যাকাতের মাসআলা মাসায়েল – সোনা রূপা অলঙ্কার গহনা ও নগদ অর্থের নিসাব

Spread the love

যাকাতের মাসআলা মাসায়েল – সোনা রূপা অলঙ্কার গহনা ও নগদ অর্থের নিসাব এবং শর্ত-শরায়েত

    

 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ سَيِّدِنَا مَوْلَانَا مُحَمَّدٍ وَعَليٰ اٰلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ صَلوٰةً تُنَجِّيْنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْأَهْوَالِ وَاْلآفَاتِ وَتَقْضِيْ لَنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْحَاجَاتِ وَتُطَهِّرُنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ السَّيِّاٰتِ وَتَرْفَعُنَا بِهَا عِنْدَكَ اَعْليٰ الدَّرَجَاتِ وَتُبَلِّغُنَا بِهَا اَقْصىٰ الْغَايَاتِ مِنْ جَمِيْعِ الْخَيْرَاتِ فِي الْحَيَاتِ وَبَعْدَ الْمَمَاتِ- اِنَّكَ عَليٰ كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ

[উল্লেখ্য, এখানে উল্লেখিত আয়াত, হাদিস ও ইবারত সমূহ, এসবের অনুবাদ ও বিভিন্ন মাসআলাহ মাসায়েল’কে কোনো বিজ্ঞ মুহাক্কেক আলেমের পরামর্শ ব্যাতীত কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে আমার অযোগ্যতার কারণে এখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করে নেয়ার আগেই মানব সমাজে ছড়িয়ে না যায়। এগুলো পড়ুন ইলম অর্জনের জন্য এবং যোগ্য আলেম থেকে তা বুঝিয়ে নিন। আর কোনো যোগ্য চোখে উল্লেখযোগ্য ভুল ধরা পড়লে তা আমাকে অবগত করুন।]

 

কী কী প্রকারের ধ্বনমালের উপরে যাকাত আদায় ফরয ?

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করছেন- 

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا

(হে নবী! তুমি) তাদের ধ্বনসম্পদ থেকে যাকাত গ্রহন করো, এর দ্বারা (আমা কর্তৃক তাদের কাছে রক্ষিত অভাবীদের হক্বটুকু নিয়ে) তাদেরকে পবিত্র করো এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করো…’। [সূরা তাওবা ১০৩]

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ

“হে মুমিনগণ! তোমরা তৈয়্যেবাত (হালাল/উৎকৃষ্ট/পবিত্র জিনিস সমূহ) থেকে যা উপার্জন করেছো তা থেকে (আমার নির্দেশ মতো) ব্যয় করো এবং (ব্যয় করো) তা থেকে যা আমরা তোমাদের জন্য জমিন থেকে বের করে দিয়েছি”। [সুরা বাকারাহ ২৬৭]

এই আয়াতে – أَنفِقُوا – (তোমরা ব্যয় করো)-এর ব্যাখ্যায় হযরত আলী বিন আবি ত্বালেব রা., ইমাম ইবনে সিরীন, ইমাম উবাইদাহ আস-সালমানী রহ. বলেছেন ‘ফরয যাকাত’। [আল-জামে লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ৩/৩২০] তবে এখানে মূলত: ‘ফরয যাকাত’ এবং ‘নাওয়াফিল দান-সদকাহ’ (তথা ফরয যাকাতের বাহিরে ওয়াজিব ও মুস্তাহাব দান-সদকাহ) উভয়’ই অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। যেমন, ইমাম ইবনে জারির তাবারী রহ. (মৃ: ৩১০ হি:) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন- زكُّوا وتصدقوا – ‘তোমরা যাকাত দাও এবং সদকাহ করো’। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ৫/৫৫৬]

আর مِن طَيِّبَاتِ – {তৈয়্যেবাত থেকে} বলতে মুফাসসীরে কেরাম দুটি অর্থ করেছেন- (১) এর দ্বারা ‘হালাল ধ্বনমাল’ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, ধ্বনমাল স্বয়ং হালাল হতে হবে; হারাম ধ্বনমাল দানযোগ্য নয়। আবার হালাল পন্থায় উপার্জিত ধ্বনমাল হতে হবে; হারাম পন্থায় উপার্জিত ধ্বনমাল দানযোগ্য নয়। (২) ধ্বনমাল ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘উৎকৃষ্ট/উত্তম/পবিত্র মানের ধ্বনমাল ব্যয় করতে হবে; যে ধ্বনমাল পঁচা/নষ্ট/অপবিত্র/অনুত্তম -যা নিজের ক্ষেত্রে কেউ গ্রহন করতে ঘৃনা/অরুচিবোধ/অনিচ্ছা পোষন করে, তা অন্যের জন্য কোন যুক্তিতে ব্যয় করা চলে। [আল-জামে লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ৩/৩২০; তাফসিরুল হিদায়াহ ইলা বুলুগিন নিহায়াহ, মাক্কী- ১/৬৪৫]

আর مَا كَسَبْتُمْ – {তোমরা যা উপার্জন করেছো}-এর ব্যাখ্যায় ইমাম মুজাহিদ রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন- التجارة الحلال – ‘হালাল ব্যবসা (থেকে যাকাত আদায় করো)’। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ৫/৫৫৬ আছার ৬১২৪; তাফসীরুল কুরআন, ইমাম ইবনু আবি হাতিম- ১/৫২৬ আছার ২৭৯৩; তাফসীরে মুজাহিদ- ১/১১৮; আদ-দুররুল মানসুর, ইমাম সয়ূতী- ১/৬০৪] আর উবাদাহ রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- سألت علي بن أبي طالب صلوات الله عليه عن قوله:”يا أيها الذين آمنوا أنفقوا من طيبات ما كسبتم قال من الذهب والفضة – ‘আমি আলী বিন আবি ত্বালেব রা.কে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত – يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ– {হে মুমিনগণ! তোমরা তৈয়্যেব (হালাল/উৎকৃষ্ট/পবিত্র জিনিস) থেকে যা উপার্জন করেছো তা থেকে (আমার নির্দেশ মতো) ব্যয় করো}-এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন: (এর অর্থ হল, তোমরা তোমাদের কর্ম বা ব্যবসা দ্বারা উপার্জনকৃত নগদ সম্পদ) স্বর্ণ ও রৌপ্য থেকে (যাকাত ও সদকাহ আদায় করো)’। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ৫/৫৫৬ আছার ৬১২৬; আল-হিদায়াহ ইলা বুলুগিন নিহায়াহ, মাক্কী- ১/৬৪৪] ইমাম বুখারী রহ. স্বয়ং তাঁর ‘সহিহ বুখারী’তে- بابُ صدقَةِ الكسْبِ والتِّجارة؛ لقوله تعالى: يَا أيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَنْفِقُواْ مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ {অধ্যায়: আয়-উপার্জন ও ব্যবসায়ের যাকাত; কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ -(হে মুমিনগণ! তোমরা তৈয়্যেবাত (হালাল/উৎকৃষ্ট/পবিত্র জিনিস সমূহ) থেকে যা উপার্জন করেছো তা থেকে (আমার নির্দেশ মতো) ব্যয় করো)}- এই অধ্যায় কায়েম করেছেন। [সহিহ বুখারী- ২/৫২৩] এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, ইমাম বুখারী’র মতেও এখানে مَا كَسَبْتُمْ -এর মধ্যে আয়-উপার্জন ও ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।

মূলত: مَا كَسَبْتُمْ – {তোমরা যা উপার্জন করেছো} বলতে মুমিন মুসলমানের উপার্জনকৃত ‘নগদ অর্থকড়ি’ (যেমন স্বর্ণমূদ্রা, রৌপ্যমূদ্রা, নগদ কারেন্সি), ‘ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী’ এবং ‘গবাদীপশু’ -এসব জিনিসই অন্তর্ভূক্ত রয়েছে, (যা থেকে শরীয়ত মোতাবেক যাকাত বা অপরাপর দান-সদকাহ করার বিষয়টি বিবেচ্য হয়)। যেমন, এর ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুফাসসের মাহমুদ আলুসী রহ. (মৃ: ১২৭০ হি:) বলেছেন- أي الذي كسبتموه أو كسبكم أي مكسوبكم من النقد وعروض التجارة و المواشي – ‘অর্থাৎ, তোমরা যা আয়-উপার্জন করেছো বা মুনাফা করেছো। তথা তোমাদের উপার্জনকৃত নগদ অর্থ, ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী ও গবাদীপশু (-এসবের মধ্য থেকে আল্লাহ’র নির্দেশক্রমে শরয়ী চাহিদা মোতাবেক ব্যয় করো)’। [রুহুল মাআনী, আলুসী- ৩/৩৯]

