ঋণ ও ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত – জাকাত হিসাবের নিয়ম – মাসলা মাসায়েল   

Spread the love

ঋণ ও ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত – জাকাত হিসাবের নিয়ম – মাসলা মাসায়েল   

 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ سَيِّدِنَا مَوْلَانَا مُحَمَّدٍ وَعَليٰ اٰلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ صَلوٰةً تُنَجِّيْنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْأَهْوَالِ وَاْلآفَاتِ وَتَقْضِيْ لَنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْحَاجَاتِ وَتُطَهِّرُنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ السَّيِّاٰتِ وَتَرْفَعُنَا بِهَا عِنْدَكَ اَعْليٰ الدَّرَجَاتِ وَتُبَلِّغُنَا بِهَا اَقْصىٰ الْغَايَاتِ مِنْ جَمِيْعِ الْخَيْرَاتِ فِي الْحَيَاتِ وَبَعْدَ الْمَمَاتِ- اِنَّكَ عَليٰ كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ

[উল্লেখ্য, এখানে ঋন ও ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত -মাসলা মাসায়েল -এ উল্লেখিত আয়াত, হাদিস ও ইবারত সমূহ এবং এসবের অনুবাদ’কে কোনো বিজ্ঞ মুহাক্কেক আলেমের পরামর্শ ব্যাতীত কারো কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে আমার অযোগ্যতার কারণে এখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করে নেয়ার আগেই মানব সমাজে ছড়িয়ে না যায়। এগুলো পড়ুন ইলম অর্জনের জন্য এবং যোগ্য আলেম থেকে তা বুঝিয়ে নিন। আর কোনো যোগ্য চোখে উল্লেখযোগ্য ভুল ধরা পড়লে তা আমাকে অবগত করুন।]

 

পূর্বের আলোচনা পেতে <<<এখানে ক্লিব ‍করুন<<<

 

পূর্বের আলোচনার বাকি অংশ এখানে-

(৫) নগদ পাওনা: কোনো ব্যাক্তি যদি কারোর কাছ থেকে ‘যাকাতযোগ্য নগদ সম্পদ’ (স্বর্ণ/রৌপ্য/ নগদ-অর্থ/বাকী-পণ্যমূল্য) পাওনা থাকে এবং সেই পাওনাটুকু যদি দেনাদারের কাছ থেকে বাহ্যত: ফেরত পাওয়ার সমূহ আশা/সম্ভাবনা/ নিশ্চয়তা থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে সে নেসাবের মালিক হলে ওই পাওনাটি যখন পাওনাদারের কবজায় (তথা মালিকানা সহ ব্যবহারাধিকারে) চলে আসবে, তখন তার জন্য ওই পাওনা’র উপরে বিগত অনাদায়ী সকল বছরগুলোর যাকাত হিসেব করে আদায় করা ফরয হবে। [কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ- ৩/১৭৫; আল-মাবসুত, সারাখসী- ২১/১২২] [উল্লেখ্য, ফিকহী পরিভাষায় ‘কবজা (হস্তগত)’ বলতে বুঝায় কোনো জিনিস সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির মালিকানাধীনে এমন ভাবে চলে আসা, যার উপরে সে নিজ স্বাধীনতা মতো ব্যয় ও ব্যবহার করতে সক্ষম]। 

যেমন, ইবনে সিরীন রহ. উবাইদাহ’র সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে- علي في الدين الظنون: إن كان صادقا فليتركه إذا قبضه، لما مضى . رواه أبو عبيد في كتاب الأموال: ١/٤٣٦ رقم ١٢٢٠، و صححه الألباني في إرواء الغليل: ٣/٢٥٣، وايضا البيهقي : ٤/١٥٠ –  “দাইনে-জন্নী (তথা যে ঋনটি দেনাদারের কাছ থেকে পাওয়ার আশা/ধারনা থাকে -সে) সম্পর্কে আলী রা. বলেছেন: ‘(ঋনগ্রহীতা/দেনাদার) যদি (ঋনের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য ও) সত্যবাদী হয়, তাহলে যখন তা কবজায় (তথা মালিকানা সহ ব্যবহারাধিকারে) চলে আসবে, তখন অবশ্যই তার বিগত (বছরগুলোর) যাকাত (হিসেব করে) আদায় করবে”। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ১/৪৩২ হাদিস ১২২০; সুনানে বাইহাকী- ৪/১৫০; আল-মুসান্নাফ, ইমাম ইবনু আবি শায়বাহ- ২/৩৯০ হাদিস ১০২৫৬]

নাফে রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেছেন- زكوا زكاة أموالكم حولا إلى حول وما كان من دين ثقة فزكه وإن كان من دين مظنون فلا زكاة فيه حتى يقضيه صاحبه . اخرجه ابن ابي شيبة في المصنف : ٢/٣٨٩ رقم ١٠٢٥١، و الطحاوي في أحكام القرآن الكريم : ١/٢٧٤ رقم ٥٤٣، و ايضا البيهقي في سنن الكبرى : ٤/١٥٠ ، و ضعفه الألباني في إرواء الغليل: ٣/٢٥٣ – “তোমরা বছরে বছরে তোমাদের ধ্বনমালের যাকাত আদায় করতে থাকো। পাওনা’টি যদি (দেনাদারের কাছে ফেরত পাওয়া এতটা) নির্ভরযোগ্য হয় (যে, তা বাহ্যত:  নিশ্চিৎ), তাহলে (তোমরা প্রতি বছর নেসাবের তারিখে) সেটার যাকাত আদায় করো। আর পাওনা’টি যদি জন্নী হয় (তথা দেনাদারের কাছ থেকে পাওয়ার একটা আশা/সম্ভাবনাময় ধারনা থাকে মাত্র), তাহলে সেটার মধ্যে কোনো যাকাত (ধার্য) হবে না -যাবৎ না তা তার মালিকের কবজায় (তথা মালিকানা সহ ব্যবহারাধিকারে) আসে[আল-মুসান্নাফ, ইমাম ইবনু আবি শায়বাহ- ২/৩৮৯ হাদিস ১০২৫১; আহকামুল কুরআন, ইমাম তাহাবী- ১/২৭৪ হাদিস ৫৪৩; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৪/১৫০]

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী রহ. (মৃ: ১৯৮ হি:) লিখেছেন- عن علي بن ابي طالب قال: اذا كان ذلك دين على الناس فقبضه فزكاه لها مضى، قال محمد: و به نأخذ و هو قول ابي حنيفة– “আলী বিন আবি ত্বালেব রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: ‘(দেনাদার) লোকদের থেকে (অর্থকড়ি) পাওনা থাকলে সেটা যখন (পাওনাদারের) কবজায় (তথা মালিকানা সহ ব্যবহারাধিকারে) চলে আসবে, তখন সে ও(ই অর্থে)র (উপরে হিসেব করে) বিগত (বছরগুলোর) যাকাত আদায় করবে’। ইমাম মুহাম্মাদ বলেন: আমরা এটাই গ্রহন করেছি এবং এটাই ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত”। [কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মাদ- ১০৮ পৃষ্ঠা]

জানা জরুরী যে, ফিকহের পরিভাষায় পাওনা-ঋন ৩ (তিন) প্রকারের হয়ে থাকে। যথা:-

(ক)  دين قوى  (শক্তিশালী পাওনা-ঋন): যাকাতদাতা যদি কাউকে যাকাতযোগ্য সম্পদ (তথা স্বর্ণ/রৌপ্য/ নগদ-অর্থ/বাকী-পণ্যমূল্য)-এর মধ্য থেকে কিছু ঋন/বাকিতে দিয়ে থাকে এবং যদি দেনাদারের কাছ থেকে তা ফেরত পাওয়ার বাহ্যত: সমূহ আশা/সম্ভাবনা/ নিশ্চয়তা থাকে, তাহলে ফিকহের পরিভাষায় সেই পাওনা’কে বলা হয় دين قوى (শক্তিশালী পাওনা)। 

মাসআলাহ: (১) এই دين قوى (শক্তিশালী পাওনা)’র ক্ষেত্রে একটি মাসআলাহ হল, পাওনাদারের অধিকারে যদি শুধুমাত্র এই دين قوى (শক্তিশালী পাওনা) ছাড়া আর কোনো যাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকে এবং সে দেনাদারের কাছ থেকে যে পরিমান পাওনা রয়েছে তা যদি কমপক্ষে ৫২.৫ তোরা রূপার বাজারমূলল্যের সমান বা তার বেশি হয়, তাহলেও সে নেসাবের মালিক হয়ে যাবে। (২) পাওনাদার প্রথমবারের মতো নেসাবের মালিক হওয়ার পর বছরান্তে যখন আবারো নেসাবের ওই তারিখ আসবে, সেদিন যদি তার পাওনাধিকারে শুধুমাত্র এই دين قوى (শক্তিশালী পাওনা) ছাড়া আর কোনো যাকাতযোগ্য সম্পদ না থেকে থাকে এবং দেনাদারের কাছ থেকে পাওনার পরিমান যদি কমপক্ষে ৫২.৫ তোরা রূপার বাজারমূলল্যের সমান বা তার বেশি হয়, তাহলে তার ওই পাওনার উপরে সেই বছরের যাকাত শুধু হিসেবের মধ্যে ধার্য হবে (তথা তখনই আদায় করা ওয়াজিব হবে না), এমনকি প্রতি বছরই শুধু হিসাবের মধ্যে ওই পাওনার উপরে  যাকাত ধার্য হতে থাকবে -যাবত না পাওনাটি তার কবজায় (তথা মালিকানা সহ ব্যবহারাধিকারে) চলে আসে। কবজায় আসার পর এবাবদ বিগত বছরগুলোর যাকাত হিসেব করে আদায় করতে হবে; কবজায় আসার আগে যাকাত আদায় করা ওয়াজিব নয়। [কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ- ৩/১৭৫; আল-মাবসুত, সারাখসী- ২১/১২২; আদ-দুররুল মুখতার- ২/৩০৫; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২২৩] (৩) তবে এক্ষেত্রে যদি পুরো পাওনাটি একইসাথে কবজায় চলে না আসে, বরং কিছু কিছু করে কবজায় আসতে থাকে, তাহলে এভাবে যখন কমপক্ষে নিসাব পরিমান (তথা ৫২.৫ তোলা রূপার বর্তমান বাজারমূল্যের সমান) অংশের এক পঞ্চমাংশ (৫ ভাগের ১ ভাগ বা ২০%) কবজায় চলে আসবে, তখন উসূলকৃত শুধু ওই  এক পঞ্চমাংশের উপরে যাকাত হিসাব করতে হবে। একই ভাবে আবারো যখন বাকি অংকের আরো এক পঞ্চমাংশ উসূল হবে, তখন আবারো ওই এক পঞ্চমাংশের উপরে যাকাত হিসাব করতে হবে। এভাবে প্রতিবার এক পঞ্চমাংশের হিসাব চলতে থাকবে -যাবৎ না পূর্ণ এক বছরের যাকাত আদায় হয়ে যায়। (৪) তবে এক্ষেত্রে যদি পাওনাদারের কবজায় এই دين قوى (শক্তিশালী পাওনা-ঋন)-এর পুরো বা কিছু অংশ উসূল হওয়া ছাড়াও অন্য যাকাতযোগ্য আরো নগদ সম্পদ থেকে থাকে, যা যোগ করে পরিমানে নেসাবের সমান বা তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে এই উসূলকৃত دين قوى (শক্তিশালী পাওনা-ঋন) এবং ওই নগদ সম্পদের মোট পরিমানের উপরে নিয়োনুগ ভাবে যাকাত আদায় করতে হবে। [ফাতাওয়ায়ে শামী- ২/৩০৫]

