কেয়ামতের আলামত ও লক্ষন সমূহ – ৫ – মহানবী (সা.) এর ভবিষ্যতবাণী

Spread the love
image_pdfimage_print

কেয়ামতের আলামত ও লক্ষন সমূহ – ৫ – মহানবী ﷺ -এর ভবিষ্যতবাণী

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

 

আমরা ইতিপূর্বে কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে (এখানে ক্লিক করুন) কিছু হাদিস ও আছার পেশ করেছি। এখানেও কিছু উল্রেখ করা হল। [উল্লেখ্য, এখানে উল্লেখিত হাদিসসমূহ কোনো বিজ্ঞ মুহাদ্দেস আলেমের পরামর্শ ব্যাতীত কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। এগুলো শুধু উল্লেখ করছি, যাতে এই রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত কোনো ঘটনা ঘটতে দেখলে তা চিনে নিতে পারেন এবং রেওয়াতের হক্ব আদায় করতে পারেন।

# আবু জুমু’ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন যে, আবু উবাদাহ ইবনুল জাররাহ রা. একবার রাসুলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন- يَا رَسُولَ اللَّهِ أَحَدٌ خَيْرٌ مِنَّا ؟ أَسْلَمْنَا مَعَكَ وَجَاهَدْنَا مَعَكَ . قَالَ : نَعَمْ , قَوْمٌ يَكُونُونَ مِنْ بَعْدِكُمْ يُؤْمِنُونَ بِي وَلَمْ يَرَوْنِي . أخرجه أحمد في المسند : ٤/١٠٦ , قال حمزة أحمد الزين : ١٣/٢٢٠ رقم ١٦٩١٤ : اسناده صحيح ; و أخرجه ايضا الدارمي في سننه رقم ٢٧٤٤; والطبراني في المعجم الكبير برقم ٣٥٣٨ ; قال الحاكم : ٤/٩٥: هذا حديث صحيح الإسناد ولم يخرجاه . و قال ابن حجر في الفتح : ٧/٦ : وإسناده حسن ; وأخرجه أبو يعلى مسنده رقم ١٥٥٩  – ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! কেউ কি আমাদের চাইতেও উত্তম আছে? আমরা-তো আপনার সাথে (কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে) ইসলাম (অনুগত্যতা) শিকার করে নিয়েছি এবং (আপনি যখন নির্দেশ দিয়েছেন আমরা লাব্বাইক বলে) আপনার সাথে (কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে) জিহাদ করেছি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: হ্যাঁ (তোমাদের চাইতেও উত্তম ব্যাক্তি আছে। ওরা হল) তারা (যারা) তোমাদের পরে (বিভিন্ন জামানায়) আসবে। তারা আমাকে না দেখেও আমার উপরে ইমান আনবে (এবং আমি তাদের সাথে না থাকা সত্ত্বেও তারা আমার রেখে যাওয়া দ্বীন ইসলামকে কায়েম করার জন্য সাধ্য মতো চেষ্টা প্রচেষ্টা চালাবে ও জিহাদ করতে থাকবে)’। [মুসনাদে আহমদ- ৪/১০৬; সুনানে দারেমী, হাদিস ২৭৪৪; আল-মু’জামুল কাবির, ত্বাবরাণী, হাদিস ৩৫৩৭; মুসতাদরাকে হাকিম- ৪/৯৫; মুসনাদে আবু ইয়া’লা, হাদিস ১৫৫৯; তারিখে দামেশক, ইবনুল আসাকীর- ২৩/৩১৮ হাদিস ৫০৭৮] 

# সওবান রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ . أخرجه مسلم: رقم ١٩٢٠ – ‘আমার উম্মতের একটি গোষ্ঠি সর্বদা  সত্যের উপর জাহের (প্রকাশমান) হয়ে থাকবে। যারা তাঁদেরকে দমন করতে যাবে, তারা তাঁদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এমন কি তাঁদের কাছে আল্লাহ’র হুকুম না এসে পৌছা পর্যন্ত তারা ওভাবেই (সত্যের উপর প্রকাশমান হয়ে) থাকবে’। [সহীহ মুসলীম- ২/১৪৩, হাদিস ১৯২০] 
 
ফায়দা: এই জামাআত/গোষ্ঠি/দল’টি হল ‘রাসুলুল্লাহ এবং তাঁর হেদায়েতপ্রাপ্ত সাহাবীগণের’ অনুসারী দল ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’, যাঁরা প্রতিটি জামানাতেই দ্বীন ও শরীয়ত’কে হিফাজত করবেন, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দিবেন, তবুও ইসলাম বিরোধীদেরকে দ্বীন ইসলামের ক্ষতি সাধন করতে দিবেন না। তাঁদের হাতেই এই দ্বীন ও শরীয়ত অদমনীয় ভাবে হিফাজত হয়ে থাকবে -কিয়ামতের আগ পর্যন্ত যতদিন আল্লাহ চাইবেন। আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لاَ يَزَالُ مِنْ أُمَّتِي أُمَّةٌ قَائِمَةٌ بِأَمْرِ اللَّهِ ، لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ ، وَلاَ مَنْ خَالَفَهُمْ ، حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ عَلَى ذَلِكَ . رواه البخاري: رقم ٣٦٤١  –আমার উম্মতের মধ্যে একটি উম্মত (জামাআত/দল/গোষ্ঠি) সর্বদা আল্লাহ’র নির্দেশের উপরে কায়েম থাকবে। যারা তাঁদেরকে দমন করতে যাবে এবং যারা তাঁদের বিরোধীতায় লাগবে, তারা তাঁদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি তাঁদের কাছে আল্লাহ’র হুকুম না এসে পৌছা পর্যন্ত তারা ওর উপরই কায়েম থাকবে’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৬৪১]
 
হাদিসটিতে  حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ– ‘আল্লাহ’র হুকুম না এসে পৌছা পর্যন্ত’ -বলতে ঈসা ইবনে মারইয়াম আ.-এর মৃত্যুর পর কোনো এক সময় একটি বাতাস এসে তখন পৃথিবীর জীবিত থাকা সকল মুমিন নর-নারীর জান কবজ করে নিয়ে চলে যাবে -সেই সময় পর্যন্ত উদ্দেশ্য। এরপর পৃথিবীতে শুধু কাফেররা থাকবে -যতদিন আল্লাহ চাবেন এবং তাদের উপরই কেয়ামত ঘটবে। যাবের বিন আব্দুল্লাহ রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন-  لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ، قَالَ فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ صلى الله عليه وسلم فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ تَعَالَ صَلِّ لَنَا ‏.‏ فَيَقُولُ لاَ ‏،‏ إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ ‏.‏ تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الأُمَّةَ ‏.‏ رواه مسلم في الصحيح, كتاب الإيمان , باب نُزُولِ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ حَاكِمًا بِشَرِيعَةِ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم : ١/١٣٧ رقم ١٥٦ ; و أحمد في مسنده : ٣/٣٨٤ اسناده صحيح – “আমার উম্মতের একটি গোষ্ঠি কেয়ামত পর্যন্ত সর্বদা সত্যের উপর বিরাজমান (থেকে) জিহাদ করতে থাকবে’। তিনি বলেন: ‘পরে (শেষ জামানার মুসলমানদের) মাঝে ঈসা ইবনে মারইয়াম (আসমান থেকে পূণরায়) নাজিল হবেন। পরে তাদের আমীর (আল-মাহদী তাঁকে) বলবেন: ‘(হে ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. !) আসুন, (ইমাম হয়ে) আমাদেরকে নামায পড়ান’। তখন তিনি বলবেন: ‘না, নিশ্চই তোমাদের (মুসলমানদেরই) কেউ তোমাদের কতকের উপর আমীর হবে। (এটা) এই উম্মাহকে আল্লাহ’র (দেয়া বিশেষ) সম্মাননা”। [সহীহ মুসলীম- ১/১৩৭, হাদিস ১৫৬; মুসনাদে আহমদ- ৩/৩৮৪] 
 
ইমাম নববী রহ. লিখেছেন- وأما هذه الطائفة فقال البخاري : هم أهل العلم ، وقال أحمد بن حنبل : إن لم يكونوا أهل الحديث فلا أدري من هم ؟ قال القاضي عياض : إنما أراد أحمد أهل السنة والجماعة ، ومن يعتقد مذهب أهل الحديث ، قلت : ويحتمل أن هذه الطائفة مفرقة بين أنواع المؤمنين منهم شجعان مقاتلون ، ومنهم فقهاء ، ومنهم محدثون ، ومنهم زهاد وآمرون بالمعروف وناهون عن المنكر ، ومنهم أهل أنواع أخرى من الخير ، ولا يلزم أن يكونوا مجتمعين بل قد يكونون متفرقين في أقطار الأرض . وفي هذا الحديث معجزة ظاهرة ؛ فإن هذا الوصف ما زال بحمد الله تعالى من زمن النبي صلى الله عليه وسلم إلى الآن ، ولا يزال حتى يأتي أمر الله المذكور في الحديث . وفيه دليل لكون الإجماع حجة …, – ‘এই الطائفة (গোষ্ঠি/দল) সম্পর্কে ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন- هم أهل العلمতাঁরা হলেন আহলে ইলম (ইলমের ধারক-বাহকগণ)। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেছেন- إن لم يكونوا أهل الحديث فلا أدري من هم ؟ তাঁরা যদি আহলুল হাদিস (হাদিসের ধারক-বাহক) না হন তাহলে তাঁরা আর কারা – তা আমি জানি না। কাযি আইয়ায রহ. বলেছেন- (একথার দ্বারা) ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের উদ্দেশ্য হল ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’ এবং যাঁরা আহলুল হাদিস (হাদিসের ধারক-বাহক) হিসেবে বিবেচিত। (ইমাম নববী বলেন:) আমার মতে, এই الطائفة  (জামাআত/গোষ্ঠি/দল) দ্বারা এমন ব্যাক্তিবর্গ উদ্দেশ্য, যাঁরা (পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে বিদ্যমান) বিভিন্ন ধরনের মুমিনদের ভিতরে (ছড়িয়ে ছিটিয়ে) থাকা একটি (বিশেষ মর্যাদাবান) গোষ্ঠি, যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হলেন বীর মুজাহীদ, কেউ কেউ ফকিহ (ফিকাহশ্বাস্ত্রবিদ আলেম), কেউ কেউ মুহাদ্দেস, কেউ বা জাহেদ (দুনিয়ার মায়া ত্যাগী আবেদ), কেউ নেকির কাজে আদেশকারী ও অন্যায় কাজের নিষেধকারী, এভাবে তাঁদের মধ্যে (ইসলামের) কল্যানকারী অন্য আরো অনেক ধরনের ব্যাক্তিগণ থাকতে পারেন। (আর) এর জন্য এমনটা হওয়া আবশ্যক নয় যে, তাঁরা সবাই মিলে এক সাথে বসবাস করবেন। বরং তাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারেন। (তবে তাঁরা যেখানেই থাকুন না কেনো, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা ইজমাবদ্ধ/ঐক্যবদ্ধ থাকবেন)। আর (দেখুন) এই যে হাদিসভান্ডার, এটা-তো একটি সুস্পষ্ট মু’জিযা। বস্তুতঃ (মুহাদ্দেসগণের প্রচেষ্টায় সংরক্ষিত হাদিসের) এই বিস্তারিত ভান্ডার নবী সা.-এর জামানা থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ’র মহিমার প্রতিফলন ঘটিয়ে আসছে। আর এ ধারা অব্যাহত থাকবে যাবৎ উপরোক্ত হাদিসে বণিত আল্লাহ’র নির্দেশ এসে না পৌছে। এটা একথারই দলিল যে, (আহলে হক্ব আলেমগণের ঐক্যমত তথা) ইজমা হল (শরীয়তের) হুজ্জত/দলিল।….[শারহুল মুসলীম, ইমাম নববী- ১৩/৬৭] الله اعلم بالصواب
 
# আব্দুর রহমান বিন আলা আল-হাদ্বরামী রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إنَّهُ سَيَكُوْنُ فِيْ آخِرِ هَذِهِ الأمَّةِ قَوْمٌ لَهُمْ مِثْلُ أجْرِ أوَّلِهِمْ ، يأمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ، وَيُقَاتِلُوْنَ أهْلَ الْفِتَنِ . أخرجه البيهقي في دلائل النبوة : ٦/٥١٣، له شاهد في المطالب العالية بزوائد المسانيد الثمانية للحافظ ابن حجر : رقم ٤٤٧٦ – “ নিশ্চই এই উম্মাহ’র শেষাংশে অচিরেই (মুসলমানদের) এমন গোষ্ঠি হবে, যারা (এই উম্মাহ’র) প্রথমাংশের (মুসলমানদের) অনুরূপ পুরষ্কার পাবে। (কারণ) তারা (মানুষজনকে) মা’রুফের (তথা কুরআন সুন্নাহ’র) নির্দেশ দিবে এবং মুনকার (তথা শরীয়ত বিরোধী বিষয়াদি) থেকে (মানুষকে) নিষেধ করবে/বাঁধা দিবে এবং ফিতনার ধারকবাহকদের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করবে”। [দালায়েলুন নাবুওয়াহ, ইমাম বাইহাকী- ৬/৫১৩]
 
# হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- إِنَّ فِي الْبَحْرِ شَيَاطِينَ مَسْجُونَةً أَوْثَقَهَا سُلَيْمَانُ يُوشِكُ أَنْ تَخْرُجَ فَتَقْرَأَ عَلَى النَّاسِ قُرْآنًا . رواه مسلم: ١٨; و عبد الرزاق في “مصنفه ,باب أشراط الساعة: ١١/٣٨٣ رقم ٢٠٨٠٧ بإسناد صحيح – ‘নিশ্চই সমূদ্রের মধ্যে (এমন কিছু) শয়তানরা বন্দি রয়েছে, যাদেরকে (নবী) সুলাইমান (আ. তাঁর জামানায়) শিকলাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। শিঘ্রই তারা (সেখান থেকে) বেড় হবে, তারপর মানুষজনের কাছে (গিয়ে পথভ্রষ্ঠ করার উদ্দেশ্যে) কুরআন পাঠ করবে’। [সহিহ মুসলীম, আছার ১৮; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক– ১১/৩৮৩ আছার ২০৮০৭]
 
ফায়দা:  ইমাম দারেমী রহ. নিজ সনদে আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রা. থেকেই বর্ণনা করেছেন- يُوشِكُ أَنْ يَظْهَرَ شَيَاطِينُ قَدْ أَوْثَقَهَا سُلَيْمَانُ عَلَيْهِ السَّلامُ يُفَقِّهُونَ النَّاسَ فِي الدِّينِ . رواه الدارمي في “سننه:١/١٢٥ رقم ٤٢٨ , قال حسين سليم أسد : إسناده ضعيف لضعف ليث بن أبي سليم . وهو موقوف – অচিরেই (এমন কিছু) শয়তানেদের আবির্ভাব হবে, যাদেরকে (নবী) সুলাইমান আ. (তাঁর জামানায়) শিকলাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তারা (এসে) মানুষ জনকে (পথভ্রষ্ঠ করার উদ্দেশ্যে) দ্বীনের জ্ঞান দান করবে। [সুনানে দারেমী– ১/১২৫ আছার ৪২৮]

আর ইমাম ইবনে ওযায়হ রহ. নিজ সনদে বর্ণনা করেছেন- يُوشِكُ أَنْ تَظْهَرَ شَيَاطِينُ يُجَالِسُونَكُمْ فِي مَجَالِسَكُمْ , وَيُفَقِّهُونَكُمْ فِي دِينِكُمْ , وَيُحَدِّثَونَكُمِ , وَإِنَّهُمْ لَشَيَاطِينُ. رواه ابن وضاح فى البدع والنهي عنها , بَابٌ : فِيمَا يُدَالُّ النَّاسُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ : ١/١٠٠ رقم الحديث: ٢٤٥, اسناده ضعيف – অচিরেই (এমন কিছু) শয়তানেদের আবির্ভাব হবে, যারা তোমাদের মসলিসগুলোতে (গিয়ে) বসবে এবং তোমাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান দান করবে ও তোমাদেরকে হাদিস বর্ণনা করে শুনাবে। কিন্তু (আসলে) তারা হল শয়তান। [আল-বাদউ ওয়ান নাহি, ইবনে ওযায়হ- ১/১০০ আছার ২৪৫] 

অার ইমাম আবু আহমাদ জুরযানী রহ. (মৃ: ৩৬৫ হি:) নিজ সনদে বর্ণনা করেছেন- يُوشِكُ أَنْ يَظْهَرَ شَيَاطِينُ ، كَانَ سُلَيْمَانُ أَوْثَقَهُمْ فِي الْبَحْرِ ، يُصَلُّونَ مَعَكُمْ فِي مَسَاجِدِكُمْ ، وَيَقْرَءُونَ مَعَكُمُ الْقُرْآنَ ، وَيُجَادِلُونَكُمْ فِي الِّدِينِ ، وَإِنَّهُمْ لَشَيَاطِينُ الإِنْسِ . رواه ابو احمد الجرجانى فى الكامل في ضعفاء الرجال, الْبَابُ الثَّلاثُونَ مَا يُتَوَقَّعُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ: ١/١١٢ رقم ٩٥; الفقيه و المتفقه للخطيب: ٣/١٥٠ – শিঘ্রই (এমন কিছু) শয়তানদের আবির্ভাব হবে যাদেরকে (নবী) সুলাইমান (আ. তাঁর জামানায়) সমূদ্রে শিকলাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তারা তোমাদের মাসজিদে তোমাদের সাথে নামায পড়বে, তোমাদের সাথে কুরআন পাঠ করবে এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে বাক-বিতন্ডা করবে। ওরা (আসলে) মানব-শয়তান। [আল-কামেল, জুরযানী- ১/১১২ আছার ৯৫ ; আল-ফাকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব- ৩/১৫০; – কাঞ্জুল উম্মাল, আছার ১২১২৫]

এসকল রেওয়ায়েত থেকে বোঝা যায়, কিছু ‘শয়তান জ্বীন’ মানুষের বেশে এসে মুসলমানদের সভা সমাবেশ ও মজলিসগুলোকে ঢুকে পড়বে এবং তাদের মাঝে ফিতনা ও বিভ্রান্তী ছাড়ানোর উদ্দেশ্যে কুরআন হাদিস আক্বিদা ও শরয়ী মাসলা-মাসায়েল -যখন যেটা পারে এসব নিয়ে আলোচনার অবতারনা করবে, এসব নিয়ে মিথ্যা কথা বলবে, এসবের ভিতরে কৌশলে নতুন নতুন মত ঢুকিয়ে দিবে ও ইস্যু তৈরী করে উসকে দিবে। ফলে সাধারণ মুসলমানরা মুর্খতাবসতঃ দ্বীন ইসলাম নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাবে।  الله اعلم بالصواب

# আবু আমের আশয়ারী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- أخوف ما أخاف على أمتي أن يكثر لهم المال فيتحاسدوا فيقتتلوا ويفتح لهم القرآن فيقرأه البر والفاجر والمنافق فيجادلون به المؤمن ابتغاء الفتنة وابتغاء تأويله وما يعلم تأويله إلا الله والراسخون في العلم يقولون آمنا به . اخرجه الداني في السنن الواردة في الفتن وغوائلها والساعة وأشراطها : رقم ٢٤٩ اسناده ضعيف , في سنده ثابت بن أبي ثابت , هو مجهول كما في ميزان الاعتدال: ١/٣٦٣ ; و ابن ابي عاصم في الآحاد والمثاني , باب : أَبُو عَامِرٍ الْأَشْعَرِيُّ وَاسْمُهُ عُبَيْدُ بْنُ وَهْبٍ رَضِيَ : رقم ٧٩٨ ; و الطبري في تهذيب الآثار, باب : ذِكْرُ مَا حَضَرَنَا ذِكْرُهُ مِنْ ذَلِكَ: رقم ٢٣٢ ; و الشجري في الأمالي : ١/١٠٤ – ‘আমি আমার উম্মতের উপরে (যে সকল ফিতনা আপতিত হওয়ার) বেশি ভয় করি, (তার মধ্যে) আমাকে (এও অধিক) আশংকিত করে তোলে যে, তাদের প্রচুর ধ্বনসম্পদ হয়ে যাবে। ফলে তারা একে অন্যেকে হিংসা করবে (এবং এই হিংসা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা নানাবিধ ষঢ়যন্ত্র করবে), এরপর (এসবের ক্রমধারায়) তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। (সে জামানায়) তাদের জন্য কুরআন (-এর কপি সংগ্রহ করা) সহজলভ্য হয়ে যাবে। এরপর (তাদের মধ্যে) ভাল লোক, ফাজের (পাপী) লোক, মুনাফেক (সবরকম লোকই) তা পাঠ করবে, পরে (তাদের স্বার্থমুখী মতগুলোকে নিজেদের পক্ষে রাখার উদ্দেশ্যে) তা দিয়ে তারা মুমিনদের সাথে ঝগড়া-বাকবিতন্ডা করে ফিতনা সৃষ্টি করতে চাইবে, চাইবে (সহিহ ব্যাখ্যার পরিবর্তে ধূর্তমুখী গলত) ব্যাখ্যা পেশ করতে। অথচ (বাস্তবতা এমন হবে যে, ওই হীন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ওরা যেসকল আয়াত পেশ করবে, তার কিছু আয়াত এমন হবে যে) তার ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না, আর (কিছু আয়াত এমন হবে যে, ওগুলোর ব্যাপারে খোদ্) গভীর ইলমের অধিকারীরা বলে যে- আমারা (ওই আয়াতের উপরে) ইমান আনলাম, (সেখানে সর্বসাধারণ পাপী ও মুনাফেকদের নোংরা অন্তরে ওসব আয়াতের মতলব হৃদয়ঙ্গম হওয়া-তো অনেক দূরের কথা)’। [আস-সুনানুল ওয়ারিদাহ, ইমাম দানী, হাদিস ২৪৯; তাহযীবুল আছার, ইমাম তাবারী, হাদিস ২৩২; আল-আহাদ ওয়াল মাছানী, ইমাম ইবনুল আসিম, হাদিস ৭৯৮; আল-আমালী, ইমাম শাযারী- ১/১০৪] 

ফায়দা: আমাদের এই শেষ জামানায় গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্য পবিত্র ‘কুরআন’- এর হার্ডকপি (যেমন: কাগজের বই, সিডি/ডিভিডি) ও ছফটকপি (ওয়েবপেজ, ডক-ফাইল, ই-বুক, পিডিএফ) যতটা সহজলভ্য হয়ে গেছে, ইসলামের গোটা ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। এমনকি আপনি-তো কম্পিউটারে বসে ইন্টারনেট থেকে বিনা-মূল্যে গোটা কুরআনের ছফটকপি নিমিশের মধ্যেই ডাউলোড করে পড়তে পারেন, আবার ইন্টারনেট অডিও/ভিডিও ও ওয়েবপেজ থেকে পড়ে নিতে পারেন। বর্তমানে কুরআনের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য তাফসীরের কিতাব, বিভিন্ন ভাষায় কৃত অনুবাদ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ, সকল হাদিসের কিতাব, বিভিন্ন ফিকহ ও সিরাতের কিতাব ইন্টারনেটে আপলোড করা রয়েছে। এজামানায় আলেমে দ্বীন, সাধারণ মুমিন মুসলমান, ফাজের, মুনাফেক, কাফের -সকলের জন্যেই কুরআন ও তার ব্যাখ্যা জানার পথ পূর্ববর্তী যে কোনো জামানার চাইতে অতীব উন্মুক্ত ও সহজলোভ্য হয়ে গেছে।

কিন্তু এজামানায় যেহেতেু ফাসেক-ফাজের ও মুনাফেক শ্রেণি দিয়ে পৃথিবীটা ভরা এবং মুমিন নর-নারীদের সংখ্যা তাদের তুলনায় একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য, তাই এই এটা তাদের জন্য মোক্ষম সময় ইমানদারদের গলাকে টিপে ধরার। কারণ তারা জানে, মুমিনরা ছটফট করে কোঁকানো-কাতরানো ছাড়া কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও প্রভাবপ্রতিপত্তিতে কোনো দিক দিয়ে পেড়ে ওঠার চিন্তা করার মতোও অবস্থায় নেই। এজন্য এজামানায় উম্মাহ’র মধ্যে যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (সেকুলারিজম), সমাজতন্ত্র (সোসালিজম), গণতন্ত্র (ডেমোক্রেসি), ফেমিনিজম (নারীবাদিতা) ইত্যাদিকে তাদের মূল বিশ্বাস ও চেতনা হিসেবে লালন করে থাকে এবং দ্বীন ইসলামের স্থলে ওগুলোকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চায়, এই ফাসেক-ফাজের ও মুনাফেক শ্রেণিটির মধ্যে যারা কুরআন পাঠ করে তারা মুমিন নর-নারীদেরকে (যারা শুধুমাত্র দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চায় এবং অন্য  মতবাদগুলোকে ইসলাম বিরোধী হওয়ার কারণে ঘৃনা করে, সেই ইমানদারদেরকে) দমন করার জন্য কুরআনের আয়াত পেশ করেই কাবু করতে চায়। উদাহরণ স্বরূপ: (১) একজন মুসলীম পুরুষের স্বাক্ষ্য = দুইজন মুসলীম নারীর স্বাক্ষ্য হওয়া, (২) সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার প্রশ্নে পুরুষের অর্ধেক ভাগ নারীর পাওয়া, ইত্যাদি বিষয়ে আলেম ও সাধারণ মুমিনগণ চোখ বন্ধ করে আল্লাহ’র কুরআনী আইনের উপরে ইমান (বিশ্বাস) স্থাপন করে থাকে। কিন্তু মুনাফেকরা তাদের মতলব হাসিল করার জন্য প্রেক্ষাপট বহিঃর্ভূত কুরআনের আয়াত পেশ করে এবং এমন সব ব্যাখ্যা করে কুরআনকে টেনে হেঁচড়ে তাদের মতের পক্ষে নিয়ে যেত চায়, যা দেখে মুমিনরা শুধু হতবাকই হয়, কিন্তু তাদের মুনাফেকির সাথে পেড়ে ওঠেনা। الله اعلم بالصواب

