কেয়ামতের আলামত ও লক্ষন সমূহ – ৬ – মহানবী (সা.) এর ভবিষ্যতবাণী

Spread the love
image_pdfimage_print

কেয়ামতের আলামত ও লক্ষন সমূহ – ৬ – মহানবী -এর ভবিষ্যতবাণী 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

 

আমরা ইতিপূর্বে কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে (এখানে ক্লিক করুন) কিছু হাদিস ও আছার পেশ করেছি। এখানেও কিছু উল্রেখ করা হল। [উল্লেখ্য, এখানে উল্লেখিত হাদিসসমূহ কোনো বিজ্ঞ মুহাদ্দেস আলেমের পরামর্শ ব্যাতীত কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। এগুলো শুধু উল্লেখ করছি, যাতে এই রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত কোনো ঘটনা ঘটতে দেখলে তা চিনে নিতে পারেন এবং রেওয়াতের হক্ব আদায় করতে পারেন।

# হযরত সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَزُولَ الْجِبَالُ عَنْ أَمَاكِنِهَا، وَتَرَوْنَ الْأُمُورَ الْعِظَامَ الَّتِي لَمْ تَكُونُوا تَرَوْنَهَا . أخرجه الطبرانى: ٧/٢٠٧، رقم ٦٨٥٧ ، قال الهيثمى ٧/٣٢٦ : فيه عفير بن معدان وهو ضعيف. وأخرجه أيضًا: نعيم بن حماد: ١/٣٩، رقم ٤٠ ; ولكن اورده و حسنه الألباني في سلسلة الأحاديث الصحيحة : ٧/١٦٦ رقم ٣٠٦١ بطرقه, ولكن ألفاظ محل الشاهد من هذه الطرق مختلفة ومحتملة, ولا يخلو إسناد منها من مقال – ‘কেয়ামত কায়েম হবে না, যাবৎ (বিভিন্ন স্থানের বিশেষ) পাহাড়সমূহ তাদের (নিজ নিজ) স্থান থেকে অপসারিত না হয় এবং (যাবৎ) তোমরা এমন বড় বড় বিষয়সমূহ প্রত্যক্ষ করে না নাও, যা আগে কখনো তোমরা দেখোনি। [আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরাণী- ৭/২০৭, হাদিস ৬৮৫৭; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইসামী- ৭/৩২৬; আল-ফিতান, নুআইম বিন হাম্মাদ- ১/৩৯, হাদিস ৪০]

ফায়দা: অনেকের মতে, এই হাদিসে আমাদের এই শেষ জামানায় অত্যাধুনিক টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পাহাড় কেটে বা সরিয়ে সেখানে বিল্ডিং-বাড়ি, মার্কেট, ইন্ডাসট্রি, রাস্তাঘাট, সুরং-রোড প্রভৃতি তৈরী করা ইশারা করা হয়ে থাকতে পারে। আমার মতে, এ ব্যাখ্যারও সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন, শুধু যদি মক্কার আধুনিকরণের দিকেই তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন যে, বায়তুল হারামের আশে পাশে পাহাড় গুলোকে কেটে, গুড়িয়ে দিয়ে সেখানে ইমারত-বিল্ডিং তৈরী করা হচ্ছে। এটা শুধু অনুমান নয়, বরং মক্কার ক্বাবা ঘরের নিকটস্থ ‘আবু কুবাইস’ পাহাড়ের উপরে যে বিল্ডিং তৈরী করা হবে সে কথা বিভিন্ন রেওয়ায়েছে ইশারা রয়েছে এবং আজ মানুষজন তার বাস্তবতা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছে।

এছাড়াও বলা হয়েছে যে, সে জামানায় এমন বড় বড় সব বিষয় ঘটতে দেখা যাবে, যা সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের জামানায় দেখেননি। এই রেওয়ায়েতে কোনো ইশারা ইংগীতও নেই যে, কী ধরনের বড় বড় বিষয় ঘটতে দেখা যাবে। তবে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীতে টেকনোলজির যে উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং ২০১৯ ইং সালে আমার এই অংশটি আপডেট কালিন সময় পর্যন্ত টেকনোলজি উন্নয়নের যে মাত্রায় গিয়ে উপনীত হয়েছে, তাতে শুধু অবাক ও অভিভূতই হতে হয়। সচেতন মহলের কাছে এটা অজানা নয় যে, এই টেকনোলজিকে ভাল’র চেয়ে মন্দের মধ্যেই ব্যবহার করা হয়েছে বেশি। তবে তা যেভাবেই ব্যবহৃত হোক, তাক লাগানোর মতো বড় বড় বিষয় অবশ্যই মানুষের চোখের সামনে দৈনন্দিন ধরা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দিবে। এই শেষ জামানার মানুষের দেখা বড় বড় বিষয়ের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস রয়েছে; যেমন: (১) টেকনোলচজির মধ্যে রয়েছ:- রকেট, স্যাটেলাইট (ভূ-উপগ্রহ), পারমাণবিক বোম্ব, অত্যাধুনিক সব যুদ্ধমারনাস্ত্র, অত্যাধুনিক রোবট, কম্পিউটারাইজড মেশিন ইন্ডাট্রিজ ইত্যাদি। (২) ১ম বিশ্বযুদ্ধ, ২য় বিশ্বযুদ্ধ, জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে এটোম বোম্ব ফেলে ব্যাপক গণহত্যা, টুইন-টাওয়ারে সন্ত্রাসী আক্রমন, দুনিয়া জুড়ে মুসলমানদেরকে গণহত্যা ইত্যাদি। (৩) আবার বড় বড় বিষয় বলতে ‘কেয়ামতের বড় বড় আলামত’ও উদ্দেশ্য হতে পারে, যেমন: দাজ্জালের আগমন, ঈসা ইবনে মারইয়াম আ.-এর আকাশ থেকে অবতরণ, পৃথিবীর তিন স্থানে অভূতপূর্ব ভূমিকম্প, ইয়াজুজ মাজুজ বেড় হওয়া, পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হওয়া, দাব্বাতুল আরদ বেড় হওয়া ইত্যাদি। (৪) ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. এবং মুমিনগণের মৃত্যুর পর যেসকল কাফের দুনিয়া চালাবে তারা হয়তো কেয়ামতের আগে আগে অন্য আরো বড় বড় বা বিষ্ময়কর কিছু তৈরী ও ব্যবহার করবে, যা মুমিনগণ দেখে মড়তে পারবে না বটে কিন্তু এই উম্মতের মধ্যে যারা তখন কাফের মুরতাদ হয়ে যাবে তাদের কেউ হয়-তো তখনকার বড় বড় আরো কিছু বিষয় দেখতে পাবে। الله اعلم بالصواب

