ইসলামে খলিফা কর্তৃক বিজিত এলাকার ভূমি বন্টন ও ব্যবহারের শরয়ী আইন – ১

Spread the love

ইসলামে খলিফা / আমিরুল মুমিনিন কর্তৃক বিজিত এলাকার ভূমি বন্টন ও ব্যবহার আইন : শরয়ী ফিকহি আলোচনা – ১ম পর্ব 

 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

 

লেখক

মুফতি মওলানা মুহাম্মাদ শফি উসমানী রহ.

[সাবেক প্রধান মুফতি, দারুল উলুম দেওবন্দ ও দারুল উলুম করাচী; সাবেক মুফতিয়ে আজম, পাকিস্তান]

 

[এটি মুফতি মুহাম্মাদ শফি রহ.-এর কিতাব اقوال الماضى فى احكام الأراضى (আক্বওয়ালুল মাদ্বি ফি আহকামিল আরাদ্বি) যা اسلام كا نظام اراضى (ইসলাম কা নেজামে আরাদ্বি) নামে সমধিক পরিচিত -তার ১ম খন্ডের ২১ পৃষ্ঠা থেকে ৫১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অংশের বঙ্গানুবাদ, যেখানে দারুল-ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র)-এর খলিফা / আমিরুল মু’মিনিন কর্তৃক বিজিত এলাকা সমূহের ভূমি বন্টন সম্পর্কিত শরয়ী আহকাম বর্ণিত হয়েছে। এখানে বর্ণিত আহক্বামগুলো মুখস্ত করে রাখুন, নিকট ভবিষ্যতে ইমাম মাহদী রা.-এর সময়ে খুব কাজে আসবে, ইনশাআল্লাহ। এই পুরো কিতাবটির অনুবাদ পেশ করলে পাঠক সমাজ আরো উপকৃত হতে পারতেন, তবে বর্তমানে তা সম্ভব হওয়ার কোনো আলামত দেখছি না বিধায় পরবর্তীতে তৌফিক হলে একাজটি পূর্ণ করার নিয়ত রেখে আপাতত বিদায় নিচ্ছি। দোয়ার দরখাস্ত]।

 

 

 

গোটা বিশ্বের জন্য ইসলামের ভূমি বন্টন আইন

(দারুল-ইসলাম তথা ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা / আমিরুল মু’মিনিন কর্তৃক) যখন কোনো দেশ বিজিত হয়, তখন সেই দেশটির ভূমিগুলোকে  প্রথমত: নিম্নোক্ত দু’ ভাগে বিভক্ত করা হয়।

(১) মালিকানাহীন ভূমি, যাকে ফিকাহবিদগণের পরিভাষায় ارض مباحة (আরদে মুবাহাহ) বলা হয়ে থাকে; অর্থাৎ- যে ভূমির নির্দিষ্ট কোনো মালিক নেই।

(২) মালিকানভুক্ত ভূমি; যেগুলোর উপরে নির্দিষ্ট সব মালিকদের মালিকানা রয়েছে।

আবার বিভিন্ন দেশ বিজিত হওয়ারও দু’টি ধরন রয়েছে।

(১) প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করা,

(২) কোনো রকম যুদ্ধ ব্যতিরেকেই শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে দেশ জয় করে নেয়া -চাই (ওই দেশের জনগণ) তাদের নিজ নিজ দ্বীন-ধর্মে পূর্ববৎ বহাল থেকে শান্তির সাথে তাদের দেশকে মুসলমানদের হাতে সোপর্দ করে দিক, কিংবা তাদের কাছ থেকে কর ও খারায আদায়ের ওয়াদা নিয়ে তাদেরকে তাদের ওই দেশ শাসনের উপরে পূর্ববৎ বহাল রাখা হোক।

# ১ম প্রকারের ভূমি তথা মালিকানাহীন ভূমির ক্ষেত্রে -দেশ জয় করার দুটো সুরত তথা যুদ্ধ ও বিনাযুদ্ধ -যে ভাবেই বিজিত হোক না কেনো তার বিধান একই হবে।

# ২য় প্রকারের ভূমি তথা মালিকানাভুক্ত ভূমির ক্ষেত্রে -বিনাযুদ্ধে দেশ জয় করা (ভুমি)র বিধান আলাদা এবং যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ জয় করা (ভুমি)র বিধান আলাদা। এসকল বিভিন্ন প্রকারের (ভূমি বিষয়ক) বিধি-বিধানের বিস্তারিত বিবরণ নিম্নোরূপ:-

 

(১) মালিকানাহীন ভূমি (ارض مباحة – আরদ্বে মুবাহাহ)’র শরয়ী বিধান

ارض مباحة (আরদে মুবাহাহ) -যে জমির নির্দিষ্ট কোনো মালিক নেই, তা ৩ প্রকারের হয়ে থাকে।

(ক) জনবসতির সন্নিকটস্ত এমন ভূমি, যা এলাকাবাসিদের সাধারণ ও সামষ্টিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। যেমন:- লোকালয়ের ওলিগলি, রাস্তাপথ, লোকালয়ের বাহিরে অবস্থিত কবরস্থান, ঈদগাহ, মাঠ ও চারনভূমি ইত্যাদি স্থানাদি।

(খ) জনমানবহীন বনবাদার এবং বেকার (পড়ে থাকা) ওই সকল পাহাড়ি ভূমি, যা না কোনো নির্দিষ্ট ব্যাক্তির মালিকানার অন্তর্ভূক্ত, না কোনো লোকালয়ের আওতাধীন, আর না তা চাষাবাস করে উপকৃত হওয়ার উপযোগী। এ ধরনের ভূমিকে শরিয়তের পরিভাষায় ارض موات (আরদ্বে মাওয়াত বা মৃত ভূমি) বলা হয়ে থাকে।

