মহানবী ﷺ-এর হিজরত ও ক্বিতাল/ সশস্ত্র জিহাদের সুচনা

মহানবী ﷺ-এর হিজরত এবং ক্বিতাল/ সশস্ত্র জিহাদের সুচনা হওয়ার সময় পরিবেশ পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট 

بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیۡمِ

الحمد لله و الصلاة و السلام على رسوله محمد و على أله و أمّته

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ مُحَمَّدٍ النبي الأمي عَدَدَ خَلْقِك وَ رِضَا نَفْسِك وَزِنَةَ عَرْشِك وَ مِدَادَ كَلِمَاتِك، صَلِّ عَليه صَلاَةً كَامِلَةً دَائِمَةً كَمَا يَنْبَغِي أَنْ يُصَلَّى عَلَيهِ وَ سَلِّمْ تَسلِيمَاً بِقَدرِ عَظَمَةِ ذَاتِكَ فِى كُلِّ وَقتٍ وَ حِين، صلاة تكون لك رضاء و له جزاء، صلاة لا غاية لها ولا منتهى ولا انقضاء باقية ببقائك الى يوم الدين ، و اعطه الوسيلة و الفضيلة و المقام المحمود الذي وعدته، و اجزه عنا ما هو اهله، و على اله وأصحابه و أزواجه و ذريته و أهل بيته و سلم تسليما مثل ذلك، اَللّٰهُمَّ اجمعني معه في الفردوس و جنة المأوى، اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَليٰ مُحَمَّدٍ صَلوٰةً تُنَجِّيْنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْأَهْوَالِ وَاْلآفَاتِ وَتَقْضِيْ لَنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ الْحَاجَاتِ وَتُطَهِّرُنَا بِهَا مِنْ جَمِيْعِ السَّيِّاٰتِ وَتَرْفَعُنَا بِهَا عِنْدَكَ اَعْليٰ الدَّرَجَاتِ وَتُبَلِّغُنَا بِهَا اَقْصىٰ الْغَايَاتِ مِنْ جَمِيْعِ الْخَيْرَاتِ فِي الْحَيَاتِ وَبَعْدَ الْمَمَاتِ- اِنَّكَ عَليٰ كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٍ بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ


>>> মূল সূচিপত্র (index) থেকে এ পেজের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী আলোচনা পড়তে [এখানে ক্লিক করুন


 
পূর্ব আলোচনার পর…

 

বিশ্বনবী মুহাম্মাদ মুস্তফা ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণের হিজরত এবং মক্কার পরিবেশ পরিস্থিতি ও আয়াত সমূহ নাজিলের প্রেক্ষাপট

