বাল্যবিবাহ ও বিয়ের বয়স : ইসলামী শরীয়তে বনাম আইয়ূব খানের আইন আইন

Spread the love
image_pdfimage_print

ইসলামী শরীয়তে বাল্যবিবাহ ও বিয়ের বয়স বনাম আইয়ূব খানের পাশ করা আইন 

[লেখক: শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাক্বী উসমানী দা:বা:]

ইসলামী শরীয়তে বাল্যবিবাহ শিশু বিয়েবিয়ের বয়স

এ দফায়(১) বলা হয়েছে যে, ১৮ বৎসরের কম বয়ষ্ক কোনো ছেলে এবং ১৬ বৎসরের কম বয়ষ্ক কোনো মেয়ে’র বিয়ে -আইনতঃ নিষিদ্ধ।

দফাটির উদ্দেশ্য সম্ভবতঃ ওইসমস্ত অনিষ্টতাগুলোকে দূর করা, যা সাধারনতঃ কম বয়সে সম্পাদিত বিয়েগুলোর কারণে জন্ম লাভ করে থাকে। এই উদ্দেশ্যের শুদ্ধতা ও উপকরিতাসমূহের ব্যাপারে বললে বলতে হয়, তা নিঃসন্দেহে স্বস্থানে গ্রহনযোগ্য। আমরা এ ব্যপারে সামনে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করবো। কিন্তু এটা এসব অনিষ্টতার সঠিক সমাধান নয় যে, কম বয়সের বিয়েগুলোকে গোড়া থেকেই নিষিদ্ধ বলে অবিহিত করে দেয়া হবে। কেননা, একজন ব্যক্তি অনেক সময় বিভিন্ন কারণে তার কম বয়সী ছেলে-মেয়েকে দ্রুত বিয়ে করিয়ে দিতে বাধ্য হয়ে যায়। (যে যে কারণে বাধ্য হতে হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে। -লেখক) এই মুসলেহাতের দিকে দৃষ্টি দিয়ে ইসলামী শরীয়ত কম বয়সের বিয়েকে যেমন নিষিদ্ধ গণ্য করেনি, তেমনি এর উপর বেশি গুরুত্বও দেয়নি।

কম বয়সের বিবাহ জায়েয ও বৈধ হবার ব্যপারটি পবিত্র কুরআনের নিম্নক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত-

وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ

“আর তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ‘হায়েয’ হতে বিরাশ হয়ে গেছে, তোমাদের যদি সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে তাদের ইদ্দতকাল হল তিন মাস। আর এই ইদ্দতকাল ওইসকল মেয়েদের জন্যেও, যাদের (এখনও) হায়েয আসেনি[সূরা তালাক ৪]

এই আয়াতে (প্রাপ্তবয়ষ্কা নারীদের পাশাপাশি) ওইসকল মেয়েদের ‘ইদ্দত’ সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যাদের এখনও পর্যন্ত হায়েয আসেনি। বলাবাহুল্য, ইদ্দতের প্রশ্নই তো আসে তখন, যেক্ষেত্রে প্রথমে বিয়ে, রুখসতী এবং তালাক সংঘটিত হয়ে যায়। এ থেকে বোঝা গেল, কুরআন কারিমের দৃষ্টিতে বালেগ/বালেগা ( তথা প্রাপ্ত বয়ষ্ক ছেলে / প্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ে) হবার আগেও বিয়ে সম্পাদিত হতে পারে এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে তা গ্রহনযোগ্য। অথচ এর বিপরীতে অর্ডিনেন্সের উপরোক্ত দফাটি প্রাপ্ত-বয়সের (ছেলে-মেয়ের বিয়েকেই) শুধু নয়, বরং প্রাপ্ত বয়সের ৩-৪ বৎসর পরের সম্পাদিত বিয়েকেও গ্রহনযোগ্য বলে মনে করে না!

হাদীসে বাল্যবিবাহ সম্পর্কিত ঘটনাবলী

আর এ কারণেই নববী-যুগে কম বয়সে সম্পাদিত বিয়ের বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে।

(১) খোদ রাসুলুল্লাহ  হযরত আয়েশা রা.-কে বিয়ে করেছিলেন ওই সময়ে, যখন হযরত আয়েশার বয়স ছিল কতক বর্ণনা মতে ৮ কিংবা ৯ বছর। [সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮৯৪ ; সহীহ মুসলীম, হাদীস ১৪২২]

(২) ইমাম আবু বকর জাসসাস রাযী রহ. (মৃ: ৩৭০ হি:) ‘আহকামুল কুরআন’-এ হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ হযরত উম্মে সালামাহ’র পুত্র হযরত সালামাহ’কে হযরত হামযা’র ছোট্ট মেয়ের সাথে খুব কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন। বর্ণনাটি এই- فزوجه رسول الله  بنت حمزة و هما صبيان صغيران فلم يجتمعا حتى ماتا الخ – ‘‘রাসুলুল্লাহ হযরত হামযা’র মেয়ের সাথে তার (তথা হযরত সালামাহ’র) বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন। তখন তারা দুজনেই ছিল ছোট্ট বাচ্চা। পরে তারা দুজনে একত্রিত হতে পারেন নি, এমন কি দুজনই (শিশু বয়সে) মাড়া যান। [আহকামুল কুরআন, ইমাম জাসসাস- ২/৬২]

উপরোক্ত বর্ণনায় আপনারা দেখতে পেলেন যে, রাসুলুল্লাহ নিজেই হযরত সালামাহ রা. এবং বিনতে হামযা রা.-এর বিয়ে তাদের অপ্রাপ্ত বয়সে করিয়ে দিয়েছিলেন।

উম্মাহ’র ইজমা

এজন্য আজ পর্যন্ত গোটা মসলীম উম্মাহ এ ব্যপারে একমত যে, কম বয়সের বিয়ে জায়েয ও বৈধ। যেমন: ইমাম আবু বকর জাসসাস রাযী রহ. এক আয়াতের অধীনে লিখেছেন- وفي هذه الآية دلالة أيضا على أن للأب تزويج ابنته الصغيرة من حيث دلت على جواز تزويج سائر الأولياء إذ كان هو أقرب الأولياء ولا نعلم في جواز ذلك خلافا بين السلف والخلف من فقهاء الأمصار – (উপরে উল্লেখীত) এই আয়াত থেকে একথাও প্রমাণিত হয় যে, পিতার জন্য তার (নাবালেগ/অপ্রাপ্ত বয়স্ক) ছোট ছেলের বিয়ে করিয়ে দেয়ার এখতিয়ার রয়েছে। বিধায় উক্ত আয়াত থেকে (সন্তানের অপরাপর) সকল অবিভাবক কর্তৃক বিয়ে করিয়ে দেয়ার বৈধতাও প্রমাণিত হয়। আর অবিভাবকদের মধ্যে (সন্তানের) পিতাই সর্বাধিক নিকটবর্তী (আত্বীয়, সুতরাং এব্যপারে তারই হক্ব সর্বাগ্রে)। পূর্বের ও পরের জামানার (আহলে হক্ব) ফিকাহবীদ আলেমের মধ্যে এমন কারো কথা আমরা জানি না, যিনি এর বৈধতার বিপরীত কোনো কথা বলেছেন। [আহকামুল কুরআন, জাসসাস ২/৬৪]

(২)ইমাম ইবনে আব্দিল বার রহ. (মৃ: ৪২৩ হি:) লিখেছেন- أجمع العلماء على أن للأب أن يزوج ابنته الصغيرة ولا يشاورها ، لتزويج رسول الله صلى الله عليه وسلم عائشة وهي بنت ست سنين …انتهى  – এব্যাপারে আলেমগণের ইজমা রয়েছে যে, পিতা তার নাবালেগ বাচ্চার সাথে পরামর্শ না করেও তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে পারেন। কারণ,  রাসুলুল্লাহ হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেছিলেন যখন তার বয়স ছিল ছয় বছর। [আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ১৯/৯৪]

ইমাম মালেক রহ. (মৃ: ১৭৯ হি:) বলেছেন- وإنكاح الأب جائز على الصغار من ولده ، ذكراً كان أو أنثى – পিতার জন্য তার কোনো নাবালেগ বাচ্চার বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয -চাই বাচ্চাটি ছেলে হোক বা মেয়ে। [আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ১৯/৯৮]

ইমাম ইসমাঈল বিন ইসহাক রহ. বলেছেন- والأب له أن يزوج الصغيرة بإجماع من المسلمين – এব্যাপারে মুসলীম উম্মাহ’র ইজমা রয়েছে যে, পিতার জন্য তার নাবালেগ বাচ্চার বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয।  [আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ১৯/৮৪]

ইমাম ইবনুল মুনযীর নিশাপুরী রহ. (মৃ: ৩১৮ হি:) বলেছেন-  أجمع كل من نحفظ عنه من أهل العلم أن نكاح الأب ابنته الصغيرة جائز إذا زوجها من كفء – এব্যাপারে আহলে হক্ব আলেমগণের ইজমা রয়েছে যে, পিতার জন্য তার নাবালেগ বাচ্চার বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয – যদি তিনি কুফু’র সাথে তার বিয়ে দেন। [আত-তামহীদ, ইবনুল বার- ১৯/৮৪; আল-মুগনী, ইবনে কুদামা- ৯/৩৯৮]

ইমাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. (মৃ: ৮৫২ হি:) ইবনুল বাত্তাল রহ.-এর মত উল্লেখ করেছেন- يجوز تزويج الصغيرة بالكبير إجماعاً ، ولو كانت في المهد – (আহলে হক্ব আলেমগণের) সকলের মতে বালেগ ছেলের সাথে নাবালেগা মেয়ের বিয়ে দেয়া জায়েয – এমনকি যদিও সেই মেয়ে অতীব ছোটই হোক না কেনো [ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৯/১২৩]

ইমাম ইবনে হাযাম রহ. (মৃ: ৪৫৬ হি:) লিখেছেন- الحجة في إجازة إنكاح الأب ابنته الصغيرة البكر ، إنكاح أبي بكر رضي الله عنه النبي صلى الله عليه وسلم من عائشة رضي الله عنها وهي بنت ست سنين – পিতার জন্য তার নারালেগা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়া জায়েয হওয়ার দলিল হল, হযরত আবু বকর রা. (তাঁর নাবালেগা মেয়ে) হযরত আয়েশাকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন যখন হযরত আয়েশা ছিলেন ছয় বয়সের এক মেয়ে [আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযাম- ৯/৪৫৮]

ইসলামের এই বিধানের নেপথ্যে অনস্বীকার্য হিকমতসমূহ

আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে এ আলোচনাও আনবো যে, কম বয়সের বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে যেসকল ফেতনা-ফাসাদ ও অনিষ্টতা জন্ম লাভ করে, ওগুলোর সঠিক সমাধান কী? তবে  এখন আমরা ওইসকল ক্ষতিসমূহে’র একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা পেশ করতে চাই, যা কম বয়সের বিয়েগুলোকে নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলশ্রুতিতে জন্ম লাভ করবে। এসব ক্ষতিগুলোকে চোখের সামনে রাখলে এ কথা ভাল করেই বুঝে আসবে যে, ইসলাম কেনো কম-বয়সের বিয়ে-শাদীগুলোকে নিষিদ্ধ বলে অবিহিত করেনি।

(১) এক ব্যক্তি দেখতে পাচ্ছে যে, তার ছেলে বা মেয়ে স্বভাব-চরিত্রের দিক দিয়ে বেশ বিগড়ে যাচ্ছে এবং তাকে যদি শিঘ্রই বিয়ে দিয়ে দেয়া না হয়, তাহলে তাদেরকে সামলানো মুশকিল হয়ে যাবে। বর্তমানে তার সামনে একটি উপযুক্ত রাস্তাও বিদ্যমান রয়েছে। এমতাবস্থায়, এই পরিস্থিতির দাবী হল তার সন্তানকে জলদি জলদি বিয়ে করিয়ে দেয়া। কিন্তু তিনি আপনাদের (বানানো জবরদস্তিমূলক) আইনের কারণে -যে পর্যন্ত ছেলে ১৮ বৎসর বয়সে উপনীত না হবে, সে পর্যন্ত তাকে বিয়ে না করাতে তিনি বাধ্য। তিনি তার ছেলে বা মেয়ের ধ্বংন্মুখ অবস্থার প্রতি চেয়ে চেয়ে থেকে মনযন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকবেন, কিন্তু এর কোনো সমাধান তার কাছে নেই !

(২) এক ব্যক্তির অবস্থা এই যে, তিনি রোগ-ব্যাধির কারণে বেশি দিন বেঁচে থাকার অাশা করতে পারছেন না। তার ১৫ বছরের একটি মেয়েও আছে। (তার সামনে বাস্তবতা হল), হয় তার অন্য কোনো ওয়ারীছ (উত্তরাধীকার) নেই, অথবা ওয়ারীছ থাকলেও তার প্রতি ভরসা নেই যে, সে তার মেয়েটির সাথে কোনো সদাচরণ বা সদ্ব্যবহার প্রদর্শন করবে। এমতাবস্থায় তিনি চাচ্ছেন যে, তার মেয়ের হাতকে কোনো শরীফ ও ভদ্র ছেলের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্তে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আপনার আইনের কারণে সেই মেয়েটিকে ‘লা-ওয়ারীছ’ এবং অসহায় অবস্থায় রেখে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আর মেয়েটি তার পিতার মৃত্যুর পর এক দরজা থেকে আরেক দরজায় ঠোঁকড় খেয়ে খেয়ে বেড়াবে, আর স্বার্থপর লোকদের কামনা-বাসনার শিকার হবে।

(৩) এক ব্যক্তির অবস্থা এই যে, তার কোনো ওয়ারীছ নেই। তার একটা প্রাপ্ত বয়ষ্কা অথবা অপ্রাপ্ত বয়ষ্কা মেয়ে আছে। এখন তার জন্য খোদ তার নিজ পেট পালা এবং স্বীয় ইজ্জত আব্রুর হিফাজত করাটাই সাতন্ত্র একটি সমস্যা, সেখানে নিজের সাথে আরও একটি মেয়ের (ভরন-পোষনের) চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় তার জন্য মেয়েকে নিজের কাছে রাখাটা জীবন জীবিকাগত একটি সমস্যাও বটে। তদুপরি এই ঝুঁকিও আছে যে, তিনি যদি তাকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে না দেন, তাহলে হতে পারে সে কোনো গুন্ডা (বখাটের) হাতে পড়ে যাবে। এখন আপনিই বলুন, মেয়েকে কোনো ভাল মানুষের কাছে সোপর্দ করে দেয়া ছাড়া তার আর কোন রাস্তাটা আছে? কিন্তু তিনি তা করতে পারছেন না। কারণ, আপনার আইনে সে এখনও বিয়ের উপযুক্তই নয়!