আর وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ – {(ব্যয় করো) তা থেকে যা আমরা তোমাদের জন্য জমিন থেকে বের করে দিয়েছি}-এর ব্যাখ্যায় ইমাম মুজাহিদ রহ. বলেছেন- من ثمر النخل (খেজুর ফল) এবং النَّبْتَ (উৎপন্ন খাদ্যশস্য, শাকসবজী)’[জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ৫/৫৫৭ আছার ৬১৩২, ৬১৩৩; তাফসীরুল কুরআন, ইমাম ইবনু আবি হাতিম- ১/৫২৭ আছার ২৭৯৫]  ইমাম মুকাতিল বিন হাইয়্যান রহ. বলেছেন- يَعْنِي بِهِ: الثِّمارَ، التَّمْرَ والزَّبِيبَ والأعْنابَ والحَبَّ – ‘এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল (জমিন থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন জিনিস, যেমন:) ফলমুল, খেজুর, কিসমিস, আঙ্গুর ও  খাদ্যশস্য-ফসল’। [তাফসীরুল কুরআন, ইমাম ইবনু আবি হাতিম- ১/৫২৭ আছার ২৭৯৬] উবায়দাহ রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- سألت عليا صلوات الله عليه عن قول الله عز وجل: ومما أخرجنا لكم من الأرض، قال: يعني من الحب والثمر وكل شيء عليه زكاة – ‘আমি আলী রা.কে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত – وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ – {(ব্যয় করো) তা থেকে যা আমরা তোমাদের জন্য জমিন থেকে বের করে দিয়েছি}-এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন: এর অর্থ হল, (জমি থেকে উৎপন্ন) খাদ্যশস্য, ফলমুল এবং এমন সবকিছুই (যা জমিন থেকে বের হয়) যার উপরে যাকাত আদায় আবশ্যক হয়’। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ৫/৫৫৭ আছার ৬১৩১]

ইমাম ইবনে জারির তাবারী রহ. (মৃ: ৩১০ হি:) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন- وأنفقوا أيضا مما أخرجنا لكم من الأرض، فتصدقوا وزكوا من النخل والكرم والحنطة والشعير، وما أوجبت فيه الصدقة من نبات الأرض – ‘আমি তোমাদের জন্য জমিন থেকে যা বের করে দিয়েছি তা থেকেও তোমরা (আমার নির্দেশ মোতাবেক) ব্যয় করো। খেজুর, ফলমুল, গম, যব এবং নাবাত (উৎপন্ন খাদ্যশস্য ও ফসল)’র মধ্যে যা কিছুর উপরে যাকাত অপরিহার্য হয় তা থেকে তোমরা (চাহিদা মতো) দান-সদকাহ করো এবং যাকাত দাও’। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ৫/৫৫৭] ইমাম কুরতুবী রহ. (মৃ: ৬৭১ হি:) লিখেছেন- يعنى النبات والمعادن والركاز – “এর অর্থ, নাবাত (উৎপন্ন উৎপন্ন খাদ্যশস্য, ফসল, শাকসবজী) এবং খনিজ পদার্থ ও গুপ্তধ্বন”। [আল-জামে লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ৩/৩২০] ইমাম আবু ‍হাইয়্যান উন্দুলুসী রহ. (মৃ: ৭৪৫ হি:) সহ অনেক মুফাসসীরে কেরাম বলেছেন- يَعْنِي مِن أنْواعِ الحُبُوبِ والثِّمارِ والمَعادِنِ والرِّكازِএর অর্থ, বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যশস্য ও ফলমুল এবং খনিজ পদার্থ ও গুপ্তধ্বন (-এর মধ্য থেকে যা আমি তোমাদের জন্য জমিন থেকে বের করে দিয়েছি)”। [আল-বাহরুল মুহিত, ইমাম আবু হাইয়্যান- ২/৩৩০; সিরাজুম মুনির, খতীব- ১/২০৭; জামেউল বায়ান ফি তাফসিরিল কুরআন, ইমাম শিরাজী- ১/১৯৯; মাদারিকুত তানজীল, ইমাম নাসাফী- ১/১৪৮; ইরশাদুল আকল, আবুস সাউদ- ১/২৬১]

কুরআন সুন্নাহ’র দলিলাদি দেখলে দেখা যায়, ইসলামী শরীয়তে মুসলমানদের ধ্বনমাল থেকে যাকাত বাবদ নিম্নোক্ত প্রকারের ধ্বনমাল গ্রহন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যথা:-

(১) নগদ সম্পদ (স্বর্ণমূদ্রা, রৌপ্যমূদ্রা, নগদ অর্থ)

(২) ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী

(৩) বিচরনশীল গবাদীপশু (উট, গুরু-মহিষ, ছাগল)

(৪) জমি থেকে উৎপন্ন খাদ্যশস্য, ফসলা, ফলমুল, শাকসবজী ইত্যাদি

(৫) জমি থেকে লব্ধ খনিজ সম্পদ ও গুপ্তধ্বন

এর প্রতিটি জিনিসের আবার যাকাতের নির্দিষ্ট ‘নিসাব’ রয়েছে। শরীয়তের পরিভাষায় ‘নিসাব’ (نِصاب) অর্থ হল- এমন সর্বনিম্ন পরিমান ধ্বনমাল, যার বিদ্যমানতায় সংশ্লিষ্ট ধ্বনমালের মালিককে শরীয়ত غني (গণী/ধ্বনী/মালদার/অমুকাপেক্ষি)-এর মধ্যে গণ্য করে থাকে এবং তার উপরে নির্দিষ্ট হারে ধ্বনমালের যাকাত আদায় করা ফরয হয়ে যায়। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন শর্ত শরায়েত ও মাসায়েল।

নিম্নে আমরা যাকাতযোগ্য প্রতিটি ধ্বনমালের সম্ভাব্য বিস্তারিত দালিলিক আলোচনা এক এক করে পেশ করবো, ইনশাআল্লাহ।

 

(১) নগদ সম্পদ (স্বর্ণ-রৌপ্য ও নগদ অর্থ)-এর উপরে যাকাত

স্বর্ণরৌপ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি খনিজ সম্পদ; আল্লাহ তাআলা এই দুই জিনিসের মধ্যে যেমন অনেক কল্যান রখেছেন, তেমনি এর সাথে প্রতি জামানার অর্থনীতি অতপ্রত ভাবে জড়িত থাকে, যা মানুষের ব্যাক্তি-জীবন থেকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত শক্তিশালী মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ইসলামী শরীয়ত এই দুটি ধাতব পদার্থের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে -চাই তা খনিজ দ্রব্য আকারে থাক কিংবা মুদ্রা আকারে। আল্লাহ তাআলা তাঁর ধ্বনী-সম্পদশালী বান্দাদের মালিকানাভুক্ত স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপরে যাকাত আদায়কে ফরয করে দিয়েছেন। 

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করছেন-

 وَ الَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ * يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ  

“আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্যকে পুঞ্জিভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহ’র পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। (সেই) দিন (বেশি দূরে নয়, যখন) জাহান্নামের আগুনে ওগুলোকে উত্তপ্ত করানো হবে, তারপর তা দিয়ে ছেঁকা দেয়া হবে তাদের কপালগুলোতে, তাদের পার্শ্বদেশগুলোতে এবং তাদের পৃষ্ঠদেশ গুলোতে। এই(গুলিই হচ্ছে তোমাদের সেই ধ্বনমাল) যা তোমরা (হক্ব আদায় না করে উল্টো) নিজেদের জন্য পুঞ্জিভূত করে রাখতে। সুতরাং, তোমরা যা পুঞ্জিভুত করে রাখতে, (আজ) তোমরা (সেটার) মজা চাখো”। [সূরা তাওবা ৩৪, ৩৫]

আবু হুরায়রাহ রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ  এরশাদ করেন- مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ، لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا، إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ، فَأُحْمِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ، فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِينُهُ وَظَهْرُهُ، كُلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيدَتْ لَهُ، فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ، فَيَرَى سَبِيلَهُ، إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِمَّا إِلَى النَّارِ . واه مسلم في صحيحه , كتاب الزكاة : رقم ٩٨٧  – “যে কোনো স্বর্ণের মালিক ও রৌপ্যের মালিক হোক না কেনো, যে ওর মধ্য থেকে তার (ফরয) হক্ব (যাকাত) আদায় না করবে, যখন কেয়ামতের দিন আসবে, তখন (ওসব স্বর্ণ বা রৌপ্য দিয়ে) তার জন্য আগুনের বিভিন্ন পাত তৈরী করা হবে, তারপর জাহান্নামের আগুনে সেটাকে উত্তপ্ত করানো হবে, তারপর তা দিয়ে তার কপালে, তার পাশ্বদেশে এবং তার পৃষ্ঠদেশে ছেঁকা দেয়া হবে। যতবারই সেটা শীতল হয়ে আসবে, ততবারই (একই কায়দায়) তার জন্য পুণরাবৃত্তি ঘটানো হতে থাকবে -(এমন এক ভয়ঙ্কর) দিনে যার পরিমানটা হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান -যাবৎ না বান্দাদের মাঝে বিচার করে দেয়া হয়। তারপর সে তার গন্তব্য দেখতে পাবে -হয় জান্নাতের দিকে, না হয় দোযখের দিকে”। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ৯৮৭]

