শেয়ার বাজার – শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি – মুফতী মুহাম্মাদ তক্বী উসমানী

Spread the love
image_pdfimage_print

শেয়ার বাজার সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি – মুফতী মুহাম্মাদ তক্বী উসমানী দা:বা:

[ এই প্রবন্ধটির পুরোটাই শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ ত্বকী উসমানী দা:বা: (ডেপুটি চেয়ারম্যান, ইসলামী ফিকাহ একাডেমী, জেদ্দহ; শাইখুল হাদিস, দারুল উলূম, করাচী; সাবেক বিচারপতি, শরীয়াহ সুপ্রিমকোর্ট, পাবিস্তান)-এর বেশ কয়েক বছর আগে লিখিত কিতাব “ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাত” এবং “ফিকহী মাকালাত” নামক প্রবন্ধগুচ্ছে বর্ণিত ‘ শেয়ার বাজার ও স্টক-মার্কেট’ সম্পর্কিত বিস্তারিত ফিকহী আলোচনার বঙ্গানুবাদ। মুফতী তক্বী উসমানী দা:বা: উপরোক্ত কিতাব দুটিতেই বিস্তারিত আলোচনা পেশ করেছেন, তবে যে কিতাবের যে আলোচ্য অংশটি আমার কাছে বিস্তারিত ও মুনাসেব মনে হয়েছে, আমি সেই অংশটি নিয়েছি এবং এই প্রবন্ধে যুক্ত করে দিয়ে একটি ক্রমধারায় সাজিয়েছি এবং এই ওয়েব-পেজের শেষের টিকা আকারে উল্লেখ করেছি যে, কোন আলোচনাংশটি তাঁর কোন্ কিতাবের কত কত পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে। আমি মনে করি, এতে করে ‘শেয়ার ও স্টক-মার্কেট’ সম্পর্কিত বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও তার শরয়ী সমাধান এই একই পেজে একটি সুন্দর ক্রমধারায় আপনাদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। -ওয়েব এডমিন]

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

শেয়ার বাজার সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি - মুফতী মুহাম্মাদ তক্বী উসমানী দা:বা:বর্তমান যুগে ব্যবসা বানিজ্যে একটি নতুন জিনিসের আর্বিভাব হয়েছে, যাকে আজকালকার পরিভাষায় শেয়ার’ (Share) বলা হয়ে থাকে। শেয়ার ব্যবসা যেহেতু গত শতকে জন্ম লাভ করেছে, তাই আগেকার ফিকাহবীদ আলেমগনের গ্রন্থসমূহে এর বিধিবিধান সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু পাওয়া যায় না। এজন্য এখানে ‘শেয়ার’ এবং ‘ষ্টক-একচেঞ্জে (Stock Exchange) সংঘটিত নতুন নতুন বিষয়গুলোর উপর সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করছি।

পূর্বেকার জামানায় যে সমস্ত অংশীদারি কারবার হত, সেগুলো হত মূলতঃ কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে, যাকে বর্তমানকার পরিভাষায় বলা হয় ‘পার্টনারশীপ’ (Partnership)। কিন্তু বিগত দু’দশক ধরে একটি নতুন ধরনের অংশীদারি কারবার অস্তিত্ব লাভ করেছে, যাকে ‘জয়েন্ট ষ্টক কোম্পানী’ (Joint Stock Company) বলা হয়ে থাকে। এর ফলে ব্যবসা বানিজ্যে নতুন ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, আর সামনে এসেছে কোম্পনীর অংশ ক্রয়-বিক্রয়ের মত নতুন একটি বিষয়। এর মূলে গোটা বিশ্বে কাজ করে যাচ্ছে ‘ষ্টক-মার্কেট ’(Stock Market) । এসমস্ত ‘ষ্টক-মার্কেটে’ লক্ষ লক্ষ বরং কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। এর ধরন-প্রকৃতিও হয় বিভিন্ন রকম।

শেয়ার কী

প্রথমে শেয়ার কী -তা বুঝে নেয়া দরকার। কোম্পানীর শেয়ারকে আরবীতে বলা হয় سهم (সহম)। মূলতঃ এসব শেয়ার একটি কোম্পানীর পুঁজিতে একজন শেয়ারমালিকের মালিকানার একটি আনুপাতিক অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। মনে করুন, আমি যদি কোনো কোম্পানীর শেয়ার (যা একটি কাগুজে সার্টিফিকেট) ক্রয় করি, তাহলে ওই কাগুজে প্রমানপত্র বা সার্টিফিকেটটি ওই কোম্পানীতে আমার মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করবে। সুতরাং কোম্পানীটির যেসমস্ত পুঁজি ও সহায়সম্পত্তি রয়েছে, কোম্পানীর শেয়ার কিনে নেওয়ার কারনে ওসব পুঁজি ও সম্পত্তিতে আমি আমার শেয়ারের সমানুপাতিক অংশের একজন মালিক হয়ে গেলাম।

পূর্বেকার জামানায় ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা হত। যেমনঃ দু-চারজন মিলে অংশীদর হয়ে মূলধন খাটাল ও ব্যবসা করে নিলো। কিন্তু বৃহৎ পরিসরের ব্যবসা বানিজ্য ও শিল্পের জন্য যে বিশাল অংকের পুঁজির প্রয়োজন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কয়েকজনমাত্র ব্যক্তি মিলে অত বিশাল অংকের পুঁজি যোগান দিতে পারে না। এজন্য কোম্পানী সৃষ্টির প্রয়োজন পড়েছে। ইউরোপে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হবার পর সতের শতকের গোড়ার দিকে যখন বড় বড় কলকারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশাল অংকের পুঁজির প্রয়োজন দেখা দিতে লাগলো – যা একজন কিংবা কয়েকজন মিলে যোগান দেয়া সম্ভব ছিল না, তখন সর্বসাধারন জনগনের বিক্ষিপ্ত সঞ্চয়গুলোকে একত্রিত করে সামষ্টিক ফায়দা অর্জনের উদ্দেশ্যে ‘কোম্পানী ব্যবস্থা’র অভ্যূদয় ঘটে। প্রথম দিককার কোম্পানীগুলো সাধারনতঃ আধা-সরকারী হত এবং তা রাষ্ট্রের চার্টারের (অনুমতিপত্রের) অধীনে বেসরকারী ব্যবসা-বানিজ্যের জন্য অস্তিত্ব লাভ করতো। তখন তাদেরকে এর সাথে অনেক ব্যাপক এখতিয়ারও দেওয়া হত। এমন কি মূদ্রা তৈরী, সৈন্য ও পুলিশ রাখারও এখতিয়ার দেওয়া হত তাদেরকে। নিকট অতীতে বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়া ‘ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’- এরকমই একটি কোম্পানী ছিল। এখন ব্যাপক এখতিয়ারসম্পন্ন কোনো কোম্পানী বিদ্যমান নেই। বর্তমানে শুধুমাত্র বানিজ্যিক কোম্পানীই গঠিত হয়, যা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করে থাকে।

(যাহোক, কোম্পানী গঠনের নিয়ম সংক্ষেপে এই যে, যে সকল কর্তৃপক্ষ কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করতে ইচ্ছুক, তারা) সরকারের কাছে Memorandum ( স্বারকলিপি) এবং Articles of Associations (পরিমেল নিয়মাবলী) সহকারে ‘কোম্পানী’ অনুমোদনের জন্য আবেদন পেশ কাে থাকে। মন্ত্রনালয়ের পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠান ‘করপরেট-ল-অথরিটি’র পক্ষ থেকে অনুমতি পেলে তখন কোম্পানী অস্তিত্ব লাভ করে।

সরকার যখন কোন কোম্পানীকে অনুমোদন দেয়, তখন সে ওই কোম্পানীর জন্য পুঁজির পরিমান নির্ধারন করে দেয়, অর্থাৎ, পুঁজির এই পরিমান অংশ বিনিয়োগ করতে পারবে কিংবা লোকজনকে পুঁজির এই পরিমান অংশের অংশীদার হওয়ার জন্য আহবান জানাতে পারবে। একে Authorized Capital (অনুমোদীত মূলধন) বলা হয়ে থাকে। এর মধ্য থেকে পুঁজির কিছু অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, যা কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতাবৃন্দের পক্ষ থেকে যোগান দিতে হয়। একে বলা হয় Sponsors Capital (স্পন্সরস্ মূলধন) । আর পুঁজির যে পরিমান অংশ পরিশোধ করা হয়েছে, তাকে বলা হয় Paid Up Capital (পরিশোধকৃত মূলধন)। (অপর দিকে) কোম্পানী তার যে পরিমান পুঁজির শেয়ার (সার্টিফিকেট) জারি করে লোকজনকে (কোম্পানীর) অংশ নেওয়ার জন্য আহবান জানায়, সেই পুঁজিকে Issued Capital (ইস্যুকৃত মূলধন) বলা হয়। আর মানুষ ফর্ম পূরন করে পুঁজির যে পরিমান অংশ (শেয়ার) ক্রয় করার অঙ্ঘিকার করে, তাকে বলা হয় Subscribed Capital (সাবস্ক্রাইব্ড্ মূলধন)।

(এ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, সরকারী কর্তৃপক্ষ কোম্পানী প্রতিষ্ঠার জন্য যে পরিমান পুঁজি অনুমোদন করে, সে পুঁজির নির্দিষ্ট কিছু অংশ যোগান দেয় কোম্পানীর উদ্যোক্তাবৃন্দ বা প্রতিষ্ঠাতা-মালিকগন, আর অবশিষ্টাংশ যোগান দেয়ার উদ্দেশ্যে তারা বাজারে শেয়ার সার্টিফিকেট ছেড়ে জনগনের কাছ থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে।-অনুবাদক)

মনে করুন, কোনো কোম্পানী (সরকারী কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে) ১০০ মিলিয়ন টাকা দিয়ে ব্যবসা করার অনুমোদন পেল। এই ১০০ মিলিয়ন টাকা হল Authorized Capital (অনুমোদিত মূলধন)। (ধরুন,) এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন টাকা (যোগারের দায়িত্ব) কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতাদের উপর অর্পিত।( এমতাবস্থায় এই ২০ মিলিয়ন টাকা হল Sponsors Capital বা স্পন্সরস্ মূলধন)। (মনে করুন,) এর মধ্য থেকে তারা ১০ মিলিয়ন টাকা পরিশোধ করেছে; এটা হল Paid Up Capital (পরিশোধিত মূলধন)। বাকি ৮০ মিলিয়ন টাকা জনগনের কাজ থেকে উসূল করা হবে। এর মধ্যে বর্তমানে ৬০ মিলিয়ন টাকার শেয়ার ছাড়া হচ্ছে। অবশিষ্টটা ভবিষ্যতের কোনো প্রয়োজনের জন্য সংরক্ষন করে রাখা হয়েছে। এই ৬০ মিলিয়ন টাকা হল Issued Capital (ইস্যুকৃত মূলধন)। ৬০ মিলিয়ন টাকার মধ্য থেকে লোকজন ৫০ মিলিয়ন টাকার জন্য ফর্ম পূরন করেছে; সুতরাং এটা হল Subscribed Capital (সাবস্ক্রাইবড মূলধন)। যদি আবেদনের পরিমান বেশি হয় আর ইস্যুকৃত পুঁজি কম হয়, তাহলে লটারী করা হয় এবং লটারীতে যাদের নাম আসে, কেবলমাত্র তাদের আবেদনই গ্রহন করে নিয়ে তাদেরকে (কোম্পানীর) অংশীদার বানান হয়।

কেউ যখন কোম্পানীর ‘অংশ’ (ক্রয় করে) নিয়ে (উক্ত অংশের মূল্য বাবদ কোম্পানীকে তার) পুঁজি প্রদান করে, তখন কোম্পানী (উক্ত অংশের স্বপক্ষে) অংশীদারকে একটি সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়, যা একথার প্রমাণ বহন করে যে, কোম্পানীতে উক্ত ব্যক্তিটির ওই পরিমান অংশ রয়েছে। এই সার্টিফিকেটকে আরবীতে سهم (সহম) এবং ইংরেজীতে Share (শেয়ার) বলা হয়ে থাকে। এখন (কোম্পানীর সাথে) শরীক হয়ে যাওয়ার এই লেনদেন করার পরিপ্রেক্ষতে উক্ত ব্যক্তি যে সার্টিফিকেট লাভ করল, সেই সার্টিফিকেটি প্রকৃত পক্ষে কোম্পানীতে ওই ব্যক্তির একটি আনুপাতিক অংশের (Proportionate) মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করছে। এটাই হচ্ছে শেয়ারের মূল ত্বত্ত্ব।