…তবে, মুসলমানদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন, যারা মক্কার কাফের মুশরেকদের এসব অবর্ণনীয় জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে এসব জালেম কাফেলদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি প্রার্থনা পর্যন্ত করেছিলেন। যেমন, ইকরিমাহ রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. বর্ণনা করেন- أَنَّ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ ، وَأَصْحَابًا ، لَهُ أَتَوَا النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَكَّةَ فَقَالُوا : يَا نَبِيَّ اللَّهِ ، إِنَّا كُنَّا فِي عَزٍّ وَنَحْنُ مُشْرِكُونَ ، فَلَمَّا آمَنَّا صِرْنَا أَذِلَّةً ، فَقَالَ : إِنِّي أُمِرْتُ بِالْعَفْوِ ، فَلَا تُقَاتِلُوا الْقَوْمَ . رواه النسائي في السنن الكبرى , كتاب التفسير , قوله تعالى : ألم تر إلى الذين قيل لهم كفوا أيديكم : ١٠/٦٨ رقم ١١٠٤٧، و في السنن الصغرى , كتاب الجهاد , باب وجوب الجهاد : ٣/٦ رقم ٣٠٨٦ ، قال مقبل بن هادي الوادعي في الجامع الصحيح مما ليس في الصحيحين : ٥/٤٦٠ : هذا حديث صحيح رجاله رجال الصحيح، و قال الألباني في صحيح النسائي : رقم: ٣٠٨٦ : إسناده صحيح ، و الحاكم في المستدرك على الصحيحين , كتاب الجهاد : ٢/٣٨٢ رقم ٢٤٢٤ و قال: هذا حديث صحيح على شرط البخاري و لم يخرجاه و وافقه الذهبي، و قال كمال بسيوني زغلول الناشر في تحقيقه علي أسباب نزول القرآن : ١/١٦٧: إسناده صحيح  – “(একবার) মক্কায় (থাকাবস্থায়) আব্দুর রহমান বিন আউফ তার কিছু সঙ্গিসাথি সহ নবী ﷺ-এর কাছে এসে বললেন: ‘আল্লাহ’র নবী! আমরা (জাহেলিয়াতের জামানায়) মুশরিক অবস্থায় ইজ্জত সম্মানের সাথে ছিলাম। আর আমরা যখন (থেকে আপনার উপরে) ইমান এনেছি তখন (থেকেই এসব কাফের মুশরেকদের হাতে) জিল্লত-অপদস্ততার শীকার হয়ে পড়েছি’। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: ‘আমাকে ক্ষমা করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট হুকুম না আসা পর্যন্ত) তোমরা (তোমাদের) কওমের সাথে কিতাল (সশস্ত্র যুদ্ধ) করো না”। [সুনানুল কুবরা, ইমাম নাসায়ী- ১০/৬৮ হাদিস ১১০৪৭; সুনানুস সুগরা, ইমাম নাসায়ী- ৬/৩ হাদিস ৩০৮৬; মুসতাদরাকে হাকিম- ২/৩৮৩ হাদিস ২৪২৪; সুনানুল কুবরা, ইমাম বাইহাকী- ৯/১৯ হাদিস ১৭৭৪১; জামেউল বয়ান, ইমাম তাবারী- ৫/২৩৪]
 
সুতরাং, তখনও পর্যন্ত মক্কার মুসলশানদের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে আল্লাহ তাআলা’র পক্ষ থেকে সশস্ত্র যুদ্ধ জিহাদের কোনো অনুমতি আসেনি। তখনকার জন্য মক্কার মুসলমানদের জন্য মস্তবড় জিহাদ ছিল মক্কার কাফের মুশরিকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও আল্লাহ’র বানী পৌছে দেয়া এবং এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে বিপদ আসে তার উপরে সবর (ধৈর্যধারণ) করা এবং কাফেরদের অন্যায় জুলুম অত্যাচারগুলোকে আল্লাহ’র ওয়াস্তে ক্ষমা করতে থাকা। যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন-
 
فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا
“সুতরাং, (হে নবী মুহাম্মাদ!) তুমি কাফেরদের অনুগত্য করো না এবং তাদের সাথে এ(ই কুরআনে)র দ্বারা জিহাদ করো -বিশাল (এক) জিহাদ”[সূরা ফুরকান ৫২]
 
قُل لِّلَّذِينَ آمَنُوا يَغْفِرُوا لِلَّذِينَ لَا يَرْجُونَ أَيَّامَ اللَّهِ لِيَجْزِيَ قَوْمًا بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
 “যারা ইমান এনেছে -(হে নবী! তুমি তাদের)- বলে দাও, তারা (যেন) ওদেরকে ক্ষমা করে দেয় যারা আল্লাহ’র দিনগুলোর আকাঙ্খা রাখে না, যাতে তিঁনি প্রত্যেক গোষ্ঠিকে তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল দিতে পারেন”[সূরা জাশিয়াহ ১৪]
 