মাসআলাহ: বর্তমান জামানার সরকারী বেসরকারী সূদী ব্যাংকগুলোতে গ্রহকরা ‘কারেন্ট একাউন্ট’, ‘সেভিংস একাউন্ট’ বা ‘ফিক্সড ডিপোজিট একাউন্ট’-এ যে সকল ‘নগদ মূলধন’ জমা রাখে, সেগুলো শরীয়তের দৃষ্টিতে মূলত: গ্রাহক কর্তৃক ব্যাংককে প্রদত্ত ঋন স্বরূপ (যদিও তা ব্যাংকিং পরিভাষায় ‘আমানত’ হিসেবে পরিচিত করানো হয়ে থাকে)। অর্থাৎ, ব্যাংক হল দেনাদার এবং গ্রাহকরা হল পাওনাদার। বর্তমান কালের মুহাক্কেক আলেমগণের মতে, ব্যাংকের উল্লেখীত একাউন্টগুলোতে জমাকৃত ‘নগদ অর্থ’ সমূহ মূলত: دين قوى (শক্তিশালী পাওনা-ঋন)-এর অন্তর্ভূক্ত। এসব পাওনা ফেরত পাওয়ার কেবল আশা/সম্ভাবনাই রয়েছে -তাই নয়, বরং সরকারী আইন ও ব্যাকিং আইন উভয় বলে তা গ্রাহকরা ফেরত পাওয়ার আইনানুগ পূর্ণ নিশ্চয়তা পেয়ে থাকে। তদুপরি গ্রহকরা তাদের এসব পাওনা অর্থ যখন ইচ্ছে নিজেদের কবজায় নিয়ে নেয়ার সামর্থ রাখে। যেমন, ‘কারেন্ট একাউন্ট’ থেকে প্রতিদিনেই এবং ‘সেভিংস একাউন্ট’ থেকে যে কোনো দিন (সপ্তাহে কয়েকবার করে) নগদ অর্থ কবজায় নেয়া সম্ভব। আর ‘ফিক্সড ডিপোজিট একাউন্ট’ যদিও নির্দিষ্ট কয়েক বছরের (যেমন: পাঁচ/দশ ইত্যাদি বছরের) জন্য হয়ে থাকে, যা ওই মেয়াদের আগে উত্তলন করা যায় না, কিন্তু বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে চুক্তি বাতিল করে জমানো পাওনা টাকা কবজায় আনা সম্ভব। এসব একাউন্ট থেকে জমানো অর্থ নিজ কবজায় আনার এই শাক্তিশালী নিশ্চয়তার কারণেই তা دين قوى (শক্তিশালী পাওনা-ঋন)-এর মধ্যে গণ্য। বিধায়, এসব একাউন্টে নেসাব পরিমান বা তার চাইতে বেশি নগদ মূলধন জমা থাকলে (সূদী অর্থের উপরে নয়) প্রতি বছর নিয়মানুগ ভাবে এর উপরে যাকাত আদায় করতে হবে। [ফাতাওয়ায়ে উসমানী, মুফতী তকী উসমানী- ২/৭১, ৭৪, ৮৮, ১১২] دين قوى (শক্তিশালী পাওনা-ঋন)-এর আরো কিছু নমুনা হল যেমন:- সরকারী পোষ্ট অফিফসের একাউন্টে জমাকৃত মূলধন, বীমা কোম্পানীতে জমাকৃত মূলধন; কোনো ব্যাক্তি/প্রতিষ্ঠানের কাছে রক্ষিত সিকিউরিটি মানি ও বন্ধক ইত্যাদি। এসব অর্থ কবজায় আসার পর এবাবদ বিগত বছরগুলোর যাকাত হিসেব করে আদায় করতে হবে।

(খ)  دين متوسط  (মধ্যম-মানের পাওনা-ঋন): যাকাতদাতা যদি কাউকে যাকাতযোগ্য সম্পদ (তথা স্বর্ণ/রৌপ্য/ নগদ-অর্থ/বাকী-পণ্যমূল্য)-এর মধ্য থেকে কিছু নয়, বরং এসব ভিন্ন যদি কারোর কাছে এমন কিছু জিনিস বাকীতে বিক্রি করে থাকে, যা ব্যবসায়ী পণ্য আকারে ছিল না, তবে সে কোনো কারণে তা বাকীতে বিক্রি করে দিয়েছে, তাহলে দেনাদার-ক্রেতার কাছ থেকে সেই পাওনা অর্থ’কে ফিকহের পরিভাষায় বলা হয় دين متوسط (মধ্যম-মানের পাওনা-ঋন)। যেমন: পরিধানের কাপড় বা ঘরের আসবাবপত্র কিংবা জমি বা বসবাসের বাড়ি বিক্রি করে দেয়া ইত্যাদি। এই জাতীয় পাওনা যদি দেনাদারের কাছ থেকে পাওয়ার বাহ্যত: সম্ভাবনা ও  আশা থাকে, তাহলে পাওনাটি যখন সম্পূর্ণ উসূল হয়ে পানাদারের কবজায় আসবে, তখন থেকে তার উপরে পরবর্তী বছরগুলো যাকাত আদায়েব হিসেব আসবে (যদি সে নিসাবের মালিক হয়)। এক্ষেত্রে কবজায় আসার পূর্বের অনাদায়ী বছরগুলোর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব নয়। [আদ-দুররুল মুখতার- ২/৩০৫; ফাতাওয়ায়ে শামী- ২/৩০৫]

মাসআলাহ: (১) পাওনাদারের কবজায় যদি শুধুমাত্র এই دين متوسط  (মধ্যম-মানের পাওনা-ঋন) ছাড়া আর কোনো যাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকে এবং সে দেনাদারের কাছ থেকে যে পরিমান পাওনা রয়েছে তা যদি কমপক্ষে ৫২.৫ তোরা রূপার বাজারমূলল্যের সমান বা তার বেশি হয়, তাহলেও সে নেসাবের মালিক হয়ে যাবে। (২) পাওনাদার প্রথমবারের মতো নেসাবের মালিক হওয়ার পর বছরান্তে যখন আবারো নেসাবের ওই তারিখ আসবে, সেদিন যদি তার কবজায় শুধুমাত্র এই دين متوسط  (মধ্যম-মানের পাওনা-ঋন) ছাড়া আর কোনো যাকাতযোগ্য সম্পদ না থেকে থাকে এবং দেনাদারের কাছ থেকে পাওনার পরিমান যদি কমপক্ষে ৫২.৫ তোরা রূপার বাজারমূলল্যের সমান বা তার বেশি হয়, তাহলে তার ওই অর্থের উপরে ৫.২% হারে যাকাত আদায় করতে হবে। (৩) তবে এক্ষেত্রে যদি পাওনাদারের কবজায় এই دين متوسط  (মধ্যম-মানের পাওনা-ঋন)-এর পুরো বা কিছু অংশ উসূল হয়ে আসে, এবং সাথে অন্য যাকাতযোগ্য আরো নগদ সম্পদ থেকে থাকে, যা যোগ করে পরিমানে নেসাবের সমান বা তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে এই উসূলকৃত دين متوسط  (মধ্যম-মানের পাওনা-ঋন) এবং ওই নগদ সম্পদের মোট পরিমানের উপরে নিয়োনুগ ভাবে যাকাত আদায় করতে হবে।

(গ) دين ضعيف (দূর্বল পাওনা-ঋন): উপরের বর্ণিত دين قوى (শক্তিশালী পাওনা-ঋন) এবং دين متوسط (মধ্যম-মানের পাওনা-ঋন) বাদে অপরাপর যাকাতযোগ্য পাওনা-ঋনকে ফিকাহশ্বাস্ত্রের পরিভাষায় বলা হয় دين ضعيف (দূর্বল পাওনা-ঋন)। যেমন: স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর পাওনা দেনমোহর, মালিকের কাছ থেকে কর্মীর পাওনা বেতন/মজুরী ইত্যাদি। এই জাতীয় পাওনা-ঋনের ক্ষেত্রে তা যাকাতদাতা’র কবজায় আসার পর থেকেই যাকাতের হিসাব ধর্তব্য হবে -চাই তা যত বছর পরেই কবজায় আসুক না কেনো এবং তার সেই পাওনা অর্থের উপরে ওই বিগত বছরগুলোর যাকাত দেয়া ফরয হবে না। 