শেয়ার বাজার

কেউ যখন কোনো কোম্পানীর শেয়ার (ক্রয় করে) নিয়ে সেই কোম্পানীর অংশীদারে পরিনত হয়ে যায়, তখন তার পক্ষে একাজ করা সম্ভব হয়না যে, সে যখন ইচ্ছা তার অর্থ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের ওই অংশীদারিত্বের ইতি টানবে। বরং যতক্ষন পর্যন্ত কোম্পানীর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে, ততক্ষন পর্যন্ত কোম্পানী থেকে শেয়ারের অর্থ ফিরিয়ে নেয়া যায় না। কিন্তু বহু অংশীদার যেহেতু তাদের অংশীদারিত্বের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নিজেদের শেয়ারকে নগদ অর্থে পরিবর্তন করে নিতে চায়, তাই এই দায়িত্বপূর্ণ ব্যবস্থাটির উদ্ভব ঘটানোও জরুরী ছিল যে, (কোম্পানীতে শেযার ক্রয় করার আঙ্গিকে) অর্থ বিনিয়োগ করার পর প্রয়োজন মূহুর্তে নিজের শেয়ারকে নগদ অর্থেও পরিবর্তন করে নিতে সমর্থ হবে। বস্তুতঃ এ লক্ষ্যেই ‘শেয়ার বাজার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে শেয়ার ‘ক্রয়-বিক্রয়’ করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কোম্পানীর কোনো অংশীদার তার অংশীদারিত্বের অবসান ঘটিয়ে কোম্পানী থেকে তো তার পুঁজি ফিরিয়ে নিতে পারে না বটে, কিন্তু ‘শেয়ার বাজারে’ সে তার অংশ (বা শেয়ার )-কে অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দিতে পারে, যার ফলে ওই ব্যক্তির স্থলে উক্ত শেয়ারের ক্রেতা কোম্পানীর অংশীদার গন্য হয়ে যায়। যে স্থানে শেয়ার ‘ক্রয়-বিক্রয়’ করা হয়, তাকে Stock Market  (শেয়ার বাজার) বলা হয়ে থাকে ।

শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের দুটি পদ্ধতি রয়েছে

১. একটি পদ্ধতি হল, দু’ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যম ছাড়াই শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করে নিবে।
২. দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হল, ‘শেয়ার’ ক্রয়-বিক্রয় করা হয় কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এই প্রতিষ্ঠাটিই হচ্ছে Stock Exchange (ষ্টক এক্সচেঞ্জ), যা শেয়ার ‘ক্রয়-বিক্রয়’ কার্যক্রম দেখাশুনা করে এবং ‘ক্রয়-বিক্রয়ে’র একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’র মাধ্যম ছাড়া শেয়ারের যে কারবার হয়, সেটাকে বলা হয় Over The Counter Transaction। এভাবে শেয়ার বেচা-কেনা করার নির্দিষ্ট কোনো নিয়মনীতি নেই, তাই এর বিস্তারিত কিছু জানারও দরকার নেই। তবে ‘ষ্টক- একচেঞ্জে’র মাধ্যমে যেসব ‘ক্রয়-বিক্রয়’ হয়, সে সম্পের্কে বিস্তারিত কিছু কথা জানা আবশ্যক।

‘ষ্টক এক্সচেঞ্জ’ হচ্ছে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, যা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোম্পানীসমূহের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ আঞ্জাম দেয়। তবে ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জ’ ওইসব কোম্পানীর শেয়ারের কারবার করে, সে সব কোম্পানী আস্থাযোগ্য এবং যাদের কিছু না কিছু বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’ যেসব কোম্পানীর শেয়ার ‘ক্রয়-বিক্রয় হয়, তাদেরকে বলা হয় Listed Companies (তালিকাভুক্ত কোম্পানী)। কোনো কোনো কোম্পানী অস্তিত্ব লাভ করার পর তালিকাভুক্ত হয়, আবার কখনো কখনো কোম্পানী অনুমোদন পাওয়ার পর এবং তার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পূর্বে -বরং কখনো কখনো শেয়ার ছাড়ার (Float) পূর্বেই কোম্পানী তালিকাভুক্ত (Listed) হয়ে যায়। একে Provisional Listing বলা হয়ে থাকে। এর কাউন্টারও আলাদা হয়। ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জ’ যেসব কোম্পানীর শেয়ারকে গ্রহন করে না, সেসব কোম্পানীকে বলা হয় Unlisted Companies (অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানী)। এদের শেয়ারগুলো Over The Counter Market -এ কোনা-বেচা হতে পারে; ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’ নয়।

সদস্যভুক্তি (Membership) 

‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’ সবাই শেয়ার ‘কেনা-বেচা’র কাজ করতে পারে না। এর জন্য সদস্য (Member) হওয়া জরুরী। সদস্যভুক্তির ফিসও রয়েছে। সদস্য হওয়া এজন্য জরুরী যে, ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’ শেয়ারের কারবার খুবই ব্যপক, নাজুক ও কৌশলী ধরনের হয়ে থাকে। সেখানে বিশেষ বিশেষ পরিভাষাসমূহ ব্যবহৃত হয়। একজন নতুন ও অনভিজ্ঞ লোক এ কারবারে ভুলও করে ফেলতে পারে। ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জ’ প্রতিষ্ঠানটি সেখানকার সংঘটিত সমস্ত লেনদেন আদায়করনের দায়িত্বে থাকে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি সবাইকে কেনা-বেচার অনুমতি দিয়ে তাদের লেনদেনসমুহের দায়িত্ব বহন করতে চায়না। তাই ‘সদস্য’ হওয়া জরুরী গণ্য করা হয়েছে।

‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’ দালালী

‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’ সদস্যব্যক্তি নিজের জন্যেও শেয়ার ক্রয় করে, আবার দালাল হয়ে ‘কমিশন’ গ্রহনপূর্বক অন্যদের জন্যেও তা ক্রয় করে দেয়। সদস্য বহির্ভূত কেউ শেয়ার কিনতে চাইলে সে (এরকম সদস্যভুক্ত) দালালের মাধ্যমে (শেয়ার) ক্রয় করে থাকে। শেয়ার ক্রয় করার জন্য দালালকে অর্ডার প্রদানের তিনটি ধরন রয়েছেঃ

১. Market Order (মার্কেট অর্ডার)- অর্থাৎ এমন ‘অর্ডার’, যে ক্ষেত্রে দালালকে একথা বলে দেয়া হয়েছে যে, মার্কেটে (শেয়ারের) যে মূল্যই উঠুক, ওই মূল্যেই অমুক কোম্পানীর শেয়ার কিনে দিতে হবে।

২. Limited Order (সীমাবদ্ধ অর্ডার)- অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারন করে দিয়ে অর্ডার দেওয়া হয় যে, যদি এই মূল্যে শয়ার পাওয়া যায়, তাহলে নিয়ে নিবে; এর চেয়ে বেশি মূল্যে ক্রয় করবে না।

৩. Spot Order (ষ্পট্ অর্ডার)- অর্থাৎ শেয়ারের মালিক তার শেয়ার বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই শর্ত সাপেক্ষে অর্ডার দেয় যে, যদি শেয়ারের মূল্য একই অবস্থায় থাকে কিংবা বেড়ে যেতে থাকে, তাহলে শেয়ার বিক্রি করবে। আর যদি দাম কমতে শুরু করে, তাহলে বিক্রি করবে না।

শেয়ারের দর-দাম নির্ধারন

বিভিন্ন কোম্পানীর শেয়ারের ‘মূল্য’ ওঠা-নামা করতে থাকে। এক্ষেত্রে কোম্পানীর সহায় সম্পত্তিরও দখল রয়েছে। সহায় সম্পদ বৃদ্ধি পেলে (শেয়ারের) দাম বেড়েও যায়। তবে সহায়-সম্পদ ছাড়াও আরো বেশকিছু বহিঃগর্ত কার্যক্রম দ্বারা শেয়ারের দর দাম প্রভাবিত হয়। যেমনঃ মুনাফার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, পন্য দ্রব্যের চাহিদা ও যোগান, রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি, ঋতু ও সময় ক্ষনের অবস্থাদি, এছাড়াও বিভিন্ন অবাস্তব কার্যক্রম- যেমনঃ বিভন্ন গুজব ও অনুমান-অনুমিতি দ্বারাও দাম-দর প্রভাবিত হয়। যেহেতু মূল্য ওঠা-নামার ক্ষেত্রে বহিঃগর্ত কার্যক্রমেরও দখল থাকে, তাই শেয়ারের ‘মূল্য’ থেকে কোম্পানীর সহায়-সম্পত্তির প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে না। যাহোক, যদি কোনো কোম্পানীর শেয়ারের মূল্য বেড়ে যায়, তাহলে সেই শেয়ার-বাজার’কে ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জে’র পরিভাষায় Bull Market (বুল মার্কেট) বলা হয়। অপর দিকে দাম কমে গেলে তাকে বলা হয় Bear Market (বিয়ার মার্কেট)

শেয়ার ক্রেতার প্রকারভেদ 

দু’ধরনের শেয়ার ক্রেতা রয়েছে-

১. কিছু কিছু লোক কোম্পানীতে অংশীদার হওয়ার জন্য শেয়ার ক্রয় করে এবং নিজের কাছে ‘শেয়ার’ রেখে বাৎসরিক মুনাফা লাভ করতে থাকে। কিন্তু এ ধরনের মানুষের সংখ্যা খুবই কম।

২. অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এই যে, তারা খোদ্ শেয়ারকেই একটি ‘ব্যবসায়িক মাল’ মনে করে নিয়ে তা কেনা বেচা করে থাকে। যখন শেয়ারের মূল্য কমে যায়, তখন তারা তা ক্রয় করে এবং যখন মূল্য বেড়ে যায়, তখন বিক্রি করে দেয়। এ দ্বিবিধ মূল্যের মধ্যে যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়, সেটাই তাদের মুনাফা। দাম বেড়ে যাওয়ার কারনে যে মুনাফা লাভ হয়, তাকে বলা হয় Capital Gain (ক্যাপিটাল গেইন)। এ কারবারের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোন্ শেয়ারের দাম কমবে এবং কোন্ শয়ারের দাম বাড়বে- প্রথমে সেটাই অনুমান করে নেয়া হয়। এই অনুমান করাকে বলা হয় Speculation (স্পেকুলেশন)। কখনো এই অনুমান সঠিক প্রমাণিত হয়, আবার কখনো হয় ভুল।

শরয়ী দৃষ্টিতে শেয়ারের স্বরূপ ও তার ‘ক্রয়-বিক্রয়’

সমকালীন কতিপয় ওলামায়ে কেরাম (যাঁদের সংখ্যা খুবই কম)- তাঁদের অভিমত হল , এ সমস্ত শেয়ার (সার্টিফিকেট) কোম্পানীর সহায় সম্পত্তি ও পুঁজিতে শেয়ার মালিকদের মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি (শেয়ার-মালিক) কোম্পানীকে যে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ দিয়ে রেখেছে -শেয়ারগুলো মূলতঃ তারই প্রমানপত্র। যেমনটা ঘটে থাকে ঋনের অপরাপর দলিলপত্র- যেমন বন্ড ইত্যাদির বেলায় । ঠিক একইভাবে এগুলোও ঋনের একপ্রকার দলিল। এখানে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, বন্ড ইত্যাদির উপর নির্দিষ্ট হারে সূদ ধার্য হয়, অপরদিকে শেয়ারের উপর সূদের হার নির্দিষ্ট থাকে না। বরং কোম্পানীর যে মুনাফা অর্জিত হয়, তারই একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ শেয়ার মালিককেও দেয়া হয়। শেয়ার যদি কোম্পানীর সহায়সম্পত্তি ও পুঁজির মধ্যে শেয়ার মালিকের) মালিকানারই প্রতিনিধিত্ব করতো, তাহলে ‘শেয়ার মালিক’ দেউলিয়া হওয়ার বেলায় যেখানে তার অন্যান্য জিনিসও ক্রক্ (বাজেয়াপ্ত) হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে তো কোম্পানীতে তার (শেয়ারের) সমানুপাতিক অংশের মালিকানাও ক্রক্ হয়ে যাওয়ার কথা; কিন্তু তা হয় না। তাই বোঝা গেল, কোম্পানীর সহায়সম্পত্তি ও পুঁজির মধ্যে শেয়ার মালিকের ‘মালিকানা’ থাকে না। এ দৃষ্টিকোণ থেকে শেয়ার নেয়াও জায়েজ নয়, আবার তা কম বেশি করে কেনা-বেচা করাও জায়েজ নয়।

