কিতাল / জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ : কুরআন সুন্নাহ ও ফিকহি আলোচনা – ১

Spread the love

কিতাল / জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ : কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে শরয়ী ফিকহি আলোচনা – ১

 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ سَيِّدِنَا مَوْلَانَا مُحَمَّدٍ وَعَليٰ اٰلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ صَلوٰةً تُنَجِّيْنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْأَهْوَالِ وَاْلآفَاتِ وَتَقْضِيْ لَنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْحَاجَاتِ وَتُطَهِّرُنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ السَّيِّاٰتِ وَتَرْفَعُنَا بِهَا عِنْدَكَ اَعْليٰ الدَّرَجَاتِ وَتُبَلِّغُنَا بِهَا اَقْصىٰ الْغَايَاتِ مِنْ جَمِيْعِ الْخَيْرَاتِ فِي الْحَيَاتِ وَبَعْدَ الْمَمَاتِ- اِنَّكَ عَليٰ كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ

 

বর্তমান বিশ্ব যুদ্ধবিগ্রহ ও খুনাখুনিতে ভরপুর হয়ে আছে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন পৃথিবীর মানুষ এসব বিষয়ের খবরাখবর শোনা বা দেখা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। আরো ভয়ঙ্কর কথা হল, সোসালিজম/সমাজতন্ত্র, সেকুলারিজম/ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ডেমোক্রেসি/গণতন্ত্র ইত্যাদি ইসলাম বিরোধী বিভিন্ন কুফরী মতবাদ গুলোকে কোনো দেশে/এলাকায় প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলেনের নামে সৃষ্ট মানুষে মানুষে দলাদলি, মাড়ামাড়ি, গন্ডোগোল, রায়োট, খুনাখুনি কিংবা তার পরিণতিতে সৃষ্ট ছোট বড় যুদ্ধ-বিগ্রহ গুলোকে বুক ফুলিয়ে বলা হয় ‘ভাল কাজ’। আর এসব করতে গিয়ে যাদের মৃত্যু হয়, তাদেরকে ‘শহিদ’ পর্যন্ত বলা হয় এবং তাদেরকে ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার সাথে ‘শহিদ’ মর্যাদায় ভুষিত করা হয়ে থাকে প্রকাশ্যে। অথচ, ‘শহিদ’ পরিভাষাটি একটি ইসলামী পরিভাষা, কুরআন সুন্নাহ’র পরিভাষা। কুরআন সুন্নাহ যাদেরকে ‘শহিদ’ বলে না, বরং ‘সমাজের ফ্যাসাদকারী বলে থাকে’, তাদেরকে ‘শহিদ’ বলাটা মূলত: কুরআন-সুন্নাহ’র শরয়ী পরিভাষা ও অর্থের মধ্যে তাহরিফ (খলৎমলৎ) সৃষ্টি করা ছাড়া আর কী হতে পারে! বিশ্বের প্রতিটি দেশে থাকা মুসলমান ছাত্র/ছাত্রী, যুবক/যুবতী এবং কাঁচা-পাকা চুলের বয়ষ্করা যে হারে এসব তথাকথিত আন্দোলন রায়োট গন্ডোগোল এমনকি যুদ্ধবিগ্রহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িয়ে পড়ছে বা কথা ও কাজ দ্বারা সমর্থন করছে প্রতিনিয়ত, তাতে আমার মতে- “শরীয়ত সম্মত ক্বিতাল/জিহাদ কী’ এবং তাতে শহিদ কাঁদেরকে বলা যায়, অপরদিকে ভাল কাজের নামে সমাজে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও গন্ডোগোল বাঁধাতে গিয়ে তাতে মড়ে দোযখী হয় কারা”?- এ ব্যাপারে শরয়ী ইলম হাসিল করা এজাতীয় প্রত্যেক নারী পুরুষের জন্য ফরয।  এজন্য এখানে কুরআন সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করায় হাত দিলাম। আল্লাহই তৌফিকদাতা 

 

শরীয়তের দৃষ্টিতে জিহাদ ও ক্বিতাল বলতে কী বুঝায় :-

আরবীতে শরীয়তের দৃষ্টিতে الجِهَادُ (জিহাদ) শব্দটি  الْقِتَالُ (ক্বিতাল) শব্দটি থেকে আরো ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর পার্থক্য বোঝার জন্য প্রথমে  ‘জিহাদ’ ও ‘ক্বিতাল’-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ জানা ও বোঝা জরুরী।
 

الْقِتَالُ (আল-ক্বিতাল):

ক্বিতাল’ শব্দটির বিভিন্ন অর্থ রয়েছে এবং তা স্থান কাল পাত্র ভেদে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন:
 
(১) ‘ক্বিতাল’ শব্দের একটি অর্থ হল ‘রুখে দেয়া, প্রতিরোধ করা, হাতাহাতি লড়াই করা ইত্যাদি’। যেমন, আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন: إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ إِلَى شَيْءٍ يَسْتُرُهُ مِنْ النَّاسِ فَأَرَادَ أَحَدٌ أَنْ يَجْتَازَ بَيْنَ يَدَيْهِ فَلْيَدْفَعْهُ فَإِنْ أَبَى فَلْيُقَاتِلْهُ فَإِنَّمَا هُوَ شَيْطَانٌ . رواه البخاري كتاب الصلاة باب : يَرُدُّ الْمُصَلِّي مَنْ مَرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ: ٢/٣٢١ رقم ٤٧٩; ومسلم , كتاب الصلاة باب , منع المار بين يدي المصلي : ٣/٧٣ رقم ٧٨٢ ; أبو داود , كتاب: الصلاة , باب: ما يؤمر المصلي أن يدرأ عن الممر بين يديه”، حديث ٧٠٠  – “তোমাদের কেউ যখন (কোনো লাঠি বা অন্য কিছু দ্বারা) লোকজন থেকে (নিজকে) সুতরাহ (আড়াল) করে সেদিকে (মুখ করে) নামায পড়ে, তখন কেউ যদি (ওই সুতরা’র ভিতর দিয়ে) তার সামন দিয়ে অতিক্রম করতে চায়, তাহলে সে অবশ্যই ওকে বাঁধা দিবে। তাতেও যদি সে না মানে, তাহলে অবশ্যই সে ওর সাথে (প্রয়োজনে হাত দিয়ে) লড়াই করবে, (তবুও ওকে তার নামযের সামন দিয়ে যেতে দিবে না)। কারণ নিশ্চই ও একটা শয়তান, (এজন্যই বাঁধা দান সত্ত্বেও তার নামাযের সামন দিয়ে যেতে চাইছে)’। [সহি বুখারী- ২/৩২১ হাদিস ৪৭৯; সহিহ মুসলীম- ৩/৭৩ হাদিস ৭৮২; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৭০০] এখানে ‘ক্বিতাল (লড়াই)’ বলতে ‘হাত দিয়ে জোর করে বাঁধা দান’ উদ্দেশ্য, সমর যুদ্ধ উদ্দেশ্য নয়।
 
(২) ‘ক্বিতাল’ শব্দটি ‘অভিশাপ পড়া বা ধ্বংস/বরবাদী আসা’ অর্থেও কখনো কখনো ব্যবহৃত হয়। যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেন- قَاتَلَهُمُ اللهُ أَنَّى يُؤْفَكُوْنَ – ‘আল্লাহ ওদেরকে বরবাদ করুন, (দেখো, তাদের বদ-স্বভাব, পাপ ও জুলুমের কারণে বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে) তারা কিভাবে ঠোকর খেয়ে ফিরছে’ ? [সূরা তাওবা ৩০]
 