# হযরত মিকদাম বিন মা’দীকারাব রা. থেকে বর্নিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ القُرآنَ وَمِثلَهُ مَعَهُ ، أَلَا يُوشِكُ رَجُلٌ شَبعَان عَلَى أَرِيكَتِهِ يَقُولُ : عَلَيكُم بِهَذَا القُرآنِ ، فَمَا وَجَدتُم فِيهِ مِن حَلَالٍ فَأَحِلُّوهُ ، وَمَا وَجَدتُم فِيهِ مِن حَرَامٍ فَحَرِّمُوهُ ، أَلَا وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ كَمَا حَرَّمَ اللَّهُ . رواه الترمذي ٢٦٦٤ وقال : حسن غريب من هذا الوجه ، وحسنه الألباني في “السلسلة الصحيحة” ٢٨٧٠ – ‘খুব ভাল করে শুনে রাখো, আমাকে (ওহী সূত্রে) কুরআন দেয়া হয়েছে এবং এর সাথে অনুরূপ (ওহী সূত্রেই হিকমত ও সুন্নাহ) দেয়া হয়েছে। খুব ভাল করে শুনে রাখো, অতি শিঘ্রই এমন হবে যে, উদরপূর্ণ লোক আরামকেদারায় ঠেস দিয়ে বলবে: তোমরা শুধু এই কুরআন’কেই গ্রহন করো; এর মধ্যে তোমরা যা হালাল পাবে তাই হালাল মনে করবে এবং তাতে যা হারাম পাবে তোমরা (শুধু) সেটাকেই হারাম মনে করবে। (কিন্তু) খুব ভাল করে শুনে রাখো, আল্লাহ’র রাসুল কর্তৃক হারামকৃত জিনিস আল্লাহ কর্তৃক (কোনো কিছু) হারাম করার মতোই, (কেননা আল্লাহ’র রাসুল কোনো শরয়ী কিছুই ওহীর ইঙ্গিত ছাড়া নিজ থেকে হারাম করেন না)’[জামে তিরমিযী, হাদিস ২৬৬৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৪]

ফায়দা: এই শেষ জামানায় এক পথভ্রষ্ঠ ফেরকাহ’র আবির্ভাব হয়েছে, যারা বলে তাদের জন্য শুধু কুরআনই যথেষ্ট, আর এদিকে মুসলীম উম্মাহ’র কাছে রাসুলুল্লাহ সা.-এর যেসকল হাদিসসমূহ নির্ভরযোগ্যসূত্রে সংরক্ষিত আছে তা আগাগোড়া অস্বীকার করে। তারা ‘আহলে কুরআন’ নামে পরিচিত, যাদেকে ‘মুনকেরুল হাদিস’ (হাদিস অস্বীকারকারী) বা ‘মুনকেরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাহ অস্বীকারকারী)ও বলা হয়ে থাকে। এই ভবিষ্যৎ বাণী পূর্ণ হয়েছে।

হাদীস অস্বীকার করার এক সুবিধা হল কুরআনের ইচ্ছে মতো ব্যাখ্যা করে তার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্যকে দুমড়ে-মুঁচড়ে রাখা যায় এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে যুৎসই মতো ব্যবহার করে স্বেচ্ছাচারী জীবন কাটানোর পথ পাওয়া যায়। আজকালকার লিবারাল ঘরানার লোকেরা এই ফাঁদের বেশি শিকার হয়ে থাকে।  الله اعلم بالصواب

# আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ : أَنْ يُرْفَعَ العِلْمُ وَيَثْبُتَ الجَهْلُ، وَيُشْرَبَ الخَمْرُ، وَيَظْهَرَ الزِّنَا . رواه بخاري , كتاب العلم , باب رفع العلم وظهور الجهل : رقم ٨٠ ; و مسلم , كتاب العلم, باب رفع العلم وقبضه وظهور الجهل والفتن في آخر الزمان : ٢٦٧١ ; و ابن ماجة في سننه : رقم ٤٠٤٥ ; و الترمذي : رقم ٢٢٠٥ و قال هذا حديث حسن صحيح ; و احمد في المسند : ٣/١٥١– ‘কেয়ামতের লক্ষনসমূহের মধ্যে এও রয়েছে যে, (দ্বীনী) ইলম উঠে যাবে, মুর্খতা (উম্মাহ’র মস্তিষ্কে) বিদ্ধ হয়ে যাবে, খামরুন (মদ ও মাদক) পান/সেবন করা হবে এবং (ব্যাপক হারে) জেনা (ব্যাভিচার) প্রকাশ পাবে’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৬৮০৮; সহিহ মুসলীম, হাদিস ২৬৭১;  মুসনাদে আহমাদ-৩/১৫১; জামে তিরমিযী, হাদিস ২২০৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০৪৫]

ফায়দা: এই আমালতগুলো প্রকাশ পাবে ‘শেষ জামানা’য়। যেমন, তারিফ বিন ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত, হযরত আবু মুসা রা. বলেছেন- إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ أَيَّامًا يَنْزِلُ فِيهَا الْجَهْلُ، وَيُرْفَعُ فِيهَا الْعِلْمُ، حَتَّى يَقُومَ الرَّجُلُ إِلَى أُمِّهِ فَيَضْرِبُهَا بِالسَّيْفِ مِنَ الْجَهْلِ . اخرجه ابن أبي شيبة في “المصنف, كتاب الفتن: ٨/٦٦٧ – ‘কেয়ামতের আগে আগে (তথা শেষ জামানায়) কিছু দিন এমন হবে যে, তাতে মুর্খতা নাজিল হবে এবং ইলম’কে উঠিয়ে নেয়া হবে’। [আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ- ৮/৬৬৭]
 
হাদিসটিতে বলা হয়েছে,  يُرْفَع العِلْمُ‘ইলম উঠে যাবে’ অর্থ উম্মাহ’র আলেমগণের অন্তর থেকে কুরআন-সুন্নাহ’র ইলমকে উঠিয়ে নেয়া নয়, বরং এর অর্থ হল, আল্লাহ তাআলা এক এক করে সুদক্ষ ও নেককার আলেমগণকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়ার মাধ্যমে তাদের সাথে সাথে তাদের ‘সহিহ ইলম’-কেও দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিবেন। যেমন: অন্য এক হাদিসে এসেছে , রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِنَّ اللَّهَ لاَ يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا، يَنْتَزِعُهُ مِنَ الْعِبَادِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ، حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا، اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالاً فَسُئِلُوا، فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ، فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا . رواه البخاري: رقم ١٠٠ , و مسلم : ٢٦٧٣, و الترمذي :٢٦٥٢ , وابن ماجه : المقدمة٥٢ , وأحمد: ٢/١٦٢ , والدارمي : المقدمة ٢٣٩ – ‘নিশ্চই আল্লাহ (কুরআন ও সুন্নাহ’র সহিহ) ইলমকে লোকজনের অন্তর থেকে ছিনিয়ে নেয়ার ন্যায় ছিনিয়ে নিবেন না। তবে তিনি আলেমগণকে (একে একে মৃত্যু দিয়ে দুনিয়া থেকে) উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ইলমকে তুলে নিবেন। যখন কোনো (সুদক্ষ) আলেম থাকবে না, তখন লোকজন (তাদের সামনে পাওয়া) চরম জাহেল-মুর্খ মাথাগুলোকে ধরে তাদের কাছে প্রশ্ন করবে। তখন তারা ইলম ছাড়াই ফাতওয়া/জবাব দিবে। ফলে তারা (নিজেরাও) পথভ্রষ্ঠ হবে, এবং (যারা প্রশ্ন করেছে) তাদেরকেও পথভ্রষ্ঠ করবে’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ১০০; সহিহ মুসলীম, হাদিস ২৬৭৩;  মুসনাদে আহমাদ-২/১৬২; জামে তিরমিযী, হাদিস ২৬৫২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৫২; সুনানে দারেমী, হাদিস ২৩৯]
 
হাদিসটিতে আরো বলা হয়েছে যে- يَثْبُت الجَهْلُ‘মুর্খতা (উম্মাহ’র মস্তিষ্কে) বিদ্ধ হয়ে যাবে’। এখানে يَثْبُت শব্দটির মূল হল أَثْبَتَযার অর্থ হল কোনো কিছু গেড়ে দেয়া, প্রতিষ্ঠিত করা, এঁটে দেয়া, ভিতরে প্রবেশ করানো ইত্যাদি। অন্য হাদিসে- يظهر الجَهْلُ‘মুর্খতা (ব্যাপক ভাবে) প্রকাশ পাবে’ কথাটি এসেছে। অর্থাৎ মুসলীম উম্মাহ ব্যাপক ভাবে কুরআন সুন্নাহ’র ইলম অর্জন ছেড়ে দিবে এবং তাদের মধ্যে জাহালত-মুর্খতা চেঁপে বসবে। না বুঝবে দ্বীন, না বুঝবে শরীয়ত। আমরা ২০১৯ ইং সালে এসে যদি বলি, পৃথিবীর গোটা মুসলীম উম্মাহ’র প্রায় ৯০-৯৫% কুরআন-সুন্নাহ’র সহিহ ইলম থেকে দূরে, তাহলে বোধ হয় মোটেও অতিরঞ্জিতা হবে না। এর কারণ হল, ইহূদী-খৃষ্টান জাতি খুব কৌশলে মুসলীম উম্মাহ’র মাঝে তাদের সেকুলার/ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থাকে সফলতার সাথে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন-ইসলামের চেহারাটা কিরকম -তা প্রাথমিক ভাবে একটা ধারনা পাওয়ার আগেই উম্মাহ লাইচ্যুত হয়ে যায়; দ্বীন-ইসলামের ভিতরে ঢোকা-তো আরো পরের কথা। এই আধুনিক সেকুলার/ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থাই উম্মাহ’র প্রায় ৯০-৯৫%-কে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন-ইসলামের পরিচয় ও কুরআন-সুন্নাহ’র সহিহ ইলম থেকে বহু দূরে নিয়ে গেছে এবং يظهر الجَهْلُ‘মুর্খতা (ব্যাপক ভাবে) প্রকাশ পাবে’ -এই ভবিষ্যৎবাণী তাদের দ্বারা পূর্ণ  হয়ে গেছে।
 
তবে এও বোঝা উচিৎ যে, এই সকল হাদিসে শেষ জামানায় আলেমগণকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়ার অর্থ পৃথিবীর বুক থেকে সকল সুযোগ্য আলেম ও সহিহ ইলমকে ধুয়ে মুছে তুলে নেওয়া নয়। কারণ, বহু সহিহ হাদিসে একথার ইংগীত রয়েছে যে, এই উম্মতের মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত একটি গোষ্ঠি সর্বদা সহিহ ইলমের অধিকারী হয়ে দ্বীন-ই- হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যেমন, মুয়াবিয়া রা.-এর সূত্রে বণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন- مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ ، وَإِنَّمَا أَنَا قَاسِمٌ وَيُعْطِي اللَّهُ وَلَنْ يَزَالَ أَمْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ مُسْتَقِيمًا حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ ، أَوْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ – ‘আল্লাহ যার কল্যান করতে চান, তাকে দ্বীনের ব্যাপারে ফকিহ বানান (তথা সুগভীর জ্ঞান দান করেন)। আর আমি (দ্বীনী ইলমের) নিছক একজন বন্টনকারী মাত্র, (বাস্তবে ইলম) আল্লাহ’ই দান করেন। আর এই উম্মতের (দ্বীনী) বিষয়াদি (নির্ভরযোগ্যআলেমগণের দ্বারা ) সব সময় (সিরাতে) মুস্তাকিম (তথা সোজা পথের উপর স্থাপিত) থাকবে -যাবৎ না কিয়ামত এসে যায় অথবা যাবৎ না আল্লাহ’র নির্দেশ আসে’। [সহিহ বুখারী-১/১৬, হাদিস ৬৭৯৫] বলা বাহুল্য, কুরআন সুন্নাহ’র সহিহ ইলম ছাড়া কারো পক্ষেই ‘সিরাতে মুস্তাক্বিম’ ও হক্বকে চেনাই সম্ভব নয়, তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা-তো দূরের কথা। কাজেই, বোঝা গেল, বিভিন্ন জামানায় সুযোগ্য আলেমগণের একটি জামাআত কেয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবেন যাঁরা সাধ্য মতো দ্বীন ও শরীয়তের হিফাজত করবেন -চাই তাদের সংখ্যা কখনো বেশি হোক, কখনো-বা অল্প। শেষ জামানার উম্মাহ’র সংখ্যার অনুপাতে তাঁদের সংখ্যা হবে নিতান্তই অল্প; একেবারে অনুল্লেখযোগ্য; তাঁরা তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে বিক্ষিপ্ত স্থানে স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবেন ও তাঁর ছাত্রগণের কাছে ইলম বিতরণ করবেন। তখন সমাজে বেশির ভাগ যারা আলেম বলে পরিচিত হবে, তাদের অধিকাংশই হয়তো হবে মধ্যম মানে অলেম কিংবা তারও নিম্নমানের রুসম রেওয়াজের আলেম। এজন্য হাদিসে إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا – ‘যখন কোনো (সুদক্ষ) আলেম থাকবে না’ -এর অর্থ হল, ওই সামান্য সংখ্যক সুযোগ্য আলেমগণও যখন তাদের স্বাভাবিক হাতের নাগালে থাকবেন না, (বরং তারা থাকবে এমন দূর-দূরান্তে, যেখানে যেতে হলে উল্লেখযোগ্য পরিমান অর্থ, সময় ও পরিশ্রম স্বীকার করে যেতে হয়, তখন তাদের কাছে দ্বীনের ইলমের গুরুত্ব দুনিয়াবী কোনো সার্থের কাছে অতীব নগণ্য হওয়ায় তারা ওই আলেমগণের কাছে সফর করে হলেও সহিহ ইলম হাসিল করতে চাইবে না, বরং দ্বীন ও শরীয়তের ব্যাপারে খামখেয়ালীপনার কারণে তারা হাতের নাগালে যাদেরকে পাবে, নফসের বসবর্তী হয়ে বিভিন্ন অযুহাতে তাদের কাছে শরয়ী বিষয়াদি জিজ্ঞাসা করবে এবং ভুল হোক শুদ্ধ হোক ওগুলোকেই এই অযুহাত দিয়ে মানবে যে ‘সে উত্তর দিয়েছে, কেয়ামতের দিন সে বুঝবে, আমাকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করলে আমি তার দিকে দেখিয়ে দিবো’! যেমন বলা হয়েছে- اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالاً فَسُئِلُوا – ‘তখন লোকজন (তাদের সামনে পাওয়া) চরম জাহেল-মুর্খ মাথাগুলোকে ধরে তাদের কাছে প্রশ্ন করবে’
 