# ইমাম আবু বকর ইবনু আবি শায়বাহ রহ. (মৃ: ২৩৫ হি:) নিজ সনদে বর্ণনা করেছেন, এক ব্যাক্তি আলী রা. জিজ্ঞেস করলো: متى الساعة ‘কেয়ামত কখন হবে’ ? তখন আলী রা. বললেন:  لقد سألتموني عن أمر ما يعلمه جبريل ولا ميكائيل ، ولكن إن شئتم أنبأتكم بأشياء إذا كانت لم يكن الساعة كبير لبث ، إذا كانت الألسن لينة والقلوب نيازك ، ورغب الناس في الدنيا وظهر البناء على وجه الأرض ، واختلف الأخوان فصار هواهما شتى وبيع حكم الله بيعا . رواه ابن أبي شيبة : ٧/٥٠١ رقم ٣٧٥٣٥ , فيه نبي هو مجهول الحال , قال د. غالب بن محمد في زوائد ابن أبي شيبه على الكتب الستة : ١/٤٠٦ رقم ٢٦٣ اسناده ضعيف… انتهي – ‘তোমরা আমার কাছে এমন বিষয়ে জানতে চাইলে, যার কথা না জিবরাঈলের জানা আছে, না মিকাইলের। অবশ্য, তোমরা চাইলে তোমাদেরকে এমন কিছু বিষয়ের খবর দিতে পারি (যা আমি রাসুলুল্লাহ সা. থেকে শুনেছি), যখন তা ঘেটবে, (তখন বুঝে নিবে যে,) কেয়ামত খুব বেশি দূরে নয়। যখন (মানুষের) জবানগুলো (উপরে উপরে) কোমল হবে, অথচ অন্তরগুলো হবে শক্ত/কঠিন, দুনিয়ার স্বার্থে মানুষের সাথে সম্পর্ক করতে চাইবে, জামিনের বুকে বিল্ডিং-ইমারত সমূহ প্রকাশ পাবে, ভাইয়ে-ভাইয়ে দ্বন্দ্ব হবে, পরে তাদের উভয়ের কুপ্রবৃত্তি চতুর্দিক থেকে ছেয়ে যাবে (এবং আল্লাহ’র সীমা লঙ্ঘন করবে), (পার্থিব স্বার্থে) আল্লাহ’র আইন/বিচারকে বিক্রি করে দেয়া হবে’। [আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ- ৭/৫০১ হাদিস ৩৭৫৩৫; আদ-দুররুল মানসুর, সুয়ূতী -৬/৫২; কানজুল উম্মাল- ১৪/৫৭৭]

আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ بْنِ الصَّبَّاحِ ، قَالَ : حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ وَهْبٍ ، عَنْ أَبِي هَانِئٍ الْخَوْلانِيِّ ، أَنَّ أَبَا سَعِيدٍ الْغِفَارِيَّ حَدَّثَهُ ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ , يَقُولُ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , يَقُولُ : ” إِنَّهُ سَيُصِيبُ أُمَّتِي دَاءُ الأُمَمِ ” ، قَالُوا : يَا نَبِيَّ اللَّهِ ، وَمَا دَاءُ الأُمَمِ ؟ قَالَ : ” الأَشَرُ وَالْبَطَرُ وَالتَّكَاثُرُ وَالتَّنَافُسُ فِي الدُّنْيَا وَالتَّبَاغُضُ ، وَالتَّحَاسُدُ ، حَتَّى يَكُونَ الْبَغْيُ ، ثُمَّ يَكُونَ الْهَرْجُ ” . رواه ابن أبي الدنيا في ذم البغي, مَا هُوَ دَاءُ الأُمَمِ : رقم ٢; و ذكره الهندي في كنز العمال: ١١/٢٥٠ رقم ٣١٠٧٩ – “অচিরেই আমার উম্মত (পূর্ববর্তী) জাতিসমূহের রোগে আক্রান্ত হবে। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: ‘হে আল্লাহ’র নবী! (পূর্ববর্তী) জাতিসমূহের রোগ কি’? তিনি বললেন:‘ الأَشَرُ – (ধোকাবাজী, প্রতারনা করা), الْبَطَرُ – (অহংকারী, উদ্ধত্বপরায়ন, অকৃতজ্ঞ হওয়া), التَّكَاثُرُ وَالتَّنَافُسُ فِي الدُّنْيَا (দুনিয়ার প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগীতায় পরষ্পরে লেগে যাওয়া), التَّحَاسُدُ – (পরষ্পরকে হিংসা করা)। এমনকি (এভাবে চলতে চলতে একপর্যায়ে এই উম্মত) বাগী (উদ্ধত্ববাদী/আল্লাদ্রোহী) হয়ে উঠবে। এরপর হবে ‘হারাজ (পরষ্পরে খুনাখুনি)”। [যাম্মাল বাগী, ইবনু আবিদ্দুনিয়া, হাদিস ২; কাঞ্জুল উম্মাল- ১১/২৫০ হাদিস ৩১০৭৯]