মাসআলাহ: বর্তমান জামানার বিজ্ঞ মুহাক্কেক আলেমগণের মতে, ‘সরকারী প্রভিডেন্ট ফান্ড’ যা সরকার বাধ্যতামূলক ভাবে কর্মীর বেতন থেকে কেটে রাখে ও চাকুরী-বিধি মোতাবেক বর্ধিত আকারে একেবারে চাকুরী শেষ হবার পর কর্মীর কবজায় দিয়ে দেয়, তা এই তৃতীয় প্রকারের دين ضعيف (দূর্বল পাওনা-ঋন)-এর অন্তর্ভূক্ত। (১) এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ‘সরকারী প্রভিডেন্ট ফান্ড’-এর টাকা যেদিন চাকুরীজীবী’র কবজায় চলে আসবে (-চাই সেই টাকা কবজায় আসতে যত বছরই বিলম্বীত হোক না কেনো), তারপর থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের পুরো টাকার উপরে যাকাত আদায়ের বিষয়টি ধর্তব্য হবে; তার আগে নয়। এক্ষেত্রে তার সেই টাকাগুলোর উপর দিয়ে গত হওয়া বছরগুলোর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব হবে না।  (২-ক) তবে ‘সরকারী প্রভিডেন্ট ফান্ড’-এর মধ্যে যে অর্থ/টাকা রাখা চাকুরীজীবী’র উপরে আইনানুগ ভাবে বাধ্যতামূলক নয়, বরং ইচ্ছাধীন, তথা চাকুরীজীবী’র জন্য তাতে স্বেচ্ছায় জমা করার অনুমতি আছে, সেক্ষেত্রে তাতে জমাকৃত অর্থের উপরে প্রাপ্ত সরকারী লভ্যাংশটুকু যেহেতু শরীয়ত মতে একটি খাঁটি সূদ, তাই তাতে স্বেচ্ছায় অর্থ জমা করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও গোনাহ’র কাজ, কারণ তাতে সরকারের সাথে সূদী চুক্তি করা ও সূদ লাভ করার মত হারামে লিপ্ত হওয়াটা অবধারিত হয়ে যায়। তবে কোনো চাকুরীজীবী যদি গোনাহ’র বোঝা কাঁধে নিয়েও তাতে স্বেচ্ছায় অর্থ জমা রাখতে থাকে, সেক্ষেত্রে সরকারী নিয়ম মতে যদি সেই টাকাটা চাকুরী জীবন শেষ হওয়ার আগে উত্তলনের সুযোগ না থাকে, তাহলে স্বেচ্ছায় জমাকৃত মোট টাকাটা যেদিন তার কবজায় চলে আসবে (-চাই সেই টাকা কবজায় আসতে যত বছরই বিলম্বীত হোক না কেনো), তারপর থেকে ওই টাকার উপরে যাকাত আদায়ের বিষয়টি ধর্তব্য হবে; তার আগে নয়। (২-ক) তবে যদি স্বেচ্ছায় জমাকৃত টাকাটা জায়েয ভাবে যে কোনো সময় উত্তলন করার সুযোগ থাকে, তাহলে তা উপরের دين قوى (শক্তিশালী পাওনা-ঋন)-এর অধীনে আলোচিত ‘ব্যাংক একাউন্টে’র মতোই প্রতি যাকাতবর্ষরে হিসেব করে যাকাত আদায় করতে হবে। অার ওই স্বেচ্ছায় জমাকৃত টাকার উপরে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সূদের অংশটুকু হারাম হওয়ায় তা সওয়াবের নিয়ত ব্যতীত গরীব অভাবীদের মাঝে দান করে দিতে হবে। [বিস্তারিত: কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ- ২/৯৪; আহকামুল কুরআন, ইমাম জাসসাস- ১/৪৬৮; আদ-দুররুল মুখতার- ২/৩০৫; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২০৭; বাদায়েউস সানায়ে- ২/৯০; আল-মুহিতুল বুরহানী- ৩/২৪৪; খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/২৩৮; ফাতাওয়ায়ে শামী- ২/৩০৫; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ- ১/১৭৫; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ৯/৪০৩; প্রভিডেন্ট ফান্ড পর যাকাত ও সূদ কা মাসআলাহ, মুফতি শফি- ৪৭ পৃষ্ঠা; ইমদাদুল আহকাম- ৩/৪৮০; জাওয়াহিরুল ফিকাহ- ৩/২৫৮; ফাতওয়ায়ে উসমানী, মুফতি তাক্বী উসমানী- ২/৫০, ৫৬]

(৬) হাদিয়া (উপহার) হিসেবে অর্জিত আয়/উপার্জন: কোনো মুসলমান অপর কারোর কাছ থেকে হালাল ভাবে সোনা/রূপা/নগদ অর্থ হাদিয়া (উপহার) স্বরূপ পেয়ে থাকলে এবং তা কমপক্ষে নিসাব পরিমান বা তার বেশি হলে সেক্ষেত্রে সে নিসাবের মালিক হবে এবং তার উপরে বছরান্তে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে (যদি তখনো তিনি নিসাবের মালিক থাকেন)।

(৭) দান সদকাহ হিসেবে অর্জিত আয়/উপার্জন: কোনো মুসলমান যদি যাকাত বা সদকাহ পাওয়ার উপযুক্ত হয় এবং যাকাত/সদকাহ-দাতা যদি প্রাপককে এত বেশি পরিমাণে দান করে যে, তার পরিমাণ কমপক্ষে নিসাবের সমান বা তার চাইতে বেশি হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে সেই যাকাত/সদকাহ গ্রহীতা নিজেই নিসাবের মালিক হয়ে যাবে এবং তার উপরে বছরান্তে নিয়মানুগভাবে যাকাত ফরয হবে (যদি তখনো তিনি নিসাবের মালিক থাকেন)।

 

(২) ব্যবসায়ীক মাল বা পণ্য সামগ্রী’র উপরে যাকাত 

‘ব্যবসায়ীক পণ্য’ একটি যাকাতযোগ্য মাল/সম্পদ, যে সম্পদের উপরে যাকাত আদায় করা ফরয হয় -যখন এর মালিক নেসাবের অধিকারী হয়। ‘ব্যবসায়ীক পণ্য’ বলতে উদ্দেশ্য হল কেবলমাত্র ওই সকল পণ্য বা মাল বা সম্পদ, যা নির্দিষ্ট ভাবে শুধুমাত্র বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা/করানো হয় বা ক্রয় করা/করানো হয়।  

 আল্লাহ তাআলা এরশাদ করছেন- 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ 

“হে মুমিনগণ! তোমরা তৈয়্যেবাত (হালাল/উৎকৃষ্ট/পবিত্র জিনিস সমূহ) থেকে যা উপার্জন করেছো তা থেকে (আমার নির্দেশ মতো) ব্যয় করো”। [সুরা বাকারাহ ২৬৭]

আমরা এর আগেও এই আয়াতে কারিমার মধ্যে উল্লেখীত مَا كَسَبْتُمْ – {তোমরা যা উপার্জন করেছো}-এর ব্যাখ্যায় দেখিয়ে এসেছি যে, এর মধ্যে মুমিন মুসলমানের উপার্জনকৃত ‘নগদ অর্থকড়ি’ (যেমন স্বর্ণমূদ্রা, রৌপ্যমূদ্রা, নগদ কারেন্সি), ‘ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী’ এবং ‘গবাদীপশু’ -এসব জিনিসই অন্তর্ভূক্ত রয়েছে, (যা থেকে শরীয়ত মোতাবেক যাকাত বা অপরাপর দান-সদকাহ করার বিষয়টি বিবেচ্য হয়)। যেমন, বিখ্যাত মুফাসসের মাহমুদ আলুসী রহ. (মৃ: ১২৭০ হি:) বলেছেন- أي الذي كسبتموه أو كسبكم أي مكسوبكم من النقد وعروض التجارة و المواشي – ‘অর্থাৎ, তোমরা যা আয়-উপার্জন করেছো বা মুনাফা করেছো। তথা তোমাদের উপার্জনকৃত নগদ অর্থ, ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী ও গবাদীপশু (-এসবের মধ্য থেকে আল্লাহ’র নির্দেশক্রমে শরয়ী চাহিদা মোতাবেক ব্যয় করো)’। [রুহুল মাআনী, আলুসী- ৩/৩৯]

আর ইমাম মুজাহিদ রহ.-তো এর ব্যাখ্যায় বিশেষ ভাবে বলেছেন যে, এখানে مَا كَسَبْتُمْ – {তোমরা যা উপার্জন করেছো}-অর্থ হল – التجارة الحلال – ‘হালাল ব্যবসা (থেকে যাকাত আদায় করো)’। [জামেউল বায়ান, ইমাম তাবারী- ৫/৫৫৬ আছার ৬১২৪; তাফসীরুল কুরআন, ইমাম ইবনু আবি হাতিম- ১/৫২৬ আছার ২৭৯৩; তাফসীরে মুজাহিদ- ১/১১৮; আদ-দুররুল মানসুর, ইমাম সয়ূতী- ১/৬০৪] ইমাম বুখারী রহ. স্বয়ং তাঁর ‘সহিহ বুখারী’তে- بابُ صدقَةِ الكسْبِ والتِّجارة؛ لقوله تعالى: يَا أيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَنْفِقُواْ مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ {অধ্যায়: আয়-উপার্জন ও ব্যবসায়ের যাকাত; কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ -(হে মুমিনগণ! তোমরা তৈয়্যেবাত (হালাল/উৎকৃষ্ট/পবিত্র জিনিস সমূহ) থেকে যা উপার্জন করেছো তা থেকে (আমার নির্দেশ মতো) ব্যয় করো)}- এই অধ্যায় কায়েম করেছেন। [সহিহ বুখারী- ২/৫২৩] এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, ইমাম বুখারী’র মতেও এখানে مَا كَسَبْتُمْ -এর মধ্যে ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী অন্তর্ভূক্ত রয়েছে, যার উপরে যাকাত অপরিহার্য। একইভাবে ভাবে, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ নাসাফী রহ. (মৃ: ৭১০ হি:) বলেছেন- فيه دليل وجوب الزكاة في أموال التجارة – “এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রীর মধ্যে যাকাত (আদায়) অপরিহার্য”। [মাদারিকুত তানজীল, ইমাম নাসাফী- ১/১৪৮]

সলফে সালেহীন ও পরবর্তী মুহাক্কেক আলেমগণ যে এই সকল আয়াতে কারিমার মধ্যে ‘ব্যবসায়ীক পণ্য’কেও যাকাতযোগ্য সম্পদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেছেন, তা মূলত: বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ও মকবুল হাদিস/আছার এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলের ভিত্তিতে করেছেন, যার কিছুটা নিম্নরূপ:-

হুমায়েদ বিন আব্দির রহমান রহ. বর্ণনা করেছেন আব্দুর রহমান বিন আব্দেল ক্বারী রহ. থেকে যে- وَ كَانَ عَلَى بَيْتِ الْمَالِ فِي زَمَنِ عُمَرَ مَعَ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ الْأَرْقَمِ فَإِذَا خَرَجَ الْعَطَاءُ جَمَعَ عُمَرُ أَمْوَالَ التِّجَارَةِ فَحَسَبَ عَاجِلَهَا وَآجِلَهَا ، ثُمَّ يَأْخُذُ الزَّكَاةَ مِنَ الشَّاهِدِ وَالْغَائِبِ . أخرجه ابن أبي شيبة في المسنف , كتاب الزكاة , ما قالوا في العطاء إذا أخذ: ٦/٥٢٧ رقم ١٠٥٦٧ ; و أبو عبيد في الأموال، ص ٥٢٠-٥٢٦، برقم ١١٧٨ و ١٢١١،: اسناده حسن كما في إعلاء السنن: ١٢/٥٩٦، و صححه ابن حزم في المحلى: ٥/٢٣٤    – ‘তিনি (মুসলীম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা) ওমর রা.-এর (খিলাফতের) জামানায় উবাইদুল্লাহ বিন আরক্বামের সাথে বায়তুল মালের দায়িত্বে ছিলেন। (তিনি বলেন: মানুষজনকে প্রদানের জন্য) যখন (বাৎসরীক সরকারী) অনুদান/ভাতা বেড় করা হত, তখন ওমর রা. সকল ব্যবসায়ীক মালসামগ্রী গুলোকে একত্রিত করতেন, তারপর তার নগদ ও বাকীর হিসাব করতেন। এরপর (তা থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের) উপস্থিত ও অনুপস্থিত -(উভয় প্রকার ধ্বনমাল) থেকে যাকাত উসূল করে নিতেন’। [আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ– ৬/৫৬৭ হাদিস ১০৫৬৭; আল-আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ১/৫২০-৫২৬ হাদিস ১১৭৮, ১২১১; আল-মুহাল্লা, ইবনে হাযাম- ৫/২৩৪]

আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এরশাদ করেন- لَيْسَ فِي الْعُرُوضِ زَكَاةٌ إِلَّا مَا كَانَ لِلتِّجَارَةِ . رواه البيهقي في السنن الكبرى، جماع أبواب صدقة الورق، باب: زكاة التجارة : ٤/٢٤٩ رقم ٧٦٠٥ ، و في السنن الصغير، كتاب: الزكاة، باب: زكاة التجارة : ٢/٥٨ رقم ١٢١٠، و صحَّحه النووى في المجموع : ٦/٥ و الألباني في تمام المنة موقوفًا : ١/٣٦٤، رواه ايضا ابو عبيد في الأموال: رقم ١٠٦٩ و صحَّحه د. مصطفى امين في تخريج الاحاديث والآثار الواردة في كتاب الاموال لابي عبيد   – “(ব্যবহারিক) ভোগপণ্য (জাতীয় জিনিসপত্র)-এর মধ্যে ব্যবসার উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো যাকাত নেই”। [সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৪/২৪৯ হাদিস ৭৬০৫; সুনানুস সুগরা, বাইহাকী- ২/৫৮ হাদিস ১২১০; কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ১০৬৯; আল-মুসান্নাফ, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক- ৪/৯৭; আল-মুসান্নাফ, ইমাম ইবনু আবি শাইবাহ- ৩/১৮৩]

সামুরাহ বিন জুনদুব রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এরশাদ করেন-  أَمَّا بَعْدُ، فَإِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَأْمُرُنَا أَنْ نُخْرِجَ الصَّدَقَةَ مِنَ الَّذِي نَعُدُّ لِلْبَيْعِ . رواه أبو داود في سننه، كتاب الزكاة، باب العروض إذا كانت للتجارة، هل فيها زكاة؟ : ٢/٢١١ برقم ١٥٦٢، و البيهقي في السنن الكبرى، جماع أبواب صدقة الورق، باب: زكاة التجارة : ٤/٢٤٧ رقم ٧٥٩٧، و ضعَّفه الألباني في إرواء الغليل في تخريج أحاديث منار السبيل : ٣/٣١٠ برقم ٨٢٧؛ والحديث وإن كان قد ضعفه بعض أهل العلم فإن العلماء تلقوه بالقبول، وقد حسن إسناده ابن عبد البر  – “রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে নির্দেশ দিতেন, আমরা যে জিনিস বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে গণ্য করে রেখেছি তা থেকে আমরা যেন যাকাত বের করে নেই”। [সুনানে আবু দাউদ- ২/২১১ হাদিস ১৫৬২; সুনানে দারাকুতনী- ২/১২৮; আল-মু’জামুল কাবীর, ত্বাবরানী- ৭/৩০৪ হাদিস৭০২৯; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৪/২৪৭ হাদিস ৭৫৯৭; মাআলিমুত তানজিল, ইমাম বগভী- ১/৩৩০]

রুজাইক বিন হাকিম রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এরশাদ করেন- أَنَّ عُمَرَ بْنَ عَبْدِالْعَزِيزِ، كَتَبَ إِلَيْهِ: أَنِ انْظُرْ مَنْ مَرَّ بِكَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ، فَخُذْ مِمَّا ظَهَرَ مِنْ أَمْوَالِهِمْ مِنَ التِّجَارَاتِ مِنْ كُلِّ أَرْبَعِينَ دِينَارًا دِينَارًا…… . رواه مالك في موطأ ، كتاب: الزكاة، باب: عروض التجارة : ٢/٣٥٨ برقم ٨٨٠، و الشافعي في مسنده، كتاب الزكاة من أوله إلا ما كان معادًا : ١/٩٧، و حسَّنه الأرناؤوط في حاشية سنن أبي داود : ٣/١٠    – “(খলিফায়ে রাশেদ) ওমর বিন আব্দুল আজিজ (তাঁর খিলাফতের জামানায় একবার) তার কাছে চিঠি লিখলেন (এই বলে) যে, মুসলমানদের যে কেউ তোমার সামন দিয়ে অতিক্রম করবে, তখন তাদের ব্যবসায়ীক মালামালের মধ্যে যা (যাকাতযোগ্য মর্মে) জাহের (প্রকাশ্যমান) হয়, তা থেকে প্রতি চল্লিশ দিনারে এক দিনার (যাকাত হিসেবে) গ্রহন করবে। …….”। [আল-মুআত্তা, ইমাম মালেক- ২/৩৫৮ হাদিস ৮৮০; মুসনাদে শাফেয়ী- ১/৯৭]

কুরআন সুন্নাহ’র এই সকল দলিোদি এবং সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আমলের কারণে বিখ্যাত চার মাযহাবের ফকিহ আলেমগণ সকলে একমত যে, ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রীর উপরে যাকাত ধার্য হয়। [বিস্তারিত দেখুন: শারহুস সুন্নাহ, ইমাম বগভী- ৬/৩৫০; আল-ইশরাফ- ৩/৮১; কাশশাফুল ক্বিনা, ইমাম বাইহাকী- ২/২৪০; আরেযাতুল আহওয়াযী, ইবনুল আরাবী- ৩/১৬০; আল-মুজমু’, ইমাম নববী- ৬/৪৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, রমলী- ৩/১০১; মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়্যাহ- ২৫/১৫; আল-মুগনী, ইবনে কুদামাহ- ৪/২৪৮; সুবুলুস সালাম, ইসফাহানী- ৪/৫৪; মাআলিমুস সুনান, ইমাম খাত্তাবী- ২/৫৩; আল-কাফী ফি ফিকহি আহলিল মাদিনাহ, ইবনু আব্দিল বার- ১/২৯৮; আত-তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার- ১৭/১২৫; আশ-শারহুল কাবীর (মাআ হাশিয়াতিদ দুসুকী), দারদীর- ১/৪৭২; আল-ইনায়াহ শারহুল হিদায়াহ, বাবারতী- ২/২১৮; তাবাইয়্যিনিল হাকায়েক, যাইলায়ী- ১/২৭৯; নাইলুল আউতার, শাওকানী- ৪/১৬৩] ইমাম ইবনে মুনযীর রহ. লিখেছেন- وأجمعوا على أن في العروض التي تدار للتجارة: الزكاة إذا حال عليها الحول – ‘আলেমগণ এব্যাপারে একমত যে, যে সকল পণ্যসামগ্রী ব্যবসার উদ্দেশ্যে রাখা হয়, তার উপর দিয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হলে (নিয়মানুগ ভাবে) যাকাত ধার্য হবে’[আল-ইজমা, ইমাম ইবনে মুনযীর- ৫৭ পৃষ্ঠা; আল-ইশরাফ- ৩/৮১] 

মাসআলাহ: ব্যবসায়ী ব্যাক্তি তার ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রীর কারণে যাকাতের নিসাবের মালিক হয়েছে কিনা এবং বছরান্তে তার উপরে যাকাত ফরয হয়েছে কিনা -তা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যাবতীয় পণ্যসামগ্ররীর ‘মোট বাজার মূল্য’ ধরে হিসেব করতে হবে। অর্থাৎ, ব্যবসায়ী ব্যাক্তি সংশ্লিষ্ট তারিখে পণ্যগুলি বাজারে বিক্রি করে দিলে (আনুমানিক) যে মূল্য পেতো, সেই মূল্য ধরে হিসেব করতে হবে। [বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/১১১; আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/২৮৬; আল-বুরহান শারহু মাওয়াহিবির রাহমান- ১/৫০৭; আল-মুগনী, ইবনে কুদামাহ- ৩/৫৮; ফাতওয়ায়ে উসমানী, মুফতি তাক্বী উসমানী- ২/৫২]

মাসআলাহ: ব্যবসায়ী ব্যাক্তির মালিকানা-কবজায় যদি ‘ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী’ ছাড়া আর কোনো যাকাতযোগ্য নগদ সম্পদ (সোনা/রূপা/নগদ অর্থ) না থাকে, তাহলে- (১) চন্দ্র মাস অনুযায়ী যে তারিখে তার যাবতীয় ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রীর মোট মূল্য কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি হবে, সেই তারিখে তিনি যাকাতের নিসাবের মালিক হবেন। (২) প্রথমবার নিসাবের মালিক হওয়ার পর পরবর্তীতে যে কোনো যাকাতবর্ষের ওই একই তারিখে  আবারও যদি ‘ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী’ ছাড়া তার কাছে আর কোনো যাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকে এবং যদি তার যাবতীয় ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রীর মোট মূল্য কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি হয়, তাহলে যাবতীয় পণ্যমূল্যের উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করবেন। ইমাম বগভী রহ. লিখেছেন- ذهب عامة أهل العلم إلى أن التجارة تجب الزكاة في قيمتها، إذا كانت نصاباً تمام الحول، فيخرج منها ربع العشر – “মুহাক্কেক আলেমগণ ব্যপক ভাবে এই মত দিয়েছেন যে, ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রীর মূল্যের উপরে যাকাত অপরিহার্য হবে তখন, যখন তা নিসাবের মাত্রায় আসবে এবং (সেই মালের উপরে দিয়ে) পূর্ণ এক বছর অতিক্রান্ত হবে। তখন তা থেকে (যাকাত বাবদ) চল্লিশ ভাগের এক ভাগ (তথা ২.৫%) বের করতে হবে” । [শারহুস-সুন্নাহ, ইমাম বগভী- ৬/৩৫০]

মাসআলাহ: (১) ব্যবসায়ী ব্যাক্তি ব্যাক্তির মালিকানা-কবজায় যদি ‘ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী’ ছাড়াও অপরাপর যাকাতযোগ্য নগদ সম্পদ (সোনা/রূপা/নগদ অর্থ) থেকে থাকে, তাহলে ‘পণ্যমূল্য ও নগদ সম্পদের মোট পরিমাণ’ যদি কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি হয়, তাহলে সেই তারিখে তিনি যাকাতের নিসাবের মালিক হবেন। (২) ব্যবসায়ী ব্যাক্তি নিসাবের মালিক হওয়ার পরের কোনো যাকাতবর্ষে যাকাত দানের তারিখে তার মালিকানা-কবজায় যদি ‘ব্যবসায়ীক পণ্যসামগ্রী’ ছাড়াও অপরাপর যাকাতযোগ্য নগদ সম্পদ (সোনা/রূপা/নগদ অর্থ) থেকে থাকে, তাহলে ‘পণ্যমূল্য ও নগদ সম্পদের মোট পরিমাণ’ যদি কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি হয়, তাহলে ওই পণ্যমূল্য ও নগদ সম্পদের উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করতে হবে। [কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মাদ- ২/৮৯; কিতাবুল হুজ্জাহ, ইমাম মুহাম্মাদ- ১/৩০৯; আল-মাবসুত, সারাখসী- ২/১৬৫; আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/৩০৩; আল-বাদায়েউস সানায়ে- ২/৯৬; শারহু মুখতাসারিত তাহাবী- ২/৩১৯; ই’লাউস সুনান- ৯/৪৮]

