ফরয যাকাতের ব্যয় খাত সমূহ ৮ টি – কুরআন, হাদিস ও ফিকহী মাসায়েল

Spread the love

ফরয যাকাতের ব্যয় খাত সমূহ ৮ টি – কুরআন, হাদিস ও ফিকহী মাসায়েল

 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ سَيِّدِنَا مَوْلَانَا مُحَمَّدٍ وَعَليٰ اٰلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ صَلوٰةً تُنَجِّيْنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْأَهْوَالِ وَاْلآفَاتِ وَتَقْضِيْ لَنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْحَاجَاتِ وَتُطَهِّرُنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ السَّيِّاٰتِ وَتَرْفَعُنَا بِهَا عِنْدَكَ اَعْليٰ الدَّرَجَاتِ وَتُبَلِّغُنَا بِهَا اَقْصىٰ الْغَايَاتِ مِنْ جَمِيْعِ الْخَيْرَاتِ فِي الْحَيَاتِ وَبَعْدَ الْمَمَاتِ- اِنَّكَ عَليٰ كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ

[উল্লেখ্য, এখানে যাকাতের ব্যয় খাত সমূহে উল্লেখিত আয়াত, হাদিস ও ইবারত সমূহ এবং এসবের অনুবাদ’কে কোনো বিজ্ঞ মুহাক্কেক আলেমের পরামর্শ ব্যাতীত কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে আমার অযোগ্যতার কারণে এখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করে নেয়ার আগেই মানব সমাজে ছড়িয়ে না যায়। এগুলো পড়ুন ইলম অর্জনের জন্য এবং যোগ্য আলেম থেকে তা বুঝিয়ে নিন। আর কোনো যোগ্য চোখে উল্লেখযোগ্য ভুল ধরা পড়লে তা আমাকে অবগত করুন।]

 

যাকাতের ব্যয়খাত মোট ৮টি: খোদ্ আল্লাহ তাআলা কর্তৃত নির্ধারিত

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করছেন-

 إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

‘যাকাত (ব্যয়যোগ্য) শুধুমাত্র ফকির ও মিসকীনদের জন্য এবং একাজে নিয়োজিত আমেলদের জন্য ও মুয়াল্লাফাতুল ক্বুলুব-এর জন্য, এবং দাস-মুক্তিতে ও ঋণগ্রস্থদের (ঋণমুক্তির) কাজে, এবং আল্লাহ’র পথে ও ইবনুস-সাবিল (-এর অভাব মোচনের) কাজে। (এই খাতগুলো) আল্লাহ’ কর্তৃক ফরযকৃত। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী মহাপ্রজ্ঞাময়’। [সূরা তাওবা ৬০]

এই আয়াতে যাকাত ব্যয়ের মোট ৮টি খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে- فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ – {(এই খাতগুলো) আল্লাহ কর্তৃক ফরযকৃত}। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ধ্বনী মুসলমানদের উপরে তাদের ধ্বনমালের যাকাত আদায়কে ফরয করে দিয়েছেন এবং উসূলকৃত যাকাত’কে উপরোক্ত ৮টি খাতে ব্যয় করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখাকেও ফযর (অপরিহার্য) করে দিয়েছেন; এর বাইরে নয় -চাই সেই যাকাত আদায় করুক যাকাত-দাতা নিজেই কিংবা রাষ্ট্রের খলিফা/শাসক অথবা খলিফার যাকাত-উসূলকারী আমেল (কর্মী) কিংবা অন্য কেউ।

যিয়াদ বিন হারিছ আস-সুদায়ী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তাতে তিনি বলেন-أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَبَايَعْتُهُ فَذَكَرَ حَدِيثًا طَوِيلاً قَالَ فَأَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ أَعْطِنِي مِنَ الصَّدَقَةِ ‏.‏ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى لَمْ يَرْضَ بِحُكْمِ نَبِيٍّ وَلاَ غَيْرِهِ فِي الصَّدَقَاتِ حَتَّى حَكَمَ فِيهَا هُوَ فَجَزَّأَهَا ثَمَانِيَةَ أَجْزَاءٍ فَإِنْ كُنْتَ مِنْ تِلْكَ الأَجْزَاءِ أَعْطَيْتُكَ حَقَّكَ . أخرجه أبو داود في سننه , كتاب الزكاة : ٢/٣٨١ رقم ١٦٣٠ ، و الدارقطنى في سننه ٢/١٣٧ رقم ٩، و البيهقى في السنن الكبرى : ٤/٢٩٠ رقم ٧٧٣٣، فيه عبد الرحمن بن زياد وهو الأفريقى قال الحافظ فى التقريب : ضعيف فى حفظه و كان رجلا صالحا ، و ضعفه الألباني في إرواء الغليل : ٣/٣٥٣ رقم ٨٥٩ – “আমি (একদিন) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বায়াত হলাম’। এরপর তিনি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করে বলেন: ‘পরে এক ব্যাক্তি (তাঁর কাছে) এসে বললো: ‘(ইয়া রাসুলাল্লাহ!) আমাকে যাকাত থেকে (কিছু) দান করুন’। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করলেন: ‘নিশ্চই আল্লাহ তাআলা যাকাতের ব্যাপারে -না তাঁর নবীর বিধানে রাজি হবেন আর না সেঁ ভিন্ন অন্য কারোর (বিধানে)। বস্তুত: তিঁনি (সেই মহান পবিত্র সত্ত্বা যিঁনি) নিজেই এ ব্যাপারে বিধান দিয়ে দিয়েছেন। তিঁনি সেটিকে আটটি খাতে ভাগ করেছেন। সুতরাং, তুমি যদি ওই ভাগ গুলির মধ্যে থেকে (কোনো একটি খাতের আওতাভুক্ত প্রাপক সাব্যস্থ) হও, তাহলে আমি তোমার হক্ব তোমাকে দিয়ে দিবো”। [সুনানে আবু দাউদ- ২/৩৮১ হাদিস ১৬৩১; সুনানে দারাকুতনী- ২/১৩৭ হাদিস ৯; সুনানুস কুবরা, ইমাম বাইহাকী- ৪/২৯০ হাদিস ৭৭৩৩; সুনানুস সুগরা, ইমাম বাইহাকী- ২/৭৪ হাদিস ১২৬৫]

যাকাতের উপরোক্ত ৮ টি খাতের বিস্তারিত দালিলিক আলোচনার স্থান-তো এটি নয়। এর জন্য ফুকাহায়ে কেরামের বড় বড় কিতাবে বিস্তারিত ফিকহী আলোচনা দলিল সহ বর্ণিত আছে। আমি এখানে শুধুমাত্র এই ৮টি খাতের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কিছু কথা সামান্য দলিল ও হাওয়ালাহ সহকারে খানিকটা ধারনা দিতে চাই, যাতে সাধারণ পাঠকের কাছে অল্পতেই বিষয়বস্তুটা বুঝে আসে।