(গ) ওই সকল মালিকানাহীন ভূমি, যা কোনো লোকালয়ের (সাধারণ ও সামষ্টিক) প্রয়োজনাদিতে ব্যবহৃত হয় না বটে, তবে তা চাষাবাস করে উপকৃত হওয়ার উপযোগী। এসব (ভূমি)কে (শরিয়তের পরিভাষায়) اراضى بيت المال (আরাদ্বিয়ে বায়তুল মাল) বলা হয়ে থাকে। 

(ক) মালিকানাহীন ভূমির প্রথম প্রকার: যা এলাকাবাসীদের প্রয়োজনাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত

এর বিধান হল, কোনো ব্যাক্তির জন্য এসব স্থানের উপরে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা ও তা ব্যয়-ব্যবহার করা কখনই জায়েয নয়। না মুসলীম শাসক নিজে এর মালিক হতে পারেন, না তিনি অপর কাউকে মালিক বানিয়ে দিতে পারেন, আর না পারেন অন্য কাউকে জায়গির (সরকারী বার্ষিক বৃত্তি) স্বরূপ দান করতে। বরং, এগুলো সর্বদাই এলাকার বাসিন্দাদের সাধারণ ও সামষ্টিক প্রয়োজনাদির জন্য ওয়াকফ-সম্পত্তির মতো সংরক্ষিত থাকবে।  

এমনিভাবে লবন ইত্যাদির খনী, ভূগর্ভস্ত তেল বা পেট্রোল প্রভৃতির আধার -যা সাধারণত মানুষের জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনাদির অন্তর্ভূক্ত -চাই সেটা কোনো লোকালয়ের নিকটস্থ হোক বা না হোক -সেসব জিনিস কোনো ব্যাক্তির নিজেস্ব মালিকানা বা জাইগীরে (সরকারী পুরুষ্কারে) পরিণত হতে পারে না, আর না কোনো মুসলীম রাষ্ট্রপ্রধান এগুলোর উপরে নিজ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, না পারেন অন্য কাউকে দিতে। বরং সরকারের তত্ত্বাবধানেই সাধারণ জনকল্যানমূলক কাজের জন্য এগুলোর বন্দোবস্থ করতে হবে। [বাদায়েউস সানায়ে, ইমাম কাসানী- ৬/১৯৪]

একারণেই নবী করিম ﷺ হযরত আবিদ বিন হাম্মাল মাযানী রা.-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে (ইয়েমেনে অবস্থিত) مارب (মারীব)-এর ভূমিগুলোকে প্রথমে তাকে দান করে যখন জানতে পারলেন যে, ওগুলো লবনের ভূমি ও তা সাধারণ জনগণের উপকারী জিনিস, তখন তিঁনি তা ফিরিয়ে নেন। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ২৭৬ পৃষ্ঠা]

ফায়দা: মূল আলোচিত ভূমিসমূহ -যা কোনো লোকালয়ের বিভিন্ন প্রয়োজনাদিতে ব্যবহৃত হয়, সে সম্পর্কে সহিহ ও গ্রহনযোগ্য কওল হল, এসবের বেলায় লোকালয়ের নিকটস্থ  বা দূরবর্তী হওয়ার কোনো শর্ত নেই। আর ইমামগণের কেঁউ কেঁউ যে লোকালয়ের সন্নিকটে হওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে তার পরিমাণ চিহ্নিত করে দিয়েছেন, সেটা মূলত: করা হয়েছে সাধারণ প্রচলিত নিয়মের ভিত্তিতে। কারণ, কোনো লোকালয়ের প্রয়োজনাদি (সাধারণত) তার নিকটস্থ ও আশপাশের সাথে সম্মন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।

(খ) মালিকানাহীন ভূমির দ্বিতীয় প্রকার – ‘আরদ্বে মাওয়াত’ (ارض موات – মৃত ভূমি): যার সাথে কোনো লোকালয়ের প্রয়োজনাদির সম্পর্কযুক্ত নয় এবং যা চাষাবাদ করে উপকৃত হওয়ারও উপযোগী নয়

‘আরদ্বে মাওয়াত’ অর্থাৎ ওই সকল জনমানবহীন ভূমি – যা না চাষাবাস করে উপকৃত হওয়ার উপযোগী, না সেটা কোনো ব্যাক্তির মালিকানাভুক্ত, আর না সেটা কারোর সাধারণ প্রয়োজনাদিতে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের ভূমির বিধান হল, ইমাম তথা মুসলীম রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি নিয়ে যে ব্যাক্তি তা আবাদ করবে ও তা থেকে উপকৃত হওয়ার উপযোগী বানিয়ে নিবে, সে-ই তার মালিক হয়ে যাবে -আবাদকারী চাই মুসলীম হোক চাই অমুসলীম। [বাদায়েউস সানায়ে, ইমাম কাসানী- ৬/১৯৪]

হাদিসে আছে- من احيا ارضا ميتة فهي له – ‘যে ব্যাক্তি মৃত-ভুমিকে আবাদ করবে, সেটা তারই মালিকানাভুক্ত হয়ে যাবে’। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবায়েদ- ২৮৫ পৃষ্ঠা; সুনানে তিরমিযী- ১/২৫৯; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ১১৩৯; মুসনাদে আহমদ- ৩/৩০৪]

হযরত ওমর রা.-এর কাছে এক ব্যাক্তি এরকমই একটি অনাবাদী ভূমির আবেদন করেছিল, যা দজলা নদীর কিনারায় অবস্থিত ছিল। এতে হযরত ওমর ফারূক রা. ইরাকের প্রশাসক হযরত আবু মুসা আশআরী রা.-এর কাছে একটি ফরমান পাঠিয়ে দেন, যার কথাগুলো ছিল এই :-  فان لم تكن ارض جزية و لا ارض يجري اليها ماء جزية فاعطاها ايا – ‘ভুমিটি যদি জিজিয়া যোগ্য না হয় এবং এমন ভূমিও না হয় যার দিকে পানি প্রবাহিত হয়ে জিজিয়ার উপযোগী হয়, তাহলে সেটা তাকেই দিয়ে দাও’। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবায়েদ- ২৭৭ পৃষ্ঠা]

