সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ -কেনো ইসলাম বিরোধী কুফরী ফিতনা ?

Spread the love
image_pdfimage_print

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা সেকুলারিজম -কেনো একটি ইসলাম বিরোধী মতবাদ ও কুফরী  ফিতনা  ?

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و كفى و سلام على عباده الذين اصطفى

 

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি ইসলাম বিরোধী কুফরী ফিতনা secularismধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কথাটি বুঝাতে আরবীতে পরিভাষা হিসেবে عَلمانية (অালমানিয়্যাহ)  এবং ইংরেজীতে Secularism (সেকুলারিজম) শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

যারা কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে ‘দ্বীন ইসলামে’র পরিচয়  লাভ করেছেন এবং আল্লাহ তাআলা কী উদ্দেশ্যে সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ -এর উপর ‘ইসলামী শরীয়ত’ নাজিল করেছেন তা অবগত আছেন, আর একই সাথে যারা  ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’-এর মূল বৈশিষ্ট সম্পর্কে অবগত, তাদের কাছে একথা সূর্যের আলোর মতোই পরিষ্কার যে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ আপাদমস্তক একটি খাঁটি ইসলাম-বিরোধী পথভ্রষ্ঠ কুফরী মতবাদকারণ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে ইসলামের আগমনকে পুরাপুরি অস্বীকার করে এবং যে ব্যাক্তি এই অস্বীকার করায় বিশ্বাসী নয় সে ধর্মনিরপেক্ষতাবদের দৃষ্টিতে আদপে কোনো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই নয়।কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হওয়ার পূর্বশর্তই হল ‘রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে কোনো ধর্মের আগমনকে পুরাপুরি অস্বীকার করা; অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বলতে যা বুঝায় তা কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোকে পরিচালিত হতে পারবে না’। আর একথা কোন্ মুসলমান না জানে যে, দ্বীন ইসলামে কুরআন-সুন্নাহ’য় প্রমাণিত যে কোনো শরয়ী একটি আইন বা বিধানকেও যদি কেউ অস্বীকার করে বা বাদ দেয়ায় বিশ্বাস করে, সে সর্বোসম্মতিক্রমে কাফের হয়ে যায়। সেখানে কোন্ যুক্তিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত কুরআন-সুন্নাহ’য় প্রমাণিত যাবতীয় আইন ও বিধানকে অস্বীকার করলে বা বাদ দেয়ায় বিশ্বাস করলে সে কাফের হয়ে যাবে না?! অবশ্যই কাফের হবে এবং পূর্বাপর সকল নির্ভরযোগ্য ওলামায়ে কেরামের সর্বম্মতিক্রমে এরকম আকীদায় বিশ্বাসী ব্যাক্তি -কাফের।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ মুসলমান বলে দাবীদার পৃথিবীর অধিকাংশ ইনসান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’-কে তাদের মৌলিক বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থা হিসেবে অত্যন্ত গর্বভোরে গ্রহন করে নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অনেকে নির্লজ্জ্বের মতো একথাও বলে থাকে যে ‘ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষতা-ই শিক্ষা দেয়’ ! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাযিউন।

এদিকে যারাও-বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ-কে আখেরী জামানার একটি ভয়ঙ্কর ইসলাম বিরোধী কুফরী ফিতনা হিসেবে বিশ্বাস করেন, তাদেরর কাছে কেউ যদি প্রশ্ন করে বসে যে – ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’  কেনো  ইসলাম বিরোধী কুফরী মতবাদ ?’, তখন তারা যে জবাব দেন, তাতে সত্যপিপাসু ব্যাক্তিরা একটা ধারনা লাভ করেন বটে, কিন্তু তা থেকে দ্বীন ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ-এর মূল বৈশিষ্টটা যেমন আলাদা আলাদা করে ভালভাবে ফুটে ওঠে না, তেমনি এ দু’য়ের মধ্যে আগা-গোড়া কী কী অতিব উল্লেখযোগ্য ভংঙ্কর পার্থক্য রয়েছে এবং কী কী কারণে আমরা বলে থাকি যে, কেয়ামত পর্যন্ত ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ-এর মধ্যে একটি স্থায়ী দা-কুমড়া স্বতীনী সম্পর্ক থাকতে বাধ্য – তাও পরিষ্কার হয়ে ওঠেনা। তাছাড়া আক্ষেপের বিষয় হল, লাইব্রেরী ও দোকানগুলোতে অগণিত ভিন্ন ভিন্ন লেখকের  লিখিত দৈনন্দিন মাসলা-মাসায়েল, তাবিজ-কবজ আর অযিফা-আমলের যত বই পাবেন, তার শতকরা ০.০১ ভাগো এমন কোনো বই-এর সন্ধান পাবেন না, যা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম-এর মতো ইমান বিনষ্টকারী নাজুক কুফরী মতবাদ গুলোর যথার্থ পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। আর যাও-বা শতকরা ০.০১ ভাগো বই-এ এসব বিষয়ে কোনো আলোচনা পাবেন, তাতে পরিষ্কার করে খুলে খুলে বোঝানো হয়নি যে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কী কী কারণে ‘একটি ভয়ঙ্কর পথভ্রষ্ঠ ইসলাম বিরোধী কুফরী মতবাদ’। তদুপরি মুসলমানদের ইমানী দুরাবস্থা আজ এই মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে যে, তাদের মাঝে ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ-এর মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করে ইমান বাঁচনোরও কোনো গরজ নেই।

উপরোক্ত এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে চিন্তা করে দেখলাম, এমনিতেই অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে, আরো দেরি করলে আল্লাহ’র কাছে জবাব দেয়ার কি বাকি থাকবে। নিজের জ্ঞান ও যোগ্যতার দৌড় সম্পর্কে পুরাপুরি উপলব্ধি থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ’র উপর ভরসা করে এই বিষয়ে যথাসম্ভব বিস্তারিত আলোচনা পেশ করার নিয়ত করেছি। وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ

কোনো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আদপে একটি ইসলামী আকীদা বিরোধী পথভ্রষ্ঠ কুফরী ফেতনা, কোনো এতে বিশ্বাসী ও অনুসারীরা পথভ্রষ্ঠ  কাফের-  তা বোঝার আগে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বলতে বাস্তবে কী বোঝাতে চায় তা জানা অতীব জরুরী।

 ১) অক্সফোর্ড অভিধানে বলা হয়েছে-

  • Secularism-(refers to)- the belief that the religion should not be involved in the organization of society, education etc. [অর্থ্ঃ- সেকুলারিজম ( তথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ অর্থ) এই কথা বিশ্বাস করা যে, কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির মধ্যে ধর্মকে জড়ানো অনুচিৎ]।
  • Secularization-(refers to)- the process of removing the influence or power that religion has over sth [অর্থ্ঃ- ধর্মনিরপেক্ষকরণ (সেকুলারাইজেশন )হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা -কোনো কিছুর উপর ধর্মের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি বা ক্ষমতা-শক্তি রয়েছে -তাকে ক্রমাহ্নয়ে দূরীভূত করে দেয়]। [দেখুন: Oxford Advanced Learner’s Dictionary: 1371 p, Seventh Edition; সূত্র:-অক্সফোর্ড এ্যডভান্স লারনার্স ডিকশনারী- ১৩৭১ পৃষ্ঠা, ৭ম সংস্করন]

২) যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ন্যশনাল সেকুলার সো্সাইটি (জাতীয় ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ) লিখেছে-

  • The National Secular Society campaigns for the separation of religion and state and promotes secularism as the best means to create a society in which people of all religions or none can live together fairly and cohesively. The NSS sees secularism — the position that the state should be separate from religion — as an essential element in promoting equality between all citizens. [অর্থ- ‘ন্যাশনাল সেকুলার সোসাইটি’র সংগ্রাম হল ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজনের সংগ্রাম। এ সোসাইটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে সমাজ গঠনের এমন সর্বোৎকৃষ্ট একটি মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরতে চায়, যে সমাজে সকল ধর্মের মানুষ অথবা যে মানুষগুলি কোনো ধর্ম মানে না তারা সবাই মিলে সুচারু রুপে এবং পারষ্পরিক সহযোগীতামূলক ভাবে একই সাথে বসবাস করতে পারে। ‘ন্যাশনাল সেকুলার সোসাইটি’ মনে করে-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ তথা ‘রাষ্ট্র থেকে  ধর্মকে আলাদা রাখা বাঞ্চনিয়’ -এই অবস্থানটি সকল জনগণের মাঝে সাম্যতা সৃষ্টির একটি অত্যাবশ্যক হাতিয়ার] [দেখুন:- http://www.secularism.org.uk/about.html]
  • The separation of religion and state is the foundation of secularism. It ensures that religious groups don’t interfere in affairs of state, and makes sure the state doesn’t interfere in religious affairs. [অর্থ:-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূল ভিত্তি হল  ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজন। ধর্মের অনুসারীরা যাতে রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে এবং কোনো রাষ্ট্র যাতে ধর্মীয় বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে- ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সে বিষয়টিকে নিশ্চিত করে’। [দেখুন: http://www.secularism.org.uk/what-is-secularism.html]

৩) বিশ্বকোষ উইকিপেডিয়া-তে ফিল্ডম্যান এর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে এভাবে In political terms, secularism is a movement towards the separation of religion and government (often termed the separation of church and state). This can refer to reducing ties between a government and a state religion, replacing laws based on scripture (such as the Torah and Sharia law) with civil laws, and eliminating discrimination on the basis of religion. This is said to add to democracy by protecting the rights of religious minorities. [রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হল ধর্ম ও সরকারের মাঝে বিভাজন সৃষ্টির নিমিত্তে পরিচালিত একটি সংগ্রাম (যেটাকে প্রায়ই ‘গির্জা ও রাষ্ট্রে’র মাঝে বিভাজন’ বলে সম্মোধন করা হয়ে থাকে)। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে এভাবেও বলা যায় যে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা সরকার এবং একটি রাষ্ট্রধর্মের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধনের মাঝে হ্রাস ঘটায়; সে এটি ঘটায় ধর্মীয় গ্রন্থনির্ভর আইনের (যেমনঃ তৌরাত ও শরীয়াহ আইনের) পরিবর্তে  রাষ্ট্রের  সাধারণ আইন প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এবং ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট পক্ষপাতিত্বকে দূরীভূত করণের মাধ্যমে।  বলা হয় যে  এটি (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ) গণতন্ত্রের মধ্যে একটি মাত্রা সৃষ্টি করেছে  –ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষনের মাধ্যমে । [ডিভাইডেড বাই গড, ফিন্ডম্যান, নোয়াহ (২০০৫); ফ্যারার, সট্রয়াস এন্ড জিরোআক্সঃ ১৪পৃষ্ঠা; দেখুন:- http://en.wikipedia.org/wiki/Secularism]

(৪) বাংলা উইকিপিডিয়া-তে বলা হয়েছে- “ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (ইংরেজি: Secularism) বলতে কিছু নির্দিষ্ট প্রথা বা প্রতিষ্ঠানকে ধর্ম বা ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে থেকে পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়। এক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় স্বাধীনতাকে প্রকাশ করে। এই মতবাদ অনুযায়ী, সরকার কোনরূপ ধর্মীয় হস্তক্ষেপ করবে না, কোন ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হবে না এবং কোন ধর্মকে কোন প্রকার অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করবে না। ধর্মনরপেক্ষতাবাদ সেই বিশ্বাসকে ধারণ করে যাতে বলা হয় মানুষের কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধান্তগুলো, বিশেষত রাজনীতিক সিদ্ধান্তগুলো, তথ্য এবং প্রমাণের উপর নির্ভর করবে, কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নয়। অর্থাৎ বলা যায়, “ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার”।…..রাজনৈতিক ব্যবহারের দিক থেকে বলা হয়, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হলো ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে পৃথক করার আন্দোলন, যাতে ধর্মভিত্তিক আইনের বদলে সাধারণ আইনজারি এবং সকল প্রকার ধর্মীয় ভেদাভেদ মুক্ত সমাজ গড়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রকৃতপক্ষে সেকুলারিজম অর্থে উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যবহার করা হয় না। উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রচলিত ধারণা হল, নাগরিকদের ধর্ম থাকবে তবে রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না।……“ নিরপেক্ষ” শব্দের অর্থ কোনও পক্ষে নয় ৷ “ধর্ম-নিরপেক্ষ” শব্দের অর্থ, কোন ধর্মের পক্ষে নয় ৷ অর্থাৎ সমস্ত ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন ৷ “Seculaism” শব্দের আভিধানিক অর্থ – একটি মতবাদ, যা মনে করে রাষ্ঠনীতি, শিক্ষা প্রভৃতি ধর্মীয় শাসন থেকে মুক্ত থাকা উচিত [দেখুন: https://bn.wikipedia.org/wiki/ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ]

(৫) বাংলাদেশ ‘বাংলা একাডেমীর ইংলিশ-বাংলা ডিকশনারী’ পড়ে দেখুন, তাতে বলা হয়েছে-  “Secular-(অর্থ) পার্থিব, ইহজাগতিকতা, জড়, জাগতিক। 
Secular State ‘গীর্জার সঙ্গে বৈপরিত্যক্রমে রাষ্ট্র’। এ অর্থ অনুযায়ী মুসলিম দেশে এর ব্যাখ্যা হবে মসজিদের সঙ্গে বৈপরিত্যক্রমে রাষ্ট্র।
Secularism নৈতিকতা ও শিক্ষা ধর্মকেন্দ্রিক হওয়া উচিৎ নয়-এই মতবাদ। জাগতিকতা, ইহবাদ”।

[বাংলা একাডেমীর ইংলিশ-বাংলা ডিকশনারী’, ২০১২ সালের সংস্করণ; জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী সাহেবের সম্পাদনায় প্রকাশিত]

এই অভিধানটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের নিয়ন্ত্রিত সরকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা একাডেমী’ এবং এর সম্পাদনা করেছে প্রাক্তন প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী সাহেব (মৃ: ২০১৪ ইং)। সংগাগুলো দেখে ভালো লাগলো যে, তারা কোনো রাখঢাক না করেই Secularism (সেকুলারিজম / ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ) শব্দটির সাফ সাফ অর্থটিই মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন; ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয়’ বা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মকে অস্বীকার করে না’- ইত্যকার সাইড ব্যাখ্যার অবতারনা করেনি।

যে কোনো দেশের অভিধানে Secularism কথাটির অর্থ খোঁজ করে দেখুন, সবখানে একই মর্মের ব্যাখ্যা পাবেন। অক্সফোর্ড ইংরেজী-উর্দু ডিকশনারীতে Secularism অর্থ লেখা আছে, لا دينية  لا مذهبية  (ধর্মমুক্ততা, ধর্মীয় অনুশাসনমুক্ততা)। উইকিপিডিয়াতে সেকুলারিজমের ব্যাখ্যা করা হয়েছে Anti Islam দিয়ে।

উপরোক্ত সংঙ্গাসমূহ হতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মতবাদটির যে বিশ্বাসগত সার-সংক্ষেপ ফুটে ওঠে তা আমরা ৬ টি পয়েন্ট আকারে তুলে ধরছি।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ৬টি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট 

বৈশিষ্ট নং ১:- রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে ধর্মকে আলাদা রাখায় বিশ্বাস করা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সর্ব প্রধান শর্ত ও ভিত্তি। এর খোলাসা অর্থ হল, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিশ্বাস করে,  রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনা-বিশ্বাস ও সরকারের সার্বিক রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের মধ্যে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় আইনকানুনের প্রবেশ ১০০% নিষিদ্ধ থাকবে, যাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও ধর্ম –এ দু’টি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা থাকে; মানে ধর্মীয় আইনের আলোকে যাতে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে না পারে। এটাই হল Secular State  (ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র)-এর মূল কথা।

বৈশিষ্ট নং ২:- ধর্মের অনুসারীরা যাতে রাষ্ট্রীয় ব্যপারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে সেজন্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক-দল গঠন’ সহ তাদের যাবতীয় রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করায় বিশ্বাস করা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আরেকটি অন্যতম লক্ষ্য । এর খোলাসা অর্থ হল, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিশ্বাস করে, ‘ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন’ করার সুযোগ আজীবনের জন্য ১০০% নিষিদ্ধ করে দেয়া ছাড়া কোনো রাষ্ট্রে ১০০% ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কারণটা একদমই পরিষ্কার; রাষ্ট্রে ‘ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন’ নিষিদ্ধ থাকা মানে রাষ্ট্রে  আধুনিক নির্বাচন পদ্ধতিতে  ধর্মভিত্তিক সরকার গঠনের পথও বন্ধ থাকা। এতে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকার ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম আজীবনের জন্য কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ও আইনকানুন দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হওয়া থেকে ১০০% মুক্ত থাকবে। ফলে সেই দেশটি একটি খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে আজীবন।

বৈশিষ্ট নং ৩:- নাগরীকদেরকে শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিশ্বাস ও বিশ্বাসকেন্দ্রিক অনুশাসন বা আচার অনুষ্ঠান পালন করতে দেয়ায় বিশ্বাস করা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আরেকটি অন্যতম শর্ত। এর খোলাসা অর্থ হল,ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিশ্বাস করে, রাষ্ট্রের জনগণ তাদের স্ব স্ব ধর্মের মুধুমাত্র ব্যক্তি জীবন কেন্দ্রীক অনুশাসনগুলো স্বাধীন ভাবে পালন করার অধিকার সংরক্ষন করে। বাদবাকি  পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে তাদের যে সকল ধর্মীয় অনুশাসন রয়েছে, তার মধ্যে মুধুমাত্র ওই সকল অনুশাসন পালন করার অধিকার থাকবে, যা ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাস ও চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হবে না; যদি সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তা হবে পরিত্যাজ্য।

বৈশিষ্ট নং ৪: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে ধর্মকে দূরীভূত করায় বিশ্বাস করা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আরেকটি অন্যতম শর্ত। এর খোলাসা অর্থ হল,‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বিশ্বাস করে, রাষ্ট্রের সকল ধর্ম ও মতবাদের জনগণকে এমন একটি একক ধারার শিক্ষা ব্যবস্থর অন্তর্ভূক্ত করা হবে, যে শিক্ষা সকল জনগণের উপর সমভাবে প্রয়োগ করা যাবে এবং যে শিক্ষার দ্বারা জনগণকে ব্যপকভাবে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ বানানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে; সেখানে ধর্মভিত্তিক সরকার ও রাষ্ট্রব্যাবস্থা গঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কোনো ধমীয় শিক্ষাকে অন্তর্ভূক্ত রাখা হবে না যা ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষি ক বা ভবিষ্যতে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল চেতনা ও ভিত্তিকে অটুট রাখার বিষয়টিকে বিনষ্ট করে দিতে পারে

