কেয়ামতের আলামত ও লক্ষন সমূহ – ২ – মহানবী (সা.) এর ভবিষ্যতবাণী

Spread the love
image_pdfimage_print

কেয়ামতের আলামত ও লক্ষন সমূহ – ২ – মহানবী ﷺ -এর ভবিষ্যতবাণী

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

 

আমরা ইতিপূর্বে কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে (এখানে ক্লিক করুন) কিছু হাদিস ও আছার পেশ করেছি। এখানেও কিছু উল্রেখ করা হল। [উল্লেখ্য, এখানে উল্লেখিত হাদিসসমূহ কোনো বিজ্ঞ মুহাদ্দেস আলেমের পরামর্শ ব্যাতীত কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। এগুলো শুধু উল্লেখ করছি, যাতে এই রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত কোনো ঘটনা ঘটতে দেখলে তা চিনে নিতে পারেন এবং রেওয়াতের হক্ব আদায় করতে পারেন।

# আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- بَيْنَمَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي مَجْلِسٍ يُحَدِّثُ القَوْمَ، جَاءَهُ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: مَتَى السَّاعَةُ؟ فَمَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحَدِّثُ، فَقَالَ بَعْضُ القَوْمِ: سَمِعَ مَا قَالَ فَكَرِهَ مَا قَالَ. وَقَالَ بَعْضُهُمْ: بَلْ لَمْ يَسْمَعْ، حَتَّى إِذَا قَضَى حَدِيثَهُ قَالَ: «أَيْنَ – أُرَاهُ – السَّائِلُ عَنِ السَّاعَةِ» قَالَ: هَا أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «فَإِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ»، قَالَ: كَيْفَ إِضَاعَتُهَا؟ قَالَ: «إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ . رواه البخاري في الصحيح, كتاب العلم, باب من سئل علما وهو مشتغل في حديثه، فأتم الحديث ثم أجاب السائل: حديث رقم ٥٩  – ‘(একদিন) রাসুলুল্লাহ ﷺ মজলিসে (বসে) লোকদের সাথে কথা বলছিলেন, এমন সময় এক বেদুইন এসে (তাঁকে) জিজ্ঞেস করলো: কেয়ামত কবে হবে? (কিন্তু) রাসুলুল্লাহ ﷺ (তার কথার উত্তর না দিয়ে) আলোচনা করতে থাকলেন। তখন (মজলিসে উপস্থিত লোকদের মধ্যে) কেউ কেউ (নিজেদের মধ্যে) বললো: সে যা বলেছে, তিঁনি তা শুনেছেন, কিন্তু সে যেটা জিজ্ঞেস করেছে, তিনি (মনে হয় কোনো কারণে ) তা অপছন্দ করেছেন, (তাই উত্তর দিচ্ছেন না)। আবার তাদের কেউ কেউ বললো: বরং, তিনি (আসলে তার কথাই) শুনতে পাননি। একসময় যখন তাঁর আলোচনা শেষ হলো, তখন জিজ্ঞেস করলেন: কেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেসকারী কোথায় -দেখি! সে বললো: (এই যে) এখানে -ইয়া রাসুলাল্লাহ! তখন তিনি বললেন: فَإِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ – ‘যখন আল-আমানত’কে নষ্ট-বরবাদ করে ফেলা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো’। সে জিজ্ঞেস করলো: ‘সেটা কিভাবে নষ্ট-বরবাদ করা হবে’? তিনি বললেন: إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ – ‘যখন (পদ ও পদাধিকার সম্পর্কিত) কোনো বিষয়কে (শরয়ী দৃষ্টিতে) তার গায়রে-আহাল ব্যাক্তির করায়ত্বে সোপর্দ করা হতে থাকবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৫৯]

ফায়দা: এই হাদিসে দেখা যাচ্ছে, আখেরী জামানায় কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগে আগে ঘটবে -এমন বহু আলামতের মধ্যে মাত্র ১টি আলামতের কথা বলে দেয়া হয়েছে, যা দ্বারা বোঝা যায়, এটি যেনতেন কোনো আলামত নয় বরং চোখে পড়ার মতো একটি বিশেষ আলামত। অর্থাৎ এটা এমন একটি লাল বাতী, যা উম্মাহ’র মাঝে জ্বলতে দেখলে বোঝা যাবে যে,  পৃথিবীর মানুষ শেষ জামানায় ঢুকে পড়েছে এবং কেয়ামত অতীব নিকটে চলে এসেছে। আর সেই লাল-বাতী স্বরূপ বিশেষ আলামতটি হল, ‘বিভিন্ন পদ ও পদাধিকারের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ আমানতগুলোর জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর নাজিলকৃত ইসলামী শরীয়তে যাদেরকে সেগুলোর আহাল (হক্বদার ও উপযোগী ব্যাক্তি) সাব্যস্থ করেছেন, শেষ জামানায় এই উম্মত সেই পদগুলোতে একেবারে গায়রে-আহাল (না-হক্বদার ও অনুপযোগী ব্যাক্তি)কে বসানোর সিস্টেম চালু করার মাধ্যমে আল্লাহ’র শরয়ী আমানতকে নষ্ট-বরবাদ করে ফেলবে। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে শরয়ী বিধানকেই পরিবর্তন করে ফেলা হবে এবং তদস্থলে তাদের চালুকৃত নব্য সিস্টেমের অধিনে ব্যাক্তিকে পদায়ন ও ক্ষমতায়ন করানোর ব্যবস্থা চালু করা হবে। 

উপরের হাদিসটিকে উপলব্ধি করার জন্য আহাল (হক্বদার ও উপযোগী ব্যাক্তি) এবং গায়রে-আহাল (না-হক্বদার ও অনুপযোগী ব্যাক্তি) বিষয়টিকে খুব ভাল করে বোঝা দরকার। যে কোনো বিষয়ের আহাল (হক্বদার ও উপযোগী) যারা, তাদের যোগ্যতার মধ্যেও উৎকৃষ্ট, উত্তম, ভাল, নূন্যতম ইত্যাদি স্তর রয়েছে। এদের মধ্যে উৎকৃষ্ট স্তরের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যাক্তিই হল সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অগ্রাধিকারযোগ্য আহাল (হক্বদার ও উপযোগী)। কিন্তু নূন্যতম-এর নিচের স্তরের যে কাউকে বলা হয় ‘যোগ্যতা বহির্ভূত’ ব্যাক্তি (বা গায়রে আহাল)। উদাহরণ স্বরূপ: মনে করুন, কোনো ১ম/২য় শ্রেণির সরকারী প্রশাসনীক পোষ্টে চাকুরীর জন্য নূন্যতম যোগ্যতাগুণ এঁটে দেয়া হল যে, আবেদনকারীকে অবশ্যই সরকার অনুমোদীত কোনো (আধুনিক) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মাস্টার্স/সমমান সার্টিফিকেট থাকতে হবে। সুতরাং, এক্ষেত্রে কৌমি মাদ্রাসা থেকে পাশ করা সর্বোৎকৃষ্ট ছাত্রটিও সংশ্লিষ্ট পোস্টের জন্য নূন্যতম-এর নিচের স্তরের হওয়ায় সে ওই পোস্টের জন্য আবেদনের প্রশ্নেই ‘যোগ্যতা বহির্ভূত’ ব্যাক্তি (বা গাইরে আহাল) হিসেবে গণ্য (-চাই বাস্তবেই সে সব দিক দিয়ে আধুনিক শিক্ষিত সর্বোৎকৃষ্ট ছাত্রদের চাইতেও উত্তম হোক না কেনো)। কিন্তু সরকারী নোটিশের তোয়াক্কা না করে যদি কৌমি মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্রদেরকে চাকুরীর আবেদন করা, পরীক্ষা দেয়া ও সংশ্লিষ্ট পদে চাকুরী দিয়ে পদায়ন/ক্ষমতায়ন করানো হয়, তাহলে অভিযোগ তুলে বলা হবে যে, সংশ্লিষ্ট পোস্টের জন্য নূন্যতম যোগ্যতা গুণের নিচের স্তরের এক ‘যোগ্যতা বহির্ভূত’ ব্যাক্তি (বা গাইরে আহাল) কে ওই পদে পদায়ন/ক্ষমতায়ন করা হয়েছে।

একই ভাবে, আল্লাহ তাআলা ইসলামী জীবনের বিভিন্ন অঙ্গনে বিদ্যমান একেকটি পদ ও পদাধিকারকে একেকটি আমানত হিসেবে দিয়েছেন, যার খেয়ানত করা নাজায়েয এবং তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতিটি আমানতকে যেন তার আহাল (হক্বদার ও উপযোগী ব্যাক্তি)-এর কাছে সোপর্দ করে দেয়া হয়। যেমন, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন-  إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا – ‘নিশ্চই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতগুলিকে তার (স্ব-স্ব) আহাল (তথা হক্বদার ও উপযুক্ত ব্যাক্তি)-এর কাছে সোপর্দ করে দিবে’। [সুরা নিসা ৫৮] 

আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপরে নাজিলকৃত ইসলামী শরীয়তে দেখিয়ে দিয়েছেন, কোন্ কোন্ পদ ও পদাধিকারেরর আহাল (হক্বদার ও উপযোগী) কে এবং তাদের নূন্যতম থেকে উৎকৃষ্ট যোগ্যতাগুণ কী হবে। যেমন, মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান পদটির আহাল (হক্বদার ও উপযোগী) হওয়ার নূন্যতম শরয়ী যোগ্যতাগুণ হল: মুসলীম হওয়া, পুরুষ হওয়া, আক্বেল হওয়া , বালেগ হওয়া,  ইত্যাদি (যার কিছু আলোচনা আমরা এখানে কুরআন সুন্নাহ’র দলিল সহ পেশ করে এসেছি এবং তাতে দেখিয়েছি যে, এব্যাপারে উম্মাহ’র ইজমা রয়েছে)। এই নূন্যতমের উপরের স্তরে অবশ্যই ভাল, উত্তম, উৎকৃষ্ট, সর্বৎকৃষ্ট ইত্যাদি যোগ্যতাগুণ হতে পারে, কিন্তু নূন্যতম-এর নিচের স্তরের যে কাউকে অবশ্যই বলা হবে ‘যোগ্যতা বহির্ভূত’ ব্যাক্তি (বা গায়রে আহাল)। অর্থাৎ, কোনো অমুসলীম (কাফের/মুরতাদ), নারী, না-বালেগ ইত্যাদি ব্যাক্তিরা  শরীয়তের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রপ্রধান পদটির জন্য ‘গায়রে আহাল’ (যোগ্যতা বহির্ভূত ব্যাক্তি) সুতরাং, বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা’র এই শরয়ী নোটিশের তোয়াক্কা না করে মুসলমানরা যদি কোনো অমুসলীম (কাফের/মুরতাদ) অথবা কোনো নারীকে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান বানায়, তাহলে অভিযোগ তুলে বলা হবে যে, সংশ্লিষ্ট পদে শরীয়তের নূন্যতম যোগ্যতাগুণের নিচের স্তরের এক ‘যোগ্যতা বহির্ভূত ব্যাক্তি’ (বা গাইরে আহাল) কে ওই পদে পদায়ন/ক্ষমতায়ন করানো হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বরকতময় যুগ থেকে শুরু করে নিয়ে গত ১৯২০ ইং সালে তুরষ্কের উসমানী খিলাফত ধ্বংসের আগ পর্যন্ত ইসলামী শাসনের সুদীর্ঘ প্রায় ১৪৫০ বছরের ইতিহাসে কোনো দ্বারুল ইসলামের মুসলমানরা কোনো অমুসলীম (কাফের/মুরতাদ) কিংবা কোনো নারীকে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান বানিয়েছিল মর্মে কেউ কোনো দিন দেখেনি। ১৯২০ ইং সালে উসমানী খিলাফত ধ্বংসের পর থেকে মুসলীম উম্মাহ’র মধ্যে কিছু মুসলীম নামধারী পথভ্রষ্ঠ লিডার ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক অনুসারীদের হাত ধরে মুসলীম-প্রধান দেশগুলোতে অমুসলীমদের শেখানো সেকুলারিজস (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ), ডেমোক্রেসি (গণতন্ত্র), সোসালিজম (সমাজতন্ত্র), কমিউনিজম ইত্যকার কিছু আফীম-স্বরূপ খবিস কুফরী মতবাদের নেশা মুসলমানদের মনমস্তিষ্কে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং তারা ইসলামের পরিবর্তে এগুলোকেই দেশীয় মতবাদ হিসেবে গ্রহন করে নেয়া হয়। এসব কুফরী মতবাদ অনুসারে রাষ্ট্রযন্ত্রে ধর্মের কোনো স্থান না থাকায় রাষ্ট্রপ্রধান পদটির আহাল হওয়ার জন্য শরীয়তের ‘মুসলীম হওয়া ও পুরুষ হওয়া’র অপরিহার্য শরয়ী শর্তটিকে তারা আনন্দচিত্বেই বিলুপ্ত করে ফেলে এবং তদস্থলে আইন করে মুসলমান-কাফের, পুরুষ-নারী সকলের জন্য মুসলমানদের উপরে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পথ খুলে দেয়। আজ এর দীর্ঘ ১ শ’ বছর পরে অবস্থা আরো সোচনীয়। এখন আর শুধু রাষ্ট্রপ্রধান পদ নয়, বরং সকল পদেই ওসব কুফরী আক্বীদা’র নারী পুরুষরা ক্ষমতা দখল করে বসে আছে বা পূর্ণ দমে বসানোর আয়োজন চলছে। আর বলা বাহুল্য, এত বড় পদে এত বড় পরিবর্তন হওয়ার অর্থ এর নিচের পদগুলোতে আরো সহজে পরিবর্তন আসা। আর বাস্তবতাও তার স্বাক্ষ্য বহন করে। যেমন:-

(১) মুসলমানদের উপরে নিয়মতান্ত্রিক ‘বিচারক (কাযী/হাকেম)’ পদে সমাসীন হওয়ার অন্যতম নূন্যতম শরয়ী যোগ্যতাগুণ হল মুসলীম হওয়া, পুরুষ হওয়া, যোগ্য আলেমে দ্বীন হওয়া ইত্যাদি (বিস্তারিত)। কিন্তু এই শেষ জামানায় মুসলীম-অসুমলীম (কাফের/মুরতাদ), পুরুষ-নারী, শরয়ী জ্ঞানে ব-কলম -সকলের জন্য মুসলমানদের উপরে বিচারক হওয়াকে বৈধ (হালাল) বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা এসকল পদ ও পদাধিকারের মধ্যে প্রকাশ্য খেয়ানত।

(২) মসজিদের মুতাওয়াল্লী পদটির জন্য মুসলমান মুত্তাকীদের মধ্যে তুলনামূলক যোগ্য কাউকে চয়ন করা শরীয়তের নির্দেশ। কিন্তু এই শেষ জামানায় এমন ব্যাক্তিদেরকে বিভিন্ন মসজিদের মুতাওয়াল্লী, সভাপতি বা মসজিদ কমিটির সদস্যপদগুলোকে দখল করে থাকতে দেখা যায়, যারা প্রকাশ্য মুনাফেক, হারামখোর, অর্থসম্পদ আত্বসাৎকারী, মাস্তান, খুনী, বাটপার কিংবা সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মতো কুফরী মতবাদে বিশ্বাসী কেউ, যাদের একজনও চায় না যে সমাজ ও রাষ্ট্র সহ সর্বক্ষেত্রে দ্বীন ইসলাম কায়েম হোক; পারলে তারা এর পদে পদে বাঁধার সৃষ্টি করে। এটাও এসকল পদ ও পদাধিকারের মধ্যে অত্যন্ত দুঃখজনক প্রকাশ্য খেয়ানত।

(৩) মুসলমানদের পারিবারিক ও সামাজিক ঘরো কোন্দল ও শালিশের জন্য একসময় মানুষ বাস্তবেই সমিহ করে -এমন দ্বীনদার পরহেজগার আলেম ও মুরুব্বীগণ দায়িত্ব পালন করতেন। আজ এই দায়িত্ব পালন করে তারা, যারা মাস্তান পোষে, যারা প্রকাশ্য হারামখোর, অর্থসম্পদ আত্বসাৎকারী, মাতব্বর মাস্তান, খুনী, বাটপার কিংবা সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মতো কুফরী মতবাদে বিশ্বাসী কেউ, যারা এমন প্রকাশ্য মুনাফেক যাদের একজনও চায় না যে সমাজ ও রাষ্ট্রে সর্বক্ষেত্রে দ্বীন ইসলাম কায়েম হোক; পারলে তারা এর পদে পদে বাঁধার সৃষ্টি করে।

(৪) দ্বীনী ইলম শিক্ষাদানের আহাল হলেন ওই সকল আলেমে দ্বীন, যারা এব্যাপারে মাহের (সুবিজ্ঞ ও সুদক্ষ)। রাসুলুল্লাহ সা.-এর যুগ থেকে নিয়ে সুদীর্ঘ হাজার বছর ধরে এই প্রক্রিয়াতেই ইলম শিক্ষাদান ও ইলম হাসিলের গ্রহনযোগ্য ধারাটি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলে আসছিল। কিন্তু আজ এই শেষ জামানায় এ ধারার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আজ ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, কবি সাহিত্যিকরা পর্যন্ত কুরআন সুন্নাহ’র অনুবাদ কিছু পড়েই কিংবা স্বল্প ইলমধারী ইমাম-মুয়াযযীনগণ শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ের ফাতওয়া দেয়া, কুরআনের তাফসীর করা বা হাদিসের ব্যাখ্যা ও ফিকহি আলোচনার পদ দখল করে সবে আছে! এটাও এই সকল পদ ও পদাধিকারের মধ্যে প্রকাশ্য খেয়ানত।

নারী ইমামতী নামাজের নেতৃত্ব(৫) কুরআন-সুন্নাহ ও উম্মাহ’র ইজমা দ্বারা একথা প্রমাণিত যে, পুরুষদের নামাযের জামাআতের ইমাম কোনো নারীকে বানানো সম্পূর্ণ নাজায়েয, কারণ নারী এক্ষেত্রে গায়রে-আহাল (যোগ্যতা বহির্ভূত ব্যাক্তি)। ইসলামের ইতিহাসের গত হওয়া প্রায় ১৪৫০ বছর পর আমরা দেখতে পাচ্ছি নারীর ইমামতীতে পুরুষ মুক্তাদিদেরকে নিয়ে জুমআ ও জামাআতের নামায আদায় করার মতো প্রকাশ্য ঘটনা ঘটতে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহ রাযিউন। এটা ইমামতীর পদের সাথে প্রকাশ্য খিয়ানত এবং কেয়ামতের উল্লেখযোগ্য একটি আলামত।

উপরে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দিলাম বোঝার সুবিধার্থে। অন্যথায় দেখুন একেকটি পদের সাথে কী পরিমান খেয়ানত করা হচ্ছে। সব যায়গায় মুনাফেক, বাটপার, প্রতারক, ধোকাবাজ, হারামখোর ফাসেক-ফাজের মানুষ দিয়ে ভরা। খেয়ানতের এই মহামারীর সময় কিয়ামতের অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এজন্য আমার মতে, উপরের হাদিসে إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ – ‘যখন (পদ ও পদাধিকার সম্পর্কিত) কোনো বিষয়কে (শরয়ী দৃষ্টিতে) তার গায়রে-আহাল ব্যাক্তির করায়ত্বে সোপর্দ করা হতে থাকবে’ -বলতে ১৯১৩ ইং সালে উসমানী খিলাফত ধ্বংসের পরের যুগগুলির দিকে ইশারা করা হয়েছে। এই হাদিসটিও প্রমাণ করে, আমরা শেষ জামানা অতিক্রম করছি। এখন শুধু এক এক করে ইমাম মাহদী, মালহামাতুল কুবরা (মহাযুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ), দাজ্জাল, ঈসা ইবনে মারইয়াম আ., ইয়াজুজ মাজুজ ইত্যাদি ঘটার অপেক্ষা এবং সবশেষে কেয়ামতের পালা।  الله اعلم بالصواب 

# হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِذَا كَانَ أُمَرَاؤُكُمْ خِيَارَكُمْ، وَأَغْنِيَاؤُكُمْ سُمَحَاءَكُمْ، وَأُمُورُكُمْ شُورَى بَيْنَكُمْ فَظَهْرُ الأَرْضِ خَيْرٌ لَكُمْ مِنْ بَطْنِهَا، وَإِذَا كَانَ أُمَرَاؤُكُمْ شِرَارَكُمْ وَأَغْنِيَاؤُكُمْ بُخَلَاءَكُمْ، وَأُمُورُكُمْ إِلَى نِسَائِكُمْ فَبَطْنُ الأَرْضِ خَيْرٌ لَكُمْ مِنْ ظَهْرِهَا . رواه الترمذي: رقم ٢٢٦٦ و قال: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ لَا نَعْرِفُهُ إِلَّا مِنْ حَدِيثِ صَالِحٍ المُرِّيِّ، وَصَالِحٌ المُرِّيُّ فِي حَدِيثِهِ غَرَائِبُ يَنْفَرِدُ بِهَا لَا يُتَابَعُ عَلَيْهَا، وَهُوَ رَجُلٌ صَالِحٌ – ‘যখন তোমাদের উৎকৃষ্ট লোকগুলি তোমাদের শাসক হবে, তোমাদের ধ্বনবান লোকগুলি তোমাদের দানশীলরাই হবে এবং তোমাদের বিষয়আশয়গুলি তোমাদের মাঝে পরামর্শের মাধ্যমে সম্পাদিত হবে, তখন জমিনের উপরিভাগ তোমাদের জন্য জমিনের গহবর থেকে উত্তম হবে। আর যখন তোমাদের নিকৃষ্ট লোকগুলি তোমাদের শাসক হবে, তোমাদের ধ্বনবান লোকগুলি তোমাদের কৃপণরাই হবে এবং তোমাদের (বিভিন্ন পদ ও প্রশাসনিক) বিষয়গুলিকে তোমাদের নারীদের হাতে সোপর্দ করা হবে, তখন জমিনের গহবর তোমাদের জন্য জমিনের উপরিভাগ থেকে উত্তম হবে’। [সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২২৬৬; আস-সুনান, ইমাম দানী, হাদিস ৩০৩; তাহযীবুল আছার, ইমাম তাবারী, হাদিস ১৮৬, ১৩২৫; তারিখে বাগদাদ, খতীব- ২/৫৮৭; হিলইয়াতুল আউলিয়াহ, আবু নুআইম- ৬/১৭৬; আল-উকুবাত, ইবনু আবিদ্দুনিয়া, হাদিস ২৭৯]

