পুরুষের উপরে জিহাদ ফরয; নারীর উপরে নয় – কুরআন সুন্নাহ‘র দলিল

পুরুষের উপরে কিতাল (সমর জিহাদ) ফরয; নারী’র উপরে নয় – কুরআন সুন্নাহ ও ফিকহী দলিল – মাসলা মাসায়েল

 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ مُحَمَّدٍ النبي الأمي عَدَدَ خَلْقِك وَ رِضَا نَفْسِك وَزِنَةَ عَرْشِك وَ مِدَادَ كَلِمَاتِك، صَلِّ عَليه صَلاَةً كَامِلَةً دَائِمَةً كَمَا يَنْبَغِي أَنْ يُصَلَّى عَلَيهِ وَ سَلِّمْ تَسلِيمَاً بِقَدرِ عَظَمَةِ ذَاتِكَ فِى كُلِّ وَقتٍ وَ حِين، صلاة تكون لك رضاء و له جزاء، صلاة لا غاية لها ولا منتهى ولا انقضاء باقية ببقائك الى يوم الدين ، و اعطه الوسيلة و الفضيلة و المقام المحمود الذي وعدته، و اجزه عنا ما هو اهله، و على اله وأصحابه و أزواجه و ذريته و أهل بيته و سلم تسليما مثل ذلك، اَللّٰهُمَّ اجمعني معه في الفردوس و جنة المأوى، اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ مُحَمَّدٍ صَلوٰةً تُنَجِّيْنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْأَهْوَالِ وَاْلآفَاتِ وَتَقْضِيْ لَنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْحَاجَاتِ وَتُطَهِّرُنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ السَّيِّاٰتِ وَتَرْفَعُنَا بِهَا عِنْدَكَ اَعْليٰ الدَّرَجَاتِ وَتُبَلِّغُنَا بِهَا اَقْصىٰ الْغَايَاتِ مِنْ جَمِيْعِ الْخَيْرَاتِ فِي الْحَيَاتِ وَبَعْدَ الْمَمَاتِ- اِنَّكَ عَليٰ كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ

[উল্লেখ্য,  এই গোটা আলোচনায় উল্লেখিত বিভিন্ন কুরআনের আয়াত, হাদিস ও আছার এবং আরবী ইবারত সমূহের অনুবাদ ও আনুসঙ্গিক ব্যাখ্যাকে কোনো বিজ্ঞ মুহাক্কেক আলেমের পরামর্শ ব্যাতীত কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে আমার অযোগ্যতার কারণে এখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করে নেয়ার আগেই মানব সমাজে ছড়িয়ে না যায়। এগুলো পড়ুন ইলম অর্জনের জন্য এবং যোগ্য আলেম থেকে তা বুঝিয়ে নিন। আর কোনো যোগ্য চোখে উল্লেখযোগ্য ভুল ধরা পড়লে তা আমাকে অবগত করুন।]


সশস্ত্র জিহাদ করা নারী উপরে ফরয নয় – কুরআন সুন্নাহ ও ফিকহী দলিলাদি, বিভিন্ন শর্ত শরায়েত ও মাসলা মাসায়েল

পূর্ব প্রকাশের পর >>>

৫. পুরুষ হওয়া 

ইসলামী শরীয়তে সাধারণ অবস্থায় ক্বিতাল/জিহাদ’-এর ফরয দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে ‘মুসলীম বালেগ পুরুষ’-এর উপরে। অপরদিকে ‘মুসলীম নারী’কে জিহাদের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এর দলিল সমূহ নিম্নোরূপ-

আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেন-

وَ لَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ ۚ لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا ۖ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ ۚ  وَ اسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا
“আর তোমরা ওই বিষয়ের তামান্না (আকাঙ্খা পোষন) করো না, যা দিয়ে (তোমাদের রব) আল্লাহ (তাআলা পৃথিবীর জীবনে তাঁর বান্দাদেরই মধ্যে) কতক’কে কতকের উপরে ফজিলত (শ্রেষ্ঠত্ব) দান করেছেন। (পার্থিব ধ্বনসম্পদ ও অভিভাবকত্ব-সুলভ ক্ষমতা লাভই হোক কিংবা আখেরাতে সাওয়াব লাভই হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তোমাদের রব আল্লাহ তাআলা যে সকল বিধিবিধান দিয়েছে, সেই অনুসারে) পুরুষদের জন্য থাকবে সেই অংশ যা তারা উপার্জন/লাভ করবে, আর নারীদের জন্য থাকবে সেই অংশ যা তারা উপার্জন/লাভ করবে। আর তোমরা (বরং) আল্লাহ’র কাছে (তাঁর বিধান মতো চলার) ফজল (আমলের তৌফিক) চাও। নিশ্চই আল্লাহ সব কিছুর ব্যাপারে পূর্ণজ্ঞান রাখেন”। [সূরা নিসা ৩২]

এই আয়াতের শানে-নুজুল প্রসঙ্গে হযরত মুজাহিদ রহ. থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, উম্মে সালমাহ রা. (একবার রাসুলুল্লাহ ﷺ-কেঁ) জিজ্ঞেস করলেন-  يَا رَسُولَ اللَّهِ ، أَيَغْزُو الرِّجَالُ وَلَا نَغْزُو وَلَا نُقَاتِلُ فَنُسْتَشْهَدُ وَإِنَّمَا لَنَا نِصْفُ الْمِيرَاثِ . فَأَنْزَلَ اللَّهُ { وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ } . اخرجه الحاكم في المستدرك على الصحيحين: ٢/٣٠٥ و قال الذهبي قي التلخيص : على شرط البخاري ومسلم ; و اخرجه ايضا غيره ; و صححه أحمد شاكر في عمدة التفسير: ١/٤٩٥ و في حاشية تفسير ابن جرير: ٨/٢٦٣ , و الالباني في صحيح الترمذي  – “ইয়া রাসুলাল্লাহ! পুুরুষরা গাজওয়া (জিহাদ) করে, আমরা (নারীরা) কি গাজওয়া (জিহাদ) করবো না, কিতাল (সমর যুদ্ধ) করবো না ?! তাছাড়া সাক্ষ্য দান এবং মিরাছের ক্ষেত্রেও আমাদের জন্য (বিধান রাখা) রয়েছে (মুসলীম পুরুষগণের) অর্ধেক’! তখন আল্লাহ (তাআলা কুরআন কারিমের এই আয়াতটি) নাজিল করেন- وَ لَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍআর তোমরা ওই বিষয়ের তামান্না (আকাঙ্খা পোষন) করো না, যা দিয়ে (তোমাদের প্রভু) আল্লাহ (তাআলা তাঁর বান্দাদেরই মধ্যে) কতক’কে কতকের উপরে ফজিলত (শ্রেষ্ঠত্ব) দান করেছেন”। [মুসতাদরাকে হাকিম– ২/৩০৫ হাদিস ৩১৯৫; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩০২২; মুসনাদে আহমদ- ৬/৩২২; তাফসিরে আব্দুর রাজ্জাক- ১/১৫৬; মুসনাদে ইসহাক বিন রাহওয়াইহ- ১৮৭০; তাফসিরে তাবারী– ৮/২৬৩ আছার ৯২৩৬, ৯২৩৭, ৯২৪১; তাফসিরে ইবনু আবি হাতিম- ৩/৫২২৪; মাআলিমুত তানযিল, ইমাম বগভী- ২/২০৪; আদ-দুররুল মানসুর, সুয়ূতী- ২/২৬৬]