স্বর্ণ মূদ্রা ও রৌপ্য মূদ্রার উপরে যাকাত ধার্য হওয়ার দলিল

আল্লাহ তাআলা’র সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ যে জামানায় আরবে আগমন করেন, তখনকার যেসব দেশ বা রাজ্যের সাথে আরবের ব্যাপক ব্যবসা-বানিজ্য ও লেনদেন প্রচলিত ছিল, সেসব দেশ বা রাজ্যে ‘লেনদেনের মাধ্যম’ হিসেবে মূলত: ‘দিনার (স্বর্ণমূদ্রা)’ ও ‘দিরহাম (রৌপ্যমূদ্রা)’ -এই দুই ধরনের নগদ মুদ্রা (cash/currency)  প্রচলিত ছিল। বাইজেন্টাইন রোমান সাম্রাজ্যেv প্রধান মূদ্রা ছিল স্বর্ণ নির্মিত ‘দিনার’, আর পারস্যে ছিল রৌপ্য নির্মিত ‘দিরহাম’, যা আরবে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হত। কিন্তু ‘দিরহাম’-এর মধ্যে কোনো মুদ্রিত ছাপ থাকতো না, ওগুলো হত টুকরা আকারের, বিভিন্ন আকারের ও ওজনের -ছোটও  হত, বড়ও হত, ভারীও হত, আবার হালকাও হত। এজন্য জাহেলীয়াতের জামানায় মক্কার লোকেরা ‘দিরহাম’কে গণনা করে লেনদেন করতো না, বরং লেনদেন করতো ওজনের ভিত্তিতে। আর এসব পরিমাপের জন্য তাদের মাঝে কিছু স্বীকৃত ওজন প্রচলিত ছিল, যেমন: নওয়াত (৫ দিরহাম), নশ (২০ দিরহাম), উকিয়া (৪০ দিরহাম), রতল (১২ উকিয়া) ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ ﷺ নবুওত লাভের পর মুসলমানদের জন্য আলাদা ভাবে -মক্কাবাসীদের লেনদেনের এসকল প্রচলিত হিসাবের মাঝে- কোনো রকম পরিবর্তন সাধন করেন নি। বরং, ‘দিনার (স্বর্ণমূদ্রা)’ ও ‘দিরহাম (রৌপ্যমূদ্রা)’ -এই দুই প্রকারের নগদ মূদ্রার উপরে আল্লাহ তাআলার অনুমতিক্রমে বহু শরয়ী বিধান আরোপ করতে থাকেন, যার মধ্যে একটি ছিল ‘ফরয যাকাত’ বিধান ধার্যকরন। 

আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- ليسَ فِيما دُونَ خَمْسِ أواقٍ مِنَ الوَرِقِ صَدَقَةٌ . رواه البخاري في صحيحه : ٢/٥٢٩ رقم ١٣٩٠، و مسلم في صحيحه : ٢/٦٧٣ رقم ٩٧٩، و غيرهما  – “রৌপ্য-মূদ্রা পাঁচ উকিয়ার কম থাকলে তাতে যাকাত (ধার্য) হবে না”। [সহিহ বুখারী– ২/৫২৯ হাদিস ১৩৯০; সহিহ মুসলীম- ২/৬৭৩ হাদিস ৯৭৯; আল-মুসান্নাফ, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক- ৪/১৪২ হাদিস ৭২৫৮; আল-ইসতিযকার, ইবনু আব্দিল বার- ৯/১২৮৯৭, ১৩২৬৬]

ফায়দা: এখানে ১ উকিয়া = ৪০ দিরহাম; অতএব ৫ উকিয়া = ২০০ দিরহাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই হাদিস অনুযায়ী ৫ উকিয়া তথা ২০০ দিরহাম হল রৌপ্য মূদ্রার নিসাব, যার কম রৌপ্যের উপরে কোনো যাকাত নেই। বর্তমান জামানার আধুনিক ওজন অনুপাতে ‘২০০ (দু’শ) দিরহাম’-এর পরিমান হয় ৫২.৫ তোলা রূপা

আলী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- ‏قَدْ عَفَوْتُ عن صَدَقَةِ الخَيْلِ والرّقِيقِ فهَاتُوا صَدَقَةَ الرّقَةِ مِنْ كُلّ أرْبَعِينَ دِرْهَماً دِرْهَماً‏.‏ وَلَيْسَ في تِسْعِينَ ومائةٍ شيءٌ فإذا بَلَغَتْ مائتينِ فَفِيها خَمْسَةُ الدّرَاهِمَ . رواه الترمذي في سننه : رقم و قال: روَى هذا الحديثَ الأعْمَشُ وأبو عَوَانَةَ وغَيْرُهُمَا عن أبي إسحاقَ عن عَاصِمِ بنِ ضَمْرَةَ عن علي‏.‏ وَرَوَى سُفيانُ الثّوْرِيّ وابنُ عُيَيْنَةَ وغَيْرُ واحِدٍ عن أَبِي إسحاقَ عن الحارِثِ عن علي‏.‏ قال‏:‏ وسألْتُ محمدَاً عن هذا الحَديثِ فقالَ كِلاَهُمَا عِنْدِي صحيحٌ عن أَبِي إسحاقَ، يُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ روى عَنْهُما جَمِيعاً، و أحمد في المسند: ١/٤٧٧ رقم ٧١١ و قال احمد شاكر: اسناده صحيح، و ابن حزم في المحلى: ٦/٦٣  – “বস্তুত: ঘোড়া এবং গোলামের যাকাতকে আমি মাফ করে দিয়েছি। কাজেই তোমরা (তোমাদের মালিকানাভুক্ত) প্রতি চল্লিশ দিরহাম রৌপ্য-মুদ্রা থেকে যাকাত বাবদ এক দিরহাম করে নিয়ে আসো। আর এক’শ নব্বই (দিরহাম)-এর মধ্যে কোনো কিছুই (যাকাত বাবদ ধার্য) হবে না, (বরং) যখন তা(র সংখ্যা) দু’শ (দিরহাম)-এ গিয়ে পৌছবে, তখন তাতে পাঁচ দিরহাম (যাকাত ধার্য) হবে”। [সুনানে তিরমিযী ৩/১৬ হাদিস ৬২০; সুনানে আবু দাউদ- ২/১০১ হাদিস ১৫৭৪; সুনানে নাসায়ী- ৫/৩৭; সুনানে ইবনে মাজাহ- ১/৫৭০ হাদিস ১৭৯০; মুসনাদে আহমদ– ১/৪৭৭ হাদিস ৭১১; শারহু মাআনীল আছার, তাহাবী- ২/২৮; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৪/১১৮; আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযাম- ৬/৬৩]

আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- هَاتُوا رُبْعَ الْعُشُورِ مِنْ كُلِّ أَرْبَعِينَ دِرْهَمًا دِرْهَمٌ وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ شَىْءٌ حَتَّى تَتِمَّ مِائَتَىْ دِرْهَمٍ فَإِذَا كَانَتْ مِائَتَىْ دِرْهَمٍ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ فَمَا زَادَ فَعَلَى حِسَابِ ذَلِكَ ‏‏. رواه أبو داود في سننه , كتاب الزكاة : رقم ١٥٧٢ و سكت أبو داود عنه، و قد قال في رسالته لأهل مكة كل ما سكت عنه فهو صالح، و ابن خزيمة في صحيحه , باب ذكر مبلغ الزكاة في الورق إذا بلغ خمس أواق : ٤/٣٤ رقم ٢٢٩٧، و الضياء المقدسي في الأحاديث المختارة : رقم ٤٨٧، ، و الدارقطني في سننه : ٢/٩٢ مجزوما فيها، و البيهقي : ٤/١١٦، و عبد الرزاق في مصنفه كتاب الزكاة , باب صدقة العين : ٤/٨٧، قال زيلعي في نصب الراية لأحاديث الهداية : : قال ابن القطان في ” كتابه ” : هذا سند صحيح وكل من فيه ثقة معروف ولا أعني رواية الحارث وإنما أعني رواية عاصم انتهى كلامه . وهذا منه توثيق لعاصم، و صححه الألباني في صحيح سنن أبي داود : ١/٤٣٥ و تقدم تخريجه في مقدار زكاة الذهب والفضة،  – “তোমরা (রৌপ্য মূদ্রা দিরহামের ক্ষেত্রে) প্রতি চল্লিশ দিরহাম থেকে -চল্লিশ ভাগের এক ভাগ (হিসেবে)- এক দিরহাম (যাকাত) নিয়ে আসো। আর তোমাদের উপরে (যাকাত বাবদ) কোনো কিছুই (ধার্য) হবে না, যাবৎ না (তোমাদের মালিকানায় কমপক্ষে) দু’শ দিরহাম (সম্পদ) পূর্ণ হয়। যখন তা দু’শ দিরহাম হয়ে যাবে, তখন তার মধ্যে পাঁচ দিরহাম (যাকাত বাবদ ধার্য) হবে। (এভাবে) এ(ই দু’শ দিরহামে)র (উপরে আরো) যে(সব) অতিরিক্ত (দিরহাম জমা) থাকবে, সেটার উপরে (একই অনুপাতে যাকাতের) হিসাব হবে”। [সুনানে আবু দাউদ,- ২/৩২০ হাদিস ১৫৭২; সহিহ ইবনে খুযাইমাহ- ৪/৩৪ হাদিস ২২৯৭; আল-মুসান্নাফ, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক-৪/৮৭; সুনানে দারাকুতনী- ২/৯২]