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ‘কিতাবুল খারাজ’-এ বলেছেন:- و للإمام ان يقطع كل موات و كل ما ليس فيه ملك لأحد و يعمل بما يري انه خير للمسلمين – ‘ইমাম (তথা রাষ্ট্রপ্রধান) -সকল মৃতভুমি এবং এমন ভূমি যা কারোর মালিকানাভূক্ত নয় তা কাউকে দিয়ে দিতে পারেন, আবার চাইলে মুসলমানদের কল্যানকর কাজেও ব্যবহার করতে পারেন। [শামী- ৩/৩৬৬]

যে ‘আরদ্বে-মাওয়াত’ খলিফার অনুমোদন সাপেক্ষে আবেদনকারীর মালিকানায় চলে আসে, তার ব্যাপারে গ্রহনযোগ্য মত হল -আর রেওয়ায়েতসমূহ থেকেও এ কথাই প্রকাশ পায় যে, লোকালয়ের নিকটবর্তী ও দূরবর্তী উভয় প্রকারের ভূমির বিধান একই রকম।

(গ) মালিকানাহীন ভূমির তৃতীয় প্রকার – ‘আরাদ্বিয়ে বায়তুল মাল’ ( اراضى بيت المال – বায়তুল মালের ভুমিসমূহ): 

অর্থাৎ ওই (সকল মালিকাহীন) ভূমি – যা কোনো ব্যাক্তির মালিকানাভুক্ত নয়, আবার সেটা লেকালয়ের সাধারণ প্রয়োজনাদিতেও ব্যবহৃত হয় না, তবে তা চাষবাস করে উপকৃত হওয়ার উপযোগী। এ ধরনের ভূমির বিধান হল, তা বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)-এর সম্পদ। বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)-এর মধ্যে যাদের কোনো হক্ব (অধিকার) রয়েছে, এসবের আয় ও মুনাফা ওই সমস্ত ব্যাক্তিদের উপরে ব্যয়-ব্যবহৃত হবে। এসবের ব্যয় ও ব্যবহারের প্রশ্নে খলিফার বিভিন্ন ধরনের এখতিয়ার রয়েছে, যার বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে। সরকারি অনুদান (عطيات) ও জায়গীর প্রদানের বিষয়টি এসব ভূমির সাথেই বেশি সম্পৃক্ত।

‘আরাদ্বিয়ে বায়তুল মাল’-এর মধ্যে কয়েক প্রকারের ভূমি অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। যথা:-

(১) ওই ভূমি -যা সংশ্লিষ্ট দেশটি (মুসলমানদের খলিফা কর্তৃক) বিজিত হওয়া পর্যন্ত (ওই দেশের জনগণের মধ্যে) কারোর মালিকানাভুক্ত ছিল না। (দেশটি) বিজিত হবার পর (এরকম ভূমি) ‘বায়তুল-মালে’র অন্তর্ভূক্ত হবে। كما هو ظاهر [শামী- ৩/৩৬৬] 

(২) ওই ভূমি -যা (সংশ্লিষ্ট দেশটি খলিফা কর্তৃক বিজিত হওয়া পর্যন্ত) কোনো নির্দিষ্ট ব্যাক্তির মালিকানাভুক্ত ছিল বটে, কিন্তু সে লা-ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারহীন) অবস্থায় মাড়া গেছে। (দেশটি বিজিত হবার পর) এরকম ভূমি ‘বায়তুল-মালে’র অন্তর্ভূক্ত হবে। এ ধরনের ভূমিকে ফিকাহ শাস্ত্রের পরিভাষায় اراضى مملكت (আরাদ্বিয়ে মামলাকাত), اراضى حوج (আরাদ্বিয়ে হাওয) বা اراضى سلطنية (আরাদ্বিয়ে সুলত্বনিয়্যাহ) বলা হয়ে থাকে।  [শামী- ৩/২৫৩, ওশর ও খারাজ অধ্যায়] 

(৩) (মুসলমানদের খলিফা কর্তৃক) পরাজিত (হওয়া) দেশটির মালিকানাভুক্ত ভূমি সমূহকে (শরয়ী ‍দৃষ্টিতে) যে ক্ষেত্রে গণীমত পাওয়ার যোগ্য ব্যাক্তিদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হয় (যার বিস্তারিত বিবরণ ‘আরাদ্বিয়ে মামলাকাত’-এর বর্ণনায় সামনে আসছে), সে সকল ভূমির পাঁচ ভাগের এক ভাগ ‘বায়তুল-মালে’র জন্য বেড় করা হবে। এসব ভূমিও বায়তুল-মালে’র অন্তর্ভূক্ত হবে। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবায়েদ- ৫৫ পৃষ্ঠা; বাদায়েউস সানায়ে, ইমাম কাসানী- ৭/১১৮]

(৪) প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে (অমুসলীমদের সাথে) যুদ্ধ করে কোনো দেশ জয় করা হলে (সেখানকার জনগণের) মালিকানাধীন ভূমিগুলোর ক্ষেত্রে খলিফার এখতিয়ার রয়েছে যে, গণীমত প্রাপক (মুজাহিদ)গণের মাঝে ওগুলো বন্টন না করে এবং ভূমির প্রকৃত মালিকদের মালিকানাধীনে (তা পূর্ববত বহাল) না রেখে তিনি সকল মালিকানাধীন ভূমিকে ‘বায়তুল মাল’-এর কবজায় ও ব্যায়াধীনে নিয়ে নিতে পারবেন। এমতাবস্থায় এসমস্ত ভূমিও ‘বায়তুল-মাল’-এর জমিতে পরিণত হয়ে যাবে। [শামী- ৩/৩৫৩, ৩৫৪]