(৩) ‘ক্বিতাল’ শব্দটি কোনো গোষ্ঠির সাথে ‘সমর যুদ্ধ করা’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেন- أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا – ‘(যাদের বিরুদ্ধে) ক্বিতাল (সমর যুদ্ধ) করা হচ্ছে, তাদেরকে (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে ক্বিতাল/সমর যুদ্ধ চালানোর) অনুমতি দেয়া হল। তা এজন্য যে, তারা  (কাফেরদের দ্বারা) নির্যাতিত হচ্ছে’। [সূরা হজ্জ ৩৯-৪১] كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ  – ‘(হে মুসলমানগণ) তোমাদের উপরে ক্বিতাল (সমর যুদ্ধ/জিহাদ)’কে বিধিবদ্ধ (ফরয) করে দেয়া হল’। [সূরা বাকারাহ ২১৬] এখানে ক্বিতাল বলতে সর্বসম্মতিক্রমে সমর যুদ্ধ উদ্দেশ্য।
 
মুআয বিন যাবাল রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- مَنْ قَاتَلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فُوَاقَ نَاقَةٍ فَقَدْ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ ، وَمَنْ سَأَلَ اللَّهَ الْقَتْلَ مِنْ نَفْسِهِ صَادِقًا ، ثُمَّ مَاتَ أَوْ قُتِلَ ، فَإِنَّ لَهُ أَجْرَ شَهِيدٍ  . ﺧﺮﺟﻪ ﻭﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ في سننه , كِتَاب الْجِهَادِ, بَابٌ فِيمَنْ سَأَلَ اللَّهَ تَعَالَى الشَّهَادَةَ : ٣/٢١ رقم ٢٥٤١ ، ﻭ ﺍﻟﺘﺮمذﻯ في سننه : ٤/١٨٥ رقم ١٦٥٧ ‏، و ﺃﺣﻤد في مسنده : ٥/٢٤٤ رقم ٢٢١٦٩ ، ﻭ غيرهم و صححه الألباني في صحيح أبي داود – “যে ব্যাক্তি -উটের দুধ দোহনের সময়টুকু পরিমান (হলেও)- আল্লাহ’র পথে ক্বিতাল (সশস্ত্র জিহাদ) করে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। আর যে ব্যাক্তি সত্যসত্যই আন্তরিক ভাবে আল্লাহ’র কাছে (জিহাদের ময়দানে দুশমনের হাতে) নিহত হওয়ার কামনা করে অত:পর (তার আগেই) মাড়া যায় কিংবা নিহত হয়, তার জন্য একজন শহিদের পুরষ্কার রয়েছে”। [সুনানে আবু দাউদ– ৩/২১ হাদিস ২৫৪১; সুনানে তিরমিযী-৪/১৮৫ হাদিস ১৬৫৭; মুসনাদে আহমদ– ৫/২৪৪ হাদিস ২২১৬৯; সুনানে ইবনে মাজাহ- ২/৯৩৩ হাদিস ২৭৯২; মুসতাদরাকে হাকিম- ২/৮৭; সহিহ ইবনে হিব্বান-১০/৪৭৮ হাদিস ৪৬১৮]
 
তবে স্বাভাবিক ক্ষেত্রে الْقِتَالُ (ক্বিতাল) বলতে সাধারণত: সমর যুদ্ধ/সশস্ত্র জিহাদই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে -যাবৎ না তাতে বিশেষ অর্থ নেয়ার ইংগীত থাকে। এই হিসেবে الْقِتَالُ (ক্বিতাল) -এর সংগা নিম্নোরূপ:
 
শরয়ী পরিভাষায় ক্বিতালের সংগা:  “দ্বীন ইসলামের মূল মিশনকে বাঁধাগ্রস্থ করে -পৃথিবীতে বিরাজমান এমন প্রতিটি দ্বীন (ধর্ম/মতবাদ/মতাদর্শ, ism) ও তাদের কালেমা (তথা মূল স্লোগান)-এর ফিতনাকে পরাভুত করে তদস্থলে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলা’র দ্বীন (ইসলাম) ও কালেমাকে বিজয়ী বেশে উচ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে মুসলমানদের কোনো গোষ্ঠি কর্তৃত শরয়ী শর্ত মোতাবেক ‘দ্বীনের দুশমনদে’র বিরুদ্ধে সশস্ত্র-যুদ্ধ করাকে শরীয়তের পরিভাষায় الْقِتَالُ (ক্বিতাল) বলা হয়ে থাকে”
 

اَلْجِهَادُ (আল-জিহাদ):

جِهَادٌ (জিহাদ) শব্দটি  جُهْدٌ  (জুহদুন) শব্দ-ধাতু থেকে উৎপন্ন, যা স্থান কাল পাত্র ভেদে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন:-  اَلْجَدُّ ‘(আল জাদ্দু): প্রচেষ্টা ব্যয় করা, اَلطَّاقَةُ ‘(আত্ব ত্বা-কাতু): কঠোর সাধনা করা, اَلسَّعْىُ ‘(আস্ সা‘ইউ): চেষ্টা করা, اَلْمُشَقَّةُ ‘(আল মুশাক্কাতু): কষ্ট বহন করা, بَذْلُ القُوَّةِ (বাযলুল ক্যুওয়াহ্): শক্তি ব্যয় করা, اَلنِّهايَةُ والغَايَةُ ‘(আন্ নিহায়াতু ওয়াল গায়াহ): শেষ পর্যায়ে পৌঁছা, اَلْكِفَاحْ ‘(আল কিফাহ্ব): সংগ্রাম করা …ইত্যাদি।
 
যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেন- وَجَاهِدُوا فِي اللهِ حَقَّ جِهَادِهِ ‘(হে মুমিন মুসলমানগণ!) তোমরা (তোমাদের জান-মাল দিয়ে) আল্লাহ’র পথে জিহাদ করো, (যেভাবে) তাঁর জিহাদ (করা) হক্ব’। [সূরা হজ্জ ৭৮] যেমন, আনাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন: جَاهِدُوا الْمُشْرِكِينَ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَأَلْسِنَتِكُمْ . رواه أبو داود , رقم ٢٥٠٤ , إسناده صحيح  – ‘ তোমরা মুশরেকদের সাথে তোমাদের ধ্বনসম্পদ, তোমাদের জীবন এবং তোমাদের জবান দিয়ে জিহাদ করো’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৫০৪; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৩০৬৯; মুসনাদে আহমদ- ৩/২৫১] এজাতীয় আয়াত ও হাদিস সমূহের উদ্দেশ্য শুধু ‘সমর যুদ্ধ’ নয়, বরং শরয়ী শর্ত মোতাবেক নিজের জীবন, ধ্বনসম্পদ, জবান, মেধা, ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে সাধ্য মতো সার্বিক প্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও সমর যুদ্ধ -সবকিছুকেই জিহাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। নিম্নে স্থান কাল পাত্র ভেদে ‘জিহাদ’ কথাটির বিভিন্ন  ব্যবহার লক্ষ্য করুন:-
 
(১) ‘জিহাদ’ শব্দটি কুরআন সুন্নাহ’য় ‘সমর যুদ্ধ (ক্বিতাল)’ অর্থে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে: ‘কাফের-মুরতাদ’দের দ্বারা দ্বীন ইসলামের প্রকাশ্য বিরোধীতাপূর্ণ তৎপরতা নিমূল করন এবং জমিনে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলা’র দ্বীন ও কালেমাকে বিজয়ী বেশে উচ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ‘হাত/শক্তি/ক্ষমতা’-এর সাহায্যে শরীয়ত সম্মত ভাবে সাধ্য মতো সংগ্রাম ও সমর যুদ্ধ করাকে ‘জিহাদ’ বলে অবিহিত করা হয়েছে।
 
যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেছেন-
 
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ – تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ – يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ    
“ওহে -যারা ইমান এনেছো! আমি কি তোমাদেরকে একটি ব্যবসার কথা জানাবো, (যা) তোমাদেরকে (আখেরাতের) সুকঠিন আযাব থেকে বাঁচিয়ে দিবে? (আর সেটা হল,) তোমরা ইমান আনো আল্লাহ প্রতি ও তাঁর রাসুলের প্রতি এবং আল্লাহ’র পথে জিহাদ করো তোমাদের ধ্বনসম্পদ ও জীবন দিয়ে। ওটাই তোমাদের জন্য কল্যানকর যদি তোমরা বুঝতে পারতে। (এই আমল করলে) তিনি তোমাদের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন (এমন) জান্নাতে, যার তলদেশে নহর সমূহ প্রবাহিত হয় এবং (এমন) পবিত্র বাসস্থানে (যা) জান্নাতে-আদনের ভিতরে অবস্থিত। মহা সফলতা ওটাই”। [সূরা সফ ১০-১২]
 