এধারার এক পার্যয়ে যখন মক্কার মুসলমানগণের উপরে কাফের মুশরেকদের জুলুম নির্যাতন এতটা চরম মাত্রায় গিয়ে পৌঁছে যে, মক্কায় ইসলাম নিয়ে জীবনযাপন করা তাদের জন্য অত্যন্ত অনিরাপদঅসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে ঠেঁকে, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তাআলা’র অনুমতিক্রমে ওই সকল মজলুম নির্যাতিত মুসলমানদেরকে মক্কা থেকে হিজরত করে অন্যত্র নিরাপদ কোথাও চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ ছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে ফরয নির্দেশ।
 
ফলে নবুওতের ৫ম বৎসরের রজব মাসে সাহাবাগণের প্রায় পনের-ষোল জনের একটি জামাআত হাবশা’য় (বর্তমান ইথিওপিয়া’য়) হিজরতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এখবর জানাজানি হলে মক্কার মুশরেকরা মুসলমানদের উপরে নজরদারী ও জুলুম অত্যাচার আরো বারিয়ে দেয়। ফলে আরো প্রায় এক’শ জনের মতো মুসলমান মক্কা থেকে হিজরত করে হাবশায় যেতে সমর্থ হন। [সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/১১১; উয়ূনুল আছার, ইবনু সায়্যিদিন নাস- ১/১১৫] যুহরী রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ওরওয়া রহ. বর্ণনা করেন- فَلَمَّا كَثُرَ الْمُسْلِمُونَ ، وَظَهَرَ الْإِيمَانُ فَتَحَدَّثَ بِهِ الْمُشْرِكُونَ مِنْ كُفَّارِ قُرَيْشٍ بِمَنْ آمَنَ مِنْ قَبَائِلِهِمْ يُعَذِّبُونَهُمْ وَيَسْجِنُونَهُمْ ، وَأَرَادُوا فِتْنَتَهُمْ عَنْ دِينَهُمْ قَالَ : فَبَلَغَنَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِهِ : تَفَرَّقُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا : فَأَيْنَ نَذْهَبُ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : هَاهُنَا وَأَشَارَ بِيَدِهِ إِلَى أَرْضِ الْحَبَشَةِ وَكَانَتْ أَحَبُّ الْأَرْضِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُهَاجَرُ قِبَلَهَا فَهَاجَرَ نَاسٌ ذُو عَدَدٍ مِنْهُمْ مَنْ هَاجَرَ بِأَهْلِهِ ، وَمِنْهُمْ مَنْ هَاجَرَ بِنَفْسِهِ حَتَّى قَدِمُوا أَرْضَ الْحَبَشَةِ . اخرجه عبد الرزاق في مصنفه : ٥/٣٨٤ رقم ٩٧٤٣، اسناده مرسل – “(মক্কায়) যখন মুসলমানরা সংখ্যায় অনেক হয়ে গেল এবং (লোকসম্মুখে তাদের) ইমান প্রকাশ পেতে থাকলো, তখন কুরায়েশ কাফেরদের মধ্যে মুশরেকরা -তাদের কবিলাহ গুলোর মধ্য থেকে যাঁরা (রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপরে) ইমান আনছিলো- তাঁদের ব্যাপারে তারা আলোচনা করলো (যে, এই পরিস্থিতিকে কিভাবে সামাল দেয়া যায়)। (সে সময় মূলত:) তারা মুসলমানদেরকে (দমানোর জন্য নানান কায়দায়) নির্যাতন চালাতো ও শিকলে বেঁধে রাখতো। ওদের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমানদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনায় নিপতিত করা, (যাতে তারা দ্বীন ইসলামকে ছেড়ে দেয়)’। তিনি বলেন: ‘আমাদের কাছে খবর পৌছেছে যে, যারা (সে সময় মক্কায়) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ইমান এনেছিলেন, তিঁনি তাদেরকে বললেন: ‘তোমরা (এখান থেকে হিজরাত করে) পৃথিবীর বিভিন্ন (নিরাপদ) স্থানে চলে যাও’। তারা জিজ্ঞেস করলেন: ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা যাবোটা কোথায়’? তিনি বললেন: ‘ওই দিকে’ -একথা বলে তিনি তাঁর হাত দিয়ে হাবশাহ’র দিকে ইশারা করলেন’। বস্তুত: (সে সময়) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে ওটাই ছিল হিজরত করার সবথেকে পছন্দস্ই (নিরাপদ) ভূমি। ফলে তাদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক ব্যাক্তি হিজরত করেন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ তার পরিবার সহ হিজরত করেন, আবার কেউ কেউ হিজরত করেন একাই। এভাবে এক সময় তাঁরা হাবশাহ’য় গিয়ে পৌছেন”। [আল-মুসান্নাফ, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক– ৫/৩৮৪ আছার ৯৭৪৩; উয়ূনুল আছার, ইবনু সায়্যিদিন নাস- ১/১১৫; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৮/৩৯]
 
