ধর্মনিরপেক্ষ নির্বাহী ব্যবস্থা : পথভ্রষ্ঠতা, আল্লাদ্রোহিতা ও কুফর – কেনো ? পর্ব ২

Spread the love
image_pdfimage_print

রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নির্বাহী ব্যবস্থা’য় বিশ্বাস করা পথভ্রষ্ঠতা, প্রকাশ্য ইসলাম বিরোধীতা, আল্লাদ্রোহিতা ও কুফর -কেনো ? (২য় পর্ব)

 

[পৃষ্ঠা-৩] -এর আলোচনার পরের অংশ নিম্নরূপ

গ) ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফাএবংধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানএর মনোনয়ন নির্বাচন পন্থা ভিন্ন ভিন্ন; পরষ্পর বিরোধী


আমরা আগেই বলে এসেছি, যে কোনো কারখানার মালিকমাত্রই তার কারখানার সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বভার এমন এমন প্রতিনিধিদের উপর চাপিয়ে দেয়াকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করবেন, যারা তার কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও কারখানার বিধিমালার সাথে আন্তরিকবাবে একাত্বতা পোষন করে, পূর্ণ বিশ্বাস রাখে এবং সেই অনুযায়ী কারখানা চালাতে বদ্ধপরিকর, যাদের উপর এ ব্যপারে আস্থা রাখা যায় এবং যারা এর উপযুক্ত। অর্থাৎ, কারখানার মালিকের মনকামনা থাকে যে, কারখানার একেবারে মহাপরিচালক/মহাব্যবস্থাপক থেকে নিয়ে একদম নিম্ন স্তরের কর্মচারীরা পর্যন্ত সকলে তার লোক হোক; তার বিরুদ্ধের কেউ বা কোনো মির্জাফর কেউ না হোক।

এটি এমন একটি স্বাভাবিক মূলনীতি যে, জ্ঞতে-অজ্ঞতে এই মূলনীতির আলোকেই পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় – ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র সহ। কোন্ দলটা চায় যে তাদের দলপ্রধান বিরোধীদলীয় লোকদের দ্বারা মনোনীত হোক !!! এজন্যেই চায় না, কারণ তারা ভাল করেই জানে, দলের লক্ষ্য, বিশ্বাস ও চেতনার বিরোধীদের উপর দলপ্রধান মনোনায়নের দায়িত্বভার চাপিয়ে দিলে তারা এমন দলপ্রধানকে মনোনায়ন দিবে, যে বিরোধীদলীয় চেতনার পক্ষের লোক কিংবা কমপক্ষে তাদের পক্ষে কাজ করবে এবং সুযোগ বুঝে দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টির পায়তারায় লেগে থাকবে এবং একসময় নিজেদের লক্ষ্য, বিশ্বাস ও চেতনাই প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে। ফলে দলটি একসময় হবে মূলতঃ বিরোধী দলের রঙে রঙিন।

মানুষের স্রষ্টা ভাল করেই জানেন, মানুষের খাসলত কী। বস্তুতঃ আল্লাহ তাআলা إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً –‘নিশ্চই আমি পৃথিবীতে (আমার) খলিফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করবো’। [সূরা বাকারাহ ৩০] -এই আয়াতের মধ্যে পৃথিবী ও মানুষ সৃষ্টির পিছনে তাঁর যে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে তিনি ইশারা করেছেন, তা সাফল্যমন্ডিত করার প্রশ্নে তাঁর হুকুমের কাছে আত্বসমর্পনণকারী বান্দা (মুসলমান)রা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। দ্বীন ইসলামে মুসলমানরাই মুসলমানদের খলিফা/আমীর (রাষ্ট্রপ্রধান) নির্বাচন করবে মনোনয়ন দিবে। মুসলমানদের দ্বীনী বিষয়াদিতে খবরদারী করার সামান্যতম কোনো পথ আল্লাহ তাআলা তাঁর বিরোধীদল কাফের/মুরতাদদের জন্য খোলা রাখেন নি।

وَلَنْ يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلا
‘আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের উপর (অভিভাবকত্ব ও খবরদারী করার) কোনো পথই কাফেরদের জন্য খোলা রাখেননি’। [সূরা নিসাঃ ১৪৪]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ ۚ أَتُرِيدُونَ أَن تَجْعَلُوا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُّبِينًا
‘হে ইমানদারগণ! তোমরা মুসলমানদেরকে বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে (তোমাদের) ওলী (অভিভাবক ও বন্ধু) হিসেবে গ্রহন করে নিবে না। তোমরা কি (কাফেরদেরকে তোমাদের অভিভাবক ও বন্ধ বানিয়ে নিয়ে) আল্লাহ’র কাছে তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই একথার সুস্পষ্ট দলিল দাঁড় করিয়ে দিতে চাও (যে, তোমরা আল্লাহর প্রতিনিধি হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্য কায়েম করার পরিবর্তে আল্লাদ্রোহীদের প্রতিনিধি হয়ে তাদের উদ্দেশ্য কায়েম করার বিষয়টিকে গ্রহন করে নিয়েছো)? [সূরা নিসাঃ ১৪৪]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِنْ دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ

হে ইমানদারগণ, তোমরা তোমাদের নিজেদের (মুসলমান) লোকদের ছাড়া অন্য(অমুসলীম) কাউকে তোমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহন করে নিও না। তারা তোমাদের অনিষ্ট সাধনে কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না। তারা কামনা করে যাতে তোমরা সমস্যায় পড়ে যাও। তাদের মুখ থেকেই (তোমাদের প্রতি) তাদের বিদ্বেষ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আর তাদের মনগুলোর ভিতরে (তোমাদের অনিষ্ট সাধনের জন্য) যা লুকিয়ে রয়েছে তা আরো মারাত্মক। বস্তুতঃ আমি আমার আয়াতসমূহকে তোমাদের জন্য সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিচ্ছি যাতে তোমাদের বিবেককে কাজে লাগাতে পারো [সুরা আল-ইমরান ১১৮]

যারা আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি হওয়াকেই স্বীকার করে না, উল্টো শয়তান ও পথভ্রষ্ঠ নেতা ও মোড়লদের নীতি আদর্শ ও আইনকানুনকে দুনিয়ার বুকে দেখতে চায় এবং মুখ, হাত ও বিবেক-বুদ্ধির জোরে যখন যেভাবে সম্ভব হয় পদে পদে বাঁধা সৃষ্টি করতে বুক কাঁপে না, তারা কি শয়তান ও পথভ্রষ্ঠ নেতা ও মোড়লদের প্রতিনিধি (খলিফা) নয়? তারা কি আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা) যে তিনি তাদের হাতে মুসলমানদের খলিফা/রাষ্ট্রপ্রধান কে হবে -তা ঠিক করার ভার দিবেন?!!! পাগল হয়েছেন? নাকি আল্লাহকে পাগল ও মুর্খ ভেবেছেন? এজন্য যে ব্যাক্তিই শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘মুসলীম’ বলে গণ্য নয়, তথা কাফের বা মুরতাদ হিসেবে গণ্য, সে আল্লাহর দ্বীনের হেফাজতকারী খলিফা/আমীর (রাষ্ট্রপ্রধান) নির্বাচন ও মনোনয়ন দানকার্যে মত প্রকাশে অংশগ্রহনের সামান্যতম অধিকার রাখে না; সে একাজের সম্পূর্ণ অযোগ্য

আয়েশা রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ (তাঁর মুমূর্ষ অবস্থায়) আয়েশা রা.-কে বললেন: ادعي لي أبا بكر أباك وأخاك حتى أكتب كتابا فإني أخاف أن يتمنى متمن ويقول قائل أنا أولى ويأبى الله والمؤمنون إلا أبا بكر – ‘(হে আয়েশা!) তোমার পিতা আবু বকর এবং তোমার ভাই (আব্দুর রহমান)-কে আমার কাছে ডেকে আনো যাতে আমি একটি বিষয় লিখে দিতে পারি। আমার ভয় হচ্ছে, (এ পদের) কোনো আকাঙ্খি আবার আকাঙ্খা করে বসে নাকি এবং যে কথা তোলার সে আবার এই কথা তোলে নাকি- ‘আমি (এ পদের) সবচাইতে যোগ্য’। (কিন্তু যে যাই বলুক, যাই করুক না কেনো) আল্লাহ -আবু বকরকে ছাড়া (অন্য কাউকে) গ্রহন করবে না, মুমিনরাও না। [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৮৭; সহিহ বুখারী, হাদিস ৫৩৪২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪৭৯৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৬৫৯৮; সুনানুল কুবরা, নাসায়ী-৪/২৫৩; সুনানে বাইহাকী-৮/১৫৩; মুসতাদরাকে হাকীম-৩/৫৪২; ত্ববাকাতে ইবনে সা’দ-৩/১৮০]

এই হাদিসে ‘খলিফা’ নির্বাচনের বিষয়টিকে ইমানদারগণের চাওয়া না-চাওয়ার উপর সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। কাফের’রা কাকে ‘খলিফা’ দেখতে চায় বা না-চায় সেটা বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপযোগ্য বিষয় নয়। খিলাফত মুসলমানদের; তাই মুসলমানরাই তাদের খলিফা নির্বাচন করবে।

সুতরাং, মুসলীম সমাজের উপর ফরয হল, তারা মুসলমানরা মিলেই তাদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অভিভাবক, ‘আমিরুল মুমিনীন’, খলিফা/আমীর বা রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন ও মনোনয়ন করবে। এই হক্ব শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র মুসলমানদের; মুসলমানরাই এর আহাল (উপযুক্ত ব্যাক্তি)। আর আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا ‘নিশ্চই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতগুলিকে তার (স্ব-স্ব) উপযুক্ত ব্যাক্তির কাছে সোপর্দ করে দিবে’[সুরা নিসা ৫৮]

এর বিপরীতে যে ব্যাক্তি খলিফা/আমীর (রাষ্ট্রপ্রধান) নির্বাচনের এই অধিকারকে মুসলমানদের হাত থেকে নিয়ে কোনো কাফের মুরতাদদের হাতে সোপর্দ করবে, সে হবে এই আমানতের এমন এক খিয়ানতকারী যে আল্লাহ তাআলার সাথে, তাঁর রাসুল সা.-এর সাথে এবং মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (মিরজাফরী) করেছে।

ইসলামী শরীয়তের এই মাসআলার বিপরীতে-

(ক) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ধর্মীয় বিধানকে ১০০% মুক্ত করায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা অত্যাবশ্যক (ফরয) শর্ত, তাই রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তের ‘শুধুমাত্র মুসলমানরাই মুসলমানদের খলীফা/আমীর নির্বাচন ও মনোনয়ন করবে’ মর্মে শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ১০০% মুক্ত করায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা তাদের মতে অত্যাবশ্যক (ফরয)।

(খ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানকে টেনে আনা ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম), তাই রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তের ‘শুধুমাত্র মুসলমানরাই মুসলমানদের খলীফা/আমীর নির্বাচন ও মনোনয়ন করবে’ মর্মে শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনাও তাদের মতে ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম)।

(গ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যেহেতু বিশ্বাস করে- যে ব্যাক্তি ধর্মীয় বিধিবিধানকে রাষ্ট্রব্যাবস্থায় টেনে আনায় বিশ্বাসী সে আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেই বিশ্বাসী নয় বরং অস্বীকারকারী (কাফের), তাই যে ব্যাক্তি রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তের ‘শুধুমাত্র মুসলমানরাই মুসলমানদের খলীফা/আমীর নির্বাচন ও মনোনয়ন করবে’ মর্মে শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনায় বিশ্বাসী, তাদের মতে সেও আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসীই নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে অস্বীকারকারী (কাফের)।

(ঘ) উপরোক্ত এই ৩টি পয়েন্টের এব্যাপারে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদীদেরর ঐক্যমত (ইজমা ) রয়েছে।

খলিফা মনোনায়নের শরয়ী পদ্ধতি

যখন কোনো মুসলমান অন্য কোনো মুসলমানকে ‘খলিফা/আমীর’ করা যেতে পারে মর্মে মত প্রকাশ করে -(চাই তা মৌখিক ভাবেই প্রকাশ করুক বা লিখিতভাবে কিংবা বর্তমান যুগের ভোট সিষ্টেমের মাধ্যমেই করুক), তখন আসলে সে এই সাক্ষ্য দেয় ও সুপারিশ করে যে, ‘অমুক মুসলমান আমার মতে খলিফা হওয়ার যোগ্য, তাকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দান করা হোক’। সুতরাং, কেউ যদি (শরয়ী ওজর ছাড়া) খলিফা হওয়ার উপযুক্ত মুসলমানকে বাদ দিয়ে কোনো অযোগ্য মুসলমানকে খলিফা (রাষ্ট্রপ্রধান) বানানোর স্বপক্ষে মত প্রকাশ করে, তাখন সে মূলতঃ ওই অযোগ্য ব্যাক্তির স্বপক্ষে এই মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় ও সুপারিশ করে যে, ‘অমুক আমার মতে খলিফা (রাষ্ট্রপ্রধান) হওয়ার যোগ্য এবং তাকে খলিফা হিসেবে নিয়োগ দান করা হোক’। আর আল্লাহ তাআলা সত্য সাক্ষ্য দেওয়াকে ফরয করেছেন এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়াকে হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেনمَّن يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُن لَّهُ نَصِيبٌ مِّنْهَا ۖ وَمَن يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُن لَّهُ كِفْلٌ مِّنْهَا ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا – ‘যে ব্যাক্তি কোনো হাসান (ভাল) ব্যাপারে সুপারিশ করবে, তার জন্য তা থেকে (সওয়াবের) একটা অংশ রয়েছে। আর যে ব্যাক্তি কোনো সাইয়্যেয়াত (মন্দ ও গোনাহ’র) ব্যাপারে সুপারিশ করবে, তার জন্য তা থেকে (গোনাহ’র) একটা অংশ রয়েছে’। [সুরা নিসা ৮৫]

সুতরাং, ‘আমার মতে অমুককে খলীফা/আমীর করা যায়’ মর্মে মত প্রকাশ করা কোনো মতেই ছেলে খেলা নয়, বরং এটা একটা আমানত। কাজেই এই আমানতের যাতে খেয়ানত না হয়ে যায়, সেজন্য যে ব্যাক্তি ‘মত’ প্রকাশ করবে, তার জন্য-

(১) দ্বীন ইসলামের ‘খলিফা ও খিলাফত ব্যবস্থা’ বিষয়ক পর্যাপ্ত ও পোক্ত ইলমের অধিকারী হওয়া একান্ত অপরিহার্য।

(২) আনুসঙ্গিক পার্থিব রাজনৈতিক অবস্থা ও তার গতিবিধি সম্পর্কে বিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা থাকাও অপরিহার্য।

এই দুটি বিষয় যেহেতু এখন প্রশ্ন হল, মুসলমানদের দ্বারা খলিফা নির্বাচন ও মনোনয়নের শরয়ী পন্থা কি? এর পন্থা খোদ্ রাসুলুল্লাহ বলে বা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। যেমন ইরবাজ বিন সারিয়া রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন اوصيكم بتقوى الله والسمع والطاعة وان كان عبدا حبشيا فإنه من يعش منكم يرى بعدي اختلافا كثيرا فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين وعضوا عليها بالنواجذ وإياكم ومحدثات الأمور فان كل محدثة بدعة وان كل بدعة ضلالة . أخرجه احمد فى المسند: ٤/١٢٦ رقم ١٧١٨٤ و قال شعيب الأرنؤوط : حديث صحيح ورجاله ثقات; رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ: رقم ٤٦٠٧ و صححه الألباني في مشكاة المصابيح برقم ١٦٥ و السلسلة الصحيحة:٢/٦١٠، وَ اَلتِّرْمِذِيُّ رقم: ٢٦٧٦ وَقَالَ: حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ; و ابن ماجه في سننه: رقم ٤٤; الطحاوي في مشكل الآثار:٣/٢٢٣ و سند الحديث جيد ; البغوي في شرح السنة: ١/٢٠٥ و إسناده حسن ; الطبراني فى المعجم الكبير: ١٨/٢٤٦ رقم ٦١٧ ; ابن حبان فى الصحيح : رقم٥ قال شعيب الأرناؤوط: إسناده صحيح ; وقال الجورقاني في الأباطيل والمناكير: هذا حديث صحيح ثابت مشهور: ١/٤٧٢ رقم ٢٨٨; وقال الحافظ ابن حجر في موافقة: هذا حديث صحيح رجاله ثقات: ١/١٣٦-١٣٩; قال ابن عبدالبر فى جامع بيان العلم: هذا حديث ثابت صحيح: ٢/١١٦٤ رقم ٢٣٠٥ ; قال المنذري في الترغيب والترهيب: لا ينزل عن درجة الحسن وقد يكون على شرط الصحيحين أو أحدهما: ١/٦٠; قال الذهبي في سير أعلام النبلاء: إسناده صالح: ١٧/٤٨٢; قال ابن القيم في أعلام الموقعين: حسن، إسناده لا بأس به: ٤/١١٩ তোমাদেরকে আমি উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করে চলার এবং (তোমাদের উপর নিযুক্ত আমীরের নির্দেশ) শোনা ও মানার -চাই সে কোনো হাবশী গোলামই হোক (না কেনো)। নিশ্চয় অামার (ইন্তেকালের) পরে তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি জীবিত থাকবে সে অনেক দ্বন্দ্ব-বিরোধ দেখতে পাবে। (তখন) তোমারা আমার সুন্নাহ’কে এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়েরাশেদীনের সুন্নাহ’কে তোমাদের উপর অপরিহার্য করে নিবে এবং তা মাড়ির দাঁত দিয়ে তোমরা আঁকড়ে ধরে থাকে (কোনো মতেই ছাড়বে না)। আর তোমরা (দ্বীন ইসলামের মধ্যে আমদানী হওয়া) নতুন নতুন বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, নিশ্চই (দ্বীনের মধ্যে সুন্নাহ বহির্ভূত) প্রত্যেক নতুন-বিষয় বিদআহ এবং নিশ্চই প্রত্যেক বিদআহ পথভ্রষ্ঠতা’। [মুসনাদে আহমাদ- ৪/১২৬ হাদিস ১৭১৮৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৭; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২৬৭৬; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৫; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ৪৪; শারহু মাআনিল আছার, ইমাম তাহাবী- ৩/২২৩; শারহুস সুন্নাহ, ইমাম বাগাভী- ১/২০৫; আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরানী- ১৮/২৪৬ হাদিস ৬১৭; মুসতাদরাকে হাকীম- ১/৯৫-৯৭]

এই হাদিস থেকে মুসলমানরা তাদের খলিফা নির্বাচন করার পদ্ধতি কী হবে -তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ পেয়ে গেল, আর সেটা হল-

(১) রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর সুন্নাহ

(২) খুলাফায়ে রাশেদীন (সরল সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত খলিফাগণ)-এর সুন্নাহ।

রাসুলুল্লাহ তাঁর জীবন সায়াহ্নে পরবর্তী খলিফা নির্বাচন ও মনোনয়নের দু’টি পদ্ধতির দিকে ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন, যা একটি সহিহ হাদিসে হযরত আয়েশা রা.-এর সূত্রে এভাবে বিদ্ধৃত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ আয়েশা রা.-কে বললেন: ادعي لي أبا بكر أباك وأخاك حتى أكتب كتابا فإني أخاف أن يتمنى متمن ويقول قائل أنا أولى ويأبى الله والمؤمنون إلاأبا بكر – ‘(হে আয়েশা!) তোমার পিতা আবু বকর এবং তোমার ভাই (আব্দুর রহমান)-কে আমার কাছে ডেকে আনো যাতে আমি একটি বিষয় লিখে দিতে পারি। আমার ভয় হচ্ছে, (এ পদের) কোনো আকাঙ্খি আবার আকাঙ্খা করে বসে নাকি এবং যে কথা তোলার সে আবার এই কথা তোলে নাকি- ‘আমি (এ পদের) সবচাইতে যোগ্য’। (কিন্তু যে যাই বলুক, যাই করুক না কেনো) আল্লাহ -আবু বকরকে ছাড়া (অন্য কাউকে) গ্রহন করবে না, মুমিনরাও না। [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৮৭; সহিহ বুখারী, হাদিস ৫৩৪২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪৭৯৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৬৫৯৮; সুনানুল কুবরা, নাসায়ী-৪/২৫৩; সুনানে বাইহাকী-৮/১৫৩; মুসতাদরাকে হাকীম-৩/৫৪২; ত্ববাকাতে ইবনে সা’দ-৩/১৮০]

উপরোক্ত হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়-

(১) বর্তমান খলিফা মুনাসেব (উপযোগী) মনে করলে নিজেই তার পরবর্তী খলীফা মনোনয়ন ও নির্বাচন করে যেতে পারেন, যেমনটা রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রথমে আয়েশা রা. ও তাঁর ভাই আব্দুর রহমান রা.-এর কাছে আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর পরবর্তী খলিফা হওয়ার বিষয়টি লিখে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এই রকম নমুনা অন্য হাদিসেও রয়েছে। যেমন রাসুলুল্লাহ ﷺ মুতাহ’র যুদ্ধের দিন যায়েদ বিন হারেসাহ রা.-কে ইসলামের পতাকা দান করেন এবং এরশাদ করেন: فَإِنْ قُتِلَ زَيْدٌ أَوِ اسْتُشْهِدَ فَأَمِيرُكُمْ جَعْفَرٌ، فَإِنْ قُتِلَ أَوِ اسْتُشْهِدَ فَأَمِيرُكُمْ عَبْدُ اللهِ بْنُ رَوَاحَةَ . أخرجه أحمد في مسنده: ١/٢٠٤، من حديث عبد الله بن جعفر رضي الله عنهما. وصحّحه أحمد شاكر في تحقيقه مسند أحمد: ٣/١٩٢ ، والألباني في «أحكام الجنائز: ٢٠٩ – যদি যায়েদ কতল হয় বা শহিদ হয়ে যায়, তাহলে (জিহাদে) তোমাদের আমীর হবে যা’ফর। সেও যদি কতল হয় বা শহিদ হয়ে যায়, তাহলে তোমাদের আমীর হবে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা’[মুসনাদে আহমদ- ১/২০৪]

মুতাহ’র যুদ্ধে ঠিক উপরোক্ত ক্রমানুসারেই প্রথমে যায়েদ রা, তারপর যা’ফর রা. এবং তারপর আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা. একে একে শহিদ হয়ে যান। অথচ ওই জিহাদে আল্লাহ’র তরবারী হিসেবে সম্মানীত খালেদ বিন ওয়ালিদ রা. শরিক ছিলেন, কিন্তু তাঁকে কেউ আমীর মানেননি। কারণ মুসলীম উম্মাহ’র আমীরে আ’জম রাসুলুল্লাহ ﷺ খালেদ বিন ওয়ালিদ রা.কে আমীর না বানিয়ে উপরোক্ত তিনজনকে একের পর এক আমীর বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং মুসলমানগণ আমীরে আ’জম-এর নির্দেশ মেনেছিলেন, কারণ আমীরে আ’জম-এর অনুগত্য ওয়াজিব।

(২) বর্তমান খলিফা মুনাসেব/উপযোগী মনে করলে তার পরবর্তী খলীফা মনোনয়ন ও নির্বাচনের দায়িত্ব মুসলমানদের মতের উপর ছেড়ে যেতে পারেন, যেমনটা রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রথমে আয়েশা রা. ও তাঁর ভাই আব্দুর রহমান রা.-এর কাছে আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর পরবর্তী খলিফা হওয়ার বিষয়টি লিখে দিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত এব্যাপারে কোনো নির্দেশ না দিয়ে তা মুসলমানদের মতের উপর ছেড়ে গেলেন।