মাসআলাহ: বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নয় -এমন কোনো প্রকারের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদের উপরে যাকাত ফরয হয় না। [আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৬৪; আল-হিদায়াহ- ১/১৮৬; আল-বাদায়েউস সানায়ে- ২/২১; রাদ্দুল মুহতার- ২/২৬৭] যেমন: জমি-জমা, দোকানের দালান/ইমারত, দোকানের আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি ইত্যাদি -যা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রাখা হয়নি, তার উপরে যাকাত নেই। হ্যাঁ, এসব জিনিসের উপরে শুধুমাত্র তখনই যাকাত ধার্য হবে, যদি তা নিরেট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যেই ক্রয় করা হয় অথবা প্রস্তত করা হয় কিংবা নিজের মালিকানায় নেয়ার সময়ই তা বিক্রয় করে দেয়ার নিয়তে নেয়া হয়। কিন্তু যদি তা ক্রয় করা/প্রস্তত করা/নিজের মালিকানায় নেয়ার সময় নিরেট বিক্রয়ের সুনিদিষ্ট নিয়ত না থাকে, বরং একাধিক নিয়ত থাকে, (যেমন: যদি এই নিয়ত থাকে যে, জমিটি কিনে রাখি পরে সুযোগ মতো থাকার জন্য বাড়ি বানাবো, অথবা বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দিবো, আর না হয় ভাল দাম পেলে বিক্রি করে দিবো -এজাতীয় একাধিক অনির্দিষ্ট নিয়ত যদি একই সম্পদ/মালের ক্ষেত্রে থাকে তাহলে) সেই জিনিসের উপরে যাকাত ফরয হবে না। [ফাতওয়ায়ে উসমানী, মুফতি তাক্বী উসমানী- ২/৪১]

প্রয়োজনীয় ঋন/দেনা বাদ দিয়ে তারপর যাকাত হিসেব করতে হবে 

ইমাম আবু উবাইদ রহ. (মৃ: ২২৪ হি:) নিজ সনদে মাইমুন বিন মিহরান রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন- إذا حلَّتْ عليك الزَّكاةُ؛ فانظر ما كان عندك مِن نقْدٍ أو عرَضٍ للبَيعِ، فقوِّمْه قيمةَ النَّقد، وما كان من دَينٍ في مَلاءةٍ فاحسِبْه، ثم اطرحْ منه ما كان عليك من دَينٍ، ثم زكِّ ما بَقِيَ . رواه أبو عُبيد القاسم بن سلَّام في الأموال : ١/٤٣١ رقم ١١٨٤ ، و ابن أبي شيبة بنحوه في المصنف : ٣/١٦٢  – “তোমার উপরে যখন যাকাত ফরয হয়ে যায়, তখন দেখো তোমার কাছে নগদ (অর্থ) ও বিক্রয়যোগ্য পণ্যসামগ্রী কত আছে। পরে সেটার নগদ মূল্য নির্ধারণ করে নাও। এছাড়া আদায়যোগ্য পাওনা-ঋনের যা কিছু আছে তা হিসাবে ধরো, (তথা নগদ অর্থ এবং পণ্যমূল্যের সাথে যোগ করে নাও)। তারপর তোমার উপরে ঋন/দেনা থাকলে সেটা তা থেকে বাদ দাও। এরপর যা অবশিষ্ট থাকে তার যাকাত আদায় করো”। [কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ- ১/৪৩১ আছার ১১৮৪; আল-মুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বাহ- ৩/১৬২]

যে সকল মুসলমান তাদের জীবনযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের অভাব বা সমস্যা জনিত ঠেঁকায় পড়ে বাধ্য হয়ে বা জীবনযাত্রার স্বাভাবিক সাধারণ কারণে দেনাদার/ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে -চাই ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে ঋণগ্রস্থ হোক, কিংবা অপরকে প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগীতা করতে গিয়ে ঋণগ্রস্থ হোক -উভয় ক্ষেত্রেই সেই ঋণগ্রস্থ মুসলমান তার মোট যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে এসব ঋনকে বাদ দেয়ার পর যদি তার কাছে কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকে, তাহলে সেই তারিখে তিনি যাকাতের নিসাবের মালিক হবেন। প্রতি বছর যাকাতের তারিখে  ‘নিসাবের হিসাব’ এবং ‘যাকাতের হিসেব’ করার সময় প্রয়োজনীয় ‘ঋন’কে বাদ দিয়ে নিসাব ও যাকাত হিসেব করতে হবে। [আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/২৬৩; আল-হিদায়াহ- ১/১৮৬]

(ক) ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে ঋণগ্রস্থ হওয়া: একজন মুসলমান ব্যাক্তিগত বিভিন্ন ঠেঁকায় পড়ে বা জীবনযাত্রার স্বাভাবিক সাধারণ কারণে অন্যের কাছ থেকে ঋন গ্রহন করতে বাধ্য হতে পারে। যেমন: মাথা গোঁজার মতো প্রয়োজনীয় ঘর বাড়ি নির্মান, সয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিছানা তৈরী/ক্রয়, ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী ক্রয়, খাবার-দাবার রান্না পরিবেশন ও সংরক্ষন করার জন্য প্রয়োজনীয় পাত্র ও হান্ডিপাতিল ক্রয়, প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ক্রয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খরচ, ছেলে মেয়ে’দের লানপালন ও বিয়ে শাদির প্রয়োজনীয় খরচ, মেহমানদারীর খরচ ইত্যাদি সামাল দিতে গিয়ে মানুষকে প্রায়’ই ঋনগ্রস্থ হতে হয়, দেনায় পড়তে হয়। এছাড়ও মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম দূর্যোগ, দূর্ঘটা ও বিপদ-আপদের কারণে (যেমন: নদী-ভাঙ্গন, বন্যা, টর্নেডো, ভুমিকম্প, ডাকাতী, ব্যাবসায়ীক ক্ষয়-ক্ষতি ইত্যাদি কারণে) অভাবে পড়ে  যায় কিংবা নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত হয়ে যায়  এবং তারা মানুষের কাছে ভিক্ষার হাত না পেতে বরং ঋন নিয়ে প্রয়োজন মেটায়। সংশ্লিষ্ট চলতি বছরের ‘নিসাবের হিসাব’ এবং ‘যাকাতের হিসেব’ করার সময় এই জাতীয় ‘ঋন’কে বাদ দিয়ে নিসাব ও যাকাত হিসেব করতে হয়।

(খ) অন্যের কল্যানে নিজে ঋণগ্রস্থ হওয়া: আল-হামদুলিল্লাহ সমাজে এমন উদার ও বড় মনের মুসলীমও পাওয়া যায়, যারা অন্যেদের বিভিন্ন জরুরী প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রয়োজনে নিজের কাঁধে ঋনের বোঝা উঠিয়ে হলেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। যেমন:-

(১) গরিব অভাবী আত্বীয়-স্বজনদের মধ্যে অনেকের প্রয়োজনীয় পোশাক, ক্ষুদাকষ্ট দূরকারী খাবার-দাবার কিংবা মাথা গোঁজার ঠাই-এর ব্যবস্থা করা অথবা তাদের জরুরী চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি সামাল দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া। 

(২) সাধারণ অভাবী গরিব পাড়া-প্রতিবেশিদের অনেকের প্রয়োজনীয় খরচ সামাল দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া। 

(৩) এতীম অথবা বিধবা কিংবা সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধ/বৃদ্ধাদের প্রয়োজনীয় খরচ সামাল দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া।

(৪) অভাবী গরিব কাউকে দ্বীনের আলেম বানানোর জন্য তার ব্যায়ভার চালাতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া।

(৫) কারোর আকস্মিক কোনো বিপদ-অাপদ বা দূর্ঘটনার সময় প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িতে দিতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়া। ইত্যাদি…..  

এধরনের যেসকল উদার মুসলমানগণ অপরের জরুরী প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসেন এবং কখনো কখনো ঋনের বোঝাও নিজেদের কাঁধে তুলে নেন, তারা সংশ্লিষ্ট চলতি বছরের ‘নিসাবের হিসাব’ এবং ‘যাকাতের হিসেব’ করার সময় এই জাতীয় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ‘ঋন’কে বাদ দিয়ে নিসাব ও যাকাত হিসেব করবেন।

(গ) বিবিধ কারণে দেনাদার/ঋণগ্রস্থ হওয়া: এর বিভিন্ন উদাহরণ হতে পারে। যেমন: স্ত্রীর দেনমোহরের যে অংশটুকু অনাদায়ী রয়েছে, সেটি স্বামীর উপরে একটি ঋন/দেনা। এমনি ভাবে, অধীনস্ত কর্মী/মজুর যদি মালিকের কাছে বেতন/মজুরী পাওনা থাকে, তাহলে সেটাও একটি ঋন/দেনা, যেখানে কর্মী/মজুর হল পাওনাদার এবং মালিক হল দেনাদার। ইত্যাদি…..। সংশ্লিষ্ট চলতি বছরের ‘নিসাবের হিসাব’ এবং ‘যাকাতের হিসেব’ করার সময় এই জাতীয় ‘ঋন’কে বাদ দিয়ে নিসাব ও যাকাত হিসেব করতে হয়।

মাসআলা: সংশ্লিষ্ট যাকাতবর্ষে কোনো ব্যাক্তির উপরে ঋণের পরিমাণ যদি  এই পরিমাণ হয় যে, তা তার  যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ দিলে সে আর নিসাবের মালিক থাকে না, তাহলে তার উপরে সেই বছরে যাকাত ফরয হবে না, আর নিসাবের সমান বা তার বেশি হলে যাকাত ফরয হবে। [আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/২৬৩; আল-বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/৮৩]