উপরোক্ত এ দৃষ্টিভঙ্গির উপর যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের কথা সঠিক বলে মনে হয় না। কোম্পানীর বাহ্যিক বৈশিষ্ট দৃষ্টে এবং এ বিষয়ের উপর যে সমস্ত গ্রন্থ লিখিত হয়েছে, সেগুলোর আলোকে একথা সুস্পষ্ট বোঝা যায় যে, কোম্পানীর সহায়সম্পত্তি ও পুঁজির মধ্যে ‘শেয়ার-মালিকদের’ সমানুপাতিক মালিকানা থাকে। আর এ কারনেই যদি পারষ্পরিক আলোচনার মাধ্যমে কোম্পানী বিলোপ সাধিত হয়, তখন শেয়ারমালিকরা যে শুধু তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থই ফেরত পায় -তা নয়, বরং প্রত্যেক শেয়ারমালিককে কোম্পানীর সহায়সম্পত্তি ও পুঁজির একটি আনুপাতিক অংশও প্রদান করা হয়ে থাকে। অপরদিকে অপরাপর দলিলপত্র -যেমনঃ বন্ড ইত্যাদির বেলায় কোম্পানীর বিলোপ সাধন অবস্থায় শুধুমাত্র বিনিয়োগকৃত ‘অর্থ’ সূদ সহ ফেরত প্রদান করা হয়। এ থেকে বোঝা গেল, শেয়ার নিছক ঋনের প্রমাণপত্র নয়, বরং এ সমস্ত ‘শয়ার’ কোম্পানীর সহায়সম্পত্তি ও পুঁজির মধ্যে শেয়ারমালিকের একটি আনুপাতিক মালিকানার প্রতিনিধিত্ব করে।

শেয়ারের এই স্বরূপ উৎঘাটিত হয়ে যাওয়ার পর এ কথাও বোঝা গেল যে, ‘শয়ার, স্বত্ত্বাগতভাবে কোনো কিছুই নয়, (এটি একটি কাগুজে সার্টিফিকেট মাত্র), বরং এর বিপরীতে (কোম্পানীতে) যে সম্পদ ও পুঁজি রয়েছে সেটাই আসল বস্তু। তাই ‘শেয়ার’ কেনা-বেচা করাটা মূলতঃ কোম্পানীর সহায়সম্পত্তি ও পুঁজির একটি সমানুপাতিক মালিকানার কেনা-বেচা করাই। আর কোম্পানীর ‘সহায়সম্পদ ও পুঁজি’ বিভিন্ন আঙ্গিকে বিদ্যমান থাকে। যেমনঃ নগদ (তরল সম্পদ), পাওনা ঋন, স্থাবর সম্পদ ও ব্যবসায়ী পন্যদ্রব্য ইত্যাদি। এর প্রত্যেকটিতে শেয়ারমালিকের একটি আনুপাতিক অংশ বিদ্যমান থাকে। তাই শেয়ার বিক্রি করার অর্থ হলঃ (কোম্পানীর) নগদ, পাওনা ঋন, স্থাবর সম্পদ ও ব্যবসায়ী পন্যদ্রব্যসামগ্রীর মধ্য হতে প্রতিটিতে বিদ্যমান নিজের একটি আনুপাতিক অংশের মালিকানা বিক্রি করে দেয়া। শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের এই বৈশিষ্ট অনুসারে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের বিভিন্ন শর্তাদি ব্যাখ্যা সহ নিন্মে প্রদত্ত হলঃ

কোম্পানীর লভ্যাংশে শরীক হবার জন্য শেয়ার ক্রয় করা

যদি শেয়ার বাজার থেকে কাউকে শেয়ার কিনতেই হয়, তাহলে এসব শেয়ার কেনার জন্য তার চারটি শর্তের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরী-

প্রথম শর্ত

প্রথম শর্তটি হল, কোম্পানীটিকে হারাম ব্যবসায় জড়িত হওযা চলবে না। যেমনঃ সংশ্লিষ্ট কোম্পানীটি যেন কোনো সূদী ব্যাংক কিংবা সূদ-জয়ার ভিত্তিতে পরিচালিত কোনো ইন্সুরেন্স কোম্পানী বা মাদক ব্যবসার কোম্পানী কিংবা এসব ছাড়াও অন্য কোনো হারাম কাজ আঞ্জামদাতা কোনো কোম্পানী না হয়। এ ধরনের কোম্পানীর শেয়ার নেয়া কোনো অবস্থাাতেই জায়েয নয়; প্রথম বার শেয়ার ছাড়ার (Float) সময়ও জায়েয নয়, পরবর্তীতে ‘শেয়ার-বাজার’ থেকেও নেয়া জায়েয নয়। কোম্পানীর মূল কারবারই যদি ‘হারাম’ হয়, তাহলে তার শেয়ার নেয়া নাজায়েয। ১০কিন্তু ব্যবসাটি যদি বুনিয়াদি ও মৌলীক ভাবে হারাম না হয়, বরং কোনো হালাল ব্যবসা করার উদ্দেশ্যেই কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করার জন্য শেয়ার ছাড়া (Float) হয়; যেমন ধরুনঃ- কোনো টেক্সটাইল কোম্পানী বা অটোমোবাইল কোম্পানী, তাহলে এমতাবস্থায় উক্ত কোম্পানীর শেয়ার কিনতে কোনো অসুবিধা নেই; জায়েয।

দ্বিতীয় শর্ত

[এ শর্তটি বোঝার আগে, সংক্ষেপে এ বিষয়টিও বুঝে নেয়া জরুরী যে, একই দেশের স্বচল নোট সমূহ (যেমনঃ টাকা, পয়সা) পরষ্পর বিনিময় করার সময় দু’দিকের মূল্যের পরিমান সমান হওয়া অপরিহার্য; কম-বেশী করে বিনিময় করলে সূদ হয়ে যাবে। যেমনঃ ১০০/- টাকার একটি নতুন চকচকে নোট এবং ১০০/- টাকার একটি স্বচল পুরাতোন নোংরা নোটের মাঝে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনই পার্থক্য নেই। কেউ যদি ১১২/- টাকার কিছু পুরাতন নোট দিয়ে ১০০/- টাকার একটি চকচকে নোট কিনতে বা বিনিময় করতে চায়, তাহলে অতিরিক্ত ১০ টাকা সূদের বিধানে পড়ে যাবে। টাকা দিয়ে টাকার লেনদেনের সময় সর্বাবস্থায় উভয় দিকের মূল্যের পরিমান সমান সমান হওয়া অপরিহার্য। ঠিক একইভাবে ১০০ টাকার ঋনের মূল্য ১০০/- টাকাই। এক্ষেত্রেও উভয় দিকে কম-বেশী করে লেনদেন বা বিনিময় করলে সূদ হয়ে যাবে। এমনকি ১০০/- টাকার ঋনের সার্টিফিকেটের মূল্যের পরিমানও ঠিক ১০০/- টাকাই। এক্ষেত্রেও উভয় দিকে কমবেশী করে সার্টিফিকেট ক্রয়-বিক্রয় বা বিনিময় করলে তা সূদ হয়ে যাবে। আর ইসলামে সূদ সম্পূর্ণ হারাম। এই মাসআলাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুনঃ ‘বুহুসুন ফি কাজায়া ফিকহিয়া মুআসারা, তকী উসমানী- ১/১০৮; ২/১৩৪- ১৬৮,২২৪; ফিকহী মাকালাত, তকী উসমানী- ১/১৩-৭৮; (অনুবাদক)]

১১শেয়ারের মূল্যকে কম-বেশি করে ক্রয়-বিক্রয় করার দ্বিতীয় শর্তটি হল, সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর (যাবতীয়) সম্পদ কেবলমাত্র নগদ ও প্রাপ্য ঋন আকারে থাকা চলবে না, কোম্পানী যদি এখনো পর্যন্ত কোনো প্রকার স্থায়ী সম্পদ (যেমনঃ বিল্ডীং, মেশিনারী প্রভৃতি) অথবা ব্যবসায়ী মালসামান কিনে না থাকে, বরং তার কাছে যদি শুধু নগদ অর্থ থাকে বা কারো কাছ থেকে (নগদ অর্থ) পাওনা থাকে, তবে এমতাবস্থায় (ওই কোম্পানীর) শেয়ার তার গায়ে লিখিত মূল্য (Face Value)-এর চাইতে কম-বেশি করে কেনা-বেচা করা জায়েয নয়। কারণ, এখন শেয়ারটি শুধুমাত্র নগদ অর্থের প্রতিনিধিত্ব করছে। উদাহরণ স্বরূপ, ১০/- টাকা মূল্যের শেয়ার শুধুমাত্র ১০/- টাকারই প্রতিনিধিত্ব করছে। এখন যদি তা ১১/- টাকায় বিক্রয় করা হয়, তাহলে ১০/- টাকাকে ১১/- টাকায় বিক্রি করা হয়ে গেল, যা নাজায়েয।   

১২এর কারণ এই যে, যতজন লোক ওই কোম্পানীতে তাদের অর্থ বিনিয়োগ (Subscribe) করেছে, ওই অর্থ দিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো জিনিসপত্র ক্রর করা হয়নি, না তা দিয়ে কোনো বিল্ডিং তৈরী করা হয়েছে, না মেশিন ক্রয় করা হয়েছে, আর না কোনো আসবাবপত্র (কেনা বা) তৈরী করা হয়েছে। বরং এখন তাদের সম্পূর্ণ অর্থই নগদ আকারে রয়েছে। তাই এমতাবস্থায় ১০/-টাকা মূল্যের শেয়ার ১০/- টাকারই প্রতিনিধিত্ব (Represent) করছে। এটা এমনই যেমন ১০/- টাকা মূল্যের বন্ড (Bond) ১০/- টাকারই প্রতিনিধিত্ব করে। অথবা যেমন ১০/- টাকা মূল্যের নোট ১০/- টাকারই প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। সুতরাং, যখন ১০/- টাকার  নোট ১০/- টাকারই প্রতিনিধিত্ব করছে তখন এরকম অবস্থায় শেয়ারটিকে ১১/- টাকার বা ৯/- টাকায় ক্রয় বা বিক্রয় করা জায়েয নয়। কারণ, এতে তো ১০/- টাকার নোটকে ১১/- টাকায় বা ৯/- টাকায় ক্রয় করা হয়ে যাবে, যা সূদ হয়ে যাওয়ার কারণে সম্পূর্ণ নাজায়েয। ১৩ যখন জানা যাবে যে, কোমস্পানীর কিছু সম্পদ অনগদ আকারেও রয়েছে, তখন (শেয়ারের) গায়ে লিখিত মূল্যের (Face Value) চাইতে বেশি মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয হবে। তবে প্রত্যেক শিয়ারের অংশে কোম্পানীর নগদ ও প্রাপ্য ঋনের যতটুকু পরিমান ভাগে পড়ে, যদি শেয়ারের পূর্ণ মূল্য তার বরাবর বা তার চেয়ে কম হয়, তাহলে (শেয়ারটি) কেনা জায়েয হবে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি ১০/- টাকা মূল্যের শেয়ারের মধ্যে ৮/- টাকার নগদ ও প্রাপ্য ঋন ভাগে পড়ে, আর বাকি ২/- টাকার অপরাপর (অনগদ) সম্পদসমূহ ভাগে পড়ে, তাহলে শেয়ারটি ৮/- টাকা বা তার কমে ক্রয়-বিক্রয় করা জয়েয হবে না, অবশ্য ৯/- টাকা বা তার বেশিতে জায়েয হবে।