(৪) একজন গ্রাম্য কৃষকের এই অবস্থা যে, তার এক যুবতী মেয়ে আছে। তিনি রাত-দিন লক্ষ্য করছেন যে, তার (জমির) মালিক ও কর্মচারীরা তাদের বদস্বভাবের কারণে মেয়ে মানুষদেরকে তাদের কানমা-বাসনার শিকারে পরিণত করে থাকে। তিনি দুঃশ্চিন্তায় আছেন যে, আমি যদি আমার মেয়েকে আমার কাছে বেশি দিন রাখি, তাহলে তাকে রক্ষা করতে পারবো না। এজন্য তিনি তাকে দ্রুত কোথাও বিয়ে করিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু অন্য দিকে তিনি যখন আপনার আইনের দিকে তাকান, তখন হাত গুটিয়ে বসে পড়েন এবং অপারগতার অশ্রু বহানো ছাড়া তিনি আর কিছুই করতে পারেন না। 

গ্রামাঞ্চলের বাল্যবিবাহ গুলোর সবচেয়ে বড় কারণ ছিল এটাই। আর কৃষকশ্রেণির মানুষরা এভাবেই নিজেদের মানইজ্জতের হিফাজত করতো। অন্যথায় এটা ঢেকে-চেঁপে রাখার কোনো বিষয় নয় যে, বর্গাচাষীদের ইজ্জত-আব্রু সর্বদাই জমির মালিকদের মানবীয় দুশমনীর ঝুঁকিতে থেকেছে। এখন (আপনাদের বানানো) এই আইনের পর তিনি নিজকে অসহায় অনুভব করবেন।

এই পরিস্থিতিগুলো নিছক অনুমানসর্বস্ব্য নয়, যা আমরা চোখ বন্ধ করে ঘরে নিয়ে এসেছি। বরং এই ঘটনাবহুল দুনিয়ায় চোখ রাখলে আপনি এমন বহু মানুষ পাবেন, যাদের জন্য (আপনাদের) এ আইনটি একটি আযাবে পরিণত হবে এবং তারা নিজেদেরকে ভিষন অসহায় ও মজলুম মনে করতে থাকবে।

(৫) এসব সমস্যার অবধারিত ফলাফল এই যে, আমাদের জাতীর স্বভাব চরিত্রের অধ্ব:পতনের ঢেউ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকবে এবং কম বয়সের অপরাধগুলো এতই বেড়ে যাবে যে, তা জাতীর জন্য সীমাহীন ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হবে, ব্যাভিচার ও কুপথে(৩) গমনের ঘটনা বেড়ে যাবে, এবং সকলেই দেখতে পাবে যে, বিয়ের উপর পদশৃঙ্খল লাগিয়ে দেয়া এবং ব্যভিচারের পথ উম্মুক্ত-সুগম করে দেয়ার পরিণতিটা কী?

(৬) তাছাড়া এই আইনের কারণে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ‘জন্ম তারিখ নথিভুক্তকরণ (Birth Registration)’ অপরিহার্য হয়ে যাবে। আর এ বিষয়টি বিশেষভাবে গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারীদের জন্য শক্ত পদশৃঙ্খলে পরিণত হবে, যার ফলশ্রুতিতে হয়-তো তারা মিথ্যা সাক্ষী আনতে বাধ্য হবে, নতুবা নিজেদের বয়সকে বিবাহযোগ্য প্রমাণ করার জন্য তাদের অন্য আরও মিথ্যা কথা বলতে হবে।

(৭) এমনিভাবে এই আইনের কারণে বহু ফেতনাবাজ লোকের বদকাজ ও অপরাধ করার মওকা মিলবে এবং বহু শরীফ ও ভদ্রঘরের মানুষজন চুড়ান্ত বেইজ্জতি ও বদনামের শিকার হবে। মনে করুন, এক ব্যাক্তির বিবাহ হচ্ছে, এদিকে ওই এলাকার বিবাহ-রেজিস্ট্রেশনকারীর সাথে ওই ব্যাক্তির কোনো শত্রুতা আছে। সে এখন ওই শত্রতার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য একদম বিয়ের মুহূর্তে এই আপত্তি উঠিয়ে দিবে যে, (দেশের আইন অনুসারে) ছেলে বা মেয়ের বয়স এখনও বিয়ের করার উপযুক্ত হয় নি। এই আপত্তির কারণে সেই ব্যাক্তি আগত অতিথিদেরকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়ে যাবে এবং এ পর্যন্ত সে যত টাকা খরচ করেছে, তা বরবাদ হয়ে যাবে। তদুপরি সে যতক্ষন পর্যন্ত মেডিকেল ইন্সপেকশন (Medical Inspection)- এর মাধ্যমে একথা প্রমাণ করে না দিবে যে, আমার বা আমার হনেওয়ালা স্ত্রীর বয়স বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে, ততক্ষন পর্যন্ত সে বিয়ে করতে পারবে না।

এসব কথাও নিছক কোনো অনুমান নির্ভর কথা নয়। পারিবারিক আইন কার্যকর হওয়ার এই মাত্র কিছু দিন হল। আর এরই মধ্যে পাঞ্জাব প্রদেশের কিছু এলাকায় এজাতীয় ঘটনা ঘটার খবর পাওয়া গেছে।

মোটকথা, বাল্যবিবাহ ’কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দেয়ার পর উপরোক্ত এসব ক্ষতি নিশ্চিৎভাবে সংঘটিত হবে, যা (পরে) আয়ত্বে আনা মারাত্মক জটিল হয়ে দাঁড়াবে।

অনিষ্টতার সহিহ সমাধান

অবশ্য এ কথা ঠিক যে, কম বয়সে বিয়ে করার ব্যপারে ইসলাম কোথায়ও উৎসাহ প্রদান করেনি। কারণ, কখনো কখনো এ জাতীয় বিয়ের ফলে বহু অনিষ্টতা মাথাচাড়া নিয়ে ওঠে। বাস, শুধু এতটুকু বিধান লাগিয়ে দিয়েছে যে, যদি কারও কম বয়সে বিয়ে করা বা করানোর প্রয়োজন অনুভূত হয়, তাহলে সে তা করে নিতে পারে। এখন এই অনুমতির কারণে যেসকল অনিষ্টতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সম্ভাবনা থেকে যায়, সেগুলো হল: নব্য বয়সে একথা অনুমান কর যায় না যে, স্বামী-স্ত্রী’র স্বভাব-প্রকৃতি একে অপরের সাথে মিল হবে কিনা, সামনে অগ্রসর হয়ে দু’জনের মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে কিনা। এজন্য বেশিরভগ ক্ষেত্রে এমনটা হয়ে থাকে যে, কম বয়সে বিয়ে করিয়ে দেয়া হয়, পরে দু’জনের মাঝে বনিবনা হয় না। ফলত: দু’জনের জন্যই জীবনটা একটা আযাবে পরিণত হয়ে যায়। বিশেষ করে মেয়ে মানুষ-তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়ই মুসিবতে ফেঁসে যায়। কারণ, ছেলে’র ‘তালাক’ দানের এখতিয়ারও থাকে, মেয়ের সেই এখতিয়ার থাকে না। তাছাড়া কম বয়সের কারণে ছেলে নিজে কামাই-রোজগার করার উপযোগীও থাকেনা। সুতরাং, তার উপর কি করে আরও একজনের বোঝা চাঁপানো যায়? একারণে, বিয়ের পর সে তার স্ত্রীর যাবতীয় অধীকার আদায় করার ব্যপারে নাদান থাকে এবং এর ফলে বহু ধরনের অনিষ্টতা জন্ম নেয়।

এগুলোর মধ্যে পয়লা অনিষ্টতার সমাধান কল্পে ইসলামী শরীয়ত خيار بلوغ (খিয়ারে বুলুগ)-এর বিধান দিয়েছে, যার অর্থ হল, (নাবালেগ/নাবালেগা বয়সে বিয়ের পর) যখন ছেলে এবং মেয়ে বালেগ/বালেগা হয়ে যাবে, তখন তারা যদি মুখে একথা বলে দেয় যে- ‘আমরা এ বিয়েতে সম্মত নই’ তাহলেই (নাবালেগ বয়সে তাদের কৃত) ঐ বিয়ে (শরয়ী দৃষ্টিতে) ছিন্ন হয়ে যাবে। এই বিধান সম্পর্কিত বিস্তারিত বর্ণনা ফিকাহ’র কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে। 

আজকাল স্বল্প বয়সের বিয়েগুলো থেকে যেসকল অনিষ্টতা জন্ম লাভ করে, সেগুলোর বড় কারণ এই যে, জনগণ ইসলামী তা’লীম ও শিক্ষা-দিক্ষা থেকে একেবারেই অজ্ঞ। তারা জানেই না যে, শরীয়ত তাদের জন্য কতটা সহজতা রেখেছে ! জনগনকে যদি এসকল ইসলামী বিধিবিধান সম্পর্কে (সহিহ) ইলম দান করা যায়, যার পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা ইতিপূর্বে বার বার আরোজ করে এসেছি, তাহলে এসব জটিলতার সমস্ত সমাধানই বেড়িয়ে আসবে।

থাকলো দ্বিতীয় অনিষ্ঠতার বিষয়টি। কম বয়সের বিয়েটি যদি প্রয়োজন বসতঃই করা হয়ে থাকে, তাহলে এই অনিষ্টতাটি ওইসকল অনিষ্টতার চেয়ে কয়েক গুণ ভাল, যা বিয়ে না দেয়া অবস্থায় জন্ম লাভ করে। আর বিয়েটি যদি কোনো প্রয়োজন ছাড়াই করিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে (শরীয়তে বাল্য) বিয়ের অনুমতি থাকাটাই এই দ্বিতীয় প্রকার অনিষ্টতার (নেপথ্য মূল) কারণ নয়; (মূল কারণ হল) বিয়েকারীর অজ্ঞতা ও বেউকুফি। সুতরাং এর সমাধান এছাড়া আর কিছুই নয় যে, ইসলামী তা’লীম ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যপকতা দান করতে হবে। অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয়, যেখানে যেখানে ইসলামী তা’লীমের আলো গিয়ে পৌছেছে, সেখানে কম বয়সের অপ্রয়োজনীয় বিয়ে-শাদীর বিষয়টি গড়ে এক শতাংশও অবশিষ্ট থাকে নি। স্বয়ং নিজের দেশের প্রতিই লক্ষ্য করুন। শহর এবং যে সকল লোকালয় ইসলামী তা’লীমপ্রাপ্ত, সেখানে কম বয়সে বিয়ে করার প্রবনতা একেবারেই পাওয়া যায় না। এটাে এজন্য হয়েছে যে, (ইসলামী শিক্ষা ও) তা’লীমের কারণে তারা একথা জানে যে, অপ্রয়োজনে কম বয়সে বিয়ে করলে সেটা হবে একটা আহাম্মকী কাজ, যার ফলাফল খুবই খারাপ হবে। কম বয়সের বিয়ে-শাদীর ঘটনা বেশি পাওয়া যায় গ্রামাঞ্চলে এবং ইসলামী তা’লীমবিহীন লোকালয়ে। এদের মধ্যে কেউ কেউ-তো তারাই, যাদের কদাচই বিয়ের প্রয়োজন হয়। আর কেউ কেউ হয় তারা, যারা অপ্রয়েজনে একাজ করে ফেলে। যদি এদের মাঝে ইসলামী তা’লীম ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে তাদের এই আহাম্মকীপূর্ণ কাজের উপর জেদ ধরার কোনোই কারণ থাকবে না। এসব ছাড়াও আরও বহু অনিষ্টতা এমনও আছে, যা শুধুমাত্র (দ্বীনী ইলমের ব্যাপারে) অজ্ঞতার কারণে জন্ম লাভ করে থাকে। আইনের লাঠি ঘুরানোটাই সব কিছুর সমাধান নয়। বরং বহু জিনিসের জন্য বুঝানো সমঝানো এবং তা’লীম তরবিয়তের পন্থা অবলম্বন করাটাই উপকারী হয়ে থাকে। আলোচ্য বিষয়টিও এরকমই।

এ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, কমবয়সের বিয়েগুলো থেকে যেসকল অনিষ্ঠতা জন্ম লাভ করে, তার সঠিক সমাধান এটা নয় যে, এ কাজকে গোড়া থেকেই নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দেয়া হবে। কেননা, এতে করে আরও বহু অনিষ্ঠতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে; ফলে গমের সাথে ঘুনাও চলে আসবে। বরং এর সহিহ সমাধান হল, ইসলামী তা’লীমকে(৪) ব্যপক আকার দান করতে হবে। বিশেষ করে ইসলামের সহিহ ও বিশুদ্ধ ‘পারিবারিক-বিধিবিধান’কে ব্যপক আকারে প্রচার প্রসার করতে হবে, যাতে করে বাচ্চারা পর্যন্ত ওই সমস্ত ‘সহজতামূলক’ বিষয়গুলোর ইলম অর্জন করতে পারে, যা শরীয়ত তাদেরকে দিয়েছে, এবং তারা যেন সেগুলো কে (পরবর্তীতে বাস্তবজীবনে) ব্যবহারে আনতে পারে। কেউ যদি তার অজ্ঞতা ও আহম্মকির কারণে কোনো আইনের সহজতার দিকটিকে প্রয়োগ না করে, তাহলে সেই আইনটিই সংশোধন যোগ্য হয়ে যায় না, বরং খোদ ওই ব্যক্তিই সংশোধনের যোগ্য হয়ে যায় যে উক্ত সহজতার দ্বারা কাজ নিতে চায় না।

সন্দেহ-সংশয় ও ভুল ধারনা

এবারে আমরা ওই সমস্ত দলিলগুলোকে খতিয়ে দেখবো, যা আলোচ্য আইনের সমর্থনে (কারো কারো দ্বারা) পেশ করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো জনাব কুরআনের একটি আয়াত দিয়ে দলিল দেয়ার চেষ্টা করে বলেছেন যে, কুরআন কারিম بلوغ (বালেগ/বালেগা হওয়া) কে বিয়ের বয়স হিসেবে গণ্য করেছে। সূরা নিসায় বলা হয়েছে-

وَابْتَلُوا الْيَتَامَىٰ حَتَّىٰ إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ فَإِنْ آنَسْتُم مِّنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ

‘‘ আর তোমরা এতীমদেরকে পরীক্ষা করে দেখতে থাকো, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা নিকাহ’র বয়সে গিয়ে উপনীত হয়। অত:পর তোমরা যদি তাদের মধ্যে বিচার যোগ্যতা অনুভব করতে পারে, তাহরে তাদের ধনসম্পদগুলোকে তাদের কাছেই সোপর্দ করে দাও। [সূরা নিসা ৬]