তবে জেনে রাখা অতীব জরুরী যে, এখানে ‘মুসলমানদের মতের উপর ছেড়ে যাওয়া’র অর্থ ‘সকল মুসলমান কিংবা অধিকাংশ মুসলমানের মতের উপর ছেড়ে দেয়া নয়’, বরং অর্থ হল ‘মুসলমানদের প্রতিনিধি’গণের মতের উপর ছেড়ে দেয়া। মুসলীম উম্মাহ’র এই প্রতিনিধিগণকে ফিকহের পরিভাষায় ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ বলা হয়ে থাকে, যাঁরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে কাউকে খলিফ হিসেবে মনোনয়ন ও নির্বাচিত করে তাঁর হাতে বায়াত হয়ে গেল সেই ব্যাক্তি গোটা মুসলীম উম্মাহ’র পক্ষ থেকে ‘খলিফা’ নিযুক্ত হয়ে যান এবং তখন গোটা মুসলীম উম্মাহ’র জন্য সেই খলিফার অনুগত্যতা স্বীকার করে নেয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। খোদ ইসলামী শরীয়তে সহিহ ও সারিহ অনমতি না পাওয়া পর্যন্ত ওই খলিফার অনুগত্য অস্বীকার করা বা অনুগত্য থেকে খারেজ (বেড়) হয়ে যাওয়া বা তার সাথে বিদ্রোহ করা নাজায়েয। খুলাফায়ে রাশেদীন এই অর্থই বুঝেছিলেন।

আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ হল ওইসকল ওলামায়ে কেরাম যাঁরা মুসলীম উম্মাহ’র মাঝে সুউচ্চ ইলমের অধিকারী ও এসব ব্যাপারে মতামত দানের বেলায় মুরুব্বিয়ানা মর্তবায় প্রকাশ্যভাবে পরিচিত থাকেন। [মিনহাযুত ত্বালেবীন, ইমাম নববী- ১/১৩১; শারহুল মাক্বাসীদ, তাফতানাযী- ২/২৭২]

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- حَضَرْتُ أَبِي حِينَ أُصِيبَ فَأَثْنَوْا عَلَيْهِ وَقَالُوا جَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا ‏.‏ فَقَالَ رَاغِبٌ وَرَاهِبٌ قَالُوا اسْتَخْلِفْ فَقَالَ أَتَحَمَّلُ أَمْرَكُمْ حَيًّا وَمَيِّتًا لَوَدِدْتُ أَنَّ حَظِّي مِنْهَا الْكَفَافُ لاَ عَلَىَّ وَلاَ لِي فَإِنْ أَسْتَخْلِفْ فَقَدِ اسْتَخْلَفَ مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي – يَعْنِي أَبَا بَكْرٍ – وَإِنْ أَتْرُكْكُمْ فَقَدْ تَرَكَكُمْ مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ فَعَرَفْتُ أَنَّهُ حِينَ ذَكَرَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم غَيْرُ مُسْتَخْلِفٍ ‏.‏ رواه مسلم في الصحيح, كتاب الإمارة, باب الاِسْتِخْلاَفِ وَتَرْكِهِ: رقم ١٨٢٣ ; و ابو عوانة في مسنده: رقم ٦٩٩٩; و احمد في المسند: ١/٤٣ رقم ٢٩٩ – ‘আমার আব্বাজান (ওমর বিন খাত্তাব রা.) যখন (বিষাক্ত তরবারীর আঘাতে) অাহত হলেন, তখন আমি (তাঁর কাছে) উপস্থিত হলাম। লোকজন তার সুনাম করে বললো: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। এতে তিনি বললেন: আমি (আল্লাহ’র রহমতের উপর) আশাবাদী এবং (নিজের পাপের কারণে -কী হবে -তা ভেবে) সন্ত্রস্ত। লোকেরা বললো: ‘আপনি (কাউকে আপনার পরবর্তী) খলিফা বানিয়ে যান’। তিনি বললেন: ‘আমি কি (আমার) জীবনে মরনে (উভয় ক্ষেত্রেই) তোমাদের বিষয়াদির বোঝা বহন করবো?! আমি চাই, ওর মধ্য থেকে (শুধুমাত্র আমার খিলাফতের) মাত্রাবরাবর (অংশটুকুই) আমার ভাগ্যে জুটুক, (বাদবাকি অন্যকে খলিফা বানিয়ে যাওয়ার দায় কিয়ামতের দিন) আমার উপরে না আসুক এবং (আমার দ্বারা মনোনীত খলিফার সৎকাজের সওয়াবও) আমাকে দেয়া না হোক, (আমি শুধু আমার বোঝাটুকু নিয়েই আল্লাহ’র সামনে দাঁড়াতে চাই)। (বস্তুতঃ আমার সামনে দুটো পথই খোলা রয়েছে)। আমি যদি কাউকে (আমার পরবর্তী) খলীফা বানাই (তাহলে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে সে পথও খোলা রয়েছে, কেননা) আমার চাইতে যিনি উত্তম ছিলেন – অর্থাৎ আবূ বাকর রা.- তিনি (তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর পরবর্তী) খলীফা বানিয়ে গেছেন। আবার আমি যদি (খলীফা নির্বাচনের ভার) তোমাদের উপর ছেড়ে যাই, তাহলে (শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে সে পথও খোলা রয়েছে, কেননা) রাসুলুল্লাহ -যিনি আমার চাইতে উত্তম ছিলেন- তিনি (খলীফা নির্বাচনের ভার) তোমাদের (মুসলমানদের) উপর ছেড়ে গিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ (ইবনু ওমর রা.) বলেন: তিনি যখন রাসুলুল্লাহ -এর কথা উল্লেখ করলেন তখনই আমি বুঝে গেলাম যে, তিনি (নিজে কাউকে তাঁর পরবর্তী) খলীফা বানাবেন না’। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮২৩; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ, হাদিস ৬৯৯৯; মুসনাদে আহমদ- ১/৪৩ হাদিস ২৯৯; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৮/২৫৬ হাদিস ১৬৫৭১]

এই রেওয়ায়েতে উপরোক্ত দুটি পদ্ধতির দিকে ইংগীত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ -এর পর খুলাফায়ে রাশেদীন তথা ১ম খলিফা আবু বকর সিদ্দীক রা, ২য় খলিফা ওমর ফারুক রা, ৩য় খলিফা ওসমান গণী রা. এবং ৪র্থ খলিফা আলী রা.- কে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপরোক্ত হাদিসগুলির শিক্ষার বাস্তব প্রতিবিম্বই আমরা দেখেতে পাই।

আবু বকর সিদ্দীক রা-কে ১ম খলিফা হিসেবে নির্বাচন:-

রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর দেহ মোবারক’কে দাফন করার পর আবু বকর সিদ্দীক রা ও ওমর ফারূক র ‘কে বলা হল যে, মুহাজের ও আনসার’গণের কেউ কেউ অমুক স্থানে ‘কে খীলফা হবে’ -তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন। ফলে তাঁরা দুজন সহ আরো কয়েকজন গণ্যমান্য সাহাবায়ে কেরাম সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে দেখতে পেলেন যে, এ ব্যাপারে ইলম কম ছিল -এমন কেউ কেউ এও মত দিয়েছেন যে, আনসার থেকে একজন আমীর এবং মুহাজেরদের থেকে একজন আমীর নিযুক্ত করা হোক। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক রা ও ওমর ফারূক রা. সহ অপরাপর উপস্থিত গণ্যমান্য সাহাবায়ে কেরাম উপস্থিত লোকদেরকে বুঝাতে সমর্থ হলেন যে, ‘সকল মুসলমানদের খলিফা হবেন একজনই এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপদেশ মতো খলিফা হবেন কুরাইশ থেকে। সেখানে আলোচনার মুখ্য ভূমিকা রাখছিলেন আবু বকর সিদ্দিক রা. এবং তিনি তাঁর কথার শেষ দিকে ওমর রা.-এর বিভিন্ন যোগ্যতাগুণের কথা উল্লেখ করে তাঁকে খলিফা করা যায় মর্মে মত প্রকাশ করলেন এবং তাঁর হাতে সকলকে বাইয়াত হতে বললেন। কিন্তু ওমর রা. উপস্থিত মুসলমানদেরকে বুঝাতে সক্ষম হলেন যে, আবু বকর সিদ্দিক রা. এপদের সর্বাধিক যোগ্য এবং খোদ রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবন সায়াহ্নে নামাযের জামাআতে উপস্থিত হতে অপারগ হওয়ায় মুসলমানদের জামাআতের ইমাম বানিয়েছিলেন আবু বকর সিদ্দিক রা.-কে এবং তাঁকে ছাড়া আর কারো ইমামতী তিনি গ্রহন করেননি, সুতরাং গোটা মুসলীম জামায়াতের ইমাম (আমীর/খীলফা) হওয়ারও সর্বাধিক যোগ্য তিনিই। এতে উপস্থিত লোকজন সকলেই ‘হাঁ’ সূচক সম্মতি দেন। তখন ওমর রা. বায়াতের জন্য তাঁর হাতকে আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর দিকে বাড়িয়ে দেন এবং তিনি বায়াত করে নেন। এরপর উপস্থিত গণ্যমান্য সাহাবায়ে কেরাম তাঁর হাতে বায়াত হন। ফলে তাঁদের অনুসরণ করে উপস্থিত বাকি মুসলমানগণও তাঁর হাতে বায়াত করেন।

বস্তুতঃ ওখানে ওমর ফারুক রা. ও অন্যান্য গণ্যমান্য সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ ওলামায়ে কেরাম, যাঁদের বায়াত দ্বারাই আবু বকর সিদ্দিক রা. সকল মুসলমানদের উপর শরয়ী পন্থায় ‘খলিফা’ নিযুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। বাদবাকি বাকি উপস্থিত আনসার ও মুহাজির সাধারণ মুসলমানগণের বায়াত ছিল ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণে এবং খলিফার হাতে বায়াতের স্বীকারোক্তি স্বরূপ। তাঁদের পরে ‘খলিফা নির্বাচনের খবর পেয়ে’ মদিনার মুসলমানগণ আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর হাতে বায়াত হতে থাকেন, যাঁদের মধ্যে আলী রা.ও ছিলেন। খোদ আলী রা.-এর মতো এত উচ্চ মর্তবার ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ বায়াতের প্রথম অবস্থায় উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও ‘খলিফা নির্বাচন ও বায়াত সহিহ’ হওয়াও একথার প্রমাণ যে, ‘কাউকে খলিফা নির্বাচণের জন্য সকল ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর উপস্থিতি জরুরী নয়, বরং উল্লেখযোগ্য ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ উপস্থিত থেকে বায়াত হলেই ‘খলিফা নির্বাচন সহিহ’ হয়ে যায় এবং উক্ত অনুপস্থিত ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সদস্যের জন্যও উক্ত নির্বাচিত খলিফার হাতে বায়াত হওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়’।

ওমর ফরূক রা.-কে ২য় খলিফা হিসেবে নির্বাচন:-

আবু বকর সিদ্দিক রা. তাঁর খিলাফতের শেষ দিকে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অনুভব করেন যে, তাঁর পার্থিব জীবন বোধহয় শেষ হয়ে আসছে। তখন তিনি ‘আহলে শুরা’ (তথা পরামর্শ সভা)’র কয়েকজন গণ্যমান্য সদস্য সাহাবায়ে কেরামের সাথে (যেখানে ওমর রা. অনুপস্থিত ছিলেন) তাঁর পর দ্বিতীয় খলিফা কাকে বানানো যায় মর্মে পরামর্শ করলেন। তিনি এব্যাপারে নিজ থেকে ওমর ফারূক রা- এর নাম উপস্থাপন করে উপস্থিত সদস্যগণের কাছে তাঁর ব্যাপারে তাঁদের নিজ নিজ মতামত জানতে চাইলেন। তাঁরা সকলে ওমর রা.-এর পক্ষে মত প্রকাশ করলেন। তখন আবু বকর রা. তাঁর পরবর্তী খলিফা হিসেবে ওমর ফারূক রা.-কে মনোনীত ও নির্বাচিত করেন এবং এই মর্মে সরকারী অঙ্গীকারনামা লেখেন ওসমান বিন আফফান রা. ও তা জনসম্মুখে পড়ে শোনানো হয়।

এক্ষেত্রে কয়েখটি বিষয় লক্ষনীয়। (১) বর্তমান খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. নিজেই তাঁর পরবর্তী খলিফা মনোনয়ন ও নির্বাচন করে যান, (২) এতে আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণের প্রত্যক্ষ সম্মতি ছিল।

আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর মৃত্যুর পর ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ ওমর ফারূক রা.-এর হাতে একে একে বায়াত হয়ে খলিফার প্রতি তাঁদের অনুগত্যের প্রকাশ্য স্বীকৃতি সংঘটিত হয়ে যায়। পরে মদিনার সাধারণ মুসলমানগণ খলিফার হাতে বায়াত করে অনুগত্যের প্রকাশ্য স্বীকৃতি দেন।

উসমান ইবনে আফফান রা.-কে ৩য় খলিফা হিসেবে নির্বাচন:-

ওমর রা. বিষ মাখা তরবারী দ্বারা গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর পরবর্তী খলীফা কে হবেন সে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি এব্যাপারে আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর মতো আগাম কাউকে তাঁর পরবর্তী খলিফা মনোনয়ন ও নির্বাচন চুড়ান্ত করে যাননি, বরং তা ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর উপর ছেড়ে গেছেন। তবে ওমর রা. ‘আহলে শুরা’র সদস্যদের মধ্যে উসমান ইবনে আফফান রা, আলী বিন আবি ত্বালেব রা., ত্বালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা., যুবাইর ইবনুল আউআম রা., সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা এবং আব্দুর রহমান ইবনে অাওফ রা. -এই ৬ জন’কে বলেন যে, তাঁরা পরষ্পরে পরামর্শ করে তাঁদের ৬ জনের মধ্যে যাঁকে ভাল মনে হয় তাঁকে পরবর্তী ‘খলিফা’ মনোনয়ন ও নির্বাচন করে নিবেন। হযরত ওমর রা.-এর শুরা’র সদস্য হিসেবে আরো অনেকে ছিলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে শুধুমাত্র এই ৬ জন’কে ‘খলিফা’ নির্বাচন চুড়ান্তকরনের ‘‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’’ নিযুক্ত করে দেন।

ওমর রা.কে দাফন করার পর তাঁরা ৬ জন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একস্থানে তৃতীয় খলিফা নির্বাচনের জন্য আলোচনায় বসেন। এও বর্ণিত হয়েছে যে, তখন আমর ইবনুল আস রা. এবং মুগীরা ইবনে শুবা রা. ওই ৬জনের আলোচনা শোনার জন্য দরজার পাশে এসে বসলে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. তাঁদেরকে ছোট ছোট পাথর টুকড়া নিক্ষেপ করে বেড় করে দেন। পরে আলোচনা সভায় ৩ জন সাহাবী যুবায়ের রা., সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. এবং ত্বালহা রা. নিজ নিজ ‘খলিফা’ হওয়ার অধিকারটিকে ছেড়ে দিয়ে খিলাফতের গুরু দায়িত্বের বোঝা নেয়া থেকে সড়ে দাঁড়ালেন এবং তারা অধিকারটিকে যথাক্রমে আলী বিন আবি ত্বালেব রা., আব্দুর রহমান ইবনে অাওফ রা. এবং উসমান ইবনে আফফান রা.-এর স্কন্ধে অর্পন করে দিলেন।

পরে আব্দুর রহমান ইবনে অাওফ রা. ও নিজের অধিকার ছেড়ে দিন, তখন তাঁকে উসমান ইবনে আফফান রা. এবং আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-এর মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে ‘খলিফা’ নির্বাচন করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি এই দায়িত্বটিকে কেয়ামতের দিন হিসাবের প্রশ্নে প্রকান্ড ভারী হবে বোধ করে তখনই ‘খলিফা’ ঘোষনা করলেন না। বরং তিনি তিন দিন ধরে ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সদস্যদের বাইরে অবস্থিত বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম রা., সর্বসাধারণ মুসলমান পুরুষ, এমনকি পর্দানশীন নারীদের কাছে গিয়েও তাদের মতামত জিজ্ঞেস করলেন। এমনকি বর্ণিত হয়েছে যে, ওই তিন দিনের মধ্যে মদিনায় আগত ব্যবসায়ী কাফেলা ও বেদুইনদেরকেও এব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি যখন দেখলেন যে, সকলে উসমান বিন আফফান রা.-এর নাম বলছে -যদিও উসমান রা. ও আলী রা. দুজনই খিলাফা হওয়ার উপযুক্ত ছিলেন, তখন তিনি সার্বিক দিক বিবেচনা করে অবশেষে উসমান বিন আফফান রা.কে চুড়ান্ড ভাবে খলিফা নিযুক্ত করেন এবং সকলে তাঁর হাতে বায়াত হন।

এক্ষেত্রে কয়েখটি বিষয় লক্ষনীয়। (১) বর্তমান খলিফা ওমর রা. নিজে তাঁর পরবর্তী খলিফা মনোনয়ন ও নির্বাচন চুড়ান্ত করে যান নি, বরং ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর হাতে সে দায়িত্ব অর্পণ করে যান, (২) ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সকল সদস্যকে দায়িত্ব না দিয়ে তাঁদের মধ্যে থেকে মাত্র ৬ জনকে দায়িত্ব দেন, (৩) ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর ওই ৬ জন পরামর্শ করে তাদের ওই ৬ জনের মধ্যেই যাকে উপযুক্ত বিবেচিত হয় তাঁকে পরবর্তী ‘খলিফা’ নির্বাচন করে নিতে আদেশ দিয়ে যান, (৪) উক্ত ৬ জন ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর মধ্যে ৪ জন নিজেদের ‘খলিফা’ হওয়ার অধিকার ছেড়ে দেন, বাকি ২ জনের মধ্যে কাকে ‘খলিফা’ বানানো হবে -সেই পরামর্শ করেন, (৫) উক্ত ৬ জন ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সকলে আব্দুর রহমান ইবনে অাওফ রা.-এর একার হাতে ‘খলিফা’ চুড়ান্তভাবে নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং তিনি উসমান রা.-কে ‘খলিফা’ নির্বাচন করেন।

এখানে জেনে রাখা জরুরী যে, উক্ত ৬ জন ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সকলের সম্মতিক্রমে আব্দুর রহমান ইবনে অাওফ রা. এককভাবে ‘খলিফা’ নির্বাচনের অধিকার লাভ করার পর তিনি যদি ৩ দিন ধরে বাকি মুসলমানদের কারো সাথে পরামর্শ না করেও ওই সভাতেই উসমান রা. ও আলী রা. -এই ২ জনের মধ্যে যে কাউকে ‘খলিফা’ বলে ঘোষনা দিতেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি গোটা মুসলীম উম্মাহ’র ‘খলিফা’ হয়ে যেতেন এবং তখন সেই খলিফা’র অনুগত্য করা সকল মুসলমানের জন্য ওয়াজিব হয়ে যেতো।

আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-কে ৪র্থ খলিফা হিসেবে নির্বাচন:-

উসমান বিন আফফান রা.কে সন্ত্রাসীরা শহিদ করে ফেললে পর তাঁকে দাফন দেয়া হয় এবং এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় মুসলমানরা পরবর্তী ‘খলিফা’ নির্বাচন নিয়ে কিছুটা দিশেহারা অবস্থার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। কারণ, সে সময় মদিনার অবস্থা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না, বরং সন্ত্রাসীদের যত্রযত্র দৌরাত্বের এক অসহনীয় ও অনাকাঙ্খিত অবস্থার ভিতরে ছিল মদিনাবাসী মুমিন মুসলমানরা। এমনকি এই নাজুক মুহূর্তে মদিনাবাসীদের একটি দল আলী রা.-এর হাতে বায়াত করতে চেষ্টা করলে তিনি কোনো এক বাগানে গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। পরে তারা তাঁকে বুঝাতে সমর্থ হন যে, এ মুহূর্তে তাঁর ‘খলিফা’ হওয়া থেকে পালিয়ে বেড়ানোর সময় নয় বরং এই নাজুক সময়ে তাঁর খিলাফতের হাল ধরা জরুরী। এতে তিনি সম্মত হন এবং ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর কয়েকজন সহ মদিনার অনেকে সেদিন তাঁর হাতে বায়াত হন এবং আলী রা. হয়ে যান একজন শরীয়ত সম্মত ‘খলিফা’।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেল, সুন্নাহ পন্থা হল-

(ক) বর্তমান খলীফা কোনো যোগ্য মুসলমানকে পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনীত করে যেতে পারেন। যেমন খোদ্ রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবদ্দশাতেই আবু বকর সিদ্দিক রা.কে পরবর্তী ‘খলিফা’ বানানোর কথাটি লিখে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। [আল আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, মাওয়ার্দী- ১০ পৃ:; শারহুল মুসলীম, নববী- ১০/২০৫; মারাতিবুল উজমা, ইবনে হাযাম- ১৪৫ পৃ:; মাআলিমুস সুনান, খাত্তাবী- ৩/৩৫১]

(খ) বর্তমান খলীফা কোনো যোগ্য মুসলমানকে পরবর্তী খলীফা হিসেবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করে যেতে চাইলে তিনি তাঁর ‘আহলে-শুরা’-এর সাথে পরামর্শ করে নিতে পারেন এবং আহলে-শুরা’র মধ্যে ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ সদস্যবৃন্দ উম্মতের জন্য কল্যানকর মনে করে সমর্থন দিলে পর বর্তমান খলিফা তার জীবদ্দশাতেই উক্ত ব্যক্তিকে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসেবে চুড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত করে যেতে পারেন। বর্তমান খলীফা’র মৃত্যুর পর ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সদস্যগণ উক্ত মনোনীত ব্যাক্তির হাতে বায়াত হওয়ার দ্বারা সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির ‘খলিফা’ হওয়া সুন্নাহ পন্থায় শরীয়ত-শিদ্ধ হয়ে যাবে। ১ম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. এমনটাই করেছিলেন।

(গ) বর্তমান খলীফা তার জীবদ্দশায় নিজে কোনো যোগ্য মুসলমানকে ভাবী খলীফা হিসেবে আগাম মনোনীত করে না গিয়ে তিনি মুনাসেব মনে করলে সে দায়িত্ব ‘আহলে-শুরা’ (খলীফার পরামর্শ সভার সদস্যবৃন্দ)র হাতে সোপর্দ করে যেতে পারেন। পরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সদস্যগণ নিজেদের মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষে কারো হাতে বায়াত হওয়ার দ্বারা সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির ‘খলিফা’ হওয়া সুন্নাহ পন্থায় শরীয়ত-শিদ্ধ হয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ, দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারূক রা. এমনটাই করেছিলেন।

(ঘ) বর্তমান খলীফা তাঁর জীবদ্দশায় পরবর্তী ‘খলিফা’ মনোনয়নের উপরোক্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহন না করে থাকলে বা করার আগেই মৃত্যু হয়ে গেলে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর সদস্যগণ নিজেদের মধ্যে আলোচনা সাপেক্ষে কারো হাতে বায়াত হওয়ার দ্বারা সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির ‘খলিফা’ হওয়া সুন্নাহ পন্থায় শরীয়ত-শিদ্ধ হয়ে যাবে।এভাবেই আলী বিন আবি ত্বালেব রা., হাসান বিন আলী রা, ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহ -এর ‘খিলাফত’ সুন্নাহ পন্থায় শরীয়ত-শিদ্ধ হয়েছিল। নিকট ভবিষ্যতে এভাবেই ইমাম মাহদী রা.-এর ‘খিলাফত’ তাঁর সময়কার ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর বায়াত দ্বারা সুন্নাহ পন্থায় শরীয়ত-শিদ্ধ হয়ে যাবে।