(কারণ) ১৪যখন নগদ অর্থ বাদেও কোম্পানীর অপরাপর (অনগদ)  সম্পদ ও সম্পত্তিও অস্তিত্ব লাভ করে, তখন ওই সম্পদ ও সম্পত্তিগুলো (কোম্পনীর নগদ অর্থের সাথে) মিশ্রিত হয়ে যায়। ফলে এর মধ্যে নগদ ও অ-নগদ উভয় প্রকার (সম্পত্তি)-ই শামিল থাকে। এমতাবস্থায় শেয়ার বিক্রি করার অর্থ হল কোম্পানীর প্রত্যেক প্রকার (নগদ ও অনগদ) সম্পদের একটি আনুপাতিক অংশ বিক্রি করা। ( মনে করুন), ১৫যদি কোম্পানীটির কিছু সম্পদ নিরেট ও অনগদ (منجمد) আকারেও বিদ্যমান থাকে, যেমন ধরুন ওইসব (নগদ) অর্থ দিয়ে কোম্পানীটি কাঁচামাল  (Raw Material) ক্রয় করেছে বা কোনো প্রস্তুতকৃত মাল (Produced Good) ক্রয় করেছে, কিংবা কোনো বিল্ডিং তৈরী করেছে অথবা মেশিনারী জিনিসপত্র ক্রয় করে নিয়েছে, তাহলে এমতাবস্থায় ১০/- টাকা মূল্যের ওই শেয়ারকে  কম-বেশি মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয। এটা  জায়েয হওয়ার কারণ হল একটি ফিকহী উসূল। আর সেটা হল, যখন স্বর্ণকে স্বর্ণ দিয়ে ক্রয়-বিক্রয় করা হয়, কিংবা টাকা-পয়সাকে টাকা-পয়সার মাধ্যমে বিনিময় করা হয়, তখন (উভয় দিকে) একদম সমান সমান হওয়া জরুরী। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস থাকে মিশ্রিত আকারে। মনে করুন, স্বর্ণের একটি অলংকারে মোতীও সংযুক্ত রয়েছে। এখন স্বর্ণের ব্যাপারে (শরীয়তের) হুকুম হল, তা (উভয় দিকে) সম্পূর্ণরূপে বরাবর ও সমান সমান করে ক্রয়-বিক্রয় করা জরুরী (অন্যথায় তা সূদ হয়ে যাবে)। কিন্তু এই হুকুম মোতীর বেলায় প্রযোজ্য নয়। এজন্য দশটি মোতীর বিনিময়ে বারটি মোতী নেয়া জায়েয। তাই যদি এমন কোনো অলংকার ক্রয় করা হয়, যার মধ্যে স্বর্ণ এবং মোতী দুটোই রয়েছে, তখন তা ক্রয় করার সুরত এই যে, ওই অলংকারের মধ্যে যতটুকু স্বর্ণ রয়েছে, তা থেকে কিছু বেশি স্বর্ণের বিনিময়ে তা  ক্রয় করা জায়েয আছে। উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন, ওই অলংকারটির মধ্যে ১ তোলা স্বর্ণ রয়েছে, আবার সাথে কিছু মোতীও সংযুক্ত রয়েছে। এখন কেউ যদি উক্ত অলংকারটিকে ১ তোলা ১ রতি সোনার বিনিময়ে কিনতে চায়, তাহলে তার জন্য তা ক্রয় করা জায়েয। এটা এজন্য যে, এক্ষেত্রে বলা হবে, ১ তোলা সোনা ১ তোলা সোনার বিনিময়ে এসে গেছে এবং (বাকি) ১ রতি সোনা এসেছে মোতিগুলোর বিনিময়ে। এভাবে লেনদেন করা জায়েয হবে। ঠিক একইভাবে এখানে একথাও বুঝে নিন যে, কোম্পানীর যদি কিছু সম্পদ নগদ অর্থের আকারে থাকে এবং কিছু সম্পদ ‘স্থায়ী সম্পত্তি’ (Fixed Assets) অথবা কাঁচামাল আকারে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রেও ফিকাহ’র উপরোক্ত উসূলটি প্রযোজ্য হবে।

এবিষয়টিকে একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করুন। মনে করুন, একটি (নতুন) কোম্পানী ১০০/- টাকার শেয়ার ছাড়ালো এবং ১০ জন লোক সেই শেয়ারগুলোকে ক্রয় করে নিলো। ১ টি শেয়ারের মূল্য ১০/- টাকা করে ছিল। প্রত্যেক ব্যক্তি ১০/- টাকা ১০/- টাকা করে কোম্পানীর হাতে সোপর্দ করে শেয়ার গুলো নিয়ে নিলো। এরপর কোম্পানীটি ওইসব অর্থ দিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো জিনিসপত্র ক্রয় করেনি। তাহলে এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, (মোট ) ১০০/- টাকার ওই ১০ টি শেয়ার ১০০/- টাকারই প্রতিনিধিত্ব করছে। [অন্যভাবে বলা যায় যে, উক্ত কোম্পানীতে প্রতিটি ১০/- টাকার শেয়ার প্রত্যেক ব্যক্তির ১০/- টাকার মালিকানারই প্রতিনিধিত্ব করছে।-(অনুবাদক)]। সুতরাং যদি ধরা হয় যে, ‘ক’ নামক এক ব্যক্তি’র কাছে ১টি শেয়ার রয়েছে, এখন সে সেই শেয়ারটিকে ১০/- টাকার জায়গায় ১১/- টাকায় বিক্রি করে দিতে চায়, তাহলে তার জন্য এমনটা করা জায়েয নয়। কারন, এটা এমনই হল, যেন সে ১০/- টাকা দিয়ে (এর বিনিময়ে) ১১/- টাকা নিয়ে নিলো। কেননা, উক্ত কোম্পানী সেইসব অর্থ দিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো বস্তুই ক্রয় করেনি, বরং এখনো সেসব অর্থ কোম্পানীর কাছে নগদ আকারেই বিদ্যমান রয়েছে। (আর নগদের সাথে নগদ বিনিময়ের ক্ষেত্রে উভয় দিকে সমান সমান হওয়া জরুরী)। কিন্তু মনে করুন কোম্পানীটি এই কাজ করলো যে, তার কাছে যখন ১০০/- টাকা এলো, তখন সে ৪০/- টাকা দিয়ে বিল্ডিং কিনলো, ২০/- টাকা দিয়ে মেশিনারী জিনিসপত্র কিনলো, ২০/- টাকা দিয়ে কাঁচামাল কিনলো, ১০/- টাকা তার কাছে নগদে মওজুদ থাকলো এবং (বাকিতে) মাল বিক্রি করার কারনে মানুষের কাছ থেকে পাওনা ঋন বাবদ ১০/- টাকা আাদায়যোগ্য রইলো। বিষয়টিকে নিম্নোক্ত ছকের মাধ্যমে বুঝে নিনঃ

কোম্পানীর মোট পুঁজি = ১০০/- টাকা

[supsystic-tables id=1]

এমতাবস্থায় কোম্পানীর মোট পুঁজি উপরোক্ত ৫ ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এখন ‘ক’ এর কাছে ১০/- টাকার যে শেয়ারটি রয়েছে, সেটা উপরোক্ত নিয়মেই (৫ ভাগে আনুপাতিক হারে) বিভক্ত হয়ে যাবে। এর অর্থ হলোঃ ‘ক’ এর কাছে ১০ টাকার যে শেয়ারটি রয়েছে, তার মধ্য হতে ১/- টাকা পাওনাযোগ্য ঋনের বিপরীতে, ৪/- টাকা বিল্ডিঙের বিপরীতে, ২/- টাকা মেশিনারীর বিপরীতে, ২/- টাকা কাঁচামালের বিপরীতে এবং ১/- টাকা নগদ টাকার বিপরীতে বিদ্যমান রয়েছে। এখন ‘ক’ যদি ১০/- টাকার শেয়ারটিকে ১২/- টাকায় বিক্রি করতে চায়, তাহলে তার জন্য সেটা জায়েয হবে। এর কারন এই যে, শেয়ারটি বিক্রি করার অর্থ হল, ‘ক’ ১/- টাকার বিনিময়ে তার ১/- টাকার পাওনাযোগ্য ঋন বিক্রি করেছে, ১/- টাকার বিনিময়ে নগদ ১/- টাকা বিক্রি করেছে এবং বাকি ১০/- টাকার বিনিময়ে অন্যান্য জিনিসগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। এভাবে ‘ক’- এর এই লেনদেনটি সঠিক হয়ে যাবে। এখানে ‘ক’ যে ২/- টাকা মুনাফা নিচ্ছে, সেটা নগদ ও ঋনের বিপরীতে নিচ্ছে না, মুনাফাটি নিচ্ছে অপরাপর জিনিগুলির বিপরীতে; (অর্থাৎ মেশীনারী, কাঁচামাল এবং বিল্ডিঙের বিপরীতে)। আর এসবের উপর মুনাফা নেয়া জায়েয।

কিন্তু (উপরোক্ত উদাহরণ মতে) কখনো যদি ‘নগদ অর্থ’ এবং ‘পাওনাযোগ্য ঋন’ ১০/- টাকার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তাহলে সে অবস্থায় ‘ক’-এর জন্য ১০/- টাকার শেয়ার ১০/- টাকার চেয়ে কম দামে অর্থাৎ ৯/- টাকায় বিক্রি করা জায়েয হবে না। উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন, কোম্পানীর ব্যবসা অগ্রসর হল, কোম্পানী উন্নতি সাধন করলো। এর ফলে পাওনাযোগ্য ঋন ১০০/- টাকায় এবং নগদ অর্থ ১০০/- টাকায় গিয়ে দাঁড়ালো; আর বিল্ডিং ৪০/- টাকা, কাঁচামাল ১০/- টাকা এবং মেশিনারী ২০/- টাকায় বিদ্যমান থাকলো। এ হিসেবে কোম্পানীর মোট পুঁজি দাঁড়ালো ২৮০/- টাকা এবং এক একটি শেয়ারের ব্রেক-আপ-ভেলু (Break Up Value) হল ২৮/- টকা। বিষয়টিকে নিম্নোক্ত ছকের সাহায্যে বুঝে নিন-

কোম্পানীর বর্তমান মোট পুঁজি= ২৮০/- টাকা
১ টি শেয়ারের বর্তমান মূল্য = ২৮/- টাকা

[supsystic-tables id=2]

এমতাবস্থায় ‘ক’ যদি তার শেয়ারটিকে বিক্রি করতে চায়, তাহলে তার জন্য তা ২১/- টাকার কমে বিক্রি করা জায়েয হবে না। কেননা, (শেয়ারটি ২১/- টাকায় বিক্রি করলে) তখন ১০/- টাকা ওই ঋনের বিপরীতে (বিক্রি) হয়ে যাবে, যা লোকজনের কাছ থেকে পাওনাযোগ্য রয়েছে এবং ১০/- টাকা নগদ ১০/- টাকার বিপরীতে (বিক্রি) হয়ে যাবে; আর ১/- টাকা (বিক্রি ) হবে অন্যান্য সম্পদগুলির বিপরীতে। এভাবে লেনদেনটি সঠিক হয়ে যাবে। কাজেই ‘ক’ যদি তার শেয়ারটিকে ২১/- টাকার পরিবর্তে ১৯/- টাকায় বিক্রি করে দেয়, তাহলে তার জন্য তা জায়েয হবে না। কারন, এটা তাহলে এমনই হয়ে যাবে, যেন ২০/- টাকা (অর্থাৎ ঋন ১০/- টাকা + নগদ ১০/- টাকা)- র বিনিময়ে ১৯/- টাকা উসূল করা হল, যা নাজায়েয।

সুতরাং কোম্পানী যতক্ষন পর্যন্ত কোনো (অ-নগদ) সম্পদ না কিনবে, বরং যাবতীয় সম্পদ নগদ (Liquid) আকারে অথবা পাওনাযোগ্য ঋন (Receivable) আকারেই বিদ্যমান থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই কোম্পানীর শেয়ারকে কম-বেশী (Above Par or Below Par) করে বিক্রি করা জায়েয হবে না। বরং শেয়ারটিকে তার Face Value (গায়ে লিখিত মূল্য)-তে বিক্রি করা অপরিহার্য।

সুতরাং, যে কোম্পানী এখনো পর্যন্ত অস্তিত্ব লাভ করে নি, অথচ শেয়ার-বাজারে তার শেয়ার কেনা- বেচা শুরু হয়ে গেছে- যেমনটা ঘটে প্রভিশনাল তালিকাভুক্ত কোম্পানীর (Provisional Listed Company) বেলায়, অথচ সাধারণতঃ তখনও পর্যন্ত কোম্পানীর অস্তিত্বই থাকে না, এ ধরনের কোম্পানীর শেয়ারকে (শেয়ারের গায়ে লিখিত মূল্য থেকে) কম-বেশি করে বিক্রি করা জায়েয নয়। যেমনঃ কিছু দিন আগেও শেয়ার বাজারে খুবই তেজ সৃষ্টি হয়েছিল এবং বহু কোম্পানী ফ্লোট (Float) হচ্ছিল; শেয়ার ব্যবসাও হচ্ছিল বামপার। তখন একটি কোম্পানী ১০/- টাকা মূল্যে তার শেয়ার ছাড়লো, অথচ তখনো পর্যন্ত কোম্পানীটির কোনো কিছুই অস্তিত্ব লাভ করে নি, অথচ শেয়ার বাজারে তার শেয়ার বিক্রি হচ্ছিলো ১৮০/- টাকায়! (এরকম লেনদেন নাজায়েয)।

তৃতীয় শর্ত

তৃতীয় শর্তটি বুঝে নেয়ার আগে একথা জানা জরুরি যে, বর্তমান কালে এ যাবৎ যতগুলো কোম্পানী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, ওগুলোর অধিকাংশই এমন যে, তাদের মৌলিক ও বুনিয়াদী কায়কারবার তো হারাম নয় বটে- যেমনঃ টেক্সটাইল কোম্পানী, অটোমোবাইল (Auto Mobile) কোম্পানী প্রভৃতি- তবে এমন একটি কোম্পানীও আছে কিনা সন্দেহ, যা কোনো না কোনো ভাবে সূদী কারবারে জড়িয়ে পড়েনি। এ ধরনের কোম্পানীগুলো দু’ ভাবে সূদী কারবারে লিপ্ত হয়ঃ

(১).এ সমস্ত কোম্পানী ফান্ড (Fund) বাড়ানোর জন্য ব্যাংক থেকে সূদের উপর ঋন নেয় এবং ওই ঋন দিয়ে নিজেদের কাবার চালায়।

(২) কোম্পাণীর হাতে অতিরিক্ত যে অর্থ (Surplus) বিদ্যমান থাকে, সে তা (ব্যাংকের) সূদী এইউন্টে রেখে দেয় এবং এর উপর ব্যাংক থেকে সূদ লাভ করে। এসব সূদও তাদের আয়ের (Income) একটা অংশ গন্য হয়ে থাকে।

কাজেই, কেউ যদি চায় যে, আমি এমন কোম্পানীর শেয়ার ক্রয় করবো, যা কোন ভাবেই কোনো সূদী কারবারে জড়িত নয়, তাহলে তা খুবই কঠিন। এখন প্রশ্ন এই যে, তাহলে তো কোনো কোম্পানীর শেয়ারই কেনা-বেচা করা জায়েয না হওয়া উচিৎ?