ফায়দা: এই হাদিসে এমন যুগের কথা বলা হচ্ছে, যখন -ইসলামী শরীয়ত যেসকল পদের দায়িত্ব পালনের ভার মুসলীম পুরুষদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে- দেখা যাবে যে, সে যুগে উম্মাহ’র একটি গোষ্ঠি ওসকল পদের দায়িত্ব নারীদের হাতে সোপর্দ করতে থাকবে, যার পরিণতিতে এমন সমাজ তৈরী হতে থাকবে যেখানে মুমিন নারী-পুরুষের জন্য ইমান নিয়ে চলাটা এত কঠিন হয়ে পড়বে যে, তাদের জন্য জীবিত থাকার চেয়ে মড়ে কবরে চলে যাওয়াটাই ইমান হিফাজতের প্রশ্নে অধিক নিরাপদ বিবেচিত হবে। 

এই হাদিসটি মূলতঃ উপরের আাগের হাদিসটির সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেখানে বিভিন্ন পদ ও পদাধিকারের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ আমানতকে তার গায়রে-আহাল ব্যাক্তির করায়ত্বে সোপর্দ করাকে কেয়ামতের বিশেষ আলামতের মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। 

যেমন আমরা উপরে বলে এসেছি যে, ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘নারী’  রাষ্ট্রপ্রধান পদটির আহাল নয়, বরং গায়রে-আহাল, বিধায় ইসলামী শরয়তে নারী-রাষ্ট্রপ্রধান সম্পূর্ণ রূপে নাজায়েয; এর উপরে মুসলীম উম্মাহ’র ইজমা রয়েছে। শরীয়তের এই বিধানটিকে পালনার্থে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বরকতময় যুগ থেকে শুরু করে নিয়ে গত ১৯২০ ইং সালে তুরষ্কের উসমানী খিলাফত ধ্বংসের আগ পর্যন্ত ইসলামী শাসনের সুদীর্ঘ প্রায় ১৪৫০ বছরের ইতিহাসে কোনো দ্বারুল ইসলামের মুসলমানরা কোনো নারীকে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান বানানোর কথা কল্পনাও করেনি এবং বাস্তবেও বানায়নি। ১৯২০ ইং সালের পর দেশে দেশে ইসলামী শরীয়তের আইন কানুনগুলোকে রাষ্ট্র থেকে বিলুপ্ত করার যুগ শুরু হয়। এর ক্রমধারায় শরীয়তের এই বিধানটিকে প্রথম পদদলিত করা হয় ১৯৮৬ ইং সালে ‘বেনজির ভুট্টো’কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান বানানোর মাধ্যমে। দ্বিতীয়জন হল খালেদা জিয়া, যে ১৯৯১ ইং সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়। আর তৃতীয়জন হল শেখ হাসিনা, যে ১৯৯৬ ইং সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়। আমার জানা মতে, মুসলীম বলে দাবীদার নারীদের মধ্যে এই তিনজন ছাড়া (আজ ২২ এপ্রিল ২০১৯ ইং পর্যন্ত) চতুর্থ কোনো (মুসলীম দাবীদার) নারী এই উম্মাহর মধ্যে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়নি। (অবশ্য ভবিষ্যতে অন্য কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান হলে সেও এই ভবিষ্যতবাণীর আওতায় পড়ে যাবে)। আলী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বর্ণনা করেছেন- ليأتين على الناس زمان؛ يطرى فيه الفاجر، ويقرب فيه الماحل، ويعجز فيه المنصف، في ذلك الزمان تكون الأمانة فيه مغنمًا، والزكاة فيه مغرمًا، والصلاة تطاولًا، والصدقة منا، وفي ذلك الزمان استشارة الإماء، وسلطان النساء، وإمارة السفهاء . رواه ابن المنادي كما جاء في جامع الأحاديث لجلال الدين السيوطي : ٣٢/٦١ رقم ٣٤٧١٢ ; و في إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة : ٢/٣٨ ; اورده المتقي في كنز العمال : ١٤/٥٧٥ رقم ٣٩٦٤١  – ‘মানুষের উপরে অবশ্যই এমন জামানা আসবে, যখন ফাজের (পাপঘেঁষা খবিস কিসিমের) ব্যাক্তির (অমূলক) প্রশংসা করা হবে, প্রতারককে কাছে রাখা হবে, ইনসাফগার ব্যাক্তিকে (সামাজিক ভাবে) কোণঠাসা করে দেয়া হবে। ওই জামানায় এমন হবে যে, তখন (মানুষজনের দ্বীনদারিত্ব না থাকায় তাদের কাছে) আমানত হয়ে যাবে গণীমত (স্বরূপ, যা তারা নিজেদের ব্যাক্তিগত সম্পর্দের মতো ভোগ করবে। তাদের মধ্যে মুনাফেকী, বদদ্বীনীতা ও ভোগবাদীতা জেঁকে বসার কারণে শরীয়তে ফরযকৃত) যাকাত (-কে তাদের কাছে মনে) হবে জরিমানা (স্বরূপ), নামায হবে দীর্ঘায়িত (তবে অন্তসারশুন্য অথবা বারাবারি মূলক), (তারা যাও-বা কিছু) দান-সদকাহ (করবে, তা) হবে খোঁটাদানমূলক। সেই জামানায় বাদীর কাছে পরমর্শ চাওয়া হবে, নারী রাষ্ট্রপ্রধান হবে এবং মন্ত্রীরা হবে নির্বোধ’। [ইবনু মুনাদী: আল-জামেউল কাবির, ইমাম সুয়ূতী- ৩২/৬১ হাদিস ৩৪৭১২; কানজুল উম্মাল- ১৪/৫৭৫ হাদিস ৩৯৬৪১; ইতহাফুল জামাআহ – ২/৩৮] 

বস্তুতঃ ‘নারী-স্বাধীনতা’, ‘নারী-পুরুষের সম অধিকার’, ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ ইত্যাদির নামে আজ উম্মাহ যা কিছু শুরু করে দিয়েছে, তা এই হাদিসেরই বাস্তব রূপ। আর এখন-তো এমপি, মন্ত্রী, প্রধান স্পিকার, সরকারী বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ, শহর গ্রামের চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, মেয়র, আর্মী-র‌্যাব-পুলিশ-ট্রাফিক-সিকিউরিটি গার্ড, শো-রূম, মার্কেট-দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া, এনজিও -এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে দায়িত্বগুলোকে নারীর হাতে সোপর্দ করা হচ্ছে না। তাই বিনা-দ্বিধায় বলা যায়, হাদিসটির ভবিষ্যতবাণী আমাদের এই শেষ জামানার দিকেই ইংগীত করে করা হয়েছিল।  الله اعلم بالصواب

# আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বিন আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ تُرْفَعَ الْأَشْرَارُ وَتُوضَعَ الْأَخْيَارُ ، وَأَنْ يُخْزَنَ الْفِعْلُ وَالْعَمَلُ وَيَظْهَرَ الْقَوْلُ ، وَأَنْ يُقْرَأَ بِالْمَثْنَاةِ فِي الْقَوْمِ لَيْسَ فِيهِمْ مَنْ يُغَيِّرُهَا أَوْ يُنْكِرُهَا فَقِيلَ : وَمَا الْمَثْنَاةُ ؟ قَالَ : مَا اكْتُتِبَتْ سِوَى كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ . أخرجه الحاكم: ٤/٥٥٥ رقم ٨٦٦١ وقال : صحيح الإسناد ووافقه الذهبي ورواه الحاكم أيضا في المستدرك : رقم ٨٦٦٠ ; مرفوعا ; ابن ابي شيبة في المصنف , كتاب الفتن : ١٤/١٥٣ رقم ٣٨٥٤٥ ; والبيهقي في “الشعب:٤٨٣٤; وأبو عبيد في “فضائل القرآن: ص١٧ ; والدارمي في “سننه: ٤٩٣; والطبراني في “مسند الشاميين: ٤٨٢ ; و صححه الشيخ الألباني في سلسلة الأحاديث الصحيحة : ٦/٧٧٤  – ‘কেয়ামতের লক্ষনসমূহের মধ্যে এও রয়েছে যে, নিকৃষ্টসব জিনিস সমূহকে (মানুষের সামনে) তুলে ধরা হবে এবং কল্যানকর জিনিসসমূহকে নষ্ট করে দেয়া হবে। এও রয়েছে যে, (মানুষের) ক্রিয়া-কর্মকে সংরক্ষন করা হবে ও (মানুষের) কথা’কে (ব্যাপক আকারে) প্রকাশ করা হবে। এও রয়েছে যে, এমন গোষ্ঠির মাঝে ‘আল-মাছনাহ’কে পড়া হবে, যাদের মধ্যে তা পরিবর্তন করা বা তা অপছন্দ/ ঘৃনা/প্রত্যাক্ষান করার (মতো) কেউ থাকবে না। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল: ‘আল-মাছনাহ কি’? তিনি বললেন: ‘আল্লাহ তাআলা’র কিতাব (আল-কুরআন) ভিন্ন অন্য (কিতাব) যা লিখে নেয়া হবে’। [মুসতাদরাকে হাকিম– ৪/৫৫৫ হাদিস ৮৬৬১, ৮৬৬০; শুআবুল ইমান, বাইহাকী ৪৮৩৪; ফাজায়েলুল কুরআন, আবু উবায়েদ: ১৮; সুনানে দারেমী, হাদিস ৪৯৩; আস-সুনান, ইমাম দানী- ৪০০; মুসনাদে শামেয়ীন, ত্বাবরাণী ৪৮২;  আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ- ১৪/১৫৩, হাদিস ৩৮৫৪৫; আদ-দুররুল মানসুর, ইমাম সুয়ূতী ১৩/৩৮০]

ফায়দা: এখানে প্রথম কথা হল, বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বিন আস রা. এক্ষেত্রে ভবিষ্যৎবাণীর মতো এরকম একটি গায়েবী বিষয়কে অবশ্যই রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে তা শুনে তারপরই বর্ণনা করেছেন।