(৫) যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় লাভ করার ক্ষেত্রে (খলিফার) এই এখতিয়ারও রয়েছে যে, তিনি (বিজীত দেশের জনগণের) মালিকানাভুক্ত জমিগুলোর মধ্য থেকে বিশেষ বিশেষ ভূমিকে ‘বায়তুল-মাল’-এর জন্য আলাদা করে নিতে পারবেন। হযরত ওমর ফারূক রা. ইরাকের ভূমিসমূহ, কিসরা ও তার সাথে সম্পৃক্ত ভূমিসমূহ এবং যে ব্যাক্তি ভূমি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল তার জমি এবং যে ব্যাক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে মাড়া গিয়েছেল তার জমিন, এমনি ভাবে অপরাপর বিশেষ বিশেষ ভূমিসমূহ ‘বায়তুল-মাল’-এর জন্য আলাদা করতেন, এবং ওগুলোর মধ্য থেকেই লোকজনকে জায়গীর দান করতেন। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ‘কিতাবুল খিরাজ’-এ এবং ইমাম আবু উবায়েদ রহ. ‘কিতাবুল আমওয়াল’-এ এর বিস্তারিত বিবরণ উল্লেথীত রয়েছে। হাদিসে আছে- عَادِيُّ الْأَرْضِ لِلَّهِ وَ للرسُولِ ثُمَّ هى لَكُمْ ইমাম আবু উবাইদ রহ. বলেন:   و العادى كل ارض كان بها ساكن في اباد الدهر فانقرضوا فلم يبق منهم انيس فصار حكمها الى الإمام اموال ابو عبيد ص ٢٧٨

‘আরাদ্বিয়ে বায়তুল মাল’- এর ব্যয়খাত : বায়তুল-মাল’-এর ভূমিসমূহ ওইসকল ব্যাক্তিদের উপরে ব্যয়ীত হবে, যাদের ‘বায়তুল-মাল’-এর মধ্যে (শরীয়তের দৃষ্টিতে) কোনো হক্ব রয়েছে। যেমন: ফকির, মিসকিন, এতিম, বিধবা, এমন মুসাফির যে নিজ বাসস্থলে স্বচ্ছল বটে তবে প্রবাসে অভাবে পড়ে গেছে, অসুস্থ্য  ….., মুজাহিদ ও ইসলামী সৈন্যবাহিনী, ওলামায়ে কেরাম, শরয়ী বিচারক, রাষ্ট্রীয় প্রশাসক প্রমুখ। এমনকি সাধারণ জনকল্যানমূলক কাজও ‘বায়তুল-মাল’-এর ব্যায়খাতের অন্তর্ভূক্ত। যেমন: নদ-নদীর পুল নির্মান, রাষ্ট্রীয় সীমানা সমূহের হিফাজত, মসজিদ, আধ্যাত্বপিঠ, চিকিৎসালয়, সাধারণ নির্মান প্রভৃতি।

‘আরাদ্বিয়ে বায়তুল মাল’- এ খলিফার এখতিয়ার সমূহ:- বায়তুল-মাল’-এর অপরাপর সম্পদের ন্যায় ‘বায়তুল-মাল’-এর ভূমিগেুলিও খলিফার তত্ত্বাবধানে থাকবে। এসবের আয় ও মুনাফা সমূহ খলিফার অনুমোদন সাপেক্ষে স্ব স্ব ব্যয়খাতে ব্যয়ীত হবে। খলিফার জন্য এসব ভূমি সমূহের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত এখতিয়ার সমূহ হাসেল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে তিনি যখন যে সুরতটিকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য অধিক উপকারী দেখতে পাবেন, তখন সে সুরতটিকে গ্রহন করবেন।

(১) (খলিফা বিজীত এলাকার বিভিন্ন) চাষাবাদযোগ্য জমিগুলোতে (লোক দ্বারা) চাষ করিয়ে নিবেন, অথবা অন্য চাষীদেরকে বন্টন করে দিবেন, কিংবা (তাদেরকে) নির্ধারিত বিনিময় (ভূমি রাজস্ব/কর)-এর ভিত্তিতে দিবেন। এমনি ভাবে তিনি (সে এলাকায়) স্থায়ীভাবে বসবাসকারীদেরকে তা ভাড়ায়ও দিতে পারেন। আর এর যাবতীয় আয়গুলোকে তিনি ‘বায়তুল-মাল’-এ জমা করবেন।

(২) সাধারণ জনকল্যানমূল ও জনসাধারণের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস, যেমন: মসজিদ, সাধনালয়, দরসগাহ্, এতিমখানা, মুসাফিরখানা, চিকিৎসালয় ইত্যাদি বানাবেন।

(৩) খলিফা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে প্রয়োজন হলে ‘বায়তুল-মাল’-এর ভূমিগুলোকে বিক্রিও করে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভূমির মূল্য ‘বায়তুল-মাল’-এর বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যয় করা হবে।

(৪) খলিফা যাকে ইসলামের বিভিন্ন খেদমত বা অভাব-অনটন কিংবা অসহায়ত্ব ইত্যাদি কারণের ভিত্তিতে হক্বদার মনে করবেন, তাকে ‘বায়তুল-মাল’ থেকে জায়গীরও দান করতে পারেন, যা নির্ধারণ করা, চিহ্নিত করা এবং অনুমোদন করা খলিফার এখতিয়ার ভুক্ত। 

আবার ‘জায়গীর’ দান করারও বিভিন্ন সুরত রয়েছে। এসব ক্ষেত্রেও খলিফার এখতিয়ার রয়েছে যে, তিনি যে সুরতটিকে মুসলমানদের জন্য উপকারী মনে করবেন, সেটাকে গ্রহন করবেন।