বৈশিষ্ট নং ৫:- সামাজীক প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে ধর্মকে দূরীভূত করায় বিশ্বাস করা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আরেকটি অন্যতম শর্ত। এর খোলাসা অর্থ হল, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বিশ্বাস করে, দেশের জনগণকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০০% ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনায় বিশ্বাসী হতে হবে, যারা তাদের অপরাপর কার্যক্রমের পাশাপাশি জনগণকে ব্যপকভাবে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ বানানোর প্রচেষ্টাও বিশেষভাবে অব্যাহত রাখবে;সেখানে ধর্মভিত্তিক সরকার ও রাষ্ট্রব্যাবস্থা গঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কোনো ধমীয় শিক্ষনীয় বিষয় অন্তর্ভূক্ত রাখা হবে না যা ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক হয় কিংবা ভবিষ্যতে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল চেতনা ও ভিত্তিকে অটুট রাখার বিষয়টিকে বিনষ্ট করে দিতে পারে।


বৈশিষ্ট নং ৬:– একথা বিশ্বাস করা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের একটিঅন্যতম শর্ত যে, ধর্মনিরপেক্ষতা হল সকল নাগরীকের সাথে সমতা (Equality) ও সুবিচার (Justice) রক্ষা করার সর্বোত্তম রক্ষাকবজ। অপরদিকে ধর্মকে রাষ্ট্রব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে দেয়ার একটাই অর্থ, আর সেটা হল কারো প্রতি পক্ষপাতিত্বতা (Partiality/Discrimination) করা, আর কারো কারো প্রতি অন্যায়, অবিচার (Injustice) ও বৈষম্যতার (Inequality) দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া। এর খোলাসা অর্থ হল, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিশ্বাস করে, বিশেষ কোনো ধর্মের বিধিবিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার অর্থ রাষ্ট্রের ওই বিশেষ ধর্মের অনুসারী নাগরীকদের প্রতি পক্ষপাতিত্বতা (discrimination) করা এবং একইসাথে অপরাপর ধর্মের অনুসারী নাগরীকদের উপর উক্ত ধর্মের বিধিবিধান চাপিয়ে দিয়ে প্রকারন্তে তাদের প্রতি (বিশেষ ভাবে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের প্রতি) বৈষম্যতা (inequality) ও অন্যায়-অবিচার (injustice) করা। বিধায় তাদের বিশ্বাস, ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধর্ম থেকে আলাদা রাখা’ এবং ধর্মনিরপেক্ষ আইন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করারই হল  রাষ্ট্রের সকল নাগরীকের প্রতি সুবিচার ও সাম্যতা (justice & equality between all citizens) বজায় রাখার রক্ষাকবচ। 

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বহু শাখাগত বৈশিষ্ট রয়েছে, তবে চোখে পড়ার মত মৌলিক বৈশিষ্ট আমার মতে উপরোক্ত এই ৬ টি, যা বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। এবারে আমরা এই ৬ টি বৈশিষ্টকে এক এক করে বিশ্লেষন করে দেখবো যে, এজাতীয় বিশ্বাস পোষন করা কেনো প্রকাশ্য ইসলাম-বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহীতা, পথভ্রষ্ঠতা, মুনাফেকী ও কুফরী। কারণ, আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র তাঁর নাজিলকৃত   ইসলামী শরীয়ত (ইসলামী বিধিবিধান) মানাকে মুসলমানদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন এবং ইসলামী শরীয়ত বহির্ভূত সকল শরীয়তকে মানা হারাম করে দিয়েছেন – চাই তা মুসলমানদের ব্যাক্তিজীবন, পারিবারিকজীবন, সামাজিক বা রাষ্ট্রিয়জীবনই হোক না কেনো। আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেন-

 ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَىٰ شَرِيعَةٍ مِنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ 

‘অতঃপর (হে নবী মুহাম্মাদ!) আমি তোমাকে (আমার) নির্দেশিত একটি   শরীয়তের উপর স্থাপন করেছি। অতএব তুমি তার অনুসরণ করে চলো এবং যারা (এই শরীয়ত সম্পর্কে) জানে না তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না’। [সূরা জাসিয়া ১৮]
 
 اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ 

‘(হে মুমিনগণ!) তোমাদের রবের পক্ষ থেকে (নবী মুহাম্মাদের উপর) তোমাদের জন্য (শরীয়ত হিসেবে) যা নাজিল করা হয়েছে, তোমরা তার অনুগত্য করে চলো। আর তাঁকে বাদ দিয়ে (অন্য এমন অন্য কোনো) অভিভাবকের  অনুগত্য-অনুসরণ করো না (যারা এই শরীয়ত বহির্ভূত অন্য কোনো শরীয়তের কথা বলে)’। [সূরা আ’রাফ ৩]

 
উপরের এসকল আয়াত থেকে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়-
 
(১) আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বোশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ কে নবুওত দানের পর তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত যে ইসলামী শরীয়তের উপর রেখেছেন, তাঁর অনুসারী বলে দাবীদার মুসলমানদের জন্য শুধু সেই শরীয়তের অনুগত্য-অনুসরণ করা মুসলমানদের জন্য ফরয (obligatory)। 
 
(২) ইসলামী শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক বা বিরোধী যে কারো উদ্ভাবীত বা আমদানীকৃত যে কোনো বিশ্বাস, আদর্শ, মতবাদ-মতাদর্শ ও বিধি-নিষেধের অনুগত্য-অনুসরণ করা মুসলীম উম্মাহ’র জন্য সম্পূর্ণ হারাম।  

এব্যাপারে মুসলীম উম্মাহ’র ইজমা রয়েছে যে,  ‘সলামী শরীয়তের উৎস ও মানদন্ড’ হল ৪টি:- কুরআন, সুন্নাহ, ইজমাকিয়াস’। এটাই ইসলামী শরীয়ত, এটাই আল্লাহ’র দ্বীন ইসলাম, এটাই নবী মুহাম্মাদ সা.-এর দেখানো সুন্নাহ, এটাই সাহাবী ও পরবর্তী সুপথপ্রাপ্ত মুমিনদের পথ, এটাই সিরাতে মুস্তাক্বিম। [বিস্তারিত

وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

‘আর যে ব্যাক্তির কাছে (আল্লাহ’র নাজিলকৃত) ‘হুদা’ (সঠিক পথ, সিরাতে মুস্তাক্বিম) প্রতিভাত হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলের বিরুদ্ধে (তাঁর মিশনের বিপক্ষে) অবস্থান নেয় এবং মুমিনদের পথভিন্ন অন্য পথের অনুসরণ করে, আমরা তাকে সেই দিকেই ফিরারো যে দিকে সে ফিরেছে এবং তাকে দগ্ধ করবো জাহান্নামে। আর তা কতই না নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থল’। [সূরা নিসা ১১৫]

এই ইসলামী শরীয়তের আলোকেই আমরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’কে নিরিক্ষন করে দেখবো যে, তা আল্লাহ, তাঁর রাসুল সা. এবং মুমিনদের পথ কিনা; নাকি পথভ্রষ্ঠ কোনো নেতা, লিডার বা গুরু-মাতব্বর’দের পথ।

নসর বিন আসেম আল-লাইস রহ. থেকে বর্ণিত, হযরত হুযাইফা রা. বলেন- كان الناس يسألون رسول الله صلى الله عليه و سلم عن الخير وأسأله عن الشر وعرفت أن الخير لن يسبقني قلت يا رسول الله أبعد هذا الخير شر قال يا حذيفة تعلم كتاب الله واتبع ما فيه ثلاث مرات قال قلت يا رسول الله أبعد هذا الشر خير قال هدنة على دخن وجماعة على أقذاء قال قلت يا رسول الله الهدنة على دخن ما هي قال لا ترجع قلوب أقوام على الذي كانت عليه قال قلت يا رسول الله أبعد هذا الخير شر قال فتنة عمياء صماء عليها دعاة على أبواب النار وأنت أن تموت يا حذيفة وأنت عاض على جذل خير لك من أن تتبع أحدا منهم. مسند الإمام أحمد: ٥/٣٨٦ رقم ٢٣٣٣٠ , تعليق شعيب الأرنؤوط : حديث حسن – ‘লোকজন রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কল্যান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো, আর আমি জিজ্ঞেস করতাম মন্দ সম্পর্কে, (যাতে) আমি চিনে নিতে পারি যে, কল্যান আমাকে পিছনে ফেলে অগ্রসর হয়ে যায়নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই কল্যানের পর কি কোনো মন্দ আছে? তিনি তিনবার বললেন: হে হুযাইফা! আল্লাহ’র কিতাবের ইলম হাসিল করো এবং তার মধ্যে যা আছে তার অনুসরণ করো। তিনি বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই মন্দের পর কি কোনো কল্যান আছে? তিনি বললেন: (হ্যাঁ, আছে। সেটা এমন যেন পাপের) ধোয়ার উপর (ইমান ও আমলের অপূর্ণ) স্থিরতা এবং (গোনাহ’র ছিটেফোটা) ধুলোবালির উপর (জীবন অতিবাহীত করা মুসলমানদের এক) জামাআত।তিনি বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! ধোয়ার উপর (ইমান ও আমলের অপূর্ণ) স্থিরতা -এটা কি? তিনি বললেন: (সে জামানার মুসলমান) গোষ্ঠিদের অন্তরসমূহ (ইমানের) যে অবস্থার উপর বিদ্যমান ছিল, তাতে আর ফিরে না যাওয়া (বরং ইমান ও আমলের মধ্যে পাপের কিছুটা ধোয়াসে ভাব থেকে যাওয়া)। তিনি বলেন: আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই কল্যানের পর কি কোনো মন্দ আছে? তিনি বললেন: (হ্যাঁ, আছে। আর সেটা হল এমন এক) ফিতনা যা (আকিদা ও বিশ্বাসগত) অন্ধত্ব ও বধিরতা (-র অন্ধকার নিয়ে আবির্ভূত হবে), যার উপর ভিত্তি করে দোযখের বিভিন্ন দরজায় দাঁড়িয়ে (পথভ্রষ্ঠতার ধারক-বাহক নেতা ও লিডার’দের পক্ষ থেকে তোমাদের মুসলমানদেরকে তাদের আদর্শ গ্রহনের দিকে) ডাক দেয়া হবে। হে হুযাইফা, তুমি যদি (তখন আল্লাহ’র রাস্তায় মড়ে যেতে পরো, তো) মড়ে যেও (তবুও কোনো অবস্থাতেই ওদের অনুসরণ করতে যেও না)। ওদের (মতো পথভ্রষ্ঠ লিডারদের) কোনো একজনের অনুগত্য-অনুসরণ করার থেকে তুমি আনন্দ-উল্লাসে (তোমার ধ্বনসম্পদ) উড়িয়ে দিবে সেটাও তোমার জন্য অধিক কল্যানকর হবে’। [মুসনাদে আহমদ- ৫/৩৮৬, হাদিস ২৩৩৩০; সুনানুল কুবরা, নাসায়ী- ৫/১৮ হাদিস ৮০৩২, ৮০৩৩; আত-তবাকাত, ইবনে সা’দ- ৪/২৫২] 

হযরত ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন- سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : إن في أمتي لنيفا وسبعين داعيا ، كلهم داع إلى النار ، لو أشاء لأنبأتكم بأسمائهم وقبائلهم . رواه أبو يعلى الموصلي فى مسنده: ١٠/٦٥ رقم ٥٧٠١ . قال ابن كثير فى البداية والنهاية , كتاب الفتن والملاحم وأشراط الساعة والأمور العظام يوم القيامة: ١٩/١١٨ وهذا إسناد لا بأس به; قال الهيثمى : رواه أبو يعلى وفيه ليث بن أبي سليم وهو مدلس،وبقية رجاله ثقات:٧/٣٣٢ –‘আমি রাসুলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি যে, আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর জনের বেশি আহবানকারী (লিডার/গুরু) হবে। তাদের প্রত্যেকেই (একেকজন পথভ্রষ্ঠ এবং তাদের জীবনকালে তারা নিজ নিজ প্রথভ্রষ্ঠ মত ও পথকে মুক্তির সঠিক পথ বলে প্রচার করবে, ফলে আদপে তারা মানুষকে) দোযখের দিকে আহবান করবে। (তাদের থেকে সাবধান থেকো)। আমি চাইলে তোমাদেরকে তাদের নাম ও তাদের এলাকার খবর বলে দিতে পারি’। [মুসনাদে আবু ইয়া’লা- ১০/৬৫ হাদিস ৫৭০১; আল-বিদায়াহ ওয়ান্নিহায়াহ, ইবনে কাছির- ১৯/১৮৮; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৭/৩৩২]

হযরত হুযাইফা রা. থেকে বর্ণিত,  তিনি বলেন- حدثنا عبد الخالق بن يزيد الدمشقي عن أبيه عن مكحول عن حذيفة بن اليمان رضى الله عنه قال: ما من صاحب فتنة يبلغون ثلثمائة إنسان إلا ولو شئت أن أسميه باسمه واسم أبيه ومسكنه إلى يوم القيامة كل ذلك مما علمنيه رسول الله صلى الله عليه و سلم .قالوا بأعيانها قال أو أشباهها يعرفها الفقهاء أو قال العلماء . اخرجه نعيم بن حماد المروزي فى الفتن: رقم ١٦ – ‘সাহেবুল-ফিতান (ফিতনার ধারক-বাহক) -কেয়ামত পর্যন্ত যাদের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে তিন’শ জনে -তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, আমি চাইলে যাদের প্রত্যেকের নাম, তার পিতার নাম এবং তার এলাকার নাম বলে দিতে না পারি’। এর সবই রাসুলুল্লাহ সা, আমাকে জানিয়েছেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: (তাদের পরিচয়গুলি কি) একদম স্পষ্ট (যে, যে কেউ তাদেরকে চিনে নিতে পারবে)? তিনি বললেন: (না,) বরং (তাদের পরিচয়গুলো এমন ভাবে জানানো হয়েছে, যা) সাদৃশ্যপূর্ণ; ফকিহগণ (তথা দ্বীনের গভীর জ্ঞানীগণ) অথবা বলেছেন, আলেমগণ তাদেরকে চিনে নিতে পারবেন।  [আল-ফিতান, নুআইম বিন হাম্মাদ- ১৬]

ইনশাআল্লাহ, আপনারা এই আলোচনাটি আগা-গোড়া পাঠ করলে বুঝতে পারবেন যে,  যারা ধর্মনিরপেক্ষবাদের দিকে ডাক দেয়, তারা মূলতঃ দোযখের দরজায় দাড়িয়ে ডাক্হাক-কারী এবং যে এই ডাকে সাড়া দিবে তারা তাকে দোযখে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিবে। 



বৈশিষ্ট নং ১

ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা -এ বিশ্বাস করা কেনো প্রকাশ্য কুরআন-সুন্নাহ‘র বিরোধীতা, আল্লাদ্রহীতা, পথভ্রষ্ঠতা, মুনাফেকী ও কুফরী ?

বৈশিষ্ট নং ১:- রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে ধর্মকে আলাদা রাখায় বিশ্বাস করা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সর্ব প্রধান শর্ত ও ভিত্তি। এর খোলাসা অর্থ হল, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিশ্বাস করে,  রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনা-বিশ্বাস ও সরকারের সার্বিক রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের মধ্যে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় আইনকানুনের প্রবেশ ১০০% নিষিদ্ধ থাকবে, যাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও ধর্ম –এ দু’টি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা থাকে; মানে ধর্মীয় আইনের আলোকে যাতে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে না পারে। এটাই হল  Secular State  (ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র)-এর মূল কথা।

বোঝার সুবিধার্থে বিষয়টিকে আরেকটু খোলাসা করছি। মৌলিকভাবে ৩টি বিভাগের  সমন্নয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকার (Government) গঠিত হয় –
 
 ক) ধর্মনিরপেক্ষ আইন বিভাগ (Secular Legislative Division) 
খ) ধর্মনিরপেক্ষ নির্বাহী বিভাগ (Secular Executive Division)
গ) ধর্মনিরপেক্ষ বিচার বিভাগ (Secular Judicial Division)
 

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ উপরোক্ত এই ৩ টি বিভাগের প্রতিটির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পদ ও পদের সার্বিক কার্যক্রমের মধ্যে বিশেষ কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় আইনকানুনের প্রবেশকে ১০০% নিষিদ্ধ রাখাকে তার মূল ভিত্তি বলে বিশ্বাস করে, আর কেবল তবেই একটি ১০০% খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State) গঠিত হওয়া সম্ভব। বিষয়টিকে আরেকটু খোলাসা করছি।

ক) ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রণয়নী বিভাগ (Secular Legislative Division):- এই বিভাগের আওতায় থাকে আইনসভা (Parliament/Legislative Assembly)। এর সদস্যরা রাষ্ট্রের সংবিধান রচনার একক আইনানুগ অধিকারী কর্তা (Legislators) হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে এবং নাগরীকদের জন্য সাংবিধানিক আইন রচনা করে থাকে। এই আইনসভা বাংলাদেশে ‘জাতীয়-সংসদ’ হিসেবে পরিচিত, আর এর সদস্যদেরকে বলা হয় সাংসদ।

ধর্মনিরপেক্ষকাবাদ বিশ্বাস করে, (ক) এই আইনসভার সদস্যরাই হবে দেশের সংবিধানিক আইন রচনার একমাত্র আইনানুগ অধিকারী কর্তা (Legislators), (খ) তারা সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধিবিধানকে ১০০% দূরে রেখে শুধুমাত্র নিজেদের জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা খাটিয়ে দেশের নাগরীকদের জন্য আইন রচনা করবে, (গ) আইনসভার সদস্যরা যে আইন তৈরী করবে সেটাই হবে রাষ্ট্রের চুড়ান্ত আইন, যা সকল জনগণের উপর সমভাবে প্রযোজ্য হবে এবং জনগণ শুধুমাত্র উক্ত সংবিধানকেই (ফরযে আইন হিসেবে) মানতে বাধ্য থাকবে(ঘ) সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোনো ধর্মীয় আইন মানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম) থাকবে, মানলে তা হবে আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ (রাষ্ট্রিয় পাপ), এর বিরোধীতা (বাগাওয়াত্) করলে তা হবে কখনো কখনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত রয়েছে।  এটাই হল ধর্মনিরপেক্ষ আইন-প্রণয়নী বিভাগ (Secular Legislative Division)-এর মূল চেহারা ও খাসলত ।

খ) ধর্মনিরপেক্ষ নির্বাহী বিভাগ (Secular Executive Division):- রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক (Administrative) কার্যক্রম পরিচালনার মূল দায়িত্ব এই নির্বাহী বিভাগের উপর ন্যাস্ত থাকে। রাষ্ট্রপ্রধান (দেশ ভেদে প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি) থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন প্রশাসনিক ব্যাক্তি ও তাদের স্ব-স্ব কার্যাবলি এই বিভাগের আওতায় রয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিশ্বাস করে, (ক) রাষ্ট্রের এই নির্বাহী বিভাগের সকল পদাধিকার, ক্ষমতায়ন ও কোনো পদের কার্যাবলি নির্ণয় ও প্রয়োগের প্রশ্নে যে কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানকে ১০০% দূরে রাখা অত্যাবশ্যক শর্ত (ফরযে আইন)। (খ) এক্ষেত্রে‘আইনসভা’র সদস্যদের দ্বারা রচিত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোনো ধর্মীয় আইন মানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম), মানলে তা হবে আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ (পাপ), এর বিরোধীতা (বাগাওয়াত্) করলে তা হবে কখনো কখনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত রয়েছে। এটাই হল ধর্মনিরপেক্ষ আইন-প্রণয়নী বিভাগ (Secular Executive Division)-এর মূল চেহারা ও খাসলত ।