এখানে জবাবদাতা সম্পর্কে বলা হয়েছে فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ، فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا – ‘ফলে তারা (নিজেরাও) পথভ্রষ্ঠ হবে, এবং (যারা প্রশ্ন করেছে) তাদেরকেও পথভ্রষ্ঠ করবে’। এতে ইংগীত রয়েছে যে, (১) জবাবদাতা নিজকে দ্বীনের একজন জ্ঞানী মনে করে ফতওয়া/জবাব দিবে, কিন্তু বাস্তবে সে হবে চরম জাহেল-মুর্খ, অথবা (২) সে নিজকে হয়-তো অতটা জ্ঞানী মনে করবে না, তবে তার কিছু পড়াশুনার উপর ভিত্তি করেই একটা জবাব দিয়ে দিবে আর-কি! এজামানায় এসব অহরহ দেখা যাচ্ছে। শেস জামানায় মানুষ কাদের কাছে ইলম তলব করবে, সে সম্পর্কেও একটি হাদিস রয়েছে, যা নিম্নরূপ-
 
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. তাঁর কিতাব ‘আল-যুহদ’-এ উত্তম সনদে হযরত আবু উমাইয়্যাহ আল-যামহী রা.-এর  সূত্রে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ ثَلاثًا : إِحْدَاهُنَّ أَنْ يُلْتَمَسَ الْعِلْمُ عِنْدَ الأصَاغِرِ- أخرجه ابن المبارك في ” الزهد ” ٦١ , و عنه أبو عمرو الداني في ” السنن الواردة في الفتن “٢/٦٢ رقم ٤٣٨, و اللالكائي في ” شرح أصول السنة ” ١/٢٣٠ كواكب ٥٧٦, قال الألباني في “السلسلة الصحيحة” ٢/٣١٦: قلت اسناده جيد, والطبراني في الكبير ٢٢/٣٦١، ابن عبد البر في جامع بيان العلم وفضله: ٢/٢٤٩ , الهيثمي في المجمع ١/١٣٥, – ‘কেয়ামতের লক্ষনসমূহের মধ্যে তিনটি লক্ষন আছে, যার একটি হল- (দ্বীনের) ইলম’কে আসাগীর (একদম ছোট)দের কাছে তলব করা হবে’। [আল-যুহদ, ইবনুল মুবারক, হাদিস ৬১; ‘আস-সুনান, ইমাম দানী-২/৬২, হাদিস ৪৩৮; শারহু উসূলীস সুন্নাহ-১/২৩০, কাওয়াকিব ৫৭৬; আল-মু’জামুল কাবির, ত্বাবরানী-২২/৩৬১; জামেঊ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার-২/২৪৯; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ১/১৩৫]

এখানে الأَصَاغِرُ ‘(একদম ছোট)দের’ বলতে বুঝানো হয়েছে তাদেরকে যারা দ্বীনের ইলমী ময়দানে বিজ্ঞ নয়, অভিজ্ঞও নয় বরং শিশু মানের বা জাহেল-মুর্খ; যাদের ইলমী বিষয়ে মুখ খোলা উচিৎ নয় বা সাজে না, বরং একদম অনধিকারচর্চার পর্যায়ে পড়ে। এখানে বেশি বা কম বয়স মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় হল ইলমী পান্ডিত্ব ও গভীরতা থাকা বা না থাকা। যদি বয়সে কম হয়েও কেউ বয়ষ্কদের চাইতে ইলমী ময়দানে বেশি পান্ডিত্ব ও গভীরতার অধিকারী হয়, তাহলে সে এর মধ্যে গণ্য নয়।

ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. উপরোক্ত হাদিসটি সনদ সহ বর্ণনা করার পর লিখেছেন- . قَالَ نُعَيْمٌ : قِيلَ لابْنِ الْمُبَارَكِ : مَنِ الأَصَاغِرُ ؟ قَالَ : الَّذِينَ يَقُولُونَ بِرَأْيِهِمْ ، فَأَمَّا صَغِيرٌ يَرْوِي عَنْ كَبِيرٍ فَلَيْسَ بِصَغِيرٍ . وَذَكَرَ أَبُو عُبَيْدٍ فِي تَأْوِيلِ هَذَا الْخَبَرِ ، عَنِ ابْنِ الْمُبَارَكِ أَنَّهُ كَانَ يَذْهَبُ بِالأَصَاغِرِ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ وَلا يَذْهَبُ إِلَى السِّنِّ ، – “নুয়াইম রহ. বলেছেন যে, ইবনে মোবারক রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হল– الأَصَاغِرُ -‘(আসাগীর/একদম ছোট) কারা?’ তিনি বললেন-الَّذِينَ يَقُولُونَ بِرَأْيِهِمْ ، فَأَمَّا صَغِيرٌ يَرْوِي عَنْ كَبِيرٍ فَلَيْسَ بِصَغِيرٍ – ‘যারা (শরীয়তের ইলমে বিশেষজ্ঞ না হওয়া সত্ত্বেও শরীয়তের ব্যাপারে) নিজেদের মত/রায় পেশ করে কথা বলে। তবে যে সকল ছোটরা (নিজেরা কোনো দেওয়ানী না করে বরং শরীয়তের ইলমে অভিজ্ঞ আলেম যাঁরা সেই) বড়দের কাছ থেকে (কোনো বিষয়ে শরয়ী সিদ্ধান্ত কী -তা জেনে নিয়ে অন্যকে ) মতামতটি বলে দেয় সে (হাদিসে উল্লেখিত) ছোট’র মধ্যে গণ্য নয়’।ইমাম আবু  উবাইদ রহ. এব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা এনেছেন। ইবনে মুবারক রহ. থেকে الأَصَاغِرُ (একদম ছোট)সম্পর্কে এই ব্যাখ্যাও বলা হয়েছে যে, তারা হল أَهْلِ الْبِدَعِ (বিদআত-এর ধারক-বাহক), আর এটা কোনো বয়সের সাথে সম্পৃক্ত নয়, (বরং বয়ষ্ক, যুবক, বালক যে কোনো বয়সের হতে পারে)”। [জামেঊ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার- ২/২৪৯]

এখানে الأَصَاغِرُ (একদম ছোট)দের- মধ্যে যারা অন্তর্ভূক্ত হতে পারে তাদের নমুনা নিম্নরূপ-

(ক) চরম জাহেল (মুর্খ)– কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে ব-কলম; শুধুমাত্র শিশু শুলভ কিছু শোনা ইলমের সাথে মস্তিষ্কের যুক্তি মিলিয়ে শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে মত দেয়, আর বলে যে -‘আমার মতে (!) অমুক ব্যাখ্যা বা মতটি সঠিক!! অমুক অমুক আলেমের মতটি ভুল!!’

(খ) কিছু ইলম আছে– কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে নিজে নিজে কিছু পড়াশুনা করে। কিন্তু কোনো শ্বাস্ত্রেই এতটুকু পরিমান জ্ঞান দিয়ে মুখ খোলা শোভা পায় না, কারো কাছে গ্রহনযোগ্যও হয় না। কিন্তু শরীয়তের জ্ঞানের প্রশ্নে এতটুকু পড়াশোনার উপর ভিত্তি করেইে সে ভেবে আছে যে সে ‘জানে’, আর এর সাথে কিছুটা মস্তিষ্কের যুক্তি মিলিয়ে শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে মত দেয়, আর বলে যে -‘আমার মতে (!) অমুক ব্যাখ্যা বা মতটি সঠিক!! অমুক অমুক আলেমের মতটি ভুল!!’ 

(গ) ফাসেক আলেম– ইলমের প্রসস্থতা আছে কিন্তু বাছিরাত/গভীরতা নেই। নেকির সাথে সাথে স্বভাবে ফিসক ও গোনাহ’র মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমানে থাকায় অন্তকরণ ইলমী গাম্ভির্যতা ও নূর থেকে মাহরুম হয়ে আছে, কিন্তু তার ধারনা সে আলেম এবং যে কোনো ইলমী বিষয়ে মুখ খোলার অধিকার তার আছে। ফলে বলে যে -‘আমার মতে (!) অমুক ব্যাখ্যা বা মতটি সঠিক!! অমুক অমুক আলেমের মতটি ভুল!!’ এদের থেকে বিদআত ও পথভ্রষ্ঠতা ছড়ায় বেশি; এরা তর্কও করে বেশি।

(ঘ) মুনাফেক আলেম: শাসকদের দরবারী আলেম (!), যারা শরীয়তের হিফাজত না করে উল্টো শাসকদের মনতুষ্টির জন্য শরীয়তের অপব্যাখ্যা করে শাসকদের শরীয়ত-বিরোধী মতবাদ ও কু’কর্মগুলোর সাফাই গায় এবং এর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে যতসামান্য কিছু সম্মান ও সম্পদ লাভ করে থাকে। এরা দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে বিক্রি করে দেয়। উদাহরণ স্বরূপ: সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ) একটি পরিষ্কার ইসলাম বিরোধী মতোবাদ -একথা জানা সত্ত্বেও কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী ইতিহাসের অপব্যাখ্যা করে বলে যে ‘ইসলাম আমাদেরকে সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ)-ই শিক্ষা দেয়’ ! (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) ‘আলেম’ নামধারি এধরনের ব্যাক্তিদের কাছে দ্বীনের ইলম হাসিল করতে গেলে ইমানই বরবাদ করে ফেলবে!!!

# আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- ويل لأمتي من علماء السوء يتخذون هذا العلم تجارة يبيعونها من أمراء زمانهم ربحا لأنفسهم لا أربح الله تجارتهم . أخرجه الديلمى : ٤/١٣٤, قال الألباني في سلسلة الأحاديث الضعيفة والموضوعة وأثرها السيئ في الأمة : ١١/٣٨٣ رقم ٥٢٣٥: قلت: وهذا سند ضعيف؛ صالح بن نوح لم أعرفه . و أحمد بن محمد بن أحمد العدل؛ الظاهر أنه ابن بالويه، أبو أحمد البالوب النيسابوري ، روى عنه الحاكم؛ وقال: تغير بآخره، وهو صدوق . قلت : فهو علة الحديث، أو شيخه. وأما المناوي؛ فقد أبعد النجعة حين أعله بقوله: وفيه إبراهيم بن طهمان؛ مختلف فيه، وحجاج بن حجاج؛ مجهول ; و وقره المتقي في كنز العمال: ١٠/٢٠٥ رقم ٢٩٠٨٤ و قال: “ك” في تاريخه – عن أنس  ‘আমার উম্মতের ‘ওলামায়ে ছু’ (মন্দ আলেম)দের জন্য ধ্বংস, যারা (দ্বীনের) এই ইলমকে ব্যবসা হিসেবে গ্রহন করে নিবে, যা তারা (তাদের জামানার) শাসকদের কাছে বিক্রি করে দিবে। তাদের জামানাটা হবে তাদের নিজেদের জন্য একটা মুনাফা(র জামানা। কিন্তু) আল্লাহ (কেয়ামতের দিন) তাদের (ওই) ব্যাবসায় (কোনো) মুনাফা দিবেন না’। [দাইলামী- ৪/১৩৪; কানজুল উম্মাল- ১০/২০৫ হাদিস ২৯০৮৪; ফাইযুল কাদীর, মুনাভী- ৬/৩৬৯ হাদিস ৯৬৫৪] এরা হল শেষ জামানার কাফের ও মুনাফেক শাসকদের কাছে বিক্রি হওয়া আলেম নামের কিছু খবিস, যারা কুরআন সুন্নাহ’র মহা মূল্যবান ইলমকে দ্বীন ইসলাম কায়েম ও মুসলীম উম্মাহ’র কল্যানে ব্যবহার করার পরিবর্তে ওসব খবিস শাসকদের দালাল হিসেবে কাজ করবে; কুরআন-সুন্নাহ’র সঠিক অর্থ ও মর্মকে দুমড়ে-মুচড়ে ওই শাসকদের মত ও পথের অনুকুলে নিয়ে যাবে, প্রয়োজনে  হক্কানী ওলামায়ে কেরামগণের সাথে তর্কবিতর্ক করে নিজেদেরকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্ঠা করবে। এসব কাজের জন্য তারা ওসব শাসকদের পক্ষ থেকে দালালী স্বরূপ পার্থিব নিরাপত্তা, সম্মান কিংবা অর্থ-সম্পদ হয়তো ভোগ করে নিবে, কিন্তু আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে সুকঠিন আযাব।