(১) ফকির’দের জন্য:- এখানে ‘ফকির’ বলা হয়েছে মূলত: ওই দরিদ্র ও অভাবী মুসলীম ব্যাক্তিকে, যে তার বা তার উপরে দায়িত্ব রয়েছে -এমন পরিবারের দৈনিক মৌলিক প্রয়োজন গুলো ঠিক মতো পূরণ করতে পারে, বরং দরিদ্রতা বা অভাব লেগে থাকাটাই যেন তার জীবনধারায় স্বাভাবিক। ‘ফকির’ কথাটির মধ্যে– (১) ওই ব্যাক্তি শামিল, যে তার আত্বমর্যাদাবোধ ও লজ্জার কারণে তার অভাবী দুরাবস্থার কথা মানুষের কাছে মুখফুটে বলতে পারেনা। যেমন, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا ۗ وَ مَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ – “আর (হে মুমিনগণ, তোমরা ওই সকল) ফকীর’দের জন্য (সাধ্য মতো দান-সদকাহ করার ব্যবস্থা অবশ্যই করো) যারা আল্লাহ’র পথে ব্যাপৃত হয়ে আছে (এবং দ্বীনের জরুরী সব খেদমতের কারণে) তাদের পক্ষে (উপার্জনের কাজে আলাদা ভাবে) জমিন মাড়িয়ে বেড়ানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না, (কারণ তারা দ্বীনের খেদমত ছেড়ে উপার্জনের পিছনে লেগে গেলে সে কাজ করবে কে? আর তাদের বাহ্যিক) ভদ্রতা-নম্রতা দেখে জাহেল-মুর্খরা তাদেরকে মনে করে তারা (বুঝি যথেষ্ট স্বচ্ছল ও) ধ্বনী। (বস্তুত:) তুমি তাদেরকে চিনতে পারবে তাদের চেহারা(য় গাম্ভীর্যতা ও আত্বসম্মানবোধের আলোকচ্ছটা) দেখে। তারা লোকজনের কাছে কাকুতি করে সওয়াল করে না। আর তোমরা কল্যানকর যা কিছু দান করো, বস্তুত: আল্লাহ সে ব্যাপের ভাল করেই জ্ঞান রাখেন”। [সূরা বাকারাহ ২৭৩] (২) ওই ব্যাক্তিও শামিল, যে তার অভাব ও দরিদ্রতার কথা মানুষের কাছে বলেও ফেলে, যাতে তার প্রয়োজনটুকু পূরণ হয়ে যায়ে।

উল্লেখ্য: এখানে ‘ফকির’ বলতে আমাদের দেশীয় ভাষায় ‘ফরিক’ নামে পরিচিত ওই সকল ব্যাক্তিরা উদ্দেশ্য নয়, যাদের অভাবকে কেউ পূরণ করে দিলেও তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমানোর জন্য ভিক্ষার নামে ব্যবসা করে বেড়ায়; আবার ওই সকল সুস্থ্যদেহী ভিক্ষুকরাও উদ্দেশ্য নয়, যারা কর্মক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ভিক্ষা করে বেড়ায়। তবে এদের মধ্যে যারা বৃদ্ধ, বিকলাঙ্গ ও অকর্মক্ষম, যাদের ভিক্ষা ছাড়া বাহ্যত: এমন কোনো আয়ের উৎস নেই যা দ্বারা তারা নূন্যতম খানাপিনা বা মাথাগোঁজার মতো ঠাই কিংবা কাপড়চোপড়ের অভাব পূরণ করতে পারে, তাদেরকে প্রয়োজন পূরণের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যেতে পারে। 

(২) মিসকীন’দের জন্য:   এখানে ‘মিসকীন’ বলা হয়েছে মূলত: ওই অভাবীগ্রস্ত মুসলীম ব্যাক্তিকে, যে তার জীবনের মৌলিক প্রয়োজনটুকু পূরণের প্রশ্নেও বলা যায় যে, সে নিঃস্ব বা রিক্তহস্ত হয়ে গেছে -চাই সেই নিস্বতা প্রাকৃতিক কারণে হোক বা কৃত্রিম কারণে। যেমন: ব্যবসায়ীক ক্ষতিতে রিক্তহস্ত ব্যাক্তি, নদী ভাঙ্গনে নিঃস্ব ব্যাক্তি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কিংবা বিধবা নারী যাদের আয়-উপার্জনের উৎস নেই, এক্সিডেন্টে শারীরীক ক্ষয়-ক্ষতি হওয়া ব্যাক্তি যার আয়-উপার্জনের পথ রুদ্ধ হয়ে আছে … প্রমুখ।

আবু হুরায়রাহ রা.-এর সূত্রে রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন:لَيْسَ الْمِسْكِينُ الَّذِي يَطُوفُ عَلَى النَّاسِ تَرُدُّهُ اللُّقْمَةُ وَاللُّقْمَتَانِ وَالتَّمْرَةُ وَالتَّمْرَتَانِ وَلَكِنِ الْمِسْكِينُ الَّذِي لَا يَجِدُ غِنًى يُغْنِيهِ وَلَا يُفْطَنُ بِهِ فَيُتَصَدَّقُ عَلَيْهِ وَلَا يَقُومُ فَيَسْأَلُ النَّاسَ . أخرجه البخاري، كتاب الزكاة، باب قول الله تعالى: لاَ يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا  وكم الغِنى  برقم: ١٤٧٩، ومسلم، كتاب الزكاة، باب المسكين الذي لا يجد غنى، ولا يفطن له فيتصدق عليه، برقم ١٠٣٩، و غيرهما ايضا – “মিসকীন সে নয়, যে (ভিক্ষার উদ্দেশ্যে) মানুষের চারপাশে ঘুরঘুর করে বেড়ায়, যাকে এক লোকমা বা দুই লোকমা (খাবার) কিংবা দু-একটি খেজুরই ফিরিয়ে দিতে পারে। বরং মিসকীন হল সে, যে এতটুকু সম্পদও (উপার্জন করতে) পায় না, যা তাকে (অন্যের দ্বরস্থ হওয়া থেকে) অমুকাপেক্ষী বানিয়ে দিতে পারে, আর না সে অবস্থায় তাকে (দেখে) চেনা যায় (যে, সে অভাবে আছে)। ফলে কেউ তাকে দানও করে না, আর না সে মানুষের কাছে সওয়াল (যাঞ্চা) করার জন্য দাঁড়ায়। ”। [সহিহ বুখারী- ২/১২৫ হাদিস ১৪৭৯; সহিহ মুসলীম- ২/৭১৯ হাদিস ১০৩৯; মুসনাদে আহমদ- ১/৩৮৪; সুনানে নাসায়ী- ৫/৮৪ হাদিস ২৫৭১; সুনানে আবু দাউদ- ২/২৮৩ হাদিস ১৬৩১; সুনানে দারেমী- ১/৪৬২ হাদিস ১৬১৫; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী– ৭/১৬ হাদিস ১৩১৪৭]

উপরের হাদিসটির অর্থ এই নয় যে, ‘মিসকীন পর্যায়ের কোনো নিঃস্ব অভাবী ব্যাক্তি তার দারিদ্রতা ও অভাবের কথা কাউকে বলে ফেললে সে আর মিসকীন বলেই গণ্য হবে না’। বরং, এর অর্থ কেবল ‘অভ্যস্থ ভিক্ষুক’ এবং ‘প্রকৃত মিসকীন’ কারা -তা চিনিয়ে দেয়া। যেমন, আবু হুরায়রাহ রা.-এর সূত্রে রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন:لَيْسَ الشَّدِيدُ بالصُّرَعَةِ؛ إِنَّمَا الشَدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ . أخرجه البخاري، كتاب الأدب، باب الحذر من الغضب : ٥/٢٢٦٧ رقم ٥٧٦٣، و مسلم، كتاب البر والصلة والآداب، باب فضل من يملك نفسه عند الغضب وبأي شيء يذهب الغضب : ٤/٢٠١٤ رقم ٢٦٠٩  – “(মূলত: প্রতিপক্ষকে ধরাসায়ী করে দেয়ার প্রশ্নে তার) কুস্তিগিরি’র (শক্তি-সামর্থ) দ্বারা (কোনো মানুষের) শক্তিমত্তা (প্রমাণিত) হয় না। (প্রকৃত) শক্তিমত্তা কেবল তারই রয়েছে, যে ক্রধের সময় তার নফস (প্রবৃত্তি)-কে কাবুতে রাখতে পারে”। [সহিহ বুখারী– ৫/২২৬৭ হাদিস ৫৭৬৩; সহিহ মুসলীম- ৪/২০১৪ হাদিস ২৬০৯] নিঃসন্দেহে এই হাদিসের উদ্দেশ্যও কোনো কুস্তিগিরের কুস্তি-শক্তি’কে মূল থেকেই অস্বীকার করা নয়, বরং উদ্দেশ্য হল, শারীরীক শক্তির অধিকারী কুস্তিগিরের চাইতেও বড় কুস্তিগির হল যে তার ক্রধের সময় নিজকে শরীয়তের সীমার মধ্যে কন্ট্রোল করে রাখতে পারে।