গ) ধর্মনিরপেক্ষ বিচার বিভাগ (Secular Judicial Division):- এই বিভাগের দায়িত্ব হল আইনসভায় পাশ হওয়া সংবিধান অনুসারে দেশের নাগরীকদের বিচারকার্য সম্পাদন করা।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বিশ্বাস করে(ক) রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের আওতাধীন বিচারকের পদ ও পদায়ন সংশ্লিষ্ট সার্বিক কার্যক্রমের ভিত্তি হবে শুধুমাত্র ‘আইনসভা’র সদস্যদের দ্বারা রচিত সংবিধান; (খ) দেশের সকল বিচারকার্য পরিচালিত হবে শুধুমাত্র ‘আইনসভা’র সদস্যদের দ্বারা রচিত সংবিধানের আলোকে(গ) ‘আইনসভা’র সদস্যদের দ্বারা রচিত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোনো ধর্মীয় আইন মানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম) থাকবে, মানলে তা হবে আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ (পাপ), এর বিরোধীতা (বাগাওয়াত্) করলে তা হবে কখনো কখনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত রয়েছে। এটাই হল ধর্মনিরপেক্ষ বিচার বিভাগ (Secular Judicial System)-এর মূল চেহারা ও খাসলত।

[উপরোক্ত এই তিনটি বিভাগের আওতাধীন আরো অনেক শাখা-প্রশাখা (Branches) রয়েছে, যা এখানে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম। বিস্তারিত জানার প্রয়োজন থাকলে পাঠক আপনি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারী ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো নির্ভযোগ্য সূত্রে জেনে নিতে পারেন।]

মৌলিকভাবে সাধারণতঃ উপরোক্ত খাসলত ও চেহারা বিশিষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রণয়নী বিভাগ, ধর্মনিরপেক্ষ নির্বাহী বিভাগ এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিচার বিভাগ – এই ৩ অংশের মিশ্রণেই গঠিত হয় বর্তমান জামানার একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকার (Secular Government) অন্য কথায় একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State), আর এই ৩ অংগের যে কোনো পদ, পদাধিকার, পদায়ন বা ক্ষমতায়ন সহ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কার্যাবলীর মধ্যে কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রবেশাধিকার ১০০% নিধিদ্ধ (হারাম) করায় বিশ্বাস করা একটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মৌলিক শর্ত, যা ছাড়া কারো জন্য নিজকে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বলে দাবী করা খোদ্ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথেই মিরজাফোরী করা। এজন্যই আপনি যদি নিজকে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বলে দাবী করেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে মিরজাফোরী করতে না চান, তাহলে আপনাকে অবশ্য অবশ্যই রাষ্ট্রের সরকারের এই ৩ টি অংগের প্রত্যেকটি থেকে ইসলামী শরীয়তের যে কোনো বিধানের প্রবেশকে ১০০% নিধিদ্ধ (হারাম) করায় বিশ্বাস করা বাধ্যতামূলক (ফরযে আইন)।

আর এটাই হল উপরের সংগাগুলোতে কথিত the separation of religion and government  (ধর্ম ও সরকারের মাঝে বিভাজন) অথবা Separation of religion and state (ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজন) বা  the state should be separate from religion (রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা রাখা বাঞ্চনিয়’) কিংবা  The separation of religion and state is the foundation of secularism (ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজন ই হল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূল ভিত্তি ) –ইত্যাদির মূল কথা।

অথচ একথা কে না জানে যে, ইসলাম ‘খিলাফত’ -এ বিশ্বাসী, যা কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালিত হওয়ার জিনিস। কে না জানে যে, বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ যেমন ছিলেন সর্বশেষ নবী ও রাসুল, তেমনি ছিলেন মুসলমানদের আমীর, ইসলামী  রাষ্ট্রের ‘খলিফা’ (নির্বাহীপ্রধান)প্রধান বিচারপতিঅর্থায়ন বিভাগের প্রধান (গভর্নর)প্রধান মুফতী, জিহাদ ও গাযওয়া’র প্রধান-পরিচালক (সেনাপ্রধান), কোনো কোনো জিহাদের প্রধান সেনাপতি (Commander in Chief)। তেমনি একথা কে না জানে যে, তাঁর পর মুসলীম উম্মাহ’র খলিফা হয়েছিলেন যথাক্রমে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা., হযরত ওমর ফারুক রা., হযরত ওসমান গণী রা. এবং হযরত আলী রা., যাঁরা সর্বসম্মতিক্রমে খুলাফায়ে রাশেদীন (সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত খলিফা) হিসেবে পরিচিত। তাঁরা কি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক ইসলামী  রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করে ‘খুলাফায়ে রাশেদীন’ হতে পেরেছিলেন, নাকি কুরআন-সুন্নাহ’কে রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে ছেটে ফেলে দিয়ে?! কুরআন সুন্নাহ বাদ দিলে কি কেউ সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, না পথভ্রষ্ঠ হয়ে যায়? আপনারাই বলুন, বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ ও চার খলিফায়ে রাশেদ’গণ কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক ইসলামী খিলাফত পরিচালিত করে কি পথভ্রষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন, নাকি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে কুরআন-সুন্নাহ’কে ১০০% ছেটে ফেলে দেয়ায় বিশ্বাস করায় ১০০% পথভ্রষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ দিয়েছে?! 

আমার মতে, যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী, তারা সবাই জানে যে, ‘ইসলাম আল্লাহ’র কুরআন ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী ‘খিলাফত’ পরিচালনায় বিশ্বাসী’ এবং যারা ‘ইসলামী খিলাফত’ -এর পরিবর্তে ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা’কে নিজেদের বিশ্বাস হিসেবে গ্রহন করেছে, তারা সেটা করেছেন জেনেবুঝেই। যেমন: খোদ্ শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব তার ‘আত্মজীবনী’তে জিন্না সাহেবের পক্ষ নিয়ে এক ছাত্রের বকৃতার বিপরীতে নিজের মতের দলিল দিয়েছিলেন এই বলে যে- ‘হযরত ওমরকে (রা.) সাধারণ নাগরিকরা প্রশ্ন করেছিল তিনি বড় জামা পড়েছিলেন বলে’। [অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ১০০ পৃষ্ঠা] এবং এর ১৮ নং টিকা’র ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: ‘ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) একবার মদিনা মনোয়ারার জনগণকে টুকরো কাপড় সমভাবে ভাগ করে দেন। ঐ কাপড়ের টুকরো এমন ছিল না যাতে কেউ বড় জামা বানাতে পারে। কিন্তু ওমর (রা.) ঐ কাপড় দিয়ে বড় জামা বানালে লোকের সন্দেহ জাগে ও তাঁকে প্রশ্ন করে যে, কিভাবে তিনি ওই কাপড় দিয়ে বড় জামা বানালেন। ওমর (রা.) -এর পুত্র এই সন্দেহ দূর করেন এই বলে যে, তিনি তার ভাগের কাপড়টি পিতাকে দান করেছেন যাতে তিনি বড় জামা বানাতে পারেন। যিনি যতই ক্ষমতাশালী হোন না কেন অন্যায় মনে হলে জনগণ যে বিনা দ্বিধায় তাঁকে প্রশ্ন করতে পারে, লেখক এখানে সেই প্রসঙ্গটি তুলে এনেছেন’। [অসমাপ্ত আত্মজীবনী: ২৯০ পৃষ্ঠা] এটা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করলাম মাত্র।

 অন্যথায়, বলি.., নিজেকে মুসলমান বলে বিশ্বাস করে -এমন কোন্ ‘ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী’ রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, নেতা, পাতি নেতা, ছাত্র নেতা, তাদের অনুসারী, সাধারণ পেশাজীবী, শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রী, এমনকি শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষজন রয়েছে, যারা হযরত আবু বকর সিদ্দিক বা হযরত ওমর ফারূক রা. এককালে মুসলীম জাহানের ন্যায়পরায়ন খলিফা ছিলেন -তা জানে না?! এদের কে না জানে যে, চোরের জন্য ইসলামী শরীয়তে ‘হাত কাটা’র বিধান রয়েছে?! কে জানে না যে, এগুলো রাজনীতির অংশ? সবাই জানে, (যদিও-বা তাদের বেশিরভাগই চার খলিফার জীবনী বিস্তারিত পড়েনি/শোনেনি কিংবা খিলাফত ও বিচার সম্পর্কিত বিস্তারিত শরয়ী মাসলা-মাসায়েল জানে না)।

শুধু মুসলমান বলে দাবীদার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী নর-নারী’রাই নয়, পাক্কা অমুসলীম কাফের মুশরেক পলিটিশিয়ানরা ও সচেতন সাধারণ মানুষজনও এসব কথা জানে। আপনি ভারতের নরেন্দ্র মোদী সাহেবকে প্রশ্ন করুন, তিনিও বলে দিবেন যে, ইসলাম দ্বারুল খিলাফত, দ্বারুল আমান এবং দ্বারুল কুফর -এ বিশ্বাসী; তিনি এই তিনের ব্যাখ্যাও দিবেন, (আমার বিশ্বাস, বেশিরভাগ মুসলমানই এই তিনটির একথা জানে না)! আমেরিকার হোয়াইট হাউজের লোকরা রীতি মতো ইসলামের রাজনীতি এবং কুরআন-সুন্নাহ’য় কোথায় কোথায় কোন প্রসঙ্গে রাজনীতিকে কিভাবে ব্যবহার করতে চায়, এ সম্পর্কিত রাসুলুল্লাহ ﷺ ভবিষ্যতবাণী ইত্যাতি বিষয়ে রিসার্স টিম দিয়ে কাজ করে। অবাক হবেন যে, তারা ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’, ‘খুরাসানের কালো পতাকা’, ‘ইমাম মাহদী’ ইত্যাদি বিষয়েও জ্ঞান রাখে। সুতরাং, মুসলীম অমুসলীম সবাই কমপক্ষে এতটুকু বিষয়ে একমত যে, ‘দ্বীন ইসলাম খিলাফতে বিশ্বাসী এবং ইসলামের নবী মুহাম্মাদ ﷺ ‘খিলাফত’ শিক্ষা দিয়ে গেছেন’। সম্ভব হলে এ ব্যাপারে গবেষনা চালিয়ে দেখতে পারেন।

তারপরেও নিজেদের বিবেককে লুকিয়ে রেখে শুধুমাত্র মনের গহীনের বিশ্বাস ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে পরাজীত না হতে দেয়ার জন্য জোর করে বলে থাকে যে, ‘ইসলামের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই’, বা ‘ইসলামের মধ্যে রাজনীতিকে টেনে আনা ঠিক নয়’, ‘(ইসলাম) ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা থাকা বাঞ্চনীয়’ ইত্যাদি ! 

এব্যাপারে আমরা সর্ব প্রথমে রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর একটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করতে চাই, যা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে বিশ্বাসীদের মুখে চপেটাঘাত করার জন্য যথেষ্ট।

আবু হুরায়রাহ রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন-

كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمْ الْأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيٌّ خَلَفَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي وَسَيَكُونُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُونَ قَالُوا فَمَا تَأْمُرُنَا قَالَ فُوا بِبَيْعَةِ الْأَوَّلِ فَالْأَوَّلِ أَعْطُوهُمْ حَقَّهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرْعَاهُمْ . رواه بخارى فى صحيحه, كتاب أحاديث الأنبياء, باب ما ذكر عن بني إسرائيل: رقم ٣٤٥٥; و مسلم فى صحيحه, كتاب الإمارة، باب الأمر بالوفاء ببيعة الخلفاء، الأول فالأول،,: ٣/١٤٧٢ رقم ١٨٤٢; السنة لالخلال: ١/١١ رقم ٦ اسناده صحيح ; أحمد في المسند: رقم ٧٩٤٧; ابن ماجه فى سننه: رقم ٢٨٧١; البيهقي فى دلائل النبوة: ٦/٣٣٨   

– বনী ইসরাঈলের সিয়াসাতী (রাজনৈতিক/পলিটিকাল) দায়িত্ব পালন করতেন তাদের নবীগণ। যখনই কোনো নবী মৃত্যুবরণ করতেন, তাঁর খলীফা (স্থলাভিষিক্ত) হতেন (তাঁর পরবর্তী আরেকজন) নবী। আর নিশ্চই আমার পর কোনো নবী নেই। শিঘ্রই (আমার পর রাজনৈতিক/পলিটিকাল দায়িত্ব পালনের জন্য) খলিফাগণ হবেন, পরে (ভাল-মন্দ খলিফা’র সংখ্যা) অনেক হবে। জিজ্ঞেস করা হল: (খলিফাগণ সম্পর্কে) আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ দেন? তিনি বললেন: অনুগত্য করবে তার, যার কাছে প্রথমে বায়েত করা হয়েছে, তারপর (তিনি ইন্তেকাল করলে অনুগত্য করবে তার, যার কাছে) প্রথমে (বায়েত করা হয়েছে)। (তারা খলিফা হিসেবে তোমার কাছ থেকে শরয়ী দৃষ্টিতে যে হক্ব প্রাপ্য), তাদের কাছে তাদের (সে) হক্ব (যথাযথ ভাবে) পৌছে দিবে। নিশ্চই আল্লাহ তাদেরকে যে ব্যাপারে (তোমাদের উপর) পৃষ্ঠপোষক বানিয়েছিলেন, (কেয়ামতের দিন) তাদেরকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৪৫৫; সহিহ মুসলীম– ৩/১৪৭২ হাদিস ১৮৪২; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৭৯৪৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৭১; দালায়েলুন নাবুওত, বাইহাকী- ৬/৩৩৮; আস-সুন্নাহ, ইমাম খাল্লাল-১/৭৭ হাদিস ৬]

ফায়দা: আরবী শব্দ سياسة (সিয়াসাত) অর্থ হল: রাজনীতি (Politics), যা ‘কর্তৃত্ব/শাসন ক্ষমতা  লাভ করার’  আগের এবং পরের যাবতীয় কাজ ও দায়িত্বকে শামিল করে নেয়। যে কোনো যুগের রাজনীতির মধ্যে-

(১)  কর্তৃত্ব/শাসন ক্ষমতা  লাভ করার’ আগে: কোনো গোষ্ঠির নেতা/ দলপ্রধানকে কখনো তার দলীয় বিশ্বাস ও চেতনার স্বার্থে, কখনো দলীয় নীতিমালার সার্থে, আবার কখনো অধীনস্তদের ন্যায্য অধিকারের স্বার্থে ক্ষমতাসীনদের সাথে উঠাবসা ও বোঝাপরা করতে হয়, এমন কি কখনো কখনো প্রয়োজনে ক্ষমতাসীনের কর্তৃত্ব নষ্ট করা বা তাদেরকে হঠিয়ে দেয়ার প্রশ্নে কর্মতৎপরতা, আন্দোলন, যুদ্ধ করতে হয়, কিংবা এর জন্য অপর এক বা একাধিক ক্ষমতাসীন বা কোনো রাজনৈতিক দলের সাতে হাত মিলাতে হয়। হয়-তো এতসব করেও উক্ত ক্ষমতাসীনকে কর্তৃত্ব থেকে সরাতে ব্যার্থ হতে হয়। কিন্তু তবুও এসব তৎপরতার সবটাকেই যে কোনো যুগে রাজনীতির অন্তর্ভূক্ত মনে করা হয়। সুতরাং রাজনীতি বলতে শুধু ক্ষমতাসীন/কর্তৃত্বকারী কোনো ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ জাতীয় কাউকে চিন্তাজগতে চিত্রিত করে নেয়াটা ভূল।

(২) কর্তৃত্ব/শাসন ক্ষমতা  লাভ করার’ পরে: কর্তৃত্ব/শাসন ক্ষমতার আসন লাভের পর নেতা/রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব হয়ে যায়- (ক) অধীনস্ত জনগণের মৌলিক প্রয়োজনাদি পূরণ করা, (খ) জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে  নিরাপত্তাকর্মী ব্যবস্থাপনার বন্দোবস্ত করা, (গ) অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ব্যবস্থা করা, (ঘ) বহিঃদেশীয় শত্রু থেকে নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তাকমী, যোদ্ধা ও এতদসংশ্লিষ্ট যাবতীয় ব্যবস্থাপনার বন্দোবস্ত করা, (ঙ) বহিঃদেশীয় ক্ষমতাসীনদের সাথে বিভিন্ন চুক্তি ও যোগাযোগ রক্ষা করা, (চ) প্রয়োজনে শত্রুর সাথে যুদ্ধ ঘোষনা ও পরিচালনাগত যাবতীয় বিষয় নিশ্চিত করা, (ছ) সর্বোপরি কর্তৃত্ব/ক্ষমতাটি যে মৌলিক আদর্শ ও চেতনার ভিত্তিতে গঠিত, তার সংরক্ষনের সুব্যবস্থা করো, ইত্যাদি। এসব দায়িত্ব ও তৎপরতার সবগুলিকেই যে কোনো যুগে রাজনীতির অন্তর্ভূক্ত মনে করা হয়। 

উপরের হাদিসে যে বলা হয়েছে, ‘বনী ইসরাঈল’ -এর সিয়াসাতী (রাজনৈতিক/পলিটিকাল) দায়িত্ব পালন করতেন তাদের কাছে প্রেরিত নবীগণ, এর অর্থ মূলতঃ উপরের পয়েন্ট দুটিতে উল্লেখীত রাজনৈতিক বিষয়গুলিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে আল্লাহ’র নির্দেশক্রমে সংশ্লিষ্ট নবী আ. কর্তৃক দায়িত্ব পালনকে বোঝানো হয়েছে। তাই নবীগণ কর্তৃক সিয়াসাতী (রাজনৈতিক/পলিটিকাল) দায়িত্ব পালন বলতে শুধুমাত্র পূর্ণ ক্ষমতাসীন/কর্তৃত্বকারী কোনো নবী’র কথা চিন্তাজগতে আনাটা ভূল। বরং আল্লাহ’র নির্দেশক্রমে ক্ষমতাহীন/কর্তৃত্বহীন কোনো নবী আ. কোনো ক্ষমতাসীন/কর্তৃত্বকারীর সাথে রাজনীতিতে জড়ান, কিংবা আংশিক বা পূর্ণ কোনো ক্ষমতাসীন/কর্তৃত্বকারী কোনো নবী আ. কোনো রাজনীতিতে জড়ান -সর্বাবস্থায় রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনই হবে।

