তি আন্দলনে’র শোড় তুলেছিল। এই আন্দলনের ফলে নারী’র উপর কতটুকু অবিচার হল, এতে তার কি কি ক্ষতি হল -এসব প্রশ্নের জবাব বিশদ আলোচনার দাবী রাখে। হায়াতে কুলালে এ বিয়য়ের উপরও আমরা পরবর্তিতে কখনো আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ। এখন-তো আমাদের শুধু এতটুকুই বলতে হয় যে, বহু বিবাহের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের আপত্তি ও অভিযোগগুলো নিছক ওই মন্দ অনুভুতিরই ফলাফল, যা তাদের নারীদের সাথে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিমূলক সম্পর্কের কারণে জন্ম লাভ করেছিল। তারা চাইতো, নারীদের অন্তরে যেন এই খেয়াল জন্মাতে না পারে যে, পুরুষরা তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ‘নারী মুক্তি’র ভনিতা দেখাচ্ছে এবং আমোদ ঘরগুলোতে দিনারাত প্রকাশ্যভাবে যে সমস্ত ইতর সূলভ কাজ কারবার হয়ে থাকে, নারীদের মনযোগ যেন সেই দিকে ব্যয় হতে না পারে। বিধায় তারা এই ডঙ্কা বাজাতে শুরু করে দিলো যে, “আমরা বড়ই ধৈর্যশীল ও অল্পেতুষ্ট থাকার মানুষ। আমাদের হৃদয়ে একাধিক স্ত্রীর প্রতি কোনোই খাহেশ জন্মায় না। অপর দিকে অন্যান্য জাতিগুলোর মানবীয় ক্ষধা একই বেড়ে গেছে যে, ‘নারী’কে সতীনের ঝঞ্ঝাটে ফাঁসানোটাকে তারা মেনে নিতে পারে ঠিকই, কিন্তু নিজেদের মানবীক ক্ষুধার উপর কোনো নিয়ন্ত্রন আনতে পারে না’’!

গোটা দুনিয়ায় উচ্চবাচ্চ চালিয়ে এই নির্জলা মিথ্যাটির প্রচার-প্রসার এত গুরুত্বের সাথে করা হয়েছে যে, দুনিয়া একেই সত্য মনে করা শুরু করে দিয়েছে। প্রাচ্যের নারীরাও এই একই প্রতারনায় পড়ে তাদের এখানেও ‘(পুরুষের থাকবে) এক স্ত্রী’-্এর বুলন্দ শোড় তোলা শুরু করে দিয়েছে।

ইউরোপ ও আমেরিকায় ‘এক স্ত্রী’র চর্চা এবং এর শিক্ষামূলক পরিণতি

বাস্তব কথা হল, খোদ পশ্চিমাতে একজন স্ত্রী থাকার এই মূলনীতিটি পুরুষদের জন্য যতটা-না আনন্দ-স্বাচ্ছন্দের  উপসর্গ তৈরী করছে, নারীদের জন্য সেটাই এমন এক জীবন-আযাবে পরিণত হয়েছে যে, একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে তাদের  যত বড় মজলুমী অবস্থার জল্পনা-কল্পনা করে নেয়া যাতে পারে, (বাস্তবে) তাদের বর্তমান অবস্থা ওই মজলুমী অবস্থার চাইতে অনেক প্রকট। এমনকি সেখানকার ন্যায়ানুগ ভাবধারার বুদ্ধিজীবীরা নারীদের এই ভয়ঙ্কর মজলুমী ও অবিচারপিষ্ঠ অবস্থার বিষয়টি অনুভব করে ‘এক স্ত্রীক’ চিন্তাধারার বিরুদ্ধে আপত্তিও উত্থাপন করেছেন। ‘এক স্ত্রীক’ চিন্তাধারার কারণে নারীরা মানবীয় যে সমস্ত অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়ে থাকে, এক সাংবাদিক তার এক বিবৃতিতে জনৈক পুরহীত সাহেবের সূত্রে তা প্রকাশ করে দিয়েছেন, যার কিছুটা উদ্ধৃতি আমরা নিম্নে পাঠক সমিপে উপহার দিচ্ছি:-

‘‘১৯১০ এবং ১৯৩৯ সালের বিশ্বযুদ্ধেগুলো অংগরাজ্যগুলিতে নারীদের অনুপাতকে পুরুষদের চাইতে বেশি বানিয়ে দিয়েছে। যেমন, এখানে বেশির ভাগ নারীই বিয়ের বাসনা হৃদয়ের মাঝে রেখে বৃদ্ধা হয়ে যায়। তারা জীবনের ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে বিষাদাভাবাপন্ন হয়ে যেতে থাকে, কিন্তু জীবনের সত্যিকার স্বাদ ও শান্তির দেখা তারা পায় না। লন্ডনের একজন পুরহীত বলেছেন যে, আজকাল ভুলবসতঃ কোনো কুমারীকে যদি ‘বিবাহিত’ মনে করা হয়, তাহলে সে কিছুক্ষনের জন্য বাগবাগ হয়ে যায়। বর্তমানে বেশির ভাগ নারী বিয়েকেই তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মনে করে নিচ্ছে। বিয়ের জন্য তারা হন্যে হন্যে ঘুড়ে বেড়ায় এবং যে ছেলেকেই পায়, তাকে তার হবুস্বামী ভাবতে শুরু করে দেয়।’’

পুরহীত সাহেব আরও বলেন:-

‘‘যে সব কুমারী নারীকে ‘মিসেস’ বলা হয়, তারা তাদের নিজকে সবচেয়ে উচ্চ ও মর্যাদা সম্পন্ন মনে করতে আরম্ভ করে দেয় এবং তাদেরকে উচ্চানুভুতির রোগে পেয়ে বসে। তাদের যে সমস্ত সঙ্গিনী স্বামী পায় না, তারা তাদেরকে একটু অবজ্ঞার চোখে দেখা শুরু করে দেয়। সর্বসাধারণ নারীরা যখন পরষ্পরের সাথে সাক্ষাত করে, তখন তাদের চোখ সর্বপ্রথম অন্যের আঙ্গুলে বিয়ের আংটি’র খোঁজ করে ফিরে। এমতাবস্থায় নারীরা তাদের বিয়ের খেয়াল হতেই মহব্বত করা শুরু করে দেয়’’।

আরেকটু সামনে গিয়ে প্রতিবেদকরা সব দেশ থেকে নারীদের লন্ডনে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে জমা হওয়ার বিভিন্ন কারণ এবং সেখানে তাদের কর্মব্যস্ত জীবনের বিস্তারিত রিপোর্ট(৩) দিয়েছেন এভাবে-

‘‘মা ঘরের মধ্যে ‘বয়- ফ্রেন্ডের’ সাথে সাক্ষাতের উপর আপত্তি জানায়। এখানে উন্নতি করার সুযোগ অনেক বেশি। পাওনাদারের সাথে ঝগড়া হয়ে যায়। ‘এ্যাকট্রেস’ (শিল্পী) হওয়ার শকও মেয়ের মাঝে ঘুরপাক খায়। কিছুটা দুনিয়া দেখার জন্য ঘর থেকে বেড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। এখানে …………. এবং এ-বি-সি’র এমন সব খানাপিনার রেষ্টুরেন্ট রয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মেয়ে কাজ করে। ‘ডেল-ওরথ’ এবং ‘স্পন্সরস এনড মার্কস’ এর লম্বা চওড়া ষ্টোরগুলোতে ‘শোপ গার্ল’ হতে পারে, হোটেল গুলোতে ওয়েটার হতে পারে, পারে সেকরেটারি হতে। আরও পারে ফটোগ্রাফদের মডেল এবং ইন্ডিয়ান ছেলেদের দেহাশ্রমের সৌন্দর্যশোভা। এদের মধ্যে বেশির ভাগই সপ্তাহে চার-পাঁচ পাউন্ড থেকে নিয়ে সাত-আট পাউন্ড পর্যন্ত উপার্জন করে, যার মাধ্যমে তারা খুব কষ্ট করেই নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। আর যাদেরও-বা কিছু বাঁচিয়ে নিজেদের বৃদ্ধ পিতা-মাতার কাছে পাঠাতে হয়, তারা বেঁচে থাকার জন্য পুরো খাবারও খেতে পারে না। তারা প্রায় প্রত্যেক সন্ধাতেই আনন্দ-বিনোদনের জন্য ওই শিকারের খোঁজে থাকে, যে তাদেরকে ছবি দেখায়, রেষ্টুরেন্টে এক বেলা খাবার খাইয়ে দেয় কিংবা একটি ভাল ‘কফী হাউজে’ এক কাপ কফীই খাইয়ে দেয়। অবশ্য এজন্য তাদেরকে এই ‘স্বাধীনতা এবং দুনিয়া দেখা’র ‘মূল্যও’ ( ! ) আদায় করতে হয়।