একই ভাবে, উপরের মিসকীন সম্পর্কিত হাদিসটিরও একই জাতীয় অর্থ উদ্দেশ্য। হাদিসটির অর্থ হল, ‘প্রকৃত মিসকীনই হল যাকাতের অধিক হক্বদার এবং এরকম মিসকীনকেই খুঁজে নিয়ে যাকাত থেকে তার অভাব পূরণের বন্দোবস্থ করা উচিৎ’। তবে যারা মানুষের কাছে তাদের নিঃস্বতা ও রিক্তহস্ততার কথা বলে ফেলে -তারা ‘মিসকীন’ কথাটির বাহিরের কেউ নয়। সুতরাং, ‘মিসকীন’ কথাটির মধ্যে– (১) ওই ব্যাক্তিও শামিল রয়েছে, যে তার নিঃস্বতা বা রিক্তহস্ত দরিদ্রতার কথা মানুষের কাছে বলেও ফেলে, যাতে তার প্রয়োজন পূরণের কোনো সুরাহা হতে পারে, (২) ওই ব্যাক্তিও শামিল রয়েছে, যে তার আত্বমর্যাদাবোধ ও লজ্জার কারণে তার নিঃস্বতা বা রিক্তহস্ত দরিদ্রতার কথা মানুষের কাছে মানুষের কাছে মুখফুটে বলতে পারেনা।

(৩) যাকাত উসূল ও বন্টন কাজে নিয়োজিত আমেল (কর্মী)দের জন্য: এরা হল ওই সকল মুসলমানগণ যাদেরকে ধ্বনীদের মাল-সম্পদ থেকে ‘যাকাত’ উসূল করা ও তা যোগ্য খাত সমূহে বন্টনের কাজে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদেরকে পারিশ্রমিক বাবদ যাকাতের মাল থেকে দেয়া যাবে। এখানে কয়েকটি বিষয় প্রনিধানযোগ্য:

(ক) ধ্বনী/স্বচ্ছল ব্যাক্তিকেও ‘আমেল’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে। কারণ, যাকাত থেকে আমেলকে তার যাকাতের মাল উসূল ও বন্টনের কাজের পারিশ্রমিক বাবদ দেয়া হবে; সেটা তার প্রতি কোনো দান নয়। যেমন, আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لاتَحِلُّ الصدقةُ لغَنِيٍّ إلا لخمسةٍ  العاملِ عليها…….. . رواه ابن خزيمة في صحيحه : ٤/٧١ رقم ٢٣٧٤، و وقال الأعظمي في تعليقه على صحيح ابن خزيمة: إسناده صحيح، و ايضا أبو داود في سننه , كتاب الزكاة , باب من يجوز له أخذ الصدقة وهو غني : ١٦٣٥، و الشافعي في الأم: ٢/٧٣، و الحاكم في المستدرك : ١/٤٠٨ من طرق عن مالك به، و أخرجه ابن أبي شيبة في المصنف : ٣/٢١٠ و أبو عبيد في الأموال: رقم ١٩٨٤ من طريق سفيان بن عيينة به، أما رواية معمر فأخرجها عبد الرزاق في المصنف: ٧١٥١ و أحمد في مسنده : ١١٥٥٥ و ابن ماجه في سننه : ١٨٤١ و ابن خزيمة في صحيحه : ٤/٦٩ رقم ٢٣٦٨ و الحاكم في المستدرك : ٤/١٤ و غيرهم من طرق عبد الرزاق عن معمر عن عطاء بن يسار عن أبي سعيد به موصولاً، صحَّحه الألباني في إرواء الغليل : رقم ٨٧٠– “কোনো গণী (ধনাঢ্য/অমুকাপেক্ষি) ব্যাক্তির জন্য যাকাত হালাল নয়, তবে (এই) পাঁচজনের ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম: (যাদের একজন হল) যাকাতের (উসূল ও বন্টন কাজে নিযুক্ত) আমেল (কর্মী)………….”। [সহিহ ইবনে খুযাইমা– ৪/৭১ হাদিস২৩৭৪, ৪/৬৯ হাদিস ২৩৬৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৬৩৫; মুআত্তা ইমাম মালেক– ১/২৬৮; আল-উম্ম, ইমাম শাফেয়ী- ২/৭৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৮৪১; মুসতাদরাকে হাকিম- ১/৪০৮, ৪/১৪; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ- ৩/২১০; আল-মুসান্নাফ, আব্দুর রাজ্জাক- ৭১৫১; মুসনাদে আহমদ- ১১৫৫৫; আল-আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ১৯৮৪]

(খ) একাজে নিয়োগ পাওয়ার অধিকারী শুধুমাত্র একজন আমানতদার মুসলীম; কোনো অমুসলীম কাফের নয়। কারণ, কোনো শরয়ী বিষয়ের ক্ষেত্রে অমুসলীমকে অবিশ্বাসযোগ্য মনে করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ– ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা মুমিনদেরকে বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে (তোমাদের) ওলী (অভিভাবক ও বন্ধু) হিসেবে গ্রহন করে নিবে না’।[সূরা নিসা ১৪৪]

হযরত আইয়্যাসের সূত্রে উত্তম সনদে একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে যে,হযরত ওমর রা. একবার হযরত হযরত আবু মুসা আশআরী রা.কে নির্দেশ দিলেন, তিনি কত আয় করেছেন কত ব্যয় করেছেন তার হিসেব একটি চামড়ায় লিখে যেন তার কাছে পেশ করেন। সে সময় আবু মুসা আশআরীর ছিল একজন খৃষ্টান লেখক, তিনি তাকেই (হিসাব সহ হযরত ওমরের সামনে) পেশ করলেন। এতে হযরত ওমর রা. অবাক হয়ে বললেন- إن هذا لحفيظ  – ‘এই ব্যাক্তি হিসাব সংরক্ষক’ !!! তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন- هل أنت قارئ لنا كتابا في المسجد جاء من الشام؟ ‘তুমি কি মসজিদের মধ্যে আমাদেরকে শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) থেকে আগত ফরমান পড়ে শোনাবে’? তখন হযরত আবু মুসা আশআরী রা. বললেন-(إنه لا يستطيع (أن يدخل المسجد -‘না, তার পক্ষে (মসজিদে ঢোকা) সম্ভব নয়’। হযরত ওমর রা. জিজ্ঞেস করলেন- أجنب هو؟ – ‘সে কি অপবিত্র (যে, মিসজিদে প্রবেশ করতে পারবে না)’? হযরত আবু মুসা আশআরী রা. বললেন- لا بل نصراني – ‘না, বরং সে একজন খৃষ্টান’। হযরত আবু মুসা আশআরী রা. বললেন: একথা শুনে হযরত ওমর রা. আমাকে ধমক দিলেন এবং পিঠে একটি চাপড় দিয়ে বললেন- أخرجوه -‘তাকে (এই দায়িত্ব থেকে) বহিষ্কার করো’। এরপর তেলাওয়াত করলেনيَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ  – ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ইহুদী ও খৃষ্টানদেরকে তোমাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহন করো না। [তাফসীরে ইবনে আবি হাতেম- ৪/১১৫৬, হাদিস ৬৫১০; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী-১০/১২৭, ৩২৮; শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী, হাদিস ৯৩৮৪; তাফসীরে ইবনে কাসির-৫/১৩৬ ; মুসনাদে ফারুক, ইবনে কাসির-২/৪৯৪; আদ্দুররুল মানসুর, ইমাম সুয়ূতী- ২/৫১৬]

‘ফরয যাকাত’ উসূল করণ ও তা নির্ধারিত খাতে বন্টন কাজটি যেহেতু একটি বিরাট আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার কাজ এবং এর সাথে মুসলমানদের আর্থিক শক্তি-সামর্থ চাঙ্গা করা, জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি’র বিষয়টি অতপ্রত ভাবে জড়িত, তাই এ কাজে অবশ্যই কোনো অমুসলীম/কাফের’কে নিয়োগ দেয়া যাবে না। কারণ, একে-তো অমুসলীম/কাফেররা কোনো দিনই তাদের নিজেদের চাইতে মুসলমানদের অর্থনৈতিক শক্তি ও জীবনযাত্রার মান উচ্চতর ও মজবুত হোক -তা মোটেও চাইবে না। তাই চোরা শত্রুদের হাতে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া, আর এই সুযোগের হাত ধরে ধীরে ধীরে মুসলমানদের কোমড় ভাঙ্গার কাজে খাল কেটে কুমির আনা -শেষমেস একথাই প্রমাণিত হবে।