# হযরত আউফ বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ بْنِ رَاهَوَيْهِ ، ثنا أَبِي ، ثنا النَّصْرُ بْنُ شُمَيْلٍ ، عَنِ النَّهَّاسِ بْنِ قَهْمٍ ، عَنْ شَدَّادٍ أَبِي عَمَّارٍ ، عَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : ” أَخَافُ عَلَيْكُمْ سِتًّا : إِمَارَةُ السُّفَهَاءِ ، وَسَفْكُ الدِّمَاءِ ، وَبَيْعُ الْحُكْمِ ، وَقَطِيعَةُ الرَّحِمِ ، وَنَشْوٌ يَتَّخِذُونَ الْقُرْآنَ مَزَامِيرَ ، وَكَثْرَةُ الشُّرَطِ ” . اخرجه طبراني , قال الهيثمى: ٥/٢٤٥ , فيه النهاس بن قهم ، وهو ضعيف – ‘অামি তোমাদের উপর ছয়টি বিষয় নিয়ে শংকিত: (১) হতনির্বোধ আমীর, (২) রক্ত ঝড়ানো, (৩) বিচার’কে বিক্রি করা, (৪) রক্ত-সম্পর্ক কর্তন, (৫) একটি প্রজন্ম কর্তৃক কুরআনকে বাজনা হিসেবে অবলম্বন করা, (৬) অধিক সংখ্যক সিপাহী। [ত্বাবরাণী: মাজমাউয যাওয়ায়ীদ- ৫/৬৪৫]

# হযরত আব্দুর রহমান আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- وعن عبد الرحمن الأنصاري قال : قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم : ” من اقتراب الساعة كثرة المطر ، وقلة النبات ، وكثرة القراء ، وقلة الفقهاء ، وكثرة الأمراء ، وقلة الأمناء ” . رواه الطبراني ، وفيه عبد الغفار بن القاسم وهو وضاع .كذا فى مجمع الزاوئد ومنبع الفوائدلالهيثمي: ٧/٦٣٩ رقم ١٢٤٧٢ – ‘কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে বৃষ্টি হবে প্রচুর কিন্তু ফলন হবে অল্প, কুরআনের পাঠক হবে প্রচুর কিন্তু (কুরআনের মর্ম ও অর্থ বোঝার মতো গভীর জ্ঞানের অধিকারী) ফকিহ হবে স্বল্প, প্রশাসক হবে অনেক কিন্তু (তাদের মধ্যে) আমানতদার হবে কম’। [ত্বাবরানী: মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৭/৬৩৯]

# হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- والذي نفس محمد بيده ، لا تقوم الساعة حتى يظهر الفحش والتفحش ، وسوء الجوار ، وقطيعة الأرحام ، وحتى يخون الأمين ويؤتمن الخائن . المستدرك على الصحيحين:١/١٣٧ كتاب الابمان رقم ٢٠٣ و كتاب الفتن و الملاحم: ٤/٦٨٥ رقم ٨٥٦٦ , المصنف لعبد الرزاق :١١/٤٠٥ رقم ٠٨٥٢, تاريخ دمشق لابن عساكر: ١٨٦٩١, – ‘ওই সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন, কেয়ামত কায়েম হবে না, যাবৎ না -অশ্লীলতা (-র উপকরণ), অশ্লীলতার মহড়া/কসরত, মন্দ প্রতিবেশীত্ব, আত্বীয়তার সম্পর্ক কর্তন -(এসব) ব্যাপক হয়ে যায়। এবং যাবৎ না আমানতদারকে (সমাজের চোখে) খেয়ানতকারী বানানো হয় এবং খেয়ানতকারীকে বানানো হয় আমানতদার। [মুসতাদরাকে হাকিম- ১/১৩৭ হাদিস ২০৩ এবং ৪/৬৮৫ হাদিস ৮৫৬৬; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক- ১১/৪০৫, হাদিস ২০৮৫২; তারিখে দামেশক, ইবনুল আসাকীর- ১৮৬৯১]