يُخْزَنَ الْفِعْلُ وَالْعَمَلُ وَيَظْهَرَ الْقَوْلُ store কথা ও ক্রিয়া কর্ম সংরক্ষনআমার মতে, এই রেওয়ায়েতে বর্ণিত কেয়ামতের লক্ষন গুলি আমাদের এই শেষ জামানার দিকে ইশারা করে করা হয়েছে, যার একটি উজ্জল প্রমাণ হল এই অংশটি – يُخْزَن الْفِعْلُ وَالْعَمَلُ – ‘(মানুষের) ক্রিয়া-কর্মকে সংরক্ষন করা হবে’। আমার মতে এর দ্বারা আমাদের এই আধুনিক যুগের মানুষজনের দৈনন্দিন বিভিন্ন ক্রিয়া-কর্ম গুলিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ভিডিও আকারে সংরক্ষন করে রাখার ব্যবস্থাদির দিকে ইশারা করা হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ: এক ইউটিউব (YouTube)-এর কথাই চিন্তা করুন, পৃথিবীর এই সর্ববৃহৎ অডিও ভিডিও সংরক্ষনকারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটি তাদের সর্ববৃহৎ আকারের সার্ভারে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের আপলোডকৃত কথাবার্তা, মতামত, খবরাখবর, ছোট-বড় ডকুমেন্টারী, হাসি-ঠাট্টা, আমোদ-প্রমোদ, বিনোদন, নাচ, গান, নাটক, সিনেমা, শিক্ষা-দিক্ষা, প্রশিক্ষন -এমন কোন্ বিষয়টি বাদ রয়েছে যার ভিযিও সংরক্ষন করে রাখা হচ্ছে না। এমনি ভাবে এসমস্ত জিনিসকে এ যুগের অত্যাধুনিক কম্পিউটার, টেপ, ডিডি/ডিভিডিতেও  ওডিও-ভিডিও আকারে সংরক্ষন করে রাখা হচ্ছে। একই ভাবে ‘সিসি-ক্যামেরা’র মতো প্রযুক্তির কথাও চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীর সকল দেশে কোটি কোটি ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট, মার্কেট, রাস্তা-ঘাট প্রভৃতিতে লাগানো সিসি ক্যামেরাগুলোতে দৈনিক কত মানুষের ক্রিয়া-কলাপ সংরক্ষিত হচ্ছে। আর এ যুগের অন্যতম আকর্ষনীয় আবিষ্কার স্যাটেলাইট বা ভূ-উপগ্রহ সিস্টেমের কথাটা চিন্তা করে দেখুন, আকাশে মেঘের কত উপর থেকে কত পরিষ্কার ভিজুয়াল শক্তি নিয়ে প্রতিটি সেকেন্ডে গোটা পৃথিবীতে তার অনুসন্ধানী দৃষ্টি রেখে যাচ্ছে এবং ওগুলোতে ধরা পরা প্রতিটি জিনিসের অবস্থা অডিও-ভিডিও  আকারে বিভিন্ন সার্ভারে সংরক্ষিত হচ্ছে। এই স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট যোগাযোগ সিস্টেমের সাহায্যে মানুষ পৃথিবীর প্রতিটি কোণ থেকে একে অপরের সাথে কথা বলতে পারছে -এমনকি সরাররি একে-অন্যকে দেখে দেখেও; মোবাইলের বিভিন্ন প্রগ্রামড-এ্যাপ এসব সুবিধা দিচ্ছে এবং তা নিজ নিজ ধারায় নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চাহিদা মতো সংরক্ষন করা হচ্ছে। 
মাইক্রোচিপ মাইক্রো চিপ mark of the beastএখন-তো খোদ মানুষের দেহের অংগের ভিতরে ‘মাইক্রো চিপ’ নামক একটি ছোট্ট অত্যাধুনিক জিনিসকে সংযুক্ত করে সেটিকে সরাসরি কম্পিউটারাইজড স্যাটেলাইটরে সাথে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে সংযোগ রক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মানুষটির গতিপথ, চলন-গতি, কেনাকাটা, কথাবার্তা, শরীরের তাপমাত্রা ওব্লাড প্রেশার ইত্যাদি নানাবিধ তথ্য গ্রহন ও সংরক্ষন করা হচ্ছে, এমনকি এই ‘মাইক্রো-চিপ’টিই তার ন্যাশনাল-আইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র), ব্যাংক ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড পরিগ্রহ করে নিয়েছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ভবিষ্যৎবানীটি আমাদের এই শেষ জামানা সম্পর্কে। 

আরো বলা হয়েছে- يَظْهَرَ الْقَوْلُ –কথা’কে (ব্যাপক অাকারে) প্রকাশ করা হবে’। বলা বাহুল্য, আগেকার জামানাগুলিতেও মানুষজন তাদের কথা/বক্তব্য/মন্তব্য গুলোকে বিভিন্ন কায়দায় প্রকাশ করেছে, যেমন: শাসকের মহলে, মসজিদ/গীর্যা/উপাসনালয়ে, শিক্ষালয়ে, হাটে-বাজারে, সনাতন চিঠি-পত্রে। কিন্তু এগুলো-তো আগেকার সব জামানারই চিরাচরিত মাধ্যম ছিল। আর আলামত বলতে বোঝায় এমন স্বতন্ত্র কিছু যা বিশেষ ভাবে চোখে পড়ার মতো এবং তা দ্বারা অন্যসব জিনিস থেকে সংশ্লিষ্ট জিনিসটিকে আলাদা করা সম্ভব হয়। হ্যাঁ, আলোচ্য ক্ষেত্রেও আগের যে কোনো জামানা থেকে আমাদের এই অত্যাধুনিক শেষ জামানাটি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্বতন্ত্র ও ও ভিন্ন এবং বিশেষ ভাবে চোখে পড়ার পর্যায়ে উন্নিত, যার কোনো নজির পৃথিবীর ইতিহাসে মিলবে না। এ যুগের মাঠে-ঘাটে, হাঠে-বাজারে, অফিস-আদালতে, রাস্তা-পথে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, মসজিদ/গীর্যা/উপাসনালয়ে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানে, এমনকি খোলা ময়দানে যেমন ‘কথা/বক্তব্য/মন্তব্য/দাবী-দাওয়া’কে প্রতিনিয়ত ব্যাপক হারে প্রকাশ হতে দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় রেডিও-টেলিভিশনে, পেপার-পত্রিকা-ম্যাগাজিনে, বই-পত্রে, ওয়ারলেস ওয়াকিটকি ও মোবাইলে, ইন্টারনেট সোসাল মিডিয়ায় (যেমন: ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, গুগোলপ্লাস ইত্যাদিতে), বিভিন্ন সাধারণ ও ভিডিও ওয়েবসাইটে (যেমন:  ইউটিউব, ডেইলি মোশন ইত্যাদিতে), লাইভ-চ্যাট এ্যাপে (যেমন: ইমো, লাইভচ্যাট, ম্যাসেঞ্জার, স্কাইপ ইত্যাদিতে)। আজ গোটা ইন্টারনেট ও ওয়ারলেস স্যাটেলাইট সিস্টেমের সাহায্যে কোটি কোটি মানুষের কথা/বক্তব্য/মন্তব্যকে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে অপর কোনো প্রান্তে নিমিশের মধ্যেই আদান-প্রদান করা ও তার প্রচার-প্রসার সম্ভব হচ্ছে। এসব এযুগে এতটাই ব্যাপক আকারে হচ্ছে যে, আগেকার কোনো যুগে এর নজির ছিল না। 

হাদিসটিতে আরো বলা হয়েছে- تُرْفَع الْأَشْرَارُ – ‘নিকৃষ্টসব জিনিস সমূহকে (মানুষের সামনে) তুলে ধরা হবে। এখানে ‘নিকৃষ্টসব জিনিস’-বলতে সম্ভবতঃ মিথ্যা, প্রতারণা, ধোকাবজী, রকমারী ফাহেশাপনা-অশ্লীলতা (যেমন: বেপর্দেগী, পর্ণ ইত্যাদি), অশ্লীলতার প্রদর্শনী ও মহড়া (যেমন: বিউটি শো/কনটেষ্ট), যুদ্ধ-বিগ্রহ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-খারাবী, চুরি-ডাকাতী, মস্তানী, ছিন্তাই, অত্যাচার অবিচার ইত্যাদি খারাপ ও নিকৃষ্ট জিনিসগুলোকে পত্র-পত্রিকায়, রাস্তা-ঘাটের প্রদর্শনী বোর্ডে, মঞ্চে, টেলিভিশনে, অডিও বা ভিডিও আকারে সিডি/ডিভিডিতে, মোবাইলে, ইন্টারনেট ওয়েবপেজ ইত্যাদিতে মানুষের সামনে তুলে ধরার বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। মন্দ জিনিসকে মানুষের সামনে তুলে ধরার যত রকমারী মাধ্যম আমাদের এই শেষ জামানায় আবিষ্কৃত হয়েছে এবং তা যে শক্তিশালী প্রভাব নিয়ে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার সাথে আগের কোনো জামানার তুলনাই চলে না। 

হাদিসটিতে আরো বলা হয়েছে- تُوضَع الْأَخْيَارُ – ‘কল্যানকর জিনিসসমূহকে নষ্ট করে দেয়া হবে। অাল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত দ্বীন ও শরীয়তের চাইতে কোন্ জিনিস মানুষের জন্য সর্বাধিক কল্যানকর হতে পারে! এই শেষ জামানার উম্মাহ’র প্রায় সবাই সেই দ্বীন ও শরীয়তের সাথে কী জালেমানা আচরনটাই না করছে! উদাহরণ স্বরূপ: (১) উম্মাহ’র প্রায় সবাই দেশে দেশে কুরআনী সংবিধানের গোটা সিস্টেমকে নষ্ট-বরবাদ করে দিয়ে তদস্থলে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান তৈরীর সিস্টেমকে সানন্দে গ্রহন করে নিয়েছে, (২) উম্মাহ’র প্রায় সবাই আজ ‘ইসলামী-খিলাফত’ (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা)কে নষ্ট-বরবাদ করে দিয়ে তদস্থলে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি শাসনব্যবস্থাকে আনন্দচিত্বে গ্রহন করে নিয়েছে, (৩) উম্মাহ’র প্রায় সবাই ইসলামী শরীয়ত ভিত্তিক বিচারব্যবস্থাকে নষ্ট-বরবাদ করে দিয়ে তদস্থলে ধর্মনিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থাকে আনন্দচিত্বে গ্রহন করে নিয়েছে, (৪) উম্মাহ’র প্রায় সবাই ইসলামের কল্যানকর অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থাকে নষ্ট-বরবাদ করে দিয়ে তদস্থলে সূদ-জুয়া-প্রতারণা নির্ভর ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থাকে আনন্দচিত্বে গ্রহন করে নিয়েছে, (৫) উম্মাহ’র প্রায় সবাই ইসলামের শরয়ী পর্দাব্যবস্থা এবং বালেগ নারী-পুরুষের মাঝে যথাসম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার সিস্টেমকে নষ্ট-বরবাদ করে দিয়ে তদস্থলে জীবনের সকল অঙ্গনে সকল নারী পুরুষকে বেপরওয়া ভাবে বেপর্দায় একাকার হওয়ার ব্যাস্থাকে আনন্দচিত্বে গ্রহন করে নিয়েছে। তারা বালেগ নারী-পুরুষের শরয়ী প্রয়োজনে কৃত বিয়ের পথে জটিল সব আইনী প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে রেখেছে, আর অন্য দিকে ছেলে-মেয়েদের নাজায়েয প্রেমপ্রীতি ও মেলামেশার রকমারী সব পথ খুলে দিয়েছে। … এগুলো মোটা মোটা কয়েকটি উদাহরণ দিলাম -বোঝার সুবিধার্থে। অন্যথায়, ইসলামী শরীয়তের ছোট-বড়-মাঝারি এমন কোন অঙ্গনটি রয়েছে যার সাথে এই জামানার উম্মাহ অত্যাচার করেনি এবং এসবের এক একটিকে উপড়ে ফেলে দিয়ে তদস্থলে ইহূদী-খৃষ্টানদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অনুসরণ অনুকরন ও অনুগত্য শুরু করে দেয়নি! দ্বীন ইসলামের প্রতিটি জিনিসই ছিল কল্যানকর, আর এর প্রায় সবগুলোই নষ্ট-বরবাদ করে ফেলা হচ্ছে; রয়ে যাচ্ছে শুধু কিছু রুসম রেওয়াজ। تُوضَع الْأَخْيَارُ – ‘কল্যানকর জিনিসসমূহকে নষ্ট করে দেয়া হবে’- এই ভবিষ্যৎবাণীটি আমাদের এই শেষ জামানায় এসে যেভাবে খাপ খেয়ে গেছে, তার সাথে ইসলামের প্রায় ১৪৫০ বছরের ইতিহাসের কোনো জামানার তুলনাই চলে না। 