 لَّا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ ۚ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً ۚ وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ۚ وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا – دَرَجَاتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً ۚ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا 
“মুমিনদের মধ্যে থেকে উপযুক্ত অক্ষমতা ব্যতীত (ঘরে) বসে থাকা ব্যাক্তিরা এবং আল্লাহদর পথে নিজেদের ধ্বনসম্পদ ও জীবন দিয়ে জিহাদকারীগণ (মোটেও) সমান নয়। আল্লাহ -(ঘরে) বসে থাকা ব্যাক্তিদের উপরে নিজেদের ধ্বনসম্পদ ও জীবন দিয়ে জিহাদকারীগণকে (আলাদা শ্রেষ্ঠ) মর্যাদাস্তরে ভুষীত করেছেন। আর আল্লাহ (মুমিনদের) প্রত্যেকের (জন্যেই তাদের আমল অনুপাতে) কল্যানের ওয়াদা করেছেন। তবে আল্লাহ -(ঘরে) বসে থাকা ব্যাক্তিদের উপরে জিহাদকারীগণকে বিরাট পুরুষ্কারে ভুষীত করবেন। তাঁর পক্ষ থেকে (জিহাদকারীগণের জন্য) রয়েছে (বিশেষ) মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল ও দয়ালু”   । [সূরা নিসা ৯৫, ৯৬]
 
আবু হুরায়রাহ রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এরশাদ করেন- جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ يَعْدِلُ الْجِهَادَ قَالَ لَا أَجِدُهُ قَالَ هَلْ تَسْتَطِيعُ إِذَا خَرَجَ الْمُجَاهِدُ أَنْ تَدْخُلَ مَسْجِدَكَ فَتَقُومَ وَ لَا تَفْتُرَ وَتَصُومَ وَ لَا تُفْطِرَ قَالَ وَمَنْ يَسْتَطِيعُ ذَلِكَ . رواه البخاري في صحيحه : رقم ٢٧٨٥، و احمد في مسنده : ٢/٣٤٥ قال احمد شاكر : ٨/٣٤٣ رقم ٨٥٢١ : اسناده صحيح  – “(একবার) এক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বললো: ‘আমাকে এমন আমলের কথা জানান, যা জিহাদের বরাবর হয়’। তিনি বললেন: ‘আমি তা পাচ্ছি না’। (তারপর) বললেন: ‘(তুমি ঘরে বসে মুজাহিদের সমান ফজিলত পেতে চাও!) তোমার পক্ষে কি এটা সম্ভব যে, মুজাহিদ যখন (জিহাদের ‍উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে) বের হবে, তখন তুমি মসজিদে প্রবেশ করে নামায পড়তে থাকবে, (আর তাতে) ক্লান্ত হবে না এবং (অনবরত) রোযা রাখতে থাকবে, (আর তা) ভাংবে না’? সে বললো: ‘সেটা কার পক্ষে সম্ভব’?! [সহিহ বুখারী, হাদিস ২৬১৬; মুসনাদে আহমদ- ৮/৩৪৩]
 
(২) ‘জিহাদ’ শব্দটি ‘জবানী প্রতিবাদ’ অর্থেও বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে: অর্থাৎ, ‘কোনো মুশরেক বা কাফের বা মুরতাদ’ কর্তৃক দ্বীন ইসলামের প্রকাশ্য বিরোধীতা করন, কিংরা ‘কোনো পাপী মুসলমান’ কর্তৃক কোনো শরীয়ত পরিপন্থী কোনো অন্যায়কে বাঁধা দান/নিষেধ করন/নিষিদ্ধ করন/বিরোধীতা করন/প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে এবং তদস্থলে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলা’র দ্বীন ও কালেমাকে বিজয়ী বেশে উচ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ‘জবান’-এর সাহায্যে শরীয়ত সম্মত ভাবে সাধ্য মতো সার্বিক প্রতিবাদ ও সংগ্রাম করাকেও কুরআন সুন্নাহ’য় ‘জিহাদ’ বলে অবিহিত করা হয়েছে।
 
যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেছেন- فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا“সুতরাং, (হে নবী মুহাম্মাদ!) তুমি কাফেরদের অনুগত্য করো না এবং তাদের সাথে এর দ্বারা জিহাদ করো -বিশাল (এক) জিহাদ”। [সূরা ফুরকান ৫২
 
সুরা ফুরকান একটি মাক্কী সুরা। যাহহাক ইবনে মুজাহিম এবং মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের রেওয়ায়েত অনুসারে সুরা ফুরকান নাজিল হয় সুরা নিসার আট বছর পূর্বে।[জামেউল বয়ান, ইবনে জারীর- ১৯/২৮; মাফাতিহুল গাইব, ইমাম রাযী- ৬/৩৫৮] এই হিসেবে সুরা ফুরকান নাজিল হয় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাক্কী জীবনের মাঝামাঝি সময়ের দিকে। অপরদিকে মুসলমানদের উপরে ‘ক্বিতাল’ (সমর জিহাদ) ফরয বিষয়ক আয়াত নাজিল হয় রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পরে। তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাক্কী জীবনে নাজিল কৃত উপরোক্ত আয়াতে কাফের-মুশরেক’দের সাথে ‘বড় জিহাদ’ করতে বলার অর্থ কোনো অবস্থাতেই ‘সমর যুদ্ধ’ হতে পারে না। যারা এমন অর্থ করে, তাদের সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (মৃ: ৬৭১ হি:) রহ. বলেছেন- وَهَذَا فِيهِ بُعْدٌ، لِأَنَّ السُّورَةَ مَكِّيَّةٌ نَزَلَتْ قَبْلَ الْأَمْرِ بِالْقِتَالِ – “এখানে এ(রকম অর্থ নেয়া বহু) দূরের বিষয়। কেননা, ‘(সুরা ফুরকান একটি) মাক্কী সুরা (যা) ক্বিতালের নির্দেশ দানের পূর্বে নাজিল হয়েছে”। [জামেউ আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ১৩/৫৮]
 
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতে بِهِ (এর দ্বারা) অর্থ بالقرآن (কুরআনের দ্বারা/সাহায্যে)। [জামেউ বায়ানিল ইলম, ইমাম জারীর- ৯/৩৯৮; ফাজায়েলুল কুরআন, ইমাম মুসতাগফিরী- পৃ: ১১; মাআলিমুত তানযীল, ইমাম বাগাভী- ৩/৩৭৩; তাফসিরে ইবনে কাসির– ৬/১১৬] এথেকে বোঝা গেল, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাক্কী জীবনে আল-কুরআনের সাহায্যে কাফের-মুশরেকদের শিরক ও কুফরের বিরোধীতাকে جِهَادًا كَبِيرًا – ‘বিশাল জিহাদ’ বলে অবিহিত করা হয়েছে।
 
এমনকি হাদিসসমূহ থেকে তো দেখা যায়, মদিনায় ‘ক্বিতাল’ (সমর জিহাদ) ফরয বিষয়ক আয়াত নাজিল হওয়ার পরও ইসলামের দুশমন কাফের-মুশরেকদের শিরক ও কুফরের বিরোধীতাকরন ও জবাব দানকে রাসুলুল্লাহ ﷺ ‘জিহাদ’ হিসেবে অবিহিত করেছেন।
 