ফায়দা: আমাদের এজামানায় অশ্লীলতা ‘র উপকরণ এবং নারী-পুরুষের অশ্লীলতার মহড়া/কসরত -এ দুটো জিনিস বিগত যে কোনো যুগের চাইতে ভয়ঙ্কর রূপে বিশ্বজুড়ে ছয়লাব হয়ে গেছে। গোপনে, প্রকাশ্যে, বাড়িতে, পার্ক বা ক্লাবে, মাঠে-ঘাটে, স্কুল-কলেজ-ভারসিটিতে যে যেখানে পাচ্ছে মুসলীম-অমুসলীম নির্বশেষে এই পাপে জড়িয়ে পড়ছে। আর এর উপকরণাদি, যেমন: দেশি বিদেশি মুভি, সিনেমো, নাটক, বই, ম্যাগাজিন, ওয়েবসাইট, ভিডিও -এমন কোনো কিছু নাই যেখানে এসবের উপকরণ ব্যবাপক হারে দৈনিক প্রকাশিত হচ্ছেনা, আর নারী-পুরুষ তা থেকে নাজায়েয ফায়দা নিচ্ছে না। অশ্লীলতার মহড়া/কসরত -এর উদাহরণ হল: ‘অশ্লীল ড্রেসে সুন্দরী প্রতিযোগীতা (বিউটি কনটেষ্ট), বিভিন্ন দামী গাড়ির পাশে অশ্লীল পোষাকে এ্যাড হিসেবে দাড়িয়ে থাকা উলঙ্গ নারী, নারী মডেলদের অশ্লীল পোষাকে অশ্লীল পোজ দান, মুভি সিনেমায় বেগানা নারী-পুরুষের অশ্লীল কসরত ও নাচ-গান ইত্যাদি ইত্যাদি। অমুসলীমদের থেকে ছড়ানো এসব মহামারীতে এ জামানার মুসলীম উম্মাহ’ও শেষ; আরব-অনারব কোনো দেশ বাকি নেই।  الله اعلم بالصواب

# আবু যর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِذَا اقْتَرَبَ الزَّمَانُ كَثُرَ لُبْسُ الطَّيَالِسَةِ ، وَكَثُرَتِ التِّجَارَةُ ، وَكَثُرَ الْمَالُ ، وَعُظِّمَ رَبُّ الْمَالِ لِمَالِهِ ، وَكَثُرَتِ الْفَاحِشَةُ ، وَكَانَتْ إِمْرَةُ الصِّبْيَانِ ، وَكَثُرَ الْفَسَادُ ، وَجَارَ السُّلْطَانُ ، وَطُفِّفَ فِي الْمِكْيَالِ وَالْمِيزَانِ ، وَيُرَبِّي الرَّجُلُ جِرْوَ كَلْبٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يُرَبِّي وَلَدًا ، وَلا يُوَقَّرُ كَبِيرٌ ، وَلا يُرْحَمُ صَغِيرٌ ، وَيَكْثُرُ أَوْلادُ الزِّنَا ، حَتَّى إِنَّ الرَّجُلَ لَيَغْشَ الْمَرْأَةَ عَلَى قَارِعَةِ الطَّرِيقِ ، فَيَقُولُ أَمْثَلُهُمْ فِي ذَاكُمُ الزَّمَانِ : لَوِ اعْتَزَلْتُمْ عَنِ الطَّرِيقِ ، يَلْبَسُونَ جُلُودَ الضَّأْنِ عَلَى قُلُوبِ الذِّئَابِ ، أَمْثَلُهُمْ فِي ذَلِكَ الزَّمَانِ الْمُدَاهِنُ . رواه الطبراني في المعجم الأوسط :٥/١٢٦ رقم ٤٨٦٠ . قال الهيثمي في مجمع الزوائد : ٧/٢٧٤ : رواه الطبراني في الأوسط وفيه سيف بن مسكين وهو ضعيف ; و رواه الحاكم ايضا في المستدرك على الصحيحين : ٣/٣٨٦ رقم ٥٤٦٥ , وقال: هذا حديث تفرد به سيف بن مسكين عن المبارك بن فضالة ، والمبارك بن فضالة ثقة. قال الذهبي: وسيف واه، ومنتصر وأبوه مجهولان كما جاء في إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة : ٢/٢٧ – ‘যখন (শেষ) জামানা নিকটে চলে আসবে, তখন অধিক পরিমানে তায়ালিসাহ পরিধান করা হবে, ব্যাবসা-বানিজ্য ব্যাপকতা পাবে, (এক শ্রেণির মানষের) প্রচুর ধ্বনসম্পদ হবে, ধ্বনসম্পদের মালিককে তার সম্পদের কারণে সম্মান করা হবে, ফাহেশা (অশ্লীলতা) বেড়ে যাবে, ছেলে-পুলেদের শাসন চলবে, (সমাজে) ফ্যাসাদ বেড়ে যাবে, শাসক পাপাচারী হবে, ওজন ও পরিমাপে কম দেয়া হবে, মানুষের জন্য সন্তান প্রতিপালনের চাইতে কুকুর-ছানা প্রতিপালন অধিক উত্তম হবে, (তখন) বড়’কে সম্মান করা হবে না, ছোটর প্রতি দয়া করা হবে না, (সমাজে) জারজ সন্তানদের আধিক্য হবে, এমনকি (এমন) ব্যাক্তি (পাওয়া যাবে, যে) রাস্তার ধারে নারীর সাথে একেবারে মেলামেশা করবে। এভাবে তিনি তোমাদের (মুসলমানদের) সেই (সময়কার) জামানা সম্পর্কে এরকম অনেক কিছু বললেন। (হায়!) তোমরা যদি (তখনকার সেই মন্দ) পথ থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে! (আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে আরো শুনেছি যে,) তারা নেকড়ের (মতো হিংস্র) অন্তকরণের উপরে (লোক দেখানো সুবোধলোকের মতো) ভেড়ার চামড়া পরিধান করবে। সে জামানায় এরকম লোকদের মধ্যে (উদাহরণ হল, যেমন) তোষামোদকারী’। [আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী- ৫/১২৬ হাদিস ৪৮৬০; মুসতাদরাকে হাকিম- ৩/৩৮৬ হাদিস ৫৪৬৫; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৭/২৭৪]