আরেক রেওয়ায়েতে এসেছে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- يأتي على الناس زمان علماؤهم فتنة وحكماؤهم فتنة تكثر المساجد والقراء لا يجدون عالماً إلا الرجل بعد الرجل . رواه أبو نعيم ; اورده المتقي في كنز العمال: ١١/١٩٢ رقم ٣١١٨٣ – “(অচিরেই) মানুষের উপরে (এমন একটি) জামানা আসবে, (যে জামানায়) তাদের আলেমরা হবে (একেকজন) ফিতনাহ, (যাদের থেকে ফিতনা সৃষ্টি হবে), তাদের শাসকরা হবে ফিতনা, মসজিদ ও (কুরআনের) পাঠক হবে প্রচুর হবে, কিন্তু তারা (ইলমে সুবিজ্ঞ এবং দ্বীনের প্রশ্নে আমানতদার ও আস্থাভাজন পরহেজগার) আলেম পাবে না, (পাবে) কেবল (সাধারণ) মানুষের পর (সাধারণ) মানুষ, (যাদের কাছ থেকে লোকজন ইলম নিবে)”। [আবু নুআইম: কানজুল উম্মাল- ১০/১৯২ হাদিস ৩১১৮৩] 

উপরোক্ত এই শ্রেণীগুলি বাস্তবে আলেম নয়, এরা হল জাহালাত-মুর্খতা,  বিদআত ও গোমরাহীর একেকজন দোকানদার, যাদের থেকে শেষ জামানায় ফিতনা বেড় হবে। আলী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বর্ণনা করেন- يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ لا يَبْقَى مِنَ الإِسْلامِ إِلا اسْمُهُ , وَلا يَبْقَى مِنَ الْقُرْآنِ إِلا رَسْمُهُ , مَسَاجِدُهُمْ يَوْمَئِذٍ عَامِرَةٌ , وَهِيَ خَرَابٌ مِنَ الْهُدَى , عُلَمَاؤُهُمْ شَرُّ مَنْ تَحْتَ أَدِيمِ السَّمَاءِ , مِنْ عِنْدِهِمْ تَخْرُجُ الْفِتْنَةُ , وَفِيهِمْ تَعُودُ . رواه الداني في السنن الواردة في الفتن , بَابُ مَا جَاءَ فِي شِدَّةِ الزَّمَانِ وَفَسَادِ الدِّينِ : رقم ٢٣٩ موقوفا ; ابن عدي في الكامل : ٤/٢٢٧ ، والبيهقي في شعب الإيمان : ٣/٣١٧ مرفوعا ; الديلمي في مسنده : ١/١٠٧ ; اسناده منقطع و ضعيف جدا – ‘অচিরেই মানুষের উপরে এমন জামানা আসবে, যখন ইসলামের নামটুকু ছাড়া কিছু বাকি থাকবে না, কুরআনের রসমটুকু ছাড়া কিছু বাকি থাকবে না, সেদিন তাদের মসজিদগুলো (মুসুল্লিদের দ্বারা বাহ্যতঃ) আবাদ থাকবে, কিন্তু তা থাকবে হেদায়েত থেকে খালি। আর তাদের আলেমরা হবে -যারা আসমানের নিচে থাকে- তাদের মধ্যে নিকৃষ্টতর; তাদের থেকেই (দ্বীনের) ফিতনা বেড়ুবে এবং তাদের মাঝেই তা ফিরে আসবে’। [আস-সুনানুল ওয়ারিদাহ, ইমাম দানী- ২৩৯; আল-কামেল, ইবনু আদী- ৪/২২৭; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী- ৩/৩১৭; মুসনাদে দাইলামী- ১/১০৭]

যারাই এদের থেকে ইলম গ্রহন করবে, তারাও বিদআত ও পথভ্রষ্ঠতার আরো অতল গহবরে তলিয়ে যাবে। সুতরাং, ভাল করে মনে রাখুন ‘এটা শেষ জামানা’ এবং চিন্তা করে দেখুন কাদের থেকে ইলম হাসিল করছেন?! দয়া করে ‘গুগোল সার্স-ইঞ্জিন’, ‘ডাক্তার’, ‘ইঞ্জিনিয়ার’, ‘ইসলামী ইতিহাসের শিক্ষক’ কিংবা ‘শুরেলা ওয়ায়েজ’রা কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহি ইলম বিতরনের যে ঠিকাদারী নিয়ে বসেছে, আল্লাহ’র ওয়াস্তে তাদের থেকে ইলম নেয়ার আগে শতবার চিন্তা করুন। হক্কানী আলেম অবশ্যই আছে, হারিকেন দিয়ে হলেও খুঁজে বেড় করুন।  الله اعلم بالصواب

# আবু মুসা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- لا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُجْعَلَ كِتَابُ اللَّهِ عَارًا ، وَيَكُونَ الْإِسْلامُ غَرِيبًا . أخرجه ابن أبي الدنيا في موسوعة رسائل , العقوبات : ٥/١٧٩ رقم ٣٤٠ ; الخطيب البغدادي في تلخيص المتشابه في الرسم : ٢/٦٧٤ ; و ابن عساكر في تاريخ مدينة دمشق , ترجمة سعيد بن غنيم : ٧/٣٣٩ , و في ترجمة سلمة بن تميم : ٧/٤٥٣ ; قال الألباني في سلسلة الأحاديث الضعيفة : رقم ٦١٥٦ : ضعيف ; و اورده الهندي في كنز العمال : ١٤/٢٤٥ رقم ٣٨٥٧٧ – ‘কেয়ামত (ততক্ষন পর্যন্ত) কায়েম হবে না, যাবৎ না (পৃথিবীর মানুষের কাছে) আল্লাহ’র কিতাব (আল-কুরআন শিক্ষা) লজ্জাকর (শিক্ষায়) পরিনত হয় এবং (যাবৎ না মুসলমানদের জীবনে) ইসলাম দূর্লভ হয়ে যায়’। [মাউসুআত, ইবনু আবিদ্দুনিয়া- ৫/১৭৯ হাদিস ৩৪০; তারিখে দামেশক, ইবনুল আসাকির- ৭/৩৩৯, ৭/৪৫৩; কানজুল উম্মাল– ১৪/২৪৫ হাদিস ৩৮৫৭৭]

# আনাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَتَى يُتْرَكُ الْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْي عَنِ الْمُنْكَرِ؟ قَالَ: ” إذَا ظَهَرَ فِيكُمْ مَا ظَهَرَ فِي بَنِي إسْرَائِيلَ “. قِيلَ: وَمَا ذَاكَ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: ” إذَا ظَهَرَ الْإِدْهَانُ فِي خِيَارِكُمْ، وَالْفَاحِشَةُ فِي شِرَارِكُمْ، وَتَحَوَّلَ الْمُلْكُ فِي صِغَارِكُمْ، وَالْفِقْهُ فِي أَرَاذِلِكُمْ . رواه الطحاوي في شرح مشكل الآثار : ٨/٤١٧ رقم ٣٣٥٠ و قال ارناؤوط : اسناده حسن ; و أحمد في مسنده : ٣/١٨٧  – “জিজ্ঞেস করা হল: ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ ! কখন (এই উম্মত কর্তৃক) আমর-বিল-মা’রুফ ও নাহি-আনিল-মুনকার পরিত্যাক্ত হয়ে যাবে। তিনি বললেন: ‘যখন তোমাদের (মুসলীম উম্মাহ’র) মধ্যে ওই জিনিস (ব্যাপক আকারে) প্রকাশ পাবে, যা বনী ইসরাঈলের মধ্যে (ব্যাপক আকারে) প্রকাশ পেয়েছিল’। জিজ্ঞেস করা হল: ‘সেটা কী -ইয়া রাসুলাল্লাহ ’? তিনি বললেন: ‘যখন তোমাদের (তখনকার সমাজের) ভালদের মধ্যে শারীরীক-স্থুলতা (ব্যাপক ভাবে প্রকাশ) হবে, (যখন) তোমাদের নিকৃষ্টদের মধ্যে ফাহেশা-অশ্লিলতা (ব্যাপক হারে প্রকাশ) হবে, (যখন) তোমাদের ছোটলোকদের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যাবে এবং (যখন) (দ্বীনের) জ্ঞান-বুঝ (চলে যাবে) তোমাদের নীচ-অথর্বদের কাছে”। [শারহু মাআনিল আছার, ইমাম ত্বাহাবী- ৮/৪১৭ হাদিস ৩৩৫০; মুসনাদে আহমদ- ৩/১৮৭; তারিখে দামেশক, ইবনে আসাকীর – ১৪/৪৩৩; আল-কামেল, ইবনু আদী- ৩/২৯৭; হিলইয়াতুল আউলিয়াহ, আবু নুআইম- ৫/১৮৫; জামে শুআবুল ইমান, বাইহাকী- ১০/৫২ হাদিস ৭১৪৯; জামেউ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার – ১/১৫৭] 

# ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এরশাদ করেন- إِنَّكُمْ فِي زَمَانٍ‏:‏ كَثِيرٌ فُقَهَاؤُهُ، قَلِيلٌ خُطَبَاؤُهُ، قَلِيلٌ سُؤَّالُهُ، كَثِيرٌ مُعْطُوهُ، الْعَمَلُ فِيهِ قَائِدٌ لِلْهَوَى‏.‏ وَسَيَأْتِي مِنْ بَعْدِكُمْ زَمَانٌ‏:‏ قَلِيلٌ فُقَهَاؤُهُ، كَثِيرٌ خُطَبَاؤُهُ، كَثِيرٌ سُؤَّالُهُ، قَلِيلٌ مُعْطُوهُ، الْهَوَى فِيهِ قَائِدٌ لِلْعَمَلِ، اعْلَمُوا أَنَّ حُسْنَ الْهَدْيِ، فِي آخِرِ الزَّمَانِ، خَيْرٌ مِنْ بَعْضِ الْعَمَلِ . اخرجه البخاري في الأدب المفرد, بَابُ الْهَدْيِ وَالسَّمْتِ الْحَسَنِ : رقم ٧٨٩ ; صحح الحافظ ابن حجر في الفتح : ١٠/٥١٠; و حسنه الالباني في صحيح الأدب المفرد : ١/٢٩٣ رقم ٧٨٩/٦٠٥ و في سلسلة الأحاديث الصحيحة : رقم ٣١٨٩ – ‘নিশ্চই তোমরা (আজ এমন এক) জামানায় রয়েছো, (যে জামানায় ফুকাহা (গভীর জ্ঞানী আলেম) রয়েছে অনেক, বক্তা রয়েছে কম,  যাঞ্চাকারী রয়েছে কম, দানকারী রয়েছে অনেক। এখন (তোমাদের) আমলই (তোমাদের) প্রবৃত্তির পরিচালক। তোমাদের পর অচিরেই (এমন) জামানা আসবে, যখন ফুকাহা হবে কম, বক্তা হবে বেশি, আর যাঞ্চাকারী হবে বেশি, দানকারী হবে কম। তখন (তাদের) প্রবৃত্তিই হবে (তাদের) আমলের পরিচালক। তোমরা জেনে রাখো, আখেরী জামানায় কোনো কোনো আমলের চাইতে সুন্দর হিদায়েতই (আল্লাহ’র কাছে) উত্তম (বিবেচিত) হবে’। [আল-আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী, হাদিস ৭৮৯]

ফায়দা: আল্লাহ তাআলা শেষ জামানায় মুসলীম উম্মাহ’র মধ্য থেকে মুত্তাকী ও মুহাক্কেক আলেমগণকে একে একে তুলে নেবেন এবং দ্বীন ও শরীয়ত হিফাজতের জন্য সামান্য কিছু সুযোগ্য ওলামায়ে কেরাম বিদ্যমান থাকবেন। বাদ বাকিরা যারা আলেম নামে সমাজে পরিচিত হবে, তারা ইলমী প্রশস্থতা ও গভীরতা -দুটো থেকেই বেশ দূরে থাকবে, তাদের বেশির ভাগের মধ্যে তাকওয়ার চাইতে কু-প্রবৃত্তি শক্তিশালী থাকবে। ফলে শয়তান অতি সহজেই তাদেরকে ইলমের মোড়কে ব্যবহার করে বাস্তবে পরষ্পরের মধ্যে অন্যায্য মতোবিরোধ, দ্বন্দ্ব ও ঝগড়াঝাটিতে লাগিয়ে ইলমী ময়দানকে ঘোলাটে করে দিবে। আম-পাবলিক তো এমনিতেই শরীয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ এবং কু-প্রবৃত্তিতে চরমভাবে আক্রান্ত থাকবে, তার মধ্যে এসব আলেম নামধারী ব্যাক্তিদের দ্বারা সৃষ্ট ঘোলাটে ইলম থেকে খাঁটি ও ধোঁকাকে আলাদা করতে না পারায় দিশেহারা হয়ে যাবে।