ইমাম ইবনে কুদামাহ রহ. লিখেছেন, যেখানে ওমর রা. আবু মুসা আশঅারী’র দফতরে কেরানী পদে একজন খৃষ্টানকে নিয়োগ দান করাকে সমর্থন করেন নি, সেখানে যাকাত হল ইসলামের এটি ফরয বিষয়, সেখানে (অমুসলীমকে আমাদের এজাতীয় মুসলমানদের বিষয় আসয়ে যুক্ত না করার) এই নীতি তো অবশ্যই অনিবার্য হবে। [আল-মুগনী, ইবনে কুদামাহ- ২/৪৬]

(খ) ‘আমেল’কে যাকাতের মাসআলাহ মাসায়েলের ব্যাপারে সুপ্রসস্থ ও গভীর ইলমের অধিকারী হতে হবে। কারণ, জাহেরী ধ্বনসম্পদ (সোনা, রূপা, অর্থকড়ি), বিচরণশীল গবাদী পশু, শস্য ও ফলমূল ইত্যাদি কোন কোন ও কী ধরনের জিনিসাদির উপরে কি পরিমান যাকাত উসূল করতে হবে, এবং কোন কোন কোন খাতে কোন ধরণের ব্যাক্তি যাকাত পাওয়ার হক্বদার হবে, এবং যাকাত বন্টন পর্যায়ে শরয়ী ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নানাবিধ জটিল জটিল বিষয়াদি সম্পর্কে সুগভীর ইলম না থাকলে একাজে বহু ধরনের ছোট বড় ভুল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। [আল-মাজমু, ইমাম নববী- ৬/১৬৭] (বিশেষ করে এই ডিজিটাল যুগে এমন অনেক আধুনিক মাসআলাহ রয়েছে, যার সহিহ ইলম না থাকলে যাকাতের অনেক প্রকারের খেয়ানত হওয়া সহ হারাম ও নাজায়েয বিষয়ে জড়িয়ে পড়ারও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে)।

(৪) মুয়াল্লাফাতুল ক্বুলুব-এর জন্য (যাদের মনতুষ্টির প্রয়োজন):  এখানে এমন সব মুসলীম নারী-পুরুষরা অন্তর্ভূক্ত, যাদের অন্তরগুলোকে দ্বীন ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে আকৃষ্ট রাখা’র প্রয়োজন দেখা দেয়, অন্যথায় তারা দ্বীন ইসলাম ত্যাগ করে মুর্তাদ হয়ে যাওয়ার কিংবা তাদের দ্বারা দ্বীন ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন:-

(ক) নব-মুসলীম, যারা ইসলাম গ্রহনের পর আর্থিক সহায়তা, খাদ্য ও বাসস্থানের সহায়তা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা মূলক সহায়তা ইত্যাদির মুকাপেক্ষি হয়ে পড়ে এবং এসব মৌলিক বিষয়ের সম্ভাব্য নিশ্চয়তা না পেলে তারা দ্বীন ইসলাম ত্যাগ করে পূণরায় কাফের/মুরতাদ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাদের এসব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য তাদেরকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে। 

(খ) নব-মুসলীম, যারা ইসলাম গ্রহনের পূর্বে সামাজিক ভাবে স্বচ্ছল/মালদার/অভাবহীন হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ভাবে উচ্চ মানমর্যাদার অধিকারী হিসেবে পরিচিত থাকে, এখন ইসলাম গ্রহনের পর মালদার স্বচ্ছল/মালদার/অভাবহীন রয়েছে বটে, কিন্তু এজাতীয় কিছু কিছু মানুষকে কখনো কখনো আরো অতিরিক্ত উল্লেখযোগ্য পরিমান ধ্বনমাল প্রয়োজন মর্মে অনুমিত হয়ে থাকে, যাতে ইসলাম গ্রহনের পর তাদের ইসলামপূর্ব সেই সামাজিক মানমর্যাদা’র অভাবটুকুর ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় এবং যাতে তারা দ্বীন ইসলামে প্রবেশের পর শয়তানের ধোকায় পড়ে নিজদেরকে এই ধিক্কার দিতে না থাকে যে, ‘হায়! কেনো ইসলাম গ্রহন করতে গেলাম’। এই জাতীয় লোকগুলি যাতে দ্বীন ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে চির জাহান্নামী হয়ে না যায়, বরং ধীরে ধীরে ইসলামের ছায়াতলে থেকে ইমানকে মজবুত করে নিতে পারে, সেজন্য এধরনের মানমর্যাদা সম্পন্ন ধ্বনী-মালদার নব-মুসলীমগণকেও যাকাত থেকে দেয়া যাবে। মু’কিল বিন উবাইদুল্লাহ রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-  سألت الزهري عن قوله: ﴿والمؤلفة قلوبهم﴾ ، فقال: من أسلم من يهوديّ أو نصراني . قلت: وإن كان غنيًّا؟ قال: وإن كان غنيًّا – “আমি যুহরী’কে আল্লাহ’র কালাম والمؤلفة قلوبهم সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: ‘(এখানে তাদের কথা বলা হয়েছে) যারা ইহূদী বা খৃষ্টান ধর্ম থেকে ইসলাম কবুল করেছে’। আমি বললাম: ‘তারা যদি গণী (মালদার/অমুকাপেক্ষী) হয় -তবুও’? তিনি বললেন: ‘(হ্যাঁ) যদি যদি গণী (মালদার/অমুকাপেক্ষী) হয় -তবুও”। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৩১৪ আছার ১৬৮৫১; তাফসীরুল কুরআন, ইমাম ইবনু আবি হাতেম- ১/১৮২৩ আছার ১০৩৮৩; আহকামুল কুরআন, ইমাম জাসসাস- ৩/১৬১]

(গ) দূর্বল ইমানের অধিকারী মুসলমানগণ, যাদেরকে আর্থিক ও অন্যান্য বিভিন্ন প্রকারের সহায়তা না দিলে তারা দ্বীন ইসলাম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহন করে পারে, তাদেরকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে। যেমনটা অনেক ক্ষেত্রে হিন্দু/খৃষ্টান/ইহূদী/কাদিয়ানী মিশনারীদের প্রস্তাবিত আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার প্রলোভনে অনেক দূর্বল ইমানের অধিকারী মুসলমানগণ ইসলাম ত্যাগ করে মুর্তাদ হয়ে যায় এবং অন্য ধর্ম গ্রহন করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে। এরকম মুসলমানদের একজন’কেও যাতে ইমান হারা হতে না হয়, এজন্য যাকাত থেকে তাদেরকে সহায়তা দেয়া যাবে।

(ঘ) মুনাফেক/দূর্বল ইমানের অধিকারী মুসলমানরা, যারা সমাজে মুসলমান হিসেবেই পরিচিত থাকে, কিন্তু কাফেরদের প্রস্তাবিত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার প্রলোভনে তাদের সাথে হাত মিলিয়ে তলে তলে ইসলাম, খিলাফত কিংবা মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধনে তৎপর থাকে বা থাকার সমূহ সম্ভাবনা থাকে (যা খলিফা ও মুমিন মুসলমানগণ অনুভব করলেও পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপের মুখে কিছু বলার বা করার মতো সামর্থ রাখে না) এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ হলে তারা এ জাতীয় মুনাফেকী মূলক ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকারও সমূহ সম্ভাবনা থাকে, তাদের থেকে দ্বীন ইসলাম ও মুসলমানদেরকে সম্ভাব্য নিরাপদ রাখার স্বার্থে যাকাত থেকে তাদেরকে দেয়া যাবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ‘মুআল্লাতুল কুলুব’-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে- و هم قوم كانوا يأتون رسول الله ﷺ قد أسلموا، وكان رسول الله ﷺ يرضَخ لهم من الصدقات، فإذا أعطاهم من الصدقات فأصابوا منها خيرًا قالوا: هذا دين صالح! وإن كان غير ذلك، عابوه وتركوه – “ওরা ছিল এমনসব লোকজন, যারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে ইসলাম কবুল করেছিল। রাসুলুল্লাহ (তাদের ইমানী দূর্বলতা’র বিষয়টি অনুভব করে) তাদেরকে যাকাত থেকে দিয়ে (দ্বীনের) অনুগত করে রাখতেন। তিঁনি যখন তাদেরকে যাকাত থেকে দিতেন, তখন তারা ওসবের কারণে (ইসলামের) প্রশংসা করে বলতো: ‘এই ধর্মটি সঠিক’। আর যদি ঘটনা এর বিপরীত হত, তখন তারা তাঁর কুৎসা গেয়ে বেড়াতো ও তাঁকে ত্যাগ করতো”। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৩১৩ আছার ১৬৮৪৫]