# হযরত আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يَتَحَلَّقُونَ فِي مَسَاجِدِهِمْ وَلَيْسَ هِمَّتُهُمْ إِلَّا الدُّنْيَا لَيْسَ لِلَّهِ فِيهِمْ حَاجَةٌ فَلَا تُجَالِسُوهُمْ . رواه الحاكم في المستدرك, كتاب الرقاق:٤/٤٦٨ رقم ٧٩٩٧ وقال: هذا حديث صحيح ولم يخرجاه ، قال : الذهبي في التلخيص :صحيح– ‘মানুষের উপর এমন জামানা আসবে, (যখন) তারা তাদের মসজিদগুলোর মধ্যে (আলোচনার) আসোর বানাবে এবং (সেসব আলোচনায়) তাদের আগ্রহ থাকবে শুধু দুনিয়া(কে কেন্দ্র করে)। তাদের (ওসব আলোচনা) দিয়ে আল্লাহ’র কোনো কাজ নেই। তোমরা ওদের সাথে বসো না’। [মুসতাদরাকে হাকিম– ৪/৪৬৮ হাদিস ৭৯৯৭] 

ফায়দা: এই ঘটনাটি ঘটবে আমাদের এই শেষ জামানায়। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- سَيَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ قَوْمٌ يَكُونُ حَدِيثُهُمْ فِي مَسَاجِدِهِمْ لَيْسَ لِلَّهِ فِيهِمْ حَاجَةٌ . اخرجه ابن حبان في صحيحه: ١٥/١٦٢ رقم ٦٧٦١, قال الالبانى ‘حسن’ في صحيح الترغيب والترهيب: ١/٢٣٨ رقم ٢٩٦– ‘অচিরেই শেষ জামানায় এমন গোষ্টি হবে, যারা তাদের মসজিদগুলোতে (যতসব দুনিয়াদারী বিষয়আসায়’কে কেন্দ্র করে) কথাবার্তা বলবে। তাদের (ওসব আলোচনা) দিয়ে আল্লাহ’র কোনো কাজ নেই’। [সহিহ ইবনে হিব্বান– ১৫/১৬২ হাদিস ৬৭৬১]   

রাসুলুল্লাহ সা. ও খুলাফায়ে রাশেদীনের জামানায় মুমিন মুসলমানগণ নামাযের জামাআতে শরিক হওয়া, খুতবা ও দ্বীনী আলোচনা শোনা, কুরআন সুন্নাহ ও প্রয়োজনীয় মাসআলাহ মাসায়েল শিক্ষার জন্য যেমন মসজিদে আসতেন, তেমনি শরয়ী বিচার ফয়সালা, এমনকি জিহাদের প্রস্তুতির জন্য অস্ত্র চালনা শিক্ষার জন্যও মসজিদে আসতেন মর্মে বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে। এর সবগুলোই ছিল দ্বীনী বিষয়। তবে এগুলোর পাশাপাশি কথাবার্তার ফাকে একে অপরের হাল-হালত জিজ্ঞেস করা, ব্যাবসা বানিজ্যের খবরা খবর নেয়া, এমনকি একে অন্যের দেনা-পাওনা নিয়ে আলোচনা করার কথাও বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে। তবে এগুলো ছিল মূল দ্বীনী উদ্দেশ্যে মসজিদে আসার পর ছিটে ফোটা কিছু আনুসঙ্গিক আলোচনা, যা জায়েয। 