মাসআলা: ঋণের পূর্ণ অর্থ কিংবা তার কিছু অংশ যদি সংশ্লিষ্ট চলতি যাকাতবর্ষের মধ্যেই আদায় করে দেয়ার পাক্কা নিয়ত থাকে বা আদায় করতে হয়, তাহলে যতটুকু ঋণ পরিশোধ করতে চাইবে বা পরিশোধ করতে হবে, ঠিক ততটুকু অংশ যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ দিয়ে যাকাত হিসেব করবে; (পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে চাইলে পূর্ণ অর্থ বাদ দিবে, আর আংশিক অর্থ পরিশোধ করতে চাইলে আংশিক বাদ দিয়ে হিসেব করবে)। আর ঋনের যে অংশটি সংশ্লিষ্ট চলতি যাকাতবর্ষের মধ্যে আদায় করার নিয়ত থাকবে না বা আদায় করতে হবে না, সেই অংশটুকু যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ যাবে না। যেমন: স্ত্রীর দেনমোহরের অনাদায়ী অংশ, অধীনস্ত কর্মী/মজুরের অনাদায়ী বেতন/মজুরী, ব্যাক্তিগত ঋনের অনাদায়ী কিস্তি, ব্যাংক ঋনের অনাদায়ী কিস্তি ইত্যাদি বিভিন্ন ঋন পরিশোধ করার ক্ষেত্রে এই মাসআলাহটি প্রযোজ্য হবে। [আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৬১; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২০৪; ফাতাওয়া বাযযাযীয়া- ৪/৮৪; আল-বাহরুর রায়েক- ২/২০৪; খুলাসাতুল ফাতায়া- ১/২৪০; জামেউর রুমুয- ১/৩০০; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর- ১/৩৯১; রাদ্দুল মুহতার- ২/২৬১; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী- ১/১৭৩]

মাসআলা: মানুষ ব্যবসা বানিজ্যের উন্নতি ও পণ্য প্রস্তুত বা ক্রয়ের জন্য কোনো ব্যাক্তি/ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান নগদ আকারে যে সকল ‘ঋণ (loan)’ নিয়ে থাকে, সেগুলো মূলত: ‘বানিজ্যিক ঋণ’ (কমারশিয়াল-লোন) বা ‘উন্নয়নমূলক ঋণ’ (ডেভেলপমেন্ট-লোন) হিসেবে গণ্য। এজাতীয় ঋন/লোনের ক্ষেত্রে মাসআলাহ হল- 

(১) ঋনের যতটুকু অংশ সংশ্লিষ্ট চলতি যাকাতবর্ষের যাকাতের তারিখ পর্যন্ত ঋণগ্রহীতা’র কবজায় (মালিকানা ব্যবহারাধীকারে) নগদ আকারে থাকবে, ততটুকু অংশ যাকাতের তারিখে তার অপরাপর যাকাতযোগ্য সম্পদের সাথে যোগ করে নিসাব ও যাকাতের হিসেব করতে হবে; তা যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বিয়োগ যাবে না।

এর কারণ হল, শরীয়ত শুধুমাত্র ব্যাক্তির ঠেঁকায় পড়া প্রয়োজনীয় ঋন/দেনা’কে যাকাতের হিসেব থেকে বাদ দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এমনকি যাকাত ব্যয়ের ৮টি খাতের মধ্যে ‘গারেমুন (ঋনগ্রস্থ ব্যাক্তিরা)’ নামে যে খাতের উল্লেখ রয়েছে (যার আলোচনা আমরা এখানে করেছি) সেই খাতের আওতায়ও যাকাত পাওয়ার হক্বদার শুধুমাত্র সেই সকল ঋনগ্রস্থ ব্যাক্তিবর্গ যারা নিতান্ত ঠেঁকায় পড়ে প্রয়োজনে সাধারণত: ঋনগ্রস্থ/দেনাদার হয়ে পড়েছে। শরীয়তে যাকাতের সাথে ঋণ ও ঋনগ্রহীতার সম্পর্ক এটাই। আর আজকাল বড় বড় কোম্পানী ও ইন্ডাস্ট্রীজের মালিক/শরীক’রা যারা ব্যবসায়িক উন্নয়নের জন্য ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কমারশিয়াল-লোন বা ডেভেলপমেন্ট-লোন নামে মোটা অংকের ঋন নেয়, তাদের ব্যবসায়ে সাধারণত: নিজেদের সম্পদের পরিমানের চাইতে কমারশিয়াল-লোন/ডেভেলপমেন্ট-লোনের নামে গৃহীত বানিজ্যিক ঋনের পরিমান থাকে অনেক অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ: তাদের নিজেদের সম্পদ যদি থাকে মোট ১০০ কোটি টাকা হয়, তাহলে ব্যাংক থেকে গ্রহনকৃত কমারশিয়াল-লোন বা ডেভেলপমেন্ট-লোনের পরিমান হয়তো ৫০০ কোটি টাকা। এমতাবস্থায়, আপনিই বলুন, এরা কি ধ্বনী নাকি গরীব হিসেবে গণ্য হবার যোগ্য। যদি এসব বানিজ্যিক ঋনের মোকাবেলায় তাদের নিজেদের সম্পদ কম থাকার কারণে এদেরকে ঋনগ্রস্থ অভাবী গরিব বলে গণ্য করেন, তাহলে তারা এমন গরিব অভাবী যাদের রয়েছে দেশে বিদেশে বড় বড় বাংলো, বিলাসবহুল দালানকোঠা, দামী দামী গাড়ি পেশাক-আশাক, যারা প্লেনে ভ্রমন করে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়ায় ব্যয়বহুল বিনোদন ও দামী দামী জিনিস কেনাকাটার জন্য। এই যদি হয় গরিব অভাবী’র বৈশিষ্ট, তাহলে কি আপনার মতে এরাই উল্টো যাকাত পাওয়ার যোগ্য? !!!  তার অর্থ এই দাড়ায় যে, যেসকল দিনমজুর, দোকানদার, মধ্যবৃত্ত উপার্জনকারী ব্যাক্তিরা কষ্ট করে টাকাপয়সা জমাতে জমাতে নেসাবের মালিক হবে (তথা ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূল্য, যা মনে করুন প্রায় ৩৬,০০০/= থেকে ৪০,০০০/= টাকার মতো জমাতে সমর্থ হবে), তারা  তাদের সেই সম্পদ থেকে ২.৫% হারে যাকাত বের করবে, আর এদিকে যারা বিলাসবহুল ধ্বনীক শ্রেণিটি যাকাতের অর্থ খাবে!!! এজন্য, ইসলামী শরীয়ত যেসকল ঠেঁকায় পড়া সাধারণ স্বাভাবিক  ‘ঋন’-কে যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ দিয়ে যাকাত হিসেব করার সুযোগ দিয়েছিল এবং যে ধরনের ঋনগ্রস্থ  ব্যাক্তিদেরকে যাকাতের সম্পদ থেকে দেয়ার পথ করে দিয়ে মুসলমানদের নিজেদের মাঝে অর্থনৈকিত একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার একটি আইনানুগ ব্যবস্থা দিয়েছিল, আজকালকার পরিভাষার বানিজ্যিক ‘ঋন’গুলি মূলত: সেই বৈশিষ্টে পড়ে না, কারণ তাতে যাকাতের মূল উদ্দেশ্য গোড়া থেকেই ব্যহত হয়ে যাবে। এজন্য এ যুগের বড় বড় মুহাক্কেক ফকিহ আলেমগণের মতে, ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে নগদ আকারে নেয়া ‘কমারশিয়াল-লোন’ বা ‘ডেভেলপমেন্ট-লোন’ সংশ্লিষ্ট ঋনী ব্যাক্তির যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বিয়োগ যাবে না, বরং এজাতীয় ঋন নিয়ে নেসাবের মালিক হলে তাকে এর উপরে নিয়োমানুগ ভাবে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করতে হবে।

(২) সংশ্লিষ্ট চলতি যাকাতবর্ষের যাকাতের তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঋণগ্রহীতা ঋনের যতটুকু অংশ দিয়ে অ-যাকাতযোগ্য কোনো সম্পদ (যেমন: জমিজমা, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ইত্যাদি) ক্রয়/প্রস্তুতের জন্য ব্যয় করবে, ঋনের ততটুকু অংশ যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বিয়োগ করে নিসাব ও যাকাতের হিসেব করতে হবে। 

(৩) সংশ্লিষ্ট চলতি যাকাতবর্ষের যাকাতের তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঋণগ্রহীতা ঋনের যতটুকু অংশ দিয়ে যাকাতযোগ্য কোনো সম্পদ (যেমন: সোন, রূপা, ব্যবসায়িক পণ্যসামগ্রী ইত্যাদি) ক্রয়/প্রস্তুতের জন্য ব্যয় করবে, ঋনের ততটুকু অংশ যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বিয়োগ করে নিসাব ও যাকাতের হিসেব করতে হবে। কারণ এসব যাকাতযোগ্য সম্পদ এই ঋণের হিসেব করার আগেই মূল যাকাতযোগ্য সম্পদগুলির সাথে প্রথমে যোগ করে তারপর তা থেকে ঋনকে বাদ দেয়া হচ্ছে, বিধায় এই যাকাতযোগ্য সম্পদ দু’বার হিসেব আসতে পারে না। [ফিকহী মাকালাত, মুফতী তক্বী উসমানী- ৩/১৫৬; ফাতাওয়ায়ে উসমানী- ২/৮৩]

মাসআলা: জুয়া খেলা, সূদী লেনদেন করা, মদ ও মাদক সেবন, জেনা-ব্যাভিচার করা, নাজায়েয প্রেম পরকীয়া করা, নাজায়েয গান-বাজনা আমোদ প্রমদের অনুষ্ঠান, বিদআতী অনুষ্ঠান পালন, নাজায়েয বিলাসীতা অপব্যয় অপচয় করা ইত্যাদি বিভিন্ন হারাম ও নাজায়েয কারণে যারা ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছে, নিসাব ও যাকাত হিসাব করার সময় তাদের যাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে ওই ঋন বাদ যাবে না -(যদিও সেই ঋনকে কারোর হালাল মাল থেকে হালাল পন্থায়ই নেয়া হোক না কেনো)।

যাকাত কিভাবে হিসেব করবেন -তার সহজ নমুনা পদ্ধতি 

 উপরের আলোচনা মাসআলাহ মাসায়েল গুলো বিস্তারিত পড়ে নেয়ার পর এবারে নিম্নোক্ত ভাবে নিসাব ও যাকাতের হিসেব বের করুন:-

(১) প্রথমে বের করুন, আপনি নিসাবের মালিক কিনা। অর্থাৎ (চন্দ্র মাস অনুযায়ী) যে তারিখে আপনার মালিকানাধীন যাবতীয় যাকাতযোগ্য সম্পদের মোট মূল্য কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজার মূল্যের সমান বা তার থেকে বেশি হয়, ঠিক সেই তারিখেই আপনি ‘নিসাবের মালিক’ হিসেবে গণ্য হলেন।

আরো খোলাসা: আপনার মালিকানা-কবজায় থাকা (সোনা + রূপা + নগদ আয়/উপার্জন + নগদ পাওনা অর্থ + বিক্রয়যোগ্য পণ্য)-এর মোট বাজারমূল্য বের করুন। তারপর প্রাপ্ত এই মোট বাজারমূল্য থেকে আপনার ‘ঋন/দেনা’ বিয়োগ দিন। এভাবে যোগ ও বিয়োগ করার পর মোট যে টাকা অবশিষ্ট থাকে, তা যেই তারিখে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজার মূল্যের সমান বা তার থেকে বেশি হয়, ঠিক সেই তারিখে আপনি ‘নিসাবের মালিক’ হিসেবে গণ্য হলেন। একদম সোজা হিসাব।