যেমন, কা’ব বিন মালেক রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন:يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا تَرَى فِي الشَّعْرَ؟ قال: إِنَّ الْمُؤْمِنَ يُجَاهِدُ بِسَيْفِهِ وَلِسَانِهِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَكَأَنَّمَا تَنْضَحُونَهُمْ بِالنَّبْلِ . أخرجه أحمد في مسنده : ١٥٧٨٥ و ٢٧١٧٤ و صححه شعيب الأرناؤوط ; و ابن حبان في صحيحه : ٤٧٠٧ و ٥٧٨٦ و صححه شعيب الأرناؤوط ; و عبد الرزاق في مسنفه : ٢٠٥٠٠ ، و البخاري في التاريخ الكبير : ٥/٣٠٤ ; و البيهقي في السنن الكبرى : ١٠/٢٣٩ ; و الطبراني في المعجم الأوسط : ١/٢٠٨ ; و صححه الألباني في السلسلة الصحيحة : ١٦٣١ – “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কবিতা সম্পর্কে কী বলেন’? তিনি বললেন: ‘নিশ্চই মুমিন জিহাদ করে তার তরবারী (অস্ত্র) দিয়ে এবং ও তার জবান (দিয়ে)। ওই সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, (কোনো কোনো কবিতা কখনো কখনো) ঠিক যেন তাদেরকে তীর দিয়ে নিক্ষেপ করা(র মতো কাজে দেয়)[মুসনাদে আহমদ- ৬/৩৮৭, ৩/৪৫৬; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৪৭০৭, ৫৭৮৬; আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস ২০৫০০; আল-মু’জামুল কাবির, ত্বাবরাণী- ১৯/৭৫ হাদিস ১০১; আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী- ১/২০৮; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ১০/২৩৯; তারিখে কাবির, ইমাম বুখারী- ৫/৩০৪; আল-জিহাদ, ইবনু আবি আসেম- ১/১৭৭; মুসনাদে শিহাব– ২/১৩৫ হাদিস ১০৪৭] 
 
এই হাদিসে-তো কাফেরদের ‘ইসলাম বিরোধী জবান চালনা’র প্রতিবাদে ‘(ইমানদীপ্ত) কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে জবানী জবাব দান’কেও জিহাদ বলা হয়েছে। বরং, কোনো কোনো ইমানদীপ্ত কবিতাকে-তো দুশমনকে উদ্দেশ্য করে তীর নিক্ষেপের মতো কার্যকর মাধ্যম বলেও অবিহিত করতে দেখা যাচ্ছে। বারা বিন আযেব রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- قَالَ رَسولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ يَومَ قُرَيْظَةَ لِحَسَّانَ بنِ ثَابِتٍ: اهْجُ المُشْرِكِينَ، فإنَّ جِبْرِيلَ معكَ . متفق عليه ، رواه البخاري في صحيحه : ٤١٢٣ ، و مسلم في فضائل الصحابة : ٢٤٨٦، و أحمد في المسنده : ١٨٦٥٠- “রাসুলুল্লাহ ﷺ কুরাইযার দিনে (সাহাবী কবি) হাসসান বিন সাবেতকে বললেন: ‘(তুমি তোমার কবিতার দ্বারা) মুশরেকদের (কথার প্রতিবাদী) জবাব দাও। নিশ্চই জিবরীল তোমার সাথে আছে”। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৪১২৩, সহিহ মুসলীম, হাদিস ২৪৮৬; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১৮৬৫০]
 
এমনি ভাবে, জীবন চলে যেতে পারে -এমন ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তেও জালেম/অন্যায়কারী শাসকের মুখের উপরে- ‘তুমি আল্লাহ তাআলা’র আইনে একজন জালেম/অন্যায়কারী’ -এই ধরনের হক্ব কথাকে সাহসের সাথে বলে দেয়াকে সর্বোত্তম জিহাদ বলে অবিহিত করা হয়েছে।
 
তারিক বিন শিহাব থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ وَضَعَ رِجْلَهُ فِي الْغَرْزِ، أَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ. رواه النسائي في سننه, كتاب البيعة, فضل من تكلم بالحق عند إمام جائر, حديث رقم ٤٢٠٩, و قال المنذري في الترغيب : إسناده صحيح , وقاله النووي فى رياض الصالحين: رواه النسائي بإسناد صحيح , و صححه الألباني فى سنن النسائي و في السلسلة الصحيحة: ١/٨٨٦ رقم ٤٩١ ; و أحمد في مسنده : ٤/٣١٤ رقم ; و الطبراني فى المعجم الكبير: ٨/٣٣٨ رقم ٨٠٨٠ ; و الحاكم: ٤/٥٠٥; و الحميدي في مسنده: ٧٥٢; و الترمذي في سننه: ٢١٧٤; و ابو داود في سننه: رقم ٤٣٤٤ – “রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর (এক) পা (বাহনের) জিন/পা’দানীর মধ্যে রেখেছেন -এমতাবস্থায় এক ব্যাক্তি জিজ্ঞেস করলো: (ইয়া রাসুলাল্লাহ!) কোন জিহাদ সর্বত্তম। তিনি বললেন: ‘অন্যায়কারী সুলতান (খলিফা/আমীর/রাষ্ট্রপ্রধান)-এর কাছে কালেমায়ে-হক্ব (পেশ করা)’। [সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪২০৯; মুসনাদে আহমদ- ৪/৩১৪ হাদিস ১৮৮৪৭, ১৮৮৫০; আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরাণী- ৮/৩৩৮ হাদিস ৮০৮১; মুসতাদরাকে হাকিম- ৪/৫০৫; মুসনাদে হুমাইদী, হাদিস ৭৫২; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২১৭৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৪৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০১২; শুআবুল ইমান, বাইহাকী- ২/৪১৮] 
 
(৩) ‘জিহাদ’ শব্দটি নারীদের ‘হজ্জ ও উমরাহ’ করার অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে: নারীদের উপরে যেহেতু বাড়িতে অবস্থান করার হুকুম রয়েছে এবং সমর যুদ্ধ যেহেতু গৃহের বাহিরের একটি কাজ, তদুপরি নারীদেরকে বাড়ির ভিতরে ও বাহিরে শরয়ী পর্দার ব্যাপারে যত্নবান থাকার হুকুম করা হয়েছে, তাই জিহাদের মত ‘ফরয’ কাজটিকেও নারী জাতির দায়িত্ব থেকে বাহিরে রাখাকে সার্বিক ভাবে নিরাপদ ও কাম্য মনে করা হয়েছে এবং তদস্থলে পুরুষদের উপরে ক্বিতাল (সমর জিহাদ)-এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে (যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে)। নিম্নোক্ত এসকল রেওয়ায়েতে ‘নারীদের হজ্জ ও উমরাহ’কে তাদের ‘জিহাদ’ বলে অবিহিত করা হয়েছে। 
 
যেমন, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম- يَا رَسُولَ اللَّهِ ، نَرَى الجِهَادَ أَفْضَلَ العَمَلِ ، أَفَلاَ نُجَاهِدُ ؟ قَالَ : لاَ ، لَكِنَّ أَفْضَلَ الجِهَادِ حَجٌّ مَبْرُورٌ . رواه البخاري في صحيحه , كتاب الحج , باب فضل الحج المبرور: رقم ١٥٢٠  – “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা দেখছি জিহাদ হল সর্বোত্তম আমল। তাহলে আমরা (নারীরা) কি জিহাদ করবো না’? তিনি বললেন: ‘না। (তোমাদের নারীদের জন্য সমর জিহাদ নয়)। তবে (নারীদের জন্য) সর্বোত্তম জিহাদ হল হজ্জে-মাবরুর (কবুলযোগ্য হজ্জ)”। [সহিহ বুখারী, হাদিস ১৫২০]
 