উপরোক্ত আয়াতে এতীমদের অবিভাবকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে, তোমরা তোমাদের তত্ত্বাবধায়নে থাকা এতীমদের কাছে তাদের ধনসম্পদ গুলোকে সোর্পদ করে দিবে তখন, যখন তারা نكاح (নিকাহ)-র বয়সে গিয়ে উপনীত হবে এবং সাথে সাথে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ মাত্রায় বুঝজ্ঞানও জন্মাবে। (তাদের মতে) কুরআনে কারিম এখানে (নাকি কারো) ‘বালেগ/বালেগা’ হওয়াকে بلوغ النكاح (বুলুগুন-নিকাহ) বলে অবিহিত করেছে, যা থেকে (নাকি) একথা বেড় হয় যে, কুরআনের দৃষ্টিতে বিয়ে’র একটি বয়স নির্ধারিত আছে, আর সেটা হল বালেগ/বালেগা হওয়া।’

কিন্তু এ জাতীয় দলিল দান নিম্নবর্ণিত দলিলসমূহের কারণে নিতান্তই দূর্বল। কেননা, আয়াতে نكاح (নিকাহ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এ শব্দটি আরবী অভিধান এবং আরবদের কথ্যে দু’টি অর্থ প্রকাশ করে।

نكاح (নিকাহ)-র আভিধানীক অর্থ

(نكاح /নিকাহ)-এর প্রকৃত অর্থ হল مباشرت (মুবাশারাত/যৌন সঙ্গম)। পরবর্তীতে এটি عقد نكاح (আকদে নিকাহ/বিয়ের আকদ) অর্থেও ব্যবহৃত হতে থাকে।

আরবী অবিধানের বিখ্যাত ও বরেন্য সুপন্ডিত ইমাম আল্লামা আযহারী রহ. বলেছেন – قال الأَزهري: أَصل النكاح في كلام العرب الوطء، وقيل للتزوّج نكاح لأَنيه سبب للوطء المباح –‘আরবী ভাষায় نكاح (নিকাহ) শব্দের প্রকৃত অর্থ হল وطء (মিলন/যৌনসঙ্গম)। আর বিয়ে করাকে এজন্য ‘নিকাহ’ বলা হয়, কারণ তা বৈধ যৌন সঙ্গমের উপায় হয়ে থাকে’। [লিসানুল আরাব– ৩/৪৬৫]

এমনিভাবে আরবী অভিধানের অন্য আরেকজন বড় ও বিখ্যাত আলেম আল্লামা জাওহারী রহ. বলেছেন- النكاح الوطء وقد يكون العَقْدَ – ‘নিকাহ অর্থ ‘যৌনসঙ্গম’। এ শব্দটি বিয়ের ‘আকদ’ (চুক্তি) অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে’[লিসানুল আরাব– ৩/৪৬৫]

কুলআন কারিমেও نكاح (নিকাহ) শব্দটি কয়েক জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন এরশাদ হয়েছে- وَلَا تَنكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاءِ – ‘আর তোমরা ওই সকল নারীদেরকে নিকাহ করো না, যাদের সাথে তোমাদের পিতারা নিকাহ করেছ’। [সূরা নিসা ২২]

এই আয়াতে نَكَحَ (নিকাহ করেছে) দ্বারা সর্বসম্মত মতানুসারে উদ্দেশ্য হল مباشرت (মুবাশারাত/যৌন সঙ্গম) করা।

এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন- الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ
‘জেনাকারীনী নারী অথবা মুশরেকা নারীর সাথে নিকাহ করার পাত্র জেনাকার পুরুষ বৈ অন্য কেউ নয়। আর জেনাকার পুরুষ অথবা মুশরেক পুরুষের সাথে নিকাহ করার পাত্র জেনাকারীনী নারী বৈ অন্য কেই নয়’[সূরা নূর ৩] কতক ওলামায়ে কেরামের মতে এখানেও نكاح (নিকাহ) শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হল যৌন সঙ্গম করা। [লিসানুল আরাব ৩/৪৬৬]

যদি উপরোক্ত এসব আয়াতের মতো আলোচ্য আয়াত- حَتَّىٰ إِذَا بَلَغُوا النِّكَاحَ (যতক্ষন পর্যন্ত না তারা নিকাহ’র বয়সে গিয়ে উপনীত হয়) -এই আয়াতের ক্ষেত্রেও نكاح (নিকাহ) শব্দের উদ্দেশ্য ‘যৌন সঙ্গম’ নেয়া হয়, তাহলে আয়াতটির অর্থ হবে- ((যতক্ষন পর্যন্ত না তারা যৌন সঙ্গমের উপযুক্ত বয়সে গিয়ে উপনীত হয়। অত:পর তোমরা যদি তাদের মধ্যে বিচার যোগ্যতা অনুভব করতে পারে, তাহলে তাদের ধনসম্পদগুলোকে তাদের কাছেই সোপর্দ করে দাও )) এমতাবস্থায়- ‘বালেগ/বালেগা’ হওয়াটাই বিয়ের বয়স’ -এরকম কথার সমর্থনে আলোচ্য আয়াত থেকে সামান্যতম কোনো আঁচড়ও পাওয়া যায় না।

যুক্তিও একথাকেই বেশি সায় দেয় যে, আলোচ্য আয়াতে نكاح (নিকাহ) শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হল ‘যৌনসঙ্গম’ করা; ‘বিয়ে করা’ নয়। এ ব্যপারে নিম্নক্ত দলিলগুলোই একথার প্রমাণ-

(১) প্রথম কথা হল, এটা-তো একদম পরিষ্কার যে, কুরআন কারিম بلوغ النكاح (বুলুগুন-নিকাহ/নিকাহ’র বয়সে উপনীত হওয়া) দ্বারা ‘বালেগ/বালেগা’ হওয়ার বয়সকেই উদ্দেশ্য নিচ্ছে। এখানে একথা বলাই এর উদ্দেশ্য যে, ‘যখন এতীম মেয়েরা বালেগা (প্রাপ্ত বয়স্কা) হয়ে যাবে, সাথে তাদের মধ্যে কিছুটা বুঝজ্ঞানও জন্ম লাভ করবে, তখন তাদেরকে তাদের ধনসম্পদ সোপর্দ করে দাও’। এবারে আপনি ভাল করে চিন্তা করে দেখুন, এই স্বাবালকত্ব্যের বিষয়টিকে বর্ণনা করার জন্য একথা বলাতেই কি অধিক ভাব ফুটে ওঠে যে- ‘যখন তারা বিয়ের উপযুক্ত হয়ে যাবে’… নাকি ‘যখন তারা যৌন সম্ভোগের উপযুক্ত হয়ে যাবে’ -এ ভাবে বললেই বিষয়টি অধিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাহ্যতঃ, স্বাবালকত্ব্যের বিষয়টিকে বর্ণনা করার জন্য দ্বিতীয় প্রকাশভঙ্গিটাই অধিক সুষ্পষ্ট। কেননা, ‘বিয়ের উপযুক্ততা নিয়ে-তো অনেক ধরনেরই কথা বলার অবকাশ থাকতে পারে। কারণ মানুষের দৃষ্টিতে ‘বিয়ের উপযুক্ত’ হওয়া নিয়ে পৃথক পৃথক মানদন্ড থাকে। কেউ একথা বলতে পারে যে, ‘ছেলে-তো বালেগ হয়ে গেছে বটে, তবে এখনও বিয়ের উপযুক্ত হয়নি’। অর্থাৎ, বয়সের দৃষ্টিকোণ থেকে সে এখনও পর্যন্ত এতটা উপযুক্ত হয় নি যে, তার উপর বিয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া যাবে; অথবা বলতে পারে, ‘তার জীবন জীবিকাগত অবস্থা তেমন নয়’, বা ‘তার শিক্ষাগত অবস্থা তাকে বিয়ের অনুমতি দেয় না’। এজন্যই কাউকে যখন বলা হয় যে- ‘আপনার ছেলে যখন বিয়ের উপযুক্ত হয়ে যাবে, তখন তার কাছে তার মালসম্পদগুলো সোপর্দ করে দিবেন’, তখন লোকটি বাস্তবিক ভাবেই একথার এ অর্থই ধরে নিবেন যে, যখন তার ছেলে আঠারো বিশ বছর বয়সে উপনীত হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, জীবিকা উপার্জন করতে শুরু করবে, তখন তার কাছে মালসম্পদ সোপর্দ করে দিতে হবে। এর বিপরীতে দ্বিতীয় প্রকাশভঙ্গিটি ফুটিয়ে তুলতে এর অর্থ ‘বালেগ হওয়ার বয়স’ নেওয়া ছাড়া আর কোনো অর্থই নেয়া যেতে পারে না। যদি বলা হয় যে- ‘ছেলে যখন যৌন সঙ্গম বা সহবাসের উপযুক্ত হয়ে যাবে, তখন তার কাছে মাল সম্পদ সোপর্দ করে দিবেন’, তাহলে এ থেকে এছাড়া আর কোনো অর্থই বোঝা যেতে পারে না যে, ‘বালেগ হয়ে গেলে তার কাছে মাল সম্পদ সোপর্দ করে দিতে হবে’। যেহেতু, نكاح (নিকাহ)-র অর্থ যদি ‘যৌন সঙ্গম’ নেয়া হয়, তাহলেই কুরআন কারিমের অভিব্যক্তিটি অধিক পরিষ্কার ফুটে ওঠে, তাই এখানে এ অর্থ হওয়াই বাঞ্চনিয়।

(২) আমরা এইমাত্র আরোজ করে এসেছি যে, ইমাম আযহারী এবং জাওহারী’র বক্তব্য মতে ‘নিকাহ’র প্রকৃত অর্থ ‘যৌন সঙ্গোম’ই । এজন্য এই প্রকৃত অর্থটিকে ততক্ষন পর্যন্ত পরিত্যাগ করা যেতে পারে না, যতক্ষন পর্যন্ত না দ্বিতীয় অর্থ (তথা বিয়ে) কে অর্থ হিসেবে ধরে নিতে বাধ্য হতে হয়। এখানে দ্বিতীয় অর্থটিকে গ্রহন করার যে কোনেই আবশ্যকতা নেই -ব্যাপার শুধু তা-ই নয়, বরং দ্বিতীয় ‘অর্থ’ থেকে এমন ভুল ধারনা সৃষ্টি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে, যা কুরআন কারিমের উদ্দেশ্য নয়। তাছাড়া কুরআন হাদীসের অপরাপর পরিষ্কার বর্ণনাগুলো এ অর্থকে নাকোচ করে দেয়। এ জন্যেও আলোচ্য আয়াতে ‘নিকাহ’ শব্দ দ্বারা যৌনসঙ্গম অর্থ নেয়াই বাঞ্চনিয়।

এসমস্ত অনস্বীকার্য কারণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মত হল, এখানে ‘নিকাহ’র অর্থ মূলতঃ ‘যৌন সঙ্গম’ই।

বিয়ের বয়স নির্ধারিত নয়

কিন্তু কেউ যদি অকারণে জেদ ধরে বসে, আর আমরা যদি ধরেও নেই যে, এখানে نكاح (নিকাহ) বলতে ‘যৗনসঙ্গমে’র বদলে ‘বিয়ে’ই উদ্দেশ্য, তবুও মূল মাসআলায় কোনোই পার্থক্য সৃষ্টি হয় না এবং আলোচ্য আয়াত থেকে কোনো ভাবেই বোঝা যায় না যে, কুরআনে কারিম- ‘বালেগ/বালেগা’ হওয়ার পূর্বে সম্পাদিত বিবাহকে নাজায়েয করে দিয়েছে। কারণ, এমতাবস্থায় আয়াতের অনুবাদ হবে- ‘যতক্ষন পর্যন্ত না সে বিয়ের বয়সে গিয়ে উপনীত হয়। অত:পর তোমরা যদি তাদের মাঝে বিচারযোজ্ঞতা অনুভব করতে পারো, তাহলে তাদের ধনসম্পদ গুলোকে তাদের কাছে সোপর্দ করে দাও’’ । একথার উদ্দেশ্য হল, ‘‘সে যখন এত বড় হয়ে যায় যে, তার মধ্যে বিয়ে করার উপযোগীতা সৃষ্টি হয়ে গেছে’’। এ থেকে কমপক্ষে এতটুকু কথা তো অবশ্যই বোঝা যায় যে, বিয়ের উপযোগীতা ও উপযুক্ততা বালেগ/বালেগা হওয়া থেকে হয় । খুব বেশি হলে বলা যায়, কুরআন নাজিলের জামানায় সাধারণ রীতি এই ছিল যে, তখন ‘বালেগ’ বয়সে বা এর কিছু পর পরই বিয়ে করে নেয়া হত। কিন্তু ‘বালেগ/বালেগা’ হওয়ার পূর্বে বিয়ে জায়েয নয়’ -একথা আয়াতটির কোন্ কথা, কোন ইশারা ইংগীত কোন দলিল কিংবা কোন অংশ থেকে উদ্ভাবিত হয়?