ফায়দা: এই দুই হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, রৌপ্য মূদ্রার ক্ষেত্রে ২০০ (দু’শ) দিরহাম হল ‘যাকাতের নিসাব’। অর্থাৎ, যে ব্যাক্তির মালিকানায় কমপক্ষে ২০০ (দু’শ) দিরহাম থাকবে, সে তা থেকে ৫ (পাঁচ) দিরহাম যাকাত দিবে; (অর্থাৎ ২০০ দিরহামের ২.৫%)। একইভাবে যে ব্যাক্তির মালিকানায় কমপক্ষে ২০০ (দু’শ) দিরহাম থাকবে, সে তা থেকে প্রতি ৪০ (চল্লিশ) দিরহামে ১ (এক) দিরহাম যাকাত দিলেও হিসাবটা ২০০ দিরহামের ২.৫%-ই দাঁড়ায়। শেষে বলা হয়েছে- فَمَا زَادَ فَعَلَى حِسَابِ ذَلِكَ – {(এভাবে) এ(ই দু’শ দিরহামে)র (উপরে আরো) যে(সব) অতিরিক্ত (দিরহাম জমা) থাকবে, সেটার উপরে (একই অনুপাতে যাকাতের) হিসাব হবে}– অর্থাৎ আগেরটা তো গেল কমপক্ষে ২০০ (দু’শ) দিরহাম থাকলে তা থেকে কতটুকু যাকাত দিতে হবে -সেই কথা, আর এবারে বলা হচ্ছে যে, যদি কারোর মালিকানায় ২০০ (দু’শ) দিরহাম থেকেও বেশি থাকে, উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন যদি ১০০০ (এক হাজার) দিরহাম থাকে, তাহলে সে ১০০০ (এক হাজার) দিরহামের ২.৫% হারে মোট ২৫ (পঁচিশ) দিরহাম যাকাত আদায় করবে। 

আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন-فَإِذَا كَانَتْ لَكَ مِائَتَا دِرْهَمٍ وَ حَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ وَ لَيْسَ عَلَيْكَ شَىْءٌ – يَعْنِي فِي الذَّهَبِ – حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا وَ حَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارٍ فَمَا زَادَ فَبِحِسَابِ ذَلِكَ . رواه أبو داود في سننه , كتاب الزكاة : رقم ١٥٧٣، و ابن وهب في الموطأ : ١٨٦، و البيهقي : ٤/١٣٧ رقم ٧٧٨٣، حسَّنه ابنُ حَجَرٍ في بلوغ المرام : ١٧١ و قال: وقد اختلفوا في رَفعِه، و قال الشوكانيُّ في نيل الأوطار: ٤/١٩٩ : الضَّعفُ الذي فيه منجَبِرٌ، و صحَّحه الألباني في صحيح سنن أبي داود – “যদি তোমার দুই’শ দিরহাম থাকে এবং সেটির উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হয়, তাহলে তার মধ্যে পাঁচ দিরহাম (যাকাত ধার্য হবে)। আর স্বর্ণের ক্ষেত্রে তোমার উপরে (যাকাত বাবদ) কোনো কিছুই (ধার্য) হবে না, যাবৎ না তোমার কাছে (কমপক্ষে) বিশ দিনার (সম্পদ) থাকে। যখন তোমার কাছে বিশ দিনার থাকবে এবং সেটির উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হবে, তখন তার মধ্যে অর্ধ-দিনার (যাকাত ধার্য হবে)। (এভাবে) এ(ই বিশ দিনারে)র (উপরে আরো) যে(সব) অতিরিক্ত (দিনার) থাকবে, সেটার হিসাব (একই অনুপাতে করতে) হবে”। [সুনানে আবু দাউদ– ২/৩২০ হাদিস ১৫৭৩; আল-মুআত্তা, ইমাম মালেক, হাদিস ১৮৬; সুনানে বাইহাকী- ৪/১৩৭ হাদিস ৭৭৮৩]

আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন- لَيْسَ فِي أَقَلَّ مِنْ عِشْرِينَ دِينَارًا شَيْءٌ ، وَفِي عِشْرِينَ دِينَارًا نِصْفُ دِينَارٍ ، وَفِي أَرْبَعِينَ دِينَارًا دِينَارٌ ، فَمَا زَادَ فَبِالْحِسَابِ . رواه ابن أبي شيبة في المصنف : ٦/٣٩١ رقم ٩٩٦٦ اسناده جيد كما قال الألباني في إرواء الغليل : ٣/٢٩١  – “(স্বর্ণ মূদ্রা দিনারে ক্ষেত্রে) বিশ দিনারের কমে কোনো কিছু (যাকাত বাবদ ধার্য) হবে না, আর বিশ দিনারের মধ্যে (যাকাত ধার্য) হবে অর্ধ-দিনার এবং চল্লিশ দিনারের মধ্যে (যাকাত ধার্য) হবে এক দিনার। (এমনি ভাবে ওই বিশ দিনারের উপরে আরো) যা (কিছু) অতিরিক্ত (দিনার) থাকবে, তখন (সেটার) হিসাব (একই অনুপাতে) করতে হবে”। [আল-মুসান্নাফ, ইমাম ইবনু আবি শায়বাহ- ৬/৩৯১ হাদিস ৯৯৬৬]

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এবং আয়েশা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা বলেছেন أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْخُذُ مِنْ كُلِّ عِشْرِينَ دِينَارًا فَصَاعِدًا نِصْفَ دِينَارٍ ، وَمِنْ الْأَرْبَعِينَ دِينَارًا دِينَارًا . رواه ابن ماجه في سننه : ١/٥٧١ رقم ١٧٩١، و صححه الألباني في صحيح ابن ماجة – “নবী ﷺ (স্বর্ণ মূদ্রা দিনারে ক্ষেত্রে) প্রত্যেক বিশ দিনার বা তদপেক্ষা বেশি দিনার হতে (যাকাত বাবদ) গ্রহন করতেন অর্ধ-দিনার (হিসেব ধরে) এবং (প্রত্যেক) চল্লিশ দিনার থেকে (গ্রহন করতেন) এক দিনার (হিসেব ধরে)”। [সুনানে ইবনে মাজাহ- ১/৫৭১ হাদিস ১৭৯১]

ফায়দাউপরের এই রেওয়ায়ত গুলিত স্বর্ণের ক্ষেত্রে নিসাব বলা হয়েছে ‘২০ (বিশ) দিনার’। অর্থাৎ, যে ব্যাক্তির মালিকানায় কমপক্ষে ‘২০ (বিশ) দিনার’ থাকবে, সে তা থেকে অর্ধ-দিনার হারে (তথা ২.৫% হারে) যাকাত আদায় করবে। শেষে বলা হয়েছে- فما زاد فبِحِسابِ ذلك– {(এভাবে) এ(ই বিশ দিনারে)র (উপরে আরো) যে(সব) অতিরিক্ত (দিনার) থাকবে, সেটার হিসাব (একই অনুপাতে করতে) হবে}– অর্থাৎ আগেরটা তো গেল কমপক্ষে ‘২০ (বিশ) দিনার’ থাকলে তা থেকে কতটুকু যাকাত দিতে হবে -সেই কথা, আর এবারে বলা হচ্ছে যে, যদি কারোর মালিকানায় ‘২০ (বিশ) দিনার’ থেকেও বেশি থাকে, উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন যদি ১০০ (এক’শ) দিনার থাকে, তাহলে সে ১০০ (এক’শ) দিনারের ২.৫% হারে মোট ‘২.৫ (আড়াই) দিনার’ যাকাত আদায় করবে।

আমর বিন শুয়াইব রহ. তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন-ليس فى أقل من عشرين مثقالاً من الذهب ولا فى أقل من مئتى درهم صدقة . أخرجه أبو عبيد في الأموال :١/٣٣٩ رقم ١٢٩١، وأخرجه أيضاً الدارقطني في سننه : ٢/٩٣، . صحَّحه الألباني في إرواء الغليل : ٣/٢٩٢ رقم ٨١٥ و قال: وقد أخرجه الدارقطنى أيضا وهو و إن كان سنده ضعيفا فهو صحيح بإعتبار ما له من الشواهد – “বিশ মিছক্বালের কম স্বর্ণের মধ্যে এবং দু’শ দিরহামের কম (রৌপ্য মূদ্রা)-এর মধ্যে যাকাত (ধার্য) হয় না”। [আল-আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ১/৩৩৯ হাদিস ১২৯১; সুনানে দারাকুতনী- ২/৯৩]