حَدِيثُهُمْ فِي مَسَاجِدِهِمْ لَيْسَ لِلَّهِ فِيهِمْ حَاجَةٌকিন্তু শুধু দুনিয়াবী কথাবার্তা দিয়ে সময় ক্ষেপনের জন্য মসজিদে আসা এবং সেখানে বসে শুধু দুনিয়াবী আলাপ আলোচনার আসোর মাচানো কোনো ভাবেই সমুচিত হতে পারে না। মসজিদ মোটেও এসবের কোনো স্থান নয়।  [বিস্তারিত: আল-বাহরুর রায়েক- ২/৬৩; ফাতাওয়ায়ে শামী- ১/৬৬১] অথচ, এই শেষ জামানায়-তো কোনো কোনো মসজিদে এমন ঘটনাও ঘটছে যে, যেখানে সাধারণ ঘরেই মুর্তি/ছবি রাখা নাজায়েয, সেখানে খোদ আল্লাহ’র ঘর মসজিদের ভিতরে এমন পথভ্রষ্ঠ নেতার ছবি সহ ব্যানার টাঙ্গিয়ে তার জন্মদিন/মৃত্যুদিন উপলক্ষে তার স্মৃতিচারন, প্রশংসা ও গুণকীর্তন ও দোয়া মাহফিলের আসোর বসানোর তামাশাও শুরু হয়েছে, যার গোটা রাজনৈতিক জীবন অতিবাহিত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মতো পথভ্রষ্ঠ সব মতোবাদগুলোকে চিন্তা-চেতনায় লালন করে, এবং শেষে ক্ষমতায় গিয়ে আইন করে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে দ্বীন ইসলামের বিরাট জরুরী অংশগুলোকে ছেটে ফেলে দিয়েছে। আল্লাহ’র দ্বীন রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হোক -যে এর বিপক্ষে, সে-তো খোদ আল্লাহ’র বিপক্ষের লোক। তার প্রশংসা-তো এমনিতেই জায়েয নয়, সেখানে খোদ আল্লাহ’র ঘরে ওই ব্যাক্তির প্রশংসা কি করে জায়েয হতে পারে ! আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ – ‘তোমরা (মনের দিক থেকে হোক বা অনুগত্যের দিক থেকে -কোনো ভাবেই) তাদের প্রতি ঝুকে পড়ো না যারা জুলুম করছে। তাহলে (কিন্তু) আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে’ [সুরা হুদ: ১১৩] যারা রাষ্ট্র যন্ত্রে ইসলামী খিলাফত কায়েমের বিপক্ষে তাদের চাইতে আল্লাহ’র বিপক্ষবাদী জালেম আর কে হতে পারে? আব্দুল্লাহ বিন বুরাইদাহ তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- لَا تَقُولُوا لِلْمُنَافِقِ سَيِّدٌ، فَإِنَّهُ إِنْ يَكُ سَيِّدًا فَقَدْ أَسْخَطْتُمْ رَبَّكُمْ عَزَّ وَجَلَّ . رواه أبو داود في السنن , كتاب الأدب , باب لا يقول المملوك ربي وربتي : رقم ٤٩٧٧ , صححه الألباني في صحيح الجامع رقم ٧٤٠٥ و في الصحيحة : رقم ٣٧٠ – ‘তোমরা কোনো (মুসলীম নামধারী) মুনাফেককে ‘নেতা’ বলো না’। কারণ, (আল্লাহ’র পক্ষের লোক মুমিনদের কেউ থাকতে) যদি সে(ই কমবখ্ত মুনাফেক) হয় (তোমাদের) নেতা, তাহলে তোমরা (নির্ঘাত) তোমাদের ‘রব’ (আল্লাহ) আযযা ওয়া জাল্লা’কে ক্রধাহ্নিত করে ফেলেছো’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৭৭; আল-আদাবুল মুফরাদ, বুখারী- ৭৬০; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২২৯৮৯] আরেক রেওয়ায়েতে আছে- إذا قال الرجل للفاسق : يا سيدي فقد أغضب ربه . أخرجه أبو نعيم في أخبار اصبهان : ٢/١٩٨ , قال الألباني : و هو بهذا اللفظ صحيح    – ‘যখন কোনো ব্যাক্তি কোনো ফাসেক লোককে বলে: ‘হে আমার নেতা’ তখন (তার এহেন) তার রব (আল্লাহ তাআলা)কে রাগিয়ে দেয়’। [আখবারু ইসবাহান, আবু নুআইম- ২/১৯৭] যেখানে কোনো ফাসেক/মুনাফেক নেতার প্রশংসাই আল্লাহ সহ্য করেন না, সেখানে খোদ তাঁর ঘর মসজিদে কোনো ফাসেক/মুনাফেক নেতার স্মৃতিচারন, প্রশংসা ও গুণকীর্তন করাটা আল্লাহ তাআলাকে কি পরিমাণ রাগিয়ে দিতে পারে -কেউ ভেবে দেখেছেন! এই শেষ জামানায় এসব পথভ্রষ্ঠদের আসোরে শরিক হওয়া থেকে বেঁচে থাকুন -চাই মসজিদে হোক বা মসজিদের বাইরে। الله اعلم بالصواب

 

 

# সালামাহ বিনতে হুররী’র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يَتَدَافَعَ أَهْلُ الْمَسْجِدِ لَا يَجِدُونَ إِمَامًا يُصَلِّي بِهِمْ . اخرجه ابو داود في سننه , كتاب الصلاة , باب في كراهية التدافع على الإمامة: رقم ٥٨١ ; و أحمد في المسند: ٢٦٥٩٦ ; و وضعفه الالباني في ضعيف الجامع: ١٩٨٧ ; و البيهقي في السنن الكبرى : ٣/١٢٩ ; و ابن أبي عاصم في الآحاد والمثاني : ٣٤١٧ , و أبو نعيم الأصبهاني في معرفة الصحابة : ٧٧٢٥ , في إسناده طلحة أم غراب وعقيلة ولا يعرف حالهما , وهذا حديث حسن كما في إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة : ٢/١٦٩– ‘নিশ্চই কেয়ামতের লক্ষন সমূহের মধ্যে এও রয়েছে যে, মসজিদের লাকজন পরষ্পরে (মনোমালিন্যতা, দলাদলি কিংবা ফিরকাওয়ারিয়াতের কারণে) একে অন্যের দিফা করবে। (এমনও হবে যে,) তারা (নামাযের জামাআতের দাঁড়াবে, অথচ তাদের মধ্যে) ইমাম (হওয়ার মতো বাহ্যত নূন্যতম যোগ্যতার এমন কাউকে) পাবে না, যে তাদেরকে নামায পড়াবে’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫৮১; মুসনাদে আহমদ- ২৬৫৯৬; আল-আহাদ ওয়াল মাছানী, ইবনু আবি আসিম- ৭৭২৪; মা’রেফাতুস সাহাবাহ, আবু নুআইম- ৭৭২৫; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৩/১২৯] 