এখানে নারী -স্বাধীন, কিন্তু তার অবস্থা করুনাযোগ্য। এখানে সর্বসাধারণ নারী’র কোনো সম্মান নেই, কোনো মযার্দা নেই। তারা যদি প্রাচ্যের মজলুম নারীদের জেলের জীবনকে এক ঝলক দেখে নিতো, তাহলে তারা ‘নারী স্বাধীনতা ও সম-অধিকার থেকে তাৎক্ষনিকই ফিরে আসতো। এখানে হাজারও নারী সারা জীবন ঘর সংসার ও বাচ্চা কাচ্চার আকাঙ্খায় জীবন কাটিয়ে দেয়। তারা তাদের মজলুমী ও ছটফটানী রাজ্যের বিষয়টি পরিপূর্ণভাবেই অনুভব করে থাকে।

এই হল ইংল্যান্ড ও ইউরোপের অধিকাংশ রাজ্যগুলোর জীবন জীবিকাগত অবস্থা। উপরের উদ্ধৃতিটি বার বার পাঠ করুন। বিশেষ করে শেষের প্যারাগ্রাফটির উপর একান্ত মনযোগ সহকারে চিন্তা করে দেখুন এবং আমরা শুরুর দিকে এই দাবীর স্বপক্ষে যে সব মজবুত দলিল উপস্থাপন করে এসেছি – এখানে তার প্রতিও লক্ষ্য করে দেখুন।

এটা-তো গেল ইংল্যান্ডের অবস্থা। এবারে আপনারা আমেরিকার হাল-অবস্থার উপরও এক নজর বুলিয়ে নিন। সেখানকার যৌনাবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে উচুঁদরের বিচার বিশ্লেষন করা যেতে পারে ওই গ্রন্থ থেকে, যা সেখানকার বিখ্যাত যৌন-বিশ্লেষক Dr. C. Kinsay (ডঃ সি কিন্সে) পনের বৎসরের সুদীর্ঘ পবেষনা ও রিসার্চের পর আমেরিকানদের যৌন বিষয়ক কাজকারবারের উপর লিখেছেন। বইটির একটি প্যারা আমাদেরকে বিশেষভাবে চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিদানের প্রতি আহবান জানায়।

‘‘নারীদেরকে যদি যৌন ভ্রষ্টামীর ভিত্তিতে শাস্তি দেয়া যায়, তাহলে সেখানকার প্রচলিত সমসাময়িক  আইনের আলোকে শতকরা ৮০ জন নারীকে এখনই জেলে বন্ধ করে রাখা উচিৎ’’।

একটু ভেবে দেখুন, শতকরা ৮০ জন নারী শুধুমাত্র ওই সমস্ত অপরাধের অপরাধে অপরাধি, যে অপরাধটা (আমেরিকার) আইনের চোখে অবৈধ। আর আপনাদের তো এই ধারনা রয়েছেই যে, এমন অসংখ্য যৌন অপরাধ রয়েছে, যা স্বভাব বিরুদ্ধে হওয়া স্বত্ত্বেও আমেরিকার আইনের চোখে সেটা কোনো অপরাধই নয় !

ডঃ সি কিন্সে তার এই রিপোর্টের মাধ্যমে আমেরিকান সভ্যতাকে সবার সামনে অর্ধ-উলঙ্গ করে দিয়েছেন। আর আপনারা যদি এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত কথা শুনতে চান, তাহলে ‘ডঃ গ্রেচ সি. শোফলার আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনের রোকনদের সামনে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা কলিজা ঠান্ডা করে পড়ে নিন। তিনি বলেন-

‘‘আমেরিকায় কুমারী ( ! ) মা’দের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ১৯৩৮ সালে ৮৮ হাজার অবৈধ শিশু জন্ম লাভ করেছিল। কিন্তু ১৯৫০ সালে তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার। এসব মা’দের বয়স বিশে’রও কম। বরং শতকরা ৪৪ জন মা’র বয়সই ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যে। ১৯৫০ সালে প্রায় ৩২ হাজার মা’র বয়স ছিল ১৭ বা তার কিছু কম। এখন এধরনের মা’দের সংখ্যাই বাড়ছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রী এবং ভাল ভাল চাকুরিজীবী কুমারী মা’দের সংখ্যাই বেশি। গরীব ও নিঃস্ব মেয়েদের ৯ বৎসরের মধ্যেই যৌন অনুভুতি সীমাতিরিক্ত আকার ধারন করছে। বর্তমানকার বই পত্র, বিভিন্ন আনন্দ-বিনেদন, সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশন ও থিয়েটারগুলি এর জন্য যথেষ্ট দায়ী”। [দৈনিক জংগ, করাচি, সেপ্টেম্বর, ১৯৫৪]

এসব সংখ্যা ও পরিমান স্বজোরে ঢোল বাজিয়ে ঘোষনা দিচ্ছে যে, ইউরোপ ও আমেরিকায় সতীত্ব ও পবিত্রতার সামান্য থেকে সামান্য চিন্তাটুকুকেও মুক্তবিহঙ্গ জীবনের উৎসর্গগাহে বলী দেয়া হয়েছে। জাতি পর জাতি ইজ্জতহারা হয়ে গেছে। এটা যৌন অপরাধের এমন এক অপ্রতিরোধ্য ছয়লাব, যা আদালতী আইনের চাবুক হাতে থাকা স্বত্ত্বেও ধেয়েই আসছে।

কোনো কোনো জনাব এতে অবাক হন যে, পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা এ বিষয়টির স্বীকৃতিও দিচ্ছেন, অথচ (নিজেদের জীবনের প্রশ্নে) তা গ্রহন করছেন না, এদিকে বহু বিবাহই হল এসকল সমস্যার একমাত্র সমাধান ! কিন্তু উপরের লাইনগুলোতে আমরা যে সমস্ত গুজারেশ পেশ করে এসেছি, তার আলোকে এটা
কোনো আশ্চার্যের কিছু নয়। যেখানে তাদের খাহেশগুলো আকাঙ্খা মতো-ই পূরণ হয়ে যাচ্ছে, যার কারণে তারা ‘নারী মুক্তি’র স্লোগান’ তুলেছিল, সেই পশ্চিমা পুরুষরা কেনো বহু বিবাহের অনুমতি দিতে যাবে ? পশ্চিমায় তাদের জন্য প্রত্যেক কদমে ‘যৌন প্রশান্তি’ লাভের উপকরণ মওজুদ আছে। অন্যদিকে নারী ঘরে থাকার ফলে তাকে যে দ্বিমুখী মেহনত ও কষ্ট-পরিশ্রম করতে হত, এখন আর সেটাও তাকে করতে হয় না। তার দৃষ্টিতে-তো সাপও মড়ছে, আবার লাঠিও ভাংছে না। তাহলে এই ‘স্বাধীনতা’র বদৌলতে নারীকে কতখানি কষ্ট পরিশ্রম শিকার করতে হচ্ছে এবং ‘একজন স্ত্রী’র মূল্য ( ! ) আদায় করতে গিয়ে এ বেচারিকে কতটুকু জুলম ও অন্যায়-অবিচার সহ্য করতে হচ্ছে’, সে চিন্তা পশ্চিমা পুরুষরা করবে কেন ?

একাধিক বিয়ে এবং আমরা 

এসমস্ত ঘটনা খোলা চোখে দেখে নেয়ার পরও আমরা যদি এখানেও একাধিক বিয়েকে নাজায়েয বলে আখ্যায়িত করতে চাই, তাহলে এ পথে পা বাড়ানোর আগে একথা ভাল করে বুঝে নেয়া কর্তব্য যে, আমরা যদি এখানেও ‘একজন স্ত্রী’ থাকার আইন রচনা করে বসি, তাহলে আমাদের সংসার জীবনেও বেশি দিন যেতে না যেতে ফাহেশা ও যৌন অপরাধের ওই সব ঘটনাই ঘটতে থাকবে যেসব ঘটনা ইউরোপ  আমেরিকাতে পদে পদে ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয়ে গেছে। একাধিক বিয়েকে নিষিদ্ধ করে দেয়ার অর্থ হবে এই যে, এখানে আমরাও আমাদের নারীদের উপর ওই একই অবিচারই করতে চাচ্ছি, যে অবিচার দু’শতাব্দি ধরে ইউরোপ আমেরিকায় প্রদর্শিত হয়ে আসেছে। এতে করে কোনো কোনো জনাব সন্দেহে পড়তে পারেন যে, ‘‘ইউরোপ আমেরিকায় যেহেতু নারীদের সংখ্যা পুুরুষদের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে, তাই তাদের জন্য নিঃসন্দেহে একাধিক স্ত্রীর প্রয়োজন রয়েছে। আর যেহেতু এই জরুরতের উপর আমল দেয়া হচ্ছে না, এজন্য ওসব জায়গায় এতসব খারাব কাজ ছড়িয়ে পড়ছে। অপর দিকে আমাদের সমাজে যেহেতু পশ্চিমা দেশগুলোর মতো নারী-পুরুষের সংখ্যাগত (এতটা) ব্যবধান বিদ্যমান নেই, তাই এখানে একাধিক বিয়ের কোনোই প্রয়োজন নেই। বরং কয়েকজন স্ত্রী রাখার অনুমতি থাকার কারণে বহু নারী জুলুম ও অন্যায়-অবিচারের শিকার হচ্ছে। এখন আমরা যদি এখানে বহু বিবাহের উপর পদশৃঙ্খল লাগিয়ে দেই, তাহলে এতে করে ইউরোপ আমেরিকায় যে সমস্ত জুলুম ও অন্যায় অবিচার সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো সব দূর হয়ে যাবে এবং যে সমস্ত অনিষ্টতা জন্ম লাভ করেছে, ওগুলোও আর জন্মাতে পারবে না”।