দেখুন, যদি কুরআন কারিমের অভিপ্রায় এই হত যে, বালেগ বয়সের আগে বিয়ে করা জায়েয নয়, তাহলে কুরআন হাদীসের কোথাও না কোথাও তো এর উল্লেখ পাওয়া যাওয়া উচিৎ ছিল। এখানে কুরআন কারিম বিভিন্ন মাসআলার মাঝে  بَلَغُوا النِّكَاحَ (তারা নিকাহ’র বয়সে উপনীত হয়) কথাটিকে আনুসঙ্গিক্রমে এমন ভাবে উল্লেখ করছে, যেন এটা এমন একটি সুপরিজ্ঞাত বয়স, যে সম্পর্কে সবারই জ্ঞান রয়েছে। এর দ্বারা যদি বিয়ের এমন কোনো বয়স উদ্দেশ্য হত, যার পূর্বে বিয়ে জায়েয’ই হয় না, তাহলে এক্ষেত্রে একে আনুষঙ্গিক ভাবে টেনে আনা শুদ্ধ হত না। কারণ, সর্বদা ওই জিনিসেরই প্রসঙ্গ টানা হয় , যার উল্লেখ ইতিপূর্বে কোথাও করা হয়ে গেছে। কুরআন কারিমের কোনো আয়াত কিংবা কোনো দূর্বল থেকে দূর্বলতর হাদিসেও এমন কোনো বয়সের কথা পাওয়া যায় নাা, যার পূর্বে বিয়ে করা জায়েযই হয় না। এমতাবস্থায় আমরা যদি এখানে একথা ধরে নেই যে, কুরআন কারিমের উদ্দেশ্য হল ওই বয়স, যার আগে বিয়ে করা জায়েযই নয়, তাহলে এর অর্থ এই দাঁড়াবে যে, পবিত্র কুরআন এমন এক বয়সের প্রসঙ্গ টেনে আনছে, যার উল্লেখ ইতিপূর্বে কোথাও করা হয় নি! আর এটা এমন একটি কথা, যার কল্পনা কমপক্ষে আল্লাহ’র কালামের ব্যপারে করা যায় না।

এ থেকে বোঝা গেল যে, بَلَغُوا النِّكَاحَ (তারা নিকাহ’র বয়সে উপনীত হয়) দ্বারা কুরআনের উদ্দেশ্য নিছক এতটুকু যে- ‘‘যে বয়সে সাধারণত: বিবাহের পূর্ণ উপযোগীতা সৃষ্টি হয়ে যায়, অথবা যে বয়সে সাধারণত: বিয়ে-শাদী করিয়ে দেয়া হয়, তারা যখন সেই বয়সে উপনীত হবে—’’। আর এটা এমনই একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়, যা সকলেই জানে। ভাল-খারাপ সব মানুষই জানে যে, বিয়ের পরিপূর্ণ উপযোগীতা এবং বিয়ে সম্মন্ধিয় বিশেষ বিশেষ কাজ আনজাম দেয়ার যোগ্যতা বালেগ বয়স থেকেই তৈরী হয়।

আমরা উপরে যেসব কথা আরোজ করলাম, তা পূর্ণাঙ্গ সমর্থন মেলে ওই সমস্ত রেওয়ায়েত থেকেও, যেগুলো কম বয়সে সম্পাদিত বিয়ে-শাদীকে জায়েয প্রমাণিত করে, কিংবা যেগুলোতে রাসুলুল্লাহ থেকে একথা প্রমাণিত রয়েছে যে, তিনি কম বয়সের বাচ্চাদের বিয়ে করিয়ে দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, যদি কুরআনের দৃষ্টিতে বালেগ বয়সের আগে বিয়ে জায়েযই না হত, তাহলে স্বয়ং রাসুলূল্লাহ হযরত আয়েশাকে তার কম বয়সে বিয়ে করতেন না এবং হযরত সালামাহ’র সাথে হযরত বিনতে হামযার বিয়ে করিয়ে দিতেন না। একই ভাবে কুরআনী শিক্ষার উপর জীবন উৎসর্গকারী সাহাবায়ে কেরামও কম বয়সে’র বিয়ে-শাদীর উপর এত ব্যাপকভাবে আমল করতেন না।

১৬ এবং ১৮ বৎসব নির্ধারন করা

আমরা ইতিপূর্বে যা লিখে এসেছি, তাতে অগত্যা কৃত্রিমভাবে (হলেও কিছুক্ষনের জন্য) যদি ‘বালেগ/ বালেগা’ হওয়াকেই বিয়ের বয়স হিসেবে ধরে নেয়া হয়, তবুও তা অর্ডিনেন্সের সমর্থন পায় না। কেননা, অর্ডিনেন্স-তো ছেলে ১৮ বৎসর এবং মেয়ে ১৬ বৎসর বয়সে উপনীত হলেও তাদেরকে বিয়ের অনুমতি দেয় না। বর্তমানে সাধারণত : ১৪-১৫ বৎসর হতেই মানুষ বালেগ/বালেগা হয়ে যায়। আর একারণেই কোনো কোনো জনাব আবারও সেই ব্যাখ্যাবাজীই শুরু করে দিয়েছেন। তাদের টানা হেঁচড়াটা একটু দেখুন:

“বাচ্চাদের বালেগ হওয়ার বিষয়টি যদিও ছেলেদের বেলায় ‘স্বপ্নদোষ’ এবং মেয়েদের হায়েযের আঙ্গিকে হয়ে থাকে, কিন্তু এই ব্যাপার দুটি এমন যে, অন্যরা তা সহজে জানতে পারে  না। এজন্য আমাদের ফিকাহবীদ ওলামায়ে কেরাম বাচ্চাদের ‘‘বালেগ/বালেগা’ হওয়ার জন্য সাধারনভাবে তাদের একটি অনুমান নির্ভর বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ফুকাহায়ে কেরাম বিভিন্ন বয়স নির্ধারণ করেছেন। কারণ, একথা সুস্পষ্ট যে, এই ‘অনুমান নির্ভরতা’ বিভিন্ন আবহাওয়া’ জীবন জীবিকা জনিত: অবস্থা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। যেহেতু, ‘ফিকহে-হানাফী’ তে ব্যপকভাবে ১৫ বৎসরের কথা কলা হয়েছে, তাই যদি অর্ডিনেন্স সাবধানতা অবলম্বন পূর্বক ১৬ বৎসর রেখে দেয়, তাহলে তা কিছু মাত্র ভুল হবে না। কেননা, আমাদের দেশের কিছু কিছু এলাকা এমনও থাকতে পারে, যেখানে ১৫ বৎসরেও একটি বাচ্চা বালেগ বয়সে উপনীত হয় না। যেমন : স্বাধীন কাশ্মির, গুলগত, সুওয়াত ইত্যাদির ন্যয় শীতাঞ্চলগুলোর কথা বলা যায়।’’

প্রথমত: তো একথা বলাই ভুল যে, ফিকাহবীদ ওলামায়ে কেরাম বাচ্চাদের ‘বালেগ’ হওয়ার জন্য অনুমান নির্ভর বয়স নির্ধারণ করেছেন ! কারণ, তারা যে বয়স নির্ধারণ করেছেন, সে বয়সটি শুধুমাত্র ঐ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যখন বিশেষ বয়স পেড়িয়ে যাওয়ার পরও ‘বালেগ/বালেগা’ হওয়ার কোনো লক্ষন বা চিহ্নই প্রকাশ পায় না। এজন্যেই কোনো ছেলের মধ্যে যদি ১২ কিংবা ১৩ বৎসরের মধ্যেই বালেগ হওয়ার আলামত বা চিহ্ন প্রকাশ পেয়ে যায়, তখন তাকে বালেগই গণ্য করা হয়। হ্যাঁ, যদি ১৫ বৎসর এভাবে অতিক্রান্ত হয়ে যায় যে, তাতেও বালেগ হওয়ার কোনো আলামত প্রকাশ পায় না, তাহলে যখন তার ১৫ বৎসর পূর্ণ হয়ে যায়, তখন তার উপর ‘বালেগ’ সম্মন্ধীয় বিধিবিধানগুলো আরোপ করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ ১৫ বৎসর পর্যন্ত (বয়সের প্রশ্নেও মূলে একজন ছেলে বা মেয়ের) ‘বালেগ’ হওয়ার আলামত বা চিহ্নের উপরই তার বালেগ হওয়ার ভিত্তি রাখা হয়েছে এবং পরে একটি বয়স নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে (ওই ছেলে বা মেয়ের জন্য, যে ওই স্বাভাবিক বয়সে উপনীত হওয়ার পরও তার থেকে বালেগ হওয়ার সংশ্লিস্ট কোনো আলামত বা চিহ্ন পাওয়া যায় না)। এর বিপরীতে অর্ডিনেন্সের কোথায়ও এসকল আলামতের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় নি।

তাছাড়া ১৫ বৎসরের স্থলে ১৬ বৎসর রাখাটাও এজন্য ঠিক নয় যে, হতে পারে কোনো কোনো শীতাঞ্চলে বিলম্বে বালেগ হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, কিন্তু দেশে এমন গরম এলাকাও রয়েছে, যেখানে ১২-১৩ বৎসরের মধ্যেই মানুষ বালেগ হয়ে যায়। তাহলে আপনাদের কি অধিকার রয়েছে যে, একটি বিশেষ অঞ্চলের দিকে লক্ষ্য রাখবেন, আর অপরাপর অঞ্চলগুলো থেকে চোখকে একেবারে বন্ধ করে রাখবেন !!!!

দ্বিতীয়ত: নিছক একটি মাত্র অঞ্চলের দৃষ্টিবিচারে কোনো একটি সীমা তক্ ১৬ বৎসরের ঘটনা তো ঘটতেই পারে, কিন্তু দেশে বা দুনিয়ার মানচিত্রে এমন আর কোনো অঞ্চল রয়েছে কি, যেখানকার মানুষজন কেউই ১৮ বৎরের আগে বালেগ হয় না ? যদি ঘটনাক্রমে আপনার চোখে এমন কোনো অঞ্চলের হোদিছ পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে তার ঠিকানা চিহ্নিত করে দিবেন। এতে গোটা দুনিয়ার মানচিত্রের বিষয়ে জানাশোনা বাড়বে। আর যদি পাওয়া না যায়; আর নি:সন্দেহে নেইও বৈকি, তাহলে এই ১৮ বৎসরের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে আপনি কি বলবেন ?!!!

খোলাসা কথা হল, একে-তো বিয়ের জন্য বালেগ হওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা কুরআন-সুন্নাহ’র পরিপন্থী, তদুপরি আসমান-জমীন একাকার হওয়ার কথা যেভাবে কল্পনা করা হয়, সেভাবেও যদি একথাও কল্পনা করে নেয়া হয় যে, বালেগ হওয়ার আগে বিয়ে জায়েয নয়, তাহলে তাতেও অর্ডিনেন্সের সমর্থন হয় না। কারণ, সে তো ‘বালেগ হওয়া’ থেকে আরও অগ্রসর হয়ে ১৬ এবং ১৭ বৎসর বয়স নির্ধারন করে নিয়েছে !!!!!

হযরত আয়েশা রা.-এর হাদীসের উপর অভিযোগ 

আমরা আলোচনার শুরুতে আমাদের প্রমাণের স্বপক্ষে হযরত আয়েশা রা.-এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করে এসেছি যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল তখন, যখন তার বয়স ছিল ৭ অথবা ৮ বছর।

এটা এমনই এক সহিহ ও সুস্পষ্ট বর্ণনা, যার বিপরীতে কিছু বলা মুশকিল কাজ ছিল। আর তাই এদিকটিকে সামনে রেখে কোনো কোনো জনাব এক অদ্ভুত গবেষনা (!) চালিয়েছেন। সম্ভবত: হাদিস অস্বীকারকারী গোষ্ঠির প্রধান পৃষ্ঠপোষক জনাব পারভেজ সাহেবই সর্বপ্রথম এ গবেষনা দিয়ে উপকার সাধন ( !)  করেছিলেন যে, ‘‘হযরত আয়েশার বিয়ের সময় তার বয়স ছিল ৭ বৎসরের পরিবর্তে ১৭ বৎস র“ !’ তার এসব কথা তারই طاهره كى نام (ত্বাহেরাহ কি নাম) নামক কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে। ওই আলোচনাটি এ দিক থেকেও বেশ চিত্তাকর্ষক যে, তাতে অাপনি গবেষনা (!), ইজতেহাদ (!) এবং ঐতিহাসিক চিন্তাভাবনার এমনসব বিরল ও আজগুবিসব উসূল বা মূলনীতি খুঁজে পাবেন, যা হয় তো এর আগে আপনার চোখে কখনো ধরাই পরে নি। এর সাথে সাথে সাখোনে (কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে) টানা হেঁচড়া’র এমন এমন সব ভেলকিবাজী সামনে আসবে যে, আপনি ‘তার পক্ষে রায়’ দিতে বাধ্য হয়ে যাবেন ! তার গোটা বিষয়বস্তুর উপর নিয়মতান্ত্রিকভাবে সুক্ষ পর্যালোচনায় নেমে পরা দীর্ঘ আলোচনার দাবী রাখে। অচিরেই আমরা  তার গোটা আলোচিত বিষয়বস্তুর উপর একটি বিষদ পর্যালোচনা আলাদা কোনো প্রবন্ধের আকারে পেশ করবো ইনশাআল্লাহ ! এখানে আমরা সংক্ষেপনের দিকে লক্ষ্য রেখে তার উপস্থাপিত ওই সমস্ত দলিলগুলোর সারবত্তার উপর আলোচনা পেশ করবো, যা তারই দিক্ষাপ্রাপ্ত এক স্থলাভিষিক্ত জনাব উদ্ভাবন করেছেন, যা মূলত: পারভেজ সাহেবের গোটা আলচনার প্রাণ। তিনি বলেছেন-

‘‘হযরত আয়েশা রা. তাঁর বোন হযরত আসমার চেয়ে ১০ বৎসরের ছোট ছিলেন। আর হযরত আসমার মুত্যু হয়েছিল ৭৩ হিজরীতে, বিধায় তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর। অর্থাৎ, হিজরতের সময় হযরত আসমার বয়স ছিল ২৭ বা ২৮ এবং হযরত আয়েশার বয়স ছিল ১৭ কিংবা ১৮। আর হযরত আয়েশার রুখসতী হয়েছিল হিজরী ২ সনের শাওয়াল মাসে। অর্থাৎ তখন তার বয়স ছিল ১৯ কিংবা ২০। দেখন : আকমাল ফি আসমায়ির রিজাল, আঈনী শরহে বুখারী এবং ইস্তিয়াব – ৩/৭৪৪

এর ভিত্তিতে তার মত হল-

“যে সকল বর্ণনায় বিয়ের সময় হযরত আয়েশার বয়স ৬ বৎসর এবং রুখসতীর সময় ৯ বৎসর বলা হয়েছে, সেখানে ‘দশ’ শব্দটি কিংবা কোনো গাণিতিক সংখ্যা (হাদিসের) কোনো রাবী (বর্ণনাকারী) থেকে বাদ পড়ে গেছে।’’