নবী ইসহাক আ.-এর পুত্র (মানে নবী ইব্রাহীম আ.-এর নাতী) হলেন নবী ইয়াকুব আ. যাঁর আরেক নাম হল ইরসাঈল। নবী ইয়াকুব/ইরসাঈল আ. -এর ১২ পুত্র (অর্থাৎ নবী ইউসুফ আ. ও তাঁর ১১ ভাই) ও তাদের বংশধরকে ‘বনী ইসরাঈল’ বলা হয়। ‘বনী ইসরাঈল’ -এর কাছে প্রেরিত সকল নবীর নাম ও তাদের রাজনৈতিক দায়িত্বের বিস্তারিত বর্ণনা কুরআন-সুন্নাহ’য় আসেনি। কুরআন কারিমে শুধু হাতে গোণা মাত্র কয়েকজন নবীর নাম ও তাদের প্রাসঙ্গিক কিছু রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতার কিছু ইংগীত পাওয়া যায়। যেমন: ইউসূফ আ., মূসা আ., দাউদ আ., সুলাইমান আ., প্রমূখ। আমাদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, খোদ রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন যে, তাদের নবীগণ সিয়াসাতী (রাজনৈতিক/পলিটিকাল) দায়িত্ব পালন করতেন।

(ক) ইউসূফ আ.: আল্লাহ তাআলা নবী ইউসূফ আ.-কে মিশরের রাজার অধিনস্ত একজন রাষ্ট্রীয় কোষাধ্যক্ষ (অর্থমন্ত্রী/খাদ্যমন্ত্রী ধরনের) হিসেবে ক্ষমতাসীন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে সূরা ইউসূফ দেখা যেতে পারে। 

(খ) মূসা আ.: আল্লাহ তাআলা নবী মূসা আ.-কে ‘তাওরাত কিতাব’ সহকারে বনী ইসরাইলের কাছে একজন রাসুল করে পাঠিয়েছিলেন। ঘটনার পরিক্রমায় বনী ইসরাইলে যে গোষ্ঠিটি তৎকালীন মিশরের জালেম রাজা/শাসক ফেরআইন-এর অধীনে গোলাম হয়ে দীর্ঘকাল ধরে জুলুম অন্যায় অবিচার সয়ে আসছিল, মূসা আ. আল্তালাহ তাআলার নির্দেশক্রমে বনী ইসরাইলে সেই গোষ্ঠিটিকে ফেরআউনের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহ’র গোলামীতে লাগানোর জন্য কী না করেছেন। তার এই জান বাজি রাখা তৎপরতার মধ্যে নবুওতী দায়িত্বের সাথে রাজনৈতিক পদক্ষে অতপ্রতভাবে বিজড়িত ছিল। 

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন-

إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ . وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ . وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَنُرِيَ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُم مَّا كَانُوا يَحْذَرُونَ

‘নিশ্চই ফেরআউন (তার রাজ্যের) জমিনে (যত্রতত্র) ঔদ্ধত্যকারী (এক প্রভাবশালী জালেম শাসক) ছিল এবং সে (তার ক্ষমতা ও দাপটকে টিকিয়ে রাখার জন্য) সেখানকার অধিবাসীদেরকে (বিভিন্ন) দলে (বিভক্ত) করে রেখেছিল (যাতে তারা এক জোট হয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করতে না পারে)। সে তাদের একটি অংশকে (অন্যায়-অত্যাচার দ্বারা) দূর্বল করে রাখতো, তাদের ছেলে সন্তানদেরকে জবেহ করতো এবং তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখতো। নিশ্চই সে ছিল (জমিনে) ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের একজন। আর আমরা চাইলাম, জমিনে যাদেরকে দূর্বল করে রাখা হয়েছিল আমরা তাদের উপর নেয়ামত দান করবো, (ফেরআউনের স্থলে) তাদেরকে (অন্যদের উপর) ইমাম বানাবো, তাদেরকে (সেই জমিন ও তদস্থ ধ্বনসম্পদের পরবর্তী ওয়ারীস) উত্তরাধিকার বানাবো, তাদেরকে জমিনে ক্ষমতাসীন করবো (কর্তৃত্ব দিবো), এবং ফেরআউন, হামান ও তাদের উভয়ের সৈন্যদেরকে তা দেখিয়ে দিবো, যে ব্যাপারে আশংকা তারা করতো’। [সূরা ক্বাসাস ২-৬]
 
আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের রাজ্যক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে ধ্বংস করার পর বনী ইসরাঈল’কে মিশর ও শামের ওয়ারিস বানিয়েছিলেন।   

(গ) দাউদ আ.: আল্লাহ তাআলা নবী দাউদ আ.-কে বনী ইসরাঈলের কাছে যাবুর কিতার সহকারে রাসুল রূপে পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁকে এক পর্যায়ে বনী ইসরাঈলের উপরে মুকাম্মাল/পূর্ণ ক্ষমতাসীন ও কর্তৃত্বকারী খলিফা বানিয়েছিলেন। ফলে একজন শাসক যে সকল রাজনৈতিক বিষয়ে লিপ্ত থাকে, তার সবগুলিই নবী দাউদ আ. তাঁর উপরে নাজিলকৃত ‘যাবুর কিতাব’ ও তাঁর ‘সুন্নাহ’ অনুযায়ী নবীসুলভ ইনসাফের সাথে ব্যবহার করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ছিলেন। ফলে তিনি পূর্ণ ক্ষমতার সাথে তাঁর অধীনস্ত বনী ইসরাঈলের উপরে আল্লাহ’র বিধান জারি করতে পারতেন, তাদের মাঝে বিচার ফয়সালা করতে পারতেন, এমনকি প্রয়োজনে শত্রুর সাথে জিহাদও করতে পারতেন ইত্যাদি।

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন-

فَهَزَمُوهُم بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِينَ

‘তখন আল্লাহ’র ইচ্ছায় তারা (যুদ্ধ ক্ষেত্রে) ওদেরকে পরাজিত করে দিল এবং (নবী) দাউদ (তার দুশমন) জালুতকে কতল করলো। আর আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন মুলক (রাজ্যক্ষমতা) ও হিকমাহ এবং তাকে যা ইচ্ছা শিখিয়েছিলেন। আর আল্লাহ যদি (বিভিন্ন জামানায়) মানুষের একদলকে অপরদল দ্বারা প্রতিহত না করতে থাকতেন, তাহলে (একটি ক্ষমতালোভী উদ্ধত্ব্যবাদী গোষ্ঠি) পৃথিবীকে অবশ্যই বিশৃঙ্খল/ফ্যাসাদময় বানিয়ে দিতো। কিন্তু আল্লাহ হলেন বিশ্ববাসীর উপর অনুগ্রহকারী’। [সূরা বাকারাহ ২৫১]

আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন-

فَهَزَمُوهُم بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاءُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِينَ

‘তখন আল্লাহ’র ইচ্ছায় তারা (যুদ্ধ ক্ষেত্রে) ওদেরকে পরাজিত করে দিল এবং (নবী) দাউদ (তার দুশমন) জালুতকে কতল করলো। আর আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন মুলক (রাজ্যক্ষমতা) ও হিকমাহ এবং তাকে যা ইচ্ছা শিখিয়েছিলেন। আর আল্লাহ যদি (বিভিন্ন জামানায়) মানুষের একদলকে অপরদল দ্বারা প্রতিহত না করতে থাকতেন, তাহলে (একটি ক্ষমতালোভী উদ্ধত্ব্যবাদী গোষ্ঠি) পৃথিবীকে অবশ্যই বিশৃঙ্খল/ফ্যাসাদময় বানিয়ে দিতো। কিন্তু আল্লাহ হলেন বিশ্ববাসীর উপর অনুগ্রহকারী’। [সূরা বাকারাহ ২৫১]
 
ইমাম ইবনে জারীর তাবারী রহ. (মৃ: ৩১০ হি:) নিজ সনদে সুদ্দি রহ. থেকে উপরোক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, এখানে يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ -‘নিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি’ –এর অর্থ হল: ملَّكه في الأرض – ‘(আল্লাহ তআলা) তাঁকে জমিনে শাসনকর্তৃত্ব দিয়েছিলেন’। এরপর তাবারী রহ. নিজে আয়াতের অর্থ করেছেন এভাবে: يا داود إنا استخلفناك في الأرض من بعد من كان قبلك من رسلنا حكما ببن أهلها – ‘হে দাউদ! তোমার আগে আমি আমার রাসুলদের মধ্যে থেকে যাদেরকে তাদের নিজ নিজ অধিবাসীদের উপর হাকেম (শাসক) বানিয়ে পাঠিয়েছিলাম, (এখন) আমি তোমাকে তাদের (পরবর্তী একজন স্থলাভিষিক্ত) খলিফা বানালাম (যাতে তুমি আমার নাজিলকৃত শরীয়ত অনুযায়ী তোমার নাগরীকদের উপর শাসন চালাতে পারো)’। [তাফসিরে তাবারী- ২৩/১৮০]
 
ইমাম আবুল লাইস নসর বিন মুহাম্মাদ সমরকন্দি রহ. (মৃ: ৩৭৩ হি:) এখানে إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِনিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি -এর অর্থ করেছেন- يعني: أكرمناك بالنبوة، وجعلناك خليفة، والخليفة الذي يقوم مقام الذي قبله، فقام مقام الخلفاء الذين قبله، وكان قبله النبوة في سبط، والملك في سبط آخر، فأعطاهما الله تعالى لداود – ‘আমরা তোমাকে নবুওত দিয়ে সম্মানীত করেছি এবং তোমাকে খলিফা বানিয়েছি’। আর খলিফা হলেন তিনি যিনি তার পূর্বের জনের স্থলে স্থলাভিষিক্ত হন। এভাবেই খলিফাগণ (একের পর এক) তাদের পূর্বের জনের স্থলে স্থলাভিষিক্ত হতে থাকেন। আর নবী দাউদ আ.-এর পূর্বপুরুষদের মধ্যে যেমন নবুওত ছিল, তেমনি অন্য দিকে শাসন-ক্ষমতাও ছিল। আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ আ.-কে (নবুওত ও শাসন-ক্ষমতা) দুটোই দিয়েছেন (দু’ধারারই স্থলাভিষিক্ত করেছেন)। [তাফসিরে সমরকন্দি– ৩/১৩৪ ]
 
ইমাম মাহমুদ জামাখশারী রহ. (মৃ: ৫৩৮ হি:) এখানে يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ -‘নিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি’ -এর অর্থ করেছেন : استخلفناك على الملك في الأرض ، كمن يستخلفه بعض السلاطين على بعض البلاد ويملكه عليها – ‘(হে দাউদ!) নিশ্চই আমি তোমাকে পৃথিবীর একটি রাজ্যের খলিফা বানিয়েছি, যেমনি ভাবে (ইতিপূর্বে) কতক শাসককে কোনো কোনো ভূমির খলিফা বানিয়ে তথাকার (নাগরীকদের) উপর কর্তৃত্বক্ষমতা দেয়া হয়েছিল’। আর فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ – সুতরাং, তুমি মানুষজনের মাঝে হক্ব সহকারে বিচার-ফয়সালা করো’ -এর অর্থ করেছেন: بحكم الله تعالى إذ كنت خليفته – ‘তুমি যখন তাঁর খলিফা হয়ে গেছো, তখন (স্বভাবতই তোমার উপর ফরয হল) আল্লাহ  তাআলা’র বিধান দিয়ে (তাদেরকে শাসন করা এবং তাদের মাঝে ইনসাফের সাথে বিচার-ফয়সালা করা)’[তাফসিরে কাশশাফ, ইমাম জামাখশারী- ৩/৩৭১]
 
ইমাম ফখুরুদ্দিন রাজী রহ. (মৃ: ৬১৫ হি:) এখানে يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ -‘হে দাউদ! নিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি’ –এর অর্থ করেছেন: إنا جعلناك مالكاً للناس ونافذ الحكم فيهم فبهذا التأويل يسمى خليفة ، ومنه يقال خلفاء الله في أرضه ، وحاصله أن خليفة الرجل يكون نافذ الحكم في رعيته وحقيقة الخلافة ممتنعة في حق الله ، فلما امتنعت الحقيقة جعلت اللفظة مفيدة اللزوم في تلك الحقيقة وهو نفاذ الحكم – ‘নিশ্চই আমি তোমাকে (একটি রাজ্যের) জনগণের শাসক বানিয়েছি ও (বানিয়েছি) তাদের মাঝে (আমার) বিধান-কার্যকরকারী (স্বরূপ)’। বস্তুতঃ এই মর্মার্থের সাথেই (নবী দাউদ আ.-কে) খলিফা নামে সম্মোধন করা হয়েছে। তাঁকে বলা হয়েছে, তিনি হলেন আল্লাহ’র জমিনে আল্লাহ’র খলিফা। আর মূলতঃ খলিফা হলেন এমন ব্যাক্তি যিনি তার অধীনস্তদের মাঝে (আল্লাহ’র) বিধান চালু/প্রয়োগ করতে পারেন। আর খিলাফতের মূল বৈশিষ্টই হল, আল্লাহ’র (দ্বীনী) হক্বের রক্ষনাবেক্ষন। যখন (খিলাফতের) মূল বৈশিষ্টের রক্ষনাবেক্ষন করা হবে, তখনই (খলিফা) কথাটির সার্থকতা প্রকাশ পাবে, উপকারী সাব্যস্থ হবে। আর এই মূল বৈশিষ্টের (সার্থকতার) জন্য অপরিহার্য হল (আল্লাহ’র) হুকুম-আহকাম’কে (মানুষের মাঝে) চালু/প্রয়োগ করা’।… [তাফসিরে কাবীর, ইমাম রাজী- ১৩/১৮৪]
 
ইমাম কুরতুবী রহ. (মৃ: ৬২৭ হি:) এখানে إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِনিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি -এর অর্থ করেছেন: ملكناك لتأمر بالمعروف وتنهى عن المنكر ، فتخلف من كان قبلك من الأنبياء والأئمة الصالحين – ‘আমরা তোমাকে শাসক বানিয়েছি এজন্য যে, তুমি (তোমার নাগরীকদেরকে আমার নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী) ভাল’র নির্দেশ দিবে এবং মন্দ থেকে নিষেধ করবে। বস্তুতঃ তোমার পূর্বেও নবীগণ এবং নেককার ইমামদের (নেতা/শাসকদের) মধ্য থেকে (কাউকে কাউকে জামিনের বিভিন্ন এলাকার) খলিফা বানানো হয়েছিল’…। আর فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّসুতরাং, তুমি মানুষজনের মাঝে হক্ব সহকারে বিচার-ফয়সালা করো-এর ব্যাখ্যায় কুরআনের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ ও উদ্দেশ্য একই, যেমন: وقوله : وأن احكم بينهم بما أنزل الله وقوله تعالى : لتحكم بين الناس بما أراك الله وقوله تعالى – ‘আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: ‘তুমি তাদের মাঝে হুকুম জারি করো/বিচার-ফয়সালা করো তা দিয়ে যা আল্লাহ (তোমার প্রতি ওহী সূত্রে) নাজিল করেছেন’। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন: ‘এজন্য যে, যাতে তুমি ওইভাবে হুকুম জারি করতে পারো/বিচার করতে পারো যেভাবে আল্লাহ তোমাকে দেখিয়ে দিয়েছেন’…..’। আর وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَىٰ – ‘এবং তুমি কুপ্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না’ -এর অর্থ করেছেন: لا تقتد بهواك المخالف لأمر الله – ‘তুমি আল্লাহ’র নির্দেশ/বিধানের বিপরীতে নিজের প্রবৃত্তিকে মান্য করবে না’…। [তাফসিরে কুরতুবী- ১৫/১৮৯]
 
ইমাম বাইযাভী রহ. (মৃ: ৬৮৫ হি:) এখানে إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِনিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি -এর অর্থ করেছেন: اسْتَخْلَفْناكَ عَلى المُلْكِ فِيها، أوْ جَعَلْناكَ خَلِيفَةً مِمَّنْ قَبْلَكَ مِنَ الأنْبِياءِ القائِمِينَ بِالحَقِّ – আমরা তোমাকে রাষ্ট্রের খলিফা নিযুক্ত করেছি, বা তোমাকে আমরা তোমার পূর্বের হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত আম্বীয়াগণের খলিফা/স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছি’[আনওয়ারুত তানজিল, ইমাম বাইযাভী- ৫/৪৩]
 
ইমাম বদরুদ্দিন আইনী রহ. (মৃ: ৮৫৫ হি:) এখানে يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً -‘নিশ্চই আমরা তোমাকে খলিফা বনিয়েছি’ -এর অর্থ করেছেন: صيرناك خلفا عمن كان قبلك – ‘তোমার পূর্বে যাঁরা (নবী ও রাসুল) ছিলেন, তোমাকে আমরা তাঁদের খলিফা/স্থালাভিষিক্ত করেছি’। এবং فِي الْأَرْضِ -‘জমিনে’ -এর অর্থ করেছেন: على المُلك من الأرض كمن يستخلفه بعض السلاطين على بعض البلاد ويملكه عليها – ‘পৃথিবীর একটি রাষ্ট্রের উপর (খলিফা স্বরূপ ক্ষমতাসীন করেছি), যেমনি ভাবে (তোমার পূর্বে) কতক শাসককে কোনো কোনো ভূমির খলিফা বানিয়ে তথাকার (নাগরীকদের) উপর কর্তৃত্বক্ষমতা দেয়া হয়েছিল’[উমদাতুল ক্বারী, আইনী- ২৪/২৪০]
 
ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান ইযিয়ী রহ. (মৃ: ৯০৫ হি:) এখানে إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِনিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি -এর অর্থ করেছেন: استخلفناك على الملك أو خليفة ممن قبلك من الأنبياء – আমরা তোমাকে রাষ্ট্রের খলিফা নিযুক্ত করেছি, বা তোমাকে আমরা তোমার পূর্বের আম্বীয়াগণের খলিফা/স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছি’। আর فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ – সুতরাং, তুমি মানুষজনের মাঝে হক্ব সহকারে বিচার-ফয়সালা করো’ -এর অর্থ করেছেন: الذي هو حكم الله تعالى – ‘আল্লাহ তাআলা যে বিধান দিয়েছেন (তা দিয়ে ইনসাফের সাথে শাসন চালাও ও বিচার-ফয়সালা করো)’[জামেউল বয়ান, ইমাম ইযিয়ী- ৩/৪৭৪]
 
মাহমুদ আলুসী রহ. (মৃ: ১২৮০ হি:) এখানে يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ -‘হে দাউদ! নিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি’-এর অর্থ করেছেন: اسْتَخْلَفْناكَ عَلى المُلْكِ فِيها، والحُكْمِ فِيما بَيْنَ أهْلِها، أوْ جَعَلْناكَ خَلِيفَةً مِمَّنْ قَبْلَكَ مِنَ الأنْبِياءِ القائِمِينَ بِالحَقِّ – আমরা তোমাকে রাষ্ট্রের নাগরীকদের খলিফা ও হাকেম নিযুক্ত করেছি, বা তোমাকে আমরা তোমার পূর্বের হক্বের উপর প্রতিষ্ঠিত আম্বীয়াগণের খলিফা/স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছি’। আর فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ ‘সুতরাং, তুমি মানুষজনের মাঝে হক্ব সহকারে বিচার-ফয়সালা করো’ -এর অর্থ করেছেন: الَّذِي شَرَعَهُ اللَّهُ تَعالى لَكَ – আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে শরীয়ত দিয়েছেন (তা দিয়ে তাদেরকে শাসন করো এবং তাদের মাঝে ইনসাফের সাথে বিচার-ফয়সালা করো)’। [রুহুল মাআনী, আলুসী- ২৩/১৮৬]
 