এ ধরনের কোম্পানীর ব্যপারে সমকালীন ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। আলেমগনের একটি জামাআত বলছেন যে, যেহেতু এসব কোম্পানী হারাম কাজকারবারে জড়িত -এখন সম্পর্কযুক্ততার প্রশ্নে সেই হারাম কাজ চাই সামান্যই হোক না কেনো -কিন্তু যেহেতু হারাম কাজ করছে, তাই কোনো মুসলমানের জন্য এসব কোম্পানীর সাথে হারাম কাজে অংশীদার হওয়া জায়েয নয়। কেননা, সে যখন শেয়ার কিনে নিলো, তখন ওই কোম্পানীর কারবারে সে শরীক হয়ে গেল। আর (শরীয়ত মতে) কোন কারবারে একজন শরীকব্যক্তি অপর শরীকের উকিল বা প্রতিনিধী (Agent) স্বরূপ। তাই (কোম্পানীর শেয়ার কিনে নেয়ার ফলশ্রতিতে) এখন ‘শেয়ার মালিক’ যেন তাদেরকে এই কাজের জন্য প্রতিনিধি বা এজেন্ট বানিয়ে দিচ্ছে যে, তোমরা সূদী ঋন নেও এবং সূদী আয়ও অর্জন করো। বিধায়, এ সকল আলেমগনের মতে ততক্ষন পর্যন্ত কোনো কোম্পানীর শেয়ার কেনা জায়েয নয়, যতক্ষন পর্যন্ত না এ ব্যপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এসব কোম্পানী সূদী লেনদেন করে না।

ওলামায়ে কেরামদের আরেকটি জামাআত বলেন যে, যদিও এসব কোম্পানীতে এ সমস্ত মন্দ বিষয় পাওয়া যায়, কিন্তু এ সব স্বত্ত্বেও যদি কোনো কোম্পানীর বুনিয়াদী তথা মৌলিক কারবার সামষ্ঠিগত ভাবে হালাল হয়, তাহলে দুটি শর্ত সাপেক্ষে উক্ত কোম্পানীর শেয়ার নেয়ার অবকাশ রয়েছে। হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী সাহের থানভী রহ. এবং আমার শ্রদ্ধেয় পিতা হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী (সাবেক গ্রান্ড মফতী, পাকিস্তান) সাহেব রহ.-এর এটাই অভিমত।এই দু জন হযরতের অনুসরনে আমিও এই অভিমতকে সঠিক বলে মনে করি। শর্ত দুটি নিম্নরূপঃ

প্রথম শর্ত হল, ‘শেয়ার মালিক’ অবশ্যই কোম্পানীর ভিতরে সূদী লেনদেনের বিপক্ষে কথা উত্থাপন করবে, যদিও-বা তার এ ‘কথা-উত্থাপন’ (কোম্পানীর) নিয়ম লঙ্ঘন (Over Rule) হয়ে যাক না কেনো। আমার মতে কথা তোলার উত্তম পন্থা হল, কোম্পানীর যে ‘বাৎসরীক সাধারণ সভা (Annual General Meeting) অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে সে একথা উত্থাপন করবে যে, ‘আমি সূদী লেনদেনকে জায়েয মনে করি না, আমি সূদী লেনদেনের উপর অসন্তুষ্ট , কাজেই একে বন্ধ করা হোক’। বলা বাহুল্য, বর্তমান অবস্থায় এ রকম ‘কথা উত্থাপন’ করা ঢোলের আসড়ে তোতার কন্ঠের ন্যয়ই হবে। আর নিঃসন্দেহে তার এ কথাটি হবে নিয়ম-লঙ্ঘন (Over Rule)। কিন্তু সে যখন এ কথা উত্থাপন করবে, তখন হযরত থানভী রহ.-এর বক্তব্য মতে সে তার দায়িত্ব পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছে।

(আমরা আগেই বলে এসেছি যে), ১৬কোম্পানী দু’ পন্থায় সূদী লেনদেন করে থাকে। তার একটি হল, কোম্পানী ঋন নেয় এবং এর উপর সূদ প্রদান করে। এ অবস্থায় কোম্পানীর এই ঋন গ্রহনের ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো হারাম কিছু শামিল হল না। কারন কেউ যখন সূদ (প্রদানের শর্ত ) -এর উপর ঋন নেয়, তখন সেটা একটা হারাম ও কঠিন গোনাহ’র কাজ বটে, তবে তাতেও সে ওই ঋনের মালিক হয়ে যাবে। এখন এর মাধ্যমে কারবার করে যে আয় উপার্র্জীত হবে, সেটাও হালালই হবে। এমতাবস্থায় খুব বেশি হলে এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, কোম্পানী যেহেতু ওই ‘শেয়ার মালিকের’ উকিল (প্রতিনিধি) স্বরূপ, তাই সূদী ঋন নেয়ার সম্পর্কটি উক্ত ‘শেয়ার মালিকের’ উপরও আরোপীত হবে এবং তাকেও ‘সূদী ঋন’ নেওয়ার বিষয়টির উপর সন্তুষ্টচিত্ত মনে করা হবে। (অর্থাৎ এই শেয়ার মালিকও যেন কোম্পানী ও অংশীদারদের গলায় গলায় মিলে সূদী লেনদেনে জড়িত থাকার বিষয়টিকে মেনে নিয়েছে)। হযরত হাকীমূল উম্মত থানভী রহ. এ প্রশ্নর এই জবাব দিয়েছেন যে, ‘শেয়ার মালিক’ যদি কোনো ভাবে এ কথা উত্থাপন করে দেয় যে, আমি সূদী কাবারের উপর সন্তুষ্ট নই, তাহলে তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে। কোম্পানীর দায়িত্বশীলদের প্রতি চিঠি লিখে দেয়াটাও এব্যপারে যথেষ্ঠ হতে পারে। [ইমদাদুল ফাতাওয়া, থানভী- ১/৪৯] অবশ্য এর উপরও একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, যা হযরত থানভী রহ. উল্লেখ করেন নি। সেটা এই যে, (শরীয়ত মতে) কোম্পানীর দায়িত্বশীলগন অংশীদারিত্বের কারনে কোম্পানীর উকিল (প্রতিনিধি) তো অবশ্যই, আর এও জানা আছে যে, যে কথা উত্থাপীত হতে যাচ্ছে তার প্রতি আমল দেওয়া হবে না, তাহলে প্রতিনিধি হিসেবে এমন প্রভাবহীন কথা উত্থাপনের মাধ্যমে এত বড় দায়িত্ব কি করে আদায় হতে পারে ? এর জবাব এই যে, কোম্পানীতে যে প্রতিনিধিত্ব চলে তা ওই প্রতিনিধিত্ব থেকে ভিন্ন যা অংশীদারি কারবারের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। (শরীয়তসম্মত) অংশীদারি কারবারে প্রত্যেক ব্যক্তির ওকালত বা প্রতিনিধিত্ব এত শক্তিশালী হয় যে, কোন একজন অংশীদারও যদি কোনো কারবারের বিরোধীতা করে বসে, তাহলে সেই কারবার আর হয় না। অংশীদারি কারবারে (কোনো কিছুর ) ফয়সালা হয় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে। অপরদিকে কোম্পানীতে উকিল (প্রতিনিধিস্বরূপ অংশীদার) এবং মুআক্কান (দায়িত্বশীল কর্মকর্তা)-এর সম্মন্ধ ও সম্পর্ক অত শক্তিশালী হয় না যে, কোনো একজন শেয়ার মালীকও বিরোধীতা করে বসলে সিদ্ধান্ত আর কার্যকরই হবে না। কোম্পানীতে কোনো কিছুর ফয়সালা (সমস্ত শেয়ার মালিকের) সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে হয় না। আর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রেমে কারবার চালানো সম্ভবও নয়। সেখানে সিদ্ধাস্ত হয় অধিকাংশের রায়ের ভিত্তিতে। এখন যেখানে অধিকাংশের রায়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়, সেখানে কেউ যদি সূদী লেনদেনের বিরুদ্ধে কথা উত্থাপন করে, কিন্তু সংখ্যালঘুর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারনে তার উপর আমল দেয়া না হয় এবং আগের মতই সূদী লেনদেন অব্যাহত থাকে, তাহলে একথা বলা যায় না যে, এসব সূদের বিপক্ষে কথা উত্থাপনকারীর প্রতিনিধিত্ব ও সন্তুষ্টি বলে এসব লেনদেন সম্পাদিত হচ্ছে। তাই এ কথাই সঠিক মনে হয় যে, যদি কোম্পানীর মূল কারবার জায়েয (হালাল) হয় এবং আনুষঙ্গিক ভাবে কখনো যদি সূদী শর্তে ঋন নিয়ে ফেলে, তাহলে সেই কোম্পানীর শেয়ার নেওয়া এই শর্তে জায়েয যে, সূদের বিপক্ষে কথা উত্থাপন করতে হবে। (অপর শর্তটি মূলতঃ নিম্নে বর্নিত চতুর্থ নম্বর শর্তটাই)।

চতুর্থ শর্ত

চতুর্থ শর্তটি হল, যখন ১৭‘লভ্যাংশ’ (Dividend) বন্টিত হবে, তখন ‘আয়-বিবরনী’ (Income Statement)-এর মাধ্যমে কোম্পানীর আয়ের শতকরা কত অংশ (ব্যাংকে) সূদী একাউন্ট থেকে অর্জিত হয়েছে তা সে জেনে নিবে। উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন, কোম্পানীর মোট আয়ের ৫% সূদী একাউন্টে অর্থ রাখার কারনে অর্জীত হয়েছে। তাহলে ওই ব্যক্তি তার মুনাফার ৫% সদকাহ্ (দান) করে দিবে।

(আমরা আগেই বলে এসেছি যে), ১৮আজকাল বেশিরভাগ কোম্পানী তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব (সেভিংস্ একাউন্ট)-এ রেখে তার উপর সূদ খায়। এখানে দুটি প্রশ্ন ওঠে। একটি হল, এতে করে সূদী লেনদেনে ‘শেয়ার-মালিকে’রও অংশীদারিত্ব সৃষ্টি হবে। বস্তুতঃ এর সমাধান তাই যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, কোম্পানী যে লভ্যাংশ (Dividend) বন্টন করবে, তাতে সূদও শামিল থাকবে। আর আয়ের য়ে অংশ সূদ থেকে অর্জিত হয় তাও হারাম। এসম্পর্কে থানভী রহ. দুটি কথা বলেছেন। (১) ‘প্রত্যেক কোম্পানীর ব্যপারে আমরা নিশ্চিত ভাবে জানি না যে, সে সূদ নিয়েছে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করে দেখতে আমরা আদিষ্ট নই। (২) যদি ধরেও নেয়া হয় যে, সূদ নিয়েছে, তাহলেও তার পরিমান খুব সামান্য, যা হালাল মালের সাথে মিশ্রিত হয়ে গেছে। আর মিশ্রিত মালের যদি অধিকাংশই হালাল হয়, তাহলে তা ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।

কিন্তু এর উপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, কেউ যদি মিশ্রিত মাল থেকে উপহার উপঢৌকন দেয় এবং উক্ত মালের মধ্যে হারামের অংশ কম হয়, তাহলে সেই উপহার নেওয়া এজন্য জায়েয যে, এক্ষেত্রে ধরা হবে যে, সে হালাল অংশ থেকে দিচ্ছে। কিন্তু কোম্পানীর লভ্যাংশের (Dividend) চেহারাটি এ থেকে ভিন্নতর। এর কারন হল, কোম্পানীর যতগুলো খাত থেকে ‘আয়’ উপার্জিত হয়েছে, ততগুলো খাতের প্রতিটির আয়ের একটি আনুপাতিক আংশ উক্ত লভ্যাংশের (Dividend) মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। যদি কোম্পানীর (মোট) আয়ের ১০% সূদী একাউন্ট থেকে অর্জিত হয়ে থাকে, তাহলে লভ্যাংশের (Dividend) ১০% অংশও হবে সূদী। তাই মুনাফার যতটুকু অংশ সূদী, ততটুকু অংশ সওয়াবের নিয়ত ব্যতিত সদকাহ্ (দান) করে দেয়া অপরিহার্য। আয়ের কত অংশ সূদী একথা কোম্পানীর আয়-বিবরনী (Income Statement) থেকে জানা যেতে পারে।