উপরোক্ত এই হাদিসটি একথার পরিষ্কার দলিল যে, সুরা নিসার’র ৩২ নং আয়াতটি নাজিল হওয়ার আগেও কুরআনের যতগুলো আয়াতে ‘আল্লাহ’র রাস্তায় ক্বিতাল/সশস্ত্র-জিহাদ করা’র নির্দেশ বা উৎসাহ দেয়া হয়েছে, তার সবগুলোই কেবলমাত্র মুসলীম পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করে করা হয়েছিল; মুসলীম নারী’দেরকে নয়। আর এ বিষয়টি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগের মুসলীম নারী পুরুষ উভয়েরই জানা ছিল। একথা উম্মে সালমাহ রা.-এর প্রশ্ন থেকেও বোঝা যায় যে, তারা মুসলীম নারীরাও মাসআলাহ’টি জানতেন। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন- يَا رَسُولَ اللَّهِ ، أَيَغْزُو الرِّجَالُ وَلَا نَغْزُو وَلَا نُقَاتِلُ – ইয়া রাসুলাল্লাহ! পুুরুষরা জিহাদ করে, আমরা (নারীরা) কি গাজওয়া (জিহাদ) করবো না, কিতাল (যুদ্ধ) করবো না ?। এ প্রশ্নের জবাবে খোদ্ আল্লাহ তাআলা সুরা নিসা’র উপরোক্ত ৩২ নং আয়াতটি নাজিল করার মাধ্যমে বিষয়টিকে আরো জোরালো করে দিলেন যে, সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তাআলা ‘জিহাদের গুরুদায়িত্ব খানি অর্পনের প্রশ্নে’ মুসলীম নারীদের উপরে মুসলীম পুরুষদেরকে যে ফজিলত (শ্রেষ্ঠত্ব) দিয়েছেন, সেটা তিঁনি তার মহাজ্ঞান অনুসারেই দিয়েছেন, আর দিয়ে যথাযথ কাজই করেছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর পক্ষ থেকে “নেতিবাচক” জবাব আসার পরও কোনো মুমিনা নারীর জন্য এই আকাঙ্খা ব্যাক্ত করা সমীচীন নয় যে, ‘তার উপরেও কেনো পুরুষের সমপর্যায়ের দায়িত্ব চাপানো হল না’।

একই বিষয়বস্তুর সমর্থন উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা.-এর একটি সহিহ হাদিস থেকেও হয়। আয়েশা বিনতে ত্বলহাহ রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা সিদ্দিকাহ রা. বলেন- قُلتُ يا رَسولَ اللَّهِ، ألَا نَغْزُو ونُجَاهِدُ معكُمْ؟ فَقالَ: لَكُنَّ أحْسَنَ الجِهَادِ وأَجْمَلَهُ الحَجُّ، حَجٌّ مَبْرُورٌ، فَقالَتْ عَائِشَةُ فلا أدَعُ الحَجَّ بَعْدَ إذْ سَمِعْتُ هذا مِن رَسولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ . رواه البخاري في الصحيح , كتاب جزاء الصيد , باب حج النساء: رقم ١٨٦١ ، و البيهقى : ٤/٣٢٦، و أحمد في مسنده : ٦/٧٩ – “আমি (একবার রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে) জিজ্ঞেস করলাম: ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! (মুসলীম পুরুষদের মতো) আমরা (নারীরাও) কি আপনার সঙ্গি হয়ে গাজওয়া করবো না, জিহাদ করবো না’? রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: ‘বরং তোমাদের নারীদের জন্য সর্বোত্তম ও সুন্দরতম জিহাদ হল হজ্জ; হজ্জে মাবরুর (কবুলযোগ্য হজ্জ)’। আয়েশা রা. বলেন: ‘আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকে একথা শোনার পর হতে কখনো হজ্জ ত্যাগ করিনি”। [সহিহ বুখারী, হাদিস ১৮৬১; মুসনাদে আহমদ- ৬/৭৯; সুনানুল কুবরা, ইমাম বাইহাকী- ৪/৩২৬] 

অন্য রেওয়ায়েতে এভাবে এসেছে যে, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন- قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ عَلَى النِّسَاءِ جِهَادٌ قَالَ ‏ :‏ نَعَمْ عَلَيْهِنَّ جِهَادٌ لاَ قِتَالَ فِيهِ الْحَجُّ وَالْعُمْرَةُ ‏. أخرجه ابن ماجه في سننه , كتاب المناسك , باب الحج جهاد النساء : رقم ٢٩٠١ ; و أحمد في مسنده : ٦/١٦٥ ; و ابن خزيمة في صحيحه , كتاب المناسك , باب الدليل على أن جهاد النساء الحج و العمرة : رقم ٣٠٧٣ ; و ابن حبان في صحيحه: رقم ٣٧٠٢ ; و الدار قطني في سننه: ٣/٣٤٥ ; صححه النووي في المجموع شرح المهذب : ٤/٧ , و ابن القيم في تهذيب السنن : ٥/٢٤٩ , و ابن الملقن في البدر المنير: ٩/٣٦ و في تحفة المحتاج : ٢/١٢٦ , و ابن كثير في إرشاد الفقيه : ١/٣٠٠ ; و الالباني في صحيح سنن ابن ماجه : ٣/١٠ و في الإرواء : ٩٨١    – “আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম: ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! নারীদের উপরে জিহাদ আছে কি’? তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ (আছে বৈকি, তবে) তাদের উপরে এমন জিহাদ আছে, যার মধ্যে কোনো যুদ্ধ নেই। (আর সেটা হল) হজ্জ ও উমরাহ”। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৯০১; মুসনাদে আহমদ- ৬/১৬৫; সহিহ ইবনে খুযাইমাহ, হাদিস ৩০৭৩; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৩৭০২; সুনানে দ্বারাকুতনী– ৩/৩৪৫]