এরপর এই শেষ জামানার আরেকটি বিশেষ আলামতের কথা বলা হয়েছে, আর সেটা হল ‘উম্মাহ’ আল্লাহ তাআলার কিতাব ‘আল-কুরআন’কে বাদ দিয়ে তদস্থলে الْمَثْنَاةُ (আল-মাছনাহ)কে গ্রহন করে নিবে। আর الْمَثْنَاةُ (আল-মাছনাহ) কি -তার উত্তরে বলা হয়েছে مَا اكْتُتِبَتْ سِوَى كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ‘আল্লাহ তাআলা’র কিতাব (কুরআন) ভিন্ন অন্য (কিতাব) যা লিখে নেয়া হবে’। পাঠককে এই উত্তরটির হাক্বিকত বোঝানোর সুবিধার্থে আমি এখানে পথভ্রষ্ঠ ইহূদীদের কাছে ‘তাওরাত’-এর বিপরীতে ‘আল-মাছনাহ’র গুরুত্ব সম্পর্কিত একটি যুৎসই রেওয়ায়েত উল্লেখ করছি, যা থেকে মুসলীম উম্মাহ’র কাছে ‘আল-কুরআন’-এর বিপরীতে ‘আল-মাছনাহ’ ব্যাপক ভাবে ব্যবহারের বিষয়টি বুঝে আসবে, ইনশাআল্লাহ।  যায়েদ বিন আসলামের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে. তিনি বর্ণনা করেছেন- انَّ يَهُودِيَّةً جَاءَتْ إلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَقَالَتْ: إنَّ ابْنِي هَلَكَ، فَزَعَمَتْ الْيَهُودُ أَنَّهُ لَا حَقَّ لِي فِي مِيرَاثِهِ؟ فَدَعَاهُمْ عُمَرُ فَقَالَ: “أَلَا تُعْطُونَ هَذِهِ حَقَّهَا؟” فَقَالُوا: لَا نَجِدُ لَهَا حَقًّا فِي كِتَابِنَا؟ فَقَالَ: “أَفِي التَّوْرَاةِ؟” قَالُوا: بَلَى، فِي الْمُثَنَّاةِ قَالَ: “وَمَا الْمُثَنَّاةُ؟” قَالُوا: كِتَابٌ كَتَبَهُ أَقْوَامٌ عُلَمَاءُ حُكَمَاءُ؟ فَسَبَّهُمْ عُمَرُ وَقَالَ: “اذْهَبُوا فَأَعْطُوهَا حَقَّهَا – (একবার এক) ইহূদী নারী (ইসলামী জাহানের দ্বিতীয় খলিফা) ওমর বিন খাত্তাব রা.-এর কাছে এসে বললো: ‘আমার ছেলে মাড়া গেছে। এখন ইহূদীদের সিদ্ধান্ত হল, তার (তথা ছেলের) রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে আমার কোনো হক্ব নেই’। এতে ওমর রা. তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘তোমরা (ইহূদীরা) কি এরকম (অবস্থায় পতিত) নারীকে (তোমাদের তাওরাতে লিখিত আইন অনুযায়ী) তার হক্ব দাও না’? তারা বললো: ‘আমরা আমাদের কিতাবে তার (মতো অবস্থায় পতিত কোনো নারীর কোনো) হক্ব (থাকার কথা) পাই নেই’। এতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘(পাই না -বলতে কি তোমাদের) তাওরাতে (পাওনা বলদে চাচ্ছো)’? তারা বললো: (জি না, তাওরাতের কথা বলছি না) বরং (আমরা বলতে চাচ্ছি, আমাদের) ‘আল-মাছনা’য় (নেই)। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘আল-মাছনাহ’ কি? তারা বললো: ‘(এটা ওই) কিতাব (যার মধ্যে) আমাদের (ইহূদীদের) বিভিন্ন গোষ্ঠির আলেমরা (তাওরাতের আলোকে নয়, বরং নিজেরা ভাল-মন্দ বিবেচনা করে যেসব) হুকুম-আহকাম লিখেছে (সেই কিতাব)’। এতে ওমর রা. তাদেরকে তিরষ্কার করে বললেন: ‘(তোমরা তোমাদের তাওরাতকে মুসা আ.-এর উপরে আল্লাহ’র নাজিলকৃত কিতাব বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও তাতে লিখিত আইন-কানুন বাদ দিয়ে তোমাদের নিজেদের রচিত আইন-কানুন দেখিয়ে বলছো যে, তার ছেলের সম্পত্তিতে তার কোনো হক্ব নেই ! যাও,) তোমরা গিয়ে ওই নারীকে তার হক্ব দিয়ে দাও’। [আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযাম- ৮/৩৪১]

এখানে ওমর ফারূক রা. কর্তৃক উপস্থিত ইহুদীদেরকে তিরষ্কার করার কারণ হল, ইহূদীরা যদি বাস্তবেই তাদের কাছে রক্ষিত ‘তাওরাত’কে আল্লাহ কর্তৃক মুসা আ.-এর উপর নাজিলকৃত ‘তাওরাত’ বলেই বিশ্বাস করে এবং তাদের জীবনের যাবতীয় আইন-কানুনের শরয়ী ‘উৎস’ বলতে ‘তাওরাত’কেই বুঝে থাকে, তাহলে তাদের ইমানের দাবী হল, তাদের তাওরাতের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোনো মানব রচিত আইনকে মন থেকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা প্রত্যাখ্যান করা এবং ওই নারীর মাসআলার সমাধানও তাওরাত’-এ বর্ণিত হুকুম-আহকামের আলোকে দান করা। কিন্তু এই অভিশপ্ত হতভাগাদের কাছে উত্তরাধিকারের মতো একটি শরয়ী মাসআলার সমাধানের ‘উৎস’ও হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন একটি মানবরচিত আইনের কিতাব, যার সাথে না আল্লাহ’র কোনো সম্পর্ক আছে বলে তারা বিশ্বাস করে, আর বিশ্বাস করে যে, সেটির সাথে তাদের নবী মুসা আ.-এর কোনো যোগসম্পর্ক রয়েছে। এটাই হল, ‘তাওরাত’ বনাম ‘আল-মাছনাহ’র হাক্বিকত। একই ভাবে শেষ জামানাতেও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মাহ’র ইহূদী সদৃশ মানুষগুলির মধ্যেও এই ক্যানসার ব্যাপক হারে দেখা দিবে যে, তারা তাদের জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে ‘আল-কুরআন’কে আইন-কানুনের ‘উৎস’ হিসেবে গ্রহন করার পরিবর্তে বরং তাদেরই নিজেদের হাতে রচিত সব আইনের কিতাবাদিকে আইন-কানুনের ‘উৎস’ হিসেবে গ্রহন করে নিবে এবং তার ভিত্তিতেই জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালিত হবে। আমাদের এই শেষ জামানায় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মাহ’র বেশিরভাগ অংশ কর্তৃক ‘আল-কুরআন’-এর পরিবর্তে স্ব-আইনের কিতাব ‘আল-মাছনাহ’ হল তাদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ও তার আওতাধিন আনুষঙ্গিক আইনের কিতাবাদি’, যা রচনার ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ নির্ভর ইসলামী শরীয়তকে সম্পূর্ণ রূপে বহিষ্কার করে তারপরই রচনা করা হয়েছে বা সময়ে সময়ে হচ্ছে। উম্মাহ’র বেশিরভাগ অংশ-ই ধর্মনিরপেক্ষ আইন রচনার এই সিস্টেমের উপরে রাজি-খুশি এবং তাতে কুরআনের আগমনকে জাতির ধ্বংসতুল্য বলে বিশ্বাস করে, সেখানে তারা তাদের সিস্টেমকে পরিবর্তন করে আল্লাহ’র কুরআনী আইনকে আনতে যাবে কোনে দুঃখে! এদের গোটা গোষ্টিটির সম্পর্কেই কি বলা হয়নি-  أَنْ يُقْرَأَ بِالْمَثْنَاةِ فِي الْقَوْمِ لَيْسَ فِيهِمْ مَنْ يُغَيِّرُهَا أَوْ يُنْكِرُهَا – ‘এমন গোষ্ঠির মাঝে ‘আল-মাছনাহ’কে পড়া হবে, যাদের মধ্যে তা পরিবর্তন করা বা তা অপছন্দ/ ঘৃনা/প্রত্যাক্ষান করার (মতো) কেউ থাকবে না’ !? ইমাম আবু উবায়েদ রহ. (মৃ: ২২৪ হি:) তাঁর কিতাব ‘ফাজায়েলুল কুরআন’-এ উত্তম সনদে এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, যেখানে আছে- أن تقرأ المثناة على رءوس الملأ لا تغير . رواه أبو عبيد في “فضائل القرآن: ١/٣٥ ; اسناده حسن كما قال ابو سليمان جاسم الدرسري في الروض البسام بترتيب وتخريج فوائد تمام : ص ١٠٩ – (কেয়ামতের আলামতের মধ্যে এও রয়েছে) যে, ‘الملأ (আল-মালাউ)দের মাথার কাছে আল-মাছনাহ পাঠ করা হবে, যা (কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও) পরিবর্তন করা হবে না’। [ফাজায়েলুল কুরআন, ইমাম আবু উবায়েদ- ১/৩৫ হাদিস ৩০; গারিবুল হাদিস, ইমাম আবু উবায়েদ- ৪/২৮১; শুআবুল ইমান, বাইহাকী- ৪/৩০৬] পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে কারিমায় الملأ ‘আল-মালাউ’দের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নবী বিরোধীতার কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা ‍উল্লেখ করে দেয়ার মুনাসেব স্থান এটি নয়। আপনি নমুনা পেতে হলে ‘সূরা হুদ’টি পড়ে দেখুন, তাতে দেখবেন নবী নূহ আ. সহ বিভিন্ন নবীগণের উপরে নাজিলকৃত ওহীকে সমাজে বাস্তবায়নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁদের স্ব-স্ব জামানার ‘আল-মালাউ’রা। যেমন, ফেরাউনের রাজদরবারের এক ‘আল-মালাউ’ ছিল ‘হামান’, এছাড়াও অনেকে। এমনি ভাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মক্কী জীবনে আবু জাহল, ওত্ববা, শাইবা, আবু সুফিয়ান প্রমুখ ‘আল-মালাউ’রা (সমাজপতি ও নেতারা) দ্বীনের পথে বিভিন্ন ভাবে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মনে হয় ‘আল-মালাউ’ কারা -তা বুঝতে তেমন কষ্ট হচ্ছে না। এই শেষ জামানায় উম্মাহ’র ‘আল-মালাউ’রা হল বিভিন্ন দেশের ধর্মনিরপেক্ষ-কর্ণধাররা এবং তাদের আইনের দলিল ‘আল-মাছনাহ’ হল তাদের দ্বারা রচিত ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ও আনুসঙ্গিক আইন-কানুনের বই। এই হাদিসের সকল বর্ণনা আমাদের এ যুগে পূর্ণ হয়ে গেছে। الله اعلم بالصواب