এসব কথা খুব জোরেশোরেই উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু এর প্রতিটি বাক্যাংশই ভুল এবং
বাস্তবতার পরিপন্থী। তাদের এই দলিলের চারটি বুনিয়াদী অংশ নিম্নরুপ:-

(১) বহুবিবাহের কারণে বহু নারীর উপর জুলুম ও অন্য়ো-অবিচার হচ্ছে।

(২) এ সমস্ত জুলুম ও অন্যায়-অবিচারের কারণ হল এই বহু বিবাহের অনুমতি।

(৩) বহু বিবাহকে নিষিদ্ধ করে দিলে অথবা এর উপর পদশৃঙ্খল চড়িয়ে দিলে এসব জুলুম ও অবিচার দূর হয়ে যাবে।

(৪) বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত কিংকর্তব্যবিমূড় জনক নয়, তাই বহুবিবাহকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে একজন স্ত্রী থাকার নীতি চালু করে দিলে ওই সমস্ত অনিষ্টতা জন্মাতে পারবে না, যেগুলো ইউরোপ আমেরিকায় জন্মেছে।

(১) বহুবিবাহের কারণেই কি বহু নারীর উপর জুলুম ও অন্যায়-অবিচার হচ্ছে

এগুলোর মধ্যে প্রথম কথাটি এজন্য ভুল যে, একথা সবাই স্বীকার করবে যে, আমাদের সমাজে বহুবিবাহের নমুনা কদাাচিৎ-ই পাওয়া যায়। দশ হাজারে হয় তো এক-আধটা। খোদ আমাদের সরকার যে পারিবারিক কমিশন গঠন করেছে, তারা তাদের রিপোর্টে স্বীকার করেছেন যে, ‘‘আমাদের সমাজে বহু বিবাহের ঘটনা খুবই কম’’। সুতরাং এটা এমন কোনো সমস্যা নয়, যার কারণে ওই সকল অনিষ্টতা গুলোকে মুল্যায়নে আনতে হবে, যা মূলতঃ বহুবিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষনা করার পরই সংঘটিত হতে পারে।

এই যদি হয় অবস্থা তাহলে এই বহুবিবাহের বিরুদ্ধেই কেনো আপনাদের আত্বমর্যাদাবোধ উথলে ওঠে, যার নমুনা আপনারা কালেভদ্রেই আপনাদের সমাজ জীবনে পেয়ে থাকেন? ওই ‘বহু-বৌ’ এর বিরুদ্ধে আপনাদের আত্বসম্ভ্রমবোধের ধমনী আন্দলিত হয় না কেনো, যার বিভিন্ন নমুনা ‘নব্য-সভ্যতা’র বদৌলতে আপনাদের প্রত্যেকটি পার্টিতে, প্রত্যেকটি দাওয়াতে, ডিনারে এবং প্রত্যেকটি পিকনিকের ঘনঘটায় সর্বক্ষনই পাওয়া যায়? 

(২) জুলুম ও অন্যয়-অবিচারের প্রকৃত কারণ কি ‘বহু বিবাহের অনুমতি’?

আবার এ ধারাটিও সম্পূর্ণ ভুল যে, যারা কয়েকজন করে স্ত্রী রাখে, তারা নারীদের উপর যে জুলুম ও অন্যায়-অত্যাচার করে থাকে, তার কারণ ‘বহুবিবাদের অনুমতি’! বস্তুত: জুলুম ও অন্যায়-অত্যাচারের প্রকৃত কারণ শুধু এই যে, আমরা নারীদের জন্য আইনগত সুবিচার পাওয়াকে শুধু মুশকিল-ই বানাইনি বরং অসম্ভব বানিয়ে দিয়েছি। আজ আমাদের আদালতের অবস্থা এই যে, একজন মজলুম যখন কল্পনা করে যে, সুবিচার পাওয়ার জন্য আমাকে আদালতের দরওয়াজা খটখটাতে হবে, তখন তার আত্বাই কেঁপে ওঠে। সে যখন (আদালতী ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য) ওই সমস্ত অন্য়ো-অবিচারগুলোর কথা চিন্তা করে, যা তাকে সুবিচার পেতে গিয়ে সইতে হবে, তখন উপস্থিত অন্যায়-অবিচারের উপর ছবর করাটাই তার কাছে বেশি সহজ মনে হয়। এর কারণ হল, তার কাছে না এত পয়সা আছে যে, সে মকাদ্দমার প্রত্যেক শুনানির তারিখে তা দিয়ে শুনানি আহবানকারীদের ঝুলি ভর্তি করতে পারবে, আর না তার এত সময় আছে যে, মাস-কে মাস ধরে, বরংচ কোনো কোনো অবস্থায় বছর-কে-বছর আদালতের চার দেয়াল মাপতেই সময় অতিবাহিত করে দিবে।

দিন-কে-দিন অন্যায়-অবিচার বৃদ্ধি পাওয়ার মূল কারণ এটাই। আমাদের আদালতী ব্যবস্থাপনা যদি সুবিচার অর্জনের ক্ষেত্রে এতটা জটিল না হত, তাহলে কারোরই এই সামর্থ ছিল না যে, কেউ অন্যের হক্ব নিয়ে পালায়। ইসলাম বহুবিবাহের যে অনুমতি দিয়েছিল এবং তার উপর সে যে কোনো পদশৃঙ্খল লাগায়নি, তার কারন এই যে, তার দৃষ্টির সামনে ছিল ওই সমস্ত অকল্যান ও অনিষ্টকর দিক, যা (কাউকে) ‘একজন স্ত্রী’ গ্রহনে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জন্ম লাভ করতো, যার কিছুটা আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করে এসেছি; সামনেও কিছুটা করবো।

রইলো ওই সমস্ত অবিচার ও অন্যায়ের কথা, যা ‘বহু বিবাহে’র বেলায় সৃষ্টি হতে পারে। ইসলাম এসবের সাদাসিধা সমাধান এই নির্ধারন করে দিয়েছে যে, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীর সাথে সুবিচার না করে, তাহলে সে ততক্ষনাৎ শরয়ী আদালতে দাবী দায়ের করতে পারে। শরয়ী আদালতে বর্তমানকার আদালগুলোর মতো এক একটি মুকাদ্দমাকে বছরের পর বছর রগরাতে হতনা, বরং হাতে হাতেই ফয়সালা হয়ে যেত।
এ থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, যে সকল নারীরা তাদের স্বামীদের অত্যাচার-অবিচারের শিকার হয়, তাদের এ দুরবস্থার মূল কারণ হল আদালতের নোরা ও পুঁতিগন্ধময় ব্যবস্থাপনা, যেখান থেকে সুবিচার লাভ করতে গিয়ে খোদ হাজারটা অবিচার সইতে হয়। এখন আমাদের বিবেকবোধের দুরাবস্থা হল, এ সমস্ত অন্যায়-অবিচার বন্ধ করার জন্য আমরা আমাদের আদালতগুলোকে সংশোধন করার পরিবর্তে উল্টো একাধিক বিয়েরই পরিসমাপ্তি টেনে দিতে চাচ্ছি।

যদি সংশোধনের এই পন্থাই অবলম্বন করার ইচ্ছা থেকে থাকে, তাহলে এর চাহিদা তো এই যে, কোনো ব্যক্তিকে একজন স্ত্রী রাখার অনুমতিও দেয়া উচিৎ নয়। যেমনিভাবে কয়েকজন স্ত্রী থাকার ক্ষেত্রে অত্যাচার অবিচার হয়ে থাকে, তেমনি অসংখ্য নারী এমনও আছে, যাদের সতীনের জ্বালা-তো নেই বটে, কিন্তু তার পরও স্বামী তার উপর অত্যাচার-অবিচার চালায়, ভাত-কাপড় দেয় না, দীর্ঘ দিন পর্যন্ত কোনো খোঁজ খবর নেয় না। বরং বহু বিবাহের ক্ষেত্রে যেসমস্ত অত্যাচার অবিচার সংঘটিত হয়, সেগুলো-তো মাঝে মধ্যে হয়ে থাকে। অপর দিকে এক স্ত্রীর ক্ষেত্রে সংঘটিত অত্যাচার-অবিচারের উদাহরণ-তো এক শহরেই হাজারটা পাওয়া যায়। সুতরাং এজাতীয় চিন্তার দাবী হল, আদালতের সংশোধন এবং জনগণের মাঝে আল্লাহ’র ভয় সৃষ্টি করার পরিবর্তে বরং গোড়া থেকে একটি বিয়েরও অনুমতি দেয়া না হোক! কেননা, এতে বহু অন্যয়, অবিচার ও অত্যাচারের দরজা খুলে যায় !!!