এর জবাব

পেশকৃত এই দলিলের গোটা বুনিয়াদ ও ভিত্তিটাই হল ‘হযরত আয়েশা রা. হযরত আসমার চেয়ে ১০ বৎসরের ছোট ছিলেন’। আর এই কথাটি হাদিস ও আসমাউর রিজালে’র গ্রন্থভান্ডারের মধ্যে শুধুমাত্র ‘আল-আকমাল ফি আসমায়ির রিজাল’ এই একটি মাত্র কিতাবেই পাওয়া যায়। তাছাড়া আর কোথায়ও একথার প্রমাণ পাওয়া যায় না। (এর পরিপেক্ষিতে আঈনী ও ইস্তিয়াব-এর যে রেফারেন্স দেয়া হয়েছে, সেখানেও একথা উল্লেখ নেই। – লেখক) বরং এর উল্টো প্রমাণই মওজুদ রয়েছে। অপরাপর সমস্ত সহিহ ও সুস্পষ্ট রেওয়অয়েত থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, হযরত আয়েশা রা. হযরত আসমা’র চেয়ে ২০ বৎসরের ছোট ছিলেন। এখন পন্ডীতগিরির অবস্থার দিকেও একটু লক্ষ্য করে দেখুন, নিছক এক ‘আল-আকমাল’ এর কারণে বুখারী, মুসলীম সহ যাবতীয় সহিহ বর্ণনার ব্যপারে বলা হচ্ছে যে, ওগুলোতে (নাকি) বর্ণনাকারীদের থেকে গাণিতিক সংখ্যা বাদ পড়ে গেছে !!! তাহলে কি এসব জনাবদের ধারনা মতে সহিহ বুখারী ও মুসলীম সহ অন্যান্য সমস্ত হাদিস গ্রন্থের চাইতে ‘আল-আকমাল’ কিতাবই অধিক সহিহ ও বিশুদ্ধ হয়ে গেল যে, হাদিসের রেওয়ায়েতগুলোতে গানিতিক সংখ্যা বাদ পড়ে যেতে পারে, কিন্তু ‘আল আকালে’র ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো ভুল সংঘটিত হতে পারে না !!! নাকি মুহাদ্দেসবৃন্দের চাইতে আজকালকার লেখকদের উপরই তাদের বেশি আস্থা যে, তাদের দৃষ্টিতে হাদিসের সমস্ত বর্ণনাকারী থেকে গাণিতিক সংখ্যা বাদ পড়ে যেতে পারে, কিন্তু ‘আকমাল’ এর লেখক এতই সুউচ্চ প্রকৃতির মহামানব যে, তাঁর থেকে কোনো রকম ভুলচুক’ই হতে পারে না ! মোটকথা, এসবের মধ্যে যে কারনেই হোক, এ সকল জনাবরা ‘আল-আকমাল’ এর ইবারতের মধ্যে গাণিতিক সংখ্যা বাদ পড়ে যাওয়ার কোনো খতরাহ প্রকাশ করেন নি ; বরং বুখারী, মুসলীম সহ সমস্ত হাদিস ও আসমাউর রিজালে’র গ্রন্থাবলীতে গাণিতিক সংখ্যা বাদ পড়ে যাওয়ার উপর দৃঢ় বিশ্বাস করে নেয়ার মধ্যেই শান্তি ও স্বস্থি অনুভব করেছেন।

চলুন ! আমরা কিছুক্ষনের জন্য এই অনর্থক কথাটিকেই গ্রহন করে নিই। কিন্তু ওই রেওয়াতটির ব্যপারে আপনি কি বলবেন, যেটাকে হাফিজুল হাদীস ইমাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ : (মৃ: ৮৫২ হি 🙂 নিম্নক্ত আলফাজ সহকারে উদ্ধৃত করেছেন – 

و فى الصحيح من رواية ابى معاوية عن الاعمش عن ابراهيم عن الاسود عن عائشة رضى الله تعالى عنها قالت تزوجنى رسول الله  و انا بنت ست سنين و بنى بى و انا بنت تسع سنين و قبض و انا بنت ثمان عشرة سنة

‘সহিহ বর্ণনায় এসেছে, হযরত আবু মুআবিয়া হযরত আ’মাশ থেকে, তিনি হযরত ইবরাহীম থেকে, তিনি হযরত আসওয়াদ থেকে এবং তিনি হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত আয়েশা রা. বলেছেন : تزوجنى رسول الله  و انا بنت ست سنين و بنى بى و انا بنت تسع سنين و قبض و انا بنت ثمان عشرة سنة –আমার যখন ছয় বৎসর বয়স, তখন রাসুলুল্লাহ সা. আমাকে বিয়ে করেন। আর আমার বয়স যখন নয় বছর, তখন আমার রুখসতী হয়। আর রাসুলুল্লাহ সা. যখন ইন্তেকাল করেন তখন আমার বয়স ছিল আঠার বছর[ইসাবাহ, ইবনে হাজার- ৪/৩৪৮]

আপনার বক্তব্য মোতাবেক যদি ست (ছয়)-এর পাশ থেকে عشرة (দশ) শব্দটি বাদ পড়ে গিয়েই থাকে, তাহলে قبض و انا بنت ثمان عشرة -রাসুলুল্লাহ সা. যখন ইন্তেকাল করেন, তখন আমার বয়স ছিল আঠার বছর’ – এর ব্যপারে আপনার কি বক্তব্য? এখানে কোন গাণিতিক সংখ্যাটি বাদ পড়ে গেল ?

হাদিসটির বিভিন্ন সনদ 

বস্তুত: যে হাদিসে ست (ছয়) ইত্যাদি শব্দটি মওজুদ রয়েছে, সেটি কোনো একজন রাবীর বর্ণনাকৃত হাদিস নয়, বরং তা ভিন্ন ভিন্ন বহু সনদে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর একজন রাবীও পরিত্যাজ্য নন, বরং তাঁরা সকলেই সিকাহ (নির্ভরযোগ্য)। নিম্নে কয়েকটি সনদের প্রতি লক্ষ্য করে দেখুন-

(১) একটি সনদ তো তা-ই, যা আমরা ‘ইসাবাহ’র সূত্রে উপরে উদ্ধত করে এলাম।

(২) اخرجه ابن ابى عاصم من طريق يحيى القطان عن محمد بن عمرو عن يحيى بن عبد الرحمن بن حاطب عن عائشة رضى الله تعالى عنها- فذكر الحديث بطوله و فيه – فانكحه و هى يومئذ بنت ست سنين

“হযরত ইবন আবি আসিম বর্ণনা করেছেন হযরত ইয়াহইয়া আল-কাত্তান-এর সূত্রে, তিনি মুহাম্মাদ বিন আমর থেকে, তিনি ইয়াহইয়া বিন আব্দুর রহমান বিন হাতীব থেকে এবং তিনি হযরত আয়েশা রা. 
থেকে। (এরপর দীর্ঘ হাদিস উল্লেখ করেন; তাতে একথাও রয়েছে যে) فانكحه و هى يومئذ بنت ست سنين –রাসুলুল্লাহ যখন হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেন, তখন তার বয়স ছিল ছয় বছর”[ইসাবাহ, ইবনে হাজার- ৪/৩৪৮]

(৩) اخرجه ابن عبد البر بطريق عبد الوارث حدثنا قاسم بن اصبغ ثنا احمد بن زهير حدثنا موسى بن اسماعيل حدثنا حماد بن سلمة عن هشام بن عروة عن ابيه عن عائشة رضى الله تعالى عنها قالت: تزوجنى رسول الله ﷺ بعد متوفى خديجة رضى الله تعالى عنها و قبل مخرجه الى المدينة بسنتين او ثلاثة و انا بنت ست او سبع

‘ইমাম ইবনে আব্দুল বার বর্ণনা করেছে হযরত আব্দুল ওয়ারীছের সূত্রে এভাবে- আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন কাসেম বিন আসবাগ, (তিনি বলেন) আমাদের কাছে হাম্মাদ বিন সালামাহ বর্ণনা করেছেন হযরত হিশাম বিন ওরওয়াহ থেকে, তিনি তার পিতা থেকে এবং (তাঁর পিতা) হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা রা. বলেছেন: تزوجنى رسول الله ﷺ بعد متوفى خديجة رضى الله تعالى عنها و قبل مخرجه الى المدينة بسنتين او ثلاثة و انا بنت ست او سبع রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে বিয়ে করেন হযরত খাদীজা রা.- এর মৃত্যুর পর এবং তাঁর মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরতের জন্য বেড় হওয়ার দুই বা তিন বছর পূর্বে। তখন আমার বয়স ছিল ছয় কী সাত বছর। [আল ইস্তিয়াব আলা হামিশীল ইসাবাহ- ৪/৩৪৭]

 উপরোক্ত এসকল সনদের মধ্যে আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, তাতে কোনো একজন রাবীও পরিত্যজ্য নন। এখন এসমস্ত নির্ভরযোগ্য রাবীদের সবার ব্যপারেই কি একথা বলা যেতে পারে যে, তাঁদের সবার থেকেই عشرة (দশ) সংখ্যাটি বাদ পড়ে গেছে !

হযরত ফাতেমা রা. থেকে হযরত আয়েশা রা.-এর বয়সের ব্যবধান

এসকল জনাব হযরত আয়েশার বিয়ে ১৭-১৮ বৎসর বয়সে হওয়ার স্বপক্ষে এই দলিল পেশ করেছেন যে-

‘‘হযরত আয়েশা রা. হযরত ফাতেমা রা. থেকে ৫ বৎসরের ছোট ছিলেন। রাসুলুল্লাহ -এর ইন্তেকালের ৬ মাস পর দশম হিজরীতে হযরত ফাতেমার ইন্তেকাল হয়। প্রসিদ্ধ মতানুসারে তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩০ বৎসর আর কালবী’র মতানুসারে হয়েছিল ৩৫ বৎসর। (ইস্তিয়াব : ২/৭৫২ ; উসদুল গাবাহ : ৪/৩৭৭)

কাজেই হিজরতের সময় হযরত ফাতেমার বয়স ছিল ২০ এবং হযরত আয়েশা’র বয়স ছিল ১৫ বৎসর। দু’বছর পর তাঁর রুখসতী হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ অথবা ২২ বৎসর। কখনো কখনো জন্ম এবং বিভিন্ন ঘটনাবলির বছরগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় না। যদি ওগুলোকেও অন্তর্ভূক্ত করে নেয়া যায়, তাহলে ১৯ কিংবা ২৪ বৎসর দাঁড়াবে’’।

এখানে একথা-তো অবশ্যই সত্য যে, হযরত আয়েশা রা. হযরত ফাতেমার চেয়ে ৫ বছরের ছোট ছিলেন। কিন্তু একথা গ্রহন করে নেয়ার পরও এই দলিলটির গোটা ভিত্তি’ই একথার উপর রয়ে যায় যে,
হযরত ফাতেমার বয়স হয়েছিল মোট ৩০ বৎসর। যদিও কথাটি একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা দ্বারা ছাবেত, কিন্তু হযরত ফাতেমার বয়স সম্পর্কে আরও বেশ কয়েকটি রেওয়ায়েও রয়েছে। আর ৩০ কিংবা ৩৫ বৎসর সম্বলিত রেওয়াযেতটি অপরাপর সহিহ ও সুস্পষ্ট রেওয়ায়েতাসমূহের আলোকে কোনো ভাবেই সঠিক বলে অনুভ’ত হয় না। কেননা, ঐতিহাসিকগণ সবাই এব্যপারে একমত যে, হযরত ফাতেমার জন্ম হয়েছিল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওত লাভের কিছু দিন পূর্বে। [ইসাবাহ- ৪/৩৬৫, ৩৬৮] বরং, হযরত ইবনে সীরজের একটি বর্ণনায় আছে যে, নবুওতের এক বৎসর পর তাঁর জন্ম হয়। [ইস্তিয়াব ৩৬ পৃ:]

অপর দিকে তাঁর মৃত্যুর তারিখ সম্পর্কেও ঐতিহাসিকগণ প্রায় একমত যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের ৬ মাস পর তাঁর ইন্তেকাল হয়। (খোদ এ সকল জনাবরাও একথা মানেন)।

এবারে আপনি একটু গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখুন, যদি সাবধানতার খাতিরে নবুওতের এক বৎসর পূর্বেও হযরত ফাতেমার জন্মের কথা মেনে নেয়া হয়, তবুও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় ২৪ বৎসর। (কেননা, তাঁর নবুওতের সময়কাল ছিল মোট ২৩ বৎসর)। ৬ মাস পর হযরত ফাতেমারও ইন্তেকাল হয়ে যায়। কাজেই তখন হযরত আয়েশা রা.-এর মোট বয়স হয় সারে চব্বিশ বৎসর। আর যদি হযরত ইবনে সীরাজের রেওয়ায়েতটি নেয়া হয়, তাহলে হয় সারে তেইশ বৎসর। সুতরাং, হিজরতের সময় হযরত ফাতেমা রা.-এর বয়স হয়েছিল ১৩ কিংবা ১৪ বৎসর, আর হযরত আয়েশার ৮ কিংবা ৯ বৎসর। হিজরতের ২ বৎসর পূর্বে হযরত আয়েশার বিয়ে হয়। তাহলে তখন তাঁর বয়স দাঁড়ায় ৬ কিংবা ৭। আর এ কথাটি হাদিসের অপরাপর সমস্ত রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত।

এসব ছাড়াও, হযরত ফাতেমা রা.-এর বিয়ে সম্পর্কে পরিষ্কার বর্ণনা রয়েছে যে, তাঁর যখন বিয়ে হয়, তখন তাঁর বয়স ১৫ বছরের কাছাকাছি ছিল। [ইস্তিয়াব ৩৬২ পৃ: ; তাহযীবুত তাহযীব, ইমাম যাহবী- ১২/৪৪১] 
এ থেকে জানা গেল, হযরত আয়েশার রুখসতীর কয়েক মাস পরই হযরত ফাতেমার বিয়ে হয়। [ইসাবাহ- ৪/৩৬৫, ৩৬৮; ইস্তিয়াব ৩৬২ পৃ: ; তাহযীবুত তাহযীব, ইমাম যাহবী- ১২/৪৪১]  কাজেই, হযরত আয়েশার রুখসতীর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯ বছর এবং বিয়ের সময় ছিল ৭ বছর। আর এ বিষয়টি অপরাপর রেওয়ায়েত দ্বারাও প্রমাণিত।

থাকলো, সাঈদ বিন আমর কিংবা কালবীর ওই রেওয়ায়েত, যা এসকল জনাবরা তাদের দলিলের
স্বপক্ষে পেশ করেছেন, আর যা থেকে জানা যায় যে, হযরত ফাতেমার মোট বয়স হয়েছিল ৩০ কিংবা
৩৫ বছর।

এই মৃত্যু তারিখটি দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই ভুল। আর ‘ইস্তিয়াব’ এবং ‘তাহযীবে’র ওই সকল বর্ণনাও একে রদ করে দেয়, যেখানে হযরত ফাতেমার বিয়ে ১৫ বছর বয়সে হয়েছিল বলে বর্ণিত আছে। কেননা, তাঁর বিয়ের ৯ বছর পর তাঁর ইন্তেকাল হয়। সুতরাং, তখন তাঁর মোট বয়স হয়েছিল ২৪ বছর; ৩০ বা ৩৫ বছরের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

তাছাড়া ‘সিহাহ-সিত্তা’ সহ হাদিসের যাবতীয় কিতাবের ওই সকল বর্ণনাগুলোও এর পরিপন্থী, যে সকল বর্ণনায় ৯ বছর বয়সে হযরত আয়েশার রুখসতী হওয়ার কথা বণিত রয়েছে। তাই এসমস্ত মজবুত ও অনস্বীকার্য দলিল-প্রমানের পর সাঈদ বিন আমর এবং কালবী’র ওই দূর্বল বর্ণনাটির মধ্যে এমন কোনো ওজনই অবশিষ্ট থাকে না, যার কারণে হাদিসের যাবতীয় কিতাব সহ ইতিহাসের অপরাপর সকল রেওয়ায়েতগুলিকে পরিত্যাগ করা হবে।