ইসলামী শরীয়তের এই সুন্নাহ/আদর্শিক পন্থার বিপরীতে-

(ক) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ধর্মীয় বিধানকে ১০০% মুক্ত করায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা অত্যাবশ্যক (ফরয) শর্ত, তাই রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রেও ইসলাম ধর্মের এই ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ কর্তৃক সুন্নাহ/আদর্শিক পন্থা’য় গোটা মুসলীম উম্মাহ’র রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন চুড়ান্ত হওয়ার’ শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ১০০% মুক্ত করায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা তাদের মতে অত্যাবশ্যক (ফরয)।

(খ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানকে টেনে আনা ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম), তাই রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রেও ইসলাম ধর্মের এই ‘‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ কর্তৃক সুন্নাহ/আদর্শিক পন্থা’য় গোটা মুসলীম উম্মাহ’র রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন চুড়ান্ত হওয়ার’ শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনাও তাদের মতে ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম)।

(গ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যেহেতু বিশ্বাস করে- যে ব্যাক্তি ধর্মীয় বিধিবিধানকে রাষ্ট্রব্যাবস্থায় টেনে আনায় বিশ্বাসী সে আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেই বিশ্বাসী নয় বরং অস্বীকারকারী (কাফের), তাই যে ব্যাক্তি রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মের এই ‘‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ কর্তৃক সুন্নাহ/আদর্শিক পন্থা’য় গোটা মুসলীম উম্মাহ’র রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন চুড়ান্ত হওয়ার’ শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনায় বিশ্বাসী, তাদের মতে সেও আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসীই নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে অস্বীকারকারী (কাফের)।

(ঘ) উপরোক্ত এই ৩টি পয়েন্টের এব্যাপারে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদীদেরর ঐক্যমত (ইজমা) রয়েছে।

এজন্য, এযুগের গণতান্ত্রীক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে সকল প্রাপ্তবয়ষ্ক নাগরীক -চাই সে মুসলীম, হিন্দু, বৈদ্ধ, ইহুদী, খৃষ্টান, কাদিয়ানী বা নাস্তিক হোক আর মুর্খই হোক – সবাই মিলে নিজ নিজ মত (ভোট) দান করে দেশের ‘রাষ্ট্রপ্রধান’ নির্বাচন করে থাকে। এতে অধিকাংশ নাগরীকের ভোটে যদি কোনো কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক’ও নির্বাচিত হয়, তাহলে হালের গণতান্ত্রীক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নেয়া অপরিহার্য (ফরয), তাকে না মানা আইনতঃ নিষিদ্ধ (হারাম) এবং দাপ্তরিক ভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও কেউ মানতে অস্বীকার করলে সে রাষ্ট্রীয় অপরাধে অপরাধী (মুজরীম) হবে, যার কোনো কোনো সীমালঙ্ঘন তাকে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত উপভোগ করতে হতে পারে।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের এই তথাকথিত অধিকাংশের মতের ভিত্তিতে নেতা/নেত্রী নির্বাচনের যে থিওরী তারা ‘গণতন্ত্র’ নাম দিয়ে পৃথিবীর মানুষকে বেউকুফ বানাচ্ছে আর ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছে তা জানার জন্য আল্লাহ তাআলার এই আয়াতই যথেষ্ট-

وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ
 
‘আর তুমি যদি পৃথিবীতে যারা আছে তাদের অধিকাংশের অনুসরণ করো তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করে দিবে। তারা শুধুমাত্র ধারনার অনুসরণ করে এবং তারা শুধু ধারনাই করে। [সুরা আনআম ১১৬]
 
এ কথা কে না জানে যে, ইসলামের ঊষালগ্নে মক্কার অধিকাংশ মানুষ ছিল ইসলাম বিরোধী, রাসুলুল্লাহ সা.-এর বিরোধী, এমন কী সংখ্যালঘু মুসলমানগণ মক্কার সংখ্যাগুরু কাফেরদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। হিজরতের পর মদিনাতেও মুসলমানরা ছিল প্রায় সংখ্যালঘু, আর কাফেররা ছিল সংখ্যাগুরু। যদি মক্কা বা মদিনায় অধিকাংশ নাগরীকের মতামত (ভোট)-এর ভিত্তিতে রাষ্ট্রপ্রধান বা গোত্রপ্রধান নির্বাচনের বিষয়টি সাব্যস্ত হত, তাহলে কাফেররা সর্বাবস্থায় চাইতো তাদের রাষ্ট্র/গোত্রপ্রধান হোক তাদের কেউ (অর্থাৎ কোনো কাফের)। আর বলাই বাহুল্য, এরকম হলে কোনো দিনই মক্কা মদিনা কোথায়ও ‘দ্বীন ইসলাম’ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতো না এবং দুনিয়ার বুকে আল্লাহ’র খলিফারা আল্লাহ’র পছন্দনীয় ‘খিলাফত’ ব্যবস্থা পরিচালনার পরিবর্তে উল্টো শয়তানের খলিফারা জমিনের বুকে শয়তানী সাম্রাজ্যের শিকড় গেড়ে রাখতো। তখন রাসুলুল্লাহ সা., হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা., হযরত ওমর ফারুক র., হযরত ওসমান রা. কিংবা হযরত আলী রা.-কে মুসলীম জাহানের খলিফা হিসেবে ইতিহাস দেখতে পেতো না, দেখতে পেতো না এ ব্যাপারে ইসলামী শরয়ী দৃষ্টিকোণ কী। আর যে মহান উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এ বিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন তাও বাস্তবরূপে বিকশিত হতে পারতো না। কারণ তা পূর্ণতা দানে ভুমিকা রাখবে-তো তাঁর খলীফারা তাঁর প্রতিনিধিরা, যাদের জন্য এ জমিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
 
إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
‘নিশ্চই আমি পৃথিবীতে (আমার) খলিফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করবো’। [সূরা বাকারাহ ৩০]
 
এই খিলাফতের মিশন আঞ্জাম দেয়ার জন্য এই শেষ জামানায় (ইনশাআল্লাহ অতীব নিকতবর্তী সময়ের মধ্যে) ইমাম মাহদী রা. যখন আবির্ভূত হবেন এবং ক্বাবা ঘরের রুকন ও মাক্বাম-এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তৎকালীন বিশ্বের ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ তাঁর হাতে উপরোক্ত সুন্নাহ/আদর্শিক পন্থায় খিলাফতের বায়াত নিবেন এবং তাঁদের বায়াত দ্বারাই ইমাম মাহদী গোটা মুসলীম উম্মাহ’র ‘আমীরে আ’জম/খলিফা/ইমাম’ হয়ে যাবেন, তখন দেখতে পাবেন যে, যারা (সম্ভবতঃ বেশিরভাগ রাজনীতিক ও সর্বসাধারন মানুষ) ধর্মনিরপেক্ষতা’র উপরোক্ত আক্বীদায় পোক্তভাবে বিশ্বাসী থাকবে এবং খাঁটি তওবা করে ইসলামের ছায়ায় ফিরে আসবে না, তারা ইমাম মাহদী’র শরীয়তশুদ্ধ খিলাফতকে ইনকার/অস্বীকার করবে। ফলে তারা প্রকাশ্য মুনাফেক হয়ে কাফের গোষ্ঠিদের ও শেষমেস দাজ্জালের সহযোগী হয়ে ইমাম মাহদী ও মুমিনগণের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাবে।

শরীয়ত শুদ্ধ ‘খলিফা’র বিদ্যমানতায় ২য় কারো হাতে খিলাফতের বায়াত হওয়া নাজায়েয

এখানে শরীয়ত শুদ্ধ ‘খলিফা’ -এজন্য বললাম, যেহেতু খোদ শরীয়ত যাদেরকে খলিফা/আমীরে আ’জম/ইমাম হওয়ার অধিকারই দেয়নি (যেমন কাফের-মুরতাদ, নারী প্রমূখ), তাদেরকে যদি খোদ্ উপরোক্ত শরয়ী পন্থায়ও ‘খলিফা’ হিসেবে নির্বাচন করা হয়, তবুও তারা মুসলমানদের শরয়ী ‘খলিফা/আমীরে আ’জম/ইমাম’ নয়। কারণ, শুধুমাত্র পন্থা শুদ্ধ হওয়া যথেষ্ট নয়, খোদ ব্যাক্তি/পাত্রও শরীয়তের দৃষ্টিতে শুদ্ধ হওয়া অপরিহার্য। কোনো জামানায় শরীয়তের দৃষ্টিতে কেউ প্রথমে ‘খলিফা’ হিসেবে উত্তির্ণ/সাব্যস্থ হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয় কেউ নিজকে ‘খলিফা’ হিসেবে দাবী করা ও তার হাতে বায়াত করা উভয়টিই নাজায়েয। এরকম দাবীদার ব্যাক্তি ও তার দল শরীয়তের দৃষ্টিতে মুসলীম উম্মাহ’র একতাবদ্ধ জামাআতের মাঝে ফাটল/বিভেদ সৃষ্টিকারী হিসেবে গণ্য।

আবু হুরায়রাহ রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمْ الْأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيٌّ خَلَفَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِي وَسَيَكُونُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُونَ قَالُوا فَمَا تَأْمُرُنَا قَالَ فُوا بِبَيْعَةِ الْأَوَّلِ فَالْأَوَّلِ أَعْطُوهُمْ حَقَّهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ سَائِلُهُمْ عَمَّا اسْتَرْعَاهُمْ . رواه بخارى فى صحيحه, كتاب أحاديث الأنبياء, باب ما ذكر عن بني إسرائيل: رقم ٣٤٥٥; و مسلم فى صحيحه, كتاب الإمارة، باب الأمر بالوفاء ببيعة الخلفاء، الأول فالأول،,: ٣/١٤٧٢ رقم ١٨٤٢; السنة لالخلال: ١/١١ رقم ٦ اسناده صحيح ; أحمد في المسند: رقم ٧٩٤٧; ابن ماجه فى سننه: رقم ٢٨٧١; البيهقي فى دلائل النبوة: ٦/٣٣٨ – বনী ইসরাঈলের সিয়াসাতী (রাজনৈতিক/পলিটিকাল) দায়িত্ব পালন করতেন তাদের নবীগণ। যখনই কোনো নবী মৃত্যুবরণ করতেন, তাঁর খলীফা (স্থলাভিষিক্ত) হতেন (তাঁর পরবর্তী আরেকজন) নবী। আর নিশ্চই আমার পর কোনো নবী নেই। শিঘ্রই (আমার পর রাজনৈতিক/পলিটিকাল দায়িত্ব পালনের জন্য) খলিফাগণ হবেন, পরে (ভাল-মন্দ খলিফা’র সংখ্যা) অনেক হবে। জিজ্ঞেস করা হল: (খলিফাগণ সম্পর্কে) আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ দেন? তিনি বললেন: অনুগত্য করবে তার, যার কাছে প্রথমে বায়েত করা হয়েছে, তারপর (তিনি ইন্তেকাল করলে অনুগত্য করবে তার, যার কাছে) প্রথমে (বায়েত করা হয়েছে)। (তারা খলিফা হিসেবে তোমার কাছ থেকে শরয়ী দৃষ্টিতে যে হক্ব প্রাপ্য), তাদের কাছে তাদের (সে) হক্ব (যথাযথ ভাবে) পৌছে দিবে। নিশ্চই আল্লাহ তাদেরকে যে ব্যাপারে (তোমাদের উপর) পৃষ্ঠপোষক বানিয়েছিলেন, (কেয়ামতের দিন) তাদেরকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৩৪৫৫; সহিহ মুসলীম– ৩/১৪৭২ হাদিস ১৮৪২; আস-সুন্নাহ, ইমাম খাল্লাল-১/৭৭ হাদিস ৬; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৭৯৪৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৭১; দালায়েলুন নাবুওত, বাইহাকী- ৬/৩৩৮]

এই হাদিসে فُوا بِبَيْعَةِ الْأَوَّلِ فَالْأَوَّلِ অনুগত্য করবে তার, যার কাছে প্রথমে বায়েত করা হয়েছে, তারপর (তিনি ইন্তেকাল করলে অনুগত্য করবে তার, যার কাছে) প্রথমে (বায়েত করা হয়েছে)’ -এর মধ্যে প্রথমে বায়াত করার অর্থ হল, ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ যাঁকে ‘খলিফা’ নির্বাচিত করে ফেলেছেন -তিনি উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, তাঁরা নির্বাচন করে বায়াত হয়ে গেলেই গোটা উম্মাহ’র পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে মুসলীম উম্মাহ’র ‘খলিফা/আমীরে আ’জম’ হিসেবে গণ্য হবেন। তখন অপরাপর মুসলমানদের উপর ওয়াজিব হবে ওই ব্যাক্তিকেই ‘খলিফা’ হিসেবে মেনে নেয়া ও সাধ্যমতো (সকল জায়েয নির্দেশের) অনুগত্য করা। এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র আক্বিদা।

ইমাম নববী রহ. বলেছেন- إذا بويع لخليفة بعد خليفة فبيعة الأول صحيحة يجب الوفاء بها ، وبيعة الثاني باطلة يحرم الوفاء بها ، ويحرم عليه طلبها ، وسواء عقدوا للثاني عالمين بعقد الأول أو جاهلين ، وسواء كانا في بلدين أو بلد ، أو أحدهما في بلد الإمام المنفصل والآخر في غيره – অর্থাৎ যখন (আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ কর্তৃক) একজন খলিফার হাতে (প্রথমে) বায়াত হওয়ার পর (আরেক গ্রুপ অন্য দ্বিতীয়) কোনো খলিফার হাতে বায়াত হয়, তখন প্রথম জনের হাতে হওয়া বায়াতটি (শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্য ও) সহিহ (সাব্যস্থ হয়) এবং তার অনুগত্য করা (সকল মুসলমানদের উপর) ওয়াজিব (থাকে)। আর দ্বিতীয় (জনের হাতে হওয়া) বায়াতটি (শরীয়তের দৃষ্টিতে) বাতিল (ও অগ্রহনযোগ্য বলে বিবেচিত হয়) এবং (খলিফা হিসেবে) তার অনুগত্য করাও (মুসলমানদের জন্য) যেমন হারাম, তেমনি তার জন্যও ওই দাবী করা হারাম -সেটা চাই (আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ কর্তৃক) প্রথম খলিফার কাছে বায়াত হওয়া অবস্থায় (বাকি) সকল মানুষ বা জাহেলরা (মিলে) দ্বিতীয়জনের হাতে বায়াত হোক না কেনো, চাই তারা দু’জন দু’নগরের বা একই নগরের লোক হোক অথবা তাদের দুজনের একজন বিচ্ছিন্ন কোনো রাজধানীর আর অপরজন ভিন্ন কোনো স্থানের লোক হোক না কেনো’। [শারহুল মুসলীম, ইমাম নববী৬/২১; উমদাতুল কারী, ইমাম আইনী- ১৬/৬০]

‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ কর্তৃক মুসলীম উম্মাহ’র ‘খলিফা’ নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পরও যদি মুসলমানদেরই অপর কোনো গ্রুপ দ্বিতীয় কোনো মুসলীমকে ‘খলিফা’ নির্বাচন করে তার হাতে খিলাফতের বায়াত করে বসে -চাই সেই দ্বিতীয় ব্যাক্তি যত যোগ্যই হোক না কেনো, তাদের এসব তৎপরতা শরীয়তের দৃষ্টিতে দ্বীন ইসলামে প্রকাশ্য ‘ফিতনা’ হিসেবে গণ্য। এমতাবস্থায়, শরীয়ত প্রথম খলিফা’কে অধিকার দিয়েছে, তিনি- (১) ওই পরের দাবীদারকে কতল করতে পারেন যদি কতল করা ব্যতীত তাকে তাঁর অনুগত্যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হয়, (২) ওই পরের দাবীদার ও তার গ্রুপের বিরুদ্ধে জিহাদ/কিতাল করতে পারেন -যদি জিহাদ/কিতাল করা ব্যতীত তারা তাঁর বশ্যতা স্বীকার না করে। [আল-মিনহাজ, ইমাম নববী – ১২/২৪২; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ১২/১৫৬; মিরকাতুল মাফাতিহ, কারী- ৭/২৩৫]

আরফাযাহ রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- লিখেছেন- مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ، يُرِيدُ أَنْ يَشُقَّ عَصَاكُمْ، أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ، فَاقْتُلُوهُ .صحيح مسلم, كتاب الإمارة, باب حكم من فرق أمر المسلمين وهو مجتمع: رقم ١٨٥٢; مسند أبي عوانة, كتاب الإمارة : ٤/٤١٢ رقم ٨١٤٠ ‘তোমাদের (মুসলমানদের) শাসন (ব্যবস্থা) সার্বিকভাবে কোনো একজন ব্যাক্তির উপর (ন্যাস্ত) থাকাবস্থায় (অন্য) যে ব্যাক্তি তোমাদের কাছে এসে তোমাদের শাসনের লাঠিকে ভেঙ্গে দিতে চায়, অথবা তোমাদের জামাআতের মাঝে ফাটল ধরাতে চায়, তোমরা তাকে হত্যা করে ফেলো’[সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৫২; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ- ৪/৪১২ হাদিস ৮১৪০]

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- লিখেছেন- إِذَا بُويِعَ لِخَلِيفَتَيْنِ فَاقْتُلُوا الْآخَرَ مِنْهُمَا . رواه مسلم, كتاب الإمارة, باب إذا بويع لخليفتين: رقم ١٨٥٣; و أبو عوانه في مستخرجه, كتاب الأمراء, بيان وجوب نصرة الخليفة: رقم ٥٧٦١; و البيهقي في السنن الكبرى, كتاب القسامة: رقم ٢٥٠٥٣; و الطبراني في المعجم الأوسط , باب الألف: ٢٨٥٠ – ‘যখন দু’জন খলিফার কাছে বায়াত করা হয়, তখন তাদের দুজনের শেষোক্তজনকে তোমরা কতল করে ফেলবে’[সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৫৩; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ, হাদিস ৫৭৬১; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী, হাদিস ২৫০৫৩; মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী, হাদিস ২৮৫০]

অামর বিন আস রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- লিখেছেন- من بايع إماماً فأعطاه صفقة يده وثمرة قلبه فليطعه إن استطاع ، فإن جاء آخر ينازعه فاضربوا عنق الآخر . رواه مسلم, كتاب الإمارة:٣/١٤٧٣ رقم ١٨٤٤; و ابو داود: رقم ٤٢٤٨ و صححه الالباني في صحيح سنن أبي داود ‘যে ব্যাক্তি কোনো ইমাম (খলিফা/আমীর)-এর কাছে বায়াত করে, সে যেন (নাগরীক হিসেবে) তার হাতের চুক্তি ও মনের ফল (নিষ্ঠা) তাঁকে দিয়ে দেয়, তারপর সাধ্যমতো তার অনুগত্য করে। পরে অন্য কেউ যদি এসে তাঁর (তথা প্রথম ইমামের) সাথে (খিলাফত নিয়ে) দ্বন্দ্ব বাঁধায়, তাহলে তোমরা পরেরজনের গর্দান উড়িয়ে দাও’[সহিহ মুসলীম-৩/১৪৭৩ হাদিস ১৮৪৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪২৪৮]

এ থেকে প্রমাণিত হয়, যে কোনো জামানায় গোটা মুসলীম উম্মাহ’র ‘খলিফা/আমীরে আ’জম’ হবে শুধুমাত্র একজন। বাদবাকি বিভিন্ন স্থানের আমীর’রা মূলতঃ মূল ‘খলিফা’র একেকজন নায়েব (প্রতিনিধি) মাত্র। [মাজমুউল ফাতাওয়া, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ- ৩৪/১৭৫] ‘খলিফা/আমীরে আ’জম’ প্রয়োজনে তার এই নায়েব আমীরদেরকে ছাটাই বা অন্যত্র বদলীও করার শরয়ী অধিকার রাখেন। কিন্তু ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ কর্তৃক নির্বাচিত ‘খলিফা/আমীরে আ’জম’ -কে ছাটাই করা বা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসা জায়েয নেই -যাবৎ না খোদ শরীয়ত অনুমতি দেয়। শরীয়ত কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে খলিফা/ইমাম/সুলতান/আমীরে আ’জম -এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা যুদ্ধ করার অনুমতি দেয় সে ব্যাপারে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা আসছে।

কিন্তু ইসলামী শরীয়তের এই মাসআলার বিপরীতে-

(ক) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ধর্মীয় বিধানকে ১০০% মুক্ত করায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা অত্যাবশ্যক (ফরয) শর্ত, তাই রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তের ‘১ম খলীফার বিদ্যমানতায় ২য় কেউ খিলাফতের দাবী করতে পারবে না’ মর্মে শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ১০০% মুক্ত করায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা তাদের মতে অত্যাবশ্যক (ফরয)।

(খ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানকে টেনে আনা ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম), তাই রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তের ‘১ম খলীফার বিদ্যমানতায় ২য় কেউ খিলাফতের দাবী করতে পারবে না’ মর্মে শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনাও তাদের মতে ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম)।

(গ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যেহেতু বিশ্বাস করে- যে ব্যাক্তি ধর্মীয় বিধিবিধানকে রাষ্ট্রব্যাবস্থায় টেনে আনায় বিশ্বাসী সে আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেই বিশ্বাসী নয় বরং অস্বীকারকারী (কাফের), তাই যে ব্যাক্তি রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তের ‘১ম খলীফার বিদ্যমানতায় ২য় কেউ খিলাফতের দাবী করতে পারবে না’ মর্মে শর্তটিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনায় বিশ্বাসী, তাদের মতে সেও আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসীই নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে অস্বীকারকারী (কাফের)।

(ঘ) উপরোক্ত এই ৩টি পয়েন্টের এব্যাপারে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদীদেরর ঐক্যমত (ইজমা) রয়েছে।

‘খলিফা/আমীরে-আ’জম/ইমাম/শাসক’- এর অনুগত্য, মুখালিফাত (বিরোধিতা) এবং বাগাওয়াত (বিদ্রোহ) সম্পর্কিত শরয়ী দিকনির্দেশনা

শরীয়তের দৃষ্টিতে কেউ ‘খলিফা/আমীরে আ’জম’ নির্বাচিত হয়েছে মর্মে উত্তির্ণ হয়ে গেলে, সেই ‘খলিফা’র সার্বিক অনুগত্য করা ও তার আদেশ নির্দেশ মানা গোটা উম্মাহ’র উপর ওয়াজিব।
 
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন-
 
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَ أُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
‘হে মুমিনগণ! তোমরা অনুগত্য করো আল্লাহ’র এবং অনুগত্য করো রাসুলের, এবং (অনুগত্য করো) তোমাদের (মুসলমানদের) মধ্যকার উলুল-আমর’-এর। এতে তোমরা যদি কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পরো, তাহলে যদি আল্লাহ ও কেয়ামতের দিবসের প্রতি তোমাদের ইমান থেকে থাকে, তাহলে বিষয়টি আল্লাহ ও (তাঁর) রাসুলের (ফয়সালার) কাছে ছেড়ে দাও। এই (নির্দেশনাটি তোমাদের জন্য) কল্যানকর এবং (এটাই এবিষয়ক) সর্বোত্তম ব্যাখ্যা’।[সূরা নিসা ৫৯]
 