‘জায়গীর’ দান করার সুরতসমূহ:

(৪-ক) ‘জায়গীর’ দানের একটি সুরত হল, যে ব্যাক্তিকে জমি দেয়া হবে, তাকে তার মালিকও বানিয়ে দেয়া হবে। এমতাবস্থায়, (ওই ব্যাক্তির জন্য) সেই জমির ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি যাবতীয় মালিকানামূলক ব্যয়-ব্যবহার জায়েয হবে এবং এরপর এসব জমিন তার উত্তরাধিকারদের মাঝে শরীয়ত সম্মত অংশ অনুযায়ী হাতবদল হবে। খলিফার জন্য তার থেকে তা ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার থাকবে না। [শামী- ৩/৩৬৬] (খলিফা হিসেবে মুসলমানদেরকে প্রদত্ত) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অধিকাংশ (সরকারী) অনুদান এরকমই ছিল। হযরত সালিত আনসারী রা.-কে একটি ভূমি অনুদান হিসেবে দিয়েছিলেন। হযরত সালিত আনসারী রা. উক্ত ভূমির দেখাশোনা ও কারবারের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতেন। কিন্তু ওই ভূমির কারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র খেদমতে ও দর্শনে আগমনে ঘাটতি অনুভব করে তা (তার থেকে) ফিরিয়ে নেয়ার আবেদন করেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ সেটা ফিরিয়ে নিয়ে হযরত যুবায়ের রা.-কে দান করেন। এই ফেরত দান যেহেতেু (অন্তরের) পবিত্রতার খাতিরে ছিল, তাই এটাকে জায়েয মনে করা হয়েছে। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবায়েদ- ২৭৩ পৃষ্ঠা]

এমনি ভাবে খয়বরের একটি জমিন যার মধ্যে গাছপালা ও খেজুরের বাগান ছিল, রাসুলুল্লাহ ﷺ  সেটা হযরত যুবায়ের রা.-কে জায়গীর হিসেবে দিয়ে দিয়েছিলেন। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবায়েদ- ২৭৩ পৃষ্ঠা] এই জমিনটি (পরবর্তীতে) হযরত যুবায়ের রা.-এর উত্তরাধিকারদের মাঝে হাতবদল হয়। এমনি ভাবে হযরত বেলাল বিন হারিস রা. কে মদিনা থেকে পাঁচ মঞ্জিল দূরে অবস্থিত আক্বীক্বের গোটা উপত্তকাটাই দান করেছিলেন। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবায়েদ- ২৭৩ পৃষ্ঠা]

(৪-খ) ‘জায়গীর’ দানের দ্বিতীয় সুরতটি হল, যাকে জমি দেয়া হবে, তাকে জমির মালিক বানানো হবে না, বরং তার এক বংশের পর আরেক বংশকে উক্ত জমি থেকে মুনাফা ও আয়-উপার্জন করার এখতিয়ার দেয়া হবে।এমতাবস্থায় খলিফা শরীয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়া উক্ত জায়গীর গ্রহিতা অথবা তার উত্তরাধিকারদেরকে সংশ্লিষ্ট জমি থেকে বেদখল বানাতে পারবে না। হ্যাঁ, সে যদি জমিটিকে বেকার ফেলে রাখে অথবা জমির উশর বা খারাজ আদায় না করে, তাহলে তার কাছ থেকে জমিটি নিয়ে অন্যকে দেয়া যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে জায়গীরগ্রহীতা অথবা তার উত্তরাধিকারদের জন্য সংশ্লিষ্ট জমিটি (অন্যের কাছে) বিক্রি, হেবা কিংবা ওয়াকফ করার এখতিয়ার থাকবে না। এটা ছাড়া বাদবাকি ব্যয় ও ব্যবহার সমূহ যার সম্পর্ক উৎপাদনের সাথে তার সবই  (তাদের জন্য) জায়েয।

হযরত তামীম দ্বারী রা. যখন মুসলমান হলেন, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আবেদন করলেন, কুরআনের ওয়াদা মোতাবেক আল্লাহ তাআলা আপনাকে যখন গোটা ভূমির উপরে প্রবল ও কর্ণধার বানিয়ে দিবেন, তখন শামে আমার যে গ্রাম রয়েছে, যাকে বায়তুল-হাম বলা হয়ে থাকে (যেখানে হযরত ঈসা আ. ভুমিষ্ট হয়েছিলেন) আপনি সেই গ্রামটি আমাকে দান করুন, যখন শাম বিজীত হবে, তখন আমি নিয়ে নিবো। রাসুলুল্লাহ ﷺ তার আবেদনের প্রেক্ষিতে গ্রামটিকে জায়গীর বাবদ তাকে দিয়ে দেন এবং এরজন্য একটি ফরমানও লিখে দেন। হযরত ওমর ফারুকের খিলাফতের আমলে শাম বিজীত হলে হযরত তামীম দ্বারী রা. ফরমানটি নিয়ে (খলিফা হযরত ওমর ফারুকের কাছে) উপস্থিত হন। হযরত ওমর ফারুক রা. বললেন, আমি নিজেই এই ফরমানটির একজন সাক্ষি, তাই এই জায়গীর আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। তবে তিনি এও বললেন যে, এটাকে বিক্রি করে দেয়ার এখতিয়ার আপনার নেই’। লাইস বিন সা’দ এই ঘটনাটি উল্লেখ করার পর বলেন, এই জায়গীরটি আজ পর্যন্ত হযরত তামীম দ্বারীর বংশধরদের ব্যয়-ব্যবহারাধিকারেই রয়েছে।