ইতিহাস এবং হাদীস 

আর তাছাড়া অগত্যা যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ইতিহাসের সমস্ত বর্ণনা হাদিসের বর্ণনার বিপরীত, তবুও আমরা ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোকে পরিত্যাগ করে হাদিসগুলোকেই অগ্রাধিকার দিবো। কারণ, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বুখারী, মুসলীম সহ অপরাপর হাদিসের কিতাবগুলোর যে মযার্দা অর্জিত রয়েছে, তা ইতিহাসের কোনো উচ্চ মর্তবার কিতাবেরও অর্জিত হতে পারে না। তা এজন্য যে, যে পরিমান যাচাই বাঁছাই করে হাদিসের কিতাবসমূহের বর্ণনাগুলোকে সংকলন করা হয়েছে, ইতিহাস লিপিবদ্ধ করণের ক্ষেত্রে সেই পরিমান গুরুত্ব দেয়া হয় নি। এর সামান্য একটু খানিক অনুমান করা যেতে পারে এব্যপারে যে, আল্লামা ওয়াকেদী রহ. (১৩০-২০৭ হি:)-কে ইসলামী ইতিহাসে’র একজন অতি উচ্চস্তরের ঐতিহাসিক মনে করা হয়ে থাকে। যে সব রেওয়ায়েত তাঁর থেকে বর্ণনা করা হয়, ইতিহাসের প্রশ্নে সেটা খুবই গুরুত্ব লাভ করে। কিন্তু এই আল্লামা ওয়াকেদী’ই যখন হাদিসের ময়দানে আসেন, তখন মুহাদ্দেসগণ তাঁকে জয়ীফ (দূর্বল) হিসেবে গণ্য করে থাকেন এবং যে হাদিস আল্লামা ওয়াকেদী থেকে বর্ণিত হয়, সেটির উপর তাঁরা ‘মুহাদ্দেসানা সমালোচনা’ আরোপ করে থাকেন। একইভাবে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকও রহ. (৮৫-১৫০/১৫৯হি:) ‘সির ও মাগাজী’ সম্পর্কিত একজন উচ্চমর্তবান ঐতিহাসিক। কিন্তু এই মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকই যখন হাদিসের ময়দানে আসেন, তখন মুহাদ্দেসগণ তাকে- বিশেষ করে আহকাম সম্পর্কিত রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে ভ্রুক্ষেপযোগ্য মনে করেন না। একই অবস্থা ইবনে লেহইয়া’র বেলায়ও। ইতিহাসের উচ্চস্তরের কিতাবগুলো তার বর্ণনা দিয়ে ভরে আছে। কিন্তু এই ইবনে লেহইয়া’ই যখন কোনো হাদিস বর্ণনা করেন, তখন মুহাদ্দেসগণ তার উপর সমালোচনা করে থাকেন, কেননা সেখানে তো ইমাম যুহরী, ইমাম ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-কাত্তান, ইমাম হাম্মাদ বিন সালামাহ এবং ইমাম বুখারীর মতো হতঃভম্ব করার মত হাদিস হিফজতকারী ব্যক্তিদের রাজত্ব বিদ্যমান। এর কারণ হল, এমন বহু বর্ণনাকারী রয়েছেন, যাদেরকে ইসলামী ইতিহাসের প্রশ্নে নির্ভরযোগ্য হিসেবে অবিহিত করা হয়। কিন্তু হাদিস শ্বাস্ত্রে তাঁদের বর্ণনাগগুলোকে গ্রহন করা হয় না। কেননা, হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে রাবী/বর্ণনাকারীর হিফজের শক্তিমত্তা, দ্বীনদারীত্ব, পরহেজগারী, আকীদার শুদ্ধতা সবকিছুই দেখা হয়। কিন্তু ইতিহাসের মানদন্ড এতটা কঠিন হয় না। এজন্যে যদি ইতিহাসের অনেকগুলো বর্ণনাকে এক পাল্লায় রাখা হয়, আর হাদিসের শুধু একটি বর্ণনাকে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তবুও দ্বিতীয় পাল্লাটিই ঝুঁকে যাবে।

একথা বলার দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য এই নয় যে, ‘‘ইতিহাস হল মিথ্যার ঝোপঝাড়” -যেমনটা কেউ কেউ বলেছে। কারণ, ইতিহাসের নিজ স্থান থেকে অমুকাপেক্ষিতা অবলম্বন করে নেয়া যেতে পারে না। বিশেষ করে মুসলমানদের ইতিহাস-তো দুনিয়ার সকল জাতীর মধ্যে অতি উচ্চাশনে সমাসীন এক ইতিহাস। ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকগণ বর্ণনাকে সূত্র সমৃদ্ধ করার প্রতি একদমই গুরুত্ব প্রদান করে নি। আমরা-তো শুধু এতটুকই বলতে চাই যে, হাদিসের সহিহ ও সুস্পষ্ট বর্ণনার মোকাবেলায় ইতিহাসের বর্ণনাগুলোকে এতে টেনেহেঁচড়ে পেশ করাটা কত মস্ত বড় বুনিয়াদী ভুল। একাজ শুধু ওই ব্যক্তিই করতে পারে, যার অন্তর থেকে বিবেক-বোধের নকশাটা পর্যন্ত বিলীন হয়ে গেছে ! কেননা, এটা-তো প্রত্যেক চক্ষুসমান ব্যক্তির নজরে পড়ার মতই একটি বিষয় যে, ইতিহাসের বেলায় হাদিসের মতো বর্ণনা সমূহের বিশুদ্ধতার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয় নি, আর না এর (এতটা) প্রয়োজন ছিল। কারণ, ইতিহাসের ক্ষেত্রে যদি কোনো ঘটনা অজানা ও নাদানিতা বস্বতঃ কিছুটা আগ-পিছ হয়ে যায়, কিছুটা এদিক-সেদিক হয়ে যায়, অর্থ ও মর্মের মধ্যেও যদি কিছুটা পরিবর্তণ ঘটে যায়, তাহলে তার দ্বারা বিধিবিধানের উপর তেমন বিশেষ কোনো পার্থক্য সূচীত হয় না। এর বিপরীতে হাদিসের অর্থ ও মর্মের মধ্যে পরিবর্তন সাধন এবং ঘটনাবলির ক্রমধারার বিষয়টি-তো পৃথক ভাবে থাকলই, যদি হাদিসের খোদ বক্তব্যের মধ্যে গড়বড় হয়ে যায়, তখন মুহাদ্দেসগণের কাছে সেটাই একটি দোষ। এজন্যেই কোথাও যদি ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং হাদিসের বর্ণনার মধ্যে দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়, তখন সেক্ষেত্রে হাদিসই অগ্রাধীকার লাভ করে।

আর আলোচ্য মাসআলার ক্ষেত্রে আমরা উপরে যেসকল উচ্চস্তরের ঐতিহাসিক বর্ণনা পেশ করে এসেছি, ওগুলো হাদিস সমূহের অনুকুলেই রয়েছে। তাই এসবের মোকাবেলায় সাঈদ বিন আমর এবং কালবী’র বর্ণনাগুলো এমন কোনো বৈশিষ্ট রাখে না যে, এর কারণে হাদিস ও ইতিহাসের যাবতীয় বর্ণনাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করা হবে।

তৃতীয় অভিযোগ 

হযরত আয়েশা রা.-এর বিয়ে ১৭ বা ১৮ বয়সে হওয়ার ব্যপারে তারা সর্বশেষ যে কথাটি উপস্থাপন করেছেন, তাতে-তো তার চুড়ান্তই করে ছেড়েছেন। তারা বলেছেন-

‘‘এছাড়া বুখারীর বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, যখন সূরা ‘কামার’ নাজিল হয়, তখন হযরত আয়েশা রা. বাচ্চা ছিলেন এবং খেলেদুলে বেড়াতেন। আর তখন থেকেই তাঁর সূরা কামারের কিছু আয়াত মুখস্ত ছিল। সূরা কামার নাজিল হয়েছিল নবুওতের ৫ম বৎসরে। হুজুরে আকরাম নবুওত লাভের পর মক্কায় ১৩ কিংবা ১৫ বৎসর ছিলেন। সুতরাং, সূরা কামার নজিল হওয়ার সময় যদি হযরত আয়েশার বয়স ৬ কে গ্রহন করে নেয়া হয়, তাহলে হিজরতের সময় তাঁর বয়স হওয়া উচিৎ ১৬-১৭ এবং রুখসতীর সময় ১৮-১৯ বছর’’।

প্রথম কথা এই যে, কি করে একথা ধরে নেয়া হল যে, হযরত আয়েশার বয়স তখন ৬ অথবা ৭ বছর ছিল ? হাদিসটিতে -তো একথাও পরিষ্কার করে বলা নেই যে, তখন থেকেই তাঁর সূরা কামার মুখস্থ ছিল। সেটা -তো পরেও হতে পারে ! আবার এই স্বীকারোক্তিও কতটা লজ্জাকর যে, এতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মক্কী জীবনকে ১৫ বছর ধরে নেয়া হয়েছে !!! এমনকি  -সূরা কামার নবুওতের ৫ম বৎসরে নাজিল হয়েছিল -একথার স্বপক্ষেও কোনো দলিল দেয়া হয়নি !

অধিকন্তু যদি একথা থেকেও দৃষ্টিকে সরিয়ে রাখা হয়, তবুও হিজরতের সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় ১৬ বৎসর। তাহলে আপনি কি এই দাবীও করবেন যে, বিয়েটা ঠিক হিজরতের সময়ই হয়েছিল ? তদুপরি বুনিয়াদীভাবে এটাও কতটা আক্ষেপজনক যে, সহিহ ও সুস্পষ্ট বর্ণনাগুলোকে বাদ দিয়ে এসমস্ত অনুমাননির্ভর ও কল্পনাপ্রসূত কথাগুলোকেই একটি ইলমী মাসআলার ভিত্তি বানিয়ে নেয়া হচ্ছে ; সাথে আবার এই দাবীও করা হচ্ছে যে-

‘‘তাই এখন আর এতে কোনো সন্দেহ বাকি থাকলো না যে, হুজুর এর সাথে হযসত আয়েশার বিয়ে ১৬ কিংবা ১৭ কৎসর বয়সেই হয়েছিল !!!

পরিষ্কার বর্ণনাগুলোর সাথে আপনাদের যদি কোনো শত্রুতা থেকে থাকে এবং আপনারা যদি এধরনের অনুমাননির্ভর যুক্তিগুলোকেই অধিক পছন্দ করে থাকেন, তাহলে বলি, যেসব যুক্তি আমরা হযরত আয়েশা রা.-এর কম বয়সে বিয়ের স্বপক্ষে দিয়ে এসেছি, আপনাদের চোখে সেগুরো পরেনা কেনো ? পরিষ্কার বর্ণনা সহ অপরাপর যুক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে এসব ভ্রান্ত আন্দাজ অনুমানগুলির উপর কোনো দলিরের ভিত্তি স্থাপন করাটা আমাদের কাছে বিবেকের এই সাক্ষ্যর রেখে যাওয়ারই আলামত যে, “দলিল দাতারা একটি মতবাদ’ প্রতিষ্ঠা করে নিয়ে (তারই স্বপক্ষে) বিভিন্ন দলিল খুজে বেড় করতে চেয়েছেন; দলীল দেখে ‘মতবাদ’’ প্রতিষ্ঠা করেননি”।

পারিবারীক কমিশনের অভিযোগ 

আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, কুরআন-সুন্নাহ’র সুস্পষ্ট দলিলগুলো এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, কম বয়সের বিয়ে-শাদী জায়েয ও বৈধ। এর বিপক্ষে যতগুলো আপত্তি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তার বাস্তবতাও আপনারা অবলোকন করে নিয়েছেন। একথা যখন প্রমাণিত হয়ে গেল যে, কুরআন-সুন্নাহ’য় কম বয়সের বিয়েকে নিষেধ করা হয় নি, তাই এসকল জনাবদেরকে এই দাবী করতে হয়েছে যে, নবুওতের যুগে যেসমস্ত বাল্যবিবাহের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, (আল্লাহ রক্ষা করুন) সেগুলো নাকি ভবিষ্যৎ পরিণতির দিকটাকে বিবেচনায় না রেখে করা হয়েছিল। যেমন, পারিবারীক কমিশন তার রিপোর্টে একদম পরিষ্কার ভাষায় লিখেছে-

‘‘ইনলাম যদিও একটি জিনিসকে নির্দেশ হিসেবে নয়, বরং নিছক অনুমতি হিসেবে এজন্য দিয়েছিল যে, মানব সমাজ তখনও পর্যন্ত তার শৈশবকালেই অবস্থান করছিল, কিন্তু সেই অনুমতিটি (আজ) ভুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতরাং, এই অনুমতির উপর আরও পদশৃঙ্খল ও শর্ত-শরায়েত এঁটে দেয়া যেতে পারে’’।

আরেক জায়গায় লিখা হয়েছে-

‘‘কম বয়সের বিয়েগুলোর উপর এজন্য কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় নি যে, সমাজ জীবনের উন্নতির একটি বিশেষ যুগে এ বিষয়টি তেমন খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ক্ষতিকর হয় না’।’

আমাদের আকীদা ও বিশ্বাস তো এই যে, ইসলামের সমস্ত বিধিবিধানই ‘ফিতরী’ (তথা মানুষের স্বভাবপ্রকৃতির সাথে খাপ খায় -এমন)। فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا – আল্লাহ’র ফিতরাত, যার উপর তিনি মানুষকে ফিতরাতমন্ডিত করেছেন। [সূরা রূম ৩০আর মনুষ্য ‘ফিতরাত’ (মৌলিক স্বভাব-প্রকৃতি) সর্বযুগে সর্বাবস্থায় একই থাকে। একারণে ইসলামের বিধিবিধানও প্রত্যেক যুগে একই থাকে। শুধুমাত্র যেসকল বিষয় যুগ-যামানা এবং উরফ (তথা সমাজ জীবনের সাভাবিক প্রচলিত নিয়ম-নীতি) পরিবতর্ণের প্রভাবে (সাভাবিকভাবেই) প্রভাবিত হয় , সেসকল বিষয়ের জন্য ইসলাম নিজেও কোনো বিধান দেয় নি; বরং সে এগুলোকে প্রত্যেক যুগ-জামানা ও স্থানের নিজ অবস্থার উপর রেখে দিয়েছে।