# আবু মালেক আশআরী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ، يَسْتَحِلُّونَ الحِرَ وَالحَرِيرَ، وَالخَمْرَ وَالمَعَازِفَ . أخرجه البخاري في صحيحه معلقاً : باب ما جاء فيمن يستحل الخمر ويسميه بغير اسمه ,: ٥/٢١٢٣ , اسناده صحيح, لأن هشام بن عمار من شيوخ البخاري, و قد روى البخاري عنه في صحيحه , بل، أخرج البخاري في صحيحه حديثين أو ثلاثة مسندة قال فيها: حدثنا هشام بن عمار; قال ابن حجر في فتح الباري : ١٠/٥٥ : والحديث صحيح معروف الاتصال بشرط الصحيح ; أن هذا الحديث لم ينفرد به هشاماً أيضاً، بل أخرجه الإسماعيلي في صحيحه (ومن طريقه البيهقي في الكبرى : ٣/٣٧٢ رقم ٦١٣٠، و ابن حجر في تغليق التعليق : ٥/١٨ . صححه الألباني في سلسلة الأحاديث الصحيحة : ١/١٨٦ رقم ٩١  – ‘অবশ্যই (নিকট ভবিষ্যতে) আমার উম্মতের মধ্যে (এমন) গোষ্ঠি সমূহ হবে, (যারা) লজ্জাস্থান’কে, রেশমী পোশাককে, খামরুন (মদ ও মাদক)কে এবং বাদ্যযন্ত্রকে -হালাল গণ্য করে নিবে’। [সহিহ বুখারী -৫/২১২৩] 

ফায়দা: এখানে  يَسْتَحِلُّونَ -‘তারা হালাল গণ্য করে নিবে’ ক্রিয়াটি মূলে اِستَحَلَّ থেকে উৎপন্ন, যার বহু অর্থের মধ্যে একটি মশহুর অর্থ হল: কোনো হারাম/অবৈধ কিছুকে হালাল/বৈধ মনে করা বা গণ্য করা। এর আরেকটি অর্থ হল- কোনো কিছু কার্যকর/চালু করা বা চালুর পথ খুলে দেয়া। এখানে দুটি অর্থই হতে পারে এবং আমাদের এই শেষ জামানার উম্মাহ’র বাস্তব অবস্থা থেকে অনুমিত হয় যে, ইতিমধ্যে তারা এই দুই অর্থকেই পূর্ণতা দিয়ে দিয়েছে। 

এখানে الحِر বলতে ‘লজ্জাস্থান’ উদ্দেশ্য, আর এ হিসেবে ‘লজ্জাস্থানকে হালাল গণ্য করে নেয়া’র অর্থ হল ‘জেনা-ব্যাভিচার’কে হালাল করে নেয়া বা ‘জেনা-ব্যাভিচার’কে সমাজে চালু করা বা চালুর পথ খুলে দেয়া। এ যুগের পথভ্রষ্ঠ উম্মাহ’র মধ্যে কিছু কিছু গোষ্ঠি ‘জেনা-ব্যাভিচার’কে বিভিন্ন ভাবে হালাল (বৈধ) করে নিয়েছে, তার কয়েকটি উদাহরণ নিম্নরূপ। যেমন:

(১) ইসলামী শরীয়তে কোনো মুসলীম পুরুষের জন্য আহলে কিতাব (ইহূদী ও খৃষ্টান) নারী ছাড়া বাকি সকল অমুসলীম-কাফের নারীকে (যেমন: হিন্দু, শিক, নাস্তিক, কাদিয়ানী প্রমুখ নারীকে) বিয়ে করা হারাম -যাবৎ না তারা মুসলীম হয়। একই ভাবে কোনো মুসলীম নারীর জন্য সকল অমুসলীম-কাফের পুরুষকে (যেমন: ইহূদী, খৃষ্টান, হিন্দু, বৈধ্য, নাস্তিক, কাদিয়ানী প্রমুখ পুরুষকে) বিয়ে করা সম্পূর্ণ হারাম -যাবৎ না তারা মুসলীম হয়। কিন্তু এ যুগে অনেকেই শরীয়তের এই বিধানকে পিঠের পিছনে ফেলে দিয়ে অমুসলীম-কাফের ব্যাক্তিকে বিয়ে (!) করছে। অথচ, শরীয়তের দৃষ্টিতে এদের মাঝে কোনো বিয়েই সংঘটিত হয়নি, সুতরাং তারা নিজেদেরকে স্বামী-স্ত্রী মনে করে যে সকল মেলামেশা করছে তার সবই হচ্ছে জেনা-ব্যাভিচার। 

(২) ইসলামী শরীয়তে বিয়ের পর ‘তালাক/ডিভোর্স’ দানের কিছু শরয়ী নিয়ম-নীতি রয়েছে, যা পালন না করলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তা ‘তালাক/ডিভোর্স’ হিসেবেই গণ্য হবে না, আর ‘তালাক/ডিভোর্স’ শরীয়ত সম্মত না হলে ‘বিয়ে’ পূর্ববৎ বহাল থাকে এবং তারা উভয়ে বৈধ স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হয়। যেমন: শরীয়তে শুধুমাত্র স্বামী তার স্ত্রীকে ‘তালাক/ডিভোর্স’ দিতে পারে; আর স্ত্রী (শরীয়ত সম্মত কারণে) স্বামীর থেকে বা শরীয়ত অনুমোদিত কাযী/জাজের কাছ থেকে শরয়ী কায়দায় ‘তালাক/ডিভোর্স’ নিয়ে নিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ কুফরী আইন আজ কুরআনী আইনকে পরিবর্তন করে মুসলীম নারীরও এই অধিকার দিয়েছে য়ে, সে তার স্বামীকে ‘তালাক/ডিভোর্স’ দিতে পারবে এবং দিলে তা কার্যকর হয়ে আইনত বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যাবে। এই উম্মাহ’র ধর্মনিরপেক্ষ নারীদের মধ্যে আজ অনেকেই শরয়ী আইনকে এই বিধানকে পিঠের পিছনে ফেলে তদস্থলে ধর্মনিরপেক্ষ কুফরী আইন অনুসারে তার স্বামীকে ‘তালাক/ডিভোর্স’ (!) দিয়ে অন্য স্বামী গ্রহন করছে। অথচ, শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রথম স্বামীকে শরীয়ত বিরোধী কায়দায় প্রদত্ত ‘তালাক/ডিভোর্স’ কার্যকর গণ্য না হওয়ায় ওই প্রথম স্বামী তখনো পর্যন্ত তার ভৈধ স্বামীই রয়ে গেছে, সুতরাং প্রথম স্বামী থাকাবস্থায় দ্বিতীয় পুরুষের সাথে তার বিয়েই হালাল/বৈধ হয়নি। সুতরাং ওই নারী দ্বিতীয়জনকে তার স্বামী গণ্য করে যে সকল মেলামেশা করছে তার সবই হচ্ছে জেনা-ব্যাভিচার।       

(৩) এযুগে নারীকে জেনা-ব্যাভিচারের জন্য সরকারী ভাবে লাইসেন্স প্রদান করে তার লজ্জাস্থানকে একেবারে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জেনা-ব্যাভিচারের জন্য হালাল/বৈধ করে দেয়া হচ্ছে। 

(৪) এযুগের ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী, বয়ষ্ক নারী পুরুষের মাঝে নাজায়েয প্রেম-প্রীতি, জেনা-ব্যাভিচার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ঝোপ-ঝাড়ে, বনে-বাদারে, বাড়িতে, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে, ক্লাবে, পার্টিতে যখন যেখানে এরা সুযোগ পাচ্ছে, উভয়ে উভয়ের লজ্জাস্থানকে (শরীয়ত সম্মত বিয়ে ছাড়াই) হালাল/বৈধ করে নিচ্ছে।

(৫) এখন-তো এক পুরুষ আরেক পুরুষের সাথে এবং এক নারী আরেক নারীর সাথে যৌনাচার ও সমকামীতার মতো মারাত্মক হারাম কাজটিকে ‘অধিকার’ বলে দাবী তোলা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশে সরকারী ভাবে অনুমতিও দেয়া হচ্ছে, কোনো কোনো দেশে সমকামীদের মাঝে ঘটা করে বিয়ে-শাদিও হচ্ছে। এই উম্মাহ’র এক শ্রেণির মাঝেও এই রোগ সংক্রামিত হয়েছে। এটাও লূত আ.-এর কওমের অনুরূপ লজ্জাস্থানকে হারাম কাজে হালাল (বৈধ) করার শামিল। 

এছাড়াও রেশম সুতার তৈরী পাঞ্জাবী, শার্ট, সেলোয়ার-কামিস, শাড়ি ইত্যাদি-তো এযুগে অহরহ বিক্রি হচ্ছে এবং এই উম্মাহ’র ধ্বনিক শ্রেণিরা কোনো রকম রাকঢাক ছাড়াই বেহায়ার মতো পড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের আচরণ দেখে মনেই হয় না যে, রেশমী কাপড়ের ব্যাপারেও শরীয়তে কিছু বলা আছে।