সহিহ বুখারী সহ বিভিন্ন হাদিসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এই আয়াতের শানে নুজুল প্রসঙ্গে বলেছেন- نزلت في عبد الله بن حذافة بن قيس بن عدي، إذ بعثه النبي صلى الله عليه وسلم في سرية – আয়াতটি আব্দুল্লাহ বিন হুযাফাহ বিন ক্বায়েস বিন আদী রা. সম্পর্কে নাজিল হয় (একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ঘটনাটি ঘটেছিল তখন) যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সারিয়া’য় (জিহাদে) পাঠিয়েছেলেন। [সহিহ বুখারী-৪৫৮৪; সহিহ মুসলীম- ১৮৩৪; মুসনাদে আবু ইয়া’লা- ২৭৪৬; সুনানে আবু দাউদ- ২৬২৪; মুসতাদরাকে হাকেম- ২/১১৪; জামে তিরমিযী – ১৬৭২; সুনানে নাসায়ী- ৪১৯৪; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ- ৪/৪৪২; দালায়েলুন নাবুয়াত, বাইহাকী- ৪/৩১১; জামেউল বয়ান, তাবারী- ৮/৪৯৭ আছার ৯৮৫৮; তাফসীরে ইবনে আবি হাতেম- ৩/৯৮৭; তাফসীরে ইবনে কাসির- ২/৪৯৭] ইমাম বাইহাকী রহ. সহিহ সূত্রে হযরত ইবনে যুরাইয রহ.-এর উক্তি বর্ণনা করেছেন যে- نَزَّلَ : يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الأَمْرِ مِنْكُمْ فِي عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حُذَافَةَ بْنِ قَيْسِ بْنِ عَدِيٍّ السَّهْمِيِّ ، بَعَثَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَرِيَّةٍ “ اخرجه البيحقى فى شعب الايمان: رقم ٦٩٦٣, اسناده صحيح – অর্থাৎ, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الأَمْرِ مِنْكُمْ -আয়াতটি আব্দুল্লাহ বিন হুযাফাহ বিন ক্বায়েস বিন আদী সাহমী রা. সম্পর্কে নাজিল হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সারিয়া’য় (জিহাদে) পাঠিয়েছেলেন। [শুআবুল ইমান, বাইহাকী- ৯/৪০৯, হাদিস ৬৯৬৩]
 
সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলীম সহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদিসের কিতাবে হযরত আলী রা.-এর সূত্রে উক্ত ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে, যার সারমর্ম হল, কোনো কারণে মুজাহিদ গণের উপর তাদের আমীর (হযরত আব্দুল্লাহ বিন হুযাফা বিন কায়েস বিন আদী রা.) খুব ক্রধাহ্নিত হয়ে যান এবং তাদেরকে বলেন: أَلَيْسَ أَمَرَكُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُطِيعُونِي – নবী কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেননি যে, তোমরা আমার অনুগত্য করবে? এতে তারা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে তিনি তাদেরকে জ্বালানী কাঠ জোগার করতে বললেন। তারা জোগার করে নিয়ে এলে তিনি তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাদেরকে আগুনে ঝাপ দিতে বললেন। কিন্তু তারা তার আদেশ মানতে অস্বীকার করে এবং বিষয়টি পরে রাসুলুল্লাহ -কে জানায়। ঘটনা শুনে রাসুলুল্লাহ বললেন: لَوْ دَخَلُوهَا مَا خَرَجُوا مِنْهَا أَبَدًا ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي المَعْرُوفِ – যদি তোমরা তাতে প্রবেশ করতে, তাহলে আর কখনই তা থেকে বেড়ুতে পারতে না। অনুগত্য শুধুমাত্র মা’রুফ (জায়েয) বিয়য়ে (করতে হয়); (আল্লাহ’র নাফরমানীমূলক কোনো কাজে নয়)[সহিহ বুখারী, হাদিস ৭১৪৫, ৪৩৪০; সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৪০; মুসনাদে আহমদ-১/৮২; মুসনাদে বাযযার- ২/২০৩, হাদিস ৫৮৫; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৭/৬৫৫; তাফসীরে ইবনে কাসির- ২/৪৯৭]
 
ইমাম বাইহাকী রহ. লিখেছেন- قال الامام احمد: والحديث الذى ورد فى نزول هذه الآية دليل على أنها فى الأمراء – ইমাম আহমদ রহ. বলেছেন: আয়াতটির শানে নুজুল প্রসঙ্গে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, সেটিই একথার দলিল যে, তা (মুসলমানদের উপরে নিযুক্ত) আমীরগণ সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। [শুআবুল ইমান, বাইহাকী- ৯/৪০৯]
 
ইমাম তাবারী রহ. সহিহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, আবু হুরায়রাহ রা. أولو الأمر (উলুল-আমর) -এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: هم الأمراء – তারা হচ্ছেন আমীরগণ[জামেউল বয়ান, তাবারী- ৯৮৫৬; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৮/১৯১]
 
এই আরবী শব্দ أَمْر (আমর্)-এর এক অর্থ হল হুকুম, আদেশ, নির্দেশ (Order)। এই অর্থ হিসেবে أُولي الْأَمْر (উলুল-আমর্) বলতে বুঝায় এমন ব্যাক্তিকে, যিনি কারো উপর হুকুম, আদেশ বা নির্দেশ (Order) দান করার অধিকার (Authority) রাখেন। আর উপরে সূরা নিসা’র ৫৯ নং আয়াতটিতে أُولي الْأَمْر (উলুল-আমর) বলতে এমন ব্যাক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যিনি মুসলমানদের উপর নিযুক্ত এমন একজন ওলী (অভিভাবক), যিনি শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানদের উপর কুরআন সুন্নাহ’র হুকুম, আদেশ বা নির্দেশ (Order) দান করা বা জারি করার অধিকার (Authority) রাখেন। বিধায়, উলুল-আমর বলতে এখানে- আমীরে আ’জম (খলিফা/ইমাম/সুলতান/রাষ্ট্রপ্রধান), আমেল (প্রশাসক), জিহাদের আমীর (সেনাপতি), হাকেম (সরকারী বিচারক), ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’গণ প্রমুখকে বোঝানো হয়েছে। [আর রিসালাহ, ইমাম শাফেয়ী- ৭৯ পৃ:; জামেউল বয়ান, তাবারী– ৫/১৫০; আল উসূল ওয়াল ফুরু’, ইবনে হাযাম- ২/২৯২; তাফসীরে কাবীর, ইমাম রাজী- ৫/২৫০; আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী- ১/৫৭৩; আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ২/২৯৮; আল মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়্যাহ- ২৮/১৭০; ই’লামুল ময়াক্কিঈন, ইবনুল কাইয়্যেম- ১/১০; আল-জামেউ লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ৫/২৬১; তাফসিরে ইবনে কাসির- ১/৪৪৫; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৮/১৯১; ফাতহুল কাদীর, শাওকানী- ১/৪৮১]
 
উপরোক্ত আয়াতে يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا – ‘হে মুমিনগণ!’ -বলে প্রত্যেক মুমিন নর-নারী’র দৃষ্টি আকর্ষন করা হয়েছে এবং এরপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তাদের জীবনে মেনে চলতে নির্দেশ দান করা হচ্ছে যা এখানে বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। যথা:-
(১) أَطِيعُوا اللَّهَ (তোমরা অনুগত্য করো আল্লাহ’র)-এখানে আল্লাহ’র নিঃশর্ত অনুগত্য করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
(২) أَطِيعُوا الرَّسُولَ (তোমরা অনুগত্য করো রাসুলের)-এখানে শেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ -এর নিঃশর্ত অনুগত্য করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
(৩) وَ أُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ (এবং তোমাদের মধ্যকার উলুল-আমর’-এর) -আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে মুসলমানদের জন্য উলুল-আমর-এর নির্দেশ মান্য করে চলাকে ওয়াজিব (অতিব আবশ্যক কর্তব্য) বনিয়ে দিয়েছেন। তবে সাথে সাথে এই শর্ত এঁটে দিয়েছেন যে:-
 
(ক)উলুল-আমর’ হবেন مِنكُمْ (তোমাদের মধ্য থেকে) অর্থাৎ তোমাদের মুসলমানদের মধ্য থেকে ‘উলুল-আমর’ হতে হবে। কাজেই, কোনো অমুসলীম কাফের- মুরতাদ’কে মুসলমানদের উপর ‘উলুল-আমর’ বানানো শরীয়তে একে-তো নাজায়েয, তদুপরি কোনো গোষ্ঠি কোনো অমুসলীম কাফের বা মুরতাদ’ -কে ‘উলুল-আমর’ -এর আসনে সমাসীন করে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দিলেও সে মুসলমানদের ‘উলুল-আমর’ নয় এবং তাকে মানার কথাও উপরোক্ত আয়াতে বলা হয়নি।
 
(খ) উলুল-আমর-এর নির্দেশ মানা ততক্ষন পর্যন্ত ওয়াজিব, যাবৎ তিনি আল্লাহ’র কুরআন এবং তাঁর রাসুল -এর সুন্নাহ (আদর্শ) মাফিক নির্দেশ দিবেন। এর বিরোধী বা এর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন কোনো আদেশ-নির্দেশ, কোনো হুকুম মানা সম্পূর্ণ নাজায়েয। একথার প্রমাণ এই আয়াতেই রয়েছে। এখানে লক্ষ্য করুন, ‘উলুল-আমর’ -এর পূর্বে أَطِيعُوا (তোমরা অনুগত্য করো) কথাটি নেই। বরং আল্লাহ’র ক্ষেত্রে ও তাঁর রাসুলের ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ভাবে أَطِيعُوا اللَّهَ (তোমরা অনুগত্য করো আল্লাহ’র) এবং أَطِيعُوا الرَّسُولَ (তোমরা অনুগত্য করো রাসুলের) -বলার পর উলুল-আমর’ -এর বেলায় এসে أَطِيعُوا (তোমরা অনুগত্য করো) কথাটিকে সম্পূর্ণ উহ্য রেখে আল্লাহ’র অনুগত্য ও তাঁর রাসুলের অনুগত্যের সাথে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। এথেকে প্রমাণিত হয়, ‘উলুল-আমর’ -এর অনুগত্য নিঃশর্ত নয়, বরং তা আল্লাহ’র অনুগত্য ও তাঁর রাসুলের অনুগত্যের সাথে শর্তযুক্ত। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা অহী সূত্রে তাঁর শেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ -এর উপর যে ইসলামী শরীয়ত নাজিল করে দ্বীন-ইসলাম’কে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন, তার ভিতরে থেকে ‘উলুল-আমর’ কোনো নির্দেশ দিলে তা মানা প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর জন্য ওয়াজিব (অপরিহার্য কর্তব্য), আর ইসলামী শরীয়তের বিরোধী বা সাংঘর্ষিক কোনো নির্দেশ দিলে তা মানা প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর জন্য নাজায়েয। [ই’লামুল মুওয়াক্কিইন, ইবনুল কাইয়্যেম- ১/৫৬; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ১৩/১১২] একথার দলিল রয়েছে আয়াতটির পরবর্তী অংশে যেখানে আখেরাতে হিসাব-নিকাশের ধমকী দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলছেন- فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا –এতে তোমরা যদি কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পরো, তাহলে যদি আল্লাহ ও কেয়ামতের দিবসের প্রতি তোমাদের ইমান থেকে থাকে, তাহলে বিষয়টি আল্লাহ ও (তাঁর) রাসুলের (ফয়সালার) কাছে ছেড়ে দাও। এই (নির্দেশনাটি তোমাদের জন্য) কল্যানকর এবং (এটাই এবিষয়ক) সর্বোত্তম ব্যাখ্যা’।[সূরা নিসা ৫৯]
 
উপরোক্ত শানে নুজুল সম্পর্কিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ -এর উক্তি- إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي المَعْرُوفِ – ‘অনুগত্য শুধুমাত্র মা’রুফ (জায়েয) বিয়য়ে (করতে হয়)’ –থেকেও প্রমাণিত হয়, উলুল-আমর’ -এর অনগত্য নিঃশর্ত নয়, বরং তার অনুগত্য আল্লাহ’র দেয়া ইসলামী শরীয়তের অধীন। আর ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা (রাষ্ট্রপ্রধান) হলেন মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আমীর (আমীরে আ’জম), সবচেয়ে বড় ওলী (অভিভাবক), সবচেয়ে বড় উলুল-আমর। সুতরাং সে যদি কোনো মুমিন নারী বা মুমিন পুরুষ’কে আল্লাহ’র নাফরমানীমূলক কোনো নাজায়েয হুকুম, আইন-কানুন বা আদেশ-নির্দেশ মানতে বলে, তাহলে তা মান্য করা সম্পূর্ণ নাজায়েয
 
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- السمع والطاعة على المرء المسلم فيما أحب وكره، ما لم يؤمر بمعصية، فإذا أُمِر بمعصية فلا سمع ولا طاعة . رواه البخاري في الصحيح, كتاب الأحكام، باب السمع والطاعة للإمام ما لم تكن معصية: ٨/١٣٤ رقم ٧١٤٤ ، و مسلم في الصحيح, كتاب الإمارة، باب وجوب طاعة الأمراء في غير معصية، وتحريمها في المعصية: ٣/١٤٦٩ رقم ١٨٣٩ – ‘(আমীরের) মধ্যে কিছু পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক – প্রত্যেক মুসলমানের জন্য (তার নির্দেশ) শোনা ও (তার) অনুগত্য করা (ওয়াজিব) -যদি না সে (আল্লাহ’র কোনো) নাফরমানী করার নির্দেশ দেয়। সুতরাং, সে যদি (আল্লাহ’র কোনো) নাফরমানী করার নির্দেশ দেয়, তাহলে (আমীরের সেই কথা) শোনা ও মানা জায়েয নয়’। [সহিহ বুখারী- ৮/১৩৪ হাদিস ৭১৪৪; সহিহ মুসলীম- ৩/১৪৬৯ হাদিস ১৮৩৯]
 
উলুল আমর-এর নাফরমানীমূলক কোনো নাজায়েয হুকুম, আইন-কানুন বা আদেশ-নির্দেশের সহযোগীতা করাও নাজায়েযযেমন: আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন-
 
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
‘আর তোমরা নেককাজ ও পরহেজগারীর ব্যাপারে পরষ্পরকে সাহায্য-সহযোগীতা করো। কিন্তু তোমরা গোনাহ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে পরষ্পরকে সাহায্য-সহযোগীতা করো না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর’ [সূরা মায়েদাহ ২]
 
যাবির বিন আব্দুল্লাহ রা. থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- أعاذك الله من إمارة السفهاء. قال: وما إمارة السفهاء؟ قال: “أمراء يكونون بعدي لا يهتدون بهديي ولا يستنون بسنتي، فمن صدقهم بكذبهم وأعانهم على ظلمهم؛ فأولئك ليسوا مني ولست منهم، ولا يردون علي حوضي، ومن لم يصدقهم بكذبهم ولم يعنهم على ظلمهم؛ فأولئك مني وأنا منهم، وسيردون علي حوضي . رواه: الإمام أحمد: ١١/٤٤٩رقم ١٤٣٧٨ إسناده صحيح, تحقيق: حمزة أحمد الزين ، والبزار: ٢/٢٤١ رقم ١٦٠٩, و قال الهيثمي في مجمع الزوائد: ٥/٢٤٧ رجالهما رجال الصحيح; عبد الرزاق في مصنفه: ١١/٣٤٥; ابن حبان في صحيحه: ٥/٩ رقم ١٧٢٣ و قال الأرنؤوط: صحيح على شرط مسلم ; الحاكم في المستدرك: ٣/٣٧٩ و صححه و وافقه الذهبي; وصححه أحمد شاكر في تعليقه على سنن الترمذي: ٢/٥١٤ – ‘(হে কা’ব!) তুমি নির্বোধ আমীর (শাসক) থেকে আল্লাহ’র আশ্রয় চেও। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: নির্বোধ আমীর কে? রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: (ওরা হল) এমন সব আমীর যারা আমার পরে আসবে। তারা না আমার দেখানো পথে চলবে, আর না আমার আদর্শ মাফিক রীতি-নীতি চালু করবে। কাজেই যে ব্যাক্তি তাদের মিথ্যাকে সত্ত্বায়ন করবে এবং তাদের জুলুম-অন্যায়-অবিচার -এর সহায়তা করবে, ওরা আমার (কেউ) নয়, আমিও তাদের (কেউ) নই এবং তারা (কেয়ামতের দিন আমার) হাউজ (-ই-কাউসার)-এর নিকটে আসতে পারবে না। আর যে ব্যাক্তি তাদের মিথ্যাকে সত্ত্বায়ন করবে না এবং তাদের জুলুম-অন্যায়-অবিচার -এর সহায়তা করবে না, ওরা আমার , আমিও তার এবং (কেয়ামতের দিন) তারা আমার হাউজ (-ই-কাউসার)-এর নিকটে সহজে আসতে পারবে’ [মুসনাদে আহমদ, ৩/৩২১ ; সহিহ ইবনে হিব্বান– ৫/৯ হাদিস ১৭২৩; মুসনাদে বাযযার- ২/২৪১ হাদিস ১৬০৯; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক- ১১/৩৪৫; মুসতাদরাকে হাকিম- ৩/৩৭৯; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৫/২৪৭]
 
কুরআন-সুন্নাহ’য় বর্ণিত উপরোক্ত এইসকল শর্ত সাপেক্ষেই ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা/আমীর/ইমাম/ সুলতান/শাসক -এর অনুগত্য করাকে সকল মুসলমানদের উপরে ওয়াজিব বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এবং এব্যাপারে পূর্বাপর সকল মুজতাহিদীন, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন ও মুহাক্কেক ফুকাহায়ে কেরামের এব্যাপারে ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে।
 
যখন জানা গেল যে, খলিফা’র সকল জায়েয নির্দেশ মেনে চলা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য), তথন একথাও ভাল করে জানা দরকার যে, ‘খলিফা’ তার অধিনস্ত জনগণের উপর দু’ধরনের জায়েয নির্দেশ দান/কার্যকর করার শরয়ী অধিকার রাখেন।
 
(১) সরাসুরি করআন সুন্নাহ’ মাফিক নির্দেশ।
(২) সরাসুরি করআন সুন্নাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক নয় -এমন মুবাহ (অনুমদিত) নির্দেশ।
 
খলিফা’র উপরোক্ত উভয় প্রকার সরকারী জায়েয নির্দেশ মানা মুসলীম নাগরীদের জন্য ওয়াজিব -চাই পছন্দ হোক বা না হোক। আবু হুরায়রাহ রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ، وَمَنْ يَعْصِنِي فَقَدْ عَصَى اللهَ، وَمَنْ يُطِعِ الْأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي، وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي . صحيح مسلم, كتاب الإمارة , باب وجوب طاعة الأمراء في غير معصية وتحريمها في المعصية: رقم ١٨٣٥; سنن النسائي, كتاب البيعة, الترغيب في طاعة الإمام: رقم ٤١٩٣ و كتاب الاستعاذة, الاستعاذة من فتنة المحيا: رقم٥٥١٠; سنن ابن ماجه, كتاب الجهاد, باب طاعة الإمام: رقم ٢٨٥٩; مسند أحمد: ٢/٢٥٣ رقم ٧٣٨٦ , ٢/٢٧٠ رقم ٧٦٠٠; مسند أبي عوانة, كتاب الأمراء: ٤/٤٠١ رقم ٧٠٩٠-٧٠٩٦; شعب الأيمان للبيهقى: ٩/٤٠٩ رقم ٦٩٦٤ – ‘যে আমার অনুগত্য করলো, সে মূলত: (আমাকে মানা সম্পর্কিত আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে প্রকারন্তে) আল্লাহ’র অনুগত্য করলো। আর যে আমার অবাধ্য হল, সে মূলত: (আমাকে মানা সম্পর্কিত আল্লাহ তাআলার নির্দেশের অবাধ্য হওয়ার মাধ্যমে প্রকারন্তে) আল্লাহ’র অবাধ্য হল। আর যে আমীর -এর অনুগত্য করলো, সে মূলত: (আমীর’কে মানা সম্পর্কিত আমার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে প্রকারন্তে) আমার অনুগত্য করলো। আর যে আমীরের অবাধ্য হল, সে মূলত: (আমীর’কে মানা সম্পর্কিত আমার নির্দেশের অবাধ্য হওয়ার মাধ্যমে প্রকারন্তে) আমার অবাধ্য হল’। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৩৫; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪১৯৩, ৫৫১০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৫৯; মুসনাদে আহমদ- ২/২৫৩ হাদিস ৭৩৮৬, ২/২৮০ হাদিস ৭৬০০; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ- ৪/৪০১ হাদিস ৭০৯০-৭০৯৬; শুআবুল ইমান, বাইহাকী- ৯/৪০৯, হাদিস ৬৯৬৪]
 

খলিফা/আমীর/ইমাম/সুলতান’ -এর নাজয়েয কাজে বাঁধা দান, বিরোধিতা করা ও অনুগত্য ছিন্ন করে বিদ্রোহ করা

এখন প্রশ্ন ওঠে, ‘খলিফা’র যে কোনো নাজায়েয আদেশ নিষেধ মানা বা তাতে সহযেোগীতা করা-তো নাজায়েয ও গোনাহ’র কাজ বুঝলাম, কিন্তু শুধু তা না মানা বা তাতে সহযোগীতা না করাটাই কি শরীয়তের দৃষ্টিতে যথেষ্ট, নাকি খলিফা’র নাজায়েয বিষয়গুলোর সংশোধন করায় তৎপর থাকা, বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধিতা/বিদ্রোহ করাও শরয়ী দায় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? যদি পড়ে, তাহলে তার সীমা পরিসীমাই-বা কী? এর উত্তর পেতে হলেও আমাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহ’র দিকে ধাবিত হতে হবে। এটা এমন এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ জরুরী ইলম, যে ব্যাপারে অজ্ঞ হয়ে থাকার পরিণতি যে কত ভয়াবহ, তা হয়তো কিছুটা নিচের আলোচনায় অনুধাবন করতে পারবেন।
 
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন-
 
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
‘মুমিন পুরুষরা এবং মুমিন নারীরা একে অপরের (দ্বীনী) বন্ধু (ও সহযোগী)। তারা মা’রুফ (সৎ বিষয়ে)-এর নির্দেশ দেয় এবং মুনকার (হারাম ও নাজায়েয বিষয়) থেকে নিষেধ করে। তারা নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে এবং অনুগত্য করে আল্লাহ’র ও তাঁর রাসুলের। এরাই সেইসকল ব্যাক্তি যাদেরকে আল্লাহ অচিরেই রহম করবেন। নিশ্চই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাময়’। [সূরা তাওবা ৭১]
 
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- وَ الَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ المُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ . رواه الترمذي، كتاب الفتن، باب ما جاء في الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر، برقم ٢١٦٩ ، و حسنه الألباني في صحيح سنن الترمذي:٢/٢٢٣، و في صحيح الجامع: ٦/٩٩ – ‘ওই সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, তোমরা অবশ্য অবশ্যই (লোকজনকে) মা’রুফের নির্দেশ দিবে এবং মুনকার (নাজায়েয/হারাম) থেকে নিষেধ করবে/ফিরিয়ে রাখবে। অন্যথায় নিশ্চই আল্লাহ অচিরেই তোমাদের উপরে তাঁর (দৃষ্টান্তমূলক) শাস্তি পাঠিয়ে দিবেন, যারপর তোমরা দোয়া করলেও তিনি তোমাদের দোয়া কবুল করবেন না’। [সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২১৬৯]
 