কাযী শওকানী রহ. (মৃ: ১২৫০ হি:) এখানে يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ -‘নিশ্চই আমরা তোমাকে জমিনে খলিফা বনিয়েছি’ -এর অর্থ করেছেন : اسْتَخْلَفْناكَ عَلى الأرْضِ لِمَن قَبْلَكَ مِنَ الأنْبِياءِ لِتَأْمُرَ بِالمَعْرُوفِ وتَنْهى عَنِ المُنْكَرِ – ‘(হে দাউদ!) আমরা তোমাকে পৃথিবীতে পূর্ববর্তী আম্বীয়াগণের খলিফা/স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছি, এজন্য যে, তুমি (তোমার অধীন্ত মানুষজনকে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী) ভাল’র নির্দেশ দিবে এবং (আল্লাহর নিষেধকৃত) মন্দ হতে বিরত রাখবে’। আর فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ – সুতরাং, তুমি মানুষজনের মাঝে হক্ব সহকারে বিচার-ফয়সালা করো’ -এর অর্থ করেছেন: بِالعَدْلِ الَّذِي هو حُكْمُ اللَّهِ بَيْنَ عِبادِهِ – ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে বিধান দিয়েছেন (তুমি) তা দিয়ে (তাদেরকে শাসন করো এবং তাদের মাঝে) ইনসাফের সাথে (বিচার-ফয়সালা করো)’[ফাতহুল ক্বাদির, শাওকানী- ৩/৪২৯]
 
ড. নসর বিন আলী আয়েয হাসান রহ. লিখেছেন- و هذه الآية فيها ارشاد و تعليم من الباري جل و علا لعباده المؤمنين انه لا بد من خليفة يقوم بالحكم بما انزل الله بين عباده لتصلح به البلاد العباد – ‘আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মধ্যে তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে এই কথার তা’লিম দিয়েছেন যে, খলিফার বিশেষ কর্তব্য হবে নগর ও নাগরীকদের (দ্বীন-দুনিয়ার) ইসলাহ/সংশোধনের জন্য আল্লাহ’র নাজিলকৃত বিধান নিয়ে তাঁর বান্দাদের সামনে দাঁড়ানো’[আকীদাতু আহলিস সুন্নাহ ফি সাহাবাতিল কিরাম: পৃ: ৫০৮]

আমার মনে হয় না, সম্মানীত মুফাসসিরীনে কেরামের এই সকল সুস্পষ্ট তাফসিরের আরো ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে। 

উপরোক্ত হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-  لَا نَبِيَّ بَعْدِي وَسَيَكُونُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُونَ – ‘আমার পর কোনো নবী নেই। শিঘ্রই (আমার পর সিয়াসাতী/রাজনৈতিক/পলিটিকাল দায়িত্ব পালনের জন্য) খলিফাগণ হবেন, পরে (ভাল-মন্দ মিলিয়ে খলিফা’র সংখ্যা) অনেক হবে’। 

এর অর্থ এটাই যে, বণী ইসরাঈলের লোকেরা যখন আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত দ্বীন ও শরীয়ত’কে নষ্ট করে ফেলতো বা মৃতপ্রায় বানিয়ে দিতো, তখন সেটাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলে পূর্ববত নিজ পায়ে দাঁড় করিয়ে দেয়া সহ তার হিফাজত করার লক্ষ্যে একের পর এক নবীগণকে পাঠাতেন। নবীগণই বনী ইসরাঈলের লোকদের আমীর/হাকেম/ইমাম হতেন যাঁরা তাঁদের অধীনস্তদের মাঝে আল্লাহ’র বিধান পূণরায় জারি করতেন, তাদের বিচার ফয়সালা আল্লাহ’র বিধান দিয়েই করতেন, আর যখন এসব দায়িত্ব পালনে কাফের/মুনাফেকদের দ্বারা বাঁধার সম্মুখিন হতেন, তখন আল্লাহ’র নির্দেশক্রমে যেভাবে তাদের মুকাবেলা করা দরকার তা করতে গিয়ে তাঁদেরকে বহু সিয়াসাতী/রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করতে হত এবং একাজে মুমিন নর-নারীগণ তাঁদের সাহায্য করতেন।

একইভাবে আল্লাহ তাআলার তাঁর সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি যে দ্বীন ও শরীয়ত নাজিল করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলমানদের আমীর/হাকেম/ইমাম হিসেবে সেই শরয়ী বিধিবিধানকে মুসলমানদের উপর জারি করেছেন, সেই শরয়ী বিধিবিধান দিয়েই তাদেরকে শাসন করেছেন, সেই শরয়ী বিধিবিধান দিয়েই তাদের বিচার-ফয়সালা করেছেন, সেই শরয়ী বিধিবিধান দিয়েই অর্থনীতির ইসলামীকিকরণ করেছেন, সেই শরয়ী বিধিবিধান অনুসারেই ইসলামের দুশমনের সাথে সন্ধি ও জিহাদ করেছেন পরিচালনা করেছেন। মুমিন সাহাবায়ে কেরাম জীবন বাজি রেখে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সাহায্য করেছেন। এখন প্রশ্ন হল, শেষ নবী ﷺ-এর মৃত্যুর পর কি এতসব দ্বীনী সিয়াসাতী/রাজনৈতিক দায়িত্বও দাফন হয়ে যাবে? জবাব হল: নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর পর আমীর/হাকেম/ইমাম হওয়ার জন্য আর কোনো নবী আসবে না সত্য, তবে নবীর স্থলে এবারে দ্বীনী সিয়াসাতী/রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবে মুসলীম উম্মাহ’র মধ্য থেকেই নিযুক্ত খলিফাগণ।

খোদ আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি মুসলীম উম্মাহ’র মধ্যে সুযোগ্য মুমিনগণকে জমিনের বুকে পূর্ণ সিয়াসাতী/রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও শাসন ক্ষমতা দান করবেন, যা অপরাপর সকল দ্বীন, মতবাদ ও মতাদর্শের উপর প্রবল আকারে বিরাজমান থাকবে -যাবৎ না তারা আল্লাহৎর সাথে কুফরী ও অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করে। তিনি এরশাদ করেন-  

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

‘আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, যারা তোমাদের মধ্য থেকে (ইমানের দাবী অনুযায়ী) ইমান আনবে এবং (কুরআন-সুন্নাহ মাফিক) নেক কাজ করবে, তিনি অবশ্য-অবশ্যই তাদেরকে জমিনে খলিফা বানাবেন, যেমনি ভাবে তিনি- তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে খলিফা বানিয়েছিলেন এবং অবশ্য-অবশ্যই তাদের জন্য তাদের (ওই) দ্বীনকে (জমিনের বুকে) সুদৃঢ় করে দিবেন, যে (দ্বীন)টিকে তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং অবশ্য-অবশ্যই তাদের (উপর বয়ে যাওয়া নিরাপত্তাহীনতা জনিত) ভীতি’র পর (সেই পরিবেশকে) তাদের নিরাপত্তা দ্বারা বদলিয়ে দিবেন’। (তখন) তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। (এই অবস্থা যতদিন চলবে, ততদিন আমার ওয়াদা বহাল থাকবে)। কিন্তু এর পর যারা কুফরী করবে (ও অকৃতজ্ঞ হবে), বস্তুত: ওরাই -ওরাই হল ফাসেক গোষ্ঠি। [সূরা নূর ৫৫]

ইমাম ইবনে জারীর তাবারী রহ. (মৃ: ৩১০ হি:) বলেছেন: এখানে وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ -‘নেক কাজ করবে’অর্থ وأطاعوا الله ورسوله فيما أمراه ونهياه – তারা (জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে) অনুগত্য করবে আল্লাহ’র ও তাঁর রাসুলের – যে বিষয়ে তাঁরা আদেশ করেছেন বা নিষেধ করেছেন। আরلَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ তিনি অবশ্য-অবশ্যই তাদেরকে জমিনে খলিফা বানাবেন’-এর অর্থ : ليورثنهم الله أرض المشركين من العرب والعجم، فيجعلهم ملوكها وساستها – আল্লাহ তাআলা অবশ্য-অবশ্যই তাদেরকে আরবের মুশরেকদের স্থলে এবং অনারবেও -পৃথিবীর (ব্যাপক এলাকা জুড়ে) ওয়ারিস বানাবেন এবং তাদেরকে (সেখানে) শাসনক্ষমতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দিবেন। আর كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ – ‘যেমনি ভাবে তিনি- তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে খলিফা বানিয়েছিলেন’ অর্থ: كما فعل من قبلهم ذلك ببني إسرائيل ، إذ أهلك الجبابرة بالشأم ، وجعلهم ملوكها وسكانها – যেমনিটা করেছিলেন তাদের পূর্বে বনী ইসরাঈলদের সাথে, যখন শাম-এর জাবাবিরাহ (জালেমানাহ শাসন ব্যবস্থা)কে ধ্বংস করে দিয়ে (তদস্থলে) তাদেরকে শাসক বানানো হয়েছিল ও (তাদের জন্য নিরাপত্তা বেষ্টিত) আবাসস্থলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। [তাফসীরে তাবারী – ১৮/২১১]

ইমাম আবু মুহাম্মাদ বগভী রহ. (মৃ: ৫১৬ হি:) লিখেছেন- এখানে لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ – ‘তিনি অবশ্য-অবশ্যই তাদেরকে (জমিনের বুকে) খলিফা বানাবেন’ – এর অর্থ: ليورثنهم أرض الكفار من العرب والعجم ، فيجعلهم ملوكها وساستها وسكانها – ‘তাদেরকে আরব ও আজম (অনারব) কাফেরদের  ভূমির ওয়ারিস বানাবেন, শাসক বানাবেন, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দিবেন, (নিরাপদ) বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিবেন’। আর كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ – ‘যেমনি ভাবে তিনি- তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে খলিফা বানিয়েছিলেন’ -এর অর্থ: بني إسرائيل حيث أهلك الجبابرة بمصر والشام وأورثهم أرضهم وديارهم – ‘এর অর্থ: বনী ইসরাঈল। তাদের সময়ে মিশর ও শাম-এর জাবাবিরাহ (জালেমানাহ) শাসন ব্যবস্থা’কে ধ্বংস করে (তদস্থলে) তাদেরকে ওসব এলাকাসমূহের ওয়ারিস রানানো হয়েছিল। আর وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ অবশ্য-অবশ্যই তাদের জন্য তাদের (ওই) দ্বীনকে (জমিনের বুকে) সুদৃঢ় করে দিবেন, যে (দ্বীন)টিকে তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন’ অর্থ: قال ابن عباس : يوسع لهم في البلاد حتى يملكوها ويظهر دينهم على سائر الأديان – ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: তিনি তাদেরকে প্রসস্থ অঞ্চল জুড়ে শাসন-কর্তৃত্ব দিবেন এবং তাদের দ্বীন (ইসলাম)কে (পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান) বাকি সব দ্বীন (ধর্ম ও মতবাদ)-এর উপর প্রবল করে দিবেন’। [মাআলিমুত তানযিল, ইমাম বগভী- ৩/৩৫৪]

ইমাম মাহমুদ জামাখশারী (মৃ: ৫৩৮ হি:) লিখেছেন- الخطاب لرسول الله صلى الله عليه وسلم ولمن معه. ومنكم: للبيان، كالتي في آخر سورة الفتح: وعدهم الله أن ينصر الإسلام على الكفر، ويورّثهم الأرض، ويجعلهم فيها خلفاء، كما فعل ببني إسرائيل، حين أورثهم مصر والشام بعد إهلاك الجبابرة، وأن يمكن الدين المرتضى وهو دين الإسلام. وتمكينه: تثبيته وتوطيده، وأن يؤمن سربهم ويزيل عنهم الخوف الذي كانوا عليه، وذلك – এই আয়াতে রাসুলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবীগণ’কে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে।…আল্লাহ তাআলা তাঁদের সাথে ওয়াদা করেছেন যে, (অচিরেই) কাফের’দের বিপরীতে ইসলামকে সাহায্য করা হবে এবং তাঁদেরকে জমিনের ওয়ারিস বানানো হবে এবং বানানো হবে (জমিনের) খলিফা, যেমনটা করা হয়েছিল বনী-ইসরাঈলদের সাথে, যেখানে তাদেরকে (ফেরআউনের) জাবাবিরাহ (তথা জালেমানাহ শাসন কাল)-এর ধ্বংসের পর মিশর ও শাম-এর ওয়ারিস বানানো হয়েছিল। (আল্লাহ তাআলা এখানে এও ওয়াদা করেছেন) যে, তিনি তাঁদের (সেই) দ্বীন’কে (জমিনের বুকে) প্রতিষ্ঠিত করে দিবেন, (যে দ্বীনটির উপর তিনি) সন্তুষ্ট, তথা দ্বীন-ইসলাম, তিনি ইসলামকে (নিরাপত্তার মজবুত বেষ্টনির ভিতরে) স্থান করে দিবেন, (বিশেষ সময়ের জন্য জমিনে) তাকে পোক্তভাবে সুদৃঢ় করে গেড়ে দিবেন (যেটাকে ইসলামের দুশমনরা উপড়াতে পারবে না)। (আল্লাহ তাআলা আরো ওয়াদা করেছেন) যে, তিনি তাদের ছিদ্রকে নিরাপত্তা বেষ্টিত করে দিবেন এবং তারা (এ শক্রুদের পক্ষ থেকে যাবৎ জান মাল নিয়ে) যে ভয়-ভীতির মধ্যে ছিল তিনি তাদের থেকে থেকে সেই ভয়-ভীতির তুলে নিবেন..’।      [তাফসিরে কাশশাফ, জামাখশারী- ৩/৭৩]

ইমাম ফখুরুদ্দিন রাজী রহ. (মৃ: ৬১৫ হি:) লিখেছেন- فقد وعد الله الذين آمنوا منكم وعملوا الصالحات أي الذين جمعوا بين الإيمان والعمل الصالح أن يستخلفهم في الأرض فيجعلهم الخلفاء والغالبين والمالكين كما استخلف عليها من قبلهم في زمن داود وسليمان عليهما السلام وغيرهما، وأنه يمكن لهم دينهم وتمكينه ذلك هو أن يؤيدهم بالنصرة والإعزاز ويبدلهم من بعد خوفهم من العدو أمناً – ‘বস্তুতঃ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ -‘আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, যারা তোমাদের মধ্য থেকে (ইমানের দাবী অনুযায়ী) ইমান আনবে এবং (কুরআন-সুন্নাহ মাফিক) নেক কাজ করবে-(এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে) যারা (তাদের জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে) ইমান ও নেক আমলের মাঝে (কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী) সম্মন্ধ জুড়ে নিয়েছে। বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জমিনে খলিফা বানাবেন, (দ্বীনের দুশমনদের বিরুদ্ধে) তাদেরকে প্রবল ও ক্ষমতাধর শাসক বনিয়ে দিবেন, যেমনি করে বানিয়েছিলেন তাদের পূর্বে (নবী) দাউদ ও (নবী) সুলাইমান আ. প্রমূখের জামানায়, তাদের দ্বীন (ইসলাম)কে (জমিনের বুকে) প্রতিষ্ঠিত করে দিবেন, তাদেরকে (নিরাপত্তার মজবুত বেষ্টনির ভিতরে) স্থান করে দিবেন, তাদের প্রতি সাহায্য ও মহব্বতের হাত বাড়িয়ে দিবেন এবং (ইসলামের) শত্রুদের পক্ষ থেকে (জান ও মালের নিরাপত্তাহীনতার যে ) ভয় ও আশংকা (রয়েছে, সেই অবস্থা)কে নিরাপত্তা দ্বারা বদলিয়ে দিবেন।…’ [তাফসিরে কাবীর, ইমাম রাজী- ২৪/২৪]

আল্লাহ তাআলা তাঁর এই ওয়াদাটি বিশ্বনবী -এর জীবন কালেই বাস্তবতাম মুখ দেখা শুরু করে দিয়েছিল, পরে তা মুসলীম জাহানের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. এবং দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারূক রা. -এর জামানায় ‘দ্বীন ইসলাম’ পাঁকাপোক্ত রূপে জমিনের বুকে তার স্থান করে নেয়, মুসলীম জাহান ইমান ও আমানে ভরে যায়। পরে তৃতীয় খলিফা ওসমান গণী রা.-এর জামানায় ইসলামী খিলাফতের আকার অস্বভাবিক আকারে বেড়ে যায়। চতুর্থ খলিফা আলী রা. তাঁর জামানায় ইসলামের অভ্যন্তরিন দুশমন ‘খারেজী’ ফিতনার শিং-কে প্রথমবারের মতো শক্তহাতে ভেঙ্গে দেয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। এই চারজন সাহাবায়ে কেরাম রা. সর্বসম্মতভাবে ‘খুলাফায়ে রাশেদীন’ (সরল সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত খলিফা) হিসেবে গণ্য। 

ইমাম বগভী রহ. (মৃ: ৫১৬ হি:) লিখেছেন: و في الآية دلالة على خلافة الصديق وإمامة الخلفاء الراشدين – ‘এই আয়াতেটি  খিলাফতে (আবু বকর) সিদ্দিক এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের শাসন ব্যাবস্থার ব্যাপারে একটি (বিশেষ) দলিল (যে, তাঁদের জামানায় আল্লাহ’র এই ওয়াদাটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে)’। [মাআলিমুত তানযিল, ইমাম বগভী- ৩/৩৫৪]