আরেক রেওয়ায়েতে এসেছে, আয়েশা রা. বলেন- قُلْتُ: يا رسولَ اللهِ على النِّساءِ جهَادٌ؟ قال: نَعَمْ عَليهنَّ جهادٌ لا قتالَ فيه : الحجُّ والعُمرةُ . أخرجه ابن ماجه في سننه , كتاب المناسك , باب الحج جهاد النساء : رقم ٢٩٠١ ; و أحمد في مسنده : ٦/١٦٥ ; و ابن خزيمة في صحيحه , كتاب المناسك , باب الدليل على أن جهاد النساء الحج و العمرة : رقم ٣٠٧٣ ; و ابن حبان في صحيحه: رقم ٣٧٠٢ ; و الدار قطني في سننه: ٣/٣٤٥ ; صححه النووي في المجموع شرح المهذب : ٤/٧ , و ابن القيم في تهذيب السنن : ٥/٢٤٩ , و ابن الملقن في البدر المنير: ٩/٣٦ و في تحفة المحتاج : ٢/١٢٦ , و ابن كثير في إرشاد الفقيه : ١/٣٠٠ ; و الالباني في صحيح سنن ابن ماجه : ٣/١٠ و في الإرواء : ٩٨١   – “আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! নারীদের উপরে কি জিহাদ নেই? তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ (আছে)। তাদের উপরে এমন জিহাদ আছে যার মধ্যে কোনো যুদ্ধ নেই। (আর তা হল) হজ্জ ও উমরাহ”। [সুনানে ইবনে মাজাহ- ২/৯৬৮ হাদিস ২৯০১; মুসনাদে আহমদ- ৬/১৬৫; সহিহ ইবনে খুযাইমাহ, হাদিস ৩০৭৩; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৩৭০২; সুনানে দ্বারাকুতনী– ৩/৩৪৫; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৩/৩২৬; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ- ৮/২৮ হাদিস ১২৭৯৮]
 
হুসাইন বিন আলী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنِّي جَبَانٌ وَإِنِّي ضَعِيفٌ، قَالَ: هَلُمَّ إِلَى جِهَادٍ لَا شَوْكَةَ فِيهِ، الحَجُّ . أخرجه الطبراني في المعجم الكبير: ٣/١٣٥ رقم ٢٩١٠، قال ابن الملقن في البدر المنير في تخريج احاديث الشرح الكبير, كتاب السير: ٧/٥٢ : اسناده جيد، و صحَّحه الألباني في الإرواء : ٤/١٥٢، أخرجه عبد الرزاق أيضا وغيرهم  – “(একবার) এক ব্যাক্তি নবী ﷺ–এর কাছে এসে বললো: আমি একজন ভরিু ও দূর্বল ব্যাক্তি। (তাহলে) আমি (তোমাকে এমন) জিহাদের কথা জানাই যার মধ্যে কোনো ‘শাওকাত’ (অস্ত্র/ভয়ভীতি/সাহসীকতা প্রদর্শনী/আঘাত/জখম) নেই। (আর সেটা হল) হজ্জ”। [আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরাণী- ৩/১৩৫ হাদিস ২৯১০; আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী, হাদিস ৪২৯৯; আল-মুসান্নাফ, ইমাম অব্দুর রাজ্জাক, হাদিস ৮৮০৯, ৯২৮৩; সুনানে সাঈদ বিন মানসুর, হাদিস ২৩৪২; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৩/২০৬; তালখিসুল হাবীর, ইবনে হাজার- ৪/১৭১]
 
আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- جِهَادُ الْكَبِيرِ وَالضَّعِيفِ وَالْمَرْأَةِ، الْحَجُّ وَالْعُمْرَةُ . رواه النسائي في سننه , كتاب الحج ، باب فضل الحج : ٥/١١٤ رقم ٢٦٢٦ ، حَسّن المُنذري إسناده في الترغيب والترهيب : ٢/١٠٩ ; و قال الإمام بدر الدين العيني في عمدة القاري : ٩/١٩٣ : بسند لا باس به , و قال الحافظ ابن حجر في موافقة الخبر الخبر:٢/٣٠ : إسناده صحيح مرفوعاً ، قال ابن الملقن في البدر المنير في تخريج احاديث الشرح الكبير, كتاب السير: ٧/٥٣ : اسناده حسن، و اخرجه ايضا أحمد في مسنده : ١٠/٢٧٢ رقم ٩٤٥٩ ; و الطبراني في الاوسط : ٦/٢٧٢ رقم ٨٧٥١ ; و البيهقي في سننه : ٤/٣٠٠ و ٩/٢٣  – “বৃদ্ধ, দূর্বল এবং নারী’র জিহাদ হল হজ্জ ও উমরাহ”। [সুনানে নাসায়ী,- ৫/১১৪ হাদিস ২৬২৬; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী– ৪/৩০০, ৯/২৩; আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী- ৬/২৭২ হাদিস ৮৭৫১; মুসনাদে আহমদ- ১০/২৭২ হাদিস ৯৪৫৯ ] 
 
(৪) ‘জিহাদ’ শব্দটি পিতা-মাতার অনুগত্য ও খেদমত করা অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে:  ‘ক্বিতাল’ যখন কারোর উপরে ‘ফরযে কিফায়া’ হয়, তখন তার জন্য প্রথমে পিতামাতার অনুমতি নেয়া জরুরী।

যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- جَاءَ رَجُلٌ إلى النبيِّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ، فَاسْتَأْذَنَهُ في الجِهَادِ، فَقَالَ: أحَيٌّ والِدَاكَ؟، قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَفِيهِما فَجَاهِدْ . رواه البخاري في صحيحه , كتاب الجهاد والسير: ٣٠٠٤ ، و مسلم في صحيحه , كتاب الجهاد والسير: رقم ٢٥٤٩، و ابن حبان في صحيحه : ٢/٢٢، و غيرهم ايضا – “(একবার) এক ব্যাক্তি নবী ﷺ-এর কাছে এসে তাঁর কাছে জিহাদে শরিক হওয়ার অনুমতি চাইলো। তখন তিনি বললেন: ‘তোমার পিতামাতা কি জীবিত আছেন’? সে বললো: ‘জি (জীবিত আছেন)’। নবী ﷺ বললেন: ‘তাহলে (যাও,) তাদের দুজনের মাঝেই জিহাদ করো”। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ২৫৪৯; সহিহ বুখারী, হাদিস ৩০০৪, ৫৯৭২; সহিহ ইবনে হিব্বান- ২/২২; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ১৬৭১; সুনানে আবু দাউদ- ৩/১৭; মুসনাদে আহমদ- ২/১৬৫; মুসনাদে হুমাইদী- ২/২৬৭] 

উপরোক্ত হাদিসের ওই ব্যাক্তি যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে ক্বিতালে শরিক হওয়ার অনুমতি চেয়েছিল, তখন তার উপরে ক্বিতাল করা ‘ফরযে আইন’ ছিল না, বরং ছিল ‘ফরযে কিফায়া’ (যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে)। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে তার উপরে শরীয়তের বড় ফরয হুকুম তথা ‘পিতা মাতার খিদমত’-এ নিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন: فَفِيهِما فَجَاهِدْ  – ‘তাহলে (যাও,) তাদের দুজনের মাঝেই জিহাদ করো’। অর্থাৎ তোমার এখন বড় জিহাদ হল ‘তোমার পিতামাতার খেদমত’। 

(৫)  ‘জিহাদ’ শব্দটি জোরাজুরি বা জোরজবরদস্তি করা অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে: কিছু করতে জোরাজুরি করা, চাপ দেয়া, জোরজবরদস্তি করা ইত্যাদি অর্থেও জিহাদ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

 
যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেছেন- وَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا“আর আমরা মানুষকে তাকিদ করেছি তার পিতামাতার (হক্বের) ব্যাপারে (সজাগ থাকার জন্য)। তাকে তার মা কষ্টের উপরে কষ্ট (নিয়ে) তাকে পেটে ধারন করেছিল এবং দু’ বছরের মধ্যে তার দুধ ছাড়ানোর (বিষয়টি বিবেচিত ছিল)। (এজন্যই আমরা অসিয়ত করেছি) যে, আমার শুকুর এবং (শুকুর করো) তোমার পিতামাতার। (আর পরিশেষে) প্রত্যাবর্তন (করতে হবে) আমারই (দিকে)। (সুতরাং, আমার সাথে প্রকাশ্য শিরক করা থেকে তো বিরত থাকবেই), আর তারা যদি আমার সাথে (এমন কিছুকে) শরীক করানোর জন্য তোমার সাথে জিহাদ (জোরজবরদস্তি) করে, যে ব্যাপারে তোমার কোনো ইলম নেই, তাহলে তুমি তাদের দুজনের অনুগত্য করো না”। [সূরা লুকমান ১৪, ১৫]
 