ফায়দা: এই হাদিসে স্বর্ণের নিসাব বলা হয়েছে ‘২০ (বিশ) মিছক্বাল’। আর উম্মাহ’র এব্যাপারে ইজমা রয়েছে যে, স্বর্ণের নিসাব হল ২০ মিছক্বাল। [আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ২০/১৪৫; শারহুল মুসলীম, ইমাম নববী- ৭/৪৮-৫৩; আল-ইজমা, মুনযিরী- ৪৮ পৃষ্ঠা; আল-মাজমু’ ফাতওয়া, ইবনে তাইময়্যিাহ- ১২/২৫] মূলত: রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর সেই জামানায় ১ দিনার সোনার ওজন ১ মিছক্বাল হত। আর ১ মিছক্বাল = ৪.৫ মাশা। এই হিসেবে বর্তমান আধুনিক জামানায় ‘২০ (বিশ) মিছক্বাল’-এর পরিমান নির্ধারিত হয়েছে ৭.৫ ভরী স্বর্ণ। [ফিকহুয যাকাত, ইউসুফ কারাদাভী- ১/২৬০; আল-মুমতি, ইবনে উসাইমীন- ৬/৯৭; কিতাবুয যাকাত, আব্দুল্লাহ আত-ত্বইয়ার- ৯১ পৃষ্ঠা]

আধুনিক মূদ্রা (currency)/নোট/নগদ অর্থ (cash money) (যেমন: টাকা, রূপী, ডলার ইত্যাদি)’র উপর যাকাতের নিসাব

নগদ লেনদেরনের মাধ্যম হিসেবে বর্তমানে একেক দেশে একেক ধরনের সরকারী মূদ্রা (currency) প্রচলিত আছে। যেমন: সৌদি আরবে ‘রিয়াল’, আমেরিকায় ‘ডলার’, চীনে ‘ইয়েন’, ইন্ডিয়ায় ‘রূপী’, বাংলাদেশে ‘টাকা’…. ইত্যাদি। এগুলোকে বলা হয়- ‘নগদ অর্থ (cash money)’। কোনো মুসলমান হালাল পন্থায় এসব ‘নগদ অর্থ’-এর মালিক হলে, তিনি হিসেব করে দেখবেন যে, তার মোট ‘নগদ অর্থ’-এর পরিমাণটা ‘স্বর্ণ বা রৌপ্যের নিসাবের বাজার মূল্যের সমপরিমান বা তার চাইতে বেশি’ আসে কিনা। যেমন:- 

(১) স্বর্ণের নিসাব হল ৭.৫ ভরী স্বর্ণ। আপনি স্বর্ণের দোকান থেকে স্বর্ণের ভরীর মূল্য জেনে নিয়ে হিসেব করে দেখবেন যে, আপনার মোট ‘নগদ অর্থ’-এর পরিমাণটা ৭.৫ ভরী স্বর্ণের বাজার মূল্য (market value)-এর সমপরিমান বা তার চাইতে বেশি আসে কিনা। 

(২) রৌপ্যের নিসাব হল ৫২.৫ তোলা রূপা। আপনি স্বর্ণের দোকান থেকে রৌপ্যের তোলার মূল্য জেনে নিয়ে হিসেব করে দেখবেন যে, আপনার মোট ‘নগদ অর্থ’-এর পরিমাণটা ৫২.৫ তোলা রূপা’র বাজার মূল্য (market value)-এর সমপরিমান বা তার চাইতে বেশি আসে কিনা। 

এভাবে স্বর্ণ ও রৌপ্য -এই দুটি’র বাজারমূল্যের হিসাব নেয়ার পর এদের মধ্যে যেটির ‘বাজার মূল্য (market value)’ নিসাবে কম আসে, সেই ‘কম নিসাব’টি হিসাবে ধরে আপনি আপনার ‘মোট নগদ অর্থের’ উপরে হিসেব করে দেখবেন যে, তার পরিমাণটা কমপক্ষে ওই ‘কম নিসাবটি’র সমান বা তার চাইতে বেশি হয় কিনা। যদি সমান বা বেশি হয়, তাহলে আপনি ‘নিসাবের মালিক’ গণ্য হবেন। [বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/১১০] 

উদাহরণ স্বরূপ: মনে করুন, আপনার মালিকানায় আজ যাকাতযোগ্য নগদ ‘৬০,০০০ (ষাট হাজার)’ টাকা আছে। এবারে, আজকের সোনার বাজার মূল্য যদি ১ ভরী = ৪০,০০০ টাকা হয়, তাহলে আজকের ৭.৫ ভরী স্বর্ণের বাজার মূল্য হবে ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা। একই ভাবে, আজকের রূপার বাজার মূল্য যদি ১ তোলা = ৬৫০ টাকা হয়, তাহলে আজকের ৫২.৫ তোলা রূপা’র বাজার মূল্য হবে ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ) টাকা। এবারে আপনি রূপা’র বাজার মূল্য ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ) টাকা’র নিসাবটি ধরবেন, কারণ সোনা ও রূপার বাজার মূল্যের মধ্যে রূপার বাজার মূল্যটাই কম। এই কম’টি ধরার পর দেখা যাচ্ছে যে, আজকের রূপা’র বাজার মূল্য যেখানে ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ) টাকা, সেখানে আপনার কাছে আজ নগদ ‘৬০,০০০ (ষাট হাজার)’ টাকা আছে, যা পরিমানে ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ) টাকা’র চাইতে বেশি। অতএব, আজ আপনি যাকাতের নেসাবের মালিক হয়ে গেলেন। [উল্লেখ্য: আজ যদি আপনার কাছে ৬০,০০০ (ষাট হাজার)’ টাকা না থেকে বরং ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ) টাকা’র চাইতে কম টাকা থাকতো (মনে করুন ৩০,০০০ টাকা থাকতো), তাহলে আপনি আজ যাকাতের নেসাবের মালিক হতেন নাআরো উল্লেখ্য যে, আপনার জন্য যাকাতের নিসাব থেকে বাঁচার কৌশল হিসেবে আজকের স্বর্ণের বাজার মূল্য ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা দেখিয়ে একথা বলার কোনো অবকাশ নেই যে, “আমার উপরে যাকাতের নিসাব ধার্য হয় না, কারণ আমার কাছে তো ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা নেই, আছে তার চাইতে কম ৬০,০০০ (ষাট হাজার) টাকা মাত্র”। এর কারণ হল, রূপার মূল্য হিসেবে আপনার উপরে যাকাতের নিসাব সাব্যস্থ হয়ে গেছে। এজন্য, সোনা ও রূপা মধ্যে যেটির মূল্য কম সেটির হিসেবে নিসাব ধার্য হবে] আর সচেতন সবারই অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, সোনার চাইতে রূপার বাজার মূল্যই সবসময় কম হতে দেখা যায়। এজন্য আলেমগণ ব্যবপকভাবে রূপার বাজারমূল্য অনুপাতেই যাকাতের হিসাব করতে বলেন।

মাসআলা: রূপার দ্বারা নিসাব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যখন ‘বাজার মূল্য (market value)’ দিয়ে যাকাত হিসেব করবেন, তখন বাজারে রূপার ক্রয়মূল্য ধরতে হবে; অর্থাৎ আপনি বাজার থেকে রূপা ক্রয় করতে হলে যে মূল্যে ক্রয় করতেন সেই মূল্য অনুপাতে যাকাতের হিসেব করবেন। [ফাতাওয়ায়ে শামী- ২/২৩৪] আর দেশের বিভিন্ন এলাকা/অঞ্চলে রূপার ‘বাজার মূল্য (market value)’ বিভিন্ন হলে সেক্ষেত্রে যাকাতদাতার সম্পদ যে অঞ্চলে থাকবে সেখানকার ‘বাজার মূল্য’ ধর্তব্য হবে। [ফাতহুল কাদীর- ৪/১০০; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরীয়্যাহ- ১/১৮০] 

সোনা রূপার অলঙ্কার ও গহনা’র উপরে যাকাত ধার্য হওয়ার দলিল

নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত গহনা’র উপরও যাকাত আদায় করা আবশ্যক। যেমন:-