কিন্তু ‘পারিবারিক কমিশন’ আমাদেরকে এই সবক পাঠ করাচ্ছে যে, ‘ইসলামের কোনো কোনো বিধান এমনও রয়েছে, যে সব বিধান সমাজ তখন শৈশব বয়সে বিরাজ করছিল বলে দেয়া হয়েছিল‘!!!! ব্যাপার যদি এই-ই হয়, তাহলে আপনাদের উচিত ধীরস্থিরভাবে একথার উপরও একটু  চিন্তা করে দেখা যে, নবুওতের যুগে ‘সমাজ’ যখন তার ‘শৈশব বয়সে’ বিরাজ করছিল, তখন অবশ্যই যাবতীয় বিধিবিধান  তাকে‘শিশুসুলভ’ই দেয়া হয়েছিল ! (তাই না ! আপনার যুক্তি-তো তাই বলে!) আপনি কি আজ পর্যন্ত দেখেছেন যে, যে সকল বিধিবিধান বৃদ্ধদের জন্য উপযোগী, সে সকল বিধিবিধান কোনো শিশুকে দেয়া হয়েছে ? তাহলে, আপনার বক্তব্য মতে আজ যখন সমাজ ‘যৌবনে’ পদার্পণ করেছে, তাতে-তো ওসব ‘শিশুসূলভ’ বিধিবিধানগুলোকে গোড়া থেকেই বদলিয়ে নেয়া দরকার !!! (আল্লাহ রক্ষা করুন)। তাহলে আপনি এতসব বিধানের মধ্য থেকে (বেঁছে বেঁছে) শুধুমাত্র ‘বিয়ের বয়স’ এবং ‘বহু বিবাহে’র বিধিবিধান গুলেকেই কেনো বদলিয়ে নিচ্ছেন ?! সমস্ত বিধিবিধানকে বদলিয়ে ফেলছেন না কেনো, যখন তার সবগুলোকেই  শৈশব-যুগে দেয়া হয়েছে ?! এমনটা হলে-তো নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, ক্রয় বিত্রয় সহ অপরাপর লেনদেন সম্পর্কিত সমস্ত বিধিবিধানের বেলায়ই একথা বলা যেতে পারে যে, এসব বিধিবিধানকে সমাজের শৈশব বয়সে দেয়া হয়েছিল ওদের ভিতরে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রন সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে সমাজ যখন বালেগ হয়ে উঠলো, তো আর ওগুলোর মধ্যে একটিরও প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকলো না।

এই মূলনীতির অবধারিত ফলাফল-তো এই বেড় হয় যে, (নাইযুবিল্লাহ) আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল ﷺ-কে উপযোগী সময়ের পূর্বেই (এমন এক যুগে) দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, যখন তিনি দুনিয়াকে এমন দ্বীনের তালীম ও শিক্ষা দিতে সমর্থ ছিলেন না, যে দ্বীন বর্তমানকার দুনিয়া পর্যন্ত কায়েম থাকতে পারে !

বলি, এসকল পন্ডিতরা কি এভাবেও কখনো চিন্তা করে দেখেছেন যে, সমাজ যখন তার শৈশব কালে অবস্থান করছিল, তখন ইসলাম কি করে ‘স্ত্রীদের’ সাথে ইনসাফ করলো ? সমাজের উন্নতি-অগ্রগতি এবং পূর্ণ সমৃদ্ধির কি এটাই দলিল যে, যতক্ষন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির এক একটি অংগকে পদশৃঙ্খলে কঁষে বাঁধা না যাবে, ততক্ষন পর্যন্ত তাকে স্ত্রীদের উপর অন্যয়-অবিচার করা থেকে থামানই যাবে না ? (তাদের কথা মতো) এই যৌবন-যুগের এই যদি হয় কতক বরকত রাশি, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের আক্কেলের উপর রহম করুন, যারা নবুওতের যুগের সমাজকে ‘শৈশব বয়সের সমাজ’ বলে থাকেন, আর নিজেদের সমাজকে মনে করেন ‘যৌবনে পদার্পিত সমাজ’ ! এর সাথে আবার এই দাবীও করা হয়ে থাকে যে, আমরা যা কিছু বলছি, তা -মুহাম্মাদ মুস্তফা যে ইসলাম নিয়ে এসেছিলেন -একশ ভাগ সেই ইসলামই ! কথা বলতে গিয়ে যাদের এতটুকু হুশ থাকে না যে, আমরা কি বলছি, কার সম্পর্কে বলছি, এর আঘাত কোথায় গিয়ে পড়বে, তাদের এই অধিকার কে দিয়েছে যে, তারা ‘কুরআন-সুন্নাহ’কে চর্চার আসন বানিয়ে নিবে, আর মুখে যা আসে বলে যাবে ?

এবারে আমি কিছুক্ষনের জন্য ধরে নিচ্ছি যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমাজ তার শৈশব বয়সে ছিল। কিন্তু আমাকে কেউ কি একথা বলে দিবে যে, তাহলে সে যুগে কী এমন ব্যাপার ছিল, যার ভিত্তিতে তখন
কম বয়সের বিয়েগুলোর অনুমতি দিয়ে দেয়া হয়েছিল, আবার সেই অনুমতিটি ক্ষতিকারকও ছিল না ? আর আজ কোন সব অবস্থা সৃষ্টি হল, যার ভিত্তিতে কমিশন এই কথা বলছে যে, বর্তমানে ওই অনুমতিটুকু রোহিত হয়ে যাওয়া উচিৎ ? এর কারণ কি তাহলে এই যে, সে সময় ছেলে-মেয়েদের মধ্যে লজ্জা-শরম, স্বতিত্ববোধ ও সংযমশীলতার অনুভূতি বিলুপ্ত ছিল, যার ভিত্তিতে তাদেরকে কম বয়সেই বিয়ে করার অনুমতি দিয়ে দেয়া হয়েছিল ? আর আজ এসব অনুভূতি এতই প্রকট আকার ধারন করেছে যে, কোনো শক্তি নেই যে, কোনো ছেলে বা মেয়ের মানবিক চাহিদা তাকে ১৬ কিংবা ১৮ বৎসর বয়সের পূর্বে কোনো বিপথে যেতে বাধ্য করে ?

বর্তমান জামানায় নব্য বয়সী পাপ ও অপরাধ

এসকল জনাব’রা যদি বাস্তবেই তাদের নিজ জামানা সম্পর্কে এতই সুধারনায় নিমজ্জিত থাকেন, তাহলে আমরা তাদেরকে পরামর্শ দিবো, তারা যেন দয়া করে ‘কানজী রিপোর্ট’টি একবার হলেও অবশ্যই পড়ে নেন। তারা  এ রিপোর্ট থেকে জানতে পারবেন যে, আজকের সমাজে মানবিক চাহিদা ও আকাঙ্খা ৫ বৎসর বয়স থেকেই তার কাজ শুরু করে দেয়। আর ১৬ বৎসরে উপনীত হতে হতে তারা-তো এমন তুফান হয়ে দাঁড়ায় যে, আল্লাহ রক্ষা করুন! এছাড়া ড: গড়চ. সি. শুফলার কর্তৃক প্রদত্ত ওই সমস্ত বক্তব্যের উপরও একটু চিন্তা করে দেখা যেথে পারে, যা তিনি ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনের সামনে উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন-

‘‘নব্য বয়ষগুলোতে মনুষ্য আকাঙ্খা-অনুভূতিগুলো সীমাতিরিক্ত  মাত্রায়র দিকে ধাবিত হতে চলেছে’’।

এর উপর বিস্তারিত আলোচনা দেখতে চাইলে মওলানা আমীন আহসান ইসলাহী সাহেবের কিতাব كايه اقتباس পড়ে দেখুন।

এটর্নী জেনারেল টম ক্লার্ক ‘ফেড়ারেল বুরো অব ইনভেষ্টিগেশন’-এর রেফারেন্স দিয়ে একথা উদ্ধৃত করেছেন যে-

‘‘হত্যা, দাগাবাজী ও ব্যভিচারের অপরাধে সবচাইতে বেশি রয়েছে গড়পত্তা ১৭ বৎসররের নব্য যুবকরাই। এটা কেকলমাত্র ওইসব নব্য যুবকদের গড়, যারা ব্যাভীচারের অপরাধে গ্রেফতার হয়েছে’’!

এমনি করে ইউরোপিয়ান এক স্কুল টিচারের নিম্নোক্ত বক্তব্যটুকুও পড়ে দেখুন, যে কথা নিনা ইপটন (Nina Epton) তার (Love And The English) নামক গ্রন্থে উদ্ধত করেছেন-

‘‘আমার স্কুলে শিশুদের ৫ বৎসর বয়স হতেই কোর্ট শপের মত ঘটনা ঘটতে আরম্ভ হয়ে যায়। আপনি নিজেও সেখানকার নব্য যুবতী মেয়েদেরকে ‘আহবান’ করে দেখতে পারেন। এটা বিশেষ করে ওই সমস্ত ছোট শিশুদের মধ্যে ঘটে, যাদের কোনো বোন নেই। ‘মানবীয় খেলতামাশা’র নামে মানবীয় মেলামেশার বহু ঘটনাই ঘটে যায়।’’

সামনে লিখেছেন-

‘‘এখানে প্রাপ্ত বয়সের কাছাকাছি ছেলে-মেয়েদের মাঝে মানবীয় মেলামেশার এত ঘটনা ঘটে যায় যে, আমি তা গণনাও করতে পারবো না’’।

আর ১৯৫৬ সালের সরকারী রিপোর্ট অনুসারে ইউরোপে-

‘প্রতি ৫ জনে অবশ্যই এমন একজন মেয়ে থাকে, যে ১৭ বছর বয়সের আগেই বাচ্চার আশা করতে পারে’! 

এই রিপোর্টটি উদ্ধত করার পর ‘নিনা ইপটন’ লিখেছেন যে-

‘‘এখানে ১১-১২ বৎসর বয়সেই মেয়েরা বাচ্চার জন্ম দিয়েছে’’।

[Ref: “Love And The English” by Nina Epton: P-338 (Issued 1960)]

বর্তমানে আমার কাছে এমন কোনো বই নেই, যেখানে দেশের ছোট ছেলে-মেয়েদের ‘কান্ডকারখানা’র কথা আলোচিত হয়েছে। তা না হলে আমি আপনাদেরকে বলতে পারতাম যে, এখানকার অবস্থা সম্ভবত: ইউরোপ-আমেরিকা থেকে খানিকটা বেশিই বৈকি, অথবা কমপক্ষে তাদের কাছাকাছি। আপনারা খোদ এদেশেরই বিভিন্ন বস্তি এলাকাগুলোতে একটু এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে দেখে নিতে পারেন যে, আমাদের নব্য উন্মত্ত সন্তানেরা কোন দিকে যাচ্ছে!

[মুফতী মুহাম্মাদ তক্বী উসমানী দা.বা. এই লেখাটি লিখেছেন ১৯৬৩ সালের দিকে। আর আজ ২০১৮ সালে এসে দুনিয়ার নব্য যুবক-যুবতীদের চরিত্রের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তা কে না জানে। অবৈধ যোৗনাচার এবং এ্যাবর্শনের নামে অবৈধ সন্তান হত্যার কালচার আজ জমজমাট। -অনুবাদক]

তাহলে ওটা কোন কারণ, যার উপর ভিত্তি করে কমিশন এই ধারনা করছে যে, এসব আগের জামানায় পাওয়া যেত না বিধায় তখন কম বয়সের বিয়ে-শাদী জায়েয ছিল; আর আজকাল যেহেতু তা পাওয়া যায় না, তাই তা নিষিদ্ধ হওয়া উচিৎ !!! ?

 

 


-:টিকা:- 

((টিকা-১)) বলা বাহুল্য, মূল বইয়ে মুফতী মুহাম্মাদ তক্বী উসমানী (দা:বা:) আইয়ূব খানের আমলে পাশ হওয়া আইনকে ইসলামী শরীয়তের আলোকে পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন – ‘১৮ বৎসরের কম বয়ষ্ক কোনো ছেলে এবং ১৬ বৎসরের কম বয়ষ্ক কোনো মেয়ে’র বিয়ে -আইনতঃ নিষিদ্ধ’। কিন্তু বাংলাদেশে পাশ হওয়া ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ মোতাবেক ২১ বৎসরের কম বয়ষ্ক ছেলে এবং ১৮ বৎসরের কম বয়ষ্ক মেয়ের বিয়ে আইনতঃ নিষিদ্ধ। -(অনুবাদক)

((টিকা-২)) মূল বই-এ বাল্যবিবাহ জায়েয হওয়ার উপর আলেমগণের ‘ইজমা’ সম্পর্কে শুধুমাত্র ইমাম আবু বকর জাসসাস রাযী রহ.-এর উদ্ধৃতিটুকুই রয়েছে। আর যারা মানবে, তাদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। তবুও আমি ইমাম জাসসাসের উদ্ধৃতির পর আরো কয়েকজন বরেণ্য মুহাদ্দেস ও ফিকাহবীদ আলেমের উদ্ধতি আরবী ইবারত সহ জুড়ে দিয়েছি, যাতে বিষয়টি পাঠকের কাছে আরো মজবুত বলে প্রতিয়মান হয়। এ ব্যপারে নির্ভরযোগ্য সকল মুফাসসের ইমাম এবং মুহাদ্দেস ওলামায়ে কেরাম যাঁরা হাদিসের শরাহ’তে শিশু-বিয়ের আলোচনা এনেছেন, তাঁরা শিশু বিয়ে শরীয়তে জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সর্বসম্মত। মুসতাহীদ ও মুহাক্কেক ফিকাহবীদ আলেমগণের এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ফাতওয়ার কিতাব মনে হয় পাওয়া যাবে না, যেখানে ‘নাবালেগ মুসলীম ছেলে-মেয়ের বিয়ে’ বিষয়ক আলোচনা আনা হয়নি; সেখানে তাঁরা শিশু বিয়ের   শর্ত-শরায়েত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। এখানে সকল কিতাবের উদ্ধৃতি বা কমপক্ষে রেফারেন্স দেয়া কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।  বিস্তারিত জানতে হলে পড়ন: জামেউ বায়ানিল কুরআন, ইমাম তাবারী- ১৪/১৪২; তাফসীরে কুরতুবী- ৫/১৩; তাফসীরে ইবনে কাসির- ৮/১৪৯; তাফসীরে কাবীর, ইমাম রাযী- ১৫/৩৭৭; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৩/২৩৯; আল-ইসাবাহ, ইবনে হাজার- ৮/১৬; আল-ইজতিযকার, ইবনুল বার- ১৬/৪৯; শারহুল মুসলীম, ইমাম নববী- ৯/২০৬; আল-মুদা্ওয়ানাতুল কুবরা- ২/১০০; আল-উম্ম, ইমাম শাফেয়ী- ৫/২১; আল-মুগনী, ইবনে কুদামা- ৯/৩৯৮; আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযাম- ৯/৪৫৮; শারহু ফাতহিল কাদীর, ইবনুল হুমাম- ৩/২৭৬; আল-মাবসূত, ইমাম সারাখসী- ৪/২১২; আদ-দুররুল মুখতার’ হাসকাফী- ৩/৫৫; আল বাদায়াউস সানায়ী, কাসানী- ২/৩১৫; নাইলুল আউতার, শাওকানী- ৬/২৫৪; আওনুল মা’বুদ- ৬/৮৩; আদ-দেরায়াহ- ২/৬২; নসবুর রায়াহ, যাইলায়ী- ৩/১৯৫; মিসবাহুয যুজাযাহ- ২/১০২; আল-ইনসাফ- ৮/১১০; ফাতওয়া ফিকহিয়াতুল কুবরা- ৪/৯৭; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া- ১/২৯১;   ইত্যাদি। – (অনুবাদক)