(৬)  ‘জিহাদ’ শব্দটি নফস/কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে চলা অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে: ব্যাক্তির ‘নফস’ (কৃপ্রবৃত্তি) যে সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার নাফরমানী ও পাপের দিকে ধাবিত করতে উদ্দত হয়, সে সকল ক্ষেত্রে নফসের সাথে যুদ্ধ করে সেটাকে আল্লাহ তাআলা’র হুকুমের অনুগামী করে রাখার শরীয়তসম্মত সার্বিক  প্রচেষ্টা ও সংগ্রামকে কুরআন-হাদিসে ‘জিহাদ/মুজাহাদা’ হিসেবে অবিহিত করা হয়েছে। 
 
যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেছেন- وَمَن جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ – “আর যে জিহাদ (মুজাহাদা/চেষ্টা-সংগ্রাম) করে, সে মূলত: জিহাদ করে তার নিজের (আখেরাতের কল্যানের) জন্যই। নিশ্চই আল্লাহ বিশ্বসৃষ্টি থেকে অমুকাপেক্ষি”। [সুরা আনকাবুত ৬আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন- وَ الَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَ إِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ – “আর যারা আমাদের পথে জিহাদ (মুজাহাদা/চেষ্টা-সংগ্রাম) করে, আমরা অবশ্যই তাদেরকে আমাদের হেদায়েতের রাস্তা প্রদর্শন করবো। আর নিশ্চই আল্লাহ মুহসিন (নেককার পরহেজগার)দের সাথে আছেন”। [সুরা আনকাবুত ৬৯]
 
এই দুই আয়াতে ‘জিহাদ’ বলতে আল্লাহ’র রাজিখুশির জন্য দ্বীনের পথে ‘শসস্ত্র জিহাদ’ এবং ‘নফস ও শয়তানের সাথে জিহাদ’ -সবই শামিল রয়েছে। [মায়ালীমুত তানজিল, ইমাম বগভী- ৬/২৩৩; জামেউ লি-আহকামিল কুরআন, কুরতুবী- ৭/২৪২; তাইসিরুল কারীম, সা’দী- ১/৬২৬; ফাতহুল বায়ান– ৫/২৫৬; রুহুল মায়ানী, আলুসী- ২১/১৪]
 
যেমন, ফাজালাহ বিন উবায়েদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেনالْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ فِي طَاعَةِ اللهِ . أحمد في مسنده : رقم ٢٣٩٥٨، وابن حبان في صحيحه : رقم ٤٨٦٢، و الطبراني في المعجم الكبير : رقم ٧٩٦ ، و الحاكم في المستدرك : رقم ٢٤ و صحيحه ، و ابن المبارك في الزهد : رقم ٨٢٦ ، و النسائي في السنن الكبرى : رقم ١١٧٩٤ ، و البيهقي في الشعب : رقم ١٠٦١١ ، صححه الألباني في الصحيحة : رقم ٥٤٩ – “মুজাহিদ হল (সে), যে আল্লাহ’র অনুগত্যে(র পথে) জিহাদ করে”। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৩৯৫৮; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৪৮৬২; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস ২৪; আল-মুজামুল কাবিীর, ত্বাবরাণী, হাদিস ৭৯৬; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২৪৫৯; সুনানুল কুবরা, নাসায়ী, হাদিস ১১৭৯৪; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী, হাদিস ১০৬১১; আয-যুহদ, ইবনে মুবারক, হাদিস ৮২৬] 

আবু যর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এরশাদ করেছেনسَأَلْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ ؟ قَالَ : أَنْ تُجَاهِدَ نَفْسَكَ وَهَوَاكَ فِي ذَاتِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ . رواه أبو نعيم في حلية الأولياء : ٢/٢٤٩ ، و صححه الألباني في صحيح الجامع : رقم ١٠٩٩ و في في الصحيحة : رقم ١٤٩٦ – “রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হল: ‘কোন্ জিহাদ আফজল (উত্তম)’? তিনি বললেন: ‘ তুমি আল্লাহ আযযা ও যাল্লা’র জন্য জিহাদ করবে তোমার ‘নফস’ (কুপ্রবৃত্তি) ও ‘হওয়া’ (স্বেচ্ছাচারিতা)-এর বিরুদ্ধে”। [হিলইয়াতুল আউলিয়াহ, ইমাম আবু নুআইম- ২/২৪৯; সহিহাহ] 

উপরে আলোচিত অস্ত্রের জিহাদ, জবানের জিহাদ, অন্তরের জিহাদ -এজাতীয় সকল প্রকারের জিহাদের মধ্যে নফসের জিহাদের আমল শামিল রয়েছে। কিভাবে?

(১-ক) ইসলামী শরীয়ত মতে যখন কারোর উপরে ক্বিতাল (সমর জিহাদ) ফরয হয়, তখন ব্যাক্তির ‘নফস’ (কৃপ্রবৃত্তি) তাকে স্ত্রী-সন্তান পরিবার পরিজনের মহব্বত, ধ্বনসম্পদের মহব্বত, জায়গা-জমিন ও ঘরবাড়ির মহব্বত, আরাম-আয়েশে নির্বিঘ্নে-নিশ্চিন্তে জীবন কাটানোর মনবাসনা ইত্যাদি নফসানী খাহেশগুলোকে উসকে দিয়ে তাকে আল্লাহ’র রাস্তায় বের হওয়ার পথে বারবার বিভিন্ন অযুহাতে বাঁধা দিতে থাকে। এমতাবস্থায় ওই ব্যাক্তিকে সশস্ত্র জিহাদের আগে তার নফসের সাথে লড়াই করে নফসকে প্রথমে কাবু করে নিতে হয়। নফসের সাথে এই জিহাদে হেরে গেলে কেউ সশস্ত্র জিহাদে বের হতে পারে না।

(১-খ) সশস্ত্র জিহাদ শুরু করার আগে, জিহাদ চলাকালে এবং জিহাদের ঠিক পরেও ‘নফস’ (কৃপ্রবৃত্তি)’র বহু খাহেশের গলা দাবিয়ে রেখে সেটাকে আল্লাহ’র হুকুমের অধীনে রাখতে হয়। যেমন: সশস্ত্র জিহাদের বের হওয়া থেকে শুরু করে জিহাদ শেষ করা পর্যন্ত নিয়তের মধ্যে ইখলাস (খাঁটিত্ব) থাকা ফরয, অন্যথায় দুনিয়ার কোনো স্বার্থে (যেমন: লোকজনের প্রশংসা বা অর্থসম্পদ বা নারী লাভ করা, আল্লাহ’র দ্বীনকে উঁচু করার জন্য না হয়ে দেশপ্রীতি জাতিপ্রীতি ইত্যাদি স্বার্থে) হলে দোযখের জ্বালানী হতে হবে। বিশেষ করে জিহাদের মাঠ থেকে কোনো মতেই না পালানো, সর্বদা মৃত্যুভীতিকে পরাজিত করতে থাকা, সর্বদা আমীরের অনুগত্য করে চলা, জিহাদে জিহাদ-বহির্ভূত ব্যাক্তিকে হত্যা না করা বা তাদের ধ্বনসম্পদের নাজায়েয ক্ষয়-ক্ষতি না করা, জিহাদ শেষে গণীমতের সম্পদ অত্বসাৎ না করা বা তাতে বে-ইনসাফি না করা ইত্যাদি বিষয়ে সর্বদাই নফসের প্ররোচনার সাথে লড়াই করে সেটাকে আল্লাহ তাআলা’র হুকুমের অনুগামী করে রাখতে হয়। তার মানে সমর জিহাদের আগা গোড়া নফসের জিহাদে ভরপুর। 