(৫) দাস-মুক্তি’র কাজে: মুসলমান দাস বা দাসীদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য তাদের ‘মুক্তিমূল্য’ বাবদ যাকাত থেকে আদায় করা যাবে। (এই খাতটি বর্তমান জামানায় বিলুপ্ত প্রায়, তাই এখানে এব্যাপারে শর্ত-শরায়েত ও আলোচনা পরিত্যাগ করা হল)

(৬) ঋণগ্রস্থদের (ঋণমুক্তির) কাজে:  এখানে গারেমুন (ঋনগ্রস্থ’রা) বলতে মূলত: ঠেঁকায় পড়ে ঋনগ্রস্থ মুসলীম উদ্দেশ্য। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে যা কিছু হারাম/নাজায়েয কিংবা অপচয়/অপব্যয় হিসেবে গণ্য -তা পূরণ করতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয় যারা -এখানে তারা উদ্দেশ্য নয় এবং তাদেরকে যাকাত থেকে দেয়াও যাবে না। যেমন, ইমাম আবু জা’ফর রহ বলেছেনالغارمون، المستدين في غير سرف – “গারেমুন হল (তারা) যারা (নিতান্ত ঠেঁকায় পড়ে) ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছে -(তবে সেটা) অপচয় করতে গিয়ে নয়”। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৩১৮ আছার ১৬৮৬৯, ১৬৮৬৬] তিনি এভাবেও বলেছেন- المُسْتَدِينِينَ في غَيْرِ فَسادٍ – “(গারেমুন হল তারা) যারা (নিতান্ত ঠেঁকায় পড়ে) ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছে -(তবে সেটা) ফ্যাসাদ-দুষ্কৃতি-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে গিয়ে নয়”। [তাফসীরুল কুরআন, ইমাম ইবনু আবি হাতীম- ১/১৮২৪ আছার ১০৩৮৭; জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৩১৮ আছার ১৬৮৭৩]  ইমাম ক্বাতাদাহ রহ. বলেছেন- أما “الغارمون”، فقوم غرَّقتهم الديون في غير إملاق، ولا تبذير ولا فساد – “গারেমুন হল (তারা) যারা (ঠেঁকায় পড়ে) ঋনে জর্জরিত হয়ে পড়েছে -(তবে সেটা) অপচয় করতে গিয়ে নয়, তাবযীর (শয়তানী কাজে অপব্যয়) করতে গিয়ে নয়, এবং ফ্যাসাদ-দুষ্কৃতি-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে গিয়ে নয়”। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৩১৮ আছার ১৬৮৭০] ইমাম মুজাহিদ রহ. বলেছেন- هم قوم ركبتهم الديون في غير فساد ولا تبذير، فجعل الله لهم في هذه الآية سهمًا – “তারা হল এমনসব ব্যাক্তি যারা (নিতান্ত ঠেঁকায় পড়ে) ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছে -(তবে সেটা) ফ্যাসাদ-দুষ্কৃতি-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে গিয়ে নয়, এবং তাবযীর (শয়তানী কাজে অপব্যয়) করতে গিয়েও নয়। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাদের (ঋন পরিশোধের) জন্য (যাকাতের) অংশের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন”। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৩১৯ আছার ১৬৮৭৫]

যে সকল মুসলমান তাদের জীবনযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের অভাব বা সমস্যা জনিত ঠেঁকায় পড়ে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং তাদের আর্থিক সঙ্গতি দিয়ে ঋণ মিটাতে পারে না, তাদেরকে ঋণমুক্ত করার জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে। কেউ ঋণগ্রস্থ হতে পারে মূলত: দু’ ভাবে: (ক) ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে ঋণগ্রস্থ হতে পারে, (খ) অপরকে সাহায্য-সহযোগীতা করতে গিয়েও প্রয়োজনে ঋণগ্রস্থ হতে পারে। দু ক্ষেত্রেই ঋণগ্রস্থ মুসলমানকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে।

(ক) ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে ঋণগ্রস্থ হওয়া: একজন মুসলমান ব্যাক্তিগত বিভিন্ন ঠেঁকায় পড়ে অন্যের কাছ থেকে ঋন গ্রহন করতে বাধ্য হতে পারে। যেমন: মাথা গোঁজার মতো প্রয়োজনীয় ঘর বাড়ি নির্মান, সয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিছানা তৈরী/ক্রয়, ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী ক্রয়, খাবার-দাবার রান্না পরিবেশন ও সংরক্ষন করার জন্য প্রয়োজনীয় পাত্র ও হান্ডিপাতিল ক্রয়, প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ক্রয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খরচ, ছেলে মেয়ে’দের লানপালন ও বিয়ে শাদির প্রয়োজনীয় খরচ, মেহমানদারীর খরচ ইত্যাদি সামাল দিতে গিয়ে মানুষকে প্রায়’ই ঋনগ্রস্থ হতে হয়। এছাড়ও মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম দূর্যোগ, দূর্ঘটা ও বিপদ-আপদের কারণে (যেমন: নদী-ভাঙ্গন, বন্যা, টর্নেডো, ভুমিকম্প, ডাকাতী ইত্যাদি কারণে) নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত হয়ে যায় কিংবা অভাবে পড়ে যায় এবং তারা মানুষের কাছে ভিক্ষার হাত না পেতে বরং ঋন নিয়ে প্রয়োজন মেটায়। এই জাতীয় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ব্যাক্তিগত ‘ঋন’ সমূহ পরিশোধের জন্য ঋণগ্রস্থ মুসলীমকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে।

এসব ক্ষেত্রে একজন গরিব এবং একজন ধ্বনীর সামাজিক জীবনধারা ও স্তর ভিন্ন ভিন্ন হওয়াটা যেমন চিরাচরিত ও স্বাভাবিক, তেমনি সেই অনুপাতেই তাদের উভয়ের ঋন গ্রহনের মাত্রা ও প্রয়োজনও ভিন্ন ভিন্ন হওয়াটা একদম স্বাভাবিক, আর ইসলামী শরীয়ত সেদিকেও খেয়াল রেখেছে। উদাহরণ স্বরূপ: একজন গরিব মানুষের বাসায় তার কোনো গরিব মেহমান এলে সে প্রয়োজনে ১০০/২০০ টাকা ঋন করে মেহমানের জন্য ডাল-ভাত ভত্তা-ভাজি-ডিম দিয়ে মেহমানদারী করে থাকে, আবার তারই বাসায় কোনো উচ্চ-পদস্থ কেউ এলে সে আরেকটু উন্নত মানের খাবার (যেমন: যাল ভাতের সাথে মাছ/মাংস ইত্যাদি) দিয়ে মেহমানদারী করতে চায়, আর এজন্য হয়তো সে ৫০০ টাকাই ঋন করতে পারে। এমনি ভাবে যখন মধ্যবিত্ত কিংবা ‍উচ্চবিত্তদের বাড়িতে কোনো মেহমান আসে, তখন মেহমানদারী করার প্রশ্নে কারোর থেকে প্রয়োজনে তাদের ঋন গ্রহনের বিষয়টি গরিবের ১০০/২০০ টাকা ঋন গ্রহনের সাথে কিয়াস (অনুমান) করা চলে না। তখন মধ্যবিত্ত কিংবা ‍উচ্চবিত্ত’রা নিজেদের মানসম্মান রক্ষার খাতিরে এবং একই সাথে মেহমানের সামাজিক মর্যাদাস্তরের দিকে তাকিয়ে তারা আরেকটু বেশি মুনাসেব পরিমান ঋন গ্রহন করাটা একদম স্বাভাবিক। এগুলো মুলত: ব্যাক্তিগত ঋন গ্রহনের মধ্যে শামিল এবং তাদের ঋন পরিশোধের জন্য তাদেরকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে।