১৯সুতরাং, কোম্পানীর মূল কারবার যদি হালাল হয়, কিন্তু সাথে সাথে সেই কোম্পানী ব্যাংক থেকে সূদী ঋন নেয় অথবা নিজের অতিরিক্ত অর্থ সূদী একাউন্টে রেখে তার উপর সূদ খায়, তাহলে সে অবস্থায় যদি উপরোক্ত শর্ত দুটির উপর আমল করা হয়, তাহলে এরকম কোম্পানীর শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করার অবকাশ রয়েছে। আমি মনে করি ‘জায়েয’ হবার প্রশ্নে এ অভিমতটি একটি ন্যয়ানুগ অবস্থান এবং ইসলামী উসূল মোতাবেক স্থাপিত। ইসলাম মানুষের জন্য সহজতার পথ উন্মোচন করে।

সারকথা 

২০উপরোক্ত বিষদ আলোচনা থেকে একথা জানা গেল যে, শেয়ার ‘ক্রয়-বিক্রয়’ জায়েয হওয়ার জন্য মোট শর্ত চারটিঃ-

(১) ২১কোম্পানীর মূল কারবার হালাল হতে হবে।
(২) শেয়ারের Face Value (গায়ে লিখিত মূল্য) থেকে কম-বেশী করে বিক্রি করার জন্য জরুরী হল, কোম্পানীর পুঁজি শুধুমাত্র নগদ আকারে থাকা চলবে না।
(৩) সূদের বিপক্ষে কথা উত্থাপন করতে হবে।
(৪) কোম্পানীর আয়ের মধ্যে সূদ অন্তর্ভূক্ত হলে লভ্যাংশের ততটুকু অংশ সদকাহ করে দিতে হবে।

শুধু কেনা-বেচা করে মুনাফা (Capital Gain) অর্জনের উদ্দেশ্যে শেয়ার ক্রয় করাঃ

শেয়ার২২ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে এতক্ষন পর্যন্ত যে আলোচনা করা হল, তা ওই অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যখন শেয়ার ক্রেতার উদ্দেশ্য থাকে কোম্পানীর একজন অংশীদার হয়ে পুঁজি বিনিয়োগ করা (এবং বৎসরান্তে মুনাফা অর্জন করা)। কিন্তু ক্রেতার যদি (কোম্পানীতে) পুঁজি বিনিয়োগ করা উদ্দেশ্য না হয়, বরং সে যদি এই উদ্দেশ্যে তা ক্রয় করে যে, ‘যদি শেয়ারের মূল্য বেড়ে যায়, তাহলে তা বিক্রি করে দিয়ে মুনাফা অর্জন করবো’ -তাহলে এ পদ্ধতিতে শেয়ার কেনা-বেচা করার বিধান কি?

কিছু২৩লোক আছে, যারা (কোম্পানীতে) বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে শেয়ার কেনা-বেচা করে না, বরং তাদের উদ্দেশ্য থাকে Capital Gain (কেপিটাল গেইন)। তারা -কোন্ কোম্পানীর শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগ আছে -তা অনুমান করে নিয়ে ওই কোম্পানীর শেয়ার কিনে নেয়। অতঃপর কিছু দিন পরে যখন (শেয়ারটির) দাম বেড়ে যায়, তখন তা বিক্রি করে দিয়ে মুনাফা অর্জন করে। অথবা যদি কোনো কোম্পানীর শেয়ারের দাম কমে যায়, তখন সেটা কিনে নিয়ে পরে বিক্রি করে দেয়। এভাবে কেনা-বেচা করে মুনাফা অর্জন করাই থাকে তাদের উদ্দেশ্য। কোম্পানীতে অংশীদার হওয়া এবং তার বাৎসরীক মুনাফা অর্জন করা তাদের উদ্দেশ্য থাকে না। বরং খোদ্ শেয়ারকেই একটি ‘ব্যবসায়ী-মাল’ বানিয়ে নিয়ে তারা তার লেনদেন করে থাকে। প্রশ্ন হল, শরীয়তগত ভাবে এ পদ্ধতিতে কাজ করার কতটুকু অবকাশ রয়েছে?

এর জবাব হল, যেমনিভাবে শেয়ার ক্রয় করা জায়েয, তেমনিভাবে তা বিক্রি করাও জায়েয; তবে শর্ত হল, ওই সমস্ত শর্তাবলী পূরণ করতে হবে, যা এইমাত্র উপরে আলোচিত হল। আপনি একটি জিনিস আজকে ক্রয় করে নিয়ে কালকে বিক্রি করবেন, কাল ক্রয় করে নিয়ে পরশু বিক্রি করবেন -এটা যেমন জায়েয, ঠিক তেমনি ভাবে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করাও জায়েয। যখন২৪এ কথা গ্রহন করে নেওয়া হয়েছে যে, শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য একটি জিনিস এবং শেয়ার বিক্রি করা প্রকৃত পক্ষে কোম্পানীর সহায় সম্পত্তি ও পুঁজিতে বিদ্যমান (শেয়ার মালিকের একটি) আনুপাতিক অংশেরই বিক্রয়, তখন তা কেনা-বেচা করাও জায়েয হবে। শেয়ারটিকে চাই নিজের কাছে রেখে (কোম্পানীতে) পুঁজি বিনিয়োগের উদ্দ্যেশেই হোক কিংবা দাম বেড়ে গেলে তা বিক্রি করে দিয়ে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যেই হোক, যে নিয়তেই হোক শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয। তবে হ্যা, এক্ষেত্রে অবশ্যই ক্রয়-বিক্রয়ের শরয়ী শর্তাবলির প্রতি খেয়াল রাখা অপরিহার্য।

এ কথা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, অনুমান ও কিয়াস করা -যাকে (Speculation) বলা হয়ে থাকে -সেটা স্বত্ত্বাগত ভাবেই হারাম। এটা ভুল কথা। Speculation (অনুমান) হল এই ধারনা করা যে, কোন্ জিনিসের দাম বাড়ছে এবং কোন্ জিনিসের দাম হ্রাস পাচ্ছে। যে জিনিসের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে সেটাকে বিক্রি করে দেয়া এবং যে জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেটাকে রেখে দেয়া -এ বিষয়টি স্বত্ত্বাগতভাবে নিষিদ্ধ নয়। এটা তো সকল ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। যে বিষয়টি নিষিদ্ধ -তা হল ক্রয়-বিক্রয়ের শরয়ী শর্তাবলীর প্রতি খেয়াল না রাখা। যেমন ধরুন মালিকানাধীন নয় কিংবা করজা (করায়াত্ব) করা হয়নি এমন জিনিস বিক্রি করা হচ্ছে অথবা প্রতারনা ও জুয়ার আকার ধারন করছে ইত্যাদি। দুটি জিনিস মিলে ‘জুয়া’ গঠিত হয়। একটি এই যে, এক পক্ষ থেকে পরিশোধের বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে বটে, তবে দ্বিতীয় পক্ষ থেকে (পরিশোধের বিষয়টি হওয়া-না হওয়ার ) কাল্পনিক (সম্ভাবনার উপর ঝুলন্ত)। দ্বিতীয়টি হল , যে পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে, (ওই পক্ষের পরিশোধকৃত) অর্থ বা পুঁজি দুটি বিষয়ের সম্ভাবনার সাথে যুক্ত -হয় সেই অর্থ বা পুঁজি নিজেই তলিয়ে যাবে, না হয় অপর কোনো অর্থ বা পুঁজিকে আত্মসাৎ করে আনবে।

বস্তুতঃ২৫কেউ যখন কোনো শেয়ার কিনে ফেলে, তখন সে ওই কোম্পানীতে একজন অংশীদার হয়ে যায়। কিন্তু সাধারনতঃ যে পন্থা অবলম্বন করা হয় তা এই যে, ওই ‘শেয়ার-মালিক’ ততক্ষনাৎ তার শেয়ারটিকে (ষ্টক মার্কেটে) বিক্রি করে দেয়। তাই যখন কোনো কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং উক্ত কোম্পাণীর সমস্ত শেয়ার একবার জারী (Subscribe) হয়ে যায়, তখন এর পর ‘ষ্টক মার্কেটে’ উক্ত কোম্পানীর শেয়ার লেনদেন হলে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে মূলতঃ তা শেয়ার ‘ক্রয়-বিক্রয়’ই গন্য হবে। মনে করুন একটি কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হল, আমি তার দশটি শেয়ার কিনে নিলাম। এখন আমি ‘ষ্টক মার্কেটে’ ওই শেয়ারগুলোকে বিক্রি করে দিবো। এখন যে ব্যক্তি ওই শেয়ার দশটিকে আমার কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে, সে মূলতঃ কোম্পানীতে আমার মালিকানাধীন নির্দিষ্ট অংশটিকেই কিনে নিচ্ছে। সুতরাং, এই ক্রয়-বিক্রয়ের কারনে ওই ব্যক্তি এখন আমার স্থলে উক্ত অংশের মালিকে পরিনত হয়ে যাবে। শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের মূল তত্ত্ব বাস্ এতটুকুই।

‘শেয়ার-মালিকানা’ কবজা (হস্তগত/করায়াত্ব) হওয়ার আগেই শেয়ারকে বিক্রি করে দেয়া

আরেকটি২৬প্রশ্ন এই উত্থাপিত হয় যে, কখনো কখনো একজন ব্যক্তি শেয়ার কিনে নেয় বটে, তবে তখনো পর্যন্ত শেয়ারটিকে না (ক্রেতার কাছে) প্রেরন করা (Delivery) হয়, আর না (তা ক্রেতার) হস্তগত হয়। অথচ সে এর আগেই শেয়ারগুলিকে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয়। উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন, আজকে বাজারে একটি কোম্পানীর শেয়ার ছাড়া (Subscribe) হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেই কোম্পানীর ‘শেয়ার (বিক্রয় পরবর্তী) কার্যক্রম’ পূর্ণরূপে সম্পন্ন হয় নি, (বরং বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজকারবারের জটিলতার কারনে বিক্রিত শেয়ারের কাগুজে সার্টিফিকেটটি ক্রেতার কাছে হস্তগত হতে বা অধিকারে আসতে আরো সময়ের দরকার) , কিন্তু এর আগেই বেশ কয়েকবার করে এসব শেয়ারের লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যায়। অথচ ‘তাৎক্ষনিক বিক্রয়ের’ (Spot Sale) ক্ষেত্রেও শেয়ার ক্রয় করার পর সাধারণতঃ শেয়ার হস্তগত হতে হতে কম করে হলেও ১ সপ্তাহ অবশ্যই লেগে যায়। এখন প্রশ্ন হল, (ক্রেতার কাছে শেয়ার সার্টিফিকেট) প্রেরন ও (তা তার) হস্তগত হওয়ার আগেই এ সমস্ত শেয়ারকে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয়া (ক্রেতার জন্য) জায়েয কি না ?

এ সম্পর্কে যাওয়ার আগে একটি উসূল (মূলনীতি) বুঝে নিন । এর পর বিষয়টির ধরন প্রকৃতি সম্পর্কে নিরিক্ষন করে নেয়া সহজ হবে। উসূলটি হল, আপনি যে জিনিসটিকে ক্রয় করেছেন, সেটা কবজা (করায়ত্ব, হস্তগত) করার (বা অধিকারে আসার) আগে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয়া জায়েয নয়। কবজার২৭পূর্বে কোনো জিনিস বিক্রি করার নিষিদ্ধতার ব্যাপারে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

সহীহাঈনে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন-  من ابتاع طعاما فلا يبعه – ‘যে ব্যক্তি কোনো খাদ্য বিক্রি করতে চায়, সে যেন তা কবজা না করা পর্যন্ত বিক্রি না করে’। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন- احسب كل شيئ مثله حتي يستوفيه আমার মতে এই বিধান (শুধু খাদ্য সামগ্রীর সাথে নির্দিষ্ট নয়, বরং) এর ন্যয় সব কিছুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য’[সহীহ মুসলীম, হাদীস ৩৬৯৪; সহীহ বুখারী, হাদীস ২০০২]

সুনানে আবু দাউদে হযরত জায়েদ বিন ছাবীত রা. থেকে বর্ণিত আছে- فان رسول الله صل الله عليه و سلم نهى أن تباع السلع حيث تبتاع حتى يحوزها التجار إلى رحالهم – ‘যে জিনিস যেখানে ক্রয় করা হয়, সে জিনিসকে কবজা না করা পর্যন্ত ক্রেতার জন্য সেখানেই তা বিক্রি করে দেওয়াকে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিষেধ করেছেন’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৩৫৬; মুস্তাদরাকে হাকীম- ২/৪০]