আসমা বিনতে ইয়াজিদ রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এরশাদ করেন- دخَلتُ أنا وخالتي على النبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ وعلينا أَسْوِرةٌ مِن ذهَبٍ، فقال لنا: أَتُعْطيانِ زَكاتَه؟ قالتْ: فقُلْنا: لا. قال: أمَا تخافانِ أنْ يُسوِّرَكما اللهُ أَسْوِرةً مِن نارٍ، أَدِّيا زَكاتَه . رواه أحمد في مسنده : ٦/٤٥٥ و ٦/٤٦٠ و٦/٤٦١، و الطبراني : ٢٤/١٧٠ رقم ٤٣١، قال الهيثمي في مجمع الزوائد :٣/٦٧ : رواه أحمد و إسناده حسن، و قال الألباني في صحيح الترغيب والترهيب : رقم ٧٧٠ : صحيح لغيره ، قال الرباعي في فتح الغفار : ٢/٨٠٦ : إسناده حسن    – “(একবার) আমি ও আমার খালা গেলাম নবী -এর কাছে। তখন আমাদের গলায় ছিল স্বর্ণের গহনা। তখন তিঁনি আমাদেরকে বললেন: ‘তোমরা দুজন কি এর যাকাত আদায় করো’? আমরা বললাম: ‘না’। তিঁনি বললেন: ‘তোমাদের দুজনের কি ভয় হয় না যে, আল্লাহ তোমাদের দুজনের গহনাকে (কেয়ামতের দিন) আগুনের গহনা বানিয়ে দিবেন?! তোমরা দুজন এর যাকাত আদায় করো”। [মুসনাদে আহমদ– ৬/৪৫৫, ৪৬০, ৪৬১; আল-মু’জামুল কাবীর, ইমাম ত্বাবরাণী- ২৪/১৭০ হাদিস ৪৩১; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৩/৬৭]

আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ বিন হাদী বর্ণনা করেছেন আয়েশা সিদ্দিকা রা.-এর সূত্রে যে, তিনি বলেনدَخَلَ عَلَىَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَرَأَى فِي يَدِي فَتَخَاتٍ مِنْ وَرِقٍ فَقَالَ :‏ مَا هَذَا يَا عَائِشَةُ ‏‏ ‏.‏ فَقُلْتُ صَنَعْتُهُنَّ أَتَزَيَّنُ لَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ‏.‏ قَالَ ‏:‏ أَتُؤَدِّينَ زَكَاتَهُنَّ ‏‏ ‏.‏ قُلْتُ لاَ أَوْ مَا شَاءَ اللَّهُ ‏.‏ قَالَ ‏: هُوَ حَسْبُكِ مِنَ النَّارِ . رواه ابو داود في سننه , كتاب الزكاة : رقم ١٥٦٥ ، و صححه الألباني في صحيح أبي داود و في صحيح الترغيب والترهيب : رقم ٧٦٩، و ايضا الحاكم في المستدرك: ١/٥٤٧ و صححه على شرط الشيخين و وافقه الذهبي،  – “(একবার) রাসুলুল্লাহ ﷺ আমার কাছে এসে দেখলেন আমার হাতে একটি রূপার আংটি। তখন তিনি বললেন: ‘আয়েশা, এটা কি’? আমি বললাম: ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি আপনার সামনে সাজসজ্জা করার জন্য এটা বানিয়েছি’। তিনি বললেন: ‘তুমি কি এর যাকাত আদায় করো’?। আমি বললাম: ‘না’ অথবা (বললাম) ‘আল্লাহ যা চান’। তিনি বললেন: ‘তোমার দোযখের জন্য এটাই যথেষ্ট ”। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ; মুসতাদরাকে হাকিম- ১/৫৪৭; আল-আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ৩/১৩৮; সুনানে দারাকুতনী- ২/১০৫; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৪/১৩৯]

মাসআলাহ: অলঙ্কার ও গহনার ক্ষেত্রেও সোনার নিসাব হল ৭.৫ ভরী স্বর্ণ এবং রূপার নিসাব হল ৫২.৫ তোলা রূপা। আর যাকাত কেবলমাত্র সোনা বা রূপার উপরেই ধার্য হয়; অপরাপর ধাতুর উপরে নয়। তাই অলঙ্কার ও গহনার মধ্যে বিদ্যমান সোনা বা রূপা ছাড়া অপরাপর ধাতু (যেমন: হীরা, পিতল, লোহা, কাঁচ ইত্যাদি)-এর উপরে বা সেটার মূল্যের উপরে যাকাত ধার্য হবে না। [আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৭৩; বাদায়েউস সানায়ে- ২/১০৫; আল-মুহিতুল বুরহানী- ৩/১৫৬; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানীয়া- ৩/১৫৪; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২২৬; রাদ্দুল মুহতার- ২/২৯৭; দুরারুল হুক্কাম- ১/১৭৫]। 

মাসআলাহ: নিসাবের তারিখে কারোর মালিকানায় যদি শুধুমাত্র সোনা থাকে এবং এর সাথে যদি আর কোনো ‘যাকাতযোগ্য সম্পদ’ {তথা রূপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়ী পণ্য (যার আলোচনা সামনে আসছে)} না থাকে, তাহলে তাকে নিসাবের মালিক হিসেবে গণ্য হতে হলে তার কাছে কমপক্ষে পূর্ণ ৭.৫ ভরী স্বর্ণ থাকা আবশ্যক; এর কম স্বর্ণে তিনি নেসাবের মালিক হবেন না। এক্ষেত্রে যদি তার মালিকানায় বিদ্যমান স্বর্ণের বাজারমূল্য কমপক্ষে ‘৫২.৫ তোলা রূপা’র বাজারমূল্যের সমান বা তার চাইতে বেশিও হয়, তবুও তিনি নিসাবের মালিক হবে না। কারণ, নিরেট স্বর্ণের নিসাবের বেলায় রৌপ্যের নিসাব দিয়ে যাকাতের নিসাবের মালিক হওয়া বা না হওয়া ধর্তব্য নয়। [আল-বাদায়েউস সানায়ে- ২/১০৭; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়্যাহ- ৩/১৫৪; ফাতাওয়ায়ে খানীয়া- ১/২৪৯; আল-মুহিতুল বুরহানী- ৩/১৫৭; রাদ্দুল মুহতার- ২/২৯৭]

সোনা, রূপা ও নগদ অর্থের উপর দিয়ে চন্দ্র মাস হিসেবে পূর্ণ ১ (এক) বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত 

কোনো মুসলীম পুরুষ অথবা কোনো মুসলীম নারীর মালিকানায় যে দিন কমপক্ষে ‘৭.৫ ভরী স্বর্ণ’ থাকবে, অথবা কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রৌপ্য থাকবে, কিংবা কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূল্যের সমান নগদ অর্থ থাকবে, ঠিক সেই তারিখেই সে নিসাবের মালিক হিসেবে গণ্য হবে -(যেমনটা উপরের আলোচনা থেকেও স্পষ্ট হয়)। কিন্তু তাকে সেই নিসাবের প্রথম তারিখেই তার ওই সোনা/রূপা/নগদ অর্থ-এর উপরে যাকাত আদায় করা ফরয নয়। বরং সে (চন্দ্র মাস হিসেবে) পূর্ণ ১ (বছর) অতিক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষা করবে এবং ১ (বছর) অতিক্রান্ত হওয়ার পর (চন্দ্র মাস হিসেবে) ঠিক ওই একই তারিখে হিসেব করে দেখবে যে, সে সেদিন পূণরায় নিসাবের মালিক রয়েছে কিনা। যদি নিসাবের মালিক হয়, তাহলে সে তার মোট সোনা/রূপা/নগদ অর্থ-এর উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করবে।

আর কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক দ্বীন ইসলামের যাবতীয় সংশ্লিষ্ট আহকাম চন্দ্র মাসের হিসেব অনুযায়ী আদায় করতে হয়, যেমন: হজ্জ, সিয়াম (রোযা), ঈদ ইত্যাদি। ঠিক একই ভাবে ‘যাকাত’-এর নিসাবের মালিক হওয়া থেকে নিয়ে পূর্ণ ১ (এক) বছর পূরণ হওয়ার বিষয়টিও নির্ধারণ হবে চন্দ্র মাস অনুযায়ী। [আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/২৯৪] 

আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন-فَإِذَا كَانَتْ لَكَ مِائَتَا دِرْهَمٍ وَ حَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ وَ لَيْسَ عَلَيْكَ شَىْءٌ – يَعْنِي فِي الذَّهَبِ – حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا وَ حَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارٍ فَمَا زَادَ فَبِحِسَابِ ذَلِكَ . رواه أبو داود في سننه , كتاب الزكاة : رقم ١٥٧٣، و ابن وهب في الموطأ : ١٨٦، و البيهقي : ٤/١٣٧ رقم ٧٧٨٣، حسَّنه ابنُ حَجَرٍ في بلوغ المرام : ١٧١ و قال: وقد اختلفوا في رَفعِه، و قال الشوكانيُّ في نيل الأوطار: ٤/١٩٩ : الضَّعفُ الذي فيه منجَبِرٌ، و صحَّحه الألباني في صحيح سنن أبي داود – “যদি তোমার দুই’শ দিরহাম থাকে এবং সেটির উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হয়, তাহলে তার মধ্যে পাঁচ দিরহাম (যাকাত ধার্য হবে)। আর স্বর্ণের ক্ষেত্রে তোমার উপরে (যাকাত বাবদ) কোনো কিছুই (ধার্য) হবে না, যাবৎ না তোমার কাছে (কমপক্ষে) বিশ দিনার (সম্পদ) থাকে। যখন তোমার কাছে বিশ দিনার থাকবে এবং সেটির উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হবে, তখন তার মধ্যে অর্ধ-দিনার (যাকাত ধার্য হবে)। (এভাবে) এ(ই বিশ দিনারে)র (উপরে আরো) যে(সব) অতিরিক্ত (দিনার) থাকবে, সেটার হিসাব (একই অনুপাতে করতে) হবে”। [সুনানে আবু দাউদ– ২/৩২০ হাদিস ১৫৭৩; আল-মুআত্তা, ইমাম মালেক, হাদিস ১৮৬; সুনানে বাইহাকী- ৪/১৩৭ হাদিস ৭৭৮৩]