(২-ক) ইসলামী শরীয়ত মতে যখন ওই ব্যাক্তির উপরে ক্বিতাল (সমর জিহাদ) ফরয থাকে না, তখনও তাকে তার ব্যাক্তি-জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নফসের মন্দ খাহেশের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করে সেটাকে আল্লাহ তাআলা’র হুকুমের অধীনে কাবু করে রাখতে হয়। যেমন, নফসের বিপরীতে তাকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে জামাআতের সাথে আদায়ের ব্যাপারে পাবন্দি থাকতে হয়, ফরয ইলম অর্জন করতে হয়, শরীয়তের হক্ব অনুসারে ফরয যাকাত ও দান-সদকাহ এবং ফরয সিয়াম ও হজ্জ আদায় করতে হয়, সর্বদা চোখ, মন ও শরীরের বিভিন্কেন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে যথাসাধ্য হারাম ও নাজায়েয জিনিস থেকে ফিরিয়ে রাখতে হয়, হালাল উপার্জনে হাজারো হারাম ও নাজায়েয বিষয়কে বাঁছবিচার করে চলতে হয় ইত্যাদি। এর সবই আগা গোড়া নফসের জিহাদে ভরপুর।   

(২-খ) ইসলামী শরীয়ত মতে যখন ওই ব্যাক্তির উপরে ক্বিতাল (সমর জিহাদ) ফরয থাকে না, তখনও তাকে তার পারিবারিক-জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নফসের মন্দ খাহেশের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করে সেটাকে আল্লাহ তাআলা’র হুকুমের অধীনে কাবু করে রাখতে হয়। যেমন: বৈরাগ্যতা কিংবা অশ্লীলতা থেকে বাঁচার জন্য কুরআন সুন্নাহ’র আওতায় থেকে বিয়ে করা, বিয়ের পর শুধুমাত্র নিজের স্ত্রীকে নিয়ে খুশি থাকা ও পর-নারীর প্রতি আকৃষ্ট না হওয়া, স্ত্রীর হক্ব আদায় করা, সন্তান-সন্ততির হক্ব আদায় করা, সন্তানকে দুনিয়াদার জাহেল না বানিয়ে দ্বীনদার আলেম বানানোর ব্যবস্থায় তৎপর থাকা, মা ও স্ত্রীর মাঝে সাংসারিক মনোমালিন্যতা ও দ্বন্দ্ব সামাল দেয়া, পিতার পক্ষ ও শশুর পক্ষ সামাল দেয়া, একদিকে পরিবারের সাংসারিক চাহিদা মেটানো ও আরেক দিকে হালাল উপার্জনে হাজারো হারাম ও নাজায়েয বিষয়কে বাঁছবিচার করে চলা, আমর বিল মা’রুফ (শরীয়ত সম্মত সৎ কাজের নির্দেশ) ও নাহি আনিল মুনকার (শরীয়থ বিরোধী কাজের নিষেধ/বাঁধা দান) করা ইত্যাদি একেকটা-তো মস্তোবড় সংগ্রাম বলতে হয়। বিশেষ করে পরিবার যখন শরীয়ত বিরোধী মনমানুসিকতার হয়, তখন মুমিনকে কী সংগ্রামটাই না করতে হয়। সুতরাং, পারিবারিক জীবনের আগা গোড়াটাই নফসের জিহাদে ভরপুর।   

(২-গ) ইসলামী শরীয়ত মতে যখন ওই ব্যাক্তির উপরে ক্বিতাল (সমর জিহাদ) ফরয থাকে না, তখনও তাকে তার সামাজিক-জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নফসের মন্দ খাহেশের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করে সেটাকে আল্লাহ তাআলা’র হুকুমের অধীনে কাবু করে রাখতে হয়। যেমন: সমাজের মানুষের মাঝে আমর বিল মা’রুফ (শরীয়ত সম্মত সৎ কাজের নির্দেশ) ও নাহি আনিল মুনকার (শরীয়থ বিরোধী কাজের নিষেধ/বাঁধা দান) করা, ভাল/খারাপ প্রতিবেশির সাথে চলা, সমাজের মানুষজনের সাথে উঠাবসা করা লেনদেন করা, সমাজের প্রথা ও সংষ্কৃতির সাথে তাল মিলানো/না মিলানো, সামাজিক দ্বন্দ্ব-কলহ ইত্যাদি কত ব্যাপারে নফসের বিরুদ্ধে চলতে হয়। বিশেষ করে সমাজ যখন শরীয়ত বিরোধী মনমানুসিকতার হয়, তখন মুমিনকে কী সংগ্রামটাই না করতে হয় সেই সমাজে। কাজেই, সামাজিক জীবনের আগা গোড়াও নফসের জিহাদে ভরপুর।

(২-ঘ) ইসলামী শরীয়ত মতে যখন ওই ব্যাক্তির উপরে ক্বিতাল (সমর জিহাদ) ফরয থাকে না, তখনও তাকে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তার রাষ্ট্রীয়-জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নফসের মন্দ খাহেশের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করে সেটাকে আল্লাহ তাআলা’র হুকুমের অধীনে কাবু করে রাখতে হয়। যেমন: কাফের/ফাজের শাসকের শরীয়ত বিরোধী আইন ও শাসনের প্রশ্নে সাধ্য মতো ‘আমর বিল মা’রুফ (শরীয়ত সম্মত সৎ কাজের নির্দেশ) ও নাহি আনিল মুনকার (শরীয়থ বিরোধী কাজের নিষেধ/বাঁধা দান)’ করা এবং রাষ্ট্রে ইসলামী আইন ও শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করা, রাষ্ট্রীয় বৈধতাপ্রাপ্ত সূদ ঘুষ সহ বিভিন্ন হারাম ও নাজায়েয লেনদেন গুলো থেকে সাধ্য মতো নিজকে বাঁচিয়ে চলা, রাষ্ট্রে হালাল ব্যবসা ও লেনদেন সিস্টেম চালু করার সংগ্রামে রত থাকা, রাষ্ট্রে মন্ত্রী-মিনিষ্টার সংসদ আমলা সহ বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনীক ব্যাক্তিদের সাথে লোনদেন ও উঠাবসা করা, ইনফোর্সমেন্ট ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিজ (যেমন: পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ইত্যাদি) প্রশাসনের অনৈতিক চক্করে পড়া ও তাদের সাথে লেনদেন/মুআমেলা করা, দেশের আদালত ও ওকালতের অনৈতিক চক্করে ঘুরপাক খাওয়া, রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় বা অবহেলায় বেড়ে ওঠা মাস্তান গুন্ডা ছিন্তাইকারী ও গুমকারীদের সাথে পাল্লা দেয়া ইত্যকার কত ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তকে মানতে গিয়ে নফসের বিরুদ্ধে চলতে হয় ! বিশেষ করে রাষ্ট্রযন্ত্রই যখন শরীয়ত বিরোধী চেতনার হয়, তখন মুমিনকে কী সংগ্রামটাই না করতে হয় সেই রাষ্ট্রে। কাজেই, রাষ্ট্রীয় জীবনের আগা গোড়াও নিঃসন্দেহে নফসের জিহাদে ভরপুর। যেমন: হযরত ওমর রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে,  রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إنه تصيب أمتي في آخر الزمان من سلطانهم شدائد لا ينجو منه إلا رجل عرف دين الله فجاهد عليه بلسانه ويده وقلبه فذلك الذي سبقت له السوابق، ورجل عرف دين الله فصدق به، ورجل عرف دين الله فسكت عليه، فإن رأى من يعمل الخير أحبه عليه وإن رأى من يعمل بباطل أبغضه عليه فذلك ينجو على إبطانه كله. رواه أبو نعيم في أخبار أصبهان: ١/٨١ ، والبيهقي في شعب الإيمان: ٦/٩٥ . قال ابن رجب في جامع العلوم والحكم: : غريب وإسناده منقطع: ٢/٢٤٤، وضعفه الألباني في سلسلة الأحاديث الضعيفة: ٦٧٢٥ – ‘শেষ জামানায় আমার উম্মত রাষ্ট্রপ্রধান’দের পক্ষ থেকে কঠিন (ফিতনা ও) মুসিবতের সম্মুখীন হবে। সেই (মুসিবত) থেকে কেউ-ই বাঁচবে না, (বাঁচবে) শুধু (১) ওই ব্যাক্তি, যে আল্লাহ’র দ্বীন’কে (যথার্থ ভাবে) জেনে নিয়েছে, তারপর সেই (ইলমকে সহিহ ভাবে কাজে লাগিয়ে আগত ইসলাম বিরোধী ফিতনা ও মুসিবতের) সাথে জিহাদ করেছে জ্বিহবা দিয়ে, হাত দিয়ে এবং অন্তর দিয়ে। বস্তুত: সে এমন ব্যাক্তি যে (দ্বীনের তাকাযা ও দাবী অনুপাতে) অগ্রগামীতা দেখিয়ে (আল্লাহ’র কাছে) অগ্রগামীতার নজির স্থাপন করলো। (২) ওই ব্যাক্তি, যে  আল্লাহ’র দ্বীন’কে (যথার্থ ভাবে) জেনে নিয়েছে, তারপর (হাত ও শক্তি দিয়ে মুসিবতের সাথে জিহাদ করেনি ইমানী দূর্বলতার কারণে, কিন্তু ইসলাম বিরোধী ফিতনা ও মুসিবতের বিপক্ষে জ্বিহবা দ্বারা) দ্বীনের সত্ত্বায়ন করেছে। (৩) ওই ব্যাক্তি, যে  আল্লাহ’র দ্বীন’কে (যথার্থ ভাবে) জেনে নিয়েছে, কিন্তু (ইসলাম বিরোধী ফিতনা ও মুসিবত দেখেও তার বিপক্ষে হাত ও জ্বিহবা দ্বারা জিহাদ করেনি, বরং) চুপ থেকেছে, (তবে) সে কাউকে (আল্লাহ’র নির্দেশিত) ভাল আমল করতে দেখলে তাকে (দ্বীনের কারণেই) ভালবেসেছে, আর কাউকে (ইসলাম বিরোধী) বাতিল আমল করতে দেখলে তাকে (দ্বীনের কারণেই) ঘৃনা করেছে। এই (শেষোক্ত) ব্যাক্তি (দ্বীনের কারণে কাউকে তার ভালবাসা বা ঘৃনা করার) এসব (কথাকে) তার পেটে (গোপন করে) রাখা সত্ত্বেও (ফিতনা থেকে) বাঁচতে পারবে।’ [আখবার, আবু নুআইম- ১/৮১; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী- ৬/৯৫]  

এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্থান কাল পাত্র ভেদে একজন মুসলমানের মৌলিক ভাবে ৩ প্রকারের দুশমন থাকতে পারে, যাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার শরয়ী নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইমাম রাগেব ইসফাহানী রহ. বলেছেন যে, جِهَادٌ (জিহাদ) তিন প্রকারের। যথা:- (১) مجاهدة العدو الظاهر – (দ্বীনের) প্রকাশ্য দুশমনের সাথে জিহাদ করা, (২) مجاهدة الشيطان – শয়তাদের সাথে জিহাদ করা, (৩) مجاهدة النفس – নিজের নফস/কুপ্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করা। [মুফরাদাতুল কুরআন, ইমাম রাগেব- ২৭১ পৃ:; তাজুল আরুস- ২/৩২৯]
 
ইমাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেছেন-  شرعا بذل الجهد في قتال الكفار، ويطلق أيضا على مجاهدة النفس و الشيطان والفسَّاق. فأما مجاهدة النفس فعلى تعلم أمور الدين ثم على العمل بها ثم على تعليمها، وأما مجاهدة الشيطان فعلى دفع ما يأتي به من الشبهات وما يزينه من الشهوات، و أما مجاهدة الكفار فتقع باليد و المال و اللسان و القلب، و أما مجاهدة الفساق فباليد ثم اللسان ثم القلب – “শরীয়তের পরিভাষায় (‘জিহাদ’ হল) কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে সর্বাত্বক প্রচেষ্টা কাজে লাগানো। অবশ্য (জিহাদ পরিভাষাটি) নফস (কুপ্রবৃত্তি), শয়তান ও ফাসেক লোকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। নফস (কুপ্রবৃত্তি)-এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম হচ্ছে দ্বীনী বিষয়াদির ইলম শিক্ষা করা, তারপর ওর উপরে আমল করা, তারপর তার শিক্ষা দান করা। আর শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হচ্ছে, সে যেসকল সন্দেহ-সংশয় ও বদ-খাহেশাত নিয়ে হাজির হয় তার দিফা (প্রতিরোধ) করা। আর কাফেরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হচ্ছে, হাত/শক্তি, ধ্বনসম্পদ, জবান ও অন্তর দিয়ে সংগ্রাম করা। আর ফাসেক লোকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হচ্ছে, (প্রথমে) হাত/শক্তি দিয়ে, তারপর জবান (দিয়ে), তারপর অন্তর (দিয়ে সংগ্রাম করা)[ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৬/৩] 
 
শরীয়তের পরিভাষায় জিহাদের সংগা: “দ্বীন ইসলামের মূল মিশনকে বাঁধাগ্রস্থ করে –পৃথিবীতে বিরাজমান এমন প্রতিটি দ্বীন (ধর্ম/মতবাদ/মতাদর্শ/ism) ও তাদের কালেমার (স্লোগানের) ফিতনাকে পরাভুত করে তদস্থলে শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলা’র দ্বীন (ইসলাম) ও তাঁর কালেমাকে বিজয়ী বেশে উচ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে মুসলমান কর্তৃক ‘দ্বীনের দুশমনদের (যেমন: কাফের-মুরতাদ, শয়তান, নফসের) বিরুদ্ধে শরয়ী শর্ত মোতাবেক নিজের জীবন, ধ্বনসম্পদ, জবান, মেধা, ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে সাধ্য মতো সার্বিক প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম করাকে ‘জিহাদ’ বলা হয়ে থাকে
 
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেল, শরীয়তের পরিভাষাগত দিকে থেকে الْقِتَالُ (ক্বিতাল/সমর যুদ্ধ) শব্দটির চাইতে الجِهَادُ (জিহাদ) শব্দটি আরো ব্যাপক ও প্রশস্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কারণ, শরীয়তের স্বাভাবিক পরিভায়ায় الْقِتَالُ (ক্বিতাল) কথাটি বিশেষ ভাবে শুধু সশস্ত্র যুদ্ধকে বুঝায়, অপরদিকে الجِهَادُ (জিহাদ) বলতে الْقِتَالُ (ক্বিতাল/সশস্ত্র যুদ্ধ)ও উদ্দেশ্য হতে পারে, আবার জবান, ধ্বনসম্পদ, মেধা, ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে আল্লাহ’র কালেমা ও দ্বীনকে সমুন্নত করায় নিয়োজিত শরীয়ত সম্মত সকল চেষ্টা- প্রচেষ্টাও উদ্দেশ্য হতে পাারে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রত্যেক الْقِتَالُ (ক্বিতাল/সমর যুদ্ধ)ই الجِهَادُ (জিহাদ)-এর মধ্যে শামিল, কিন্তু প্রত্যেক প্রকার الجِهَادُ (জিহাদ)ই الْقِتَالُ (ক্বিতাল/সমর যুদ্ধ) নাও হতে পারে। [ফিকহুজ জিহাদ, কারজাভী- ১/৪২] তবে, হাদিস ও আছার সমূহ থেকে অনুমিত হয় যে, ‘ক্বিতাল’ বা ‘জিহাদ’ কিংবা ‘গাজওয়া’ বলতে সাধারণত: ‘শসস্ত্র যুদ্ধ’কেই উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে -যাবৎ না তাতে বিশেষ অর্থ নেয়ার ইংগীত থাকে। 
 
 
 
আলোচনার বাকি অংশের জন্য ক্লিক করুন: [পৃষ্ঠা ১][পৃষ্ঠা ২][পৃষ্ঠা ৩,  … (অসম্পূর্ণ  ও অসমাপ্ত)