এই হাদিসে আয়েশা রা.-এর প্রশ্ন – يَا رَسُولَ اللَّهِ عَلَى النِّسَاءِ جِهَادٌ   – ((ইয়া রাসুলাল্লাহ! নারীদের উপরে জিহাদ আছে কি’?))  -এটা একথারই দলিল যে, সে সময়কার মুসলীম নারীগণ জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ক্বিতাল/জিহাদের ফরয দায়িত্বটা পুরুষদের উপরেই দিয়েছেন; মুসলীম নারীদের উপরে নয়। তবুও নারীরা ‘জিহাদের বিরাট ফজিলত’ এবং এর দ্বারা শহিদ হওয়ার মতো আল্লাহ’র দরবারে বিরাট মর্যাদা লাভের সুবর্ণ সুযোগ দেখে রীতিমতো পুরুষদের উপরে ঈর্ষাহ্নিত হতেন যে, ‘হায়, পুরুষদের মতো আমরা নারী’রাও যদি জিহাদে শরিক হওয়ার সুযোগ পেতাম’। মূলত: মনের এই রকম বাসনা থেকেই হযরত উম্মে সালমাহ রা. এবং হযরত আয়েশা রা. জিহাদের ব্যাপারে উপরোক্ত প্রশ্নটি করেছিলেন।

ছাবেত রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আনাস বিন মালেক রা. বলেন- أَنَّ أُمَّ سُلَيْمٍ اتَّخَذَتْ يَوْمَ حُنَيْنٍ خِنْجَرًا ، فَكَانَ مَعَهَا ، فَرَآهَا أَبُو طَلْحَةَ ، فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، هَذِهِ أُمُّ سُلَيْمٍ مَعَهَا خِنْجَرٌ ، فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَا هَذَا الْخِنْجَرُ ؟ قَالَتْ : اتَّخَذْتُهُ إِنْ دَنَا مِنِّي أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ، بَقَرْتُ بِهِ بَطْنَهُ ، فَجَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَضْحَكُ  . رواه مسلم في صحيحه , كتاب الجهاد والسير , باب غزوة النساء مع الرجال : رقم ١٨٠٩، و أحمد في مسنده : ٣/١٩٠، و ابن سعد في الطبقات : ٨/٤٢٥   – “হুনায়েনের (যুদ্ধের) দিন (আমার মা) উম্মে সুলাইম (তার হাতে একটি) খঞ্জর ধরে রেখেছিলেন। সেটা তার সাথেই ছিল। পরে সেটাকে আবু ত্বালহা দেখে ফেলেন। ফলে তিনি বলেন: ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই যে উম্মে সুলাইম; (দেখুন) তার কাছে খঞ্জর (দেখা যাচ্ছে)’। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন: ‘(ব্যাপারটা কি! তোমার হাতে) এই খঞ্জর কিসের (জন্য)’? উম্মে সুলাইম বললেন: ‘(ইয়া রাসুলাল্লাহ) আমি এটা (এজন্য) রেখেছি (যে), যদি কোনো মুশরেক আমার দিকে এগিয়ে আসে, তাহলে আমি এটি দিয়ে তার পেট চিড়ে ফেলবো’। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ (তার এমন জবাব শুনে) হেসে দিলেন”। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮০৯; মুসনাদে আহমদ- ৩/১৯০; আত-ত্ববাক্বাত, ইবনে সা’দ- ৮/৪২৫] 

এই হাদিসটিও একথার স্পষ্ট দলিল যে, সে সময়কার মুসলমান নারী পুরুষ উভয়েই জানতেন যে, ক্বিতাল/জিহাদের ফরয দায়িত্ব মুসলমান পুরুষদের উপরে অর্পিত রয়েছে; মুসলীম নারীদের উপরে নয়। কারণ, মুসলীম নারীদের উপরে যদি সশস্ত্র জিহাদ ফরয হতই, তাহলে হযরত আবু ত্বালহা রা. কক্ষোনই উম্মে সুলাইম রা.-এর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এই অভিযোগ উতত্থাপন করতেন না যে- يَا رَسُولَ اللَّهِ ، هَذِهِ أُمُّ سُلَيْمٍ مَعَهَا خِنْجَرٌ – “((ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই যে উম্মে সুলাইম; (দেখুন) তার কাছে খঞ্জর (দেখা যাচ্ছে))’’, একই ভাবে আবু ত্বালহা’র অভিযোগ শুনে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ উম্মে সুলাইমের কাছে অবাক ভরে এই প্রশ্নও করতেন না যে- مَا هَذَا الْخِنْجَرُ ؟ –  “(ব্যাপারটা কি! তোমার হাতে) এই খঞ্জর কিসের (জন্য)”? কেননা, মুজাহিদ-তো জিহাদের ময়দানে যুদ্ধ করার জন্য ধারালো অস্ত্র সাথে রাখবেই, যাতে তা দিয়ে দুশমনের মুকাবেলা করা যায় এবং প্রয়োজনে তাকে হত্যাও করা যায়। কিন্তু উম্মে সুলাইম রা. নারী হয়েও সঙ্গে ধারালো অস্ত্র রেখেছেন বিধায় আবু ত্বালহা রা. এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক ‘অভিযোগ ও প্রশ্ন’ উত্থাপিত হওয়ার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শরীয়তে ক্বিতাল/জিহাদের ফরয দায়িত্ব’টা মূলত: মুসলমান পুরুষদের উপরে আরোপিত; মুসলীম নারীদের উপরে নয়। [তবে, হাদিসটি থেকে এও প্রমাণিত হয় যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জামানায় মুসলীম নারীদের কেউ কেউ পুরুষ মুজাহিদগণের কাফেলায় শামিল হয়ে জিহাদে যেতেন। কিন্তু আমরা নিম্নে এব্যাপারে কিছু রেওয়ায়েত বর্ণনা করবো যে, নারীরা যুদ্ধ করার জন্য ওসব কাফেলায় শরিক হতেন না, বরং যুদ্ধ ময়দান থেকে দূরে তাবুতে অবস্থান করতেন এবং আহত মুজাহিদগণের সেবাযত্ন, পানি পান করানো, নিহতদেরকে মদিনায় প্রেরন ইত্যাদি বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সাহায্য সহযোগীতা করতেন]