বস্তুতঃ একথা বলাই মারত্মক ধোঁকা যে, ‘‘একাধিক বিয়ের কারণে নারীদের উপর যেহেতু অত্যাচার অবিচার হচ্ছে, তাই একে নিষিদ্ধ করে দেয়া বা এর উপর পদশৃঙ্খল লাগিয়ে দেওয়াটা জরুরী’’! যদি সংশোধনের এই পন্থা চালু হয়, তাহলে মানুষের জন্য জীবিত থাকাটাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে এবং যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনগণের উপর শক্ত শক্তসব আইন চাপিয়ে দেয়া হবে, সেই উদ্দেশ্যের স্বরূপটি (তাদের সামনে) কক্ষোনই দৃষ্টিগোচর হতে পারবে না।

এমুহুর্তে যে বিপুল পরিমান অত্যাচার ও অবিচার আমাদের চোখে ধরা পড়ছে, তার দুটি সমাধানই রয়েছে। একটি-তো হল, আদালতের সুবিচার পাওয়ার বিষয়টিকে সহজতর করে দিতে হবে। দ্বিতীয়টি হল, জনগণের অন্তরে খোদাভীতি ও আখেরাতের চিন্তা ফিকির জন্মিয়ে দিতে হবে। দুনিয়ার নিরাপত্তা ও শান্তি লাভ করা এবং অন্যয়-অত্যাচার ও অবিচার থেকে বাঁচার এছাড়া আর অন্য কোনো পন্থা সম্ভবপর নয়।

অন্যদিকে আমরা যদি আদালতী ব্যবস্থাকে এরকম পুঁতিগন্ধময় অবস্থায় থাকতে দেই এবং জনগণকে বিভিন্ন মাধ্যম যোগে আল্লাহভীতি ও আখেরাতের চিন্তা-ফিকির থেকে গাফেল বানিয়ে দিতে থাকি, এদিকে আবার শান্তি ও নিরাপত্তার আকাঙ্খাও করতে থাকি, সাথে এও চাইতে থাকি যে, দুনিয়া থেকে অন্যায়- অবিচার দূর হয়ে যাক, তাহলে আমাদের উদাহরণ ওই আহাম্মক থেকে ভিন্ন কিছু হবে না, যে তার নিজের পায়ে কুড়াল মাড়ছে, আবার এর সাথে সাথে মানুষকে একথাও বলছে যে, ‘আমার পায়ে কোনো আঘাত লাগছে; মজা লাগছে না কেনো’?

(৩) এই দফার দ্বারা নারীদের উপর অত্যাচার, অবিচার ও অন্যয় দূর হয়ে যাবে কি?

‘এক স্ত্রী’র শোড় উত্থাপনকারীদের তথাকথিত তৃতীয় ধারনাটি হল, ‘আমরা যদি একাধিক বিয়ের উপর পদশৃঙ্খল লাগিয়ে দেই, তাহলে নারীদের উপর অন্যায় অত্যাচার ও অবিচার দূর হয়ে যাবে’ !

এই তথাকথিত চিন্তাধারাটির পিছনে কী দলিল যে রয়েছে -তা আমাদের বুঝেই আসে না। আমাদের আইন রচয়ীতারা একথা ধরেই নিয়েছে যে, স্বামীদের নির্বুদ্ধিতার কারণে স্ত্রীদের উপর যতগুলো অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচার হয়, তার সবগুলোই একাধিক বিয়ে করার কারণেই হয়ে থাকে !

বস্তুতঃ যদি ইনসাফের সাথে ভালভাবে চিন্তা করে দেখা যায়’ তাহলে দেখা যাবে ব্যাপারটি এর একদম উল্টো। এটা অনস্বীকার্য এক বাস্তব সত্য যে, একাধিক বিয়ে (বন্ধ করে দেয়া)-র পর নারীদের উপর অন্যায় অবিচারের মাত্রা এত বেড়ে যাবে যে, সম্ভবতঃ এর পূর্বে তা পশ্চিমা নারীদের কখনো কল্পনায়ও আসেনি।

(ক) মনে করুন, এক ব্যক্তি অন্য আরেকটি বিয়ে করতে চায়। কিন্তু যতক্ষন পর্যন্ত সে তার প্রথম স্ত্রীকে বন্ধা, পাগল অথবা একেবারে অসার-অযোগ্য প্রমাণ করে দিতে না পারবে, ততক্ষন পর্যন্ত আপনারা তাকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেন না। যদি কোনো কারণ বসতঃ তার মনমস্তিষ্কে দ্বিতীয় বিয়ের অভিপ্রায় বা শক্ত প্রয়োজন চড়াও হয়ে থাকে, তাহলে এটা একদম অনিবার্য যে, এখন সে সর্বক্ষন এই সুযোগেই থাকবে যে, যে ভাবে হোক তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে কোনো মতে নিজকে মুক্ত করে নিতে পারে কিনা।

আপনারা তালাকের জন্যেও এটা জরুরী হিসেবে ঘোষনা দিয়েছেন যে, তাকে প্রথম তালাকের কথা ইউনিয়ন কাউন্সিলের গোচরিভূত করতে হবে, পরে ইউনিয়ন কাউন্সিল তাকে তার ওই অভিপ্রায় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে ! বলা বাহুল্য, এতে করে ইউনিয়ন কাউন্সিলের কাছে তাকে তার ‘তালাক’ দানের কোনো ‘কারণ’ উল্লেখ করতে হবে। ফলতঃ সে তা করার জন্য তার স্ত্রীর উপর নিত্যনতুন ‘অপবাদ’ ও ‘অভিযোগ’ গড়ে নিয়ে আদালতের কাছে তাকে অপদস্থ ও সম্ভ্রমদলীত করবে।

এর অনিবার্য পরিণতি এই দাঁড়াবে যে, এমন বহু নারী -যারা নিজেদের গৃহে শান্তিতে বসবাস করে আসছিল, তারা তালাকপ্রাপ্তা হয়ে গৃহ থেকে বেড়িয়ে যেতে বাধ্য হবে। সেই তালাকপ্রাপ্তাও আবার যেনোতেনো তালাক প্রাপ্তা নয়; একেবারে আদালতের সনদে তালাক প্রাপ্তা, যার অপরাধে অপরাধী হওয়া এবং তালাকের উপযুক্ত হওয়ার স্বপক্ষে আদালতের সিলমোহড় প্রমাণ পরিগ্রহ করবে। বলুন-তো, এমতাবস্থায় এরকম নারীকে কোন পুরুষটা বিয়ে করার সৎসাহস দেখাবে? এ ধরনের মেয়ে মানুষের জীবনটা কি মৃত্যুর চেয়েও দূর্বিসহ হয়ে দাঁড়াবে না?

(খ) কেউ যদি তার প্রথম স্ত্রী থাকাবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, কিন্তু কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এর কোনো অনুমতি না পায়, তাহলে সে তার এই অভিপ্রায় থেকে তো ফিরে আসবে বটে, কিন্তু সে তার স্ত্রীকে নিজের জন্য লা’নতের একটি শৃঙ্খল মনে করতে থাকবে। পূর্বে যদি তার সাথে সম্পৃতি ও ভালবাসার কোনো সম্পর্ক থেকেও থাকে, তবে এখন সেটা সম্পূর্ণরুপে ছিন্ন হয়ে যাবে। হতে পারে, সে উপর্যপূরী তাকে ভরনপোষন দিতে থাকবে, তাকে তার ঘরে রাখতেও সম্মত হবে, কিন্তু তাদের দু’জনের মাঝে ভালবাসা ও হৃদ্যতা’র ওই পবীত্র সম্পর্কটুকু কি বাকি থাকবে, যেটা স্বামী স্ত্রীর জন্য একান্ত জরুরী?

মুশকিলের কথা হল, স্বামী যখন চিন্তা করবে যে, শুধুমাত্র এই মেয়েটির কারণে আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ দীলী অভিপ্রায় বা শক্ত প্রয়োজন পূরণ হতে পারছে না, তখন তার চোখে সে কাঁটার মত বিঁধবে এবং সে তার সাথে নিখাদ হৃদ্যতা ও ভালবাসার ওই আচরনটুকু আর কক্ষোনই প্রদর্শন করতে পারবে না, যা নারীর জীবনের জন্য সীমাহীন জরুরী। আপনি কি মনে করেন, নিছক রুটির কিছু টুকরো পেয়ে গেলো, মাথা গোঁজার মত একটা ঠাঁই পেয়ে গেলো, এতেই সে সানন্দে থাকতে পারে -চাই তার সাথে তার স্বামীর আচার আচরন যত তিক্ত, বিষাদ ও বন্ধরই হোক না কেনো? এই যদি আপনার ধারনা হয়ে থাকে, তাহলে ওই বেচারীর প্রবৃত্তিগত স্বভাবপ্রকৃতির ব্যাপারে আপনি মারাত্বক ভুল ধারনা করে বসে আছেন!