হযরত লাইস বিন সা’দ রহ. বলেন-  أن عمر رضى الله عنه أمضى ذلك لتميم و قال ليس لك ان تبيع قال فهى في ايدي اهل بيته الى اليوم –  ‘হযরত ওমর রা. উক্ত ভূমিটিকে ‘বনী-তামিমে’র জন্য’ হামেশা জারি রাখার ফরমান দিয়ে দিয়েছেন এবং বলেছেন: ‘আপনার জন্য একে বিক্রি করে দেয়ার এখতিয়ার নেই’। ফলে ওটা আজ পর্যন্ত তারই খান্দানের হাতে রয়েছে। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবায়েদ- ২৭৫ পৃষ্ঠা]

‘আপনার জন্য একে বিক্রি করে দেয়ার এখতিয়ার নেই’ -হযরত ওমর ফারূকের এই ফরমান এবং হযরত তামীম রা. ও তাঁর বংশধরদেরকে বংশের পর বংশ ধরে এর আয় ও মুাফা গ্রহনের সুযোগ দান থেকে একথা জানা গেল যে, হযরত ওমর রা. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ফরমান থেকে এই মনভাবের কথাই বুঝতে পেরেছিলেন। নতুবা তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর (নির্দেশের বাহ্যত: এরকম) বিপরীত কাজ করতেন না।

ফায়দা: (এখন কথা হল,) “যে খলিফাতুল মুসলিমীন কোনো ব্যাক্তিকে উপরোক্ত বংশানুক্রমিক ধারায় ভূমির উৎপাদন থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য জায়গীর দিয়ে দিয়েছেন, যখন সেই খলিফা মাড়া যাবেন ও উক্ত আসনে দ্বিতীয় খলিফা সমাসীন হবেন, তখন তিনি (কি) -উক্ত জায়গীর গ্রহিতা মাড়া গেলে-  এবং একই ভাবে তার পরে আগত খলিফাগণের জন্য ওই ব্যাক্তির বংশধরদের ব্যাপারে সাবেক খলিফার ফরমান মেনে চলতে হবে, নাকি প্রথম খলিফার মৃত্যুতে জায়গীরগ্রহীতার বংশধরদের উক্ত অধিকারের ব্যাপারে চুক্তিটি নিঃশ্বেস হয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় খলিফার এখতিয়ার থাকবে যে, তিনি ওই ব্যাক্তির বংশধরদের জন্য উক্ত ফরমান বহাল রাখবেন কিংবা তা ফিরিয়ে নিবেন” — এসম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহ’র দলিলাদিতে কিছু বলা নেই। তবে কাওয়ায়িদ ও নাজায়ীর থেকে ফিকাহবীদগণ যা কিছু বুঝতে পেরেছেন, তাতে তাঁদের মতামত ও বক্তব্যে বিভিন্নতা পরিদৃষ্ট হয়। ফাতওয়ায়ে শামী প্রভৃতিতে ‘শারহু সিরে কাবীর’-এর কিছু ইবারতের ভিত্তিতে এই মতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে যে, এধরনের জায়গীর বংশধরদের কাছে হাতবদল হওয়ার চুক্তিটি জায়গীর প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট খলিফার হায়াত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে এবং উক্ত খলিফার মৃত্যুতে সে চুক্তি নিঃশ্বেস হয়ে যাবে। তখন পরবর্তী খলিফা ও আমীরের এখতিয়ার থাকবে, জায়গীর গ্রহীতার মৃত্যুর পর তার সন্তান-সন্ততি ও উত্তরাধীকারদেরকে তা (পূণরায় উপকৃত হওয়ার জন্য) দিয়ে দিবেন অথবা ফিরিয়ে নিবেন। তবে খোদ জায়গীর গ্রহিতার হায়াত পর্যন্ত এব্যাপারে প্রত্যেক খলিফার যত্নবান থাকতে হবে। কারণ জায়গীর দেয়া হয়েছে ওই ব্যাক্তিকে। অপর দিকে তার সন্তান-সন্ততিদের কথা ভিন্ন, তাদেরকে তা এখনো পর্যন্ত (জায়গীর বাবদ) দেয়া হয়নি; তাদের ব্যাপারে ওয়াদাটি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে মাত্র। উপরে যে বলা হল যে, এরকম জায়গীর হযরত তামীম দ্বারী রা.-এর বংশধরদের মাঝে দীর্ঘকাল পর্যন্ত পরম্পরায় বিদ্যমান থেকেছে, এই ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে, প্রত্যেক নতুন খলিফা ও আমীর তাঁর নিজ এখতিয়ার বলে তা বহাল রেখে দিয়েছিলেন, কিংবা এমনও হতে পারে যে, পরবর্তীতে আগত আমীর ও শাসকগণ বিগত ফরমানকে মেনে চলাকেই নিজেদের জন্য জরুরী মনে করে তা বহাল রেখে দিয়েছিলেন।

(৪-গ) ‘জায়গীর’ দানের তৃতীয় সুরতটি হল, জায়গীর গ্রহিতাকে জমির মালিকও বানিয়ে দেয়া হবে না, আবার (ওই জমি থেকে) বংশপরম্পরায় উপকৃত হওয়ারও সুযোগ দেয়া হবে না, বরং তাকে তার হায়াত পর্যন্ত উপকৃত হওয়ার এখতিয়ার দেয়া হবে। এমতাবস্থায়, উক্ত শর্ত মতে জায়গীর গ্রহীতার মৃত্যুর পর জমিটি তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

(৪-ঘ) (‘জায়গীর’ দানের) চতুর্থ সুরতটি হল, জায়গীর গ্রহিতাকে নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ (নির্ধারণ) ব্যতীত কেবল (জমির) উৎপাদন থেকে উপকৃত হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। এমতাবস্থায়, খলিফার এই এখতিয়ার সর্বদায়ই থাকবে যে,  যখন কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ বা প্রয়োজন দেখবেন, তখন তার কবজা থেকে (জমিটি) নিয়ে নিবেন।