আবু হুরায়রাহ রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- جِهَادُ الْكَبِيرِ وَالضَّعِيفِ وَالْمَرْأَةِ الْحَجُّ وَالْعُمْرَةُ . رواه النسائي في سننه , كتاب الحج ، باب فضل الحج : ٥/١١٤ رقم ٢٦٢٦ ; و قد حَسّن الإمام الحافظ المُنذري إسناده في الترغيب والترهيب : ٢/١٠٩ ; و قال الإمام بدر الدين العيني في عمدة القاري : ٩/١٩٣ : بسند لا باس به , و قال الحافظ ابن حجر في موافقة الخبر الخبر:٢/٣٠ : إسناده صحيح مرفوعاً ; و اخرجه ايضا أحمد في مسنده : ١٠/٢٧٢ رقم ٩٤٥٩ ; و الطبراني في الاوسط : ٦/٢٧٢ رقم ٨٧٥١ ; و البيهقي في سننه : ٤/٣٠٠ و ٩/٢٣ – “বৃদ্ধ, দূর্বল (ব্যাক্তি) এবং নারী’র জিহাদ হল হজ্জ ও উমরাহ”। [সুনানে নাসায়ী,- ৫/১১৪ হাদিস ২৬২৬; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী– ৪/৩০০, ৯/২৩; আল-মু’জামুল আউসাত, ত্বাবরাণী- ৬/২৭২ হাদিস ৮৭৫১; মুসনাদে আহমদ- ১০/২৭২ হাদিস ৯৪৫৯ ] অন্য রেওয়ায়েতে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে-  ليس على النساء غزو ولا جمعة ولا تشييع جنازة . رواه الطبراني في المعجم الصغير: ٢/١٥٢، ضعفه الالباني في ضعيف الجامع الصغير: رقم ٤٨٩٧  – ‘নারীর দায়িত্বে না আছে জীহাদ, না জুমআ(র নামায), আর না জানাযার পিছে পিছে চলা’। [আল-মু’জামুস সাগীর, ইমাম ত্বাবরাণী- ২/১৫২; তারিখে বাগদাদ, খতীব- ১৬/৬২৯; কানজুল উম্মাল- ৮/২৬৪]

পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু আয়াত এবং বিখ্যাত মুফাসসিরীনে কেরামের তাফসির সমূহ থেকেও নারী’র জিহাদে অংশগ্রহন ফরয না হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। যেমন, আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেন-

لَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالْمُتَّقِينَ – إِنَّمَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْبِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ – وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً وَلَٰكِن كَرِهَ اللَّهُ انبِعَاثَهُمْ فَثَبَّطَهُمْ وَقِيلَ اقْعُدُوا مَعَ الْقَاعِدِينَ – لَوْ خَرَجُوا فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ
“(হে আমার নবী, মুহাম্মাদ! তুমি লক্ষ্য করবে), যারা (খাঁটি ভাবে আন্তরিকতার সাথে) ইমান এনেছে আল্লাহ’র প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি, তারা তাদের জান ও মাল দিয়ে (ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে) জিহাদ করা থেকে (অব্যহতি লাভের জন্য) তোমার কাছে (কখনই) অনুমতি চাবে না। আর আল্লাহ -মুত্তাকীগণকে ভাল করেই জানেন। (তুমি দেখবে), যারা আল্লাহ’র প্রতি এবং আখেরাতের প্রতি (খাঁটি ভাবে আন্তরিকতার সাথে) ইমান আনেনি, বরং তাদের অন্তরগুলো (এখনো) সন্দেহে পড়ে আছে, যার কারণে তারা তাদের সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে দোদুল্যমান (অবস্থায়) রয়েছে, কেবলমাত্র তারাই (নিজেদের জান ও মাল দিয়ে ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা থেকে অব্যহতি লাভের জন্য) তোমার কাছে অনুমতি চাবে। বস্তুত: তারা যদি (জিহাদে) বের হওয়ার (পাক্কা) এরাদা/ইচ্ছা করতোই, তাহলে তো তারা তার জন্য অবশ্যই (আগে ভাগেই) বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে রাখতো। কিন্তু (তাদের অন্তরের কলুষ নিয়তের কারণে পবিত্র জিহাদের ময়দানে) তাদের অভিযাত্রাকে (তোমার প্রভু) আল্লাহ’ই পছন্দ করেন নি। ফলে তিঁনি তাদেরকে (জিহাদে বের হওয়া থেকে) বিরত রাখলেন এবং তাদেরকে বলা হল: ‘তোমরা (গৃহে) উপবেশনকারীদের সাথে বসে থাকো’; (তোমাদের জিহাদের মাঠে গিয়ে কাজ নেই)’। (শোনো), তারা যদি তোমাদের মাঝে বের হত, তাহলে তারা তোমাদের মধ্যে কেবল অনিষ্ট-বিভ্রান্তি-বিশৃঙ্খলাই বৃদ্ধি করতো, (যাতে তোমাদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের মাঝে ফাটল সৃষ্টি হয়), এবং তোমাদের মাঝে ফিতনা লাগানোর মতলবে তারা অবশ্যই তোমাদের সারি গুলোর মধ্যে ছোটাছুটি করতো। আর (এও জেনে রোখো যে), তোমাদের মাঝে তাদের জন্য কানপাতা লোকজনও রয়েছে। আর আল্লাহ -মজালেমদেরকে ভাল করেই জানেন। ”। [সূরা তাওবা ৪৪-৪৭]
 
এই আয়াতে কারিমার মধ্যে- مَعَ الْقَاعِدِينَ – “(গৃহে) উপবেশনকারীদের সাথে (বসে থাকো)”-এর একটি অর্থ হল ‘মুসলীম নারীগণ’। যেমন: এর তাফসীরে ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (মৃ: ৩১০ হি:) রহ. এবং ইমাম মাক্কী বিন আবি ত্বালিব (মৃ: ৪৩৭ হি:) রহ. বলেন- يعني: اقعدوا مع المرضى والضعفاء الذين لا يجدون ما ينفقون، ومع النساء والصبيان – “এর অর্থ হল, তোমরা -অসুস্থ্য ব্যাক্তিবর্গ, দূর্বল ব্যাক্তিবর্গ, যারা (জিহাদের ব্যয়ভার বহন করার মতো) খরচপাতি (যোগার করতে) পায় না, নারী মহল এবং শিশু’দের সাথে (গৃহে বসে থাকো)”। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১০/১৮৬; আল হিদায়াহ ইলা বুলুগিন নিহায়াহ, ইমাম মাক্কী- ৩/২৮২] ইমাম কুরতুবী (মৃ: ৬৭১ হি:) রহ. বলেছেন- أي مع أولى الضرر والعميان والزمني والنسوان والصبيان – “এর অর্থ হল, আহত, অন্ধ,……, নারী মহল এবং শিশুদের সাথে (গৃহে বসে থাকো)”। [আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ৮/১৫৬] শায়েখ সা’দী (মৃ: ১৩৭৬ হি:) রহ. বলেছেন- من النساء والمعذورين – “(এর অর্থ হল), নারী মহল এবং যাদের (জিহাদে না যাওয়া শরয়ী) ওজর (অপারগতা/অসামর্থতা) আছে (তারা)”। [তাইসিরুল কারীম, শায়েখ সা’দী- ১/৩৩৯]

আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন-

وَ إِذَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ أَنْ آمِنُوا بِاللَّهِ وَ جَاهِدُوا مَعَ رَسُولِهِ اسْتَأْذَنَكَ أُولُو الطَّوْلِ مِنْهُمْ وَ قَالُوا ذَرْنَا نَكُن مَّعَ الْقَاعِدِينَ  – رَضُوا بِأَن يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطُبِعَ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ
“(৮৬) আর (হে নবী মুহাম্মাদ!) যখন (এ আদেশ সহকারে) কোনো সুরা নাজিল হয় যে, ‘তোমরা আল্লাহ’র প্রতি ইমান আনো এবং তাঁর রাসুলের সাথে থেকে (ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে) জিহাদ করো’, (তখন তুমি দেখবে যে), তাদের মধ্য থেকে উলুত্ব-ত্বাওল (শক্তি সামর্থবান বা স্বচ্ছল/ধ্বনী লোকেরা) তোমার কাছে (বিভিন্ন ঠুনকো অযুহাতে জিহাদে অংশ গ্রহন করা থেকে) অব্যহতি চাচ্ছে। আর তারা বলে, (দেখুন আমাদের অমুক অমুক সমস্যা আছে, এযাত্রায়) আমাদেরকে (যোদ্ধাদের লিষ্ট থেকে) বাদ রাখুন, আমরা (গৃহে রয়ে যাওয়া নারী, শিশু ও অক্ষম) উপবেশনকারীদের সাথে থাকবো। (৮৭) তারা (জিহাদে বের না হয়ে বরং) পিছনে রয়ে যাওয়াদের সাথে থাকা’তেই খুশি হল। বস্তুত: (তাদের মুনাফেকির কারণে) তাদের অন্তরগুলোর উপরে মোহর লেগে গেছে, কাজেই তারা উপলব্ধি করতে পারবে না (যে তারা আখেরাতে কি পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখিন হওয়ার উপক্রম হল)”। [সূরা তাওবা ৮৬, ৮৭]
 
উপরের আয়াতে বর্ণিত- رَضُوا بِأَن يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ – “তারা (জিহাদে বের না হয়ে বরং) পিছনে রয়ে যাওয়াদের সাথে থাকা’তেই খুশি হল-এই আয়াতাংশের মধ্যে উল্লেখীত আরবী শব্দ الْخَوَالِفِ – (পিছনে রয়ে যাওয়াদের)-এর এক তাফসীর হল- ‘মুসলীম নারীগণ’। যেমন: -এর তাফসীরে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন- النساء – (নারীগণ)। এই একই তাফসীর ইবন আতিয়াহ, মুজাহিদ, কাতাদাহ, জিহহাক, ইকরিমাহ, হাসান বসরী, আব্দুর রহমান ইবন জায়েদ, সুদ্দী রহ. প্রমুখ থেকেও বর্ণিত হয়েছে। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৪১৩, ৪১৪ আছার ১৭০৬৪-১৭০৭২; তাফসীরে ইবনু আবি হাতিম- ১/১৮৫৯ আছার ১০২০৪, ১০২০৫; ফাতহুল কাদীর, শাওকানী- ২/৩৯০] ইমাম মাক্কী বিন আবি ত্বালিব (মৃ: ৪৩৭ হি:) রহ. এর তাফসিরে বলেন- مع النساء اللواتي لا فرض عليهن في الجهاد – “(ওইসকল) নারীদের সাথে -যাদের উপরে (স্বাভাবিক অবস্থায়) জিহাদে যাওয়া ফরয নয় (তাদের সাথে গৃহেই রয়ে যাওয়াকেই তারা পছন্দ করে নিলো)”। [আল হিদায়াহ ইলা বুলুগিন নিহায়াহ, ইমাম মাক্কী- ৩/৩১৫] ইমাম ইবনে কাছির (মৃ: ৭৭৪ হি:) রহ. এর তাফসিরে বলেন- ورضوا لأنفسهم بالعار والقعود في البلد مع النساء – وهن الخوالف – بعد خروج الجيش – “তারা এলাকায় (রয়ে যাওয়া) নারীদের সাথে (গৃহে) বসে থাকাকেই নির্লজ্জের মতো নিজেদের জন্য পছন্দ করে নিয়েছিল। আর মুজাহিদ বাহিনী (জিহাদের উদ্দেশ্যে) বের হয়ে যাওয়ার পর –(আয়াতে বর্ণিত) الخوالف (পিছনে রয়ে যাতওয়া’রা) হল নারী মহল (যাদের উপরে জিহাদ ফরয ছিলনা বিধায় তারা নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করছিলেন)”। [তাফসিরে ইবনে কাছির- ৪/১৯৬] ইমাম ফখুরুদ্দিন রাযী (মৃ: ৬৭১ হি:) রহ. এর এক তাফসিরে বলেন- عبارة عن النساء اللاتي تخلفن في البيت فلا يبرحن، والمعنى: رضوا بأن يكونوا في تخلفهم عن الجهاد كالنساء – “বক্তব্যটি নারী মহল সম্পর্কে, যারা (তাদের উপরে জিহাদ ফরয না হওয়ার কারণে নিজ নিজ) গৃহে রয়ে গিয়েছিল, সুতরাং, তাদের উপরে (আল্লাহ’র) কোনো গোষ্মা/রাগ নেই। অর্থাৎ, (আল্লাহ তাআলা এখানে মুসলমান নামধারী কিছু পুরুষদেরকে তিরষ্কার করছেন যে), তারা (মূলত:) এতেই রাজি খুশি হয়ে রইলো যে, তারা নারীদের মতো জিহাদ থেকে পিছনে রয়ে গেলো”। [মাফাতিহুল গাইব, ইমাম রাযী- ১৬/১৫৭] ইমাম কুরতুবী (মৃ: ৬৭১ হি:) রহ. এর তাফসিরে বলেন- أي مع النساء والصبيان وأصحاب الأعذار من الرجال– “অর্থাৎ, নারী মহল, শিশু বাচ্চারা এবং পুরুষদের মধ্যে যারা ওজরযোগ্য (যাদের উপরে মূলত: জিহাদ ফরয ছিল না) -তাদের সাথে (গৃহে বসে থাকাকেই এসব নামধারী মুসলমান পুরুষগুলি পছন্দ করে নিলো)”। [আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ৮/২২৩] 
 
সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. সহ উপরোল্লখীত মুফাসসির’গণের এসকল তাফসির একথার দলিল যে, জিহাদের সময় -মুসলীম নারীগণ তাদের গৃহেই অবস্থান করবেন -এটাই শরীয়তের স্বাভাবিক বিধান, অপর দিকে মুসলীম পুরুষগণ ময়দানে জিহাদের ফরয দায়িত্ব আঞ্জাম দিবেন -এটাই আল্লাহ’র আহবান। কিন্তু কিছু মুসলীম নামধানী পুরুষ যখন কোনো যথাযোগ্য কারণ ছাড়াই জিহাদের ফরয দায়িত্ব পালনার্থে বের না হয়ে বরং বাড়িতে রয়ে যাওয়া নারী মহল, শিশু বাচ্চা, মাজুর (অপারগ/অসমর্থ ব্যাক্তি) ও দূর্বল মুসলমানদের সাথে থাকাকেই পছন্দ করে নিলো, তখনই সেই পুরুষগুলো আল্লাহ’র তিরষ্কারের মুখোমুখি হল। এ থেকে প্রমাণিত হয়, জিহাদ ও ক্বিতালের ফরয দায়িত্ব পালন করার মূল আহাল (উপযুক্ত ব্যাক্তি) হল ‘মুসলীম পুরুষ(গণ)’; নারী(গণ) নয়। 
 
উপরের এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে একথাও প্রমাণিত হল যে, কুরআন কারিমের যেসকল স্থানে ‘মুমিন’ বা ‘মুসলীম’(দের)কে সম্মোধন করে ‘জিহাদ ও ক্বিতাল’-এর জন্য ময়দানে বের হওয়ার ডাক দেয়া হয়েছে, উৎসাহ দেয়া হয়েছে জিহাদ গিয়ে শহিদ হওয়ার, সেসকল স্থানে মূল লক্ষ্যবস্তু হল ‘মুমিন/মুসলীম পুরুষ’(গণ)।  এজন্যই ইমাম শাফেয়ী (মৃ: ২০৪ হি:) রহ. বলেছেন- و قد قال لنبيه صلى الله عليه وسلم ” حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ ” فدل على أنه أراد بذلك الذكور دون الإناث لأن الإناث المؤمنات . و قال عز و جل “وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً ” وقال ” كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ ” وكل هذا يدل على أنه أراد به الذكور دون الإناث– “আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন- حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ – “(হে নবী) তুমি মু’মিনুন (তথা মুমিনদের)কে (আল্লাহ’র পথে) ক্বিতালের জন্য উৎসাহিত করো”। এ আয়াতটি প্রমাণ করে যে, এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা’র উদ্দেশ্য হল (মু’মিন) পুরুষগণ; -নারী’গণ নয়। কেননা (আরবী সম্মোধন অনুযায়ী) নারীরা  হল ‘মু’মিনাত’; (অপরদিকে এই আয়াতে পুরুষ’দেরকে সম্মোধন করে বলা হয়েছে ‘মুমিনুন’)। (তেমনি ভাবে) আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন- وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً – “মুমিনগণের জন্য সমিচিন নয় যে, তারা সকলে (মিলে একই সাথে জিহাদের উদ্দেশ্যে) বেরিয়ে পড়বে” । তিঁনি আরো এরশাদ করেন- كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ -“(হে মুসলমানগণ) তোমাদের উপরে ক্বিতাল (সমর জিহাদ)’কে বিধিবদ্ধ (ফরয) করে দেয়া হল”। এসকল আয়াতের সবগুলোই প্রমাণ করে যে, এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা’র উদ্দেশ্য হল (মু’মিন) পুরুষগণ; -নারী’গণ নয়”। [কিতাবুল উম্ম, ইমাম শাফেয়ী- ৪/১৭০]
 
এসকল দলিলাদির ভিত্তিতে ফিকাহবিদ আলেমগণ এব্যাপারে একমত যে, স্বাভাবিক অবস্থায় মুসলীম নারীদের উপরে ক্বিতাল/জিহাদ ফরয নয়। যেমন-
 
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ বিন মুনাসিফ আল-কুরতুবী (মৃ: ৬২০ হি:) রহ. বলেন- و اتفقوا كذلك أنّ المرأة ومن لم يبلغ ، والمريض الذي لا يستطيع القتال لا جهادَ فرضاً عليه  – “…..এমনি ভাবে আলেমগণ এব্যাপারে একমত যে, নারী, যে (এখনও) বালেগ (প্রাপ্তবয়ষ্ক) হয়নি এবং ওই রোগী যে ক্বিতাল করার শক্তি-সামর্থ রাখে না, তার উপরে জিহাদ ফরয নয়”। [আল-ইনজাদ ফি আবওয়াবিল জিহাদ, ইমাম ইবনু মুনাসিফ- ১/৫০] 
 
ইমাম আলাউদ্দিন আবু বকর আল-কাসানী আল-হানাফী (মৃ: ৫৮৭ হি:) রহ. বলেন- لا جهادَ على الصبي والمرأة لأنّ بنيتهما لا تحتملُ الحربَ عادة – “(না-বালেগ) কিশোর বালক এবং নারী’র উপরে জিহাদের দায়িত্ব নেই। কেননা তাদের উভয়ের মাঝে যুদ্ধের আদত (সৃষ্টিগত দৈহিক উপযোগীতা বিদ্যমান) নেই…..”। [আল-বাদায়েউস সানায়ে, ইমাম কাসানী- ৯/৩৭৭] 
 
ইমাম মহিউদ্দিন আন-নববী আল-শাফেয়ী (মৃ: ৬৭৬ হি:) রহ. বলেন- و لا جهاد على صبي ومجنون و امرأة ….. – “(না-বালেগ) কিশোর বালক, পাগল এবং নারী’র উপরে জিহাদের দায়িত্ব নেই…..”। [আল-মিনহাজ, ইমাম নববী- ১/১৪৩; তুহফাতুল মুহতাজ, ইমাম হাইতামী- ৯/২৩১] 
 
ইমাম ইবনুন নাহহাশ আদ-দিমাশকী আল-মালেকী (মৃ: ৮১৪ হি:) রহ. বলেন- و لا يجب الجهاد على صبي ومجنون وامرأة …. وما أظن فيه خلافاً – “(না-বালেগ) কিশোর বালক, পাগল এবং নারী’র উপরে জিহাদ অত্যাবশ্যক (ফরয) নয়। ….. আর এ ব্যাপারে এর বিপরীত কোনো মত আমার জানা নেই”। [আল-মাশারিঊল আশওয়াক্ব, ইবনুন নাহহাশ- ১/৯৯] 
 