নারীর প্রবৃত্তিগত স্বভাব প্রকৃতি সম্পর্কে যে ব্যক্তি সামান্যতম জ্ঞানও রাখে, সে ভালকরেই জানে যে, ভরন পোষনের প্রশ্নে নারীর যদি কিছুটা কমতিও হয়, তবুও সে তা মেনে নিতে পারে। কিন্তু সে যদি একথা অনুভব করতে পারে যে, আমর স্বামী আমার থেকে সামান্য অমনোযোগীতা প্রদর্শন করছে, তাহলে তার জন্য জীবনটা একটা আযাবে পরিণত হয়ে যায়। অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের মধ্যে যত যৌলুস ও ঐশ্বর্যই থাক না কেনো, সেটা তার কষ্টের ঔষধ পরিগ্রহ করতে পারে না। নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করুন, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে তার যে কষ্ট হত, এ আযাবটা তার চেয়ে আরও কয়েকগুণ বেশিই ঠেঁকবে। কেননা, তার স্ত্রী যদি তার সম্মতিক্রমে দ্বিতীয় বিয়ে করতো, তাহলে তার প্রথম স্ত্রীর এই মহতীকর্মের উপর তার অনুভূতি জন্মাতো যে, আমার একটি চাহিদা বা শক্ত প্রয়োজন পূরণ করার স্বার্থে সে তার নিজের একটি স্বভাবগত আকাঙ্খাকে উৎসর্গ করে দিয়েছে। এ অনুভূতিটি তার স্বামীর হৃদয়ে তার প্রতি একটি অস্বাভাবিক মর্যাদা ও মর্তবার স্তর তৈরী করে দিতো এবং তার সাথে অবিচার করার চিন্তা একজন পাষান থেকে পাষান হৃদয়ের মানুষের অন্তরেও খুব কষ্টেই ঠাঁই পেতো।

আর কোনো দুশমন মনুষ্যত্ব যদি আখলাক চরিত্রের এই স্বাভাবিক মাপকাঠি থেকে দূরে সরে গিয়ে তার সাথে অবিচার করে বসেও, তবুও স্ত্রীর জন্য (শরয়ী) আদালতের পথ সর্বক্ষনই উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু এমতাবস্থায় যখন তার স্বামী তার কারণে নিজের একটি স্বদিচ্ছা পূরণ করতে পারলো না, তখন স্বামী’র হৃদয়ে তার প্রতি মহব্বত ও মর্যাদা’র সাঙ্গোই ঘটে গেল বৈকি। এক্ষেত্রে তার স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা ও গ্রাহ্যতার কোনো নামগন্ধও বিদ্যমান থাকলো না। তাই স্ত্রীর কাছে এই ভরন পোষনটাও আগুনের টুকরা বলেই মনে হবে। এমতাবস্থায় সে অন্যায় অবিচারের ওই ভাটিতে গিয়ে উপণীত হবে, যেখান থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ নেই। সে তার দুঃখের এই কাহিনীর কথা আদালতের সামনেও বলতে পারবে না। কেননা, আদালত-তো তাকে ভরন পোষন দান পর্যন্তই সাহায্য করতে পারে মাত্র; এনিয়ে তার কোনো অনুযোগ নেই। কিন্তু আদালতের মাধ্যমে সে কি স্বামীর ভালবাসাটুকুও লাভ করতে পারবে ?

(গ) আরেকটু ভাল করে লক্ষ্য করুন, কোনো ব্যক্তি যদি দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি না পায়, তাহলে বলাই বাহুল্য যে, স্ত্রীর সাথে তার যে হৃদ্যতা, সম্পর্ক ও মিল থাকা জরুরী, সেটা আর কখনোই আগের মতো থাকবে না। এখন যদি সে শরীয়ত ও আখলাক থেকে সম্পূর্ণ মুক্তবিহঙ্গ হয়ে থাকে, (আর আজকাল এধরনের মানুষের সংখ্যাই বেশি), তাহলে সে তার মনকে ভুলিয়ে রাখার জন্য অন্যান্য বিভিন্ন রকম অবৈধ মাধ্যমগুরোকে অবলম্বন করে নিবে। সে বাহ্যিক ভাবে-তো একজন স্ত্রীর উপরই ক্ষ্যান্ত থাকবে বটে, কিন্তু আসলে তার সম্পর্ক থাকবে অন্যান্য মেয়ে মানুষদের সাথে। তাদের পিছনেই সে তার ঈমান ও চরিত্র বরবাদ করে দিবে, তাদের জন্য অর্থসম্পদ উড়াবে। তাদের সাথে থেকে সে যত ইচ্ছা নিজের জন্য আনন্দ-উল্লাসের উপসর্গ বানিয়ে নিক-গে; কিন্তু প্রশ্ন-তো হল, ওই বেচারী স্ত্রী’র কি দশা হবে? সে দেখবে যে, আমার ঘরে যদিও আমার কোনো সতীন নেই, কিন্তু ঘরে বাইরে আমার অনেক সতীন জন্মে গেছে; আমার স্বামী তাদের সাথেই পিড়িতের সম্পর্ক রাখে; অর্থ-কড়ি তাদের পিছনেই বেশি ব্যয় করে; আর আমার কাছে যখন আসে, তখন আসে নাক-মুখ কুঁচকিয়ে, মারধর করতেও প্রস্তুত; এই নামকে ওয়াস্তে ডিউটি পালন করেই কেটে পড়ে। সে তার এসব মজলুমীর কথা আদালতেরও গোচরিভ’ত করতে পারবে না। কেননা,  আমাদের আইনের চোখে-তো যে ব্যাক্তি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় সে ব্যক্তি অপরাধী। কিন্তু বেগানা নারীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা-তো (আপনাদের) আইন-সভ্যতা সবার চোখেই বৈধ!

(ঘ) নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের এসব অস্বাভাবিক অবস্থার প্রতিক্রিয়া নারীর উপর মাত্র দু’ভাবেই প্রতিফলিত হতে পারে, যা ছাড়া তৃতীয় কোনো সুরত সম্ভব নয়। হয় সে অন্যয়-অবিচারের এই ভয়াবহ আগুনে দগ্ধীভূত হতে হতে চিরজীবনের জন্য নিঃশ্বেস হয়ে যাবে, নয়-তো সেও ধীরে ধীরে ওই পথেই পা বাড়াতে থাকবে, যে পথে তার স্বামী চলছে। সেও তার মনকে ভুলিয়ে রাখার জন্য নাইট ক্লাবের অভিমুখী হবে। হয়-তো প্রথম প্রথম কিছুটা লুকিয়ে ছাপিয়েই হবে। কিন্তু কিছু কাল যেতে না যেতে এরকম নারীরা তাদের স্বামীদের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে এবং নিজের মন মাতানোর এমন এমন সব উপসর্গ তারা গড়ে নিবে যে, তাদের শ্রদ্ধেয় স্বামীদের কল্পনায়ও আসবে না। বলাবাহুল্য, যখন ‘পিতা, ‘মাতা’-ই এতটা নেককার (!) বুজুর্গ (!) হয়ে যাবে, তখন এরকম কোনো ব্যাপারে তাদের পুত্র-কন্যাদের পিছুপা হওয়ার কথা কি করে মেনে নেয়া যেতে পারে?

সংশ্লিষ্ট দফা’র মাধ্যমে আপনারা নারীদের সাথে যা করতে চাচ্ছেন, এটাইকি সেই ইনসাফ? দুনিয়াবী কোনো সম্পর্ক রাখেনা – এসব কথা নিছক এমন কোনো ‘অনুমান নির্ভর’, কাল্পনীক বা ধারনা প্রসূত কথা নয়। এগুলো-তো এ দফাটির এমন অনিবার্য ও যুক্তিসঙ্গত পরিণতিফল, যা অচিরেই সামনে এসে পড়বে। আর তখন সেগুলোকে বাঁধা দেয়া কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।

(৪) নারী পুরুষের সংখ্যানুপাতে কোনো পার্থক্য ঠেঁকে না! 

এই সকল জনাবদের মস্তিষ্কে চতুর্থ যে ধারনাটি ঠাঁই পেয়েছে, সেটি এই যে, ‘‘এদেশে নারীদের সংখ্যা যেহেতু পুরুষদের চাইতে বেশি নয়, তাই এখানে একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার দ্বারা ওইসমস্ত পরিণতির সম্মখিন হতে হবে না, যা ইউরোপ আমেরিকায় ঘটেছে’’ !