ইমাম বাইহাকী রহ. হযরত হাকীম বিন হাযাম রা. থেকে বর্ণনা করেছেন- قلت يا رسول الله، انى ابتاع هذه البيوع فما يحل لى منها ؟ و ما يحرم على؟ قال يا ابن اخى لا تبيعن شيئا حتى تقبضه –‘তিনি বলেন- আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি এই এই জিনিসের ক্রয়-বিক্রয় করি। আমার জন্য এর মধ্যে কি হালাল এবং কি হারাম? রাসুলুল্লাহ ﷺ জবাবে বললেন- ‘হে ভাতিজা! কোনো কিছুই কবজা না করা পর্যন্ত তা বিক্রি করো না’। [সুনানে বাইহাকী- ৫/৩১৩, হাদস ১০৬৮৫]

ইমাম বাইহাকী রহ. বলেন, এ বর্ণনাটির সনদ ‘হাসান’ ও ‘মুত্তাসিল’। আর ইমাম ইবনে কাইয়্যেম রহ. ‘তাহযীবুস সুনান’-এ বলেছেন যে, এই বর্ণনার সনদ ইমাম বুখারী এবং ইমাম মুসলীমের শর্ত অনুসারে রয়েছে, শুধুমাত্র আব্দুল্লাহ ইবনে আসমাহ নামক একজন বর্ণনাকারী ছাড়া। কিন্তু ইবনে হীব্বান রহ. তাকে সিকাহ্ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন। ইমাম নাসায়ী রহ. তাঁর বর্ণনাকে দলীলযোগ্য মনে করেন। [তাহযীবুস সুনান- ৫/১৩১]

হযরত২৮আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেছেন- من اشترى طعاما فلا يبعه حتى يستوفيه –‘যে ব্যক্তি কোনো খাদ্য ক্রয় করে, সে যেন তা ‘কবজা’ না করা পর্যন্ত বিক্রি করে না দেয়’। [সহীহ মুসলীম, হাদীস ৩৭০১; সহীহ বুখারী, হাদীস ২০০৩]

হযতর হাকীম বিন হাযাম রা. বর্ণনা করেন- قلت يا رسول الله ، ان الرجل ليسألني فيريد منى البيع و ليس عندى ما يطلب، افأبيع منه ، ثم ابتاعه من سوق ؟ قال لا تبع ما ليس عندك –‘আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম- ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার কাছে মানুষ এসে কোনো কিছু কিনতে চায়। কিন্তু সে সময় যদি আমার কাছে কাঙ্খিত জিনিসটি না থাকে, তাহলে আমি কি তার কাছে জিনিসটি প্রথমে বিক্রি করে দিয়ে পরে তা বাজার থেকে কিনে তাকে দিয়ে দিতে পারবো? রাসুলুল্লাহ ﷺ জবাবে বললেন- ‘যা তোমার কাছে নেই, তা বিক্রি করো না’[নাসায়ী, তিরমিযী, আবু দাউদঃ জামিউল উসূল- ১/৪৫৭]

সুনানে২৯ তিরমিযীতে আছে,হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্নিত রাসুলুল্লাহ ﷺ এরশাদ করেন- لا يحل سلف و بيع و لا شرطان فى بيع و لا ربح ما لم يضمن – ঋন ও বিক্রয় (কে একত্রিত করা), একই বিক্রিতে দুটি শর্ত লাগানো এবং যে জিনিস এখনো জামীনে (তথা মালিকানা ঝুঁকিতে) আসেনি -তার মুনাফা নেওয়া হালাল নয়’। [সুনাতে তিরমিযী, হাদিস ১২৩৪] ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।

এই হাদীসে রাসুলুল্লাহ সা. ربح ما لم يضمن অর্থাৎ এমন জিনিসের মুনাফা নিতে নিষেধ করেিেছন, যে জিনিস এখনো মুনাফা গ্রহীতার জামীনে (মালিকানা ঝুঁকিতে) আসেনি। এর মধ্যে (কোনো কিছু) করজা করার পূর্বে বিক্রি করে দেয়াও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। কেননা, বিক্রেতা যে পর্যন্ত বিক্রয়ের জিনিসটির উপর কবজা করে না নিবে, সে পর্যন্ত সেটা তার জামীনে (মালীকানা ঝুঁকিতে) আসবে না। সুতরাং, বিক্রেতা যদি বিক্রিয়ের জিনিসটির উপর কবজা করার আগেই তা বিক্রি করে দেয়, তাহলে সেটা ربح ما لم يضمن এর অন্তর্ভূক্ত হয়ে নাজায়েয হয়ে যাবে। উপরোক্ত হাদীসগুলো ব্যপকভাবে সব ধরনের বিক্রয়যোগ্য জিনিসকেই শামিল করে নেয়। তবে৩০ কবজা করার বেলায় সর্বদা (জিনিসটির) যে দৈহীক কবজাই (Physical Possession) হতে হবে -এমনটা জরুরী নয়। বরং যদি বিধানগত হুমকী কবজাও (Constructive Possession) হয়ে যায়, অর্থাৎ জিনিসটি যদি আমাদের জামীনে (Risk) চলে আসে, তাহলে তার পরেও তা অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয়া জায়েয আছে।

শেয়ারের ‘কবজা’ (করায়াত্ব / হস্তগতকরন) কি?

এখন শেয়ারের ‘কবজা’ (করায়াত্ব / হস্তগতকরন) কি , কিভাবে এর উপর কবজা সংগঠিত হয় -সেটাই এখানে দেখার বিষয়। যে কাগজটিকে আমরা শেয়ার সার্টিফিকেট বলে থাকি, সেই সার্টিফিকেটের নাম আসলে ‘শেয়ার’ নয়। বরং ‘শেয়ার’ হল ওই মালিকানার নাম, যা উক্ত কোম্পানীর মধ্যে রয়েছে। আর সার্টিফিকেটটি হল সেই মালিকানারই চিহ্ন এবং তার দলিল ও স্বাক্ষ্য। সুতরাং, যদি মনে করা হয় যে, কোম্পানীতে এক ব্যক্তির মালিকানা সাব্যস্থ হয়ে গেছে বটে, কিন্তু সে এখনও পর্যন্ত মালিকানার সার্টিফিকেট লাভ করেনি, তবুও শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে একথা বলা যাবে যে, সে তার মালিক হয়ে গেছে।

বিষয়টিকে একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করুন। মনে করুন, আপনি একটি গাড়ি কিনেছেন; গাড়িটিও আপনার কাছে চলে এসেছে। কিন্তু আপনি যার কাছ থেকে গাড়িটি কিনেছেন, এখনো পর্যন্ত তার নামেই গাড়িটির রেজিষ্ট্রেশন করা আছে; রেজিষ্ট্রেশনটি বদলিয়ে নেয়া হয় নি। এখন যেহেতু ওই গাড়িটির উপর আপনার ‘কবজা’ হয়ে গেছে, এজন্য নিছক আপনার নামে রেজিষ্ট্রেশন করা হয়নি বলে একথা বলা যাবে না যে, আপনার ‘কবজা’ পুরোপুরি হয় নি। শেয়ার সার্টিফিকেটটিও ঠিক এই রেজিষ্ট্রেশন করা গাড়িটির মতই। এখন প্রশ্ন হল, কোম্পানীর ওই মূল অংশ- যার প্রতিনিধিত্ব করছে এই শেয়ার (সার্টিফিকেট) টি, তা তার মালিকানায় চলে এসেছে কি না?

বলা বাহুল্য, (কোম্পানীতে প্রাপ্ত তার) অংশটি এমন নয় যে, সে কোম্পানীতে গিয়ে নিজের অংশ উসূল করে নিয়ে তার উপর কবজা করে নিবে। এটা করা সম্ভব নয়। সুতরাং, এর৩১ উপর দৈহিক কবজা (Physical Possession) হতে পারে না। কাজেই, এক্ষেত্রে ‘অ-স্পর্শগত (হুকমী) কবজা’ই ধর্তব্য হওয়া উচিৎ। এখানে দুটি সুরত রয়েছে। হয় একথা বলা হবে যে, যখন সার্টিফিকেটটি হাতে এসে যাবে, তখন ‘অ-স্পর্শগত কবজা সংঘটিত হবে, অথবা একথা বলা হবে যে, যখন ওই নির্দিষ্ট অংশটুকু ‘শয়ার-ক্রেতার’ জামীনে (মালিকানা ঝুঁকিতে ) এসে যাবে, তখন ‘অস্পর্শগত (হুকমী) কবজা সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করা হবে। এ বিষয়টির ফয়সালা করার জন্য প্রথমে بيع قبل القبض (কবজা’র পূর্বে বিক্রি)-র মূলত্বত্ত্বটি জেনে নেয়া জরুরি।

কবজার পূর্বে বিক্রি করার নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি মূলতঃ দুটি বিষয়ের উপর স্থাপিত

১) যে জিনিস কবজা করার পূর্বে বিক্রি করা হয়, তা ভবিষ্যতে পাওয়ার বিষয়টি ক্রেতার জন্য সুনিশ্চিত থাকে না। সুতরাং এ কথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায় না যে, বিক্রেতা জিনিসটি ক্রেতার কাছে অবশ্যই হস্তার্পন করবে। বস্তুতঃ এটা একপ্রকার ধোকা (غرر), যার ভিত্তিতে কিছু বিক্রয় করা জায়েয নয়। তবে বিক্রয়ের এমনও অনেক সুরত রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে বিক্রিত মালকে (ক্রেতা কর্তৃক) কবজা করার বিষয়টি অনুভূত হয় না। এমতাবস্থায় তাতে এ রকম ধোকার কোনো কারন পাওয়া যায় না বটে, তবে বিধানগত দিক থেকে মালটি ক্রেতার কবজায় (করায়ত্বে বা অধিকারে) চলে আসে। এরকম সুরতগুলির ক্ষেত্রে ‘কবজার পূর্বে বিক্রি’র বিষয়টি পাওয়া যায় না। (এক্ষেত্রে বলা হবে যে, কবজার পরই জিনিসটি বিক্রি করা হয়েছে।)

২) ‘কবজার পূর্বে বিক্রি’ নিষিদ্ধ হওয়ার দ্বিতীয় কারন এই যে, কবজার পূর্বে বিক্রিত মালটি বিক্রেতার জামীনে (মালীকানা ঝুঁকিতে) আসে না। আর ربح ما لم يضمن (য জিনিস জামীনে আসে তার মুনাফা নেওয়া) জায়েয নয়।

এখন যে ক্ষেত্রে (ক্রেতা দ্রব্যটিকে) ‘দৈহিক ভাবে (Physically) কবজা’ করে নি বটে, কিন্তু (তা অ-স্পর্শগত আঙ্গিকে) এমনভাবে কবজা হয়ে গেছে, যার ভিত্তিতে ক্রেতা জিনিসটিকে কবজা করে নিয়েছে বলে বিধান দেয়া যায়; অর্থাৎ যে ক্ষেত্রে বিক্রিত মাল থেকে উপকৃত হওয়ার অধিকার (বিক্রেতার কাছ থেকে) ক্রেতার দিকে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং (ক্রেতার স্কন্ধেই মালটির) জামীন (মালিকানা ঝুঁকি) প্রমানিত হয়ে গেছে, সে জিনিস বিক্রি করা (ক্রেতার জন্য) জায়েয। (কেননা, এখন তা ক্রেতার মালিকানাধীন মাল; বিক্রেতার মালিকানাধীন নয়)। তাই৩২(কোম্পানীতে বিদ্যমান) প্রকৃত অংশের মালিক হওয়ার অর্থ হল, উক্ত অংশের লাভ-ক্ষতি, দায় (Liabilities) ও লভ্যাংশ পাওয়ার অধিকারী সে হয়েছে কিনা?