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেছেمَن استفاد مالًا، فلا زكاة فيه حتى يحولَ عليه الحَوْلُ عند ربِّه . أخرجه الترمذي , كتاب الزكاة, باب لا زكاة على المال المستفاد حتى يحول عليه الحول : ٣/٧١ رقم ٦٣٢ و قال : هذا أصحُّ من حديث عبد الرحمن بن زيد ، وصححه المباركفوري في تحفة الأحوذي : ٣/٢٧ و صحَّح إسنادَه موقوفًا الألبانيُّ في صحيح سنن الترمذي ، و ايضا الدارقطني سننه : ١/٧٦ رقم ١٨٧٨ و ١٨٧٨ و ١٨٧٠ و ١٨٧١ ، و البيهقي : ٤/١٠٤ رقم ٧٥٧٢، و في السنن الصغير : ٢/٤٨ ، و عبد الرزاق في المصنف : ٧٠٣٠  – “যে ব্যাক্তি (নগদ) সম্পদ উপার্জন করে, তার মধ্যে যাকাত নেই, যাবৎ না সেটির মালিকের কাছে ওটির উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হয়”। [সুনানে তিরমিযী- ৩/৭১ হাদিস ৬৩২; সুনানে দারাকুতনী– ১/৭৬ হাদিস ১৮৭৮, ১৮৭০, ১৮৭১; আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক হাদিস ৭০৩০; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৪/১০৪ হাদিস ৭৫৭২]

আলী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন ليس في المالِ زكاةٌ حتى يحولَ عليه الحَوْلُ . أخرجه أحمد في المسند : ١٢٦٥، وعبد الرزاق في المصنف : رقم ٧٠٢٣، و ابن أبي شيبة في المصنف : ، و الدارقطني سننه : ١/٧٧ رقم ١٨٧٥، و قال ابن حزم في المحلى : ٦/٣٩ : ثابت، وصحح إسناده أحمد شاكر في تعليقِه على المسند : ٢/٣١١ ، و حسن إسناده ابن باز في حاشية بلوغ المرام : ٣٧٧   – “(নগদ) ধ্বনমালের মধ্যে যাকাত নেই, যাবৎ না সেটির উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হয়”। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১২৬৫; সুনানে দারাকুতনী– ১/৭৭ হাদিস ১৮৭৫; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শাইবাহ- ৪/২৫৭ হাদিস ১০৩০৮; আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক হাদিস ৭০২৩; আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযাম- ২/৩১১]

আয়েশা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন لا زكاة في المال حتى يحول عليها الحَوْلُ . رواه ابن ماجه في سننه : ١/٥٧١ رقم ١٧٩٢، قال الألباني في صحيح الجامع : رقم ٧٤٩٧: صحيح ، و ايضا الدارقطني سننه : ١/٧٦ رقم ١٨٧٦ – “(নগদ) ধ্বনমালের মধ্যে যাকাত নেই, যাবৎ না সেটির উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হয়”। [সুনানে ইবনে মাজাহ- ১/৫৭১ হাদিস ১৭৯২; সুনানে দারাকুতনী– ১/৭৬ হাদিস ১৮৭৬; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শাইবাহ- ৪/২৫৮ হাদিস ১০৩১৫; আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ২০/১৫৬; আল-আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ৪১৩ পৃষ্ঠা]

এমনি ভাবে বহু তাবেয়ীনে কেরাম যেমন: ওমর ইবনে আব্দুল আযীয, আসেম বিন আলী, যাবের বিন আবি বকর, সাঈদ বিন সালেম, হাসান বসরী, ইব্রাহীম নখয়ী থেকে বর্ণিত আছে যে, নেসাবের মালিকের (নগদ) সম্পদের উপর যাকাত ফরয হওয়ার জন্য ১ (এক) বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত। [দেখুন: আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শাইবাহ- ৪/২৫৭-২৫৮]

মাসআলাহ: প্রথম নিসাবের তারিখ থেকে পরবর্তী বছরের নিসাবের তারিখ পর্যন্ত মধ্যবর্তী এই এক বছরের ভিতরে যাকাতদাতার প্রত্যাহিক বিভিন্ন প্রকারের আয় ও ব্যয়ের কারণে মোট ‘সোনা/রূপা/নগদ অর্থ’-এর মধ্যে কত বৃদ্ধি পেল বা কত হ্রাস পেল -তা এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়, বরং বিবেচ্য বিষয় হল, ওই এক বছর পরের নিসাবের তারিখে তিনি নিসাবের মালিক আছেন কিনা এবং দুই নিসাবের তারিখের মধ্যবর্তী পূর্ণ বছরটি জুড়ে জরুরতের অতিরিক্ত যাকাতযোগ্য সম্পদ অল্প পরিমানে হলেও থেকেছে কিনা -সেটি। যদি নিসাবের তারিখের এক দিন আগে এসেও তার আয়ের মধ্যে নগদ অর্থ যুক্ত হয় এবং তা নিসাবের তারিখ পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে, তবুও তা যাকাতের হিসেবের মধ্যে আসবে। শেষোক্ত নিসাবের তারিখে নিসাবের মালিক হলে যাকাত আদায় করবেন, আর নিসাবের মালিক না হলে যাকাত আদায় করতে হবে না। [আল-মাবসুত, সারাখসী- ২/১৬৪; আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/১৮৮; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২২২; তাবইনুল হাকায়েক- ২/৬২; মারাকিউল ফালাহ আলাত তাহতাবী- ১/৩৮৯; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী- ১/১৭৫] (উদাহরণ স্বরূপ, মনে করুন ‘৬-ই মহররম ১৪৪১ হিজরী’ তারিখে আপনার কাছে ছিল মোট ‘৬০,০০০/= (ষাট হাজার)’ টাকা। সেদিন রূপার বাজার মূল্য যদি ১ তোলা = ৬৫০ টাকা হয়, তাহলে মোট ৫২.৫ তোলা রূপা’র বাজার মূল্য হবে ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ) টাকা। এদিকে আপনার কাছে সেদিন ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ) টাকা’র চাইতে আরো বেশি মোট ‘৬০,০০০/= (ষাট হাজার)’ টাকা থাকায় আপনি সেদিন নিসাবের মালিক সাব্যস্থ হয়েছিলেন। এবারে এর ঠিক ১ (এক) বছর পর আপনার নিসাবের তারিখে (তথা ৬-ই মহররম ১৪৪২ হিজরী তারিখে) আপনি দেখতে পেলেন যে, আপনার কাছে আছে ৪৮,০০০/= (আটচল্লিশ হাজার) টাকা, আর এদিকে সেদিন ৫২.৫ তোলা রূপা’র মোট বাজার মূল্য হল ৪২,০০০/= (বিয়াল্লিশ হাজার) টাকা। কাজেই আপনি এবারে মোট ৪৮,০০০/= (আটচল্লিশ হাজার) টাকা’র উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করবেন মোট ১২০০/= (এক হাজার দুই’শ) টাকা। কিন্তু ৬-ই মহররম ১৪৪২ হিজরী তারিখে যদি আপনার কাছে ৪২,০০০/= (বিয়াল্লিশ হাজার) টাকার কম থাকতো {মনে করুন যদি মাত্র মাত্র ১০,০০০/= (দশ হাজার) টাকা থাকতো}, তাহলে সেদিন আপনি নিসাবের মালিক না হওয়ায় আপনার উপরে যাকাত ধার্য হত না। অর্থাৎ, নিসাবের তারিখ ও পরবর্তী বছরের নিসাবের একই তারিখের মধ্যবর্তী দিনগুলোতে আপনার আয়/ব্যয়ের জোয়ার-ভাটা বা উত্থান পতন হিসেবযোগ্য নয়, বরং হিসেবটা হল আপনার পরবর্তী বছরের নিসাবের তারিখে আপনি নিসাবের মালিক আছেন কিনা -সেটি)।