(ক) অন্যের কল্যানে নিজে ঋণগ্রস্থ হওয়া: আল-হামদুলিল্লাহ সমাজে এমন উদার ও বড় মনের মুসলীমও পাওয়া যায়, যারা অন্যেদের বিভিন্ন জরুরী প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রয়োজন হলে নিজের কাঁধে ঋনের বোঝা উঠিয়ে হলেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। যেমন:-

(১) গরিব অভাবী আত্বীয়-স্বজনদের মধ্যে অনেকের প্রয়োজনীয় পোশাক, ক্ষুদাকষ্ট দূরকারী খাবার -দাবার কিংবা মাথা গোঁজার ঠাই-এর ব্যবস্থা করা অথবা তাদের জরুরী চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি সামাল দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া। 

(২) সাধারণ অভাবী গরিব পাড়া-প্রতিবেশিদের অনেকের প্রয়োজনীয় খরচ সামাল দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া। 

(৩) এতীম অথবা বিধবা কিংবা সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধ/বৃদ্ধাদের প্রয়োজনীয় খরচ সামাল দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া।

(৪) অভাবী গরিব কাউকে দ্বীনের আলেম বানানোর জন্য তার ব্যায়ভার চালাতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া।

(৫) কারোর আকস্মিক কোনো বিপদ-অাপদ বা দূর্ঘটনার সময় প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িতে দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া। ইত্যাদি…..

এধরনের যেসকল উদার মুসলমানগণ অপরের জরুরী প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসেন এবং কখনো কখনো ঋনের বোঝাও নিজেদের কাঁধে তুলে নেন, তাদের ঋন পরিশোধের জন্য তাদেরকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে।

ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারী রহ. (মৃ: ৩১০ হি:) ইমাম আবু জা’ফর রহ.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন- الغارمين المستدين في غير سَرَف، ينبغي للإمام أن يقضي عنهم من بيت المال – “গারেমুন (ঋনগ্রস্থ’রা) হল (তারা) যারা অপচয় বহির্ভূত কারণে (নিতান্ত ঠেঁকায় পড়ে) ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। ইমাম (শাসক/খলিফ)’র কর্তব্য হল বায়তুল-মাল থেকে তাদের ঋন পরিশোধ করে দেয়া”। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ১৪/৩১৮ আছার ১৬৮৬৬]

ইমাম আবু উবাইদ খুরাসানী রহ. (মৃ: ২২৪ হি:) নিজ সনদে আল-লাইছ বিন সা’দ রহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন- كتب عمر بن عبد العزيز أن اقضوا عن الغارمين . فكتب إليه : إنا نجد الرجل له المسكن ، والخادم ، والفرس ، والأثاث ، فكتب عمر : إنه لابد للمرء المسلم من مسكن يسكنه ، وخادم يكفيه مهنته ، وفرس يجاهد عليه عدوه ، ومن أن يكون له الأثاث في بيته ، نعم فاقضوا عنه . اخرجه أبو عبيد القاسم بن سلاّم الخراساني في الأموال : ٣/٢٧٢ رقم ١١٧٧ – “(খলিফায়ে রাশেদ) ওমর ইবনে অব্দুল আজিজ (রহ. একবার তাঁর জামানায় রাজ্যের প্রশাসকদের কাছে) লিখে পাঠালেন যে, ‘গারেমুন (ঋনগ্রস্থদের)কে (রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রক্ষিত যাকাতের মাল থেকে তাদের ঋনগুলোকে) পরিশোধ করে দাও’। তখন (জবাবে) তাঁর কাছে লিখে পাঠানানো হল: ‘আমরা (সমাজে) এমন লোকও পাচ্ছি, যার আছে থাকার জায়গা, (খেদমতের জন্য) খাদেম, (এখানে ওখানে যাওয়ার জন্য) ঘোড়া এবং (ঘরের প্রয়োজনীয়) আসবাবপত্র। (এধরণের ব্যাক্তিকে কি যাকাত থেকে দিবো)’? ওমর রহ. লিখলেন: ‘নিশ্চই, মুসলীম ব্যাক্তি মাত্রেরই এমন ঘর চাই যেখানে সে থাকবে, এমন খাদেম চাই যে তার জন্য যথেষ্ট মাত্রায় খেদমত আঞ্জাম দিবে, এমন ঘোড়া চাই যার উপড়ে চড়ে সে তার (দ্বীনের) দুশমনের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, তাছাড়া তার (দৈনন্দিন কাজের) জন্য তার ঘরে (প্রয়োজনীয়) আসবাবপত্রও থাকতে হবে। (এর সবগুলোই প্রয়োজনের অন্তর্ভূক্ত)। হ্যাঁ, (এসব থাকা সত্ত্বেও তাদের ঋনগুলোকে) পরিশোধ করে দাও”। [আল-আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ৩/২৭২ আছার ১১৭৭] আর যতদিন মুসলমানদের খিলাফত ফিরে না আসে, ততদিন যাকাত দাতাগণ ঋনগ্রস্থ মুসলমানদের ঋন পরিশোধ করার দায়িত্ব পালন করবেন।

যেসব ঋনগ্রস্থরা মূলত: যাকাত পাওয়ার যোগ্য নয় -তাদের নমুনা:

(১) জুয়া খেলা, সূদী লেনদেন, মদ ও মাদক সেবন, জেনা-ব্যাভিচার করা, নাজায়েয গান-বাজনা ও আমোদ প্রমদের অনুষ্ঠান, বিদআতী অনুষ্ঠান পালন ইত্যাদি বিভিন্ন হারাম ও নাজায়েয কারণে যারা ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছে, তাদের ঋন পরিশোধের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে না।

(২) স্বাভাবিক ভাবে যে অর্থকড়ি ও ধ্বনমালে একটি শরীয়ত সম্মত বিয়ে শাদি’র অনুষ্ঠান পালন হয়ে যায়, তার অতিরিক্ত নানাবিধ অপচয় জাতীয় বিলাসীতাপূর্ণ আমোদ প্রমোদ ও অনুষ্ঠানাদি পালন করার জন্য যারা ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছে, তাদের ঋন পরিশোধের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে না।

(৩) শরীয়তসম্মত প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিলাসীতা করতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হলে সেই ঋন পরিশোধের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে না। (যেমন: বিলাসবহুল ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, পরিবহন যান, পোশাক-আসাক, জৌলুস সুন্দর্য, অলঙ্কার ইত্যাদি। একই ভাবে মোটামুটি মুনাসেব মানের হাতঘড়ি, দেয়ালঘড়ি বা মোবাইল হলেই প্রয়োজনীয় কাজ আঞ্জাম দেয়া যেখানে সম্ভব, সেখানে বিলাসীতা করে দামী ঘড়ি বা মোবাইল কিনতে গিয়ে কেউ ঋনগ্রস্থ হলে তাদের ঋন পরিশোধের জন্য যাকাত থেকে মোটেও দেয়া যাবে না)। 

(৪) ব্যবসা বানিজ্যের উন্নতি ও স্বাস্থ্য বাড়ানোর জন্য যারা ঋণ নেয় (যেগুলোকে ডেভেলপমেন্ট লোন বলা হয়ে থাকে -তা চাই ব্যাংক থেকে নেয়া হোক বা কোনো ব্যাক্তির কাছ থেকে নেয়া হোক), এরকম ঋনগ্রস্থ ব্যাক্তিদেরকে তাদের ডেভেলপমেন্ট লোন/ ঋন পরিশোধের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে না। [ফিকহী মাকালাত, মুফতী তক্বী উসমানী- ৩/১৫৫]