এই হাদিস থেকে শিক্ষনীয় হল, শেষ জামানায় বেশিরভাগ আলেম নামধারী ব্যাক্তি হবে ও সাধারণ মুসলমানরা দ্বীনের খাঁটি ও সুগভীর ইলম থেকে দূরে থাকবে। এরাই হল ‘আসাগীর’; এদের থেকে ইলম হাসিলের ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। তখনও যে অল্প কিছু সংখ্যক মুহাক্কেক ও মুত্তাকি ওলামায়ে কেরাম জীবিত থাকবেন, তাদের থেকেই যথাসাধ্য ইলম নিতে হবে। তাঁদেরকে ওই ভাবেই খুঁজে নিতে হবে, যেভাবে আপনি মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে অসততায় ভরা ডাক্তারদের মধ্য থেকে খাঁটি ডাক্তার খোঁজার চেষ্টা করে থাকেন। الله اعلم بالصواب 

# হযরত ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন- سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : إن في أمتي لنيفا وسبعين داعيا ، كلهم داع إلى النار ، لو أشاء لأنبأتكم بأسمائهم وقبائلهم . رواه أبو يعلى الموصلي فى مسنده: ١٠/٦٥ رقم ٥٧٠١ . قال ابن كثير فى البداية والنهاية , كتاب الفتن والملاحم وأشراط الساعة والأمور العظام يوم القيامة: ١٩/١١٨ وهذا إسناد لا بأس به; قال الهيثمى : رواه أبو يعلى وفيه ليث بن أبي سليم وهو مدلس،وبقية رجاله ثقات:٧/٣٣٢ – ‘আমি রাসুলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি যে, আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর জনের বেশি আহবানকারী (লিডার/গুরু) হবে। তাদের প্রত্যেকেই (একেকজন পথভ্রষ্ঠ এবং তাদের জীবনকালে তারা নিজ নিজ প্রথভ্রষ্ঠ মত ও পথকে মুক্তির সঠিক পথ বলে প্রচার করবে, ফলে আদপে তারা মানুষকে) দোযখের দিকে আহবান করবে। (তাদের থেকে সাবধান থেকো)। আমি চাইলে তোমাদেরকে তাদের নাম ও তাদের এলাকার খবর বলে দিতে পারি’। [মুসনাদে আবু ইয়া’লা- ১০/৬৫ হাদিস ৫৭০১; আল-বিদায়াহ ওয়ান্নিহায়াহ, ইবনে কাছির- ১৯/১৮৮; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৭/৩৩২]

# হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- سَيَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ نَاسٌ مِنْ أُمَّتِي يُحَدِّثُونَكُمْ مَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ وَلَا آبَاؤُكُمْ، فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ . رواه ابن حبان في صحيحه: ١٥/١٦٩ رقم ٦٧٦٦, قال شعيب الأرنؤوط : إسناده صحيح ; و أحمد في مسنده: ١٤/٢٥٢ رقم ٨٥٩٦ و حسنه شعيب; و إسحاق بن راهويه في مسنده : ١/٣٤٠ رقم ٣٣٢; و ابو يعلى الموصلي في في مسنده: ١١/٢٧٠ رقم ٦٣٨٤ قال حسين سليم أسد: إسناده صحيح ; و الحاكم في المستدرك: ١/١٧٣ – ‘অচিরেই শেষ জামানায় আমার উম্মতের মেধ্য (এমন সব) লোকজন (আবির্ভূত) হবে, যারা তোমাদের কাছে এমনসব কথা বলবে, যা না তোমরা (মুসলমানরা ইতিপূর্বে কখনো) শুনে থাকবে, আর না তোমাদের পূর্বপুরুষরা (কখনো শুনে থাকবে)। তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। (তারা যেন তোমাদেরকে তাদের ফিতনায় ফেলে পথভ্রষ্ঠ করে দিয়ে না বসে)’। [সহিহ ইবনে হিব্বান– ১০/১৬৮, হাদিস ৬৭৬৬; সহিহ মুসলীম- ১/১২; মুসনাদে আহমদ- ১৪/২৫২ হাদিস ৮৫৯৬; মুসনাদে ইসহাক বিন রাহুওয়াই- ১/৩৪০ হাদিস ৩৩২; মুসনাদে আবু ইয়া’লা- ১১/২৭০ হাদিস ৬৩৮৪; মুসতাদরাকে হাকিম- ১/১৭৩; শারহুস সুন্নাহ, বাগাভী- ১/২২৩]

# হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- يَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ دَجَّالُونَ كَذَّابُونَ، يَأْتُونَكُمْ مِنَ الْأَحَادِيثِ بِمَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ، وَلَا آبَاؤُكُمْ، فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ، لَا يُضِلُّونَكُمْ، وَلَا يَفْتِنُونَكُمْ . صحيح مسلم: ١/١٢ رقم ٧; صحيح ابن حبان:١٥/١٦٨ رقم ٦٧٦٦ ,قال شعيب الأرنؤوط : إسناده صحيح ; مسند أحمد: ١٤/٢٥٢ رقم ٨٥٩٦ حسنه شعيب; مسند إسحاق بن راهويه: ١/٣٤٠ رقم ٣٣٢; مسند أبي يعلى الموصلي: ١١/٢٧٠ رقم ٦٣٨٤ قال حسين سليم أسد: إسناده صحيح – ‘শেষ জামানায় (আমার উম্মতের মাঝে এমন সব) দাজ্জালদের ও কাজ্জাবদের (আবির্ভাব) হবে, যারা তোমাদের কাছে এমনসব (নতুন নতুন) কথা নিয়ে আসবে, যা না তোমরা (মুসলমানরা ইতিপূর্বে কখনো) শুনে থাকবে, আর না তোমাদের বাপ-দাদা পূর্বপুরুষরা (কখনো শুনে থাকবে। তোমরা তাদের ওসব ব্যাপারে সতর্ক হয়ে থেকো) তারা (যেন) তোমাদেরকে পথভ্রষ্ঠ করতে না পারে এবং তোমাদেরকে ফিতনায় ফেলতে না পারে’। [সহিহ মুসলীম- ১/১২ হাদিস ৭; সহিহ ইবনে হিব্বান, ১০/১৬৮, হাদিস ৬৭৬৬; মুসনাদে আহমদ- ১৪/২৫২ হাদিস ৮৫৯৬; মুসনাদে ইসহাক বিন রাহুওয়াই- ১/৩৪০ হাদিস ৩৩২; মুসনাদে আবু ইয়া’লা- ১১/২৭০ হাদিস ৬৩৮৪]

ফায়দা: ‘দাজ্জাল’ বলা হয় মূলতঃ এমন চরম ধোকাবাজ বা প্রকারক’কে, যে তার কথা বা কাজের ভেলকিতে একজন মানুষের সামনে সত্য ও মিথ্যাকে এতটা ঘোলাটে করে দেয় যে, তার জন্য মিথ্যা থেকে সত্যকে আলাদা করাই দায় হয়ে দাঁড়ায়। আর কাজ্জাব বলা হয় মূলতঃ অতি মাত্রার মিথ্যাককে। এরা আসবে এই উম্মতের শেষ জামানায়। আর আমরা ইতিপূর্বে দেখিয়ে এসেছি যে, আমরা শেষ জামানা অতিক্রম করছি।

হাদিসটিতে বলা হয়েছে- يَأْتُونَكُمْ مِنَ الْأَحَادِيثِ بِمَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ– ‘তারা তোমাদের কাছে এমনসব (নতুন নতুন) কথা নিয়ে আসবে, যা না তোমরা (মুসলমানরা ইতিপূর্বে কখনো) শুনে থাকবে, আর না তোমাদের বাপ-দাদা পূর্বপুরুষরা (কখনো শুনে থাকবে’। এখানে মূল শব্দটি হল حديث (হাদিস), যার অর্থ কথা, বাণী, নতুন বিষয় ইত্যাদি। আমি এর অর্থ করেছি ‘(নতুন নতুন) কথা’। এখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পুরো বাক্যটির অনেক অর্থ ও উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমন:-

(ক) এখানে حديث (হাদিস) বলতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মুখ নিঃসৃত হাদিস (বাণী/কথা)ও উদ্দেশ্য হতে পারে। তখন এর অর্থ হবে, শেষ জামানার ওই দাজ্জাল ও কাজ্জাব লোকগুলি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামে এমনসব জাল/বানোয়াট হাদিস বর্ণনা/পেশ করবে, যা আমাদের সম্মানীত মুহাদ্দেসগণ থেকে নির্ভরযোগ্য/মকবুল সূত্রে বর্ণিত হয়নি বা তাঁরা কিতাবে লিখে যাননি।    

(খ) এখানে حديث (হাদিস) বলতে এমন পথভ্রষ্ঠ ও বাতিল আক্বীদা বিশিষ্ট বাণী/কথাও উদ্দেশ্য হতে পারে, যা শেষ জামানার উম্মাহকে পথভ্রষ্ঠ করার উদ্দেশ্যে ওই দাজ্জাল ও কাজ্জাব লোকগুলি বিভিন্ন কায়দায় পেশ করবে। যেমন: বাংলাদেশের দেওয়ানবাগী নামক শয়তানটি যেসকল মিথ্যা ও বাতিল আক্বীদাগুলো পেশ করে থাকে। কিংবা যেমন ভারতের গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজকে কখনো ‘নবী’, কখনো ‘মাহদী’, আবার কখনো ‘ঈসা মাসিহ’ ইত্যাদি দাবী করার জন্য তার কিতাবাদিতে বিভিন্ন ধোকা, প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয়ে কুরআন-সুন্নাহ’র অপব্যাখ্যা করেছে। সে কুরআন-সুন্নাহ’র এমন সব অপ-তথ্য ও অপ-ব্যাখ্যা দিয়েছে, যার নজির গোটা ১৪৫০ বছরের ইসলামী ইতিহাসে নেই। এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- لا تقوم الساعة حتى يبعث دجالون كذابون قريبا من ثلاثين كلهم يزعم أنه رسول الله – ‘কেয়ামত কায়েম হবে না যাবৎ না প্রায় ত্রিশ জনের মতো দাজ্জাল কাজ্জাব আবির্ভূত হয়। তাদের প্রত্যেকেই দাবী করবে যে, সে আল্লাহ’র রাসুল’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৬০৯]

(গ) এখানে حديث (হাদিস) বলতে এমন পথভ্রষ্ঠ কথা/মতবাদও উদ্দেশ্য হতে পারে, যা শেষ জামানার কিছু পথভ্রষ্ঠ লোক/লিডার উম্মাহ’র সামনে পেশ করবে, যেসব কথা/মতবাদ শেষ জামানার মুসলমানদের কাছেই প্রথম পেশ করা হয়েছে। যেমন: সেকুলারিজস (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ), ডেমোক্রেসি (গণতন্ত্র), সোসালিজম (সমাজতন্ত্র), কমিউনিজম, ফেমিনিজম (নারীত্ববাদ), ফ্রিডম অব স্পিস (বাক স্বাধিনতা) ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগ থেকে নিয়ে গত ১৯২০ সালে ‘উসমানী খিলাফত’ ধ্বংসের আগ পর্যন্ত  বিগত ১৪৫০ বেছরের ইসলামী ইতিহাসে মুসলমানগণ কখনো এসব পথভ্রষ্ঠ মতবাদ-মতাদর্শ গুলোকে গ্রহন করার কথা শোনেনি। ১৯২০ সালে ‘উসমানী খিলাফত’ ধ্বংসের পর মুসলীম নামধারী কিছু পথভ্রষ্ঠ লিডার শ্রেণির লোক ইহূদী-খৃষ্টানদের থেকে আমদানীকৃত এসব মতবাদকে উম্মাহ’র মাঝে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দেয়। এসব পথভ্রষ্ঠ লিডার শ্রেণির লোকদের মধ্যে যাদের নাম না নিলেই না, তারা হল: তরষ্কের মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক, মিশরের আনোয়ার সাদাত, জামাল আব্দেল নাসের, হোসনি মুবারক, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মুআম্মার গাদ্দাফী, পাক-ভারত উপ-মহাদেরশের এ.কে ফজলুল হক্ব, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি, জুলফিকার আলী ভুট্টো, শেখ মুজিবুর রহমান, ইরানের শাহ মুহাম্মাদ রেজা পাহলভি প্রমুখ।  হযরত ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন- سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : إن في أمتي لنيفا وسبعين داعيا ، كلهم داع إلى النار ، لو أشاء لأنبأتكم بأسمائهم وقبائلهم . رواه أبو يعلى الموصلي فى مسنده: ١٠/٦٥ رقم ٥٧٠١ . قال ابن كثير فى البداية والنهاية , كتاب الفتن والملاحم وأشراط الساعة والأمور العظام يوم القيامة: ١٩/١١٨ وهذا إسناد لا بأس به; قال الهيثمى : رواه أبو يعلى وفيه ليث بن أبي سليم وهو مدلس،وبقية رجاله ثقات:٧/٣٣٢ -‘আমি রাসুলুল্লাহ সা.-কে একথা বলতে শুনেছি যে: আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর জনের বেশি আহবানকারী (লিডার/কর্ণধার) হবে। তাদের প্রত্যেকেই (একেকজন পথভ্রষ্ঠ এবং তাদের জীবনকালে তারা নিজ নিজ প্রথভ্রষ্ঠ মত ও পথকে মুক্তির সঠিক পথ বলে প্রচার করবে, ফলে আদপে তারা মানুষকে) দোযখের দিকে আহবান করবে। (তাদের থেকে সাবধান থেকো)। আমি চাইলে তোমাদেরকে তাদের নাম ও তাদের এলাকার খবর বলে দিতে পারি’। [মুসনাদে আবু ইয়া’লা- ১০/৬৫ হাদিস ৫৭০১; আল-বিদায়াহ ওয়ান্নিহায়াহ, ইবনে কাছির- ১৯/১৮৮; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৭/৩৩২]