ইমাম আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-আযুরী রহ. (মৃ: ৩২০ হি:) লিখেছেন- اعلموا ، رحمنا الله وإياكم أن خلافة أبي بكر، وعمرَ، وعثمانَ، وعليٍّ رضي الله عنهم بيانها في كتاب الله عز وجل وفي سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، وبيان من قول أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم، وبيان من قول التابعين لهم بإحسان . ولا ينبغي لمسلم عَقَلَ عن الله عز وجل أن يشك في هذا . فأما دليل القرآن: فإن الله عز وجل قال: وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا . فقد واللهِ، أنجز اللهُ الكريمُ لهم ما وعدهم به، جعلهم الخلفاء من بعد رسول الله صلى الله عليه وسلم ومكنهم في البلاد، وفتحوا الفتوح، وغنموا الأموال، وسبوا ذراري الكفار، وأسلم في خلافتهم خلقٌ كثيرٌ، وقاتلوا مَن ارتدَّ عن الإسلام حتى أجلوهم، ورجع بعضهم، كذلك فعل أبو بكر الصديق – رضي الله عنه -، فكان سيفُه فيهم سيفَ حقٍّ إلى أن تقوم الساعة، وكذلك الخليفة الرابع وهو علي بن أبي طالب – رضي الله عنه – كان سيفه في الخوارج سيف حق إلى أن تقوم الساعة، فأعز الله الكريم دينه بخلافتهم، وأذلوا الأعداء، وظهر أمر الله، ولو كره المشركون، وسنوا للمسلمين السنن الشريفة، وكانوا بركة على جميع أمة محمد – صلى الله عليه وسلم من أهل السنة والجماعة . الشريعة للإمام الآجُرِّيِّ : ص٤٣٨، ط/ دار الحديث – ‘জেনো রাখো -আল্লাহ তাআলা আমাদের ও তোমাদের উপর রহম করুন- আবু বকর (সিদ্দিক) রা., ওমর (ফারূক) রা., ওসমান রা. এবং আলী রা. -এর খিলাফতের বয়ান (খোদ্) আল্লাহ’র কিতাব (কুরআন)-এ হয়েছে, রয়েছে রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাদিসেও। এর বয়ান রয়েছে রাসুলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীগণের (অনেকের) বর্ণনাতে, রয়েছে তাবেয়ী’গণের বর্ণনাতেও। কোনো মুসলমানের জন্যেই এটা উচিৎ নয় যে, সে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বিবেক খাঁটিয়ে সন্দেহ-সংশয়ে নিপতিত হবে। এক্ষেত্রে কুরআনের দলিল হল, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন: وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا‘আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, যারা তোমাদের মধ্য থেকে (ইমানের দাবী অনুযায়ী) ইমান আনবে এবং (কুরআন-সুন্নাহ মাফিক) নেক কাজ করবে, তিনি অবশ্য-অবশ্যই তাদেরকে জমিনে খলিফা বানাবেন, যেমনি ভাবে তিনি- তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে খলিফা বানিয়েছিলেন এবং অবশ্য-অবশ্যই তাদের জন্য তাদের (ওই) দ্বীনকে (জমিনের বুকে) সুদৃঢ় করে দিবেন, যে (দ্বীন)টিকে তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং অবশ্য-অবশ্যই তাদের (উপর বয়ে যাওয়া নিরাপত্তাহীনতা জনিত) ভীতি’র পর (সেই পরিবেশকে) তাদের নিরাপত্তা দ্বারা বদলিয়ে দিবেন’। (তখন) তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না’। আল্লাহ’র কসম, তিঁনি তাদেরকে যা যা দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন তার সবই দিয়েছে পরিপূর্ণরূপে। তিনি তাদেরকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর পর (জমিনের বুকে) খলিফা বানিয়েছেন, তাদেরকে বিভিন্ন অঞ্চলের কতৃত্ব দিয়েছে, দিকে দিকে বিজীত করেছেন, গণীমতের সম্পদে আপ্লুত করেছেন, কাফেরদেরকে শক্ত হাতে বন্দি করেছেন, তাঁদের খিলাফতের জামানা গুলোতে বহু লোক ইসলাম গ্রহন করেছে, তারা মুরতাদদেরকে কতল করেছেন -সেটা বিলম্ব হলেও, তাদের মধ্যে কেউ কেউ (দ্বীন ইসলামের ভিতরে) ফিরেও এসেছে। এমনটা করেছিলেন আবু বকর সিদ্দিক। তাদের মাঝে তাঁর তরবারী ছিল হক্কের তরবারী যাবৎ না কিয়ামত আসে। আল্লাহ তাআলা তাঁদের খিলাফতের মাধ্যমে দ্বীন (ইসলাম)কে সম্মানিত করেছেন, দুশমনদেরকে লাঞ্চিত করেছেন, আল্লাহ’র দ্বীনকে প্রবল হয়েছে -যদিও মুশরেকরা তাতে অসন্তুষ্ট হয়েছে। তাঁরা মুসলমানদের জন্য পবিত্র সুন্নাহ জারি করেছেন। বস্তুতঃ গোটা উম্মতে-মুহাম্মাদী ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ তাঁদের বরকতে ধন্য হয়েছে’ । [আশ-শারইয়াহ, ইমাম আযুরী: ৪৩৮ পৃ:]

ইমাম ইবনে কাসির রহ. (মৃ: ৭৭৪ হি:) লিখেছেন- هذا وعد من الله لرسوله صلى الله عليه وسلم . بأنه سيجعل أمته خلفاء الأرض ، أي : أئمة الناس والولاة عليهم ، وبهم تصلح البلاد ، وتخضع لهم العباد ، وليبدلن بعد خوفهم من الناس أمنا وحكما فيهم ، وقد فعل تبارك وتعالى ذلك . وله الحمد والمنة ، فإنه لم يمت رسول الله صلى الله عليه وسلم حتى فتح الله عليه مكة وخيبر والبحرين ، وسائر جزيرة العرب وأرض اليمن بكمالها . وأخذ الجزية من مجوس هجر ، ومن بعض أطراف الشام ، وهاداه هرقل ملك الروم وصاحب مصر والإسكندرية – وهو المقوقس – وملوك عمان والنجاشي ملك الحبشة ، الذي تملك بعد أصحمة ، رحمه الله وأكرمه . ثم لما مات رسول الله صلى الله عليه وسلم واختار الله له ما عنده من الكرامة ، قام بالأمر بعده خليفته أبو بكر الصديق ، فلم شعث ما وهى عند موته ، عليه الصلاة والسلام وأطد جزيرة العرب ومهدها ، وبعث الجيوش الإسلامية إلى بلاد فارس صحبة خالد بن الوليد ، رضي الله عنه ، ففتحوا طرفا منها ، وقتلوا خلقا من أهلها . وجيشا آخر صحبة أبي عبيدة ، رضي الله عنه ، ومن معه من الأمراء إلى أرض الشام ، وثالثا صحبة عمرو بن العاص ، رضي الله عنه ، إلى بلاد مصر ، ففتح الله للجيش الشامي في أيامه بصرى ودمشق ومخاليفهما من بلاد حوران وما والاها ، وتوفاه الله عز وجل ، واختار له ما عنده من الكرامة . ومن على الإسلام وأهله بأن ألهم الصديق أن استخلف عمر الفاروق ، فقام في الأمر بعده قياما تاما ، لم يدر الفلك بعد الأنبياء [ عليهم السلام ] على مثله ، في قوة سيرته وكمال عدله . وتم في أيامه فتح البلاد الشامية بكمالها ، وديار مصر إلى آخرها ، وأكثر إقليم فارس ، وكسر كسرى وأهانه غاية الهوان ، وتقهقر إلى أقصى مملكته ، وقصر قيصر ، وانتزع يده عن بلاد الشام فانحاز إلى قسطنطينة ، وأنفق أموالهما في سبيل الله ، كما أخبر بذلك ووعد به رسول الله ، عليه من ربه أتم سلام وأزكى صلاة . ثم لما كانت الدولة العثمانية ، امتدت المماليك الإسلامية إلى أقصى مشارق الأرض ومغاربها ، ففتحتبلاد المغرب إلى أقصى ما هنالك : الأندلس ، وقبرص ، وبلاد القيروان ، وبلاد سبتة مما يلي البحر المحيط ، ومن ناحية المشرق إلى أقصى بلاد الصين ، وقتل كسرى ، وباد ملكه بالكلية . وفتحت مدائن العراق ، وخراسان ، والأهواز ، وقتل المسلمون من الترك مقتلة عظيمة جدا ، وخذل الله ملكهم الأعظم خاقان ، وجبي الخراج من المشارق والمغارب إلى حضرة أمير المؤمنين عثمان بن عفان ، رضي الله عنه . وذلك ببركة تلاوته ودراسته وجمعه الأمة على حفظ القرآن; ولهذا ثبت في الصحيح عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه قال : ” إن الله زوى لي الأرض ، فرأيت مشارقها ومغاربها ، وسيبلغ ملك أمتي ما زوي لي منها ” فها نحن نتقلب فيما وعدنا الله ورسوله ، وصدق الله ورسوله ، فنسأل الله الإيمان به ، وبرسوله – আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সা.-এর কাছে এই ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাঁর উম্মত (-এর মধ্যে খাঁটি ইমানদার মুসলীম জামাআত)’কে জমিনের (বুকে) খলিফা বানাবেন, অর্থাৎ মানুষের ইমাম (দিশারী/কান্ডারী) এবং তাদের উপর (কর্তৃত্বকারী) শাসক বানাবেন, তাদের দ্বারা বিভিন্ন এলাকার (নৈতিক ও আধ্যত্বীক) সংশোধন করাবেন, (তাঁর অন্যান্য অকৃতজ্ঞ) বান্দারা তাঁদের অনুগত হয়ে যাবে, তাঁরা (সদা সর্বদা ইসলাম বিরোধী) মানুষের পক্ষ থেকে (জান ও মালের যে নিরাপত্তাহীনতার) ভয় ও আশংকাবোধ করতেন সেই অবস্থার বদলে তাদেরকে (নিজেস্ব আলয়ের মজবুত) নিরাপত্তা দেয়া হবে এবং (দেয়া হবে) ওদের মাঝে (চালানোর মতো) শাসনক্ষমতা। বস্তুতঃ আল্লাহ তাবারাক ওয়া তাআলা (তাঁর পবিত্র ওয়াদা মাফিক) তা করেছেন। সকল প্রশংসা আল্লাহ’র প্রাপ্য; এটা তাঁরই করুনা। দেখুন, রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের কিছুকাল আগেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে মক্কার বিজয়, খায়বর, বাহরাঈন, বৃহত্তর আরব উপকুল, গোটা ইয়ামেন দান করেন। তিনি যিযিয়া উসূল করেন হাযরের মাজুস এবং শামের কিছু এলাকা থেকে। রোমান সম্রাট হিরকল (হিরাক্লিয়াস), মিশর ও ইসকান্দ্রিয়া’র অধিপতি মাকুকাস তাঁর কাছে উপহার সামগ্রী পাঠায়। আর আম্মানের শাসক এবং হাবশা’র শাসক নাজ্জাসী -যিনি আসহামাহ’র পর শাসক হন -তারাও (রাসুলুল্লাহ সা.-কে সম্মান করেন)। আল্লাহ তাআলা নাজ্জাসীর উপর রহম করুন এবং তাকে সম্মানীত করুন।

এরপর রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকাল হলে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য যে মর্যাদা নিজের কাছে রেখেছেন তা তাঁকে দান করেন। এরপর খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. (রাসুলুল্লাহ সা.-এর রেখে যাওয়া) একই কাজ নিয়ে দাঁড়ান। বস্তুতঃ রাসুলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের সময় (দ্বীনের) যে বিষয়টি (যে অবস্থায় ছিল, তাতে) তিনি শিথীলতা/বিশৃঙ্খলা আনতে দেননি, তিনি বৃহত্তর আরব উপকুল’কে শক্তিশালী করেছিলেন, করেছিলেন সুগঠিত। তিনি খালিদ বিন ওয়ালীদের নেতৃত্বে পারস্য ভুমিতে ইসলামী সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং পারস্যের একাংশ বিজয় লাভ করে। সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে (যারা ইসলামের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের) কতককে কতল করা হয়। এমনিভাবে তিনি আবু উবাইদাহ রা.-এর নেতৃত্বে কয়েকজন আমীর সমেত আরেকটি সৈন্যবাহিনী শাম-এ প্রেরন করেন। আমর বিন আস রা.-এর নেতৃত্বে তৃতীয় আরেকটি সৈন্যবাহিনী প্রেরন করেন মিশরে। পরে আল্লাহ তাআলা শামে প্রেরিত সৈন্যবাহিনীকে তাঁর আমলেই বুসরা, দামেশক, তাদের বিপরীত পার্শ্বে অবস্থিত হাওরান এবং আশে পাশের কিছু অঞ্চলের উপর বিজয় দান করেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে মৃত্যুর স্বাদ আসাদন করান এবং তাঁর জন্য যে মর্যাদা নিজের কাছে রেখেছেন তা তাঁকে দান করেন, সাথে এই অনুগ্রহ করেন যে, আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর অন্তরে ওমর ফারুক রা.-কে পরবর্তী খলিফা বানানোর কথাটি ঢেলে দেন। ফলে তাঁর (ইন্তেকালের) পর ওমর ফারুক রা. (খিলাফতের) কাজ নিয়ে পূর্ণদমে দাঁড়িয়ে যান। আম্বীয়ায়ে কেরাম আ.-এর পর তাঁর মতো সুগঠিত চরিত্র ও ইনসাফে পরিপূর্ণ কোনো (মানব)জাহাজ (আজ পর্যন্ত এ ধরায়) জন্মগ্রহন করেনি। তাঁরই আমলে গোটা শাম অঞ্চল, মিশরের মাথা থেকে অন্ত পর্যন্ত এলাকা, পারস্যের বেশিরভাগ অঞ্চল বিজীত হয়। কিসরা সম্রাজ্য একেবারে খানখান হয়ে যেতে থাকে, হয় (ইসলামের পতাকাতলে) পদদলীত এবং তার সাম্রাজ্য পিছাতে পিছাতে একেবারে দেয়ালে গিয়ে ঠেঁকে। (এভাবে একসময়) তিনি কায়সার’কে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং তার হাত থেকে শাম’কে ছিনিয়ে আনেন। এরপর তিনি কুসতুনতুনিয়ার দিকে মনোযোগী হন এবং (বিজীত) রোম ও পারস্যের ধ্বনসম্পদ আল্লাহ’র পথে ব্যায় করেন। এই সংবাদই দেয়া হয়েছে (আলোচ্য আয়াতে), আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সা.-এর সাথে এই ওয়াদাই করেছিলেন। রাসুল সা.-এর উপর তাঁর রবের পরিপূর্ণ সালাম ও দরূদ নাজিল হোক।

এরপর যখন উসমানী রা.-এর খিলাফত কাল এলো, তখন ইসলামী রাজ্যের সীমানা পূর্ব ও পশ্চিমের শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেঁকলো। আন্দুলুস (স্পেন), কাবরুস, কায়রাওয়ান অঞ্চল এবং বাহরুল মুহিত (আটলান্টিক মহাসাগর) -এর পার্শ্বস্থ সাবতাহ সীমাঞ্চল -এই পশ্চিমাঞ্চলগুলোর শেষ পর্যন্ত (ইসলামী খিলাফতের) করতলগত হল। আর পূর্ব দিকে (খিলাফতের সীমানা) গিয়ে ঠেঁকলো বৃহত্তর চীন পর্যন্ত। কিসরা’কে হত্যা করা হল ও তার গোটা রাজ্যকে বিলুপ্ত করে দেয়া হল। ইরাকের মাদায়েন, খুরাসান, আহওয়ায বিজীত হল। এপর মুসলীম বাহিনী তুর্কীদের সাথে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধে অবতরন করলো। আল্লাহ তাআলা তুর্কীদের রাষ্ট্রপ্রধান খাক্বান’কে (মুসলমানদের হাতে) পরাভূত করলেন। আমীরুল মু’মিনীন উসমান বিন আফফান রা.-এর কাছে পূর্ব ও পশ্চিম (-এর সকল অঞ্চল) থেকে খারায (ভূমি-কর) উসূল করে নিয়ে আসা হতে লাগলো। এসব হয়েছে তাঁর (অধীনস্থ এলাকাগুলোতে কুরআন) তিলাওয়াত, (কালামুল্লাহ’র) শিক্ষা ব্যবস্থা চালু এবং উম্মতকে কুরআন সংরক্ষনের ব্যাপারে একত্র করার বরকতে। আর এসব কথা রাসুলুল্লাহ সা. থেকে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যেখানে তিনি বলেছেন: إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِيَ الْأَرْضَ ، فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا ، وَسَيَبْلُغُ مُلْكُ أُمَّتِي مَا زُوِيَ لِيَ مِنْهَا আল্লাহ তাআলা আমার জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত করে দিয়েছিলেন। ফলে আমি তার পূর্ব ও পশ্চিম (দিগন্ত পর্যন্ত বহুদূর) দেখতে পেলাম। আর (সুসংবাদ গ্রহন করো,) আমার জন্য যতটুকু অংশ সংকুচিত করা হয়েছিল, শিঘ্রই আমার উম্মতের রাজ্য সেই পর্যন্ত গিয়ে ঠেঁকবে। এই হল আমাদের (মুসলীম উম্মাহ’র পূর্বসূরীগণের দ্বারা আনীত ইসলামী) বিপ্লব যার ওয়াদা করেছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা.। আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন এবং সত্য বলেছেন তাঁর রাসুলও।…[তাফসীরে ইবনে কাসির– ৬/৮৮, ৮৯]

বহু হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পর থেকে নিয়ে নবী ঈসা ইবনে মারইয়াম আ.-এর দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আগমন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে খুলােফায়ে রাশেদীন সহ বহু খলিফা আগমণের ইংগীত রয়েছে। যেমন:

# আবু তুফায়েল রা. থেকে উত্তম সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি হুযাইফা রা.-কে একথা বলতে শুনেছেন-  يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا تَسْأَلُونِي فَإِنَّ النَّاسَ كَانُوا يَسْأَلُونَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ الْخَيْرِ وَكُنْتُ أَسْأَلُهُ عَنْ الشَّرِّ إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ نَبِيَّهُ عَلَيْهِ الصَّلَاة وَالسَّلَامُ فَدَعَا النَّاسَ مِنْ الْكُفْرِ إِلَى الْإِيمَانِ وَمِنْ الضَّلَالَةِ إِلَى الْهُدَى فَاسْتَجَابَ مَنْ اسْتَجَابَ فَحَيَّ مِنْ الْحَقِّ مَا كَانَ مَيْتًا وَمَاتَ مِنْ الْبَاطِلِ مَا كَانَ حَيًّا ثُمَّ ذَهَبَتْ النُّبُوَّةُ فَكَانَتْ الْخِلَافَةُ عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ . اخرجه أحمد: ١٦/٦٢٤ رقم ٢٣٣٢٤ قال حمزة احمد الزين إسناده حسن – ‘হে লোকসকল! (আমি বেঁচে থাকতে) তোমরা আমাকে (রাসুলুল্লাহ -এর ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে) কেনো জিজ্ঞেস করো না ? কারণ, লোকেরা রাসুলুল্লাহ -কে কল্যান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো, আর আমি জিজ্ঞেস করতাম মন্দ সম্পর্কে। আল্লাহ তাঁর নবীকে পাঠিয়েছেন। ফলে তিনি মানুষকে ডাক দিয়েছেন কুফর থেকে ইমানের দিকে এবং পথভ্রষ্ঠতা থেকে হেদায়েতের দিকে। সুতরাং (মানুষের মধ্য থেকে তাঁর ডাকে) যার সারা দেয়ার সে সারা দিয়েছে। ফলে যে হক্ব ( ও সত্য এক সময়) মৃত ছিল তা (তাঁদের দ্বারা পূণরায়) জীবিত হয়েছে এবং যে বাতিল (ও পথভ্রষ্ঠতা এক সময়) জীবিত ছিল তা (দ্বীন ইসলামের নিচে চাঁপা পড়ে) মড়ে গেছে। এরপর (সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ -এর ইন্তেকালের মাধ্যমে) নবুওত (-এর জামানা) চলে গেছে। পরে হয়েছে নবুওতী পন্থার খিলাফত (ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হল তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীন ইসলামকে জমিনের বুকে পরিপূর্ণ ভাবে মাথা উচু করে জীবন্ত করে রাখা; মড়তে না দেয়া)’। [মুসনাদে আহমদ– ১৬/৬২৪ হাদিস ২৩৩২৪]