এ সম্পর্কে আইম্মাগণের আরো ফাতাওয়া জানতে দেখুন: [আল-মুহাযযাব মাআল মাজমু’- ১৯/২৭০; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৬/৭৬; আল-মুগনী, ইবনে কুদামাহ- ৯/১৬২; আল-কাফী, ইবনু কুদামাহ- ৪/২৫৩; হাশিয়ায়ে দুসুকী- ২/১৭৫; হাশিয়ায়ে আদাউই আলা শারহি কিফায়া- ২/৪]
 
বিশেষ দ্রষ্টব্য: তবে একথা ঠিক যে, বিভিন্ন রেওয়ায়েত থেকে এও প্রমাণিত হয় যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর জামানায় কিছু কিছু মুসলীম নারী’কে জিহাদের কাফেলায় শরিক করা হয়েছিল। বস্তুত: তারা মূল রনক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে শরিক হয়ে যুদ্ধ করতেন না, বরং তারা রনক্ষেত্র থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরে অবস্থান করতেন এবং আহত মুজাহিদগণের সম্ভাব্য সেবা পরিচর্যা করা, পিপাসার্তদেরকে পানি সরবরাহ করা এবং শহিদগণকে মদিনায় পৌছানোর কাজে সহায়তা করতেন। আর সেই নারীরা মূল জিহাদী দায়িত্ব পালন করতেন না বিধায় তাদেরকে পুরুষ যোদ্ধাদের মতো জিহাদ লব্ধ গণীমতের শরীয়ত-নির্ধারিত অংশ দেয়া হত না, বরং পুরুষ্কার স্বরূপ কিছু দেয়া হত মাত্র। যেমন-
 
জা’ফর বিন মুহাম্মাদ রহ. থেকে তার পিতা মুহাম্মাদ রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ইয়াযিদ বিন হুরমুয রহ. বলেন- أَنَّ نَجْدَةَ ، كَتَبَ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ يَسْأَلُهُ ، عَنْ خَمْسِ خِلَالٍ ، فَقَالَ : ابْنُ عَبَّاسٍ : لَوْلَا أَنْ أَكْتُمَ عِلْمًا مَا كَتَبْتُ إِلَيْهِ ، كَتَبَ إِلَيْهِ نَجْدَةُ : أَمَّا بَعْدُ ، فَأَخْبِرْنِي هَلْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَغْزُو بِالنِّسَاءِ ؟ وَهَلْ كَانَ يَضْرِبُ لَهُنَّ بِسَهْمٍ ؟ وَهَلْ كَانَ يَقْتُلُ الصِّبْيَانَ ؟ ……. ؟ فَكَتَبَ إِلَيْهِ ابْنُ عَبَّاسٍ : كَتَبْتَ تَسْأَلُنِي هَلْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَغْزُو بِالنِّسَاءِ ؟ وَقَدْ كَانَ يَغْزُو بِهِنَّ ، فَيُدَاوِينَ الْجَرْحَى ، وَيُحْذَيْنَ مِنَ الْغَنِيمَةِ ، وَأَمَّا بِسَهْمٍ فَلَمْ يَضْرِبْ لَهُنَّ ، وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ يَقْتُلُ الصِّبْيَانَ ، فَلَا تَقْتُلِ الصِّبْيَانَ ……... رواه مسلم في صحيحه , كتاب الجهاد والسير, باب النِّسَاءُ الْغَازِيَاتُ يُرْضَخُ لَهُنَّ وَلاَ يُسْهَمُ وَالنَّهْىُ عَنْ قَتْلِ صِبْيَانِ أَهْلِ الْحَرْبِ : رقم ١٨١٢، و أحمد في مسنده : ٤/٢٩١ و قال أحمد شاكر: إسناده صحيح، و أبو داود في سننه : ٢٧٢٧ و ٢٧٢٨ مفرقاً مختصرا، و الترمذي في سننه : ١٥٥٦، و النسائي في سننه : ٤١٣٤ مختصراً، – “নাজদাহ (রহ.-একবার আব্দুলল্লাহ) ইবনে আব্বাস রা.-এর কাছে পাঁচটি প্রশ্ন লিখে পাঠালেন। (উত্তরে) ইবনে আব্বাস রা. বললেন: ‘আমি যদি ইলম গোপন (করার অপরাধের আশংকা) না করতাম, তাহলে (এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই) আমি তাকে লিখে পাঠাতাম না। (রাবী বলেন:) নাজদাহ তাঁকে লিখে পাঠিয়েছিল: ‘আম্মা বা’দ, আমি জানতে চাই, রাসুলুলল্লাহ ﷺ কি মহিলাদেরকে নিয়ে গাজওয়া’য় (জিহাদে) যেতেন? এবং তিঁনি কি তাদেরকে গণীমতের অংশ দিতেন?  তিনি কি (দুশমনদের) বালকদেরকে হত্যা করতেন?………………। তখন ইবনে আব্বাস রা. তাকে লিখলেন: তুমি পত্র লিখে আমার কাছে জানতে চেয়েছো, রাসুলুল্লাহ ﷺ কি নারীদেরকে নিয়ে যুদ্ধে যেতেন? (এর উত্তর হল: হ্যাঁ) তারা তাঁর সাথে যুদ্ধে যেতো। তারা (সেখানে) আহতদের সেবা করতো। (আর এজন্য) তাদেরকে ‘গনীমতের মাল’ থেকে পুরষ্কার (স্বরূপ কিছু) দেয়া হত (বটে), তবে গণীমতের ভাগ সম্পর্কে কথা এই যে, তিনি (গণীমতের নিয়মানুগ অংশে) তাদের জন্য বরাদ্দ রাখতেন না। আর রাসুলুলল্লাহ ﷺ অবশ্যই (দুশমনদের) বালকদেরকে হত্যা করতেন না।………….”[সহীহ মুসলীম, হাদীস ১৮১২; মুসনাদে আহমদ- ৪/২৯১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৭২৭, ২৭২৮; সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৪১৩৪; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ১৫৫৬; মুসনাদে আবু আউয়ানাহ- ৪/৩৩৬ হাদিস ৬৮৯০]