এসব ঋন আমাদের পরিভাষায় ‘ঋন’ হিসেবে পরিচিত হলেও তা ওই ‘ঋন’-এর মধ্যে গণ্য নয়, যাদের ঋনকে যাকাতের মাধ্যমে পরিশোধ করার সুযোগ ইসলাম দিয়েছে। চিন্তা করে দেখুন, একজন লোক ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা ঋন নিয়েছে ব্যবসা বানিজ্য করার জন্য, এখন যাকাতের টাকা দিয়ে তার ঋন পরিশোধ করবেন?!!! যাকাতের মধ্যে অভাবী ও গরীরের ভাগটাও এই ধ্বনী লোকটার পকেটে দিয়ে দিবেন?!! তাহলে দেখা যাবে এযুগের সকল ধ্বনীরা হল ধ্বনীই, আবার যাকাত পাওয়ার যোগ্যও হল একজন ধ্বনকুবেড় ধ্বনী !!! হাস্যকর নয় কি?!!! এতে করে শরীয়তের দৃষ্টিতে যে উদ্দেশ্যে ঋনগ্রস্থ ব্যাক্তিকে যাকাত থেকে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে তা গোড়া থেকেই ব্যহত হয়ে যাবে। এজন্য এ যুগের মুহাক্কেক ফকিহ আলেমগণ এব্যাপারে একমত যে, ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে ‘ডেভেলপমেন্ট লোন গ্রহনকারী ব্যাক্তি’ যাকাতের ‘গারেমুন (ঋনগ্রস্থ ব্যাক্তি)’-এর অন্তর্ভূক্ত নয়, বরং ‘ডেভেলপমেন্ট লোন’ গ্রহন করাবস্থায় সে নেসাবের মালীক হলে তাকে ওই ধ্বনমালের উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করতে হবে; তার স্বয়ং যাকাত গ্রহন করে ঋন শোধ করা তো অনেক দূরের কথা।

(৫) যার কাছে নেসাব পরিমান যাকাতযোগ্য সম্পদ নেই বটে, কিন্তু তার এই পরিমাণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে যা বিক্রি করে সে ঋন পরিশোধ করতে পারে, তার ঋন পরিশোধের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে না। (যেমন: বসবাসের অতিরিক্ত ঘরবাড়ি/জমিজমা , চাষবাসের অতিরিক্ত জমিজমা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক-আশাক, প্রয়োজনের অতিরিক্ত আসবাবপত্র ইত্যাদি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলতে, যা না হলেই নয় -তার অতিরিক্ত)।

(৭) ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথে): এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত দ্বীন ইসলামে সকল ইবাদত ও নেক কাজই ‘আল্লাহ’র পথ’ হিসেবে গণ্য। কিন্তু যখন যাকাত আদায়ের প্রশ্ন আসে, তখন দ্বীন ইসলামে সকল ইবাদত ও নেক কাজই ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’র মধ্যে গণ্য ধরে সেগুলোর সবগুলোকেই যাকাত খাত হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে না। কারণ, খোদ আল্লাহ তাআলা উপরের আয়াতে- إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ ‘যাকাত (ব্যয়যোগ্য) শুধুমাত্র……’ – বলে যাকাতের খাতগুলোকে কেবলমাত্র উক্ত ৮টি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও সুচিহ্নিত করে দিয়েছেন। কাজেই, এখানে ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’ বলতে যাবতীয় ইবাদত ও নেক কাজে যাকাত দান উদ্দেশ্য হলে বহু নেক কাজের মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট ভাবে ৮টি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হত না। দ্বিতীয়ত: যখন ৮টি খাতের এক একটিকে যাকাতের আলাদা আলাদা একটি করে খাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তখন অবশ্যই ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’ও আলাদা স্বতন্ত্র একটি খাত। সুতরাং, একথা বলার কোনো অবকাশ নেই যে, ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’ বলতে যাবতীয় ইবাদত ও নেক কাজই ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’র মধ্যে গণ্য তাই যাবতীয় যাবতীয় ইবাদত ও নেক কাজেই যাকাত দান করা যাবে! যদি তাই হত, তাহলে তো ৮টি খাতের বাকি ৭টি খাতও ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’, তাহলে আবার স্বতন্ত্র ভাবে ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’ নামের আলাদা একটি খাতের উল্লেখ করার কী অর্থ হতে পারে! এ থেকে বোঝা গেল, ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’ একটি আলাদা যাকাত খাত, যা বাকি ৭টি খাত থেকে আলাদা। নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলো এই খাতের অন্তর্ভূক্ত:-

(১) যাকাতের খাত ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’-এর ব্যাখ্যায় যে ব্যাপারে সকলে একমত সেটা হল, এখানে ‘দ্বীন ইসলামকে সুউচ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে কৃত শরীয়তসম্মত কিতাল/জিহাদ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, গরিব মুসলমান কিংবা এমন মুসলমান যে নিজ বাসস্থানে স্বচ্ছল হওয়ায় যাকাত পাওয়ার অধিকারী নয় বটে, কিন্তু জিহাদ/ক্বিতালের সফরে মুজাহিদগণের সাথে বের হওয়ার প্রশ্নে নূন্যতম পাথেয়, খাদ্যসামগ্রী, যুদ্ধের অস্ত্র, বাহন, পোষাক ইত্যাদি ক্রয়/জোগার করতে সমর্থ হয়নি, তাকে আল্লাহ’র পথে জিহাদ/ক্বিতালের উদ্দেশ্যে বের হওয়া জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে। [শারহে সিয়ারুল কাবীর– ১/১১৪; বাদায়েউস সানায়ে, ইমাম কাসানী- ২/৪৬; আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী- ২/৯৫৭; রাদ্দুল মুহতার- ২/৮৫; তুহফাতুল মুহতাজ বি-শারহিল মিনহাজ- ৭/৯৬] আবু মুসা আশআরী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- من قاتل لتكون كلمة الله هي العليا فهو في سبيل الله . أخرجه البخاري في صحيحه , كتاب الجهاد، باب من قاتل لتكون كلمة الله هي العليا : ٦/٢٧رقم ٢٨١٠ ; و مسلم في صحيحه , كتاب الجهاد : رقم ١٩٠٤ ; و ابن حبان في صحيحه : ٤٦٣٦ ; و ابن ماجه في سننه , كتاب الجهاد , باب النية في القتال : ٢/٩٣١ رقم ٢٧٨٣ ; أبو داود في سننه , كتاب الجهاد، باب من قاتل لتكون كلمة الله هي العليا فهو في سبيل الله : ٣/٣١ رقم ٢٥١٧ ; و الترمذي في سننه , أبواب الجهاد، باب ما جاء فيمن يقاتل رياء وللدنيا : رقم ١٥٧٠ ; و أحمد في مسنده : ٤/٤٥٢ – “যে (মুসলমান)  আল্লাহ’র কালেমাকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে ক্বিতাল (সমর জিহাদ) করে, বস্তুত: সেই  ফি-সাবিলিল্লাহ’য় (আল্লাহ’র পথে) রয়েছে”। [সহিহ বুখারী,- ৬/২৭ হাদিস ২৮১০; সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৯০৪; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ৪৬৩৬; সুনানে ইবনে মাজাহ- ২/৯৩১ হাদিস ২৭৮৩; সুনানে আবু দাউদ- ৩/৩১ হাদিস ২৫১৭; মুসনাদে আহমদ- ৪/৪৫২] 

(২) যে মুসলমানের উপরে হজ্জ ফরয হয়েছিল, কিন্তু কোনো শরয়ী গ্রহনযোগ্য কারণে অনাদায়ী রয়ে গেছে, আর বর্তমানে হজ্জ সংশ্লিষ্ট ব্যয় বহন করার মতো তার আর্থীক অবস্থা নেই, তাকে ফরয হজ্জ পালনের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে। এটি ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’-এর মধ্যে গণ্য। [নাইলুল আউতার, শাওকানী- ৪/১৮১]