আখেরী জামানা মদকে নাম পাল্টিয়ে হালালএখানে الخَمْر – ‘খামরুন (মদ ও মাদক)’কে হালাল গণ্য করে নেয়া’র অর্থ হল- (১) ‘মদ ও মাদক’ শরীয়তে হারাম হওয়া সত্ত্বেও তা হালাল মনে করা। এযুগের শরীয়ত বিরোধীদের মধ্যে যারা মদ সেবন করে, তারা সরাসরি হালাল (বৈধ) মনে করে। যেমন: এই উম্মাহ’র যারা কমিউনিষ্ট/সোসালিষ্ট বা নাস্তিক হয়ে গেছে তাদের মধ্যে মদ পানকারী নারী-পুরুষরা এমনটা বিশ্বাস করে থাকে। এমনি ভাবে শরীয়ত বিরোধী চেতনার তুর্কি শাসক কামাল আতাতুর্ক মদকে দেশে হালাল করে দিয়েছিল মূলতঃ শরীয়তের সাথে গোয়ার্তুমী আচরন দেখাতে গিয়েই।… (২) ‘মদ ও মাদক’কে (হারাম বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও) মুসলীম সমাজে ব্যাপক ভাবে চালু করা বা চালুর পথ খুলে দেয়া, যেমন: মদ পান ও ব্যাবসার সরকারী লাইসেন্স দিয়ে মদকে সমাজে জিইয়ে রাখা হচ্ছে, আবার পার্লামেন্টে এমন আইন পাশ করা হচ্ছে, যাতে কোনো কোনো মহলের জন্য মদ পানের সুযোগ খোলা থাকে। এমনি ভাবে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা, সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারী-পুরুষরা ‘মদ ও মাদক’কে (হারাম বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও) পার্থিব মৌজ-ফুর্তির অনুষ্ঠান-পার্টিতে মদের আসোর জমাচ্ছে। আমাদের এই শেষ জামানার উম্মাহ’র বাস্তব অবস্থা থেকে অনুমিত হয় যে, ইতিমধ্যে তারা এই দুই অর্থকেই পূর্ণতা দিয়ে দিয়েছে।  

উবাদাহ বিন সামিত রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لَيَسْتَحِلَّنَّ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي الْخَمْرَ بِاسْمٍ يُسَمُّونَهَا إِيَّاهُ . رواه أحمد في المسند : ٥/٣١٨ ; قال قال ابن حجر في فتح الباري : ١٠/٥٥ : سنده جيد ; و صححه الألباني في سلسلة الأحاديث الصحيحة : ١/١٨٢ رقم ٩٠ و في غاية المرام : ١/٢٤; و اخرجه ايضا ابن ماجه : رقم ٣٣٨٥ – ‘অবশ্যই (শেষ জামানায়) আমার উম্মতের মধ্যে একটি গোষ্ঠি খামরুন (মদ ও মাদক)কে হালাল গণ্য করে নিবে -এমন নাম ব্যবহার করে, যে নামে শুধু তাকেই নামকরণ করা হবে’। [মুসনাদে আহমদ– ৫/৩১৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৩৮৫; আল-মুসান্নাফ, ইমাম ইবনু আবি শায়বাহ- ৫/৬৮; মুসনাদে বাযযার, হাদিস ২৭২০; মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসী, হাদিস ৫৮৭] উবাদাহ বিন সামিত রা. থেকেই বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لَيَسْتَحِلَّنَّ آخِرُ أُمَّتِي الْخَمْرَ تُسَمِّيهَا بِاسْمِهَا . رواه محمد بن أبي شيبة في المصنف , كتاب الأشربة , باب من حرم المسكر وقال : هو حرام ، ونهى عنه : ٥/٦٨ رقم ٢٣٧٥٩ و رجاله كلهم من ثقة كما في زوائد ابن أبي شيبه على الكتب الستة لدكتور عبد الستار : ص ٧٣٣ رقم ٦٢٩ – ‘অবশ্যই আমার আখেরী উম্মত (-এর মধ্যে একটি গোষ্ঠি) খামরুন (মদ ও মাদক)কে হালাল গণ্য করে নিবে -তার (এমন) নাম ব্যবহার করে, যে নামে তার নামকরণ করা হবে’। [আল-মুসান্নাফ, ইমাম ইবনু আবি শায়বাহ- ৫/৬৮ হাদিস ২৩৭৫] এ থেকে বোঝা য়ায়, এই অ-কাম’টি করবে এই উম্মতের শেষ জামানার লোকদের মধ্যে একটি গোষ্ঠি।

বাদ্যযন্ত্র (Musical Instrument) শেষ জামানাআর বাদ্যযন্ত্র (Musical Instrument)-কে এ যুগে এতটাই ব্যাপক ভাবে হালাল/বৈধ করে নেয়া হয়েছে যে, এই উম্মাহ’র একটি বিরাট অংশ তার চুড়ান্ত করেই ছাড়ছে। মোবাইলে, টিভিতে, কম্পিউটারে, ইন্টারনেটে, খোলা ময়দানে, রাস্তা-ঘাটে, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে, ক্লাবে, পার্টিতে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে, সামাজিক অনুষ্ঠানে -এমন কোনো স্থান মনে হয় বাদ নেই, যেখানে বিভিন্ন সনাতন ও অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্র (Musical Instrument) ওয়ালা কান-ভাজানো শুধু গান বা গানের তালে তালে নাচ/ড্যান্সের আসোর জমানো হচ্ছে না। এগুলোর কোনো কোনোটিতে আরো যুক্ত থাকছে নারী-পুরুষের নাজায়েয পোষাকের মহোড়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, অশালীন মেলামেশা। আমার জানা মতে পৃথিবীর মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরবে সেখানকার ওলামায়ে কেরামের কারণে এতদিন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এসব বাদ্যযন্ত্র ও নাচ-গানের অনুষ্ঠান হতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান যুবরাজ মুনাফেকে মুহাম্মাদ বিন সালমান পশ্চিমাদের পরামর্শে আইন ও ক্ষমতার অপব্যাবহার করে বহু ওলামায়ে কেরামের মুখ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং শেস-মেস সে মক্কা-মদিনা’র দেশে দাড়িয়ে মুসলমানদের কলিজায় রক্তক্ষরন ঘটিয়ে প্রকাশ্য ব্যান্ড-শো, বিউটি-শো অনুষ্ঠিত করেছে। রেস্টুরেন্টে গানকে খুলে-আম বৈধ করে দেয়া হয়েছে। 

আমার মতে, এই হাদিসের ভবিষ্যতবাণীর সব কিছুই আমাদের এই শেষ জামানায় পূর্ণ হয়ে গেছে; সামনে হয়-তো এর মাত্রা আরো বাড়বে। الله اعلم بالصواب

# হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِنَّ السَّاعَةَ لَا تَقُومُ حَتَّى لَا يُقْسَمَ مِيرَاثٌ . رواه مسلم رقم ٢٨٩٩ – ‘নিশ্চই কেয়ামত কায়েম হবে না, যাবত না (মুসলীম সমাজে শরয়ী আইন অনুযায়ী) মিরাস (উত্তরাধিকার) বন্টন করা বর্জন  হয়ে যায়’। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ২৮৯৯]

ফায়দা: এই ভবিষ্যৎবাণী শেষ জামানার মুসলমানদের সম্পর্কে এবং তা আমাদের এ জামানায় পূর্ণতা লাভ করেছে। উম্মাহ’র এই দূর্গতির প্রধান কারণ হল, (১) কুরআন সুন্নাহ’র ইলমকে পিঠের পিছনে ফেলে দেয়া এবং তদস্থলে অপরাপর পার্থিব জ্ঞানের পিছনে মাতালের মতো দৌড় দেয়া; (ভাল হত, যদি তারা অন্য যে জ্ঞানই শিখুক কিন্তু দ্বীনের ইলম অর্জনকে না ছাড়তো)। (২) পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামী শরীয়াহ’র পরিবর্তে ব্যাপক ভাবে অমুসলীমদের শেখানো অনৈসলামীক উত্তরাধিকার আইনগুলির চর্চাকে গ্রহন করে নেয়া। আল্লাহ তাআলাকে এভাবে অবমাননা করার কারণে তারা তাঁর দ্বীন ও কুরআনী শরীয়ত থেকে বহু দূরে চলে গেছে এবং পরিত্যাক্ত করে রেখেছে শরয়ী উত্তরাধিকার আইনের বাস্তবায়নকে।

আরেক হাদিসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- تعلموا القرآن وعلموه الناس ، وتعلموا الفرائض وعلموه الناس ، فإني امرؤ مقبوض وإن العلم سيقبض وتظهر الفتن حتى يختلف الاثنان في الفريضة لا يجدان من يقضي بها . أخرجه الحاكم في المستدرك, رقم ٧٩٥٠, و النسائي في السنن الكبرى ٦٣٠٥, ٦٣٠٦ , وأبو داو الطيالسي في مسنده ٤٠٣ , والدرامي في سننه ٢٢١, والطبراني في الأوسط ٥٧٢٠, وما في سنن الدارمي قال عنه حسين أسد: إسناده صحيح وهو موقوف على عمر -‘তোমরা কুরআন নিজে শেখো এবং মানুষজনকে শিখাও। তোমরা ফারায়েজ (শরয়ী উত্তরাধিকার আইন) নিজে শেখো এবং মানুষজনকে শিখাও। নিশ্চই আমি একজন মানুষ যাঁকে (একসময়) তুলে নেয়া হবে। নিশ্চই অতিশিঘ্রই (একে একে ইলমের ধারক-বাহক আলেমগণ ইন্তেকাল করবে এবং এভাবেই দ্বীনের) ইলম উঠে যাবে এবং (সাধারণ লোকজন দ্বীনের সহিহ তা’লিম হাসিল না করায় তাদের দ্বারা) ফিতনাহ প্রকাশ পাবে। এমনকি ফারায়েজ (বন্টন) নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ বাঁধবে। (এমনকি) উভয় পক্ষের মধ্যে (শরীয়ত সম্মতভাবে) ফয়সালা করার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না’। [মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস ৭৯৫0; সুনানুল কুবরা, নাসায়ী, হাদিস ৬৩০৫, ৬৩০৬; মুসনাদে তায়ালিসী, হাদিস ৪০৩; সুনানে দারেমী, হাদিস ২২১; মু’জামে আউসাত, ত্বাবরানী, হাদিস ৫৭২০]

এখানে শরীয়ত সম্মতভাবে উত্তরাধিকার ফয়সালা করার মতো আলেম না পাওয়া যাওয়ার অর্থ আলেমগণের অস্তিত্ব একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নয়, কারণ অপরাপর সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, হক্বপন্থি আলেমগণের একটি জামাআত কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে দ্বীনকে কায়েম রাখার জন্য। এখানে অর্থ হল, সমাজে যোগ্য হক্কানী আলেমগণ দূর্লভ হয়ে যাওয়া। আগেকার জামানায় ইলম পিপাসুরা দ্বীন শেখা ও দ্বীনের উপরে চলার খাতিরে দূর দূরান্তের কষ্টকর সফরের ধকল সহ্য করে হলেও ইলম হাসিল করতেন, কারণ তাদের কাছে দ্বীন ও শরীয়তের গুরুত্ব ছিল সর্বাগ্রে। কিন্তু আজ উম্মাহ-তো দ্বীনের সিংহভাগ অংশ থেকেই নিজেদেরকে আলাদা করে নিয়েছে। আর যারাও-বা দ্বীন মেনে চলতে চায়, তারাও কোনো সুযোগ্য হক্কানী আলেমের সন্ধান পেলেও টাকাপয়সা খরচ করে তাঁর কাছে সফর করে গিয়ে ইলম হাসিল করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় না। বলে যে, ‘এই মাসআলাহ’র জন্য আবার এত দূর যাবো ?!’ (অথচ, এরাই আবার চিকিৎসা, আনন্দবিনোদন ইত্যাদির জন্য দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ার সময় বলে না যে, ‘এর জন্য আবার এত দূর যাবো ?!’)। যাদের কাছে দ্বীনই একটা খেলাখেলার মতো তুচ্ছ বিষয়, তারা কোন গরযে দ্বীনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাহ জানতে সফর করতে যাবে ! তারা-তো কাউকে যাচাই বাছাই না করেই হাতের কাছে যাকেই পায় তার কাছে মাসআলাহ জিজ্ঞেস করে। তাও নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের মাসআলাহ। কিন্তু যারা শরীয়তের উত্তরাধিকার আইনকেই অন্যায্য বলে বিশ্বাস করে, তারা মাসআলাহ জানতে সফর করবে কোন্ দুঃখে। এখন-তো এদেরই এক বিরাট গোষ্ঠি কুরআন-সুন্নাহ’র মিরাস/উত্তরাধিকার আইনের সংষ্কার করার জোর দাবী তুলছে, এ দাবী বাস্তবায়নে তৎপরতা চালাচ্ছে, অনেকে প্রকাশ্য বিরোধিতাতেও কোমড় বেঁধে নেমেছে -বিশেষ করে নারী-পুরুষের সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন নিয়ে। الله اعلم بالصواب