((টিকা-৩)) বাংলাদেশ দণ্ড আইন দণ্ডবিধির ধারা নং ৩৭৫, ৩৬৫ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০  -এর সারনির্জাস হল –“একজন পুরুষ ১৬ বৎসরের বেশি বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে বলপূর্বক যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হলে সেটি ধর্ষণ, তথা উভয়ের সম্মতিক্রমে হলে তা ধর্ষণ নয়। আর নিজ বিবাহিত স্ত্রীর বয়স ১৩ বছরের কম হলে তার সঙ্গে যে কোনো ধরনের যৌনসঙ্গমও ধর্ষণ”। মানে, ১৬ বছরের বেশি বয়স এমন যে কোনো যুবতী মেয়ে বা মহিলার সম্মতি থাকলে  তার সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া আইনত: সম্পূর্ণ  বৈধ (হালাল), আর শরীয়ত সম্মত পন্থায় কম বয়সের বিয়ে আইনতঃ নিষিদ্ধ (হারাম), আর যদি ১৩ বছরের কম বয়সী স্ত্রীর সাথে নিজের স্বামীও যৌনমিলন করে, তাহলে সেটাও দেশের আইন মতে ধর্ষন (গোনাহ) !!! দেখা যাচ্ছে, এক দিকে বিয়ের রাস্তা বন্ধ, অন্য দিকে যৌনাচারের রাস্তা খোলা -বাহ ! আমাদের উপর যে পাথর বর্ষন হচ্ছে না, বা জমিন যে আমাদেরকে গিলে খাচ্ছে না -এটা আল্লাহ’র দয়া ছাড়া কিছুই না।

‘বহু বিবাহ’ সম্পর্কিত আলোচনায় আপনারা হয়তো ড: সি কিন্সে’র বক্তব্য পড়ে এসেছেন (আর পড়ে না থাকলে একবার পড়ে নিন)। সেখানে ১৯৩৮ সালের যৌন অপরাধ মূলক এক পরিসংখ্যান দিতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে, যেসব মেয়েরা অবৈধ যৌনাচারের মাধ্যমে অবৈধ-বাচ্চা জন্ম দিয়েছে, তাদের সংখ্যা ১৯৩৮ সাথে ৮৮ হাজার এবং ১৯৫০ সালে ১ লক্ষ ৪২ হাজার পর্যন্ত গিয়ে ঠেঁকেছে। এসব মেয়েদের বয়স ২০ বছরেরও কম, এমনকি এদের প্রায় ৪৪% মেয়ের বয়স ১৫ থেকে ২০- এর মধ্যে! ১৯৫০ সালে এরকম অবৈধ-বাচ্চা জন্মদাতা প্রায় ৩২,০০০ জন মেয়ে’র বয়স দেখা গেছে ১৭ বা তার কিছু কম। এদের মধ্যে স্কুল-কলেজের ছাত্রি এবং ভাল ভাল চাকুরিজীবি মেয়েদের সংখ্যাই বেশি; গরীব ও নি:স্ব মেয়েদের সংখ্যা এদের থেকে কম। ৯ বছরের ভিতরেই মেয়েদের মাঝে যৌন অনুভ’তি সীমাতিরিক্ত আকার ধারন করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। আর এর জন্য তিনি বিশেষভাবে দায়ী করেছেন বিভিন্ন (আশ্লীল ও যৌন উত্তেজক) বই পত্র, বিভিন্ন আনন্দ-বিনদন মাধ্যম, সিনেমা, টেলিভিশন ও থিয়েটারকে।

NSPCC.uk তাদের এক রিপোর্টে বলেছে-“We don’t know exactly how many children in the UK are victims of child abuse. Child abuse is usually hidden from view and children may be too young, too scared or too ashamed to tell anyone about what is happening to them. However, there are a number of different sources of information, including official government statistics and academic research. These give us an indication of the number of children who are affected by abuse. There were over 58,000 children identified as needing protection from abuse in the UK in 2017………Reports of sexual offences against children have increased in the UK”. [Ref: NSPCC.uk Websiteতারা আরো বলেছে- Over 2,900 children were identified as needing protection from sexual abuse in 2015/16……1 in 3 children sexually abused by an adult did not tell anyone…… Over 90% of sexually abused children were abused by someone they knew…… Around a third of sexual abuse is committed by other children and young people….. Over 8,000 contacts to the NSPCC’s helpline last year were concerns about sexual abuse….. Over 63,000 sexual offences against children were recorded by the police in the UK in 2016/17…… Nearly 30,000 registered offenders have been convicted of offences against children…..[Ref: NSPCC.uk Website ]

আমাদের দেশেও এই মহামারী অপ্রতিরোধ্য বেগে ধেয়ে আসছে, বরং বলবো ইতিমধ্যে ধেয়ে এসেছে এবং অগনীত অসংখ্য ছেলে-মেয়েকে তার ঢেউয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। যারা এদেশের পতীতাদের উপর গবেষনা করেছেন, তাদের দেয়া পরিসংখ্যান অনুসারে এ মহামারী আজ ভয়ঙ্কর আকার ধারন করেছে। এডভোকেট সালমা আলী‘র দেয়া তথ্য মতে, পতিতাদের মধ্যে দেখা গেছে শতকরা প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ জনই অপ্রাপ্ত বয়ষ্কা মেয়ে। (দেখুন: জীবনের দামে কেনা জীবিকা: ১২ পৃষ্ঠা) এছাড়াও একটু উচ্চমানের পতীতারা, যারা বিভিন্ন হোটেল,পর্যটন, পার্টি বা বিভিন্ন শ্রেণির আধুনিক শিক্ষিত ও ধ্বনী লোকদের বাসস্থানে গিয়ে ‘সার্ভিস’ (!) দেয়, তাদের মধ্যে স্কুল –কলেজ- ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। পেপার-পত্রিকায় যুবক যুবতীদের অসামাজিক কাজের ঘটনা ছিটে-ফোটা দু একটি ছাপানো হয় মাত্র। বাদ বাকি ভিতরে ভিতরে কিসব কেলেংকারী ঘটে যাচ্ছে, তার বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় কলেজ-ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন ছাত্রদের কাছ থেকিই। এরকমই আমার এক পরিচিত ব্যক্তি আমাকে অতি আক্ষেপের সরে জানালো যে, ‘‘কিছুদিন পর পবিত্র ও স্বতিত্ত্বরক্ষাকারী কুমারী মেয়ে পেতে হলে দুরবিন দিয়ে খুঝে দেখতে হবে কি- না, কে জানে! আজ স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির যুকব-যুবতীদের মোবাইলে মোবাইলে ‘পর্নগ্রাফী’ পাওয়া যায়; কলেজ-ভার্সিটির যুবক-যুবতীরা বিভিন্ন মেসে, বন্ধু বান্ধবের বাড়িতে , হোটেল-পর্যটনে অসামাজিক কাজ করে থাকে। এমনকি অনেকে বিয়ে হওয়ার পরও স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব অসামাজিক কাজে ব্যাপক আকারে লিপ্ত থাকে। আমার এই পরিচিত ব্যক্তিটি আরো জানালো যে, খোদ তার কোনো কোনো পরিচিতজন ও বন্ধুবান্ধবও এতে লিপ্ত আছে, যা সে আগে জানতো না এবং সে কল্পনাও করতে পারেনি যে, তাদের মত এত শিক্ষিত, স্মার্ট ও ‘ভেজা বিড়াল’ রুপী যুবকরা এসব কাজে লিপ্ত হতে পারে। এ পর্যায়ে আরো বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে এরকমই বহু বাস্তব ঘটনা শুনেছি এবং তারাও এই মন্তব্যই করেছেন যে, ‘যুবক-যুবতীরা আজ ব্যাপকভাবে যৌনচর্চায় লিপ্ত হচ্ছে’, যার ফিরিস্তি অতি দীর্ঘ; এত স্বল্প পরিসরে তার বর্ণনা দান সম্ভব নয়। এসব ছাত্র ছাত্রীরা বাংলা, হিন্দি, ইংরেজী বিভিন্ন অশ্লীল ফ্লিম, বিভিন্ন অশ্লিল ওয়েব সাইট, অশ্লীল বইপত্র, ম্যাগাজীন দেখে, সংগ্রেহে রাখে, হাত বদল করে, বিক্রিও করে। আরও আাশ্চর্য হবেন যে, ক্লাস ৮-৯ এর ছেলে-মেয়েদের মাঝেও এসব অসামাজিক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, বিশেষ করে (ধ্বনীক পরিবারের) ইংলীশ মিডিয়াম পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্যীদের মাঝে। বৃদ্ধিজীবি, রাজনীতিক এবং এদের সমমনাদের মতে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে এবং ২১ বছরের কম বয়সী ছেলেরা হল ‘শিশু’ (!) স্তরের, এদের এখনও বিয়ের বয়স হয় নি! এদিকে আবার যৌন বিদ্যায় এরা ডক্টোরেট ডিগ্রীধারি! এদের অসামাজীক কাজ কারবার সমাজ ও আইনের চোখে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়; বাচ্চা মানুষ, এমনটা একটু-সেকটু করবেই’’ -এই হল হাল সমাজের হাবভাব। আর এদেরকেই যখন বিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়, তখন রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবি ও কুটনীতিকদের পক্ষ থেকে এই বাচ্চা (!) বয়সে বিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে মিসাঈল বর্ষন শুরু হয়ে যায়! এজাতীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে সমাজ সংস্কারের জন্য পরামর্শ নিলে সে সমাজে ‘জেনা করা অনুমোদিত, আর ‘বিয়ে করা নিষিদ্ধ’ হবে না তো , আর কি হবে! -(অনুবাদক)

((টিকা-৪)) মুসলীম শিশুদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার কথা-তো দূরে থাক, বর্তমানে ‘ধর্মমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা’ কার্যকর করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। জেনারেল শিক্ষা ব্যবস্থায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত ‘ধর্মশিক্ষা’ নামে যা সংযুক্ত রয়েছে, তা থাকা-নাথাকা প্রায় সমানই বলা চলে। পড়াশুনার শুরু থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এসব ‘ধর্মশিক্ষা’ নামের পাঠ্যবই পড়ে দ্বীন ইসলামের সুক্ষাতিসুক্ষ বিষয়গুলোর কথা-তো আরও পরে, খোদ মোটা মোটা বিষয়গুলোর মৌলিক ও প্রাথমিক জ্ঞানটুকু অর্জন করাও কোনো মুসলিম ছেলে-মেয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। সত্যি বলতে, অসম্ভব করে রাখার অভিপ্রায় নিয়েই জেনারেল শিক্ষাব্যাস্থার নাট-বল্টু যুক্ত করে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষরা এর বেশি কিছু সংযোজন করতে নারাজ; গ্রন্থকাররা সংযোজন করতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ এরকম কাটছাট মার্কা পাঠসূচীর বাইরে কোনো কিছু অনুমোদন করতে ইচ্ছুক নন। এসব ‘ধর্ম শিক্ষ’র বই-এ কুরআন-সুন্নাহ’র আলোকে পর্দাহীনতা, সহশিক্ষা, সূদ-ঘুস, জুয়া-জেনা-ব্যভিচার ইত্যাদি নাজায়েয কাজের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা যেমন আপনি পাবেন না, তেমনি এতে বিয়ে-তালাকের বিধান, ওয়ারীছ/উত্তরাধীকার আইন, ইসলামী খিলাফত বিধান, শরয়ী বিচার বিধান-প্রভৃতি কোনো বিধানের নূন্যতম চেহারাটুকুর দেখাও আপনি পাবেন না। আমি যদি বলি  -‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থায় মুসলীম ছেলে-মেয়েদের জন্য ইসলামী শরীয়তের মাত্র ১০-২০% ইলমকে অতীব শুষ্ক আকারে কোনোমতে পানি দিয়ে গলদ্ধ করনের মত ব্যবস্থা করে রেখেছে, বাদ বাকি ৮০-৯০% ইসলামী ইলমকে ছেলে মেয়েদের চিন্তারও বাইরে সরিয়ে রেখেছেন’ -তাহলে বোধহয় কথাটা অত্যুক্তি হবে না। দশম শ্রেণির পর-তো ধর্মশিক্ষার ছুটি। এতকিছুর পরও কোনো কোনো মহল থেকে পড়াশুনার শুরু থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদের জন্য ১০০% ধর্মমুক্ত শিক্ষ চালু করার পরামর্শও খয়রাত করা হয়েছে !!! এদের মধ্যে ঢাকা ইউনিভার্সিটির সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ মনমানুসিকতার সাবেক ইংরেজী প্রফেসর কবীর চৌধুরী (মৃ: ১৩ ডি. ২০১১ ইং)-এর নাম বিশেষভাবে অাসে। এসব ছাড়াও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী শিক্ষাকে (বিশেষ করে ‘ইসলামী পারিবারিক আইন’ পর্যায়ের শিক্ষাগুলোকে ) ভ্রান্ত আঙ্গিকে উপস্থাপন করে ছোট ছোট মুসলিম শিশু  সহ প্রাপ্তবয়ষ্ক নারী-পুরুষদের মস্তিষ্কে একথা ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে, ‘ইসলামী শরীয়তের বিধানগুলো’ অবিচার মূলক, এগুলোর সংশোধন প্রয়োজন! (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাযিউন) এজন্য বলি, তারা ইসলামী শিক্ষাকে জিইয়ে রাখতে দিলেই-বা কোন জায়গায়; সেখানে দ্বীনী ইলমের প্রচার প্রসার হোক -এরা তা কোনো দিনই চাবে না। তবুও তাদেরকে উপদেশ দেয়া ছাড়া বর্তমানে মুসলমানদের কি-ই-বা ক্ষমতা আছে!- (অনুবাদক)

 

 



মুফতী মুহাম্মাদ তাক্বী উসমানী দা:বা: লিখিত ‘মুসলমি পারিবারিক আইন’ বিষয়ক আলোচনা পড়তে নিম্নে ক্লিক করুন।

# ইসলামী শরীয়ত বনাম আইয়ূব খানের মুসলিম পারিবারিক আইন