(৩) যে সকল দেশে বা অঞ্চলে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ আঞ্জাম দেয়া শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরী -চাই সেখানকার কাফেরদেরকে মুসলীম বানানোর জন্য হোক কিংবা সেখানকার মুসলমানদেরকে দ্বীন ও শরীয়তের উপরে যথাসাধ্য কায়েম রাখার জন্য হোক -উভয় অবস্থাতেই সে কাজ আঞ্জাম দেয়া ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’-এর মধ্যে গণ্য। সুতরাং, এই মর্যাদাপূর্ণ কাজে নিয়োজীত মুবাল্লেগগণ যদি তাদের নিজ নিজ বাসস্থানে স্বচ্ছলও হয়, কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে গিয়ে সেখানে দীর্ঘদিন থেকে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলগের কাজ করার মতো আর্থিক সামর্থ না রাখে, তাহলে তাদেরকে এ কাজের জন্য যাকাত থেকে দেয়া যাবে।

যেমন: অনেক স্থানে মুসলীম নারী-পুরুষগণকে বিভিন্ন পার্থিব প্রলভন দেখিয়ে ইহূদী/খৃষ্টান/হিন্দু/কাদিয়ানী মিশনারীরা যেসকল ইমান বিধ্বংসী অপ-তৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের অপতৎপরতার ফিতনাগুলোকে শরয়ী আন্দাজে মুকাবেলা করার জন্য মুসলমানদের মধ্য থেকে উপযোগী ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুবাল্লেগগণের বিভিন্ন জামাআত যেমন তৈরী করা জরুরী এবং তেমনি সেসব এলাকায় তাদেরকে পাাঠিয়ে প্রয়োজনীয় থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়াও জরুরী, এমনকি সেখানে তাদেরকে দীর্ঘ দিন ধরে ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতেও হতে পারে। এমতাবস্থায় একাজের জন্য তাদেরকে ট্রেনিং দেয়া থেকে শুরু করে সেখানে জীবনযাপন করার যাবতীয় প্রয়োজনীয় ব্যয় যাকাত থেকে বহন করা যাবে। কারণ তা ‘ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহ’র পথ)’-এর মধ্যে গণ্য।   

(৮) ইবনুস সাবীল-এর (অভাব মোচনের) কাজে:  ইবনুস সাবীল বলা হয় সফরকারী পথিককে। ধ্বনী হোক বা দরিদ্র -উভয় অবস্থাতেই অনেক মুসলমান নর-নারী দেশের ভিতরেই কিংবা বিদেশে বিভিন্ন স্থানে সফরে গিয়ে যদি অভাবে পড়ে যায় এবং গন্তব্যস্থলে পৌছানো ও খাদ্যপানীয় ইত্যাদীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে সে ক্ষেত্রে তার এই সমস্যা দূরকরণের জন্য তাকে যাকাত থেকে দেয়া যাবে। 

যাকাত আদায় বিষয়ক আরো জরুরী কিছু মাসআলা মাসায়েল

মাসআলা: যাকাত আদায় হওয়ার একটি অন্যতম শর্ত হল, যাকাতের মালসম্পদ/অর্থগুলো প্রাপকের মালিকানায় দিয়ে দিতে হবে। সুতরাং, এমন কোনো জিনিস নির্মান বা ক্রয় কার্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যা শরীয়ত মোতাবেক কাউকে মালিক বানিয়ে দেয়া যায় না, এমন কাজে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না। যেমন: মসজিদ/মাদ্রাসা/এতীমখানা ইত্যাদি নির্মাণ করা কিংবা এগুলোর অসবাবপত্র ক্রয় করতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করলে যাকাত আদায় হবে না। [ফাতহুল কাদীর, ইবনে হুমাম- ২/২০৭; আল-হিদায়াহ, মারগিনানী- ১/২০৫; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানীয়্যাহ- ২/২৭২; আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/২৯১; তানবিরুল আবছার- ২/৩৪৪]

মাসআলা: যাকাতের অর্থ তার প্রাপককে দেয়ার সময় একথা জানিয়ে দেয়া জরুরী নয় যে, ‘এটা যাকাতের অর্থ’। যাকাত দেয়ার ক্ষেত্রে যাকাতদাতার মনের মধ্যে শুধু যাকাতের নিয়ত থাকলেই তা আদায় হয়ে যাবে। [আল-বাহরুর রায়েক- ২/২১২; আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৬৮; ফাতাওয়ায়ে বাযযাযীয়া-৪/৮৬; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদদূর- ১/৪৩১] এ যুগে যাকাত দানের সময় প্রাপককে কিছু বলে কয়ে না দেয়াই মুনাসেব (যথার্থ), বরং ‘ভাই/বোন! এই টাকাগুলো রাখুন, প্রয়োজনে খরচ করিয়েন’ -এজাতীয় কিছু বলে দেয়াই উভয়ের হৃদ্যতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য অধিক সহায়ক। কারণ, অনেক আত্বমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যাক্তি এমন আছেন, যারা অভাবে পড়ে কারো কাছ থেকে সহায়তা পেলে অবশ্যই খুশি হন, কিন্তু টাকাটা তাকে যাকাত থেকে দেয়া হয়েছে জানতে পারলে ‘অনেক অপমান বোধ করেন বা মনে কষ্ট পান’। 

মাসআলা: যাকাতের মাসআলাহ মোতাবেক কোনো ব্যাক্তিকে বাহ্যদৃষ্টিতে ‘যাকাতের হক্বদার’ হিসেবে প্রবল ভাবে অনুভূত হওয়ার পর যাকাতের অর্থ তাকে দিয়ে দিলে পরে যদি দেখা যায় যে, সে মূলত: ‘যাকাতের হক্বদার’ ছিল না, তবুও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। [ফাতহুল কাদীর, ইবনে হুমাম- ২/২১৪; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২৪৭; আল-বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/১৬৩; তাবইনুল হাকায়েক- ২/১২৯; রাদ্দুল মুহতার- ২/৩৫২]

মাসআলা: কোনো ব্যাক্তি (১) তার বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, স্ত্রী (একই ভাবে স্ত্রী তার স্বামীকে), সন্তান, সন্তানদের সন্তানাদি ও অধ্বস্তন সন্তানাদি (যেমন: নাতী, নাতনী বা তাদের সন্তানাদি)কে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না। এদেরকে যাকাত ছাড়া অন্য অর্থ থেকে দেয়া যাবে। (২) তবে কোনো ব্যাক্তি তার ভাই-বোন, খালা-খালু, ফুফা-ফুফু, মামা-মামি, চাচা-চাচি সহ সকল আত্বীয়স্বজনকে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে -যদি তারা যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত (গরীর-অভাবী) হয়। [কিতাবুল আছল, ইমাম মুহাম্মাদ- ২/১২৪; ফাতহুল কাদীর, ইবনুল হুমাম- ২/২০৯; আল-বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/১৪৩; আদ-দুররুল মুখতার- ২/৩৪৬; আল-মুহিতুল বুরহানী- ৩/২১২, ২১৮; খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/২৪২; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৩/২১০; রাদ্দুল মুহতার- ২/৩৪৪] 

মাসআলা: যাকাতের অর্থ -যাকাত পাওয়ার কোনো হক্বদার ব্যাক্তি’র কবজায় দেয়ার পর সে সেটার মালিক হয়ে যায়। এভাবে মালিক হওয়ার পর ওই অর্থ আর যাকাতের মালের হুকুমে থাকেনা, বরং সাধারণ হালাল মালের হুকুমে চলে আসে। সুতরাং, সে এখন তা দিয়ে দাওয়াত খাওয়াতে চাইলে ধ্বনী-গরিব সকলেই সেই দাওয়াত খেতেও পারবে, আবার সে যদি ওই অর্থের পুরোটা বা কিছু অংশ কাউকে হাদিয়া (উপহার) স্বরূপ দিয়েও দিতে চায়, ধ্বনী-গরিব সকলের জন্য তা গ্রহন করা হালাল হবে। [আল-ইসতিযকার- ৫/৭৪; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৫/২৪৩; উমদাতুল ক্বারী, আঈনী- ৯/৯২; বাযলুল মাজহুদ- ৮/১৯৮; ] 

 

 

আলোচনার বাকি অংশ দেখার জন্য এখানে >>>ক্লিক করুন>>> (অসমাপ্ত)