যারির রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেনمَا مِنْ رَجُلٍ يَكُونُ فِي قَوْمٍ يُعْمَلُ فِيهِمْ بِالْمَعَاصِي، يَقْدِرُونَ عَلَى أَنْ يُغَيِّرُوا عَلَيْهِ، فَلَا يُغَيِّرُوا، إِلَّا أَصَابَهُمُ اللَّهُ بِعَذَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَمُوتُوا . رواه ابو داود, كتاب الملاحم, باب الأمر والنهي: رقم ٤٣٣٩ ; و الجصاص في أحكام القرآن, باب الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر: ٤٤٧; ابن حبان الصحيح: ٣٠٢; الحاكم: ١٩٢٣٦; ابن ماجة: ٤٠٠٩; و حسنه الألباني في صحيح سنن أبي داود و في الصحيحة: ٣٣٥٣، صحيح الترغيب والترهيب: ٢٣١٦ – ‘যে কোনো ব্যাক্তি হোক, সে যদি এমন কোনো গোষ্ঠির মধ্যে অবস্থান করে তাদের মাঝে (আল্লাহ’র) নাফরমানীমূলক কাজ করতে থাকে, যাদের এ ক্ষমতা রয়েছে যে তারা তার উপর (ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে তাকে) পরিবর্তন করতে সক্ষম, কিন্তু (তা সত্ত্বেও) তারা (তাকে নাফরমানী থেকে ফিরিয়ে অবস্থার) পরিবর্তন করে না, তারা অবশ্যই তাদের মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ আযাবে গ্রেফতার হবে’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৩৯; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৩০২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০০৯; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস ১৯২৩৬; আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ৫/১৫৫]
 
আবু বকর সিদ্দিক রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إن رأى الناس الظالم فلم يأخذوا على يديه أوشك أن يعمهم الله بعقاب منه . رواه الترمذي , كتاب الفتن: ٢١٦٨ ; و أبو داود , كتاب الملاحم : ٤٣٣٨ ; ; و أحمد: رقم ٣٠, ٣١ ; و صححه الألباني في صحيح الترمذي – ‘নিশ্চই মানুষ কোনো জালেমকে (জুলুম করতে) দেখেও যদি তারা তার হাত না ধরে, (তাহলে) আল্লাহ অচিরেই তাদেরকে তাঁর শাস্তি দিয়ে ব্যাপক আকারে গ্রেফতার করবেন ’। [সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২১৬৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৩৮; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৩০, ৩১]
 
এজাতীয় বহু আয়াতে কারিমা ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আমরে বিল মা’রুফ (মা’রুফ/সৎ বিষয়ে নির্দেশ দান) ও নাহি আনিল মুনকার (নাজায়েয বিষয় থেকে নিষেধ করন) মুসলমান নারী পুরুষ উভয়ের উপরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য দায়িত্ব। খলিফা/ইমাম/সুলতান/আমীর -এর ভুল-ত্রুটি ও নাজায়েয পদক্ষেপ সংশোধনের প্রশ্নেও এ দায়িত্ব প্রযোজ্য এবং এব্যাপারে মুসলমান নারী পুরুষ উভয়ের উপরে গুরু-দায়িত্ব রয়েছে।
 
যেমন: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- مَا مِنْ نَبِىٍّ بَعَثَهُ اللَّهُ فِى أُمَّةٍ قَبْلِى إِلاَّ كَانَ لَهُ مِنْ أُمَّتِهِ حَوَارِيُّونَ وَأَصْحَابٌ يَأْخُذُونَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُونَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوفٌ يَقُولُونَ مَا لاَ يَفْعَلُونَ وَيَفْعَلُونَ مَا لاَ يُؤْمَرُونَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الإِيمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ . رواه مسلم, كتاب الإيمان , باب بيان أن النهي عن المنكر من الإيمان وأن الإيمان يزيد وينقص: رقم ٥٠; وأحمد في المسند: ١/٤٦١ ; و الطبراني في المعجم الكبير: ١٠/١٣; أبو عوانة في مسنده: ١/٤٣ رقم ٩٨ ; و ابن حبان في صحيحه: ١/٤٠٣; و البزار في مسنده: ٥/٢٨١ ; و الإيمان لابن منده: ١/٣٤٦ ; و البيهقي في السنن الكبرى: ١٠/٩٠ ; الحاكم: ٤٣٧٩ – ‘আল্লাহ আমার পূর্বে এমন কোনো নবীকে উম্মাহ’র মাঝে পাঠান নাই, যাঁর জন্য তাঁর উম্মতের মধ্য থেকে হাওয়ারীগণ এবং সাহাবীগণ ছিল অথচ তারা তাঁর সুন্নাহ’কে আঁকড়িয়ে ধরেনি এবং তাঁর নির্দেশের অনুসরন করে চলেনি। তারপর তাঁদের পরে এমনসব লোকরা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে, যারা (কুরআন সুন্নাহ থেকে) যা বলতো (বাস্তব ক্ষেত্রে) তা করতো না এবং যা (করতে) নির্দেশিত ছিল না তারা তাই করতো। (ফলে দ্বীন ও শরীয়ত স্ব-স্থানে বহাল না থেকে তাদের দ্বারা তাতে খলত্-মলত সৃষ্টি হয়ে যেতো। তোমরা আজ আমার উপর নাজিল কৃত শরীয়ত কায়েম ও হিফাজত করছো। কিন্তু তোমাদের পরে এই উম্মতের মাঝে এমনসব গোষ্ঠি আসবে, যারা আমার রেখে যাওয়া দ্বীন ও শরীয়তের মাঝে খলত-মলত সৃষ্টি করবে)। সুতরাং, যে ব্যাক্তি তাদের সাথে হাত দিয়ে জিহাদ করবে সে মুমিন, যে তাদের সাথে মুখ দিয়ে জিহাদ করবে সে মুমিন এবং যে তাদের সাথে অন্তর দিয়ে জিহাদ করবে সে মুমিন। আর (এর পর) সরিষার দানা পরিমানও ইমান নেই’।[সহিহ মুসলীম, হাদিস ৫০; মুসনাদে আবু আউআনাহ – ১/৪৩ হাদিস ৯৮; সহিহ ইবনে হিব্বান- ১/৪০৩; মুসনাদে আহমদ- ১/৪৬১; মুসনাদে বাযযার- ৫/২৮১; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ১০/৯০; কিতাবুল ইমান, ইমাম ইবনু মুনদুহ- ১/৩৪৬; মুজামুল কাবীর, তাবরাণী- ১০/১৩; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস ৪৩৭৯]
 
আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرا فَلْيُغَيّرْهُ بِيَدِهِ. فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ. فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ. وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ‏ .‏ ‏‏رواه مسلم, رقم ٤٩ ; و ابن منده في كتاب الإيمان: ١/٣٤١ رقم ١٧٩; ابن حبان الصحيح: ٣٠٦, ٣٠٧; و عبد الرزاق في مصنفه: ٥٦٤٩; عبد بن حميد في مسنده: ٩٠٦ ; أبو داود الطياليسي في مسنده : ٢٣١٠; أبو يعلى في مسنده: ١٢٠٣; البيهقي في السنن الكبرى: ٧/٢٦٥; و احمد في مسنده: ١٠٧٦٦; الترمذي: ٢١٧٢; ابن ماجه: ١٢٧٥; أبو داود: ٤٣٤٠ – ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি কোনো মুনকার (তথা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয কিছু ঘটতে) দেখে, সে তার হাত দিয়ে তা (জায়েয অবস্থায়) পাল্টিয়ে/পরিবর্তন করে দিবে। তাতেও যদি তার সামর্থ না থাকে, তাহলে (কমপক্ষে তার) মুখ দিয়ে (তা জায়েয অবস্থায় পাল্টিয়ে/পরিবর্তন করে দিবে)। এতেও যদি তার সামর্থ না থাকে, তাহলে (কমপক্ষে তার) অন্তর দিয়ে (হলেও সেই নাজায়েয বিষয়টিকে ঘৃনা করবে এবং এই আকাঙ্খা করবে যে সেটা যেন জায়েয অবস্থায় ফিরে আসে), আর সেটা হল সবচাইতে দুর্বল ইমান’।[সহিহ মুসলীম, হাদিস ৪৯; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৩০৬, ৩০৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১২৭৫; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২১৭২; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৪০; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১০৭৬৬; মুসনাদে আবু ইয়া’লা, হাদিস ১২০৩; মুসনাদে তায়ালিসী, হাদিস ২৩১০; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৭/২৬৫; কিতাবুল ইমান, ইমাম ইবনু ইসহাক- ১/৩৪১ হাদিস ১৭৯]
 
এই হাদিস দুটি একথার দলিল যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে যা ‘নাজায়েয’/‘হারাম’, তা কাউকে করতে দেখলে সাধ্য মতো তাকে সেই নাজায়েয/হারাম কাজ থেকে ফিয়ে রাখা ইমানী দায়িত্ব শুধু নয়, ইমানের দাবী। সর্বোচ্চ ইমানওয়ালা হল ওই মুসলমান, যার হাত/ক্ষমতা দিয়ে কোনো নাজায়েয/হারাম বিষয়কে পরিবর্তন করে হালাল/জায়েয অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সামর্থ রয়েছে এবং সে সেই দায়িত্ব পালন করে। আর সর্বনিম্ন স্তরের ইমান ওই মুসলমানের অন্তরে রয়েছে, যে কোনো নাজায়েয/হারাম কিছু হতে দেখে মনের মধ্যে ওই নাজায়েয/হারাম জিনিসটির ব্যাপারে ঘৃনা অনুভব করে এবং তার মন বলে ওঠে যে, এই নাজায়েয/হারাম কাজটি পরিবর্তন করে হালাল/জায়েয অবস্থায় আসা উচিৎ, কিন্তু আফসোস, অবস্থা পরিবর্তন করার মতো ক্ষমতা আমার নেই, নইলে করতাম। [শারহুল মুসলীম, ইমাম নববী- ২/২৩; ফায়জুল কাদীর- ৬/১৬৯; হাশিয়ায়ে সিন্ধি (সুনানে নাসায়ী)- ৭/৪৮৬; মিরকাত, ক্বারী- ৯/৩২৪; আজিজী- ৩/৩৩৪; ই’লাউস সুনান, জফর আহমদ উসমানী- ১২/৮, কিতাবুস সির]
 
তবে এখানে إِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ– ‘যদি তার সামর্থ না থাকে’ -এর অর্থ বোঝা অতীব জরুরী। এই হাদিসে ‘সামর্থ থাকা’ বলতে আভিধানিক/পারিভাষিক ‘সামর্থ থাকা’ উদ্দেশ্য নয়, বরং উদ্দেশ্য হল الإستطاعة الشرعية (শরীয়তের দৃষ্টিতে সমর্থ) হওয়া’। যেমন: মনে করুন, এক ব্যাক্তি’র অসুস্থ্য অবস্থায় জানাবতের গোসল ফরয হয়েছে এবং তার কাছে গোসল করার মতো পানিও মওজুদ রয়েছে, এমনকি নিজেই গোসলের পানি গায়ে ঢেলে গোসল করতে সমর্থ।কিন্তু সে এত অসুস্থ্য যে, পানি দিয়ে গোসল করলে তার রোগ আরো বেড়ে গিয়ে পরে জীবন নাশও ঘটতে পারে বা মুমূর্ষও হয়ে যেতে। এক্ষেত্রে, আভিধানিক/পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে সে পানি ব্যবহার করতে সমর্থ বটে, কিন্তু ‘শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে সে পানি ব্যবহারে সমর্থ নয়’। এজন্যই পানি দিয়ে গোসল না করে তায়াম্মুম করা তার জন্য জায়েয শুধু নয় বরং ওয়াজিব। উপরের হাদিসটিতেও দেখুন, বলা হয়েছে فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ. فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ তাতেও যদি তার সামর্থ না থাকে, তাহলে (কমপক্ষে তার) মুখ দিয়ে (তা জায়েয অবস্থায় পাল্টিয়ে/পরিবর্তন করে দিবে)। এতেও যদি তার সামর্থ না থাকে, তাহলে (কমপক্ষে তার) অন্তর দিয়ে (হলেও….’। এখানে ‘মুখ দিয়ে বলার সামর্থ থাকা’ বলতে আভিধানিক/পারিভাষিক ‘সামর্থ থাকা’ উদ্দেশ্য নয়, কারণ কথা বলার শারীরীক সামর্থ (বোবা বাদে) সকলেরই আছে এবং সে যে কোনো সময় যে কাউকে কিছু একটা বলে দিলেই তো তার বলার সামর্থ থাকা প্রমাণিত হয়ে যাবে। কাজেই বোঝা গেল, এই হাদিসে ‘মুখে বলার সামর্থ থাকা’র অর্থ হল الإستطاعة الشرعية (শরীয়তের দৃষ্টিতে সমর্থ) হওয়া’। [ই’লাউস সুনান, জফর আহমদ উসমানী- ১২/৮, কিতাবুস সির]
 
অর্থাৎ, শরীয়ত যে যে সময়ে যেখানে যেখানে যার যার বিরুদ্ধে হাত বা মুখ ব্যবহারের দাবী জানায়, সেই সেই সময়ে সেখানে সেখানে তার তার বিরুদ্ধে আপনি আপনার হাত বা মুখ ব্যবহারের সামর্থ রাখেন কিনা -সেটাই এখানে বিবেচ্য বিষয়। এ থেকে পরিষ্কার হল যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে স্থান কাল পাত্র বিবেচনায় রেখে-
 
(ক) কোনো মুসলমান তার হাত/ক্ষমতা দিয়ে কোনো মুনকার (নাজায়েয বিষয়)’কে পরিবর্তন করার শরয়ী সামর্থ রাখলে এবং তার হাত/ক্ষমতা দিয়ে তা পরিবর্তনে তৎপর থাকলে সে প্রথম শ্রেণির মুমিন।
(খ) কোনো মুসলমান তার হাত/ক্ষমতা দিয়ে কোনো মুনকার (নাজায়েয বিষয়)’কে পরিবর্তন করার শরয়ী সামর্থ রাখা সত্ত্বেও যদি সে তার হাত/ক্ষমতা দিয়ে তা পরিবর্তনে তৎপরতা না চালায়, বরং শুধু মুখ ব্যবহার করে তা পরিবর্তন করায় ভুমিকা রাখে, তাহলে সে দ্বিতীয় শ্রেণির মুমিন।
(গ) কোনো মুসলমান তার হাত বা মুখ দিয়ে কোনো মুনকার (নাজায়েয বিষয়)’কে পরিবর্তন করার শরয়ী সামর্থ রাখা সত্ত্বেও সে যদি তার হাত বা মুখ কোনোটাই না খাটায়, বরং মনের মধ্যে ওই নাজায়েয/হারাম জিনিসটির ব্যাপারে কমপক্ষে ঘৃনা অনুভব করে এবং তার মন বলে ওঠে যে, ‘এই নাজায়েয/হারাম কাজটি পরিবর্তন করে হালাল/জায়েয অবস্থায় আসা উচিৎ, কিন্তু আফসোস, অবস্থা পরিবর্তন করার মতো ক্ষমতা আমার নেই, নইলে করতাম’, তাহলে সে সর্ব নিম্ন স্তরের মুমিন। এতটুকু ঘৃনাও যদি মনে অনুভূত না হয়, তাহলে- لَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الإِيمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ – ‘(এর পর তার অন্তুরে মূলতঃ) সরিষার দানা পরিমানও ইমান নেই’ । আল্লাহ তাআলা তৌফিক দিলে ইনশা-আল্লাহ সামনে আমরা আলোচনা করবো ‘কেনো এর পর কোনো ইমান নেই, বরং এর পর শুরু হবে কুফর দিয়ে’।

আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন- لا يمنعن احدكم مخافة الناس ان يتكلم بحق اذا رأه او عرفه . رواه ابن حبان في صحيحه (بترتيب ابن بلبان): ١/٥١٢ رقم ٢٧٨, و قال شعيب الارنؤوط: اسناده صحيح على شرط مسلم ; رواه أحمد في المسند : ١١٤٩٤ بإسناد صحيح ; أبو يعلى: ١/٥١٠ رقم ١٢٠٧; البيهقي في السنن الكبرى: ١٠/٩٠ – ‘মানুষের (বিরোধিতার) ভয় যেন তোমাদের কাউকে হক্ব কথা বলতে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় -যখন তা (তথা মুনকার কিছু) দেখতে বা চিনতে পাবে’। [সহিহ ইবনে হিব্বান– ১/৫১২ হাদিস ২৭৮; মুসনাদে আবু ইয়া’লা– ১/৫১০ হাদিস ১২০৭; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১১৪৯৪; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ১০/৯০]

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেন- لَا يَحْقِرْ أَحَدُكُمْ نَفْسَهُ ” , قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ , كَيْفَ يَحْقِرُ أَحَدُنَا نَفْسَهُ ؟ قَالَ : ” يَرَى أَمْرًا لِلَّهِ عَلَيْهِ فِيهِ مَقَالٌ , ثُمَّ لَا يَقُولُ فِيهِ , فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : مَا مَنَعَكَ أَنْ تَقُولَ فِي كَذَا كذا وَكَذَا , فَيَقُولُ : خَشْيَةُ النَّاسِ , فَيَقُولُ : فَإِيَّايَ كُنْتَ أَحَقَّ أَنْ تَخْشَى . رواه ابن ماجه : رقم: ٤٠٠٨ ; قال المنذري في الترغيب والترهيب: ٣/٢٣١ : رواه ابن ماجه و رواته ثقات ; و قال البوصيري في الزوائد: ٣/٢٤٢ : هذا إسناد صحيح ; و قال أحمد محمد شاكر في ‘كلمة حق’: رواه ابن ماجه: ٢/٢٥٢ بإسناد صحيح – ‘তোমাদের কেউ যেন নিজকে হাক্বির (অক্ষম) করে না রাখে’। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ ! আমরা কিভাবে আমাদের নিজকে হাক্বির (অক্ষম) করে রাখি’? তিনি বললেন: ‘সে এমন (মুনকার) বিষয় দেখে, যে ব্যাপারে তার উপরে আল্লাহ’র জন্য কথা বলার দায়িত্ব রয়েছে, (অথচ) তারপরও সে ওই ব্যাপারে কথা বলে না। কেয়ামতের দিন আল্লাহ আযযা ওয়া যাল্লা তাকে বলবেন: ‘কি তোমাকে অমুক অমুক অমুক বিষয়ে কথা বলতে বাঁধা দিয়েছিল’? সে বলবে: ‘মানুষের ভয়’। তখন তিনি বলবেন: ‘বস্তুত আমিই অধিক হক্বদার ছিলাম যে তুমি (মানুষের চাইতে) আমাকে (অধিক) ভয় করবে’। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০০৮; মুসনাদে আহমদ– ১০/৯৯ হাদিস ১১১৯৩; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ১০/৯০; মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসী, হাদিস ২৩২০; মুসনাদে আব্দ বিন হুমায়েদ. হাদিস ৯৭১; আল-মু’জামুল আউসাত, তাবরাণী- ৫১৯৯]

উপরোক্ত এই হাদিস দুটি ওই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যখন ইসলামী শরীয়ত আপনার হাত/ক্ষমতা কিংবা মুখের আওয়াজ’কে যার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার দাবী জানায়, তখন তার বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করার শরয়ী সামর্থ থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার না করবেন, তখন। আর কখন কোন ব্যাক্তির কোন কাজের বিরুদ্ধে মুখ বা হাত ব্যবহার করতে হবে, তা বোঝার জন্য ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও সুগভীর ইলম অর্জন ও বাছিরাত ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। একথা আগের জামানাগুলির জন্য যেমন প্রযোগজ্য ছিল, তেমনি আমাদের এই শেষ জামানাতেও একই ভাবে প্রযোজ্য। বরং, আমাদের শেষ জামানা সম্পর্কে-তো বিশেষ ভাবে হাদিসে তাম্বিহ করা হয়েছে। যেমন হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إنه تصيب أمتي في آخر الزمان من سلطانهم شدائد لا ينجو منه إلا رجل عرف دين الله فجاهد عليه بلسانه ويده وقلبه فذلك الذي سبقت له السوابق، ورجل عرف دين الله فصدق به، ورجل عرف دين الله فسكت عليه، فإن رأى من يعمل الخير أحبه عليه وإن رأى من يعمل بباطل أبغضه عليه فذلك ينجو على إبطانه كله. رواه أبو نعيم في أخبار أصبهان: ١/٨١ ، والبيهقي في شعب الإيمان: ٦/٩٥ . قال ابن رجب في جامع العلوم والحكم: : غريب وإسناده منقطع: ٢/٢٤٤، وضعفه الألباني في سلسلة الأحاديث الضعيفة: ٦٧٢٥ – ‘শেষ জামানায় আমার উম্মত তাদের শাসক’দের পক্ষ থেকে কঠিন (ফিতনা ও) মুসিবতের সম্মুখীন হবে। সেই (মুসিবত) থেকে কেউ-ই বাঁচবে না, (বাঁচবে) শুধু (১) ওই ব্যাক্তি, যে আল্লাহ’র দ্বীন’কে (যথার্থ ভাবে) জেনে নিয়েছে, তারপর সেই (ইলমকে সহিহ ভাবে কাজে লাগিয়ে আগত ইসলাম বিরোধী ফিতনা ও মুসিবতের) সাথে জিহাদ করেছে জ্বিহবা দিয়ে, হাত দিয়ে এবং অন্তর দিয়ে। বস্তুত: সে এমন ব্যাক্তি যে (দ্বীনের তাকাযা ও দাবী অনুপাতে) অগ্রগামীতা দেখিয়ে (আল্লাহ’র কাছে) অগ্রগামীতার নজির স্থাপন করলো। (২) ওই ব্যাক্তি, যে আল্লাহ’র দ্বীন’কে (যথার্থ ভাবে) জেনে নিয়েছে, তারপর (হাত ও শক্তি দিয়ে মুসিবতের সাথে জিহাদ করেনি ইমানী দূর্বলতার কারণে, কিন্তু ইসলাম বিরোধী ফিতনা ও মুসিবতের বিপক্ষে জ্বিহবা দ্বারা) দ্বীনের সত্ত্বায়ন করেছে। (৩) ওই ব্যাক্তি, যে আল্লাহ’র দ্বীন’কে (যথার্থ ভাবে) জেনে নিয়েছে, কিন্তু (ইসলাম বিরোধী ফিতনা ও মুসিবত দেখেও তার বিপক্ষে হাত ও জ্বিহবা দ্বারা জিহাদ করেনি, বরং) চুপ থেকেছে, (তবে) সে কাউকে (আল্লাহ’র নির্দেশিত) ভাল আমল করতে দেখলে তাকে (দ্বীনের কারণেই) ভালবেসেছে, আর কাউকে (ইসলাম বিরোধী) বাতিল আমল করতে দেখলে তাকে (দ্বীনের কারণেই) ঘৃনা করেছে। এই (শেষোক্ত) ব্যাক্তি (দ্বীনের কারণে কাউকে তার ভালবাসা বা ঘৃনা করার) এসব (কথাকে) তার পেটে (গোপন করে) রাখা সত্ত্বেও (ফিতনা থেকে) বাঁচতে পারবে।’ [আখবার, আবু নুআইম- ১/৮১; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী- ৬/৯৫]

এখন বোঝার বিষয়, কোন অবস্থায় মুসলমানরা হাদিসে বর্ণিত مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرا فَلْيُغَيّرْهُ بِيَدِهِ – তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি কোনো মুনকার (তথা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয কিছু ঘটতে) দেখে, সে তার হাত দিয়ে তা (জায়েয অবস্থায়) পাল্টিয়ে/পরিবর্তন করে দিবে’-এই নির্দেশ পালনার্থে তাদের হাত/ক্ষমতা দিয়ে শাসকের কোনো মুনকার (নাজায়েয/হারাম) কর্মের পরিবর্তন সাধনে সাধ্যমতো চেষ্টা করবে?
 