এ ধারনাটিও সম্পূর্ণ ভুল। একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ করে দেয়ার পর ওসব পরিণতি এখানেও নির্ঘাত সংঘটিত হবে। এমনও হতে পারে যে, ইউরোপ আমেরিকায় যা হয়েছে, কেবল ওগুলিই এর যাবতীয় উৎসমূল বা উপসর্গ নয় বটে, কিন্তু অপরাপর উপকরণ ও উপসর্গের প্রভাবে ওসব অবস্থা এখানেও অনিবার্যভাবে জন্ম নিবে।

আমরা এই মাত্র লিখে এসেছি যে, যখন এমন অবস্থা ঘটবে যে, এক ব্যাক্তি কোনো নারীকে বিয়ে করাকে শক্ত প্রয়োজন বলে মনে করছে অথবা বিয়েটা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পরিগ্রহ করছে, এমতাবস্থায় সে যখন একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না, তখন সে তার মাধ্যমে নিজের চাহিদা বা জরুরত পূরণের উদ্দেশ্যে নাজায়েয মাধ্যমগুলোকে ব্যবহারে আনবে।(৪) 

একদম নিশ্চিৎভাবে বলা যায়, এযুগের ৯০ শতাংশ মানুষ হবে তারাই , যারা দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি না পাওয়ার পর এসমস্ত অবৈধ মাধ্যমগুলোর দিকে অগ্রসর হবে। প্রথম স্ত্রীর সাথে তাদের সম্পর্ক থাকবে ভাসাভাসা; অপর দিকে তাদের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হবে ওসব অবৈধ আনন্দ বিনোদনের মধ্যেই। প্রথম স্ত্রী যখন তার স্বামীর এসমস্ত ধারাবাহিক কাজকারবার লক্ষ্য করবে, তখন সেও হোটেল এবং নাইক্লাবের দিকে পা বাড়াবে। পিতামাতার আচরণের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে তাদের নিজেদের সন্তানদের উপরে। এক্ষেত্রে তারা নিজেদের পিতামাতা থেকেও চার কদম সামনে অগ্রসর হয়ে যাবে। এমনকি কিছু কাল যেতে না যেতে আমাদের সমাজ জীবনেও ওই সমস্ত অভিশাপ আছাড় খেয়ে পড়বে, যার সংক্ষিপ্ত কাহিনী আমরা ইতিপূর্বে আপনাদেরকে শুনিয়ে এসেছি। এই জীবন মঞ্জিলে নারী-পুরুষ ঘটিত এমন সব বিপথগামীতা, নগ্নতা ও অশ্লিলতার তুফান আগমন করবে, এমুহূর্তে যার কল্পনাও হয়তো আমরা করতে পারবো না।

তাহলে কি করে একথা বলা যেতে পারে যে, ইউরোপ আমেরিকায় বিঘতে বিঘতে যে সব অভিশাপ বর্ষিত হচ্ছে, আমরা সেসব অভিশাপ থেকে নিরাপদ থাকবো? হ্যাঁ, এটা অবশ্য আলাদা কথা যে- ‘আপনারা এসব অভিশাপকেই আগা-গোড়া খায়ের বরকত (!) মনে করেন এবং এসব ‘খায়ের-বরকত’ দিয়ে এ দেশকেও সভ্য (!) বানাতে চান’! ব্যাপার যদি এরকমই হয়, তাহলে আল্লাহ’র ওয়াস্তে জাতিকে একথা বলে ধোঁকা দিবেন না যে, ‘ওসব পরিণতি এখানে সংঘটিত হবে না’। কেননা, আপনারা যদি এসব পরিণতিকেই খায়ের-বরকত মনে করে থাকেন, তাহলে আপনাদের জন্য ওসব স্থানই অধিক উপযোগী, যেখানে এসব খায়ের বরকত বর্ষিত হয়। এ দেশের দশ কোটি মুসলমান-তো এসব ব্যাপারকে নিজেদের জন্য অভিশাপ বলেই মনে করে। আর তারা যদি একথা জানতে পারে যে, আপনারা কোনো (বাজে) জিনিসকে ‘সুবিচার’ ও খায়ের-বরকত মনে করে তা এ দেশে চালু করতে চাচ্ছেন, তাহলে তাদের সকলেই হাত জোড় করে আপনাদের কাছে এই বলে নিবেদন জানাবে যে, আল্লাহ’র ওয়াস্তে-

احساں یہ کیجئے کہ یہ احساں نہ کیجئے
‘‘দয়া করে এ দয়াটুকু করতে যাবেন না’’।

অনিষ্টতা সমূহের সঠিক সমাধান

এখন প্রশ্ন জাগে, ‘একাধিক বিয়ে’ নিষিদ্ধ ঘোষনা করার পরও নারীদের সমস্যাগুলো-তো আগের মতই থেকে যাচ্ছে। আবার একাধিক বিয়ের রাস্তা খুলে দিলেও থাকছে -যেমনটা আজকাল ঘটছে। তাহলে এসব অন্যায়-অবিচারের আদৌ কোনো সমাধান আছে কি; নাকি নেই? এজন্য এবারে এ দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা মাসআলাটিকে খঁতিয়ে দেখবো।

এসব অন্যায়-অবিচার দূর করার সহিহ পন্থা –আমাদের মতে যে পন্থার বিদ্যমানতায় কোনো অযাচিত কিছু জন্মায় না এবং যার অনুপুস্থিতিতে কোনো ক্রমেই অন্যয়-অবিচার দূর হওয়া সম্ভবপর নয় -তা মাত্র দু’টি।

প্রথম পদক্ষেপ(৫)

ওগুলোর মধ্যে প্রথম বিষয়টি বিশাল এক ভিত্তিমূল এবং এর উপর আমল করা ছাড়া কেবল নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে জুলুম, অন্যায়-অবিচার ও অপরাধ থেকে বাঁচা সম্পূর্ণ অসম্ভব। আর সেটা হল, মানুষের অন্তরে আল্লাহ’র ভয় এবং আখেরাতের ফিকির সৃষ্টি করাতে হবে। তাদেরকে বিভিন্ন পন্থায় বারবার সাবধান করে দিয়ে তাদের অন্তকরনে একথা পোক্তভাবে বসিয়ে দিতে হবে যে, ‘‘তারা এ দুনিয়ায় অযথাই আগমন করেনি। বরং তাদের সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে একটি জিন্মাদারী একটি গুরুদায়িত্ব দিয়ে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তাদের জীবনের একটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য রয়েছে, যার ব্যাপারে তাদেরকে জীবনের প্রত্যেক শাখা-প্রশাখায় খেয়াল রেখে চলতে হবে। আল্লাহ তাদেরকে এজন্য হাত-পা দেননি যে, তারা এসবের মাধ্যমে অন্যদের উপর অন্যায়-অবিচার করে বেড়াবে’’।

একথাও পোক্তভাবে বসিয়ে দিতে হবে যে, ওই মহান শক্তিধর স্বত্তা যিনি তাদেরকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, তিনি তাদের প্রতিটি কথা ও কাজকে সর্বক্ষন দেখেন শুনেন। এরপর এমন একটি জবরদস্ত বিচারের দিন আসছে, যেদিন তাদেরকে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার দরবারে উপস্থিত হয়ে নিজেদের এক একটি কথা ও কাজের জবাব দিতে হবে, যে দিন জালেমের জুলুম ‘প্রজ্বলিত অগ্নিরূপ’ ধারন করে তাদের সামনে আগমন করবে এবং সেখানকার কঠিন আযাব থেকে বেঁচে পালানোর কোনো পথ পাওয়া যাবে না। ফলে যখনই সে কোনো কদম উঠাবে, তখন সর্বপ্রথম একথা চিন্তা করবে যে, আমার কাছে এ কাজের স্বপক্ষে বলার মত এমন কোনো জবাব আছে কি, যে জবাবটিকে কেয়ামতের দিন উপস্থাপন করে আমি ওই ভয়ানক আগুন থেকে বাঁচতে পারবো, যে আগুন- প্রত্যেক জালেমের জন্য -মুখ উন্মুক্ত করে বসে আছে ? এটাই ছিল সেই ভেদ, ইসলাম যেটাকে জন্মে দেয়ার উদ্দেশ্যে তার প্রত্যেকটি বিধানের পশ্চাতে আল্লাহ ও আখেরাতের বরহক্ব দৃশ্যকে মানুষের অন্তরে পোক্তভাবে বসিয়ে দিয়েছিল, যা রাতের আঁধারে এবং জঙ্গলের একাকিত্বে পর্যন্ত মানুষর প্রতিটি কথা ও কাজের পাহারাদারি করেছে।

ইসলাম তেমন বেশি বিধান বানায়নি আবার আইনানুগ পদরুদ্ধতাও আরোপ করেছে কম। সে ওই  বরহক্ব ও সত্য উপলব্ধিজ্ঞানের দ্বারা বেশি কাজ নিয়েছে, যা প্রত্যেক মু’মেন মাত্রই বুঝতে পারে, (যা দিয়ে সে সত্য-মিথ্যার মধ্যে) পার্থক্য করতে পারে। যেমন, নারীদের উপর অন্য়ো অবিচার দূর করার জন্য সে আইনানুগ পদরুদ্ধতা আরোপ করেছে কম, আর উপদেশ, নসিহত ও উৎসাহীতকরনের দ্বারা কাজ নিয়েছে বেশি। কেননা, তার সামনে এই হাক্বিকতটি উন্মেচিত ছিলযে, শুধুমাত্র আইনের জোরে কখনো অন্যায়-অবিচার দূর হতে পারে না; এমনটা না আগে কখনো হয়েছিল, না পরে হওয়ার কোনো অবকাশ আছে। আর যে-ই নিছক আইনের জোরে অপরাধ থামাতে চেয়েছে, সে সবসময়ই ব্যার্থ হয়েছে। যেমনঃ ইসলাম বিয়েকে জায়েয ও বৈধ বলে ঘোষনা করেছে ঠিকই, কিন্তু সাথে সাথে একথাও বলে দিয়েছে যে-

وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ

‘আর যারা বিয়ে করার সামর্থ রাখেনা, তাদের উচিৎ ওই পর্যন্ত সংযম অবলম্বন করা, যাবৎ না আল্লাহ তাঁর নিজ অনুগ্রহে তাদের ধ্বনী বানিয়ে দেন’। [সূরা নূর ৩৩]