# ইরবাজ বিন সারিয়া রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন–  اوصيكم بتقوى الله والسمع والطاعة وان كان عبدا حبشيا فإنه من يعش منكم يرى بعدي اختلافا كثيرا فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين وعضوا عليها بالنواجذ وإياكم ومحدثات الأمور فان كل محدثة بدعة وان كل بدعة ضلالة . أخرجه احمد فى المسند: ٤/١٢٦ رقم ١٧١٨٤ و قال شعيب الأرنؤوط : حديث صحيح ورجاله ثقات; رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ: رقم ٤٦٠٧ و صححه الألباني في مشكاة المصابيح برقم ١٦٥ و السلسلة الصحيحة:٢/٦١٠، وَ اَلتِّرْمِذِيُّ رقم: ٢٦٧٦ وَقَالَ: حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ; و ابن ماجه في سننه: رقم ٤٤; الطحاوي في مشكل الآثار:٣/٢٢٣ و سند الحديث جيد ; البغوي في شرح السنة: ١/٢٠٥ و إسناده حسن ; الطبراني فى المعجم الكبير: ١٨/٢٤٦ رقم ٦١٧ ; ابن حبان فى الصحيح : رقم٥ قال شعيب الأرناؤوط: إسناده صحيح ; وقال الجورقاني في الأباطيل والمناكير: هذا حديث صحيح ثابت مشهور: ١/٤٧٢ رقم ٢٨٨; وقال الحافظ ابن حجر في موافقة: هذا حديث صحيح رجاله ثقات: ١/١٣٦-١٣٩; قال ابن عبدالبر فى جامع بيان العلم: هذا حديث ثابت صحيح: ٢/١١٦٤ رقم ٢٣٠٥ ; قال المنذري في الترغيب والترهيب: لا ينزل عن درجة الحسن وقد يكون على شرط الصحيحين أو أحدهما: ١/٦٠; قال الذهبي في سير أعلام النبلاء: إسناده صالح: ١٧/٤٨٢; قال ابن القيم في أعلام الموقعين: حسن، إسناده لا بأس به: ٤/١١٩ – তোমাদেরকে আমি উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করে চলার এবং (তোমাদের উপর নিযুক্ত আমীরের নির্দেশ) শোনা ও মানার -চাই সে কোনো হাবশী গোলামই হোক (না কেনো)। নিশ্চয় অামার (ইন্তেকালের) পরে তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি জীবিত থাকবে সে অনেক দ্বন্দ্ব-বিরোধ দেখতে পাবে। (তখন) তোমারা আমার সুন্নাহ’কে এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়েরাশেদীনের সুন্নাহ’কে তোমাদের উপর অপরিহার্য করে নিবে এবং তা মাড়ির দাঁত দিয়ে তোমরা আঁকড়ে ধরে থাকে (কোনো মতেই ছাড়বে না)। আর তোমরা (দ্বীন ইসলামের মধ্যে আমদানী হওয়া) নতুন নতুন  বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, নিশ্চই (দ্বীনের মধ্যে সুন্নাহ বহির্ভূত) প্রত্যেক নতুন-বিষয় বিদআহ এবং নিশ্চই প্রত্যেক বিদআহ পথভ্রষ্ঠতা’। [মুসনাদে আহমাদ- ৪/১২৬ হাদিস ১৭১৮৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৭; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২৬৭৬; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৫; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ৪৪; শারহু মাআনিল আছার, ইমাম তাহাবী- ৩/২২৩; শারহুস সুন্নাহ, ইমাম বাগাভী- ১/২০৫; আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরানী- ১৮/২৪৬ হাদিস ৬১৭; মুসতাদরাকে হাকীম- ১/৯৫-৯৭]

এই হাদিসটি ‘ইসলামী খিলাফত’ এবং ‘খুলাফায়ে রাশেদীন’ -এর ব্যাপারে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎবাণী ও উপদেশ এবং তা উপরোক্ত ‘সূরা নূর’-এর ৫৫ নং আয়াতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। 

বলি, পথভ্রষ্ঠতা থেকে বাঁচার জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ/আদর্শের পাশাপাশি খুলাফায়ে রাশেদীন রা.-এর সুন্নাহ/আদর্শকেও দৃঢ়ভাবে আঁকড়িয়ে ধরতে বলা হয়েছে কি দ্বীন ইসলাম থেকে সিয়াসাত/রাজনীতিকে ছেটে ফেলে দেয়ার জন্য, নাকি পথভ্রষ্ঠ ও লাইনচ্যুত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকার জন্য ? তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কি কুরআন-সুন্নাহ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের পথ ভিন্ন অন্য আরেক পথের উপরে থাকায় বিশ্বাসী নয়? 

# সাফিনাহ রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন–  خِلَافَةُ النُّبُوَّةِ ثَلَاثُونَ سَنَةً ثُمَّ يُؤْتِي اللَّهُ الْمُلْكَ أَوْ مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ . رواه أبو داود ٤٦٤٦، قال الألباني في صحيح سنن أبي داود: حسن صحيح – ‘নবুওতী (ধারার) খিলাফত থাকবে ত্রিশ বছর। এরপর আল্লাহ বাদশাহি (শাসন ব্যবস্থার জামানা) নিয়ে আসবেন অথবা যাকে ইচ্ছে শাসক বানাবেন’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬৪৬] আরেকটি উত্তম সনদে বর্ণিত বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- الخلافة في أمتي ثلاثون سنة ثم ملك بعد ذلك . رواه الترمذي: ٢٢٢٦ و ابن حجر في موافقة الخبر الخبر: ١/١٤١ : حسن; وصححه الألباني في صحيح سنن الترمذي; رواه أحمد: ٥/٢٢٠ رقم ٢١٩٦٩. وقال شعيب الأرناؤوط محقق المسند : إسناده حسن رجاله ثقات رجال الصحيح غير سعيد بن جمهان –‘আমার উম্মতের মধ্যে খিলাফাত (ব্যাবস্থা) থাকবে ত্রিশ বৎসর পর্যন্ত। এরপর হবে বাদশাহী (শাসন ব্যবস্থা)’। [সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২২২৬; মুসনাদে আহমদ- ৫/২২০ হাদিস ২১৯৬৯]

মুহাক্কেক আলেমগণের মতে, এই হাদিসে ত্রিশ বৎসর খিলাফত ব্যবস্থা থাকার অর্থ হল: প্রথম খলীফা হযরত আবুবকর সিদ্দিক রা., দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ফারুক রা., তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান গণী রা, চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রা. এবং পঞ্চম খলীফা হযরত হাসান বিন আলী রা. -এই মোট ত্রিশ বৎসর কাল একটানা খিলাফত ব্যবস্থা। [বিস্তারিত: আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী- ৪/১৭২০; শারহু মুসলীম, ইমাম নববী- ১২/২০১; আল-বিদায়াহ ওয়ান্নিহায়াহ, ইবনে কাসির- ৮/১৭; ফাইযুল কাদির, মুনাবী- ২/৪০৯]

আবু হুরায়রাহ রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন- سَيَكُونُ بَعْدِي خُلَفَاءُ يَعْمَلُونَ بِمَا يَعْلَمُونَ، وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ، ثُمَّ يَكُونُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلَفَاءُ يَعْمَلُونَ بِمَا لَا يَعْلَمُونَ، وَيَفْعَلُونَ مالا يؤمرون، فمن أنكر عليهم فقد بريء، ولكن من رضي وتابع . رواه ابن حبان في الصحيح,: رقم ٦٦٦٠ و قال الأرنؤوط: إسناده صحيح على شرط الشيخين; و البيهقي في السنن: ٨/١٥٧ و في الدلائل: ٦/٥٢١; و أبو يعلى في المسند: رقم ٥٩٠٢ – ‘শিঘ্রই আমার (ইন্তেকালের) পর খলিফা’গণ হবে, যারা -(দ্বীন ও শরীয়ত সম্পর্কে) যা জানে সেই অনুযায়ী তারা আমল করবে এবং তাদেরকে (আল্লাহ কিংবা আমার পক্ষ থেকে) যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেই অনুযায়ী কাজ করবে। অতঃপর তাদের পরে (এমন সব) খলিফারা হবে, যারা (এমন এমন) আমল করবে যে ব্যাপারে (ইসলামী শরীয়ত কী বলেছে সে সম্পর্কে তারা কোনো) জ্ঞান রাখে না এবং (এমন এমন সব মন্দ) কাজ করবে যে ব্যাপারে তাদেরকে (আল্লাহ কিংবা আমার পক্ষ থেকে কোনো) নির্দেশ দেয়া হয়নি। সুতরাং, যে ব্যাক্তি (তাদের মন্দ’কে চিনতে পেরে ওসব কাজের) উপর অসন্তুষ্ট হয়েছে/অস্বীকৃতি প্রদর্শন করেছে সে নিরাপত্তা পেয়েছে। কিন্তু যে ব্যাক্তি (তাদের মন্দ’কে চিনতে পেরেও অপছন্দ করেনি, বরং মনে মনে রাজি) খুশি হয়েছে ও (সেই মন্দের) অনুগত্য করেছে (সে অপরাধী সাব্যস্থ হয়ে গেছে)’। [সহিহ ইবনে হিব্বান– ১৫/৪৩ হাদিস ৬৬৬০; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৮/১৫৭; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৬/৫২১; মুসনাদে আবু ইয়া’লা, হাদিস ৫৯০২]

# হযরত যাবের বিন সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لَا يَزَالُ هَذَا الدِّينُ عَزِيزًا مَنِيعًا إِلَى اثْنَيْ عَشَرَ خَلِيفَةً . اخرجه مسلم فى الصحيح: ٣/١٤٥٣ رقم ١٨٢١; و البخاري فى الصحيح, كتاب الأحكام، باب الاستخلاف:  رقم الحديث ٧٢٢٢;   – ‘এই দ্বীন (ইসলাম আমার উম্মাতের) বার জন খলিফার হাতে (তাদের নিজ নিজ জামানায় তার স্ব-বৈশিষ্টে পূণর্জ্জীবিত হয়ে অপরাপর দ্বীনের উপর) প্রবল ও দুর্বেদ্ধ-মজবুত হওয়া থেকে খালি থাকবে না’। [সহিহ মুসলীম– ৩/১৪৫৩ হাদিস ১৮২১; সহিহ বুখারী, হাদিস ৭২২২] 

এর অর্থ হল, এই বার জন খলিফার মধ্যে কারো জামানার সুশাসনের পরও যদি  পরবর্তী শাসক, মুসলমান কিংবা মুনাফেক ও কাফেরদের দ্বারা দ্বীন ইসলামের কোনো বিশেষ ক্ষতিও হয়ে যায় -তা খিলাফত হারানোর মাধ্যমেই হোক বা খিলাফত থাকাবস্থায় দুঃশাসন, অসততা ও অবহেলার কারণেই হোক, আল্লাহ’র করুনায় যথা সময়ে আরেকজন এমন খলিফা আসবেন, যিনি সেই হারানো খিলাফতকে পুণরায় ফিরিয়ে আনবেন অথবা দ্বীন ইসলামের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছিল তার সম্ভাব্য চিকিৎসা করে সেটাকে পূণরায় সারিয়ে তুলবেন, ইনশাআল্লাহ। ইমাম ইবনে কাসির রহ.-এর মতে শেষ জামানায় ইমাম মাহদী রা.ও এই বারজনের একজন হবেন।

# মাসরুক রহ. থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- كنا جلوسا عند عبد الله بن مسعود وهو يقرئنا القرآن ، فقال له رجل : يا أبا عبد الرحمن هل سألتم رسول الله صلى الله عليه وسلم : كم يملك هذه الأمة من خليفة ؟ فقال عبد الله : ما سألني عنها أحد منذ قدمت العراق قبلك ، ثم قال : نعم ، ولقد سألنا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال : ” اثنا عشر كعدة نقباء بني إسرائيل . المسند للإمام أحمد: ٤/٢٨ رقم ٣٧٨١ و قال احمد شاكر:اسناده صحيح ; ورواه الحاكم في مستدركه, كتاب الفتن و الملاحم: ٤/٦٨١ رقم ٤٨٩٤; و ابن حجر في فتح الباري: ١٣/١٨٣ و حسنه – আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর সাথে বসা ছিলাম। তিনি (তখন) আমাদেরকে কুরআন পড়াচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যাক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলো: হে আব্দুর রহমানের পিতা (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ) ! আপনারা কি রাসুলুল্লাহ -কে (কখনো) একথা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, এই উম্মত থেকে কতজন খলিফাহ শাসনক্ষমতা পাবে? তখন তিনি বললেন: আমি ইরাকে পা রাখার পর থেকে তোমার আগে অন্য আর কেউ আমাকে একথা জিজ্ঞেস করেনি। এরপর বললেন: হ্যাঁ। আমরা রাসুলুল্লাহ -কে একথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন: (এই উম্মতের ভিতরে) বার জন (খলিফা হবে), যেমন বনী ইসরাঈলের নকীব (আমীর)-এর সংখ্যা ছিল (বার জন)’। [মুসনাদে আহমদ– ৪/২৮ হাদিস ৩৭৮১; মুসতাদরাকে হাকিম– ৪/৬৮১ হাদিস ৪৮৯৪]

# হযরত আমের বিন আস বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- كَتَبْتُ إِلَى جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ مَعَ غُلَامِي نَافِعٍ ، أَنْ أَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ سَمِعْتَهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : فَكَتَبَ إِلَيَّ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ جُمُعَةٍ عَشِيَّةَ رُجِمَ الْأَسْلَمِيُّ ، يَقُولُ : ” لَا يَزَالُ الدِّينُ قَائِمًا حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ أَوْ يَكُونَ عَلَيْكُمُ اثْنَا عَشَرَ خَلِيفَةً كُلُّهُمْ مِنْ قُرَيْشٍ . رواه مسلم فى الصحيح , كتاب الإمارة , باب الناس تبع لقريش والخلافة في قريش, رقم ١٨٢٢; أبو عوانة في مسنده: ٤/٣٧٣ رقم ٦٩٩٦ – আমি যাবের বিন সামুরাহ’র কাছে চিঠি লিখে (তা) আমার গোলাম নাফেহ’কে দিয়ে পাঠালাম (এই বলে) যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে আপনি শুনেছেন -এমন কিছু আমাকে জানান। তিনি আমার কাছে লিখে পাঠালেন: ‘আমি জুমআর দিন বিকেলে আল-আসলামীকে রজমের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ -কে বলতে শুনেছি: এই দ্বীন সর্বদা কায়েম হয়ে থাকবে, যাবৎ না কেয়ামত ঘটে যায় কিংবা (যাবৎ না) তোমাদের (মুসলমানদের) উপরে বার জন খলিফাহ হয়, যাদের সকলে কুরায়শ (বংশ) থেকে (হবে)’ [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮২২; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ– ৪/৩৭৩ হাদিস ৬৯৯৬]

# আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- أَوَّلُ هَذَا الْأَمْرِ نُبُوَّةٌ وَرَحْمَةٌ ، ثُمَّ يَكُونُ خِلَافَةً وَرَحْمَةً ، ثُمَّ يَكُونُ مُلْكًا وَرَحْمَةً ، ثُمَّ يَكُونُ إِمَارَةً وَرَحْمَةً ، ثُمَّ يَتَكادَمُونَ عَلَيْهِ تَكادُمَ الْحُمُرِ فَعَلَيْكُمْ بِالْجِهَادِ ، وَإِنَّ أَفْضَلَ جهادِكُمُ الرِّبَاطُ ، وَإِنَّ أَفْضَلَ رباطِكُمْ عَسْقَلَانُ. رواه الطبراني في المعجم الكبير: رقم ١١١٣٨; قال الهيثمي رحمه الله في المجمع:٥/١٩٠: رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ وَرِجَالُهُ ثِقَاتٌ; وقال الألباني رحمه الله فى سلسلة الأحاديث الصحيحة :٧/٨٠٣ وهذا إسناد جيد –‘এই (দ্বীন ইসলামের) প্রথম (দিকটি) হবে নবুওত ও রহমত, তারপর হবে খিলাফত (ব্যবস্থা) ও রহমত, তারপর হবে বাদশাহী (শাসন ব্যবস্থা) ও রহমত, তারপর হবে আমীরী (শাসন ব্যবস্থা) ও রহমত, তারপর (এমন শাসকরা আসবে যে,) তারা তা নিয়ে (এমনভাবে) পরষ্পরে কামড়া-কামড়ি করবে (যেমনটা) গাধারা কামড়া-কামড়ি করে। তখন তোমরা জিহাদকে অপরিহার্য করে নিবে। নিশ্চই তোমাদের সর্বত্তম জিহাদ হল রিবাত, আর তোমাদের সর্বত্তম রিবাত হল আসকালান’। [আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী, হাদিস ১১১৩৮; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৫/১৯০]

# হযরত হুযাইফা রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- تَكُونُ النُّبُوَّةُ فِيكُمْ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ، ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةٌ عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ ، فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَرْفَعَهَا ، ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا عَاضًّا ، فَيَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَكُونَ ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ، ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةً ، فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ، ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ، ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ ” . ثُمَّ سَكَتَ . قَالَ حَبِيبٌ : فَلَمَّا قَامَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ ، وَكَانَ يَزِيدُ بْنُ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ فِي صَحَابَتِهِ ، فَكَتَبْتُ إِلَيْهِ بِهَذَا الْحَدِيثِ أُذَكِّرُهُ إِيَّاهُ ، فَقُلْتُ لَهُ : إِنِّي أَرْجُو أَنْ يَكُونَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ ، يَعْنِي عُمَرَ ، بَعْدَ الْمُلْكِ الْعَاضِّ وَالْجَبْرِيَّةِ ، فَأُدْخِلَ كِتَابِي عَلَى عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ ، فَسُرَّ بِهِ ، وَأَعْجَبَهُ . اخرجه احمد فى المسند: ٤/٢٧٣ و حسنه الأرناؤوط ; رواه الحافظ العراقي في ” محجة القرب إلى محبة العرب: ٢/١٧ و قال : ” هذا حديث صحيح ، و إبراهيم بن داود الواسطي وثقه أبو داود الطيالسي و ابن حبان ، و باقي رجاله محتج بهم في الصحيح ; وروى الحديث أيضًا و البزار: ٧/٢٢٣, الطيالسي فى المسند: رقم ٤٣٨ ; والبيهقي في منهاج النبوة، والطبري فى المعجم الأوسط:٦/٣٤٥ ، و الحديث صححه الألباني في السلسلة الصحيحة: ١/٨ رقم ٥، و قال الهيثمي في ” المجمع: ٥/١٨٩ – رواه أحمد و البزار أتم منه و الطبراني ببعضه في الأوسط  ، و رجاله ثقات ” –‘আল্লাহ তোমাদের মাঝে নবুওত’কে যতদিন রাখতে চান রাখবেন, এরপর তিনি যখন সেটিকে তুলে নিতে চাবেন তুলে নিবেন। এরপর হবে নবুওতী পন্থার খিলাফত (ব্যাবস্থা), এরপর আল্লাহ যতদিন  (সেটিকে) রাখতে চান রাখবেন, অতঃপর তিনি যখন তা তুলে নিতে চাবেন তুলে নিবেন। এরপর হবে আযুয-শাসন (ব্যবস্থা)। পরে আল্লাহ যতদিন (সেটিকে) রাখতে চান রাখবেন, অতঃপর তিনি যখন তা তুলে নিতে চাবেন তুলে নিবেন। এরপর হবে জাবরিয়্যাহ শাসন (ব্যবস্থা)। এরপর আল্লাহ যতদিন (সেটিকে) রাখতে চান রাখবেন, অতঃপর তিনি যখন তা তুলে নিতে চাবেন তুলে নিবেন। এরপর (আবারো) হবে নবুওতী পন্থার খিলাফত (ব্যাবস্থা)’। অতঃপর তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। [মুসনাদে আহমদ– ৪/২৭৩; মুসনাদে বাযযার- ৭/২২৩; মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসী, হাদিস ৪৩৮; আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী – ৬/৩৪৫; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৫/১৮৯]