ফায়দা: ‘দিফা’ করা বলতে বুঝায় কোনো মত/বিশ্বাস/কর্ম-তৎপরতা’কে খন্ডন করা, বাঁধা দেয়া, প্রতিরোধ করা, প্রত্যাখ্যান করা, বিরত রাখা ইত্যাদি। এই শেষ জামানায়-তো ৭২ ফিরকাহ রয়েছেই, এসবেরও কোনো কোনোটার আবার শাখা-প্রশাখাও রয়েছে। এভাবে উম্মাহ’র টুকরো হওয়া অংশগুলোর নানান লোকদের হরেক রকমের মনমানুসকতা, চেতনা, বিশ্বাস রয়েছে, যা তারা বছরের পর বছর ধরে লালন করে আসছে। ফলে উম্মাহ’র এক টুকরো আরেক টুকরোকে দেখতে পায়না, সহ্য করতে পারে না। উদাহরণ স্বরূপ:

(১) যে মসজিদের মসজিদ কমিটির সদস্যরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী, তারা মসজিদের ইমাম বা খতিব সাহেবকে মিম্বরে বা মসজিদের দ্বীনী আলোচনার আসোরে ইসলামের ‘খিলাফত ব্যাবস্থা’, ‘শরয়ী বিচারব্যাবস্থা’, শরয়ী আইন-কানুন ইত্যাদি নিয়ে আলোনা করতে দেয় না, বরং বিভিন্ন কায়দায় দিফা করে। বহু মসজিদ থেকে এরা ইমাম/খতিব সাহেবকে বেড়ও করে দেয়।   

(২) কোনো কোনো মসজিদের অবস্থা এই যে, এক ধরনের চিন্তাচেতনার দল তাদের প্রবাভাধিন মসজিদে অন্য আরেক চিন্তাচেতনার দলকে ঢুকতে দেয়না, ঢুকলে বেড় করে দেয়। এটাও  এক দল কর্তৃক আরেক দলকে দিফা করার একটি প্রকার। 

(৩) মসজিদের মিম্বরে দ্বীনী আলোচনার পরিবর্তে বিভিন্ন ফুরুয়ী (শাখাগত) মাসআলাহ নিয়ে গলাবাজী, চ্যালেঞ্জবাজী করে অন্যের মতকে দিফা করার ঘটনা আজ অহরহ ঘটছে। যেমন: ইমামের পিছনে ফাতিহা/কেরাআত পড়া বা না-পড়া, আমীন জোরে পড়া বা আস্তে পড়া, নামাযের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাফউল ইয়াদাইন (হাত উঠানো) করা বা না-করা, বিতের এক/তিন/পাঁচ/সাত রাকাত পড়া, তারাবিহ ৮ রাকাত বা ২০ রাকাত পড়া, নবীজী সা. নূরের নাকি মাটির তৈরী ইত্যাদি বিষয়ে এক দল আরেক দলের দিফা করতে গিয়ে যেসব ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ড করছে, তা সত্যই দঃখজনক। 

এই তিনটি নমুনা থেকেই বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করুন যে, কেয়ামতের আগে আগে উম্মাহ কিভাবে একে অপরকে দিফা করছে। মুসনাদে আহমদের রেওয়ায়েতে এদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- في شرار الخلق – অর্থাৎ (এগুলো এই উম্মতের) নিকৃষ্টসব মানুষদের মধ্যে ঘটবে’। এরা আসলেই এই উম্মতের নিকৃষ্ট লোকজন। এদের সর্বশক্তি  দ্বীন ইসলামের সারে সর্বনাশ করে দিয়েছে।