অর্থাৎ কারও যদি এই আশংকা হয় যে, সে বিয়ের পর তার স্ত্রীর হক্বসমূহ আদায় করতে পারবে না, তাহলে তার কর্তব্য ওই পর্যন্ত ধৈর্যধারন করা, যাবৎ না সে এ ব্যাপারে সুনিশ্চিৎ হয়ে যায় যে, ‘আমি আমার স্ত্রীর হক্ব সমূহ আদায় করার সামর্থ রাখি’। কেউ যদি এর আগেই বিয়ে করে নেয় এবং স্ত্রীর সাথে অবিচার করে, তাহলে সে যেন স্মরন রাখে যে, দুনিয়া ও আখেরাত -উভয় জগতেই অন্যায়-অবিচারের বদলা নেয়া হবে।

এমনিভাবে অন্যদিকে একাধিক বিয়ের অনুমতিও দেয়া হয়েছে, তবে সাথে সাথে এও বলা হয়েছে যে-

فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا
 ‘পরন্তু (এতেও) যদি তোমরা আশংকাবোধ করো যে, তোমরা (দই,তিন, বা চার জন স্ত্রীর মাঝে) ন্যায়বিচার করতে পারবেনা, তাহলে একজন (-এর উপরই ক্ষ্যান্ত থাকো)’। [সূরা নিসা ৩] 

এ আয়াতেও আল্লাহ তাআলা পুরুষকে এই নির্দেশ দিয়েছেন যে, সে প্রথমে নিজে নিজে খতিয়ে দেখবে যে, ‘আমি দ্বিতীয় বিয়ে করার পর ইনসাফের সীমা-পরিসীমাগুলোকে রক্ষা করে চলতে পারবো কি-না? কেউ যদি এ বিষয়টি খতিয়ে না দেখেই বিয়ে করে বসে এবং বে-ইনসাফী করে, তাহলে তার জন্য দুনিয়া আখেরাত -উভয় জগতেই কঠিন শাস্তি রয়েছে।

কিন্তু যেমনিভাবে ইসলাম নারীর উপর অন্যায় অবিচার হতে পারে বলে একটি বিয়ে করাকে আইনত নাজেয়েয ও অবৈধ হিসেবে ঘোষনা দেয় নি -যদিওবা পুরুষ তার একমাত্র স্ত্রীর উপরও বিভিন্ন ভাবে অন্যায়-অবিচার করতে পারতো, তেমনিভাবে সে অন্যায় অবিচার ও বেইনসাফীর ভয়ে একাধিক বিয়েকেও আইনত নাজায়েয ও অবৈধ করে দেয়নি। বরং উভয় ক্ষেত্রেই সে প্রথমতঃ এই উপদেশ দান করেছে যে, যদি বেইনসাফী ও অন্য়ো-অবিচারের আশংকা থাকে, তাহলে একাজ (বিয়ে) করো না। কিন্তু যদি করে ফেলোই, তাহলে প্রত্যেক পদক্ষেপে একথা সামনে রেখো যে, সামান্য বেইনসাফী ও অন্যয়-অবিচার করা হলে দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতের শাস্তিই তুমি তোমার ঘাঁড়ের উপর নিয়ে নিলে। পার্থীব শাস্তির ক্ষেত্রে-তো এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, তুমি ধোঁকা- প্রতারনার আশ্রয়ে বেঁচে যাবে, কিন্তু পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার পর ওই শাস্তি থেকে বাঁচার কোনোই পথ নেই, যেখানে তোমাকে (উক্ত অপরাধে) লিপ্ত (প্রমাণ) করার জন্য খোদ তোমার ‘হাত-পা’ ই তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।

মোটকথা, ইসলাম চায় -মানুষের হৃদয়ে খোদাভীতি এবং আখেরাতের ফিকির অধিক থেকে অধিক পরিমানে জাগরুক করে দিয়ে- বিভিন্ন অপরাধ থেকে তাদেরকে বাঁধা দান করা হোক; নিছক অপরাধ ঘটার ভয়ে তাদের উপর ওই সমস্ত আইন-কানুন চাপিয়ে দেয়া না হোক, যা তাদের জন্য -শুধু যে কঠিন ‘জীবন আযাবে’ই পরিণত হবে- তা নয়, বরং এতে করে তাদের গোটা সমাজ জীবনে দূর্গন্ধের মহামারী ফুসলে বেড়িয়ে আসবে।

আক্ষেপ এই যে, গোনাহ ও অপরাধগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে আমরা মানুষের হৃদয়ে খোদাভীতি ও আখেরাতের সত্য উপলব্ধিজ্ঞানকে দৃঢ় ভাবে গেড়ে দেয়ার পরিবর্তে আজ এসব বুনিয়াদী বিষয়গুলোকেই ভুলে বসে আছি। এক্ষেত্রে আমরা যেসব পথ ও পন্থা অবলম্বন করছি, তার সবগুলো তা-ই, যার কারণে মানুষজন এই ধ্যানধারনা থেকেই গাফেল হয়ে যাবে। আমাদের রেডিও, আমাদের সংবাদ মাধ্যম, আমাদের ভাষন, আমাদের বই পুস্তক, আমাদের স্কুল-কলেজ এবং আমাদের হাসপাতালগুলো (ইসলামের) এই পবিত্র ধ্যানধারনার প্রচার প্রসার এবং এর প্রতি আহবান জানিয়ে জনগণকে অপরাধ ও অন্যায়-অবিচার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চালানোর পরিবর্তে উল্টো ওগুলোর সবই এই মনমানসিকতা থেকে মানুষজনকে গাফেল বানিয়ে দিচ্ছে। তদুপরি সিনেমা, থিয়েটার, নাইটক্লাব এবং পতিতালয়গুলো-তো আছেই, যেগুলোর মধ্যে পাপ ও অপরাধের জ্ঞানদান এবং অন্যায়-অবিচারের দিক্ষাদান ছাড়া আর কোনো কাজই হয় না।

এক্ষেত্রে যা করতে হবে, সেটা হল, প্রচার প্রসারের যাবতীয় বৈধ মাধ্যমগুলোকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে ধর্মীয় ও চরিত্রগত শিক্ষা ও দিক্ষা দান করতে হবে। তাদের মধ্যে আল্লাহ এবং আখেরাতের ওই বুনিয়াদী চিন্তাধারাকে দৃঢ়ভাবে বসিয়ে দিতে হবে, যেটা -অন্যায়-অবিচার করার চিন্তা আসা মাত্রই- তাদের শরীরের পশমকে দাঁড় করিয়ে দিবে।

আমি জানি, আমার এই বক্তব্যটিকে কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী জনাব ‘মোল্লা গোঁছের ওয়াজ’ বলে ছেঁচা দিবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি নির্বোধদের স্বর্গে বাস করে, কেবল মাত্র সে-ই আল্লাহভীতি এবং আখেরাতের ফিকিরকে বাদ দিয়ে আ্ইনের ভান্ডার জোরে অপরাধ থামানোর কল্পনা করতে পারে। রইলো ওই ব্যক্তির কথা, যে চোখ বন্ধ করে এক খেয়ালে বিল্ডিং বানানো ও চুনকাম করে যাওয়ার পরিবর্তে নিজের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা চিন্তা-ভাবনা করে এবং নিজের দু’চোখ দিয়ে নিজের চারপাশ সহ দুনিয়ার সব ঐতিহাসিক ব্যাপার স্যাপারের অবস্থা নিরিক্ষন করে দেখে; সে-তো এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য যে, খোদাভীতি ও আখেরাতের ফিকির জন্মানো ব্যতীরেকে অপরাধের গতিরোধ করা বিবেকগত ভাবেও যেমন অসম্ভব, তেমনি এ সম্পর্কে অভিজ্ঞতাও ‘আইনানুগ অকর্মন্যতা’র বিষয়টিকে প্রমাণ করে দিয়েছে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ

এসব-তো ছিল আমাদের সমাজ জীবনে প্রসার লাভ করা ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি ও অনিষ্টতাবলির একটি মৌলিক সমাধান, যার পরিসীমার ভিতরে নারীদের উপর অন্যায়-অবিচারের (সমাধান) বিষয়টি আপনা আপনিই এসে যায়। আমাদের দাবী হল, যদি একথার উপর যথার্থভাবে আমল করা যায়, তাহলে কিছু কাল যেতে না যেতে অপরাধ ও অন্যায় অবিচারের ঘটনাবলিতে এমন আশ্চর্য জনক কমতি সৃষ্টি হবে, সম্ভবতঃ তার কল্পনাও এমুহূর্তে করা যাবে না।

সংশোধন ও সমাধানের দ্বিতীয় যে পদক্ষেপটি নারীদের উপর থেকে অন্যায়-অবিচার দূর করার জন্য জরূরী, তা এই যে, আদালতী ব্যবস্থার মধ্যে মারাত্বক মারাত্বক যে ঘাটতিগুলো সৃষ্টি হয়ে আছে, সেগুলোকে দূর করতে হবে। ঘটনা ক্রমে এ কাজটি যদি বিলম্বত হয়-ই, তবুও কমপক্ষে এতটুকু-তো অবশ্যই করা যায়:-