(২) এবারে নিসাবের তারিখটি স্মরণে রাখুন কিংবা ডাইরীতে লিখে রাখুন । প্রতি বছর ঠিক এই ‘চন্দ্র মাসের তারিখ’টিই আপনার যাকাত হিসাবের তারিখ হিসেবে গণ্য হতে থাকবে। (উদাহরণ স্বরূপ: মনে করুন আপনি নেসাবের মালিক সাব্যস্থ হলেন ৬-ই মহররম ১৪৪১ হিজরী তারিখে। এরপর থেকে হিজরী ১৪৪২, ১৪৪৩, ১৪৪৪ -এর ৬-ই মহররম তারিখটিই হবে আপনার যাকাত হিসাবের তারিখ)।

মাসআলা: যে মুসলমান ইমানের দূর্বলতা বা মুর্খতার কারণে আগের কোনো বছরে নিসাবের মালিক হওয়া সত্ত্বেও যাকাত আদায় করেনি, এখন আদায় করতে চায়, কিন্তু সে কোন তারিখে নেসাবের মালিক হয়েছিল তা নির্ণয় করার কোনো পথ পায় না, তার জন্য এই অবকাশ আছে যে, সে চন্দ্র মাস অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট নিসাবের তারিখ ঠিক করে নিবে এবং প্রতি বছর ঠিক ওই তারিখটিকেই যাকাতের নিসাবের তারিখ রূপে মূল্যায়ন করতে থাকবে, (ওই তারিখটি আর বদলাবে না)। [ফিকহী মাকালাত, মুফতি তাকী উসমানী- ৩/১৬২]

(৩) এরপর চন্দ্র মাস অনুযায়ী দীর্ঘ ১ (এক) বছর অপেক্ষা করুন এবং আবারও ঠিক ওই তারিখটি আসা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকুন। (উপরের উদাহরণ হিসেবে, আপনি নেসাবের মালিক সাব্যস্থ হলেছিলেন ৬-ই মহররম ১৪৪১ হিজরী তারিখে। এবারে আপনি আগামী বছর তথা ১৪৪২ হিজরীর ঠিক ৬-ই মহররম তারিখ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন)।

(৪) এভাবে (চন্দ্র মাস অনুযায়ী) দীর্ঘ ১ (এক) বছর অপেক্ষা করার পর নিসাবের তারিখটি এলে আবারো হিসাব করে দেখুন আপনি নিসাবের মালিক রয়েছেন কিনা। নিসাবের মালিক থাকলে যাকাতযোগ্য মোট সম্পদের উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করুন, আর নিসাবের মালিক না হলে সে বছর আপনাকে যাকাত আদায় করতে হবে না। (উপরের উদাহরণ হিসেবে আপনি ৬-ই মহররম ১৪৪১ হিজরী তারিখে নিসাবের মালিক হয়েছিলেন। এবারে পরবর্তী বছর তথা ১৪৪২ হিজরীর ঠিক ৬-ই মহররম তারিখটি আসলে আপনি উপরের একই নিয়মে আপনি নিসাবের মালিক আছেন কিনা -তা আবারো হিসেব করুন)।

আরো খোলাসা: আপনি এবছর নিসাবের তারিখে আবারো আপনার মালিকানা-কবজায় থাকা (সোনা + রূপা + নগদ আয়/উপার্জন + নগদ পাওনা অর্থ + বিক্রয়যোগ্য পণ্য)-এর মোট বাজারমূল্য বের করুন। তারপর প্রাপ্ত এই মোট বাজারমূল্য থেকে আপনার ‘ঋন/দেনা’ বিয়োগ দিন। এভাবে যোগ ও বিয়োগ করার পর আপনার কাছে মোট যে টাকা অবশিষ্ট থাকে, তা যদি ৫২.৫ তোলা রূপার বাজার মূল্যের সমান বা তার থেকে বেশি হয়, তাহলে এবছরও আপনি নিসাবের মালিক’ গণ্য হওয়ায় এবারে আপনার ওই মোট অবশিষ্ট টাকার উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করুন। আর যদি আপনি নিসাবের মালিক না হন, তাহলে আপনাকে এবছর যাকাত আদায় করতে হবে না।

মাসআলাহ: প্রথম নিসাবের তারিখ থেকে পরবর্তী বছরের নিসাবের তারিখ পর্যন্ত মধ্যবর্তী এই এক বছরের ভিতরে আপনার বিভিন্ন প্রকারের আয় ও ব্যয়ের কারণে আপনার মোট ‘যাকাতযোগ্য সম্পদ’ কতটা বেশি হল নাকি কমে গেল -তা এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়, বরং বিবেচ্য বিষয় হল, ওই এক বছর পরের নেসাবের তারিখে আপনি নিসাবের মালিক আছেন কিনা -সেটি। যদি নিসাবের তারিখের এক দিন আগে এসেও আপনার আয়ের মধ্যে কোনো ‘যাকাতযোগ্য সম্পদ’ যুক্ত হয় এবং তা নিসাবের তারিখটি পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে, তবুও তা যাকাতের হিসেবের মধ্যে ধর্তব্য হবে। [আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৮৮; মারাকিউল ফালাহ আলাত তাহতাবী- ১/৩৮৯; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী- ১/১৭৫] নেসাবের মালিক হলে যাকাত আদায় করুন, নেসাবের মালিক না হলে যাকাত আদায় করতে হবে না। (উপরের উদাহরণ হিসেবে, আপনার প্রথম নিসাবের তারিখ তথা ৬-ই মহররম ১৪৪১ হিজরী তারিখে আপনার কাছে ছিল মনে করুন মোট ‘৬০,০০০/= (ষাট হাজার)’ টাকা , আর ঠিক সেদিন ৫২.৫ তোলা রূপা’র বাজার মূল্য ছিল ৩৪১২৫ (চৌত্রিশ হাজার এক’শ পঁচিশ), যার কারণে আপনি সেদিন নিসাবের মালিক সাব্যস্থ হয়েছিলেন। এবারে এর ঠিক ১ (এক) বছর পর আপনার দ্বিতীয় নিসাবের তারিখে তথা ৬-ই মহররম ১৪৪২ হিজরী তারিখে আপনি দেখতে পেলেন যে, ৫২.৫ তোলা রূপা’র বাজার মূল্য ৪২,০০০/= (বিয়াল্লিশ হাজার) টাকা এবং আপনার কাছে আছে ৪৮,০০০/= (আটচল্লিশ হাজার) টাকা। কাজেই আপনি এবারে ৪৮,০০০/= (আটচল্লিশ হাজার) টাকার উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করবেন মোট ১২০০/= (এক হাজার দুই’শ) টাকা। কিন্তু সেদিন আপনার কাছে যদি ৪২,০০০/= (বিয়াল্লিশ হাজার) টাকার কম থাকতো, তাহলে নিসাবের মালিক না হওয়ায় আপনার উপরে যাকাত ধার্য হত না। অর্থাৎ, নেসাবের তারিখ ও পরবর্তী বছরের নেসাবের একই তারিখের মধ্যবর্তী দিনগুলোতে আপনার আয়/ব্যয়ের জোয়ার-ভাটা বা উত্থান পতন হিসেবযোগ্য নয়, বরং হিসেবটা হল আপনার পরবর্তী বছরের নিসাবের তারিখে আপনি নিসাবের মালিক কিনা -সেটি)।

নগদ সম্পদ ও ব্যবসায়িক পণ্য সম্পর্কিত আরো জরুরী কিছু মাসআলা

মাসআলা: যদি কিছু স্বর্ণ, কিছু রৌপ্য, কিছু নগদ অর্থ এবং কিছু ব্যবসায়ীক পণ্য থাকে এবং এর সবগুলোর বাজার মূল্য মিলিয়ে যদি কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূলল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি হয়, তাহলে নেসাবের মালিক হওয়ায় ওই মোট সম্পদের উপরে ২.৫% হারে যাকাত ধার্য হবে -(যদি যাকাত আদায়যোগ্য অপরাপর শর্তাদি পাওয়া যায়)। [আল-মাবসুত, সারাখসী- ২/১৯১; আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী- ২/২৯৯; আত-তাতারখানিয়াহ- ২/২৩৭; আল-হিদায়াহ- ১/১৯৬]

মাসআলা: যাকাতদাতা যদি বিগত বছরের স্বর্ণ/রৌপ্যের যাকাত আদায় করে না থাকে এবং এখন তা আদায় করতে চায়, তাহলে অনাদায়ী বছরগুলোতে স্বর্ণ/রৌপ্যের বাজারমূল্য ধর্তব্য হবে না, বরং বর্তমান বাজারমূল্য অনুপাতে যাকাত হিসেব করে আদায় করতে হবে। [আল-বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/২২; আল-বুরহান শারহু মাওয়াহিবির রাহমান- ১/৫০৭; আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৮২]

মাসআলা: নগদ অর্থ কোনো হালাল ব্যবসায় কিংবা অন্য কোনো আয়ের খাতে না খাটিয়ে এমনিতে অযথা ফেলে রাখলেও তাতে যাকাত ধার্য হবে -(যদি শর্ত মোতাবেক নিসাবের মালিক হয়)। [আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৬৭; আর-রাদ্দুল মুহতার- ২/২৬২, ৩০০]

মাসআলা: নিসাবের মালিক যদি হজ্জ বা ওমরা কিংবা অন্য কোনো হালাল উদ্দেশ্যে (যেমন: ঘরবাড়ি নির্মান, গাড়ি/মটরসাইকেল ক্রয় ইত্যাদির জন্য) নগদ অর্থ জমা করতে থাকেন, আর এমতাবস্থায় ওই হজ্জ বা ওমরা কিংবা ওই হালাল উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়ার আগেই যদি সামনের যাকাতের নিসাবের তারিখ চলে আসে, তাহলে (১) যদি তার পরিমাণ কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূলল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি হয় (এবং এই জমানো অর্থ ছাড়া আর কোনো যাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকে), তাহলে তিনি নিসাবের মালিক হওয়ায় তার ওই মোট জমানো অর্থের উপরে ২.৫% হারে যাকাত ধার্য হবে। (২) আর যদি ওই জমানো ‘নগদ অর্থ’-এর পরিমাণ ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূলল্যের চাইতে কম হয়, কিন্তু যদি সাথে অপরাপর এত পরিমাণ নগদ যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকে যা সাথে যোগ করলে তার পরিমাণ কমপক্ষে ৫২.৫ তোলা রূপার বাজারমূলল্যের সমান কিংবা তার চাইতে বেশি হয়, তাহলে তাকে ওই জমানো মোট অর্থ এবং অতিরিক্ত ‘মোট নগদ সম্পদ’ এই উভয়ের যোগফলের উপরে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করতে হবে। [আল-বাহরুর রায়েক- ২/২০৬; আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৬৭; ফাতওয়ায়ে উসমানী, মুফতি তাক্বী উসমানী- ২/৫৮]