এই হাদিসের আরেকটি দিক হল لَا يَجِدُونَ إِمَامًا يُصَلِّي بِهِمْ – ‘ইমাম (হওয়ার মতো এমন কাউকে) পাবে না, যে তাদেরকে নামায পড়াবে’এক হাদিসে এসেছে. রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يَقُومُونَ سَاعَةً لَا يَجِدُونَ إِمَامًا يُصَلِّي بِهِمْ . اخرجه ابن ماجه في سننه , كتاب إقامة الصلاة والسنة فيها , باب ما يجب على الإمام : ١/٣١٤ رقم ٩٨٢ ; و أحمد في المسند: ٦/٣٨١ ; و عبد بن حميد: ١٥٦٦  ; و الطبراني في المعجم الكبير: ٧٨٣ ; و إسحاق بن راهويه في المسنده : ٢٣٨٨ ; و محمد بن سعد الزهري في الطبقات : ٨/٤٠٢; و ابن أبي عاصم في الآحاد والمثاني : ٣٤١ , و أبو نعيم الأصبهاني في معرفة الصحابة : ٧٧٢٤ , في إسناده طلحة أم غراب وعقيلة ولا يعرف حالهما , وهذا حديث حسن كما في إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة : ٢/١٦٩   – ‘মানুষের উপরে এমন এক জামানা আসবে, (যখন এমনও ঘটতে দেখা যাবে যে,) তারা (নামাযের জামাআত আরম্ভ করার জন্য) সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে (যে, কাকে ইমাম বানানো যায়), কিন্তু (মুসল্লীদের ব্যাপক মুর্খতা ও বদদ্বীনতার কারণে) তারা (উপস্থিত লোকদের মধ্যে) ইমাম (হওয়ার মতো এমন কাউকে) পাবে না, যে তাদেরকে নামায পড়াবে’। [সুনানে ইবনে মাজাহ– ১/৩১৪ হাদিস ৯৮২; মুসনাদে আহমদ- ৬/৩৮১; মুসনাদে আবদ বিন হুমাইদ, হাদিস ১৫৬৬; আল-মু’জামুল কাবির, ত্বাবরাণী- ৭৮৩; মুসনাদে ইসহাক বিন রাহুওয়াইহ- ২৩৮৮; আ-ত্বাবাকাত, ইবনে সা’দ- ৮/৪০২; আল-আহাদ ওয়াল মাছানী, ইবনু আবি আসিম- ৭৭২৪]

এযুগের প্রায় সকল মসজিদের অবস্থা এই যে, মুসল্লীরা পাইকারী হারে ইলমী জাহালত ও মুর্খতার রোগে আক্রান্ত। দু’রাকাত নামাযও নূন্যতম শুদ্ধ ভাবে আদায় করতে জানে। সুরা ফাতিহা ও সাথে একটি ছোট সুরা বা আয়াতও নূন্যতম শুদ্ধ ভাবে পড়তে জানে না। নামাযের অপরাপর ফরয ‍ও ওয়াজিব রোকনগুলোর যে কি দুরাবস্থা তা কারোর কাছে গোপনীয় নয়। আবার যারাও-বা এগুলো কমপক্ষে নূন্যতম মাত্রার শুদ্ধতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, তাদের বাহ্যিক পোষাক আসাক ও চেহারা সুরতে দেখেও মুসলমানের ছাপ নেই, যার পিছনে নামায পড়ে মনতৃপ্তি আসে। তারা এমন প্যান্ট/ট্রাউজার শার্ট/গেঞ্জি পড়ে নামায পড়তে আসে, যারা রুকু বা সিজদায় গেলে তাদের লজ্জাস্থান নিতম্ব সব কাপড়ের উপর দিয়ে এমন ভাবে ভেসে ওঠে, যে অবস্থার বিদ্যমানতায় ‘সতর ঢাকার ফরয’ বিধানটি আদায় না হওয়ার কারণে নামাযই আদায় হয় না। আর পাড়া মহল্লার লোকজন একে অপরের জীবন ধারা সম্পর্কে কমবেশি জানা শোনা রাখে, যাদের প্রায় সবাই পারিবারিক/সামাজিক ভাবে চিরাচরিত বেপর্দা ও হালকা দাইউসী স্টাইলে জীবন যাপন করে, অনেকেই প্রকাশ্য হারাম চাকুরী/ব্যবসা (যেমন: সূদী ব্যাংক, জুয়া নির্ভর বীমা প্রতিষ্ঠান, প্রতারণাপূর্ণ মাল্টিলেভেল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান, আত্বসাতের কন্ট্রাক্টারী ইত্যাদি)তে জড়িত। মসজিদের মুসুল্লীদের বেশির ভাগই এসব প্রকাশ্য ফাসেক-ফাজের লোকজন দিয়ে ভরা থাকে। এদের পিছনে নামায আদায়ের শরয়ী ঝুঁকি এই যে, হয় তাদের কারো কারো পিছনে বিলকুল নামায আদায়ই হবে না, আর কারো কারো পিছনে শক্ত ওজর ছাড়া নামায আদায় নামাযটি মুমূর্ষ ভাবে হয়তো কোনো রকমে বাহ্যিক ভাবে আদায় হয়ে যাবে তবে নামায দোহরানো ওয়াজিব হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। এমতাবস্থায় কোনো ওয়াক্তে নির্ধারিত ইমাম/খতিব অনুপস্থিত থাকলে কাতারের মুসল্লীদের মধ্যে গুণগুণ শুরু হয়ে যায় যে, তাদের মধ্যে কাকে ইমাম বানানো হবে; ইমামই খুঁজে পায় না। আমি বহুবার এরকম পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখেছি যে, তারা কাউকে ইমাম বানাতে পারছে না, হঠাৎ আমি ‘একজন বাহ্যদৃষ্টিতে হুজুর গোছের লোক’ তাদের সামনে নামাযে শরিক হওয়ার জন্য উপস্থিত হলে পর তাদের চোখে মুখে একটু আনন্দের ছাপ লক্ষ্য করা গেল একারণে যে, ‘যাক ইমাম হিসেবে চালানো মতো এ ওয়াক্তে কাউকে পাওয়া গেল’! এ অবস্থা শুধু মসজিদে নয়, মুসলমানদের বাড়িতে, দোকানে, মার্কেটের নামায ঘরে -সব স্থানেই একই দৃশ্য দেখেছি। আমার মতে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এই ভবিষ্যৎবাণী আমাদের এ জামানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। الله اعلم بالصواب