খুব ভাল করে জেনে রাখুন, কোনো খলিফা/ইমাম/আমীরে-আ’জম/সুলতান/শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারন করে বিদ্রোহ করাকে খোদ শরীয়তই ততক্ষন পর্যন্ত জায়েয সাব্যস্থ করেনি, যাবৎ না শাসকের থেকে সুষ্পষ্ট কুফরী প্রকাশ পায়, যে ব্যাপারে পরিষ্কার শরয়ী বুরহান (দলিল) রয়েছে।
 
উবাদাহ বিন সামেত রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- دَعَانَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَايَعْنَاهُ ، فَقَالَ فِيمَا أَخَذَ عَلَيْنَا: «أَنْ بَايَعَنَا عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ، فِي مَنْشَطِنَا وَمَكْرَهِنَا، وَعُسْرِنَا وَيُسْرِنَا وَأَثَرَةً عَلَيْنَا، وَأَنْ لاَ نُنَازِعَ الأَمْرَ أَهْلَهُ، إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا، عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ . رواه البخاري, كتاب الفتن, باب قول النبي صلى الله عليه وسلم: سترون بعدي أمورا تنكرونها: رقم ٧٠٥٥; و مسلم: رقم ١٨٤٠; البزار في البحر الزخار: ٧/١٤٤ রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে (বায়াত হওয়ার জন্য) ডাক দিলেন, আমরা তখন তাঁর কাছে বায়াত হলাম’। তিনি (তথা উবাদাহ রা.) বলেন: তিনি সে সময় আমাদের থেকে যে ওয়াদা নিয়েছিলেন, তাতে আমারা বায়াত করছিলাম একথার উপর যে, (আমরা) আমাদের পছন্দসই অবস্থায়, আমাদের অপছন্তনীয় অবস্থায়, আমাদের দুঃখ-কষ্টের সময়ে, আমাদের সুখ-সাচ্ছন্দের সময়ে এবং (কাউকে) আমাদের উপরে অগ্রাধিকার দিলেও (আমরা) শুনবো ও মানবো। (এরও বায়াত করছিলাম) যে, আমরা শাসনব্যবস্থা নিয়ে (শরীয়ত শুদ্ধ) শাসকের সাথে দ্বন্দ্ব/সংঘর্ষে লিপ্ত হবো না, (বললেন:) -যাবৎ না তোমরা (শাসকের মধ্যে) সুস্পষ্ট কুফর দেখতে পাও, যে ব্যাপারে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে বুরহান (সুস্পষ্ট দলিল) রয়েছে’। [সহিহ বুখারী, হাদিস ৭০৫৫; সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৪০; মুসনাদে বাযযার- ৭/১৪৪]
 
সুতরাং বোঝা গেল, উপরোক্ত হাদিসে বর্ণিত مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرا فَلْيُغَيّرْهُ بِيَدِهِ – ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি কোনো মুনকার (তথা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয কিছু ঘটতে) দেখে, সে তার হাত দিয়ে তা (জায়েয অবস্থায়) পাল্টিয়ে/পরিবর্তন করে দিবে নির্দেশটি মুসলমানদের মানুষিক, শারীরীক, আর্থিক এমনকি রাজনৈতিক শক্তি সামর্থ পর্যাপ্ত থাকার পরও প্রযোজ্য নাও হতে পারে, যাবৎ না খোদ শরীয়তই উক্ত নির্দেশ পালনের অনুমতি দেয়। যেমন: রাসুলুল্লাহ ﷺ খলিফা/ইমাম/শাসকের বিরুদ্ধে হাত (শক্তি ও ক্ষমতা) প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছেন শুধুমাত্র إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا، عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ – ‘যাবৎ না তোমরা (শাসকের মধ্যে) সুস্পষ্ট কুফর দেখতে পাও, যে ব্যাপারে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে বুরহান (সুস্পষ্ট দলিল) রয়েছে’ -এর ক্ষেত্রে। সুতরাং, প্রমাণিত হল, হাদিসটিতে হাত (শক্তি ও ক্ষমতা) প্রয়োগ প্রসঙ্গে বলা فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ – ‘তাতেও যদি তার সামর্থ না থাকে’ -এর অর্থও মূলতঃ الإستطاعة الشرعية (শরীয়তের দৃষ্টিতে সমর্থ) না থাকা। অর্থাৎ, যদি শাসকের বিরুদ্ধে হাত (শক্তি ও ক্ষমতা) প্রয়োগের শরয়ী অনুমতি ও শরয়ী শক্তি-সামর্থ থাকে আর আপনি তা যথাযথ ভাবে প্রয়োগ না করে তা পরিবর্তনের জন্য শুধু মুখ বা অন্তর ব্যবহার করেন, তাহলে আপনি যথাক্রমে ২য়/৩য় স্তরের মুমিন। আর যদি শাসকের বিরুদ্ধে হাত (শক্তি ও ক্ষমতা) প্রয়োগের শরয়ী অনুমতি ও শরয়ী শক্তি-সামর্থ না থাকে, তাহলে খোদ শরীয়তের দৃষ্টিতেই আপনি শাসকের বিরুদ্ধে হাত (শক্তি ও ক্ষমতা) প্রয়োগে আদিষ্ট নন, বরং সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র মুখ ও/বা অন্তর দিয়ে শাসকের মুনকার (নাজায়েয/হারাম) কর্ম পরিবর্তনের চেষ্টা করতে আদিষ্ট -শরয়ী পন্থায়।
 
এজন্য মুনকার পরিবর্তনের আগে মুনকারের শরয়ী স্তর ও প্রয়োগ ক্ষেত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত ইলম হাসিল করা ওয়াজিব। অন্যথায়, মুর্খরা ফিতনা-ফ্যাসাদের দ্বার উন্মুক্ত করে মনে করতে থাকবে তারা দ্বীন ইসলামের খুব খিদমত করে বসেছে, যেমনটা খারেজীরা ভেবেছিল, অথচ ইবনু আবি আউফা রা. থেকে সহিহ হাদিসে এসেছে যে,, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- الْخَوَارِجُ كِلَابُ النَّارِ – ‘খারেজী’রা হল দোযখের কুকুর’। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৭৩; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ৩০০০; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১৯১৩০] এজন্য উপরে ওমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিসটির দিকে লক্ষ্য করুন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إنه تصيب أمتي في آخر الزمان من سلطانهم شدائد لا ينجو منه إلا رجل عرف دين الله فجاهد عليه بلسانه ويده وقلبه – ‘শেষ জামানায় আমার উম্মত তাদের শাসক’দের পক্ষ থেকে কঠিন (ফিতনা ও) মুসিবতের সম্মুখীন হবে। সেই (মুসিবত) থেকে কেউ-ই বাঁচবে না, (বাঁচবে) শুধু ওই ব্যাক্তি, যে আল্লাহ’র দ্বীন’কে (যথার্থ ভাবে) জেনে নিয়েছে, তারপর সেই (ইলমকে সহিহ ভাবে কাজে লাগিয়ে আগত ইসলাম বিরোধী ফিতনা ও মুসিবতের) সাথে জিহাদ করেছে জ্বিহবা দিয়ে, হাত দিয়ে এবং অন্তর দিয়ে।…….
 
এবারে শাসকের সুস্পষ্ট কুফরী সম্পর্কে কিছুটা ধারনা দেয়ার জন্য আমি নিম্নে কিছু উদাহরণ পেশ করছি, যাতে পাঠকের বোঝা সুবিধা হয় যে, কোনে কোনে ক্ষেত্রে শাসককে উৎখাত করার জন্য তার বিরুদ্ধে মুসলমানদের অস্ত্রধারন বৈধ হয়ে যায়। (আর এসবের বিস্তারিত ইলম অর্জনের জন্য ফিকহের কিতাবাদি দেখা যেতে পারে)।
 
সুস্পষ্ট কুফরের উদাহরণ:
 
(১) খলিফা যদি দ্বীন ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যায় -চাই এর পর সে অন্য কোনো ধর্ম (কাদিয়ানী ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, খৃষ্টান ধর্ম, ইহূদী ধর্ম ইত্যাদি) গ্রহন করুক বা না করুক কিংবা চাই নাস্তিক হয়ে যাক না কেনো। এটা খলিফার পরিষ্কার কুফর এবং এই কুফরের কারণে খলিফা’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অস্ত্রধারণ জায়েয হয়ে যায়।
 
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেনمن بدَّل دينه فاقتلوه . رواه البخاري في باب حكم المرتد والمرتدة واستتابتهم برقم ٦٩٢٢ ; و أحمد : ١٨٧١، و الترمذي في سننه: ١٤٥٨ ، و أبو داود في سننه: ٤٣٥١، و ابن ماجه في سننه: ٢٥٣٥، و النسائي في سننه: ٤٠٥٩ – ‘যে (মুসলমান) তার দ্বীনকে পরিবর্তন করে, তোমরা তাকে কতল করে ফেলো’[সহিহ বুখারী, হাদিস ৬৯২২; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১৮৭১; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ১৪৫৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৫১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৫৩৫; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪০৫৯]
 
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- وَلَنْ يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلا – ‘আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের উপর (অভিভাবকত্ব ও খবরদারী করার) কোনো পথই কাফেরদের জন্য খোলা রাখেননি’। [সূরা নিসাঃ ১৪৪] এর ব্যাখ্যা আমরা ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
 
‘খলিফা’ মুরতাদ হয়ে গেলে তাকে কতল করতে হবে। সে যদি ক্ষমতা ও শক্তি খাটিয়ে খিলাফতের পদে বহাল থাকার চেষ্টা করে, তাহলে মুসলীম উম্মাহ (শরয়ী শর্তাদি পূরণ করে) প্রয়োজনে স্বসস্ত্র জিহাদ করে হলেও তাকে ক্ষমতাচ্যুুত করবে এবং কতল করবে।
 
(২) খলিফা যদি কোনো সুস্পষ্ট কুফরী আক্বিদায় বিশ্বাসী হয় এবং তা তার কথা/কাজ/আচরণ দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায়। যেমন: কমিউনিজম, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (সেকুলারিজম), সমাজতন্ত্র (সোসালিজম) ইত্যাদি কুফরী আক্বীদায় বিশ্বাসী হওয়া এবং তা তার কথা/কাজ/আচরণ দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পাওয়া। যেমন: শাসক যদি ইসলামী শরীয়তের স্থলে উপরোক্ত ধরনের কোনো এক বা একাধিক কুফরী শাসনব্যবস্থাকে মুসলমানদের উপরে কার্যকর করা আইনতঃ বৈধ করে দেয় বা কার্যকর করে, তাহলে এটা তার পরিষ্কার কুফরী ও আল্লাদ্রোহিতার প্রমাণ বহন করার কারণে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অস্ত্রধারণ জায়েয হয়ে যাবে।
 
উম্মে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِنْ أُمِّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ مُجَدَّعٌ – حَسِبْتُهَا قَالَتْ – أَسْوَدُ، يَقُودُكُمْ بِكِتَابِ اللهِ تَعَالَى، فَاسْمَعُوا لَهُ وَأَطِيعُوا . رواه مسلم, كتاب الحج, باب استحباب رمي جمرة العقبة يوم النحر راكبا، وبيان قوله صلى الله عليه وسلم «لتأخذوا مناسككم: رقم ١٢٩٨; و احمد في المسند: ١٨/٤٨٩ رقم ٢٧١٤٣ اسناده صحيح; الخلال في السنة: رقم ٥٢ ‘যদি তোমাদের উপরে কোনো অঙ্গ কর্তিত গোলামকেও শাসক হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয় -(রাবী বলেন:) আমার মনে হয় তিনি (এও) বলেছেন যে, কালো (ও অঙ্গ কর্তিত গোলামকেও শাসক হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয়)- যে তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার কিতাব অনুযায়ী পরিচালনা করে, তাহলে তোমরা তার কথাও শুনবে এবং (তার জায়েয নির্দেশগুলোর ক্ষেত্রে) অনুগত্য করবে’[সহিহ মুসলীম, হাদিস ১২৯৮; মুসনাদে আহমদ– ১৮/৪৮৯ হাদিস ২৭১৪৩; আস-সুন্নাহ, ইমাম খাল্লাল, হাদিস ৫২]
 
(৩) কোনো মুসলীম শাসক যদি ইসলামী শরীয়ত দিয়ে শাসন করতে প্রকাশ্য বাঁধার সৃষ্টি করে বা বিরোধীতা করে কিংবা শরয়ী শাসনের পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে শরীয়তের সাথে এহেন আচরণ হবে তার পরিষ্কার কুফর ও আল্লাদ্রোহিতার প্রমাণ, যার কারণে সর্বসম্মত ভাবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অস্ত্রধারণ জায়েয হয়ে যাবে।
 
(৪) খলিফা যদি বিনা-ওযরে স্বেচ্ছায় ফরয নামায পড়া বাদ দেয় বা পড়তে অস্বীকার করে। এটা খলিফার পরিষ্কার কুফর এবং এই কুফরের কারণে খলিফা’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অস্ত্রধারণ জায়েয হয়ে যায়।
 
হযরত আওফ বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- خِيَارُ أَئِمَّتِكُمْ الَّذِينَ تُحِبُّونَهُمْ وَيُحِبُّونَكُمْ، وَيُصَلُّونَ عَلَيْكُمْ وَتُصَلُّونَ عَلَيْهِمْ، وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمْ الَّذِينَ تُبْغِضُونَهُمْ وَيُبْغِضُونَكُمْ، وَتَلْعَنُونَهُمْ وَيَلْعَنُونَكُمْ ” قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا نُنَابِذُهُمْ بِالسَّيْفِ ؟ فَقَالَ:” لَا مَا أَقَامُوا فِيكُمْ الصَّلَاةَ، وَإِذَا رَأَيْتُمْ مِنْ وُلَاتِكُمْ شَيْئًا تَكْرَهُونَهُ، فَاكْرَهُوا عَمَلَهُ، وَلَا تَنْزِعُوا يَدًا مِنْ طَاعَةٍ. رواه مسلم, كتاب الإمارة, باب خيار الأئمة وشرارهم: رقم ١٨٥٥ –‘তোমাদের ওই ইমাম (খলিফা/আমীর)গণই উত্তম, যাদেরকে তোমরা ভালবাসো এবং তারাও তোমাদেরকে ভালবাসে, তারা তোমাদের জন্য দোয়া করে এবং তোমরাও তাদের জন্য দোয়া করো। আর তোমাদের ওই ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান)গণই নিকৃষ্ট যাদেরকে তোমারা ঘৃনা করো এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃনা করে, তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দেও, তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দেয়। বলা হল: ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তরবারী নিয়ে বিদ্রোহ করবো না? তিনি বললেন: না, যাবৎ তারা তোমাদের মাঝে নামায আদায় করে। আর তোমরা যখন তোমাদের ওলীগণের (খলিফা/আমীর/শাসক’গণের মাঝে এমন) কিছু দেখতে পাও যা তোমরা অপছন্দ করো, তখন তোমরা তাদের ওই কাজটাকে অপছন্দ করো, কিন্তু (তাদের) অনুগত্য থেকে (তোমাদের) হাত’কে সরিয়ে নিও না’। [সহিহ মুসলীম – ৬/২৪ হাদিস ১৮৫৫]
 
হযরত উম্মে সালামাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- سَتَكُونُ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ عَرَفَ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ قَالُوا أَفَلَا نُقَاتِلُهُمْ قَالَ لَا مَا صَلَّوْا . رواه مسلم, كتاب الإمارة, باب وجوب الإنكار على الأمراء فيما يخالف الشرع وترك قتالهم ما صلوا ونحو ذلك: رقم ١٨٥٤; سنن الترمذي, أبواب الفتن / باب / حديث رقم ٢٢٦٥ و صححه الالبانى; سنن أبي داود, كتاب السنة / باب في قتل الخوارج / حديث رقم ٤٧٦٠‘শিঘ্রই (তোমাদের মুসলমানদের উপর কিছু) আমীর’রা হবে। (তাদের কাজ কারবার এমন হবে যে,) তোমরা তাদের (কিছু বিষয়ের) প্রশংসা করবে এবং (কিছু বিষয়’কে) অপছন্দ করবে। যে ব্যাক্তি (তাদের) মন্দ’কে চিনতে পেরে অপছন্দ করেছে সে নিরাপত্তা পেয়েছে। কিন্তু যে ব্যাক্তি (তাদের মন্দ’কে চিনতে পেরেও অপছন্দ করেনি, বরং মনে মনে রাজি) খুশি হয়েছে ও (সেই মন্দের) অনুগত্য করেছে (সে অপরাধী সাব্যস্থ হয়ে গেছে)। লোকেরা বললো: (এর পরেও) আমরা কি তাদের সাথে কিতাল (জিহাদ) করবো না? তিনি বললেন: না, (কিতাল/জিহাদ করবে না) -যাবৎ তারা নামায আদায় করে’। [সহিহ মুসলীম– ৬/২৪ হাদিস ১৮৫৪; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২২৬৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৬০]
 
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- عرى الإسلام و قواعد الدين ثلاثة ، عليهن أسس الإسلام ؛ من ترك واحدة منهن فهو بها كافر حلال الدم : شهادة أن لا إله إلا الله ، و الصلاة المكتوبة ، و صوم رمضان . رواه أبو يعلى: رقم ٢٣٤٩ , اسناده حسن كما في الفتح الرباني لترتيب مسند الإمام أحمد : ١/٢٣٧ – ইসলামের কড়া/হাতল এবং দ্বীনের কাওয়ায়িদ তিনটি, যার উপর ইসলামের মৌলিকতা স্থাপিত। যে (মুসলমান) এগুলোর মধ্যে থেকে কোনো একটিকেও পরিত্যাগ করবে, সে এমতাবস্থায় কাফের (বিবেচিত হবে), তার রক্ত (তথা তাকে হত্যা করা) হালাল। (ওই তিনটি বিষয় হল): এই সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, ফরয নামায (আদায় করা) এবং রমযানে রোযা পালন করা। ’। [মুসনাদে আবু ইয়া’লা, হাদিস ২৩৪৯; আত-তামহিদ, ইবনু আব্দীল বার- ১৬/২৬৯; ফাতহুর রাব্বানী- ১/২৩৭]
 
(৫) ‘খলিফা’ যদি কুরআন সুন্নাহ’র প্রমাণিত কোনো বিধান (যেমন কেসাস আইন, হদ্দ আইন ইত্যাদি) দিয়ে মুসলমানদের বিচার করতে- (ক) অস্বীকার করে, বা (খ) প্রকাশ্য বাঁধা দেয়, বা (গ) বন্ধ করে দেয়, বা (ঘ) অন্য কোনো পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের এমন কোনো বিধান যা আমাদের শরীয়তে মানসুখ (রহিত) হওয়া প্রমাণিত তা দিয়ে মুসলমানদের বিচার করার ব্যবস্থা চালু করে, বা (ঙ) ইসলামী শরীয়ত বিরোধী যে কোনো মানবরচিত আইন দিয়ে মুসলমানদের বিচার করার ব্যবস্থা চালু করে, (চ) কুরআন সুন্নাহ’র প্রমাণিত কোনো বিধানের চাইতে মানুষের তৈরী কোনো আইনকে উত্তম বলে বিশ্বাস করে তা দিয়ে বিচার ব্যবস্থা চালু করে, (ছ) কুরআন সুন্নাহ’র প্রমাণিত কোনো বিধানকে বে-ইনসাফীমূলক, প্রতারণাপূর্ণ, বৈষম্যতাপূর্ণ মনে করে ও তা কথা/আচরণ দ্বারা প্রকাশ করে, (জ) কোনো বিধানকে অবমাননা করে বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে…..ইত্যাদি…..ইত্যাদি। [এব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা দেখতে এখানে ক্লিক করুন]
 
খলিফা/আমীর/ইমাম/শাসকের এই জাতীয় বিভিন্ন পরিষ্কার কুফরের কারণে প্রয়োজনে অস্ত্রধারন করে হলেও তাকে ‘শাসকের আসন’ থেকে হটানোর বৈধতার দ্বার মুসলমানদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায় বটে, কিন্তু ততক্ষন পর্যন্ত এই উন্মুক্ত দরজা দিয়ে প্রবেশ করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব হবে না -যাবৎ না তারা আরো ৩টি শর্ত পূরণ করতে সমর্থ হয়। শর্ত ৩টি হল: (১) শরীয়ত সম্মত নতুন খলিফা/আমীর/ইমাম নিযুক্ত করা, (২) কুফরীকারী শাসককে পূর্ণ ক্ষমতাচ্যুত ও পূর্ণ বসিভূত করার মতো মুসলমানদের পর্যাপ্ত সম্ভাব্য শক্তি ও সামর্থ থাকা, এবং (৩) উৎখাত করতে গিয়ে উল্টো মুসলমানদের মাঝে অধিক ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি হওয়ার বাহ্যিক সমূহ সম্ভাবনা না থাকা। এসব শর্ত পূরণ হলে কুফরী শাসকের বিরুদ্ধে স্বসস্ত্র জিহাদে নেমে পড়া ওয়াজিব। অন্যথায়, হাদিসের فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ. فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ – …..তাতেও যদি তার সামর্থ না থাকে, তাহলে (কমপক্ষে তার) মুখ দিয়ে (তা জায়েয অবস্থায় পাল্টিয়ে/পরিবর্তন করে দিবে)। এতেও যদি তার সামর্থ না থাকে, তাহলে (কমপক্ষে তার) অন্তর দিয়ে (হলেও….’ -এর উপর আমলের বিষয়টি আসবে।
 
ইমাম হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (মৃ: ৮৫২ হি:) রহ. লিখেছেন- إنَّ الإمام “ينعزل بالكفر إجماعًا، فيَجِب على كلِّ مسلمٍ القيامُ في ذلك، فمَن قوي على ذلك فله الثَّواب، ومَن داهن فعليه الإثم، ومن عَجز وجبَتْ عليه الهجرةُ من تلك الأرض ‘ইমাম (খলিফা/আমীরে আ’জম/শাসক) তার আল-কুফর (কুফরে আকবর / বড় কুফর)-এর কারণে সর্বসম্মত ভাবে (খিলাফতের দায়িত্ব থেকে) বহিষ্কৃত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় সকল মুলমানের জন্য ওয়াজীব হল (তাকে সরিয়ে দিয়ে অন্য কোনো যোগ্য মুসলীমকে) ইমাম (খলিফা/আমীরে আ’জম/শাসক) বানানো। যে ব্যাক্তি একাজে শক্তি যোগাবে তার জন্য রয়েছে সওয়াব, আর যে একাজে অবহেলা করবে সে গোনহগার হবে। আর যে (এ দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ায়) অপারগ/অসমর্থবান, তার জন্য ওযাজেব হল সে (সম্ভব হলে) ওই জমিন থেকে হিজরত করে (অন্য মুনাসেব কোথাও) চলে যাওয়া। [ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ১৩/১২৩]
 