# ওমর বিন খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে,  তিনি এরশাদ করেন- أَلا وَإِنَّهُ سَيَكُونُ مِنْ بَعْدِكُمْ قَوْمٌ يُكَذِّبُونَ بِالرَّجْمِ وَبِالدَّجَّالِ وَبِالشَّفَاعَةِ وَبِعَذَابِ الْقَبْرِ وَبِقَوْمٍ يُخْرَجُونَ مِنْ النَّارِ بَعْدَ مَا امْتَحَشُوا . رواه أحمد: رقم ١٥٧ و قال أحمد شاكر : إسناده صحيح – ‘শুনে রাখো, নিশ্চই তোমাদের পর এমন গোষ্ঠির আবির্ভাব হবে যারা -(বিবাহিত জেনাকার নর-নারী শাস্তি) ‘রজম’কে, দাজ্জালকে, ‘শাফাআত’কে, ‘কবরের আযাব’কে এবং কঠিন আযাব ভোগের পর একটি গোষ্ঠির দোযখ থেকে বেড় হওয়াকে -মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে (অস্বীকার করবে)’। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১৫৭]

ফায়দা: শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহিত মুসলীম পুরুষ বা বিবাহিত মুসলীম নারী কর্তৃক জেনা (ব্যাভিচার) প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিকে মাটিতে গেড়ে পাথর নিক্ষেপে ছঙ্গেছাড় করাকে পরিভাষায় الرَّجْم (রজম) বলা হয়। এই রজমের কথা কুরআনে উল্লেখ নেই, তবে তা সাহাবায়ে কেরাম রা., তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীনের যুগ থেকে নিয়ে উম্মাহ’র মাঝে মুতাওয়াতির ইজমা চলে আসছে এবং বিভিন্ন সহিহ হাদিস ও আছার দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ রজমের শাস্তিকে শরয়ী ‘হদ্দ’ হিসেবে কার্যকর করেছেন, সাহাবায়ে কেরামও করেছেন। শেষ জামানায় ‘মুনকেরুল হাসিদ (হাদিস অস্বীকারকারী)’ শ্রেণিটি শুধুমাত্র কুরআনকে পেশ করে যুক্তি দেখাবে যে, ‘যেহেতেু কুরআনে রজমের কথা নেই, তাই আমরা তা মানি না ! এই দিকে ইংগীত করেই বলা হয়েছে যে, একটি গোষ্ঠি রজমকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। একইভাবে আমাদের এই শেষ জামানায় বহু লোক আছে যারা কানা-দাজ্জালের আবির্ভাব, হাশরের ময়দানে রাসুলুল্লাহ ﷺ ও নেককার মুমিনগণ কর্তৃক কারো আযাব মাফ করে দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহৎর কাছে শাফাআত এবং কবরের আযাব’কে গোড়া থেকেই অস্বীকার করে।

আর ‘কঠিন আযাব ভোগের পর একটি গোষ্ঠির দোযখ থেকে বেড় হওয়াকে -মিথ্যা প্রতিপন্ন করাবলতে সম্ভবতঃ মুতা’জিলা গোষ্ঠিটির দিকে ইশারা করা হয়েছে, যারা বিশ্বাস করে যে, কেউ কবিরাহ গুণাহ করলে সে কাফেরদের মতোই চিরকাল দোযখে থাকবে; কোনো দিন দোযখ থেকে বেড় বে না। আমার মতে, এসব ভবিষ্যৎবাণীর সবগুলোই আমাদের এ জামানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। الله اعلم بالصواب

# ত্বলহা বিন মুসরিফ  রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন- إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَتَخَوَّفُهُ عَلَى أُمَّتِي فِي آخِرِ الزَّمَانِ ثَلاثًا : إِيمَانًا بِالنُّجُومِ , وَتَكْذِيبًا بِالْقَدَرِ , وَحَيْفَ السُّلْطَانِ . رواه الإمام الداني في السنن الواردة:١/١٣٢ رقم ٢٨٢ و صححه الألباني في الصحيحة: ٣/١١٨ رقم ١١٢٧  – ‘শেষ জামানায় আমার উম্মতের উপর যে বিষয়গুলো অামাকে ভীত করে তোলে, তার মধ্যে আমি শংকাবোধ করি তিনটি জিনিস (নিয়ে): (ভাল-মন্দ ভাগ্য নির্ণয়ের ব্যাপারে) নক্ষত্রের উপর ইমান (রাখা), তাক্বদীরকে মিথ্যা ভাবা/প্রতিপন্ন করা এবং সুলতান (শাসক)-এর অন্যায়-অত্যাচার’। [আস-সুনান, ইমাম দানী- ১/১৩২ হাদিস ২৭২]

ফায়দা: এখানে إِيمَانًا بِالنُّجُومِ – ‘নক্ষত্রের উপর ইমান রাখা’ বলতে সম্ভবতঃ জ্যোতিষ শাস্ত্রবাদী লোকজন কিংবা তাবিজ-কবচকারীদের শেখানো ‘অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে অমুক ক্ষতি হয়েছে’, ‘অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে শনি লেগেছে, ইনকাম বন্ধ হয়ে গেছে’ ইত্যাদি বিশ্বাসের দিকে ইশারা করা হয়েছে। এ জামানার বহু লোক এসব বিশ্বাস করে এবং নিজেদের উপর থেকে ক্ষয়-ক্ষতি ও বিপদ সরানোর জন্য জ্যোতিষ শাস্ত্রবাদী বা তাবিজ-কবচকারীদের দারস্থ হয়। আজকাল-তো নামকরা পেপার পত্রিকাতেও  নিয়মিত জ্যোতিষ-শাস্ত্র ছাপা হয় !!!

আর تَكْذِيبًا بِالْقَدَرِ – তথা ‘ত্বাকদীর (ভাগ্য)’কে একটা ডাহা মিথ্যা বলে মনে করা বা অস্বীকার করাটা-তো এখন লিবারেল কিসিমের শিক্ষিত সমাজের কাছে একটা আধুনিক ‘বিশ্বাস/চেতনা’র রূপ নিয়েছে। তাছাড়া এই উম্মাহ’র মধ্যে যারা নাস্তিকত্ব মাখা কমিউনিজম মতবাদটিকে তাদের নিজের মতোবাদ হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছে, তারা-তো খোদ আল্লাহ তাআলা’র অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে, সেখানে ‘ত্বাকদীর (ভাগ্য)’-এর উপরে আল্লাহ’র কুদরতী হাতের কথা বিশ্বাস করার-তো তাদের কল্পনাতেও আসে না। الله اعلم بالصواب

# হযরত আবু আলা রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- سمع عبد الله بن المغفل ابنا له وهو يقول : اللهم إني أسأل القصر الأبيض عن يمين الجنة قال : يا بني إذا سألت فاسأل الله الجنة و تعوذ به من النار فإني سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول :  يكون في آخر الزمان قوم يعتدون في الدعاء والطهور . صحيح ابن حبان:١٥/١٦٦ رقم ٦٧٦٣ , قال شعيب الأرنؤوط : إسناده صحيح على شرط مسلم – ‘(একবার) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল রা. তাঁর ছেলেকে বলতে শুনলেন, সে (দোয়ার মধ্যে) বলছে: হে আল্লাহ! আমি জান্নাতের ডান দিকে উজ্জল-শুভ্র প্রাসাদ চাই। (একথা শুনে) তিনি বললেন: হে পুত্র! তুমি যখন চাবে, তখন আল্লাহ’র কাছে জান্নাত চাও এবং তাঁর কাছে দোযখ থেকে পানাহ চাও। (এতটুকু দোয়ার মধ্যে জান্নাতের সকল নেয়ামত যেমন অন্তুর্ভূক্ত থাকবে, তেমনি দোযখের সকল প্রকার আযাব থেকেও মুক্তির বিষয়টি অন্তুর্ভূক্ত থাকবে) আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: শেষ জামানায় এমন লোকজন হবে, যারা দোয়া এবং অযু’র মধ্যে বাড়াবাড়ি করবে’। [সহিহ ইবনে হিব্বান- ২/২৯১হাদিস ৬১৮৪]

ফায়দা: আমার মতে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই ভবিষ্যৎ বাণী আমাদের এজামানায় পূর্ণ  হয়ে গেছে। শেষ জামানায় (১) ওযু’তে বাড়াবাড়ি করবে যে লোকগুলি তাদের এক শ্রেণিকে আপনারা অনেকেই দেখেছেন যে, তারা ওযুর সময় নাক বা মুখ কিংবা দু’ হাত ধুতে গিয়ে টেপ জোরে ছেড়ে দিয়ে বারবার ধুচ্ছে বারবার ধুচ্ছে যেন সে মনে করছে যে তার ওই অঙ্গটি এত ধুয়েও ধোয়া হচ্ছে না বা পরিত্রতা হাসিল হচ্ছে না। আর (২) দোয়া’তে বাড়াবাড়ি করবে যে লোকগুলি তাদের একটি চোখে পড়ার মতো নমুনা হল কম শিক্ষিত ইমাম/মুয়াযযিন’দের অনেকেই যে সকল লম্বা লম্বা দোয়া করে থাকে। যেমন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নাম থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে’-তাবেয়ীন সহ বিভিন্ন জামানার নামকরা ওলী ও জুর্গগণের এক এক করে নাম উল্লেখ পূর্বক তাদের রূহের মাগয়েরাত চাওয়া, নফল আমল বকশায়ে দেয়া, খুটিয়ে খুটিয়ে বহু বিষয় উল্লেখ করে লম্বা দোয়া করা, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে থাকে। আমি নিজেই বহুবার বিরক্ত হয়ে হাত নামিয়ে ফেলেছি। যারা  রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শিখানো সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ দোয়ার ভান্ডার পেতে চান, তারা ইমাম জাজরী রহ.-এর ‘হিসনে হাসিন’ কিতাবটি সংগ্রহ করে নিতে পারেন।  الله اعلم بالصواب