বিনতে সিরীন রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, উম্মে আতিয়াহ রা. বলেন- غَزَوْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعَ غَزَوَاتٍ ، أَخْلُفُهُمْ فِي رِحَالِهِمْ ، فَأَصْنَعُ لَهُمُ الطَّعَامَ ، وَأُدَاوِي الْجَرْحَى ، وَأَقُومُ عَلَى الْمَرْضَى . رواه مسلم في صحيحه , كتاب الْجِهَادِ وَالسِّيَرِ, بَابُ النِّسَاءِ الْغَازِيَاتِ يُرْضَخُ لَهُنَّ وَلَا يُسْهَمُ ، وَ النَّهْيِ عَنْ قَتْلِ : رقم ١٨١٢  – “আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে সাতটি গাজওয়ায় (জিহাদে) শরিক ছিলাম। আমি তাঁদের তাবুর পিছনে অবস্থান করতাম। তাদের জন্য আমি খাবার বানাতাম, আহতদের চিকিৎসা-পরিচর্যা করতাম এবং রোগীদের সেবাশুশ্রূষা করতাম”। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮১২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৫৬; মুসনাদে আহমদ- ৫/৮৪; আল-মু’জামুল কাবির, ত্বাবরাণী- ২৫/৫৬; সুনানুল কুবরা, নাসায়ী, হাদিস ৮৮৮০; মুসনাদে ইসহাক বিন রাহুওয়াইহ- ৫/২১১] 

খালিদ বিন যাকওয়ান রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রুবাইয়্যে’ বিনতে মুয়াওউইয রা. বলেন- كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَسْقِي وَنُدَاوِي الجَرْحَى ، وَنَرُدُّ القَتْلَى إِلَى المَدِينَةِ . اخرجه البخاري في صحيحه : رقم ٢٨٨٢ – “আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে (জিহাদের সফরে) থাকতাম। (সেখানে মুজাহিদগণকে) আমরা পানি সরবরাহ করাতাম, আহতদের চিকিৎসা-সেবা দিতাম এবং মৃত ব্যাক্তিবর্গকে মদিনায় পাঠিয়ে দিতাম”। [সহিহ বুখারী, হাদিস ২৮৮২] 

ছাবেত রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আনাস বিন মালেক রা. বলেন- كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَغْزُو بِأُمِّ سُلَيْمٍ ، وَنِسْوَةٍ مِنَ الْأَنْصَارِ مَعَهُ إِذَا غَزَا ، فَيَسْقِينَ الْمَاءَ ، وَيُدَاوِينَ الْجَرْحَى . رواه مسلم في صحيحه , كتاب الْجِهَادِ وَالسِّيَرِ, بَابُ النِّسَاءِ الْغَازِيَاتِ يُرْضَخُ لَهُنَّ وَلَا يُسْهَمُ ، وَ النَّهْيِ عَنْ قَتْلِ : رقم ١٨١٠  – “রাসুলুল্লাহ ﷺ  -উম্মে সুলাইম ও আনসারী নারীদেরকে তাঁর সাথে জিহাদে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা (সেখানে মুজাহিদগণের কাছে) পানি সরবরাহ করতো এবং আহতদের সেবা করতো”। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৮১০; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৫৩১; মুসনাদে আবু আউআনাহ- ৩/৪৩১ হাদিস ৫৫০৭] 

সুরায়হ বিন উবায়দ আল-হাদরামী রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ বিন কুরত্ব আল-আজদী রহ. বলেন- غَزَوْتُ الرُّومَ مَعَ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ فَرَأَيْتُ نِسَاءَ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ وَ نِسَاءَ أَصْحَابِهِ مُشَمِّرَاتٍ يَحْمِلْنَ الْمَاءَ لِلْمُهَاجِرِينَ يَرْتَجِزْنَ . رواه الإمام سعيد بن منصور في سننه , كتاب الجهاد , باب ما جاء في سهمان النساء : ٢/٢٨٤ رقم ٢٧٨٨ ، و صححه الالباني في الرد المفحم على من خالف العلماء وتشدد وتعصب: ١/١٥٤  – “আমি খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর সাথে থেকে রোম-এর বিরুদ্ধে জিহাদ করেছি। তখন আমি দেখেছি, খালিদ বিন ওয়ালিদের স্ত্রীগণ এবং তাঁর (মুজাহীদ) সাথীদের স্ত্রীগণ প্রচন্ড জোশ সহকারে কবিতা আবৃত্তি করতে করতে মুহাজের’দের জন্য পানি বহন করে নিয়ে আসছিলেন”। [সুনানু ইমাম সাঈদ বিন মানসুর- ২/২৮৪ হাদিস ২৭৮৮; আর-রাদ্দুল মুফহিম, আলবানী- ১/১৫৪]

মাসআলা: উপরে আনাস বিন মালেক রা.-এর সূত্রে বর্ণিত (সহিহ মুসলীম, ১৮০৯ নং) হাদিসে ‘রাসুলুল্লাহ ﷺ উম্মে সুলাইমকে খঞ্জরটি নিজের কাছে রাখতে নিষেধ না করা এবং তাঁর নিছক হাসি হাসা’ -একথারই দলিল বহন করে যে, মুজাহিদগণের সাথে জিহাদে গমনকারী মুসলীম নারীরাও কাফের দুশমনদের থেকে নিজেদেরকে আত্বরক্ষার প্রয়োজনে সাথে অস্ত্র রাখতে পারেন; জায়েয। [ই’লাউস সুনান, জফর আহমদ উসমানী- ১২/২৮] ‍সুতরাং, নারীরা এক্ষেত্রে চাকু, লাঠি, বন্দুক, ইলেকট্রিক শক দিয়ে দেহকে সাময়ীক স্থবির করার হস্ত মেশিন, স্টেনগান ইত্যাদি অস্ত্র সাথে রাখতে পারেন। (প্রয়োজনে এসব ব্যবহার ও চালনা করার দক্ষতাও তারা শিখে রাখবেন)। 

মাসআলা: মনে রাখতে হবে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মুসলীম নারীগণ পুরুষ মুজাহিদগণকে জিহাদের বাহিরে আনুসঙ্গিক বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করতেন বটে, তবে এরকম সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতো পূর্ণাঙ্গ শরয়ী পর্দা’কে সম্ভাব্য মাত্রায় পালন করে। বলা বাহুল্য, আমাদের এই ফিতানর যুগে আজ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগের পর্দা ব্যবস্থার অনুরূপ পর্দা ব্যবস্থার আর নেই। তারপরও জরুরত বসত: কোনো মুসলীম নারীকে যদি জিহাদের ময়দানে কিংবা পরপুরুষের মহলে নিয়ে যেতেই হয়, তাহলে ইসলামী পর্দা ব্যবস্থার পুরোপুরি হক্ব আদায় করেই তাদেরকে নিয়ে যেতে হবে।