মনে করুন, আজ আমি ‘ষ্টক মার্কেট’ থেকে একটি শেয়ার কিনেছি, তবে শেয়ার সার্টিফিকেটটি এখনো পর্যন্ত আমার হস্তগত হয় নি বা ডেলিভারি হয় নি। এরই মধ্যে কোম্পানীটি বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেল এবং এর সহায় সম্পদ ও পুজির কিছুই রক্ষা পেল না। এখন প্রশ্ন হল, এ ক্ষতিটি কার হল? যদি আমার ক্ষতি হয়, তাহলে তার অর্থ এই যে, উক্ত শেয়ারের ঝুঁকি (Risk) আমিই নিয়েছিলাম। (একথাই প্রমাণ করে যে, কোম্পানীর উক্ত অংশের মালিকানা আমার ঝুঁকিতে এসেছিল বিধায় ওই ক্ষতির দায় দায়িত্বও আমার ঘাড়েই বর্তিয়েছে) । এ অবস্থায় আমি উক্ত শেয়ারটিকে অন্যের কাছে বিক্রি করতে পারি। (কেননা, শরীয়তের দৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট অংশটি আমার মালিকানাধীন। আর আমি অবশ্যই আমার মালিকানাধীন জিনিস অন্যের কাছে বিক্রি করার অধিকার রাখি)। কিন্তু এতে যদি আমার ক্ষতি না হয়, বরং (আমার কাছে) যারা শেয়ারটি বিক্রি করেছিল ক্ষতিটা যদি তাদেরই হয়, তাহলে তার অর্থ এই হবে যে, উক্ত শেয়ারের ঝুঁকি (Risk) তখন পর্যন্ত আমার দিকে স্থানান্তরিত হয়নি। এ অবস্থায় (শেয়ারটি যেহেতু এখনো পর্যন্ত আমার মালিকানাধীন নয়, তাই) যে পর্যন্ত শেয়ার সার্টিফিকেটের উপর কবজা না করতে পারি, সে পর্যন্ত আমার জন্য তা অন্যের কাছে বিক্রি করা জায়েয নয়।

‘ষ্টক এক্সচেঞ্জের’৩৩লোকদের সাথে বিস্তারিত আলোচনার পর এ বিষয়টি সামনে এসেছে যে, তাৎক্ষনিক বিক্রয় (Spot Sale) হয়ে যাওয়ার পর শেয়ারের যাবতীয় অধিকার ও দায়দায়িত্ব ক্রেতার দিকে স্থানান্তরিত হয়ে তা ক্রেতার জামিনে (মালিকানা ঝুঁকিতে) চলে আসে। যেমনঃ ‘তাৎক্ষনিক বিক্রয়’ (Spot Sale) হয়ে যাওয়ার পর শেয়ারের উপর ‘দৈহিক কবজা’র (Physical Possession) পূর্বে কোনো দুঃর্ঘটনার কারনে কোম্পানী যদি একেবারে ধ্বংস ও বরবাদ হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিটি ক্রেতার হয়েছে বলে মনে করা হয়ে থাকে। ‘ষ্টক এক্সচেঞ্জ’ এক্ষেত্রে উক্ত বিক্রেতাকে অর্থ পরিশোধ করে দিবে। এমনিভাবে যদি কবজার পূর্বেই লভ্যাংশ (Dividend) বন্টিত হয়ে যায়, তাহলে কোম্পানী বিক্রেতার নামেই লভ্যাংশ জারি করবে। কেননা, কোম্পানীর রেকর্ডে এখনো পর্যন্ত বিক্রেতার নামেই নথিভুক্ত রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীক নিয়মের আলোকে বিক্রেতা এ ব্যপারে বাধ্য থাকে যে, সে শেয়ারের সাথে সাথে লভ্যাংশটাও ক্রেতাকে দিয়ে দেবে। এসব কথা থেকে বোঝা গেল, দৈহিক কব্জার পূর্বেও শেয়ারটি ক্রেতার জামীনে (মালীকানাধীন ঝুঁকিতে) চলে এসেছে। এখন ক্রেতার কাছে শেয়ারের মালিকানার বিবরণ সম্বলীত প্রমানপত্রটি চলে আসাটাই শুধু বাকি থাকছে। আর নিছক এতটুকুর কারনে ‘কবজা’ হয় নি বলা যায় না। তাই এ অবস্থায় সার্টিফিকেটটি হাতে আসার আগেও শেয়ারটিকে বিক্রি করে দেয়া জায়েয হবে। তবে অন্য দিকে যদি এ বিষয়টির প্রতিও লক্ষ্য করা হয় যে, প্রত্যেক জিনিসের কবজার পন্থা-তো উরফ (প্রচলীত প্রথা) দ্বারা নির্ণীত হয়; আর প্রচলীত প্রথায় ‘শেয়ারের কবজা’ ধরা হয় তখনই, যখন সার্টিফিকেটটি হস্তগত হয়–এমন হলে তো এক্ষেত্রে নাজায়েয হওয়ারই হুকুম হওয়া উচিৎ; বিশেষতঃ যখন এভাবে জুয়া ব্যবসার প্রতি উৎসাহও সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। এজন্য এ সমস্ত পরষ্পর বিপরীতমূখী বিষিয়গুলি বিদ্যমান থাকাবস্থায় সার্টিফিকেটের উপর (দৈহিক) কবজা করা ব্যতীরেকে অন্যের কাছে তা বিক্রি না করাটাই সাবধানতার দাবী।

শেয়ারের কিছু নাজায়েয ক্রয়-বিক্রয়

কিন্তু৩৪শেয়ারের এই কেনা-বেচাকে বৈধ বলা কঠিন হয়ে যায় ওই ধোকাবাজীর সময়, যা ‘ষ্টক-এক্সচেঞ্জে’র খুবই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একাট অংশ হয়ে রয়েছে, যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শেয়ারের লেনদেন করা একবারেই উদ্দেশ্য থাকে না, বরং শেষে গিয়ে পরষ্পরের মূল্য-পার্থক্যকে সমান সমান করে নেয়া হয়। এদিকে শেয়ারের না ‘কবজা’ সংঘটিত হয়, আর না কবজার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয়। সুতরাং, যেক্ষেত্রে এই অবস্থা হয় যে, ‘কবজা’ মোটেই হয় না, শেয়ার নেয়াও উদ্দেশ্য থাকে না, দেওয়াও উদ্দেশ্য থাকে না, বরং আসল উদ্দেশ্য থাকে এভাবে ধোকাবাজী করে পারষ্পরিক মূল্যপার্থক্যকে সমান সমান করে নেয়া, সেক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ হারাম। শরীয়তে এর অনুমতি নেই।

‘ষ্টক- এক্সচেঞ্জে’ শেয়ার কেনা-বেচার আরো একটি পদ্বতির প্রচলন রয়েছে, যাকে ‘বিনিময়’ বলা হয়ে থাকে। এটাও অথার্য়নের (Financing) একটি পন্থা। এর সুরত এই যে, একজনের টাকার দরকার এবং তার কাছে শেয়ার রয়েছে। সে শেয়ারটিকে অন্যের কাছে নিয়ে গিয়ে বলে যে, ‘আমি আজকে এই শেয়ারটি আপনার কাছে এত দামে বিক্রি করে দিচ্ছি এবং ১ সপ্তাহ পর আমি এর মূল্য বাড়িয়ে এত দামে আবারো কিনে নিবো’। অর্থাৎ, যেন বিক্রি করার সময়ই এ শর্ত লাগানো হয় যে, ‘শেয়ারটির মূল্য বাড়িয়ে ফেরত দিতে হবে। আপনি অন্য কারো কাছে এটা বিক্রি করতে পারবেন না’। প্রশ্ন হল, বিনিময়ের এই ধরনটি শরয়ী দৃষ্টিতে জায়েয কি-না? এর জবাব পরিষ্কার; এটা জায়েয নয়। এর কারন হল, ফিকাহ’র উসূল এই যে, কোনো বিক্রির মধ্যে এমন কোনো শর্ত লাগানো জায়েয নয়, যা ‘বিক্রয়-চুক্তির’ দাবীর পরিপন্থী। আর বিশেষ করে দাম বাড়িয়ে ফেরত নেয়ার শর্ত লাগানো হারাম। এরকম শর্ত ‘ফাসিদ’ (যা বিক্রয়চুক্তিকে বাতিল করে দেয়)। বস্তুতঃ বিনিময়ের এ ধরনটি খাঁটি সূদেরই অন্য একটি শ্রেণী। শরীয়তে এর অনুমতি নেই।

শেয়ারের উপর যাকাত

এখানে৩৫একটি বিষয় হল শেয়ারের উপর যাকাত দেওয়ার। প্রশ্ন হল, এসকল শেয়ারের উপর যাকাত ওয়াজীব হয় কিনা? যদি যাকাত ওয়াজীব হয়, তাহলে কিভাবে তার হিসাব করা হবে এবং কিভাবে আদায় করা হবে?

আমি প্রথমে আরোজ করে এসেছি যে, কোম্পানীর মধ্যে যে অংশটুকু রয়েছে, শেয়ার সেই অংশেরই প্রতিনিধীত্ব করে। সুতরাং, কেউ যদি কেবল এ উদ্দেশ্যে শেয়ার ক্রয় করে যে, আমি তা অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়ে এর মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করবো, অর্থাৎ, যদি Capital Gain (ক্যাপিটাল গেইন) করা উদ্দেশ্য হয়, এ সব শেয়ারের বাৎসরিক লভ্যাংশ উসূল করা উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে এমতাবস্থায় এসব শেয়ারের বাজার মূল্যের (Market Value) হিসাব অনুসারে এদের উপর যাকাত ওয়াজীব হবে।

কিন্তু শেয়ার কেনার সময় যদি Capital Gain করা তার উদ্দেশ্য না থেকে থাকে বরং মূল উদ্দেশ্য থাকে বাৎসরিক লভ্যাংশ (Dividend) অর্জন করা, সাথে এই খেয়ালও থাকে যে, যদি ভাল মুনাফা পাওয়া যায়, তাহলে তা বিক্রি করে দিবো, তাহলে সেক্ষেত্রে শেয়ারটির ‘বাজার মূল্যে’র ওই অংশের উপর যাকাত ওয়াজীব হবে, যা যাকাত যোগ্য সম্পদ সমূহের বিপরীতে বিদ্যমান রয়েছে। বিষয়টিকে একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝে নিন।
মনে করুন, শেয়ারের ‘বাজারমূল্য’ ১০০/- টাকা। এর মধ্যে ৬০/- টাকা বিল্ডিং মেশীনারীর বিপরীতে (যথাক্রমে ৩০/- টাকা, ৩০/- টাকা করে) এবং ৪০/- টাকা কাঁচামাল, প্রস্তুতকৃত মাল ও নগদ অর্থের বিপরীতে (যথাক্রমে ১০/-টাকা , ১৫/-টাকা এবং ১০/- টাকা করে) বিদ্যমান রয়েছে। এমতাবস্থায়, যেহেতু শেয়ারটির ৪০/- টাকা যাকাত যোগ্য সম্পদের বিপরীতে রয়েছে, তাই ২.৫% হিসেবে ৪০/- টাকার উপর যাকাত ওয়াজীব হবে; ৬০/-টাকার উপর যাকাত ওয়াজীব হবে না। নিম্নোক্ত ছকের সাহায্যে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে-

শেয়ারের বাজার মূল্য ১০০/- টাকা

[supsystic-tables id=3]

  
সার কথা

সারকথা হল, কেবলমাত্র ওই সমস্ত কোম্পানীর শেয়ারই ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে, যাদের বুনিয়াদী কারবার জায়েয এবং হালাল; আর তা ওই সমস্ত শর্তসাপেক্ষে জায়েয, যা উপরে উল্লেখ করা হল। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শরীয়তের বিধিবিধানের উপর আমল করার তৌফিক দান করুন; আমিন।

 

 

 


-:টিকা:- (এই ওয়েব পেজের টিকা)

১. ফিকহী মাকালাতঃ ১ম খন্ড / ১৪১-১৪২ পৃষ্ঠা
২. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৫৫, ৫৬ পৃষ্ঠা
৩. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৫৬ পৃষ্ঠা
৪. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাত- ৫৭, ৫৮ পৃষ্ঠা
৫. ফিকহী মাকালাতঃ ১ম খন্ড / ১৪৩ পৃষ্ঠা
৬. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৭০ পৃষ্ঠা
৭. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৫ পৃষ্ঠা
৮. ফিকহী মাকালাতঃ ১ম খন্ড / ১৪৪ পৃষ্ঠা
৯. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৭ পৃষ্ঠা
১০. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ৪৩ পৃষ্ঠা
১১. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৬ পৃষ্ঠা
১২. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৪৫ পৃষ্ঠা
১৩. ইসলাম আত্তর জাদীলে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৬ পৃষ্ঠা
১৪. ইসলাম আত্তর জাদীলে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৬ পৃষ্ঠা
১৫. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড /১৪৫ পৃষ্ঠা
১৬. ইসলাম আত্তর জাদীলে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৭
১৭. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫০ পৃষ্ঠা
১৮. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৮ পৃষ্ঠা
১৯. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫০ পৃষ্ঠা
২০. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫১ পৃষ্ঠা
২১. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৯ পৃষ্ঠা
২২. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৮৯, ৯০ পৃষ্ঠা
২৩. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫১ পৃষ্ঠা
২৪. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৯০ পৃষ্ঠা
২৫. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৪৩, ১৪৪
২৬. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫২ পৃষ্ঠা
২৭. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ২৯১ পৃষ্ঠা
২৮. ফিকহী মাকালাতঃ ২ খন্ড / ২০৪, ২০৫ পৃষ্ঠা
২৯. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ২৯২ পৃষ্ঠা
৩০. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫৩ পৃষ্ঠা
৩১. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৯১ পৃষ্ঠা
৩২. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫৩ পৃষ্ঠা
৩৩. ইসলাম আত্তর জাদীদে মাঈশাত ও তিজরাতঃ ৯২ পৃষ্ঠা
৩৪. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫৩, ১৫৪
৩৫. ফিকহী মাকালাতঃ ১ খন্ড / ১৫৫, ১৫৬ পৃষ্ঠা