ইবনে হাজার রহ. যে এখানে বলেছেন যে, (‘দ্বারুল ইসলাম’-এ) কুফরীকারী শাসককে উৎখাত করতে অসমর্থ/অপারগ মুসলমান ওই শাসকের অধিনস্ততা থেকে বেড়িয়ে অন্য কোথাও হিজরত করে চলে যাবে, এর অর্থ হল- ‘অন্য কোনো তুলনামূলক অনুকুল ‘দ্বারুল ইসলাম’ (ইসলামী শাসনাধিন রাষ্ট্র)-এ হিজরত করা। অন্যথায়, কুফরীকারী শাসকের অধিনতা ছিন্ন করে কোনো ‘দ্বারুল-কুফর’ (কাফের শাসকের কুফরী শাসনাধিন দেশ)-এ হিজরত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কোনো দ্বারুল-কুফর-এ হিজরত করা তখনই জায়েয হতে পারে, যখন নিজের জায়গায় দ্বীন ও জান-মাল রক্ষার চাইতে কোনো দ্বারুল-কুফর-এ তা হিফাজত করা তুলনামূলক অনুকুল হয়। যেমন সাহাবায়ে কেরামদের অনেকে রাসুলুল্লাহ সা.-এর পরামর্শ ক্রমে মক্কার দ্বারুল-কুফর-এর অসহনীয় দূর্দশা অবস্থা থেকে রেহাই মেলার জন্য আরেকটি দ্বারুল-কুফর-এ আবেসিনিয়া’য় হিজরতের পরামর্শ দিয়েছিলেন। যা হোক, যদি অন্য কোনো তুলনামূলক অনুকুল ‘দ্বারুল ইসলাম’ (ইসলামী শাসনাধিন রাষ্ট্র)-এ হিজরত করা সম্ভব না হয় বা এতগুলো লোকের সকলে হিজরত করা যদি ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার সমূহ বাহ্য সম্ভাবনা থাকে, এদিকে ওই কুফরীকারী শাসককে হটানোও সম্ভব না হয়, তাহলে ওই শাসকের অধিনেই ‘দারুল আমান’-এ বসবাসকারী মুসলমানের ন্যায় বাহ্যতঃ হিকমতের সাথে বসবাস করবে এবং দ্বীনের উপর চলার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং একসময় উপরোক্ত ৩টি শর্ত পূরণ করা সম্ভব হলে আল্লাহ’র উপর ভরসা করে ওই কুফরীকারী শাসককের বিরুদ্ধে জিহাদ করে তার মূলতপাটন করবে।
 
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেল, যেসকল পরিষ্কার কুফরের ক্ষেত্রে খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অস্ত্রধারণ শরীয়তে জায়েয, সেসকল ক্ষেত্র ছাড়া বাদ বাকি ক্ষেত্রগুলোতে খলিফা/আমীর/ইমাম-এর অনুগত্যের আওতায় জামাআতবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের ঐক্য অটুট রাখা ওয়াজিব এবং এরকম কোনো অবস্থায় আমীর/ইমাম/খলিফা’র অনুগত্য থেকে বেড়িয়ে যাওয়া ও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করা সম্পূর্ণ নাজয়েযএদিকে ইংগিত করেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا حُجَّةَ لَهُ، وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ، مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً . صحيح مسلم, كتاب الإمارة , باب الأمر بلزوم الجماعة عند ظهور الفتن وتحذير الدعاة إلى الكفر: حديث رقم ١٨٥١ – ‘যে (মুসলমান তার খলিফা/আমীর/ইমামের) অনুগত্য থেকে (তার) হাত’কে সরিয়ে নিলো, সে কেয়ামতের দিন আল্লাহ’র সাথে এমতাবস্থায় সাক্ষাত করবে যে, তার (ওই অপরাধের স্বপক্ষে) কোনো হুজ্জত (প্রমাণ) থাকবে না। অার যে (মুসলমান এমন অবস্থায়) মাড়া যায় যে, তার গর্দানে (খলিফা/আমীর/ইমামরে) বায়াত নেই, সে জাহেলিয়াতের মড়া মড়ে’[সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৫১]
 
আবু যর গিফারী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ . رواه أبو داود ٤٧٥٨ ، وصححه الألباني في ” صحيح أبي داودযে (মুসলমান তার খলিফা/আমীর/ইমামের অধিনস্ত মুসলমানদের) জামাআত থেকে এক বিঘত পরিমাণও আলাদা হল, সে মূলত: তার গর্দান থেকেই ইসলামের রশিকে খুলে ফেলে দিল[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৫৮]
 
এখন প্রশ্ন হল, যেহেতু খলিফা/আমীর/ইমাম/শাসকের পরিষ্কার কুফরী প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে খোদ্ রাসুলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন, তাহলে যে খলিফা/আমীর/ইমাম/শাসক পরিষ্কার কুফরীর চাইতে নিম্ন স্তরের অন্যায় অবিচার ও জুলুম অত্যাচার করবে, তার সাথে কিরকম আচরণ করা অধিনস্ত মুসলমানদের শরয়ী দায়িত্ব? এর জবাবে প্রতিটি ইস্যুকে সামনে রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। কারণ বিভিন্ন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মুসলমানদের করনীয় সম্পর্কে ইজতিহাদের বিষয়টিও চলে আসে, যার জন্য শরয়ী ইলমে মাহের হওয়া ছাড়া যেমন গত্যন্তর নেই, তেমনি আন্তদেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে চোখ কান খোলা রাখা চৌকুশ না হলেও বহু বড় বড় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এখানে শুধু কিছু হাদিস উল্লেখ করেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছি।
 
আইয়ায বিন গনম রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন-من أراد أن ينصح لذي سلطان فلا يبده علانية ولكن يأخذ بيده فيخلوا به فإن قبل منه فذاك وإلا كان قد أدى الذي عليه . اخرجه ابن أبي عاصم في السنة, باب كيف نصيحة الرعية للولاة: ٣/١٠٣ رقم ٩٠٩, ٩١٠, ٩١١ و صححه الألباني بمجموع طرقه في تخريج السنة لابن أبي عاصم ’ظلال الجنة ‘; و اخرجه أيضًا احمد فى مسنده :٣/٤٠٣ رقم ١٥٣٦٩ ، و الطبرانى فى مسند الشاميين: ٥/٤٥٣ رقم ٩٥١, ١٨٤٣ و فى المعجم الكبير: ١٢/٣٤٤ رقم ١٤٤١٥ ، و الحاكم فى المستدرك: ١٢/١٨٠ رقم ٥٢٧١، و البيهقى فى السنن الكبرى: ٨/١٦٤ ، و القاسم بن سلام فى الاموال : ١/١٠٩; و ابن أبي عاصم في الآحاد والمثاني: ٢/١٥٤- ‘যে ব্যাক্তি কোনো সুলতানকে নসিহত করতে চায়, সে প্রকাশ্যে তা করবে না। বরং সে তার হাত ধরে তাকে নিরালায় নিয়ে যাবে। তখন যদি সে তাকে বলে তাহলে তার উপরে যে দায়িত্ব ছিল সে তা আদায় করে ফেললো’ [অাস-সুন্নাহ, ইমাম ইবনু আবি আসেম- ৩/১০৩ হাদিস ৯০৯-৯১১; মুসনাদে আহমদ- ৩/৪০৩ হাদিস ১৫৩৬৯; মু’জামুল কাবির, ত্বাবরাণী- ১২/৩৪৪ হাদিস ১৪৪১৫; মুসনাদে শামেঈন, ত্বাবরাণী- ৫/৪৫৩ হাদিস ৯৫১, ১৮৪৩; মুসতাদরাকে হাকিম- ১২/১৮ হাদিস ৫২৭১; সুনানুল কুবরা, বাইাহাকী- ৮/১৬৪; আল-আমওয়াল, ইমাম কাসেম- ১/১০৯; তারিখে দামেশক, ইবনুল আসাকির- ৪৭/ ২৬৬ হাদিস ১০২২১]
 
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ ، فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شِبْرًا ، فَمَاتَ عَلَيْهِ إِلَّا مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً . صحيح مسلم, كِتَاب الْإِمَارَةِ, الأَمْرِ بِلُزُومِ الْجَمَاعَةِ عَنْدَ ظُهُورِ الْفِتَنِ: رقم ١٨٥١; صحيح بخارى, كتاب الفتن, باب قول النبي صلى الله عليه وسلم سترون بعدي أمورا تنكرونها: رقم ٧٠٥٣‘যে (মুসলমান) তার আমীরের মধ্যে কিছু (দেখে) অপছন্দ করে, সে যেন অবশ্যই তার উপর সবর (ধৈর্যধারণ) করে। এমন কেউ নেই নেই, যে সুলতান (বাদশাহ/খলিফা/আমীরের অধীনতা) থেকে এক বিঘত পরিমাণও বেড়িয়ে যায়, তারপর সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে অথচ সে জাহেলিয়াতের মড়া মড়ে না’[সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৫১; সহিহ বুখারী, হাদিস ৮০৫৩]
 
এই হাদিসে مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا – ‘যে (মুসলমান) তার আমীরের মধ্যে কিছু (দেখে) অপছন্দ করে’ বলতে শাসক কর্তৃক ‘পরিষ্কার কুফর’ প্রকাশ পাওয়া নয়, বরং তার চাইতে নিম্ন স্তরের কোনো মুনকার (নাজায়েয) বিষয় প্রকাশ পাওয়া উদ্দেশ্য। কারণ, রাসুলুল্লাহ ﷺ খলিফা/ইমাম/শাসকের বিরুদ্ধে হাত (শক্তি ও ক্ষমতা) প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছেন শুধুমাত্র إِلَّا أَنْ تَرَوْا كُفْرًا بَوَاحًا، عِنْدَكُمْ مِنَ اللَّهِ فِيهِ بُرْهَانٌ – ‘যাবৎ না তোমরা (শাসকের মধ্যে) সুস্পষ্ট কুফর দেখতে পাও, যে ব্যাপারে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে বুরহান (সুস্পষ্ট দলিল) রয়েছে’ -এর ক্ষেত্রে। অর্থাৎ শাসক কর্তৃক পরিষ্কার কুফরের চাইতে নিম্ন স্তরের এক বা একাধিক মুনকার (নাজায়েয) বিষয় প্রকাশ পেলে সবর (ধৈর্যধারণ) করতে হবে। এখানে সবর (ধৈর্যধারণ) বলতে ‘বৈরাগী হয়ে হাপটি মেড়ে চুপ করে বসে থাকা নয়, বরং এর অর্থ হল, শরয়ী পন্থায় শাসককে আমর বিল মা’রুফ (সৎ বিষয়ের আদেশ) ও নাহি আনিল মুনকার (নাজায়েয কাজ থেকে নিষেধ) করতে গিয়ে শরীয়ত যেভাবে সবর করা শিখিয়েছে -তা। যেমন:
 
(১) নিজকে এভাবে সবরে রাখা যে, মন বিদ্রোহ করতে চাওয়া স্বত্ত্বেও আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর নির্দেশ পালনার্থে শাসকের অনুগত্য বন্ধন ছিন্ন করে মুসলমানদের জামাআত থেকে আলাদা না হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ ও বিদ্রোহ করে না বসা। এ ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধানের উপর অবিচল থাকাটাই সবর।
 
(২) নিজকে এভাবে সবরে রাখা যে, শাসক তার জুলুম অত্যাচার অবিচার ও অন্যায়গুলোকে কোনো মুসলমানকে দ্বারা জোর করে সত্ত্বায়ন করাতে চাইলে কিংবা তাতে তাকে সহযোগী হিসেবে জড়াতে চাইলে মুখের উপরে বলে দেয়া যে: ‘তুমি একটা জালেম! আমি আল্লাহ’র নির্দেশ অমান্য করে তোমার কথা মানতে পারবো না -চাই তুমি আমার উপরে যে অত্যাচারই চালাও না কেনো’। এ ক্ষেত্রে জালেম শাসকের অনুগত্য না করে বরং শরীয়তের বিধানের উপর অবিচল থাকাটাই সবর।
 
তারিক বিন শিহাব রা. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ وَضَعَ رِجْلَهُ فِي الْغَرْزِ، أَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ. رواه النسائي في سننه, كتاب البيعة, فضل من تكلم بالحق عند إمام جائر, حديث رقم ٤٢٠٩, و قال المنذري في الترغيب : إسناده صحيح , وقاله النووي فى رياض الصالحين: رواه النسائي بإسناد صحيح , و صححه الألباني فى سنن النسائي و في السلسلة الصحيحة: ١/٨٨٦ رقم ٤٩١ ; و أحمد في مسنده : ٤/٣١٤ رقم ; و الطبراني فى المعجم الكبير: ٨/٣٣٨ رقم ٨٠٨٠ ; و الحاكم: ٤/٥٠٥; و الحميدي في مسنده: ٧٥٢; و الترمذي في سننه: ٢١٧٤; و ابو داود في سننه: رقم ٤٣٤٤ – রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর (এক) পা (বাহনের) জিন/পা’দানীর মধ্যে রেখেছেন -এমতাবস্থায় এক ব্যাক্তি জিজ্ঞেস করলো: (ইয়া রাসুলাল্লাহ!) কোন জিহাদ সর্বত্তম। তিনি বললেন: ‘জালেম সুলতান (খলিফা/আমীর/রাষ্ট্রপ্রধান)-এর কাছে কালেমায়ে-হক্ব (পেশ করা)’। [সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪২০৯; মুসনাদে আহমদ- ৪/৩১৪ হাদিস ১৮৮৪৭, ১৮৮৫০; আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরাণী- ৮/৩৩৮ হাদিস ৮০৮১; মুসতাদরাকে হাকিম- ৪/৫০৫; মুসনাদে হুমাইদী, হাদিস ৭৫২; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২১৭৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৩৪৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০১২; শুআবুল ইমান, বাইহাকী- ২/৪১৮]
 
(৩) নিজকে এভাবে সবরে রাখা যে, মন বিদ্রোহ করতে চাওয়া স্বত্ত্বেও আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর নির্দেশ পালনার্থে শাসকের জুলুম ও অন্যায় অবিচারকে যথাসম্ভব বরদাস্ত করে চলা -এমনকি যদি নিজের পিঠে অন্যায় ভাবে চাবুক পড়ে বা মাল-সম্পদ অন্যায়ভাবে করায়ত্ব করে নেয়।
 
সাবি’ বিন খালিদ রহ. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, হযরত হুযাইফা রা. বলেন- إن الناس كانوا يسألون رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الخير وكنت أسأله عن الشر قال قلت يا رسول الله أرأيت هذا الخير الذي أعطانا الله يكون بعده شر كما كان قبله قال نعم قلت يا رسول الله فما العصمة من ذلك قال السيف قلت وهل للسيف من بقية قال نعم قال قلت ثم ماذا قال ثم هدنة على دخن قال جماعة على فرقة فإن كان لله عز وجل يومئذ خليفة ضرب ظهرك وأخذ مالك فاسمع واطع وإلا فمت عاضا بجذل شجرة. قال قلت ثم ماذا قال يخرج الدجال …. رواه الحاكم فى المستدرك: ٤/٤٧٩ رقم ٨٣٣٢ و قال هذا حديث صحيح الإسناد ولم يخرجاه, و وافقه الذهبي في التلخيص; أبو داود الطيالسي فى المسنده: ١/٥٩ رقم ٤٤٢ و ٤٤٣ هذا حديث صحيح، رواته كلهم ثقات كما قال حمود بن عبد الله التويجري فى إتحاف الجماعة بما جاء في الفتن والملاحم وأشراط الساعة: ١/٧٤; أبو داود فى سننه: ٤/٩٥ رقم ٤٢٤٤ و حسنه الالبانى; ابن أبي شيبة فى المصنف: ٧/٤٤٧ رقم ٣٧١١٣ ; عبد الرزاق فى المصنف: ١١/٣٤١ رقم ٢٠٧١١ ; أحمد فى ال مسند: رقم ٢٢٣٣٣ و ٢٣٤٧٦; معمر بن راشد فى الجامع: ١١/٣٤١; أبو عوانة فى المسند: ٤/٤٢٠ رقم ٧١٦٨; البزار فى المسند: ٧/٣٦١ رقم ٢٩٦٠‘লোকজন রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে কল্যান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো, আর আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম মন্দ সম্পর্কে। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ ! আল্লাহ (আপনার বরকতে) আমাদেরকে এই-যে কল্যান দিয়েছেন, এরপর কি কোনো মন্দ রয়েছে -যেমনটা এর আগে (জাহেলী জামানায়) ছিল? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ! তা থেকে মুক্তির উপায় কি? তিনি বললেন: তরবারী। আমি জিজ্ঞেস করলাম: তরবারীর কারণে কি কিছু অবশিষ্ট থাকবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ, (থাকবে)। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম: তারপর কি হবে? তিনি বললেন: এরপর (মুসলমানরা এমন হবে, যেন পাপ মিশ্রিত) ধোয়ার উপর (ইমান ও আমলের অপূর্ণ) স্থিরতা, তিনি বললেন: (তখন থাকবে বিভিন্ন) ফেরকার (নিজ নিজ বিশ্বোস ও চেতনার) উপর (গঠিত সব) জামাআত। সেদিন যদি আল্লাহ আযযা ওয়া যাল্লা (জমিনের বুকে কোনো) খলিফা (সুলতান/ইমাম-কে জীবিত) রাখেন, (যে) তোমার পিঠে (অন্যায় ভাবে) আঘাত করে, তোমার ধ্বনসম্পদ (অন্যায় ভাবে) ছিনিয়ে নেয়, তবুও (সেই খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না, বরং তার আদেশ-নির্দেশ) শুনবে এবং (ওর মধ্যে জায়েয বিষয়গুলোর) অনুগত্য করবে -(এর জন্য) যদিও তোমাকে গাছ’কে কামড় দিয়ে মৃত্যুকে বরন করতে হয়। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম: তারপর কি হবে? তিনি বললেন: এরপর দাজ্জাল বেড় হবে।… [মুসতাদরাকে হাকিম- ৪/৪৭৯, হাদিস ৮৩৩; আল-মুসনাদ, আবু দাউদ তায়ালিসী- ১/৫৯ হাদিস ৪৪২, ৪৪৩; সুনানে আবু দাউদ- ৪/৯৫ হাদিস ৪২৪৪; মুসান্নাফে ইবনু আবি শায়বাহ- ৭/৪৪৭ হাদিস ৩৭১১৩; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক- ১১/৩৪১ হাদিস ২০৭১১; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২২৩৩৩, ২৩৪৭৬; আল-জামে’, ইমাম মুআম্মার বিন রাশেদ- ১১/৩৪১; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ- ৪/৪২ হাদিস ৭১৬৮; মুসনাদে বাযযার- ৭/৩৬১ হাদিস ২৯৬০]
 
আবু সালেম রহ. থেকে বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে, হযরত হুযাইফা রা. বলেন- قلت يا رسول الله إنا كنا فى شر فجاء الله بخير فنحن فيه فهل من وراء هذا الخير شر ؟ قال نعم .قلت فهل وراء ذلكالشر خير ؟قال: نعم فهل وراء ذلك الخير شر قال:نعم قلت: كيف؟ قال: يكون بعدى أئمة لا يهتدون بهداى ولا يستنون بسنتى وسيقوم فيهم رجال قلوبهم قلوب الشياطين فى جثمان أنس قال:قلت :كيف أصنع يارسول الله إن أدركت ذلك ؟ قال:تسمع وتطيع للأمير وإن ضرب ظهرك وأخذ مالك فاسمع وأطع – ‘আমি জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসুলাল্লাহ ! আমরা (একসময়) মন্দ জামানায় ছিলাম। পরে আল্লাহ কল্যান নিয়ে এলেন। ফলে (এখন) আমরা তাতে আছি। এই কল্যানের পর কি কোনো মন্দ আছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ওই মন্দের পর কি কোনো কল্যান আছে। তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম: ওই কল্যানের পর কি কোনো মন্দ রয়েছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম: কিভাবে? তিনি বললেন: আমার পর এমন রাষ্ট্রপ্রধান/লিডার’রা আসবে, যারা না আমার দেখানো পথে চলবে আর না আমার সুন্নাহ মতো চলবে। তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক দাঁড়াবে যাদের মনুষ্য দেহের ভিতরে বিদ্যমান অন্তরগুলো হবে একেকটা শয়তানের অন্তর। আমি জিজ্ঞেস করলাম: আমি যদি সে যুগ পেয়ে যাই, তাহলে কি করবো -ইয়া রাসুলাল্লাহ ? তিনি বললেন: আমীরের কথা শুনবে এবং অনুগত্য করবে – এমন কি যদিও সে তোমার পিঠে মাড়ে এবং তোমার ধ্বনসম্পদ কেড়ে নেয়; তারপরও (তার কথা) শুনবে ও (জায়েয নির্দেশগুলোর) অনুগত্য করবে, (অনুগত্যতা থেকে বেড় হয়ে মুসলমানদের জামাআত থেকে আলাদা হবে না এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও যুদ্ধ করবে না)’। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮৪৭]
 
ইমাম আবু বকর মুহাম্মাদ বিন হুসাইন আল-আযরী রহ. (মৃ: ৩৬০ হি:) সহিহ সনদে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ওমর বিন খাত্তাব রা. সুয়াইদ বিন গাফালা ‘কে বলেছেন- حَدَّثَنَا حَدَّثَنَا أَبُو شُعَيْبٍ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الْحَسَنِ الْحَرَّانِيُّ ، قَالَ : حَدَّثَنِي جَدِّي ، قَالَ : حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ أَعْيَنَ ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ عَبْدِ الأَعْلَى ، عَنْ سُوَيْدِ بْنِ غَفَلَةَ ، قَالَ : قَالَ لِي عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ : لَعَلَّكَ أَنْ تُخَلَّفَ بَعْدِي ، فَأَطِعِ الإِمَامَ ، وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا وَإِنْ ضَرَبَكَ فَاصْبِرْ ، وَإِنْ حَرَمَكَ فَاصْبِرْ ، وَإِنْ دَعَاكَ إِلَى أَمْرِ مَنْقَصَةٍ فِي دُنْيَاكَ فَقُلْ : سَمْعًا وَطَاعَةً ، دَمِي دُونَ دِينِي . اخرجه الإمام محمد ابن الحسين الأجرى فى كتاب الشريعة, بَابٌ فِي السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ لِمَنْ وَلِيَ أَمْرَ: رقم الحديث ٧٤ , اسناده صحيح: ١/١٦١ , تحقيق: عاصم بن عبد الله القريوتى; اللبيهقي قي السنن الكبرى: ٨/٢٧٤ رقم ١٦٦٢٨ -‘(হে আবু উমাইয়্যাহ!) তুমি হয়তো আমার পরেও (জীবিত) থাকবে (এবং নতুন কোনো খলিফা/ইমাম পাবে। তবে যাকেই পাও না কেনো, তুমি সর্বদা তোমাদের মুসলমানদের) ইমাম (খলিফা/আমীর)-এর অনুগত্য করবে -যদিও সে একজন হাবশী গোলামই হয় না কেনো। যদি সে তোমাকে পিটায়, তবে সবর (ধৈর্যধারন) করবে। সে যদি তোমাকে (ইসলামী রাষ্ট্রে থাকা) নিষিদ্ধ করে দেয়, তাহলে সবর করবে, (তবুও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে যাবে না)’। সে যদি তোমাকে এমন কোনো নির্দেশ মানতে বলে যা তোমার দুনিয়াবী ব্যাপারে হেয়তার কারণ হয়, তাহলেও বলবে: শুনবো ও (জায়েয নির্দেশগুলোর) অনুগত্য করবো; (শরয়ী প্রয়োজনে) আমার রক্ত (দিবো, তবুও আমি) আমার দ্বীন (ছাড়বো না)’। [কিতাবুশ শারইয়াহ, ইমাম আযরী– ১/১৬১, হাদিস ৭৪; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৮/২৭৪ হাদিস ১৬৬২৮]
 