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ، لَا يُضِلُّونَكُمْ، وَلَا يَفْتِنُونَكُمْ – ‘(তোমরা তাদের ওসব ব্যাপারে সতর্ক হয়ে থেকো) তারা (যেন) তোমাদেরকে পথভ্রষ্ঠ করতে না পারে এবং তোমাদেরকে ফিতনায় ফেলতে না পারে’। এ থেকে বোঝা যায়, শেষ জামানার ওই লোকগুলির পথভ্রষ্ঠতার ফিতনা গুলো হবে মারাত্মক, যা থেকে সতর্ক না থাকলে উম্মাহ’র পথভ্রষ্ঠ হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আর ‘ফিতনা’ মূলতঃ এমন আক্বীদাহ-বিশ্বাস বা চিন্তা-চেতনার নাম, যা মানুষকে বিবেক- বুদ্ধি জনিত ধোকার এমন ধুম্রজালে ফেলে দেয় যে, সে হক্ব ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়ে হিমশিম খেয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায় এবং একসময় তার দ্বীন ও ইমানই ছিন্তাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

এরকম ফিতনা ছড়ানোর বিভিন্ন যোগ্যতাগুণধারী ব্যাক্তিকেও দাজ্জাল (চরম প্রতারক)ও বলা হয়ে থাকে। আর এই দাজ্জালরা যেহেতু প্ররচনা ও প্রতারনার মাধ্যমে দ্বীনে-হক্ব (সত্য দ্বীন) থেকে মিথ্যার দিকে আহবান করে, তাই তাদেরকে কাজ্জাব (চরম মিথ্যুক)ও বলা হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফিতনাবাজ হবে ‘কানা-দাজ্জাল’ যে শেষ জামানায় বেড় হবে, এরপর নিজকে নবী ও রব (প্রতিপালক) দাবী করে বহু মানুষের ইমান নষ্ট করে দিবে।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন-بين يدي الساعة الدجال، وبين يدي الدجال كذابون ثلاثون أو أكثر . قلنا: ما آيتهم؟ قال: أن يأتوكم بسنة لم تكونوا عليها يغيرون بها سنتكم ودينكم، فإذا رأيتموهم؛ فاجتنبوهم وعادوهم . رواه الطبراني كما في إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة : ٣/٣٢ ; و اخرجه احمد ايضا في المسند مختصرا باسند حسن : ٥/١٨٧ رقم ٥٦٩٤ ; و اورده ابن كثير في البداية والنهاية : ١٩/١١٧ تحقيق: دكتور عبد الله التركي , و السيوطي في جامع الأحاديث : ٣/٨٨ رقم ٧٤٥٨ – ‘কেয়ামতের পূর্বে দাজ্জাল (আবির্ভূত) হবে, আর দাজ্জালের পূর্বে ত্রিশজন বা তারও বেশি মিথ্যুক হবে’। আমরা জিজ্ঞেস করলাম: ‘তাদের চিহ্ন কি হবে’? তিনি বললেন: ‘তারা এমন সুন্নাহ (আদর্শ ও নীতি) নিয়ে তোমাদের কাছে আসবে, যার উপরে তোমরা (মুসলমানরা তার আগে খায়রুল কুরুনের কোনো জামানাতেও তা দ্বীন-ইসলামের অংশ ছিল মর্মে পরিচিত) থাকবে না এবং তারা (তাদের) ওসব সুন্নাহ (আদর্শ ও নীতি) দিয়ে তোমাদের (মুসলমানদের) সুন্নাহ (ও আদর্শ)কে এবং তোমাদের দ্বীন (ইসলামকে) পরিবর্তন করে ফেলবে। সুতরাং, তোমরা যদি তাদেরকে দেখতে পাও, তাহলে তাদের থেকে তোমরা বেঁচে থাকবে এবং (যথাসাধ্য শরীয়তের সীমা রক্ষা করে) তাদের বিরোধীতা করবে’। [ত্বাবরাণী: ইতহাফুল জামাআহ – ৩/৩২; মুসনাদে আহমদ- ৫/১৮৭ হাদিস ৫৬৯৪; আল-বিদায়াহ, ইবনে কাসির- ১৯/১১৭; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ- ৭/৩৩৩; জামেউল আহাদিস, ইমাম সুয়ূতী- ৩/৮৮ হাদিস ৭৪৫৮] الله اعلم بالصواب

# উবাদাহ বিন সামিত  রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন-  يَكُونُ عَلَيْكُمْ أُمَرَاءُ إِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ أَدْخَلُوكُمُ النَّارَ وَإِنْ عَصَيْتُمُوهُمْ قَتَلُوكُمْ ” . فَقَالَ رَجُلٌ مِنْهُمْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ سَمِّهِمْ لَنَا لَعَلَّنَا نَحْثُوا فِي وُجُوهِهِمُ التُّرَابَ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – : ” لَعَلَّهُمْ يَحْثُونَ فِي وَجْهِكَ وَيَفْقَؤُونَ عَيْنَكَ ” . رواه الطبراني. قال الهيثمي:٥/٤٢٩: و فيه سنيد بن داود؛ ضعفه أحمد ووثقه ابن حبان وأبو حاتم الرازي، وبقية رجاله ثقات – ‘তোমাদের উপর এমনসব (পথভ্রষ্ঠ) শাসকরা আসবে, তোমরা যদি তাদের অনুগত্য করো, তাহলে তারা তোমাদেরকে দোযখে ঢুকবে, আর তোমরা যদি তাদেরকে অমান্য করো, তাহলে তারা তোমাদেরকে (বিভিন্ন কৌশলে) হত্যা করে ফেলবে’। তখন তাদের মধ্যে এক ব্যাক্তি জিজ্ঞেস করলো: ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদেরকে তাদের নামগুলো বলে দিন, যাতে আমরা তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করতে পারি’। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: ‘সম্ভাবনা রয়েছে, তারাই তোমার মুখে মাটি নিক্ষেপ করবে এবং তোমার চোখ বেড় করে ফেলবে’। [ত্বাবরাণী: মাজমাউয যাওয়ায়ীদ– ৫/৪২৯; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ- ৭/৪৬১ হাদিস ৩৭২৩৭; আল-মুখতারাহ, মাকদিসী- ৮/৩৪০ হাদিস ৪২০; কানজুল উম্মাল– ৬/৮৬ হাদিস ৩১১৯৫]

ফায়দা: আব্দুর রহমান বিন বাশির আল-আনসারী. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- أتى رجل فنادى ابن مسعود رضي الله عنه، فأكب عليه، فقال: يا أبا عبد الرحمن متى أضل وأنا أعلم؟ قال: إذا كانت عليك أمراء إذا أطعتهم أدخلوك النار، وإذا عصيتهم قتلوك “. رواه الحاكم في “مستدركه”: ٤/٦٢٩ رقم ٨٤٩٠، وقال: “هذا موقوف صحيح الإسناد ولم يخرجاه “، و وافقه الذهبي في “تلخيصه كما في إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة: ١/٢٢٠ – ‘(একবার) এক ব্যাক্তি এসে (আব্দুল্লাহ) ইবনে মাসউদ রা.-কে ডাক দিলো এবং তাঁর দিকে মুখ করে বললো: ‘হে আব্দুর রহমানের পিতা (-ইবনে মাসউদ)! (সেটা) কোন সময় (যখন) আমি (পথভ্রষ্ঠতা কী -তা) জেনেও পথভ্রষ্ঠ হয়ে যাবো?’ তিনি বললেন: ‘যখন তোমার উপর এমন শাসকরা হবে, যখন তুমি তাদের অনুগত্য করলে তারা তোমাকে দোযখে ঢুকাবে, আর তাদেরকে অমান্য করলে তারা তোমাকে (বিভিন্ন কৌশলে) হত্যা করে ফেলবে’ [মুসতাদরাকে হাকিম- ৪/৬২৯ হাদিস ৮৪৯০]

# নসর বিন আসেম আল-লাইস রহ. থেকে বর্ণিত, হযরত হুযাইফা রা. বলেন- كان الناس يسألون رسول الله صلى الله عليه و سلم عن الخير وأسأله عن الشر وعرفت أن الخير لن يسبقني قلت يا رسول الله أبعد هذا الخير شر قال يا حذيفة تعلم كتاب الله واتبع ما فيه ثلاث مرات قال قلت يا رسول الله أبعد هذا الشر خير قال هدنة على دخن وجماعة على أقذاء قال قلت يا رسول الله الهدنة على دخن ما هي قال لا ترجع قلوب أقوام على الذي كانت عليه قال قلت يا رسول الله أبعد هذا الخير شر قال فتنة عمياء صماء عليها دعاة على أبواب النار وأنت أن تموت يا حذيفة وأنت عاض على جذل خير لك من أن تتبع أحدا منهم. مسند الإمام أحمد: ٥/٣٨٦ رقم ٢٣٣٣٠ , تعليق شعيب الأرنؤوط : حديث حسن – ‘লোকজন রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কল্যান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো, আর আমি জিজ্ঞেস করতাম মন্দ সম্পর্কে, (যাতে) আমি চিনে নিতে পারি যে, কল্যান আমাকে পিছনে ফেলে অগ্রসর হয়ে যায়নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই কল্যানের পর কি কোনো মন্দ আছে? তিনি তিনবার বললেন: হে হুযাইফা! আল্লাহ’র কিতাবের ইলম হাসিল করো এবং তার মধ্যে যা আছে তার অনুসরণ করো। তিনি বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই মন্দের পর কি কোনো কল্যান আছে? তিনি বললেন: (হ্যাঁ, আছে। সেটা এমন যেন পাপের) ধোয়ার উপর (ইমান ও আমলের অপূর্ণ) স্থিরতা এবং (গোনাহ’র ছিটেফোটা) ধুলোবালির উপর (জীবন অতিবাহীত করা মুসলমানদের এক) জামাআত।তিনি বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! ধোয়ার উপর (ইমান ও আমলের অপূর্ণ) স্থিরতা -এটা কি? তিনি বললেন: (সে জামানার মুসলমান) গোষ্ঠিদের অন্তরসমূহ (ইমানের) যে অবস্থার উপর বিদ্যমান ছিল, তাতে আর ফিরে না যাওয়া (বরং ইমান ও আমলের মধ্যে পাপের কিছুটা ধোয়াসে ভাব থেকে যাওয়া)। তিনি বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই কল্যানের পর কি কোনো মন্দ আছে? তিনি বললেন: (হ্যাঁ, আছে। আর সেটা হল এমন এক) ফিতনা যা (আকিদা ও বিশ্বাসগত) অন্ধত্ব ও বধিরতা (-র অন্ধকার নিয়ে আবির্ভূত হবে, যার উপর ভিত্তি করে দোযখের বিভিন্ন দরজায় দাঁড়িয়ে (পথভ্রষ্ঠতার ধারক-বাহক নেতা ও লিডার’দের পক্ষ থেকে তোমাদের মুসলমানদেরকে তাদের আদর্শ গ্রহনের দিকে) ডাক দেয়া হবে। হে হুযাইফা, তুমি যদি (তখন আল্লাহ’র রাস্তায় মড়ে যেতে পরো, তো) মড়ে যেও (তবুও কোনো অবস্থাতেই ওদের অনুসরণ করতে যেও না)। ওদের (মতো পথভ্রষ্ঠ লিডারদের) কোনো একজনের অনুগত্য-অনুসরণ করার থেকে তুমি আনন্দ-উল্লাসে (তোমার ধ্বনসম্পদ) উড়িয়ে দিবে সেটাও তোমার জন্য অধিক কল্যানকর হবে’। [মুসনাদে আহমদ- ৫/৩৮৬, হাদিস ২৩৩৩০; সুনানুল কুবরা, নাসায়ী- ৫/১৮ হাদিস ৮০৩২, ৮০৩৩; আত-তবাকাত, ইবনে সা’দ- ৪/২৫২]

# আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُكْفَرَ بِاللَّهِ جَهْرًا ، وَذَلِكَ عِنْدَ كَلَامِهِمْ فِي رَبِّهِمْ . أخرجه الطبرانى فى الأوسط , بَابُ الْعَيْنِ : ٤/١٥٠ رقم ٣٨٤٣، قال الهيثمى : ١/٨١: رواه الطبرانى فى الأوسط وقال لم يروه عن الأوزاعى إلا إسماعيل بن يحيى التيمى قلت ولم أر من ذكر إسماعيل ولا الذى روى عنه وهو إسحاق بن زريق . والديلمى في مسند الفردوس : ٥/٨٥ رقم ٧٥٣٨ – ‘কেয়ামত কায়েম হবে না -যাবৎ না (একেবারে) প্রকাশ্যে (খোলাখুলি ভাবে) আল্লাহ’র সাথে কুফরী করা হয়। আর সেটা (তাদের থেকে প্রকাশ পারে) আল্লাহ’কে নিয়ে কথা বলার সময়”। [আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী- ৪/১৫০ হাদিস ৩৮৪৩; মুসনাদে ফিরদাউস, ইমাম দাইলামী- ৫/৮৫ হাদিস ৭৫৩৮; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ১/৮১; জামেউল আহাদিস, সুয়ূতী- ২৫৮৬৭]

ফায়দা: এই শেষ জামানায় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মাহ’র মধ্যে থেকে একটি বড় অংশ আজ কমিউনিষ্ট, সোসালিষ্ট, সেকুলারিষ্ট, ফেমিনিষ্ট, ডেমোক্রেটিষ্ট হয়ে গেছে এবং তারা যখনই দেখছে যে, তাদের এসব প্রিয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো বিশ্বাস বা বিধানের দিকে আল্লাহ তাআলা আহবান করেছেন, তখন তাদের মধ্যে অনেকেই প্রকাশ্যে আল্লাহ’র অস্তিত্বের বিরুদ্ধে, আল্লাহ’র দ্বীন ও শরীয়তের (বিধানের) বিরুদ্ধে, আল্লাহ’র সততা ও ন্যায়পরায়নাতার বিরুদ্ধে মুখ খুলছে, কলম ধরছে, রাস্তায় নামছে। তারা তাদের কথাবার্তায়, বিবৃতিতে, ভাষনে, মন্তব্যে, আলোচনা টেবিলে, মঞ্চে -এমন কোন সুযোগ হাতছাড়া করছে না, যেখানে তারা আল্লাহ’র বিরুদ্ধে কুফরী তৎপরতা চালাচ্ছে না? আমার মতে, এই ভবিষ্যৎবাণী আমাদের এ জামানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। الله اعلم بالصواب

# হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- سيأتي على أمتي زمان تكثر فيه القراء ، وتقل الفقهاء ويقبض العلم ، ويكثر الهرج ” قالوا : وما الهرج يا رسول الله ؟ قال : ” القتل بينكم ، ثم يأتي بعد ذلك زمان يقرأ القرآن رجال لا يجاوز تراقيهم ، ثم يأتي من بعد ذلك زمان يجادل المنافق الكافر المشرك بالله المؤمن بمثل ما يقول “- اخرجه الحاكم فى المستدرك : ٤/ ٤٥٧ رقم ٨٤١٢ , كتاب الفتن والملاحم و قال: هذا حديث صحيح الإسناد ، ولم يخرجاه و وافقه الذهبى,  المعجم الأوسط للطبراني, رقم الحديث ٣٣٨٥; جامع بيان العلم وفضله لابن عبد البر: , رقم ١٠٤٣  ;  مجمع الزوائد – ١/١٢٩, الجامع الصغيرلالسيوطي: ٢ / ٥٧, هذا الحديث حسن – islamic-culture.faith মুনাফেক, কাফের মুশরেক মুমিন মুর্তি সংস্কৃতি বিতর্ক -‘অতি শিঘ্রই আমার উম্মাতের উপর এমন জামানা আসবে, যখন (কুরআনের) পাঠক হবে প্রচুর, কিন্তু (কুরআনের গভীর জ্ঞনের ধারক) ফকিহ হবে অল্প, (আল্লাহ তাআলাে একে একে ফকিহ আলেমবৃন্দকে তাঁর কাছে উঠিয়ে নিবেন এবং এভাবেই) ইলম উঠে যাবে, (ফলে সর্বক্ষেত্রে জাহেল ও মুর্খ মানুষদের ঢল নামবে) এবং (এর ক্রমধারায় এমন পরিবেশ সৃষ্টি হবে যে,) হারাজ বেড়ে যাবে। জিজ্ঞেস করা হল: হারাজ কী -ইয়া রাসুলাল্লাহ? তিনি ﷺ বললেন: (শেষ জামানায়) তোমাদের (মুসলমানদের নিজেদের) মধ্যে (সংঘটিত) খুনাখুনি (-যা হবে একটি বিশেষ ফিতনা)। সেই জামানার পর আমার উম্মতের মধ্যে থেকে এমনসব ব্যাক্তিদের আবির্ভাব হবে, যারা কুরআন-তো পড়বে, কিন্তু (কুরআনের মর্মার্থ জিহবা থেকে) তাদের (গলার) হলকূমও অতিক্রম করবে না, (ক্বলব ও মস্তিষ্কে ঢোকা-তো পরের কথা)। সেই জামানার পর এমন হবে যে, মুনাফেক, কাফের ও মুশরেক ব্যাক্তি মুমিনের সাথে আল্লাহ’র ব্যাপারে বাক-বিতন্ডা করবে -এমন উদাহরণ টেনে, যা সে বলে থাকে[মুসতাদরাকে হাকীম- ৪/৫০৪, হাদিস ৮৪১২; আল-মু’জামুল আউসাত, তাবরাণী, হাদিস ৩২৭৭; জামেউ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার- ১০৪৩; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ১/১২৯; জামেউস সাগীর, সুয়ূতী- ২/৫৭]

ফায়দা: উপরোক্ত হাদিসে আল্লাহ’র ব্যাপারে বাকবিতন্ডা ও ঝগড়া বলতে মূলতঃ আল্লাহ’কে নিয়ে, আল্লাহ’র দ্বীন ও শরীয়তকে নিয়ে, কুরআনকে নিয়ে, শেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিয়ে বিভিন্ন ইস্যু দাঁড় করানো ও মুমিনগণ আল্লাহ’র পক্ষ নিয়ে মর্দে মুমিনের মতো জবাব দিতে গেলে তার জবাবকে কৌশলে খন্ডন ও বাঞ্চাল করে দেয়ার মানসে  মুনাফেক, কাফের ও মুশরেকদের দ্বারা বাক-বিতন্ডা ও ঝগড়ার পরিবেশ তৈরী করার দিকে ইশারা করা হয়েছ।

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا – “আর এভাবেই আমরা (ইবলিসের অনুগামী) মানব ও জীন শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর দুশমন বানিয়ে দিয়েছি। (এরা) প্রতারনা করার উদ্দেশ্যে একে অপারের কাছে আকর্ষনীয় কথাবার্তার প্ররোচনা দেয়”[সুরা আনআম ১১২]

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰ أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ – “আর নিশ্চই (ইবলিসের অনুগামী) শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্ররোচনা দেয় তোমাদের (মুমিনদের) সাথে (আল্লাহ তাআলা, আম্বীয়া আ. ও দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে কু-) তর্ক করার জন্য”[সুরা আনআম ১২১]

আমার মতে, এই ভবিষ্যতবাণী আমাদের এ জামানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। এ যুগে বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত  টক-শো, ডিবেট কিংবা ইন্টারভিউ গুলোতে কাফের, মুশরেক ও মুনাফেকদেরকে মুমিনদের বিপক্ষে অবস্থান করে আল্লাহ তাআলা, তাঁর কিতাব কুরআন, তাঁর রাসুল ﷺ, তাঁর নাজিল কৃত ইসলামী দ্বীন ও শরীয়ত দমনের যত কসরত আপনি দেখতে পান, তা উপরোক্ত ভবিষ্যতবাণীরই একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি।  الله اعلم بالصواب

# আব্দুর রহমান রহ.-এর সূত্রে সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রাহ রা. বলেন- والذي نفس أبي هريرة بيده؛ ليأتين على العلماء زمان الموت أحب إلى أحدهم من الذهب الأحمر، ليأتين أحدكم قبر أخيه، فيقول: ليتني مكانه . رواه الحاكم في “مستدركه , كتاب الفتن و الملاحيم : ٤/٥١٨ و قال: هذا حديث صحيح على شرط الشيخين و لم يخرجاه ، و وافقه الذهبي في تلخيصه ; و ابن عساكر في تاريخ دمشق , ابو هريرة الدوسئ : ٦٧/٣٨٠ – “ওই সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, অবশ্যই আলেমগণের উপরে এমন এক (অত্যাচারের) জামানা আসবে, যখন মৃত্যুই তাদের যে কারোর কাছে লাল স্বর্ণের চাইতেও প্রিয় (মনে) হবে। অবশ্যই (এমন জামানা আসবে, যখন) তোমাদের (মুসলমানদের) কেউ তার ভাইয়ের কবরের কাছে এসে বলবে: ‘হায় আমার (কপাল), আমি যদি তার জায়গায় হতাম”! [মুসতাদরাকে হাকিম৪/৫১৮ ; তারিখে দামেশক, ইবনে আসাকীর- ৬৭/৩৮০; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার -১৩/৭৬]

ফায়দা: হযরত আব্দুল্লাহ সেই জামানায় গোটা বিশ্ব জুড়ে কাফের ও মুনাফেকদের রাজত্ব প্রভাব প্রতিপত্তি চলবে এবং মুমিনরা খুবই কোণঠাসা হয়ে যাবে, সমাজে ভয়ে ভয়ে অনেকটা লুকিয়ে লুকিয়ে গা বাঁচিয়ে চলবে -জীবন, পরিবার পরিজন ইত্যাদির ক্ষতি হওয়ার ভয়ে। সে সময় কাফের ও মুনাফেকরা যখন দেখবে যে, অমুক অমুক আলেম ও সাধারণ মর্দে মুমিন মুসলমানরা তাদের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন তারা তাদের উপরে চড়াও হবে, অত্যাচারের স্টিমড়োলার চালাবে, আবার অনেককে মেড়েও ফেলবে।

ওযিন বিন আতার থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لَيَأْتِيَنَّ عَلَى الْعُلَمَاءِ زَمَانٌ يُقْتَلُونَ فِيهِ كَمَا يُقْتَلُ اللُّصُوصُ , فَيَا لَيْتَ الْعُلَمَاءَ يَوْمَئِذٍ تَحَامَقُوا . أخرجه أبو عمرو الداني في السنن الواردة في الفتن , باب قتل العلماء : رقم ٣٠٢ , إسناده مرسل ضعيف ; اورده الالباني في سلسلة الأحاديث الضعيفة : رقم ٦٥٢١ – ‘অবশ্যই আলেমগণের উপরে এমন এক জামানা আসবে, যখন তাদেরকে এমনভাবে হত্যা করা হবে, যেভাবে ডাকাতকে (ধরে পিটিয়ে) হত্যা করা হয়। হায়, সেদিন আলেমগণ যদি নির্বোধ (সেজে) রইতো’। [আস-সুনানুল ওয়ারিদাহ, ইমাম দানী, হাদিস ৩০২

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে- يأتي على الناس زمان يقتل فيه العلماء كما تقتل الكلاب فياليت العلماء في ذلك الزمان تحامقوا . رواه الديلمي, كذا‏ كنز العمال: ١١/٢٨٤ رقم ٣١١٨٢; ( تحامقوا : تحامق : تكلف الحماقة . المختار) – ‘মানুষের উপর একটি জামানা আসবে, যখন আলেমগণকে (এমনভাবে) হত্যা করা হবে যেমনিভাবে কুকুরদেরকে (পিটিয়ে) হত্যা করা হয়ে থাকে। হায়!!! সেই জামানার আলেমগণ যদি (কৃত্রিমভাবে পাগলপানা) আহাম্মকানা আচরন করতো’। [দাইলামী: কাঞ্জুল উম্মাল- ১১/২৮৪, হাদিস ৩১১৮২]

আবু যর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- يوشك أن تمر الجنازة في السوق على الجماعة فيراها الرجل، فيهز رأسه، فيقول: يا ليتني مكان هذا.  قلت: يا أبا ذر إن ذلك لمن أمر عظيم  . قال: أجل . اورده ابن حجر في فتح الباري : ١٣/٦٦ ; اورد في التذكرة، ص ٧١١ – “অচিরেই (মানুষের উপরে এমন একটি জামানা আসবে, যখন এমন ঘটনাও ঘটবে যে,) বাজারের ভিতর দিয়ে একদল লোককে কোনো জানাযানিয়ে যেতে দেখে এক ব্যাক্তি সেটির দিকে তাকিয়ে তার মাথাকে (আক্ষেপ ভরে) নাড়াবে, তারপর বলবে: ‘হায় আমার (কপাল! খাটলীর), এই স্থানটি (যদি আমার জন্য হত)’! আমি বললাম: ‘হে আবু যর ! এই যদি হয়, তাহলে বিষয়টি তো তার জন্য ভয়াবহ হবে ! তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ”। [ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার -১৩/৮১]

জুলুম, অন্যায় অবিচার ও অত্যাচার সে জামানায় এত বেশি হবে যে, অনেকেই তা আর সহ্য করতে পারবে না, আবার আত্বহত্যা করে চির জাহান্নামীও হতে চাইবে না, বরং কোনো জানাযা দেখলে বা কারো কবর দেখলে আক্ষেপ করে বলতে থাকবে, তাহ আমিই যদি তার স্থলে মড়ে যেতাম !!!