ফায়দা: হাদিসটিতে বর্ণিত مُلْكًا عَاضًّا – আযুয-শাসন (ব্যবস্থা) হল ওই শাসক ব্যবস্থা যার ভিতরে শাসক হয় মুসলীম বরং শাসনের সংবিধান থাকে কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক ইসলামী শরীয়াহ, কিন্তু শাসক দুনিয়ার স্বার্থে বিভিন্ন অসসতা, অন্যায় অবিচার, অন্যায্য হত্যা, রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও অন্যের সম্পদ আত্বসাৎ জাতীয় বিভিন্ন পাপকার্য দ্বারা শাসন ব্যবস্থাকে কলুসিত করে রাখে। মারওয়ান, ইয়াজিদ, হাজ্জাজ বিন ইউসূফ প্রমুখ আমীরের শাসন ব্যবস্থা ছিল مُلْكًا عَاضًّا – আযুয-শাসন (ব্যবস্থা)-এর নমুনা।

হাদিসটিতে বর্ণিত مُلْكًا جَبْرِيَّةً – জাবরিয়্যাহ শাসন (ব্যবস্থা) হল ওই শাসক ব্যবস্থা যার ভিতরে শাসক জবরদস্তি করে ইসলামী শরীয়ত বিরোধী আইন ও নীয়মনীতি মুসলমানদেরকে উপর চাপিয়ে দেয় এবং সেসব না মানলে শাসকের পক্ষ থেকে মুসলমানদের উপরে বিভিন্ন জুলুম অন্যায় অবিচার আপতিত হয়। এই শেষ জামানায় পৃথিবীর যতগুলো দেশের শাসন ব্যবস্থা জোর করে মুমিন মুসলমানদেরকে দ্বীন ও শরীয়ত মানতে বাঁধার সৃষ্টি করছে বা শরীয়ত বিরোধী আইন-কানুন মানতে বাধ্য করানো হচ্ছে, তার সবগুলোই مُلْكًا جَبْرِيَّةً – জাবরিয়্যাহ শাসন (ব্যবস্থা)-এর নমুনা। উপরের হাদিসে এধরনের শাসকদের শাসনব্যবস্থাকেই ‘গাধার কামড়া কামড়ি’র সাথে তুলনা করা হয়েছে।

এই مُلْكًا جَبْرِيَّةً – জাবরিয়্যাহ শাসন (ব্যবস্থা)’কে ধ্বংস করে দিয়ে পূণরায় ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নাবুওত’ (তথা নবীর সুন্নাহ পন্থার উপর প্রতিষ্ঠিত খিলাফত ব্যবস্থা) কায়েমের জন্য ‘আহলে-বাইত’-এর মধ্য থেকে আসবেন ইমাম মাহদী রা. এবং একজন খলিফায়ে রাশেদ হিসেবে সহিহ খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করবেন।

যেমন: কায়েস বিন যাবের সাদাফী রহ. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- سَيَكُونُ بَعْدِي خُلَفَاءُ , وَمِنْ بَعْدِ الْخُلَفَاءِ أُمَرَاءُ , وَمِنْ بَعْدِ الأُمَرَاءِ مُلُوكٌ , وَمِنْ بَعْدِ الْمُلُوكِ جَبَابِرَةٌ , ثُمَّ يَخْرُجُ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ بَيْتِي يَمْلأُ الأَرْضَ عَدْلا كَمَا مُلِئَتْ جَوْرًا . رواه ابن عساكر في تاريخ دمشق:١٤/٢٨٢ رقم ٣٥٦١ ; و ابن منده في “المعرفة: ٢/٢٣٦/٢; قال الألباني في السلسلة الضعيفة والموضوعة: ٨/١٩٨ : ضعيف ; الطبراني في المعجم الكبير:٢٢/٣٧٤ رقم ٩٣٧ و ذكر ابن حجر فى فتح الباري, كتاب الأحكام: ١٣/٢١٤ ; و الهيثمي في “مجمع الزوائد: ٥/١٩٠ وقال : رواه الطبراني ، وفيه جماعة لم أعرفهم ; و ابو نعيم الأصبهاني في معرفة الصحابة: ٤/٤٨٧ رقم ١٤٤٣; و نعيم بن حماد في الفتن: ٢٨ -‘শিঘ্রই আমার পরে (সুন্নাহ পন্থার) খলিফা’গণ হবে, তারপর হবে আমীর (ধাঁচের) খলিফাগণ, তারপর হবে বাদশাহ (ধাঁচের) আমীররা এবং তারপর হবে জাবরিয়্যাহ (ধাঁচের) শাসকরা। এরপর আমার ‘আহলে-বাইত’ -এর মধ্য থেকে এক ব্যাক্তির আবির্ভাব হবে, যে পৃথিবীকে ইনসাফ দ্বারা ভরে দিবে -যেমনটা (তাঁর আগমনের পূর্বে পৃথিবীটা) পাপ-অপরাধ দ্বারা ভরে ছিল’। [তারিখে দামেশক, ইবনুল আসাকীর- ১৪/২৮২ হাদিস ৩৫৬১; আল-মা’রিফাহ, মুনদুহু- ২/২৩৬/২; আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরাণী- ২২/৩৭৪ হাদিস ৯৩৭; মা’রিফাতুস সাহাবা, আবু নুআইম- ৪/৪৮৭ হাদিস ১৪৪৩; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৫/১৯০; আল-ফিতান, নুআইম বিন হাম্মাদ- ২৮]

# হযরত সওবান রা. থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- يَقْتَتِلُ عِنْدَ كَنْزِكُمْ ثَلَاثَةٌ ، كُلُّهُمْ ابْنُ خَلِيفَةٍ ، ثُمَّ لَا يَصِيرُ إِلَى وَاحِدٍ مِنْهُمْ ، ثُمَّ تَطْلُعُ الرَّايَاتُ السُّودُ مِنْ قِبَلِ الْمَشْرِقِ فَيَقْتُلُونَكُمْ قَتْلًا لَمْ يُقْتَلْهُ قَوْمٌ – ثُمَّ ذَكَرَ شَيْئًا لَا أَحْفَظُهُ – فَقَالَ : فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَبَايِعُوهُ وَلَوْ حَبْوًا عَلَى الثَّلْجِ ، فَإِنَّهُ خَلِيفَةُ اللَّهِ الْمَهْدِيُّ – رواه ابن ماجه في ” السنن “, كتاب الفتن, باب “خروج المهدي ٢/ ١٣٦٧، رقم ٤١٨٤ , قال ابن كثير إسناده قوي صحيح: النهاية في الفتن والملاحم: ١/٢٩, وصححه القرطبي في ” التذكرة ” ص١٢٠١، وصححه البوصيري في ” مصباح الزجاجة ” ٣/٢٦٣، وصححه الشيخ حمود التويجري رحمه الله في كتابه ” إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة ” ٢/١٨٧. و رواه البزار في ” المسند ” ٢/١٢٠، والروياني رقم ٦١٩، والحاكم في ” المستدرك ” ٤/٥١٠، ومن طريقه البيهقي في ” دلائل النبوة ” ٦/٥١٥ – ‘তিন ব্যাক্তি তোমাদের ধ্বনসম্পদ’কে কেন্দ্র করে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে; তারা প্রত্যেকেই হবে খলিফার পুত্র। পরে (সেই ধ্বনসম্পদ বাস্তবে) তাদের কারোর হাতেই আসবে না। এরপর পূর্ব দিক (-এর একটি অঞ্চল) থেকে কালো পতাকা উত্তলিত হবে, তখন তারা তোমাদেরকে এমনভাবে হত্যা করবে যে, সেরকম হত্যা কোনো জাতি করেনি। এরপর তিনি আরো কিছু উল্লেখ করলেন, যা আমার স্মরণে নেই। এরপর বললেন: সুতরাং তোমরা যদি তাঁকে দেখতে পাও, – যদি বরফের উপর দিয়েও হামাগুড়ি দিতে হয়- তবুও (সে কষ্ট সহ্য করে হলেও) তাঁর কাছে (গিয়ে) বায়াত করো। কারণ, তিনি হলেন (শেষ জামানায়) আল্লাহ’র (নিযুক্ত) খলিফাহ; আল-মাহদী’। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪১৮৪; মুসনাদে বাযযার-২/১২০; মুসনাদে রোইয়ানী- হাদিস ৬১৯; মুসতাদরাকে হাকিম-৪/৫১০; দালায়েলুন্নাবুয়াত, বাইহাকী-৬/৫১৫]

ফায়দা: হযরত  আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন-  يخرج في آخر أمتي المهدي . اخرجه الحاكم فى المستدرك: ٤/٥٥٧ , وقال :  هذا حديث صحيح الإسناد ولم يخرجاه  ، ووافقه الذهبي . وقال الألباني :  هذا سند صحيح رجاله ثقات ، سلسة الأحاديث الصحيحة : ٢/٣٣٦ – ‘আমার উম্মতের শেষভাগে আল-মাহদী’র আবির্ভাব হবে। ’। [মুস্তাদরাকে হাকিম-৪/৫৫৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে হাসান সনদে বর্ণিত আরেক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন-  لو لم يبق من الدنيا إلا يوم, لطول الله ذلك اليوم, حتى يبعث فيه رجلا من أهل بيتي يواطىء اسمه اسمي, واسم أبيه اسم أبي , فيملأ الأرض قسطا وعدلا, كما ملئت ظلما و جورا . أخرجه أبو داود: ٤٢٨٢; قال الألباني رحمه الله: حسن صحيح, كذا فى صحيح أبى داود:٣٦٠١ و صحيح الجامع : ٥٣٠٤; و أحمد: ١/٣٧٦ رقم ٣٥٧٢ , والترمذي: ٣٢٣٠ , وقال: حسن صحيح , و ابن أبى شيبة ٣٧٦٤٨, و الدراقطني في الأفراد:٣٦٤٣ ترتيب ابن طاهـر, و أبو نعيم: ١٩, والحاكم: ٤/٤٤٢ رقم ٨٤١٣ , الطبراني في الكبير: ١٠/١٣٣ رقم ١٠٢١٦– ‘যদি দুনিয়া (ধ্বংসে)র একদিনও মাত্র বাকি থাকে, তবুও আল্লাহ অবশ্যই সেই দিনটিকে দীর্ঘ বানিয়ে দিবেন, এমনকি তিনি তাতে আমার আহলে-বাইতে’র মধ্যে থেকে (এমন) এক ব্যাক্তিকে পাঠাবেন, যার নাম হবে আমার নামে এবং তার পিতার নাম হবে আমার পিতার নামে। তিনি পৃথিবীকে যথার্থতা ও  ইনসাফে ভরে দিবেন যেমনিভাবে (তাঁর আগমনের পূর্বে পৃথিবীটা তখন) জুলুম ও পাপ-অপরাধে ভরে ছিল’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪২৮২; মুসনাদে আহমদ-১/৩৭৬, হাদিস ৩৫৭২; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ৩২৩০; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ, হাদিস ৩৭৬৪৮; আল-আফরাদ, ইমাম দ্বারাকুতনী, হাদিস ৩৬৪৩; আবু নুআইম-১৯; মুসতাদরাকে হাকিম- ৪/৪৪২, হাদিস ৮৪১৩; আল-মু’জামুল কুবরা, ত্বাবরাণী- ১০/১৩৩, হাদিস ১০২১৬]

ইমাম মাহদী রা. শেষ জামানায় আবির্ভাবের পর ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সম্মতিতে সুন্নাহ পন্থায় মুসলীম উম্মাহ’র খলিফা হবেন এবং যে ৭/৮ বছর জীবিত থাকবেন, তার পূর্ণ সময়টি কাটবে খলিফা/আমীর হিসেবে রাজনৈতিক গুরু দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। তাঁর সময়ই গোটা পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো সহ মোট আশিটি দেশ তাঁর বিরুদ্ধে মরনপণ যুদ্ধ চালাবে অত্যাধুনিক সব যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে, তাঁর সময়ই দাজ্জাল ও ইয়াজুজ মাজুজ আবির্ভূত হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের উপর ইসলামকে বিজয়ী করে দিবেন। ইমাম মাহদী রা. কি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হয়ে দ্বীন ইসলাম থেকে সিয়াসাত/রাজনীতিকে ছেটে ফেলে দিতে আসবেন, নাকি যারা তা ছেটে ফেলে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন? 

# আবু হুরায়রাহ রা. থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন-   وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَيُوشِكَنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمْ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلَ الْخِنْزِيرَ وَيَضَعَ الْجِزْيَةَ وَيَفِيضَ الْمَالُ حَتَّى لَا يَقْبَلَهُ أَحَدٌ حَتَّى تَكُونَ السَّجْدَةُ الْوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنْ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا . رواه بخاري في الصحيح, كتاب أحاديث الأنبياء, باب نزول عيسى ابن مريم عليهما السلام: رقم ٣٤٤٧; و مسلم في الصحيح, كتاب الإيمان, باب نزول عيسى ابن مريم حاكما بشريعة نبينا محمد صلى الله عليه وسلم: رقم ١٥٥ – ‘ওই সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, অবশ্যই অচিরেই এমন হবে যে, তোমাদের (মুসলমানদের) মাঝে (ঈসা) ইবনে মারইয়াম (একজন) ন্যায়পরায়ন হাকেম (শাসক) হিসেবে অবতীর্ণ হবেন, তারপর ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শুয়োরকে মেড়ে ফেলবেন, জিযীয়া খতম করে দিবেন এবং (মানুষজনকে) ধ্বনসম্পদ দান করতে থাকবেন, এমনকি (পরে মানুষের অবস্থা এমন স্বচ্ছল হবে যে,) কেউ (সম্পদ) গ্রহন (করার প্রয়োজন অনুভব) করবে না। একসময় (অবস্থা এমন হবে যে, মানুষের) একটি সিজদাহ দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে উৎকৃষ্ট হবে’। অতঃপর আবু হুরায়রাহ রা. বলেন: ‘তোমরা চাইলে পড়তে পারো- وَإِن مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا – আর (সেদিন) আহলে কিতাবদের মধ্যে এমন কেউ থাকবে না, যে তাঁর প্রতি ইমান না আনবে। আর সে কেয়ামতের দিন তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দান করবে’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৪৪৭; সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৫৫]

রাসুলুল্লাহ মুহাম্মাদ ﷺ এরশাদ করেছেন: وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي – ‘নিশ্চই আমার পর আর কোনো নবী নেই’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৪৫৫] সুতরাং বোঝা গেল, ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. শেষ জামানায় দ্বিতীয়বারের মতো পৃথিবীতে আসবেন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মত হিসেবে এবং একজন ন্যায়পরায়ন হাকেম (শাসক) হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী পৃথিবী শাসন করবেন।  

এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কেয়ামতের আগ পর্যন্ত -যতদিন এই উম্মতের জন্য ইসলামী শরীয়ত থাকবে- দ্বীন ইসলামের মধ্যে সিয়াসাত/রাজনীতি অতপ্রত ভাবে বিজড়িত থাকবে। সুতরাং, যারা বিশ্বাস করে যে, ‘দ্বীন ইসলামের মধ্যে রাজনীতি নেই’ বা ‘ইসলামকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা বাঞ্চনীয়’ তারা পথভ্রষ্ঠ। শুধু পথভ্রষ্ঠতা নয়, বরং এই পথভ্রষ্ঠতা যে কুফর পর্যন্ত গড়াতে পারে -তা যতই সামনের আলোচনাগুলো পড়বেন ততই উপলব্ধি করতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।

যাহোক, এব্যাপারে আমরা উপরোক্ত “১ নং বৈশিষ্ট”টিকে ‘পথভ্রষ্ঠতা ও কুফরী’ প্রমাণ করার জন্য কুরআন-সুন্নাহ’র আলোকে নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলো নিয়ে আরো বিস্তারিতভাবে আলাদা আলাদা করে  আলোচনা করার চেষ্টা করবো, ইনশা-আল্লাহ। 

# রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আইন রচনা -এ বিশ্বাস করা প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহিতা, পথভ্রষ্ঠতা, শিরক ও কুফর – কেনো ? 

রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নির্বাহী ব্যবস্থা’ -এ বিশ্বাস করা প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহিতা, পথভ্রষ্ঠতা ও কুফর -কেনো ? 

# রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা’ -এ বিশ্বাস করা কেনো প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহিতা, পথভ্রষ্ঠতা, শিরক ও কুফর ? 

 

> পরবর্তী আলোচনা পড়ার জন্য নিম্নের ‘পৃষ্ঠা ২’ -এ ক্লিক (Click) করুন।

 

 


ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ: [পৃষ্ঠা ১][পৃষ্ঠা ২][পৃষ্ঠা ৩[পৃষ্ঠা ৪][পৃষ্ঠা ৫] , [পৃষ্ঠা ৬] , [পৃষ্ঠা ৭[পৃষ্ঠা ৮] …

 

(অথবা) নিম্নে বিষয় ভিত্তিক পেজ-এর পাশে ক্লিক করুন

# ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি ইসলাম বিরোধী মতবাদ এবং কুফরী  ফিতনা -কেনো ? [পৃষ্ঠা ১]

১ম বৈশিষ্ট: ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা -এ বিশ্বাস করা প্রকাশ্য কুরআন-সুন্নাহ‘র বিরোধীতা, আল্লাদ্রহীতা, পথভ্রষ্ঠতা, মুনাফেকী ও কুফরী –কেনো? [পৃষ্ঠা ১]

# রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ আইন রচনা -এ বিশ্বাস করা প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহিতা, পথভ্রষ্ঠতা, শিরক ও কুফর – কেনো ? [পৃষ্ঠা ২]

রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নির্বাহী ব্যবস্থা’ -এ বিশ্বাস করা প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহিতা, পথভ্রষ্ঠতা ও কুফর -কেনো ? [পৃষ্ঠা ৩] , [পৃষ্ঠা ৪] , [পৃষ্ঠা ৫] , [পৃষ্ঠা ৬] , [পৃষ্ঠা ৭

# রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা’ -এ বিশ্বাস করা কেনো প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহিতা, পথভ্রষ্ঠতা, শিরক ও কুফর ? [পৃষ্ঠা ৮]