মাসআলা: যাকাতের খাতে যাকাত দানের সময় যাকাতদাতার অন্তরে ‘যাকাত দানে’র নিয়ত বিদ্যমান থাকা জরুরী। সম্পদ থেকে যাকাতের জন্য অর্থ/টাকা পৃথক করে রাখলে, ওই পৃথক করার সময় যাকাতদাতার অন্তরে ‘যাকাত দানে’র নিয়ত থাকাটাই যথেষ্ট। তারপর ওখান থেকে যাকাতের খাতে দান কোর সময় নতুন করে বারবার নিয়ত না করলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। [শারহু মুখতাসারিত তাহাবী- ২/২৬৮; ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়্যাহ- ৩/১৯৭; আর-রাদ্দুল মুহতার- ২/২৫৮, ২৬৮] উল্লেখ্য, যাকাতদাতা প্রয়োজনে এই পৃথক করা অর্থ/টাকা থেকে অন্য কাজেও খরচ করতে পারবে, তবে আবার তাতে সেই খরচকৃত অংশটুকু পূরণ করে রাখার সময় অন্তরে যাকাতের নিয়তে রাখবে।

মাসআলা: যাকাতের অর্থ পৃথক করে রাখা কিংবা সরাসরি যাকাত দানের সময় যদি যাকাতদাতার অন্তরে ‘যাকাত দানে’র নিয়ত বিদ্যমান না থাকে, এমতাবস্থায় কাউকে তা দান করে ফেলে, তাহলে দান গ্রহীতা তা খরচ/লেনদেন করে না ফেলার আগেই নিয়ত করে নেয়া  জরুরী। [আর-রাদ্দুল মুহতার- ২/২৫৮] সম্পদ থেকে যাকাতের জন্য অর্থ/টাকা পৃথক করে রাখলে, ওই পৃথক করার সময় যাকাতদাতার অন্তরে ‘যাকাত দানে’র নিয়ত থাকাটাই যথেষ্ট। তারপর ওখান থেকে যাকাতের খাতে দান করার সময় নতুন করে বারবার নিয়ত না করে দান করতে থাকলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। [আর-রাদ্দুল মুহতার- ২/২৬৮] উল্লেখ্য, যাকাতদাতা প্রয়োজনে এই পৃথক করা অর্থ/টাকা থেকে অন্য কাজেও খরচ করতে পারবে, তবে আবার তাতে সিই খরচকৃত অংশটুকু পূরণ করে রাখার সময় অন্তরে যাকাতের নিয়তে রাখবে।

মাসআলা: যাকাতের নিয়তে টাকাপয়সা পৃথক করে রাখার পর তা হারিয়ে গেলে কিংবা চুরি হয়ে গেলে যাকাত অনাদায়ীই থেকে যাবে -যাবৎ না তা আদায় করা হয়। [ফাতাওয়ায়ে শামী- ২/১৫; ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূম- ৬/১০০]  

মাসআলা: যাকাতদাতা’র কাছ থেকে যদি কেউ স্বর্ণ/রৌপ্য/ নগদ-অর্থ/বাকী-পণ্যমূল্য ইত্যাদি ধারে/ঋন হিসেবে নিয়ে থাকে এবং সেই পাওনাটা যদি ফেরত পাওয়ার বাহ্যত: কোনো আশা/সম্ভাবনা না থাকে, (যেমন: দেনাদার যদি ঋনের কথা সরাসরি অস্বীকার করে এবং পাওনাদারের কাছে তা প্রমাণের কোনো স্বাক্ষ্য/দলিল-প্রমাণ না থাকে, দেনাদার যদি মড়ে যায় বা নি:স্ব হয়ে যায় কিংবা পালিয়ে/উধাও হয়ে যায় এবং পাওনা ফেরত পাওয়ার কোনো পথ না থাকে ইত্যাদি) তাহলে যতদিন পর্যন্ত তা সেই যাকাতদাতা’র কবজায় না আসবে, ততদিন পর্যন্ত ওই পাওনা অর্থের উপরে যাকাত ফরয হবে না এবং যেদিন তা হস্তগত হবে তার পূর্ববর্তী বছরগুলোর যাকাতও আদায় করতে হবে না। [কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদিনাহ, ইমাম মুহাম্মাদ-  ১/২৯৭; আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৬৭; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরিয়্যাহ- ১/১৭৫; জাদিদ ফিকহী মাসায়েল- ১/২১৩; ফিকহী মাক্বালাত, তকী উসমানী- ৩/১৭৯; মাজাল্লাতু মাজমাইল ফিকহিল ইসলামী- ১/১১৩ সংখ্যা ২; ইমদাদুল ফাতাওয়া- ২/৩৩] 

মাসআলা:  সরকারী ট্যাক্স আদায়ের দ্বারা ‘ফরয যাকাত’ আদায় হবে না। নেসাবের মালিককে ‘ফরয যাকাত’ আলাদা ভাবে আদায় করতে হবে। [ফাতাওয়ায়ে শামী- ২/৩১০; ফাতওয়ায়ে উসমানী, মুফতি তাক্বী উসমানী- ২/৬৭]

মাসআলা: নেসাবের মালিকের পক্ষ থেকে কেউ যাকাত আদায় করতে চাইলে সেই সুযোগ রয়েছে, তবে যাকাতদাতার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আদায় করতে হবে। অন্যথায় ওই ব্যাক্তির যাকাত আদায় হবে না। যেমন: স্ত্রীর  মালিকানাধীন স্বর্ণ/রৌপ্যের উপরে যদি যাকাত ফরয হয়, তাহলে স্বামী তা আদায় করতে চাইলে স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে সেই স্বর্ণ/রৌপ্যের যাকাত আদায় করে দিতে পারবেন। [রাদ্দুল মুহতার- ২/২৬৯]

মাসআলা: দেনাদার যদি যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত মানের গরিব/অভাবী হয়, সেক্ষেত্রে পাওনার যদি নিজের যাকাত আদায় করার সময় যাকাত দানের নিয়তে ‘যাকাতের নির্দিষ্ট পরিমান অংশ’ দেনা পরিশোধ বাবদ দেনাদারের উপরে থেকে মাফ করে দেয়, তাহলে এভাবে শুধু মাফ করার দ্বারা ‘যাকাতের ওই নির্দিষ্ট অংশ’ আদায় হবে না। বরং আদায় হওয়ার নিয়ম হল, প্রথমে পাওনাদার ওই গরিব/অভাবী দেনাদারকে যতটুকু যাকাত দিতে চায় তার পূর্ণ মালিক বানিয়ে দিবে। এরপর সেই দেনাদারের কাছ থেকে দেনার অর্থ দাবী করবে। [কিতাবুল আছল, ইমাম মুহাম্মাদ- ২/১২৬; তাবইনুল হাকায়েক- ২/৩১; রাদ্দুল মুহতার- ২/২৭০]

মাসআলা: যাকাতের অর্থ দিয়ে কোনো মৃত ব্যাক্তির ঋন পরিশোধ করলে যাকাত আদায় হবে না। তবে মৃতের ওয়ারীসগণ যদি যাকাত পাওয়ার হক্বদারদের মধ্যে কেউ হয়, তাহলে তাদেরকে যাকাতের অর্থ দেয়া যেতে পারে এবং এভাবে তারা উক্ত যাকাতের অর্থের মালিক হয়ে যাওয়ার পর তারা চাইলে মৃতের ঋন পরিশোধ করতে পারে।  [ফাতহুল কাদীর, ইবনে হুমাম- ২/২০৮; আল-বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/১৪৩; তাবইনুল হাকায়েক- ২/১২১; আদ-দুররুল মুখতার, হাসকাফী২/৩৪৪; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী- ১/১৮৮]

মাসআলা: যাকাতের তারিখ আসার আগ থেকেই যাকাত আদায় করতে থাকা জায়েয। পরে যাকাতের তারিখ এসে গেলে সেদিন হিসেব করে মিলিয়ে নিবে যে, যাকাত বাবদ কত বের হল এবং ইতিমধ্যে কত টাকা দেয়া হয়ে গেছে। যদি যাকাতের তারিখে বের হওয়া যাকাতের পরিমানের চাইতে আদায়কৃত যাকাতের পরিমান কম হয়, তাহলে বাকিটুকু আদায় করে দিবে। আর যদি যাকাতের তারিখে বের হওয়া যাকাতের পরিমানের চাইতে আদায়কৃত যাকাতের পরিমান বেশি হয়ে যায়, তাহলে সে বছরের যাকাত-তো আদায় হয়ে গেলোই, বাদ বাকি বেশি টাকাটুকু পরবর্তী বছরের জন্য আদায়কৃত যাকাতের অংশ হিসেবে ধরা যাবে। [আল-মাবসুত, সারাখসী- ২/১৭৬;  রাদ্দুল মুহতার- ২/২৯৩; ফাতাওয়ায়ে খানিয়া- ১/২৬৪; খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/২৪১]

মাসআলা: কোনো মুসলমান যদি ফরয যাকাত অনাদায়ী রেখে মৃত্যু বরণ করে এবং মৃত্যুর আগে তার পরিত্যাক্ত সম্পদ থেকে তা পরিশোধ করার জন্য কোনো ওসিয়ত না করে যায়, তাহলে তার মৃত্যুর পর তার পরিত্যাক্ত সম্পদ থেকে উক্ত অনাদায়ী যাকাত আদায় করা জায়েয নেই। হ্যাঁ, ওয়ারিসগণের মাঝে তার সম্পদ শরীয়ত সম্মতভাবে বন্টন করার পর ওয়ারিসদের কেউ চাইলে উক্ত অনাদায়ী যাকাত আদায় করে দিলে সে বিরাট সওয়াবের ভাগী হবে। [শারহু মুখতাসারিত তাহাবী- ২/৩৫৭;  আল-মাবসুত, সারাখসী- ২/১৮৫; আল-বাদায়েউস সানায়ে, কাসানী- ২/১৬৮; আদ-দুররুল মুখতার- ২/২৯৪; দুরারুল হুককাম- ১/১৭৯]

 

 


ফরয যাকাত : [পৃষ্ঠা ১] , [পৃষ্ঠা ২] , [পৃষ্ঠা ৩] , [পৃষ্ঠা ৪ (অসম্পূর্ণ)][পৃষ্ঠা ৫] , [পৃষ্ঠা ৬ (অসম্পূর্ণ)] , [পৃষ্ঠা ৭ (অসম্পূর্ণ)