ইমাম মাহিউদ্দিন নববী (মৃ: ৬৭৬ হি:) রহ. লিখেছেন- لَا يَجُوز الْخُرُوج عَلَى الْخُلَفَاء بِمُجَرَّدِ الظُّلْم أَوْ الْفِسْق مَا لَمْ يُغَيِّرُوا شَيْئًا مِنْ قَوَاعِد الْإِسْلَام – ‘খলিফা যদি ইসলামী শরীয়তের (কোনো জরুরী) কোনো কিছুকে পরিবর্তন না করেন (কোনো কিছুকে পাল্টিয়ে না দিয়ে থাকেন), তাহলে (ওই খলিফা কর্তৃক কেনো নাগরীকের উপর শুধুমাত্র কোনো) জুলুম (অন্যায় অবিচার) ও ফাসেকী কাজের কারণে (তাকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে) তার বিরুদ্ধে বেড় হওয়া জায়েয নয়’[শারহু মুসলীম, নববী- ৬/৩২৭] অন্যত্র লিখেছেন- وَأَمَّا الْخُرُوج عَلَيْهِمْ وَقِتَالهمْ فَحَرَام بِإِجْمَاعِ الْمُسْلِمِينَ ، وَإِنْ كَانُوا فَسَقَة ظَالِمِينَ – ‘মুসলীম উম্মাহ’র ইজমা রয়েছে যে, তারা (তথা খলিফা/আমীর/সুলতান’গণ) ফাসেক জালেম (ও অন্যায়কারী) হলেও তাদের বিরুদ্ধে বেড় হওয়া ও তাদের সাথে যুদ্ধ করা হারাম (- যাবৎ না তাদের থেকে প্রকাশ্য কুফরী প্রকাশ পায়)’। [শারহু মুসলীম, নববী- ১২/২২৯] তিনি আরো লিখেছেন- لُزُوم جَمَاعَة الْمُسْلِمِينَ وَإِمَامهمْ ، وَوُجُوب طَاعَته ، وَإِنْ فَسَقَ وَعَمِلَ الْمَعَاصِي مِنْ أَخْذ الْأَمْوَال وَغَيْر ذَلِكَ ، فَتَجِب طَاعَته فِي غَيْر مَعْصِيَة – ‘মুসলমানদের জামাআত ও তাদের ইমাম (খলিফা/আমীরে আ’জম/সুলতান)-কে আঁকড়িয়ে ধরে থাকা (শরীয়তের দৃষ্টিতে) অপরিহার্য। ইমামের (সকল জায়েয আদেশ নির্দেশের) অনুগত্য করা (মুসলমানদের জন্য) ওয়াজিব -(এমনকি) যদিও তিনি (কারো) মালসম্পদ (অন্যায় কৌশলে) কবজা করে নেয়ার মতো (কোনো) ফাসেকী ও নাফরমানীমূলক কাজ করে বসুন না কেনো। পাপ কাজ ছাড়া (বাকি সকল ব্যাপারে) তার অনুগত্য করা ওয়াজিব’। [শারহু মুসলীম, নববী- ১২/২৩৭ ]
 
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (মৃ: ২৪১ হি:) রহ. বলেছেন- ومن خرج على إمامٍ من أئمّة المسلمين وقد كان النّاس اجتمعوا عليه وأقرّوا له بالخلافة بأيّ وجهٍ كان بالرّضا أو الغلبة؛ فقد شقّ هذا الخارج عصا المسلمين، وخالف الآثار عن رسول الله صلّى الله عليه وآله وسلّم، فإن مات الخارج مات ميتة جاهليّة، ولا يحلّ قتال السّلطان ولا الخروج عليه لأحدٍ من النّاس، فمن فعل ذلك فهو مبتدع على غير السّنّة والطّريق – ‘ (যদি এমন হয় যে, মুসলীম) জনগণ (তাদের মৌখিক বা আচোরনগত কিংবা মৌন সম্মতি দ্বারা) কারো খিলাফতকে স্বীকার করে নিয়ে তার উপর একজোট হয়ে আছে -চাই খুশি মনেই (একজোট) থাক বা (তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ভয়ে) প্রভাবিত হয়েই (একজোট) থাক, এমতাবস্থায় যে ব্যাক্তি এধরনের ইমামগণের (খলিফা/আমীর/সুলতানগণের) মধ্যে কোনো ইমামের বিরুদ্ধে (বিদ্রোহ ঘোষনা ও যুদ্ধ করার জন্য) বেড় হয়, তাহলে তার এই বিদ্রোহটি মূলতঃ মুসলমানদের শাসনের লাঠিকে ভেঙ্গে দিয়েছে (মর্মে গণ্য হবে)। বস্তুতঃ সে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীর পরিপন্থি কাজ করে বসেছে। সে যদি এরকম বিদ্রোহাত্বক অবস্থায় মাড়া যায় তাহলে সে জাহেলিয়্যাতের মড়া মড়লো। (শরীয়ত প্রদর্শিত সীমা লঙ্ঘন ভিন্ন অন্যান্য জুলুম অন্যায় অবিচার ও পাপ কাজের কারণে) সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা (তাকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে) তার বিরুদ্ধে বেড় হওয়া ( মসলীম) জনগণের জন্য হালাল নয়। যে ব্যাক্তি এমন কাজ করবে, সে (রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর) সুন্নাহ (ও সুস্পষ্ট আদর্শ) বাদ দিয়ে দিয়ে বিদআতী পন্থা অবলম্বনকারী (হিসেবে গণ্য)’। [মাসায়েল ওয়ার রাসায়েল- ২/৫]
 
ইমাম ইবনে আব্দুল বার (মৃ: ৪২৩ হি:) রহ. লিখেছেন- وَ إِلَى مُنَازَعَةِ الظَّالِمِ الْجَائِرِ ذَهَبَتْ طَوَائِفُ مِنَ الْمُعْتَزِلَةِ وَعَامَّةِ الْخَوَارِجِ وَ أَمَّا أَهْلُ الْحَقِّ وَهُمْ أَهْلُ السُّنَّةِ فَقَالُوا هَذَا هُوَ الِاخْتِيَارُ أَنْ يَكُونَ الْإِمَامُ فَاضِلًا عَدْلًا مُحْسِنًا فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَالصَّبْرُ عَلَى طَاعَةِ الْجَائِرِينَ مِنَ الْأَئِمَّةِ – ‘মু’তাজিলাদের একটি গোষ্ঠি এবং খারেজীদের সকলে জালেম ও জায়ের (পাপীষ্ট শাসক)-এর বিরুদ্ধে নামার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর বিপরীতে আহলুল-হক্ব তথা আহুলস-সুন্নাহ’র বক্তব্য হল, (প্রথমতঃ-তো) এমন কাউকে শাসক হিসেবে নির্বাচন করতে হবে যিনি দ্বীনদার, ইনসাফগার এবং ইহসানকারী। কিন্তু পরে যদি তেমনটা না হয়, তাহলে ওসব পাপীষ্ট শাসকদের অনুগত্যের প্রশ্নে সবর এখতিয়ার করতে হবে (- যাবৎ না তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার মতো পরিষ্কার কুফর প্রকাশ পায়)’। [আত-তামহিদ, ইবনে আব্দুল বার- ২৩/২৭৯]
 
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (মৃ: ৭২৮ হি:) রহ. লিখেছেন- المشهور من مذهب أهل السنة أنه لا يرون الخروج على الأئمة وقتالهم بالسيف وإن كان فيهم ظلم ، كما دلت على ذلك الأحاديث الصحيحة المستفيضة عن النبي صلى الله عليه وسلم؛ لأن الفساد في القتال والفتنة أعظم من الفساد الحاصل بظلمهم بدون قتال ولا فتنة ، فلا يدفع أعظم الفسادين بالتزام أدناهما ، ولعله لا يكاد تعرف طائفة خرجت على ذي سلطان إلا وكان في خروجها من الفساد ما هو أعظم من الفساد الذى أزالته – ‘আহলে সুন্নাহ’র এই মতটি মাশহুর যে, তাঁদের মতে ইমামগণের (খলিফা/আমীর/সুলতানগণের) মধ্যে (সুস্পষ্ট কুফর ব্যাতীত সাধারণ) জুলুম (ও অন্যায় অবিচার) পরিলক্ষিত হলেও (তাদেরকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে) তাদের বিরুদ্ধে বেড় হওয়া ও তাদের সাথে তরবারী দিয়ে যুদ্ধ করা (কোনোটিই) জায়েয নয়। এটা রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিসসমূহে বর্ণিত তা’লিম থেকেই প্রমাণিত। এটা এজন্য যে, যুদ্ধের মধ্যে ফাসাদ (অবধারিত, যেখানে বহু মানুষের রক্ত ঝড়ে, জীবন চলে যায়, একে অপরের মধ্যে দীর্ঘ স্থায়ী দ্বন্দ্ব কলহ ও বিবাদ জিইয়ে থাকে)। আর ফাসাদের চাইতে আরো মারাত্মক হল ফিতনা। অথচ ইমাম’রা (তাদের জনগণের কারো কারো উপর) জুলুম (ও অন্যায় অবিচার) করলে সেটা (ব্যাক্তি পর্যায় পর্যন্ত থাকবে বটে, কিন্তু) যুদ্ধ ও ফিতনা (-এর মতো অত ভয়ঙ্কর ঘটনা) হবে না। সুতরাং, (শাসকের জুলুম ও অন্যায় অবিচারের মতো তুলনামূলক) ছোট ফ্যাসাদকে রদ করার জন্য ওর চাইতে আরো বড় দুটো ফ্যাসাদ’কে অবলম্বন করা জায়েয হতে পারে না। খুব বেশি হলে, কোনো (হক্বপন্থি) দলের জন্য সেই (জালেম) সুলতাদের বিরুদ্ধে বেড় হওয়ার সম্ভাব্যতা থাকলেও থাকতে পারে তখন, যদি (দেশে) তার কৃত ফাসাদের ভয়াবহতার চাইতে তাদের বেড় হওয়ার ফলে সৃষ্ট ফাসাদের মাত্রা (তুলনামূলক উল্লেখযোগ্য পরিমানে) কম হওয়ার (বাস্তব প্রবল) সম্ভাবনা থাকে’। [মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনে তাইমিয়্যাহ- ৩/৩৯১]
 
কিন্তু ইসলামী শরীয়তের এই মাসআলার বিপরীতে-

(ক) যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ধর্মীয় বিধানকে ১০০% ছেটে ফেলে দেয়ায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের অত্যাবশ্যক (ফরয) শর্ত, তাই রাষ্ট্রপ্রধানের বিরোধীতা/বিদ্রোহে নামা কিংবা তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে তাকে উৎখাত করা বা না-করা’র ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তের উপরোক্ত শর্তগুলিকেও রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ১০০% ছেটে ফেলে দেয়ায় বিশ্বাস (ইমান) রাখাও তাদের মতে অবশ্যই অত্যাবশ্যক (ফরয)।

(খ) যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানকে টেনে আনা ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম), তাই রাষ্ট্রপ্রধানের বিরোধীতা/বিদ্রোহে নামা কিংবা তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে তাকে উৎখাত করা বা না-করা’র ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তের উপরোক্ত শর্তগুলিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনাও তাদের মতে অবশ্যই ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম)।

(গ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যেহেতু বিশ্বাস করে- যে ব্যাক্তি ধর্মীয় বিধিবিধানকে রাষ্ট্রব্যাবস্থায় টেনে আনায় বিশ্বাসী সে আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেই বিশ্বাসী নয় বরং অস্বীকারকারী (কাফের), তাই যে ব্যাক্তি রাষ্ট্রপ্রধানের বিরোধীতা/বিদ্রোহে নামা কিংবা তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে তাকে উৎখাত করা বা না-করা’র ক্ষেত্রেও ইসলামী শরীয়তের উপরোক্ত শর্তগুলিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনায় বিশ্বাসী, তাদের মতে সেও আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসীই নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে অস্বীকারকারী (কাফের)।

(ঘ) উপরোক্ত এই ৩টি পয়েন্টের ব্যাপারে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদীদেরর ঐক্যমত (ইজমা) রয়েছে।

জবরদখল করে কেউ ‘খলিফা/সুলতান/ইমাম/আমীরে আ’জম/শাসক’ হয়ে বসলে তার অনুগত্য করা বা না-করা

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, উপরের সুন্নাহ/আদর্শীক পন্থাগুলি-তো মানতে রাজি শুধুমাত্র পাক্কা মুমিন মুসলমানগণ, যারা কুরআন ও সুন্নাহ মেনে চলতে বদ্ধ পরিকর এবং আখেরাতে আল্লাহ তাআলা সামনে দন্ডায়মান হতে ভয় পায়। কিন্তু বাস্তব সত্য হল, পৃথিবীর বেশিরভাগ মুসলমান আখেরাত বিমুখ এবং দুনিয়াদার, যারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সামান্য পার্থিব স্বার্থে খলিফা/আমীর নির্বাচন ও তার অনুগত্যের উপরোক্ত শরয়ী হুকুম ও নির্দেশনাগুলোকে পিঠের পিছনে ফেলে দিয়ে যে যেভাবে পারে দুনিয়ার কর্তৃত্ব ক্ষমতা, ধ্বনসম্পদ ও সুখস্বাচ্ছন্দ হাসিল করতে চায়। আর ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এভাবেই ক্ষমতা দখল করা হয়েছে এবং দখল ও তা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কত মানুষের রক্ত ঝড়ানো হয়েছে, ইজ্জত আব্রু, বাড়ি ঘর ও ধ্বনসম্পদ নষ্ট করা হয়েছে। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, সুন্নাহ পন্থায় খলিফা/আমীর/ইমাম নির্বাচনের ধার না ধেরে যে মুসলমান জবরদখল করে মুসলমানদের উপরে শাসক হয়ে বসে, তাদের সাথে মুসলীম নাগরীকদের কি আচরন করা কর্তব্য? মুসলমানরা কি পূণরায় সুন্নাহ পন্থায় খলিফা নির্বাচনের জন্য ওই জবরদখলকারী খলিফা/সুলতানের তথাকথিত খিলাফত (শাসন কর্তৃত্ব)কে অস্বীকার করে তাকে উৎখাত করার জন্য তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে, নাকি তার অনুগত্যতা স্বীকার করে নিয়ে মুসলমানদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালাবে?

এর উত্তর হল, কেউ শক্তি খাটিয়ে মুসলমানদের উপরে শাসন কর্তৃত্ব ড়েগে ফেললে, মুসলমানদের উচিৎ হবে তার শাসন কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিয়ে তার জায়েয বিষয়গুলোর অনুগত্য করতে থাকবে -যাবৎ সে আল্লাহ’র বিধান অনুযায়ী খিলাফত পরিচালনা করতে থাকে। তার অনুগত্য বন্ধন ছিন্ন করে তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ তখনই জায়েয হবে, যখন তার থেকে এমন পরিষ্কার কুফরী প্রকাশ পায়, যে ব্যাপারে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে পরিষ্কার বুরহান (দলিল) রয়েছে। 

উম্মে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- إِنْ أُمِّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ مُجَدَّعٌ – حَسِبْتُهَا قَالَتْ – أَسْوَدُ، يَقُودُكُمْ بِكِتَابِ اللهِ تَعَالَى، فَاسْمَعُوا لَهُ وَأَطِيعُوا . رواه مسلم, كتاب الحج, باب استحباب رمي جمرة العقبة يوم النحر راكبا، وبيان قوله صلى الله عليه وسلم «لتأخذوا مناسككم: رقم ١٢٩٨; و احمد في المسند: ١٨/٤٨٩ رقم ٢٧١٤٣ اسناده صحيح; الخلال في السنة: رقم ٥٢ ‘যদি তোমাদের উপরে কোনো অঙ্গ কর্তিত গোলামকেও শাসক হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয় -(রাবী বলেন:) আমার মনে হয় তিনি (এও) বলেছেন যে, কালো (ও অঙ্গ কর্তিত গোলামকেও শাসক হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয়)- যে তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার কিতাব অনুযায়ী পরিচালনা করে, তাহলে তোমরা তার কথাও শুনবে এবং (তার জায়েয নির্দেশগুলোর ক্ষেত্রে) অনুগত্য করবে’ [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১২৯৮; মুসনাদে আহমদ– ১৮/৪৮৯ হাদিস ২৭১৪৩; আস-সুন্নাহ, ইমাম খাল্লাল, হাদিস ৫২]

আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- اسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَإِنْ اسْتُعْمِلَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِيٌّ كَأَنَّ رَأْسَهُ زَبِيبَةٌ . صحيح البخاري, كتاب الأحكام, باب السمع والطاعة للإمام ما لم تكن معصية: رقم ٧١٤٢; سنن ابن ماجه: رقم ٢٨٦٠; مسند أحمد بن حنبل: رقم ١١٧١٦; السنن الكبرى للبيهقي: ٨/١٥٥; البحر الزخار بمسند البزار: ١٠/١٣ رقم ٧٣٧٤; مسند أبي يعلى الموصلي: ٤١٧٦; مسند ابن الجعد: ١٤١٣ – ‘যদি তোমাদের (মুসলমানদের) উপরে এমন হাবশী গোলাম’কে নিযুক্ত করে দেয়া হয় যার মাথাটা কিসমিস (-এর মত দেখতে), তবুও তোমরা (তার আদেশ-নির্দেশ) শুনবে ও (সেগুলোর মধ্যে জায়েয বিষয়গুলোর) অনগত্য করবে’[সহিহ বুখারী, হাদিস ৭১৪২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৬০; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১১৭১৬; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৮/১৫৫; মুসনাদে বাযযার- ১০/১৩ হাদিস ৭৩৭৪; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস ৪১৭৬; মুসনাদে ইবনুল যা’দ, হাদিস ১৪১৩]

ইমাম বাইহাকী রহ. নিজ সনদে হারমালাহ রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: আমি ইমাম শাফেয়ী’কে বলতে শুনেছি- كلُّ من غلبَ على الخلافةِ بالسيفِ حتّى يُسمّى خليفةً، ويجمع الناس عليه، فهو خليفةٌ – ‘(মুসলমানদের আমীর/খলিফা/সুলতান/ইমাম হওয়ার শরয়ী নূন্যতম যোগ্যতাগুণ সম্পন্ন) কেউ যদি (আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ কিংবা মুসলমানদের সম্মতি অসম্মতির তোয়াক্কা না করে) তরবারীর জোরে খিলাফত (তথা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষমতা) দখল করে বসে, আর তাকে যদি (মুসলীম) জনগণরাও (স্বেচ্ছায় বা তার প্রভাব প্রতিপত্তির ভয়ে) খলিফা (সুলতান/আমীরুল মু’মিনিন ইত্যাদি) বলে ডাকতে থাকে, (যার দ্বারা তার রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রকাশ্য বা মৌন স্বীকৃতি প্রকাশ পায়) তাহলে সে (মুসলমানদের) খলিফা (সুলতান/ইমাম হিসেবে গণ্য হবে এবং তার অনুগত্য করা অপরিহার্য যাবৎ সে তাদেরকে আল্লাহ’র অনুগত্যতামূলক নির্দেশ দান করতে থাকবে)’। [মানাক্বিবুশ শাফেয়ী, ইমাম বাইহাকী- ১/৪৪৯]

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. বলেছেন- ومن غلب عليهم بالسيف حتّى صار خليفة وسمّي أمير المؤمنين، فلا يحلّ لأحد يؤمن بالله واليوم الآخر أن يبيت ولا يراه إماماً، برّاً كان أو فاجراً – ‘(মুসলমানদের আমীর/খলিফা/সুলতান/ইমাম হওয়ার শরয়ী নূন্যতম যোগ্যতাগুণ সম্পন্ন) কেউ যদি (আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ কিংবা মুসলমানদের সম্মতি অসম্মতির তোয়াক্কা না করে) তরবারীর জোরে তাদের উপরে (রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার সার্বিক) প্রভাব বিস্তার করে নেয়, আর (মুসলমানরা যদি তাকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও) আমিরুল মু’মিনিন (খলিফা/সুলতান ইত্যাদি) বলে ডাকে, তাহলে আল্লাহ ও আখেরাতের দিবসের প্রতি ইমান রাখে এমন কারো জন্য তাকে ইমাম (সুলতান/খলিফা/আমীর) হিসেবে মেনে না নেয়া জায়েয নয় -চাই সে (ব্যাক্তি হিসেবে) ভাল হোক বা ফাজের (পাপী)’। [আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, ইমাম আবু ইয়া’লা- ২৩ পৃ:]

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. লিখেছেন- والقدرةُ على سياسةِ الناسِ إمّا بطاعتِهم لهُ، وإمّا بقهرهِ لهم، فمتى صارَ قادراً على سياستِهم بطاعتِهم أو بقهرهِ، فهو ذو سلطانٍ مطاعٍ إذا أمرَ بطاعةِ اللهِ – ‘জনগণের রাজনৈতিক বিষয়াবলির উপর ক্ষমতাসীন ও কর্তৃত্বকারী ব্যাক্তি – চাই তারা তার অনুগত্যতা (স্বেচ্ছায়) মেনে নিক কিংবা (বল প্রয়োগের মাধ্যমে) তাদেরকে সে (তার অনুগত্যতা স্বীকার করতে) বাধ্য করুক, (উভয় অবস্থাতেই) সে (তাদের) অনুগত্যপ্রাপ্য সুলতান (শাসক/আমীর/ইমাম/খলিফা হিসেবে গণ্য হবে) -যাবৎ সে (তাদেরকে) আল্লাহ’র অনুগত্যতামূলক নির্দেশ দান করতে থাকবে’। [মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনে তাইমিয়্যাহ- ১/১৪২]

কিন্তু ইসলামী শরীয়তের এই মাসআলার বিপরীতে-

(ক) যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ধর্মীয় বিধানকে ১০০% ছেটে ফেলে দেয়ায় বিশ্বাস (ইমান) রাখা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের অত্যাবশ্যক (ফরয) শর্ত, তাই জবরদখলকারী রাষ্ট্রপ্রধানের অনুগত্যতা স্বীকার ও উৎখাতের প্রশ্নেও ইসলামী শরীয়তের উপরোক্ত শর্তগুলিকেও রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে ১০০% ছেটে ফেলে দেয়ায় বিশ্বাস (ইমান) রাখাও তাদের মতে অবশ্যই অত্যাবশ্যক (ফরয)।

(খ) যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো ধর্মীয় বিধিবিধানকে টেনে আনা ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম), তাই জবরদখলকারী রাষ্ট্রপ্রধানের অনুগত্যতা স্বীকার ও উৎখাতের প্রশ্নেও ইসলামী শরীয়তের উপরোক্ত শর্তগুলিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনাও তাদের মতে অবশ্যই ১০০% নিষিদ্ধ (হারাম)।

(গ) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যেহেতু বিশ্বাস করে- যে ব্যাক্তি ধর্মীয় বিধিবিধানকে রাষ্ট্রব্যাবস্থায় টেনে আনায় বিশ্বাসী সে আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেই বিশ্বাসী নয় বরং অস্বীকারকারী (কাফের), তাই যে ব্যাক্তি জবরদখলকারী রাষ্ট্রপ্রধানের অনুগত্যতা স্বীকার ও উৎখাতের প্রশ্নে ইসলামী শরীয়তের উপরোক্ত শর্তগুলিকেও রাষ্ট্রযন্ত্রে টেনে আনায় বিশ্বাসী, তাদের মতে সেও আদপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসীই নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে অস্বীকারকারী (কাফের)।

(ঘ) উপরোক্ত এই ৩টি পয়েন্টের ব্যাপারে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদীদেরর ঐক্যমত (ইজমা) রয়েছে।

 

বাকি আলোচনা পরবর্তী পৃষ্ঠায় দেখুন…>>>