মাসআলাহ: প্রথম নিসাবের তারিখে এবং পরবর্তী যাকাতবর্ষে নিসাবের তারিখে কেউ নিসাবের মালিক ছিল বটে, কিন্তু এই দুই নিসাবের তারিখের মধ্যবর্তী পূর্ণ বছরের মধ্যে এক দিনের জন্যও যদি তার যাকাতযোগ্য সম্পদ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়, তাহলে উক্ত দ্বিতীয় নিসাবের তারিখে যাকাত আদায় করা তার উপরে ফরয নয়। কারণ, এক্ষেত্রে যাকাত ফরয হওয়ার জন্য এই দুই নিসাবের তারিখের মধ্যবর্তী পূর্ণ বছর ধরে অল্প কিছু হলেও জরুরতের অতিরিক্ত যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকা আবশ্যক। এমতাবস্থায়, সে যেদিন পূণরায় নিসাবের মালিক হবে, সেদিন থেকে সে পূণরায় পরবর্তী যাকাতবর্ষ গণনা শুরু করবে। [আল-বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/৯৮; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৩/১৮১; রাদ্দুল মুহতার- – ২/৩০২]

কী ধরনের নগদ আয় ও উপার্জনের উপরে যাকাত ফরয হয় -তার নমুনা 

মানুষ বিভিন্ন পন্থায় হালাল ভাবে আয় ও উপার্জন করে নগদ সম্পদ (স্বর্ণ/রোৗপ্য/নোট)-এর মালিক হতে পারে এবং এভাবে এক পর্যায়ে নেসাবের মালিক হলে তার উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে। বোঝার সুবিধার্থে নিম্নে কিছু নমুনা পেশ করা হল:-

(১) ওয়ারিসী (উত্তরাধিকার) সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদজনিত আয়/উপার্জন: পিতা মাতা ও নিকট আত্বীয়-স্বজনের মৃত্যুর পর তাদের ওয়ারিস (উত্তরাধিকার) হিসেবে শরীয়ত সম্মত ভাবে সম্পদের অংশ কোনো ওয়ারিসের মালিকানায় এলে, সেটা নিঃসন্দেহে তার জন্য একটি আয়।  এমতাবস্থায় সে নেসাবের মালিক হলে তার শুধুমাত্র ওয়ারিসী সূত্রে প্রাপ্ত নগদ সম্পদের (তথা স্বর্ণ রৌপ্য বা নগদ অর্থের) উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে। আর ওয়ারিসী সূত্রে প্রাপ্ত অনগদ সম্পদ (যেমন: জমি-জমা, গাছপালা, ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ইত্যাদি)’র উপরে সাধারণ অবস্থায় যাকাত ফরয হবে না, (তবে এগুলো বিক্রি করে দিয়ে নগদ অর্থের মালিক হলে তার উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে)। [আল-মাবসুত, সারাখসী- ২/১৯৬; আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/২৬০; বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/১১৬; আল-মুহিতুল বুরহানী- ৩/১৮০]

(২) পেশাগত আয়/উপার্জন: মানুষ বিভিন্ন ধরনের হালাল পেশায়/কার্যক্ষেত্রে কর্ম করে মজুরী বা বেতন বাবদ যে নগদ অর্থ উপার্জন করে, সেটাও তার একটি আয়। এমতাবস্থায় সে নেসাবের মালিক হলে সেক্ষেত্রে তার উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে।

পেশা/কার্যক্ষেত্রের বর্ণনা দিয়ে তো শেষ করা যাবে না। তবুও নমুনা স্বরূপ কয়েকটি পেশা/কর্মক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করছি, যাতে বাকি পেশা/কর্মক্ষেত্রগুলো অনুমান করে নেয়া সহজ হয়। যেমন:

(ক) চিকিৎসা পেশা: ডাক্তারের আয় ও উপার্জনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে বেতন, ডিসপেন্সারীতে রোগীদের থেকে নেয়া ভিজিটের অর্থ, বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানী বা ডায়াননোষ্টিক সেন্টার থেকে পাওয়া “হালাল” কমিশন (হারাম অংশটুকু’র কথা বলছি না), বিভিন্ন স্থানে গিয়ে রোগী দেখা বা চিকিৎসা/অপারেশন করার চার্য বাবদ অর্থ, চিকিৎসা-টুর বাবদ হালাল অর্থ (হারাম অংশটুকু’র কথা বলছি না)… ইত্যাদি। ডাক্তার নেসাবের মালিক হলে এসব নগদ অর্থের উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে।

(খ) শিক্ষকতা পেশা: শিক্ষকের আয় ও উপার্জনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে বেতন, টিউশনীর অর্থ, পরীক্ষাক্ষেত্রে ডিউটি দানে পাওয়া অর্থ, শিক্ষার্থিদের পরীক্ষার খাতা দেখার অর্থ, শিক্ষাটুর বাবদ হালাল অর্থ ((হারাম অংশটুকু’র কথা বলছি না)…. ইত্যাদি। শিক্ষক নেসাবের মালিক হলে এসব নগদ অর্থের উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে।

(খ) অপরাপর আরো যত হালাল পেশা আছে, এ থেকে তা অনুমান করে নিন, (এবং প্রয়োজনে বিজ্ঞ মুফতি থেকে মাসআলাহ জেনে নিন)

(৩) ব্যবসায়ীক আয়/উপার্জন: ছোট ব্যবসা হোক বা বড় ব্যবসা -যে কোনো পরিধির হালাল ব্যবসা করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী যে নগদ অর্থ মুনাফা স্বরূপ উপার্জন করে, সেটাও তার একটি আয়। এমতাবস্থায় সে নেসাবের মালিক হলে সেক্ষেত্রে তার উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে। [কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ- ২/৯৭; আল-মাবসুত, সারাখসী- ২/১৫৩; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২১৬; আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৭৩; বাদায়েউস সানায়ে- ২/১২৩; আল-মুহিতুল বুরহানী- ৩/১৬৭]

মাসআলাহ: যদি একাধিক ব্যাক্তি একজোট হয়ে ‘শরীকী ব্যবসা’ (joint venture business) করে -চাই ছোট ব্যবসা করুক বা বড় ব্যবসা -উভয় অবস্থাতেই ব্যবসার মুনাফা (profit)-এর মধ্যে যার যে পরিমান মুনাফা শরীয়সম্মত ভাবে প্রত্যেকের ভাগে আসে সে সেই পরিমান মুনাফার উপরে যাকাত আদায় করবে -যদি সে নেসাবের মালিক হয়।  

মাসআলাহ: অনেকে মনে করে, আমাদের এযুগের যাদেরকে আমরা সমাজে স্বচ্ছল ও ধ্বনী ব্যবসায়ী মনে করি, শুধুমাত্র তাদের উপরে যাকাত ফরয হয়, যা একটি ভুল ধারনা। বেশ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছোট ছোট কাঁচাবাজারী, মুদি’র ব্যবসায়ী, (ভাঙ্গা কাঁচ ও লোহা-লক্করের) ভাংরীর ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকানী, এমনকি মুড়ি-চানাচুর ও ফুচকার ব্যবসায়ী পর্যন্ত বাহ্যিক ভাবে গরীব ঘরানার দেখতে লাগলেও এদের অনেকেই আলাদা করে অর্থ জমা করে থাকে। এভাবে অর্থ জমা হতে হতে সে নেসাবের মালিক হলেও তার উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে, (কারণ নেসাবের মালিক হলে সে শরীয়তের দৃষ্টিতে মালদার/স্বচ্ছল/ধ্বনী হিসেবে গণ্য হবে)।

(৪) ইজারাহ (ভাড়া) দিয়ে আয়/উপার্জন: কোনো ব্যাক্তি শরয়ী পন্থায় কোনো কিছু (যেমন: বাড়ি/ঘর, জমি, যানবাহন, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি) ইজারা/ভাড়া দিয়ে তার বিনিময়ে যে নগদ অর্থ উপার্জন করে, সেটাও তার একটি আয়। এমতাবস্থায় সে নেসাবের মালিক হলে সেক্ষেত্রে তার উপরে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে। [আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৭৩; বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/৯১; আল-মুহিতুল বুরহানী- ৩/১৬৭; ফাতাওয়ায়ে খানিয়া- ১/২৫১; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদদুর- ১/৩৯২]

(৫) নগদ পাওনা: কোনো ব্যাক্তি যদি কারোর কাছ ………………………………..

 

আলোচনার বাকি অংশ দেখার জন্য এখানে >>>ক্লিক করুন>>> 

 


ফরয যাকাত : [পৃষ্ঠা ১] , [পৃষ্ঠা ২] , [পৃষ্ঠা ৩] , [পৃষ্ঠা ৪ (অসম্পূর্ণ)][পৃষ্ঠা ৫] , [পৃষ্ঠা ৬ (অসম্পূর্ণ)] , [পৃষ্ঠা ৭ (অসম্পূর্ণ)