মাসআলাহ: জায়গীর সম্পর্কিত উপরোক্ত সুরত চারটির মধ্যে শুধুমাত্র প্রথম সুরতটির ক্ষেত্রে জায়গীর গ্রহিতার জন্য সর্বপ্রকারের ব্যয় ও ব্যবহারের মালিকানাধিকার, বিক্রয়, হেবা, ওয়াকফ ইত্যাদির হক্ব হাসিল রয়েছে। বাকি সুরত তিনটির ক্ষেত্রে মালিকানামূলক এজাতীয় ব্যয় ও ব্যবহার জায়েয নয়। অবশ্য জায়গীর গ্রহীতার এই হক্ব হাসেল রয়েছে যে, সে নিজেই জমি চাষ করতে পারে, অথবা সেখানে গৃহ বানিয়ে উপকৃত হতে পারে, কিংবা তা ভাড়ায় দিয়ে তার ভাড়া উপার্জন করতে পারে।

(৪-ঙ) (‘জায়গীর’ দানের) পঞ্চম সুরতটি হল, জমির মালিকানার সাথে ‘জায়গীর গ্রহিতা’র কোনো সম্পর্ক থাকবে না, আবার সেই জমির উৎপাদন ও মুনাফাও কোনো মাধ্যম ব্যবতীত তাকে দেয়াও হবে না। বরং জমির যে পরিমান ওশর ও খিরাজ ‘বায়তুল-মালে’র অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকে, সেটার সবটুকু কিংবা তার কিছু অংশ কোনো হক্বদার ব্যাক্তিকে দিয়ে দেয়া হবে। এমতাবস্থায় কোনো ‘(জমির) ভাড়া গ্রহিতা কৃষক’ যদি খলিফার পক্ষ থেকে (উক্ত) জমির উপরে কবজা বা ব্যয় ও ব্যবহারের অধিকার পেয়ে থাকে, তাহলে সে অধিকার স্ব-স্থানে বহাল থাকবে; ‘জায়গীর গ্রহিতা’ সেই জমিকে বেদখল করে অন্য লোকদেরকে ভাড়ায় প্রদান করতে পারবে না। বরং, খলিফা শর্ত মোতাবেক তার উপরে যে পরিমান ওশর ও খিরাজ নির্ধারন করে দিয়েছেন -জমির সম্পর্ক সেই অংশের সাথেই সম্পৃক্ত থাকবে।

(৪-চ) ‘জায়গীর’ দানের ষষ্ঠ সুরতটি হল, সংশ্লিষ্ট জমিটি ‘বায়তুল-মালে’র অন্তর্ভূক্ত না হয়ে বরং ‘আরাদ্বিয়ে-মামলাকাহ’র অন্তর্ভূক্ত হবে। আর এর সুরত তা-ই যা পঞ্চম সুরতে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে জায়গীর গ্রহিতার কোনো মাধ্যম যোগেও জমির উৎপাদনের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং, এমতাবস্থায় উৎপাদীত দ্রব্য হবে জমির মালিকের। উক্ত জমি থেকে ‘বায়তুল-মাল’-এ যা প্রবেশ করে, খলিফা ‘জায়গীর গ্রহিতা’র জন্য উক্ত খারাজের পুরো অংশটাই অথবা কিছু অংশ নির্ধারণ করে দিবেন । এর বিধানও তাই যা পাঁচ নম্বরে বর্ণিত হয়েছে। এরকম জায়গীরের ক্ষেত্রেও শর্ত এই যে, জায়গীর গ্রহিতাকে খারাজ পাওয়ার খাতভুক্ত ব্যাক্তি হতে হবে। যে ব্যাক্তি খারাজ পাওয়ার খাতভুক্ত ব্যাক্তি নয়, তাকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ সুরতের জায়গীর দান করা যাবে না। كما صرح به في رساله ابن نجيم علي اقطاعات

(৪-ছ) ‘জায়গীর’ দানের ৭ম সুরতটি হল, সংশ্লিষ্ট জমিটি না বাইতুল-মাল থেকে দান করা হবে, আর না কারো মামলুকাহ-জমির খারজ থেকে। বরং অনাবাদী জমি -যাকে ‘আরদে মাওয়া ‘ বলা হয় -তা থেকে দান করা হবে। এমতাবস্থায়, এই জায়গীর প্রত্যেক ব্যাক্তিকে দেয়া যেতে পারে -চাই সে বাইতুল-মালের ব্যায়খাতভুক্ত কেউ হোক চাই না হোক, চাই মুসলীম হোক চাই অমুসলীম জিম্মি। যাকে এরকম জায়গীর দেয়া হবে, সে যখন সেটা আবাদ করবে তখন সে আপনা আপনিই ওই জমির মালিক হয়ে যাবে এবং তার জন্য মালিকানাগত সার্বিক ব্যায় ও ব্যবহার জায়েয হবে। যেমনটা এইমাত্র (উপরে) এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

ফায়দা: শেষের উল্লেখীত সুরত দুটি যদিও বায়তুল-মালের দান-খাতের অন্তর্ভূক্ত নয়, কিন্তু ভূমি জায়গীর দানের সমস্ত সুরতগুলিকে এক জায়গায় একত্রিত করার উদ্দেশ্যে এগুলোকে এখানে লিপিবদ্ধ করে দেয়া হল।