(১) নারীদের জন্য স্বতন্ত্র ভ্রাম্যমান আদালত কায়েম করতে হবে।
(২) নারীদের জন্য ‘কোর্ট-ফিস’ মাফ করে দিতে হবে।
(৩) মুকাদ্দমাগুলোর বিচার যাতে দ্রুত সম্পন্ন করা হয় সেদিকে স্ববিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
(৪) ঘুষখোরদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

প্রথম প্রথম এ সমস্ত আদালতের উপর সীমাহীন জটিলতা অবশ্যই সৃষ্টি হবে। কিন্তু কিছুদিন পর আপনারা দেখতে পাবেন, মুকাদ্দমার সংখ্যা বে-হদ কমে গেছে। যদি এসব কথার সবগুলির উপরই ঠিক ঠিক ভাবে আমল করা হয়, তাহলে নারীদের উপর হাত বাড়ানোর সাহস কারোরই হবে না।

বহু বিবাহের রীতি-তো ইসলামের প্রাক কালেও ছিল; তখনও নারীদের উপর কৃত অন্যায় অবিচারের সুরাহা করা হত। সে জামানায় নিজের কোনো স্ত্রীর সাথে বে-ইনসাফী করার সাহস করেছে -এমন লোকের সংখ্যা কমই দেখা যেতো। কেননা, প্রথমত: তো আল্লাহ তাআলার ভয়ই তাদেরকে এরকম কাজ করা থেকে বিরত রাখতো, তদুপরি তাদের একথাও জানা ছিল যে, আমরা যদি সামান্য পরিমাণ বে-ইনসাফী করি, তাহলে স্ত্রীর জন্য সবোক্ষনই আদালতের রাস্তা উম্মুক্ত রয়েছে, যেখানে ফয়সালা পাওয়ার জন্য তাকে বেশি সময়ও অপেক্ষা করতে হবে না।

এটাই একমাত্র পথ, যার সাহায্যে নারীদেরকে তাদের উপর আপতিত অন্যায় অবিচার থেকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। অন্যথায় আপনারা ইতিপূর্বে দেখে এসেছেন যে, একাধিক বিয়ের উপর চাই যত পদশৃঙ্খলই এঁটে দেয়া হোক না কেনো, তাতে তাদের উপর অন্যায় অবিচারের মাত্রা বেড়েই যাবে বৈ কমবে না।

যদি আমাদের এসব নিবেদনমালার উপর আপনাদের কোনো রকম সংশয় থেকে থাকে, তাহলে যথার্থ অভিজ্ঞতা লাভের জন্য না হয় দু’এক বছর এর উপর আমল করেই দেখুন। এতে প্রত্যেক ব্যক্তিই খোলা চোখে ‘অপরাধ ও অন্যায় অবিচারে’র মাত্রায় সুস্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করতে পারবে এবং আমাদের যে সকল বোন আজ বোকামী করে একাধিক বিয়ের বিরুদ্ধে শোড় উঠাচ্ছেন, যদি নারীদের উপর থেকে অন্যায়-অবিচার দূর করাই তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে খোদ তাদেরকেই এর সংরক্ষনে সবথেকে বেশি উৎসাহী ও উৎগ্রীব দেখা যাবে।

কিন্তু ‘নারীদের উপর থেকে অন্যায়-অবিচার দূরীভূত করা’টা যদি নিছক একটি উচ্চবাচ্চ হয়ে থাকে, যার পশ্চাতে পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ-অনুসরনের আগ্রহ ছাড়া অন্য আর কিছু-ই কাজ করে না, তাহলে আল্লাহ’র ওয়াস্তে এই বেচারী নারীর ভুলটুকুন মাফ করে দিন। এই অসহায়িনী পূর্বকাল থেকেই অনেক দুঃখ-কষ্ট সয়ে আসছে। এখন তার মধ্যে আর বেশি ধোকা খাওয়ার মত শক্তি অবশিষ্ট নেই। আপনারা জাতিকে সোজাসোজি বলে দিন, ‘নারীদের কাছে আমাদের কোনো কামনা-বাসনা নেই। আমরা একাধিক বিয়েকে এজন্য নিষিদ্ধ করে দিতে চাচ্ছি যে, এ কাজটি আমাদের প্রিয় পশ্চিমায় হয়ে আসছে’, যাতে করে জাতির কাছে (এ নিয়ে) অত লম্বা চওড়া বহস করার প্রয়োজন না পড়ে এবং তারা যাতে একথা বলে আপনাদের থেকে পৃথক হয়ে যেতে পারে যে, দেশ গড়তে গিয়ে যে হাজার হাজার মুসলমান রক্ত ঝড়িয়ে ছিলেন, তারা এসব রক্ত এজন্য ঝড়াননি যে, এখানে বসবাস করে পশ্চিমাদের অন্ধ অনুসরনের আশা পূরণ করতে হবে। বরং তারা এজন্য এ মহান আত্বত্যাগ করেছিলেন, যাতে করে এখানে ইসলামের নিরাপদ ‘হায়াতে নেজাম’ চালু হতে পারে এবং এখানকার অধিবাসীরা- দুনিরয়ার শেষ সীমানা পর্যন্ত বিদ্যমান ওই সমস্ত ভয়াবহতা ও বরবরতার পশ্চাদ্ধাবন করে হটিয়ে দিতে পারে, যা ‘নব্য সভ্যতা’র চোখ ধাঁধাঁনো খোলস পরিধান করে মনুষ্যত্বের নাম নিশানা মিটিয়ে দিতে চায়।

 

 

এই আলোচনার বাকি অংশ পড়তে >>>  এখানে  ক্লিক করুন>>>

 

 

 


-:টিকা:- (বক্ষমান ওয়েব পেজের টিকা)

((টিকা-১)) বাংলাদেশ দণ্ড আইন দণ্ডবিধির ধারা নং ৩৭৫, ৩৬৫ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০  -এর সারনির্জাস হল –“একজন পুরুষ ১৬ বৎসরের বেশি বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে বলপূর্বক যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হলে সেটি ধর্ষণ, তথা উভয়ের সম্মতিক্রমে হলে তা ধর্ষণ নয়। আর নিজ বিবাহিত স্ত্রীর বয়স ১৩ বছরের কম হলে তার সঙ্গে যে কোনো ধরনের যৌনসঙ্গমও ধর্ষণ”। মানে, ১৬ বছরের বেশি বয়স এমন যে কোনো যুবতী মেয়ে বা মহিলার সম্মতি থাকলে  তার সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া আইনত: সম্পূর্ণ  বৈধ (হালাল), আর শরীয়ত সম্মত পন্থায় কম বয়সের বিয়ে আইনতঃ নিষিদ্ধ (হারাম), আর যদি ১৩ বছরের কম বয়সী স্ত্রীর সাথে নিজের স্বামীও যৌনমিলন করে, তাহলে সেটাও দেশের আইন মতে ধর্ষন (গোনাহ) !!! দেখা যাচ্ছে, এক দিকে বিয়ের রাস্তা বন্ধ, অন্য দিকে যৌনাচারের রাস্তা খোলা !!!-বাহ ! আমাদের উপর যে পাথর বর্ষন হচ্ছে না, বা জমিন যে আমাদেরকে গিলে খাচ্ছে না -এটা আল্লাহ’র দয়া ছাড়া কিছুই না। -(অনুবাদক)

((টিকা-২)) এই হাদিসটি হযরত আনাস বিন মালেক রা.-এর সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। দেখুন: সুনানে ইবনে মাজাহ ২২০১; মুসতাদরাকে হাকিম- ৩/৫৭; মুসনাদে আহমাদ ১১৯৪৬; মুসনাদে বাযযার ২৫১৪; সুনানে নাসায়ী ৬৮২৯; মুসনাদে আবু ইয়ালা ২৯৫৩; মুসনাদে আব্দ বিন হুমায়েদ ১২২২; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী ৮০৪৭; মুশকিলুল আছার, তাহাবী ২৭০৭; আত-ত্ববাকাত, ইবনে সা’দ- ২/৩৭৬ ইত্যাদি। -(অনুবাদক)

((টিকা-৩)) এই বর্ণনাটি মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী’র কিতাব ‘আয়েলী কমিশন রিপোর্ট পর তাবসিরাহ’ থেকে সংগৃহীত। -(লেখক) 

((টিকা-৪)) জেনে রাখা দরকার যে, আমরা এখানে ‘না-জায়েয’ শব্দটি শরয়ী পরিভাষা মোতাবেক ব্যাবহার করেছি। অন্যথায় (দেশীয়) আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে তা ‘না-জায়েয’ হওয়া জরুরী নয়। -(ত্বকী উসমানী)

((টিকা-৫)) শুধু অধিন-শিরনামটি আমি পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে জুড়ে দিয়েছি। -(অনুবাদক)

 

 

 


মুফতী মুহাম্মাদ তাক্বী উসমানী দা:বা: লিখিত ‘মুসলমি পারিবারিক আইন’ বিষয়ক আলোচনা পড়তে নিম্নে ক্লিক করুন।

# ইসলামী শরীয়ত বনাম আইয়ূব খানের মুসলিম পারিবারিক আইন