‘আরাদ্বিয়ে বায়তুল মাল’- এর ওয়াকফ :- ‘আরাদ্বিয়ে বায়তুল-মাল’-এর শ্রেণিভেদ ও বিধিবিধান সম্পর্কে উপরে বিস্তারিত যা বলা হল, তা থেকে বোঝা গেছে যে, এসকল ভূমি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ ব্যাক্তির মালিকানাভূক্ত হতে পারে। যেমন: ‘বায়তুল মাল’-এর উকিল তা (কারো কাছে) বিক্রি করে দিল এবং খলিফা বা অন্য কেউ তা ক্রয় করে নিলো কিংবা খলিফা অন্য কাউকে হক্বদার মনে করে সংশ্লিষ্ট ভূমিটি জায়গীর গ্রহিতার মালিকানায় দিয়ে দিল। এসকল ক্ষেত্রে যারা এসব ভূমির মালিক হয়ে যাবে, তারা তা (যেমন নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যয় ও ব্যবহার করতে পারে, তেমনি চাইলে) ওয়াকফও করে দিতে পারে, যা সাধারণ ওয়াকফকৃত জিনিসের ন্যায় সর্বদাই ওয়াকফের শর্তাধিনে জারি থাকবে। আর খলিফা যদি তা কারোর মালিকানায় না দিয়ে বায়তুল-মালের ভূমি সমূহের মধ্য হতে কোনো ভূমিকে বিশেষ কোনো কাজের উদ্দেশ্যে ওয়াকফ করে দেন, যেমন: মসজিদ, দরসগাহ বা মুসাফিরখানা, সাধনালয় প্রভৃতি বানানোর জন্য ওয়াকফ করে দেন, তাহলে যদিও-বা এই ওয়াকফ প্রকৃত ওয়াকফ হবে না, কেননা এর জন্য মালিকানা ওয়াকফ করা শর্ত, আর এক্ষেত্রে খলিফা (নিজে) উক্ত ভূমির মালিক নন, তবুও সাধারণ বিধান হিসেবে এটাও ওয়াকফের বিধানে থাকবে। অর্থাৎ, খলিফা যে বিশেষ খাতে ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, ওই খাতের ব্যায় ও ব্যবহার করা হবে। কোনো রকম পরিবর্তন ও অদল-বদল করার এখতিয়ার কারোর থাকবে না। তবে শর্ত এই যে, যে খাতে ব্যবহৃত হবে -তা বাইতুল মালের ব্যয়খাত সমূহের অন্তর্ভূক্ত হতে হবে।

এই ধরনের সরকারী ওয়াকফ’কে ফিকাহবিদগণের পরিভাষায় ارصادات (ইরসাদাত) বলা হয়ে থাকে। [শামী- ৩/৩৫৭] হিজরী ৭৮০ সনে সুলতান নিজামুল মামলুকাত বরকুক চেয়েছিলেন যে, এই ধরনের ওয়াকফ সমূহকে ভেঙে দিবেন। কেননা, এগুলো প্রকৃত ওয়াকফ নয়, বরং এগুলোকে বায়তুল মাল’ থেকে বের করে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও পরামর্শ ও ফাতওয়া তলবের উদ্দেশ্যে ওলামাগণের একটি মজলিশ ডাকা হয়, যেখানে শায়েখ সিরাজুদ্দিন বালকিনী, শায়েখ কামালুদ্দিন বারবাতী (হেদায়াহ’র ব্যাখ্যাকার) এবং শায়েখ বুরহান বিন জামাআত প্রমুখ হাযরাত তাশরিফ এনেছিলেন। শায়েখ বালকিনী ফয়সালা দিয়েছিলেন যে, ওই ধরনের ওয়াকফ -যা ওলামায়ে কেরাম ও দ্বীনি শিক্ষার্থিদের জন্য করা হয়েছে, যাদের হক্ব বায়তুল মালের একপঞ্চমাংশের মধ্যে রয়েছে -তা পূর্ববৎ বহাল রাখা হোক, আর যা শরয়ী কারণ ছাড়া কোনো না-হক্বদার ব্যাক্তি জন্য আলাদা করা হয়েছে, তা ভেঙে ফেলা হোক। অপরাপর ওলামায়ে কেরামও এই মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। [শামী- ৩/৩৫৮]

 

মালিকানাহীন ভূমি’র প্রকারভেদ ও আহকামের খোলাসা কথা

যে জমির নির্দিষ্ট কোনো ব্যাক্তির মালিকানাধীন নয়, তা ৩ প্রকার:-

(ক) জনবসতির সন্নিকটস্ত ওই সকল ভূমি, যা এলাকাবাসিদের সাধারণ ও সামষ্টিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। 

(খ) আরদ্বে মাওয়াত – তথা জনমানবহীন, চাষের অযোগ্য এবং উপকৃত হওয়ার অনুপযোগী ভূমি, যার সাথে কোনো লোকালয়ের প্রয়োজনাদির সম্পর্ক নেই।   

(গ) বিভিন্ন প্রকারের ‘আরাদ্বিয়ে বায়তুল মাল’।

এগুলোর মধ্যে ১ম প্রকারের ভূমি কখনই কোনো অবস্থাতেই বিশেষ কোনো ব্যাক্তির মালিকানাভূক্ত হতে পারে না। আর ২য় প্রকারের ভূমিকে যে ব্যাক্তি -চাই সে মুসলীম হোক বা অমুসলীম, হক্বদার হোক বা না-হক্বদার -খলিফাতুল মুসলিমীনের অনুমতি নিয়ে আবাদ করবে, সে তার মালিক হয়ে যাবে। আর ৩য় প্রকারের ভূমি সম্পর্কে বিস্তারিত কথা রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জায়গিরগ্রহীতা সংশ্লিষ্ট ভূমির মালিক হয়ে যাবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক হবে না। আর উল্লেখীত সুরতগুলোর সবগুলোর মধ্যে সমষ্টিগতভাবে যে বিষয়টি পাওয়া যায়, সেটা হল, সংশ্লিষ্ট ভূমিটি শুধুমাত্র ওই সকল ব্যাক্তিদেরকেই দেয়া যেতে পারে, যাদের বায়তুল মালের উপরে হক্ব রয়েছে। و الله سبحانه و تعالى اعلم

 

বাকি অংশের জন্য ক্লিক করুন: [পৃষ্ঠা ১][পৃষ্ঠা ২ (অসম্পূর্ণ)]  …