হাবশায় হিজরত করেও মুসলমানরা মক্কার কাফেরদের থেকে নিশ্চিন্তে শান্তিতে থাকতে পারলো না। কারণ, মক্কার কাফের মুশরেকরা দ্বীন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষঢ়যন্ত্র করার ক্ষেত্রে এতটাই মড়িয়া হয়ে উঠেছিল যে, হাবশায় চলে যাওয়া মুসলমানদেরকে তারা এই বলে ছেড়ে দিতে চাইলো না যে- ‘ওরা আমাদের মক্কা ছেড়ে চলে গেছে, তো যাক গে’, বরং তারা হাবশাহ’য় অবস্থানরত সকল মুসলমানকে পূণরায় মক্কায় ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের গণ্যমান্য লোকদেরকে সেখানকার খৃষ্টান সম্রাটের কাছে পাঠালো। কিন্তু তাদের পাঠানো দলটি হাবশাহ’র তৎকালীন সম্রাট নাজ্জাশী’র কাছ থেকে তার রাজ্যে আশ্রয় নেয়া মুসলমানদেরকে ফিরিয়ে আনতে পূর্ণরূপে ব্যার্থ হয়। [মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৬/৩০; সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/১১৫; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,, ইবনে কাছির- ৩/৭৫]
 
এ ব্যার্থতার পর এই জালেম মুশরিকরা মক্কায় বিদ্যমান মুসলমানদের উপরে অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে মক্কার কুরাইশী নেতা ও গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের মধ্যে -ইসলামে শুরুর দিকে আবু বকর সিদ্দিক রা ও ওসমান বিন আফফান রা, তার কিছুদিন পর বিশেষ করে হযরত হামযা রা. এবং তারও পরে (নবুওতের ৬ষ্ঠ বছরে) হযরত ওমর রা. প্রমুখ একে একে ইসলাম গ্রহন করতে থাকায় এবং দিনকে দিন মুসলমানদের সংখ্যা অচিন্তনীয় ভাবে বাড়ে চলতে থাকায় মক্কার কাফের সর্দার’দের টনক ভাল করেই নড়েচড়ে ওঠে। তারা বেশ ভালো করেই উপলব্ধি করতে থাকে যে, এবারে ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা ছাড়া তাদের ‘বাপদাদা পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যমাখা (শিরকী) দ্বীন’ রক্ষা করাই অনতিদূরে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য মক্কার বিভিন্ন গোত্রের প্রভাবশালী সর্দার, নেতা ও গণ্যমান্যরা একত্রে সিদ্ধান্ত নেয় যে, মুসলমানরা তাদের দ্বীন ইসলাম থেকে পূণরায় তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের সকলকে সম্ভাব্য সর্বদিক দিয়ে বয়কট করা হবে, তাদের সাথে মক্কার কেউ দেখাসাক্ষাত করতে পারবে না, তাদেরকে কোনো রকম খাবার পানীয়ও সরবরাহ করতে পারবে না ইত্যাদি। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তারা ‘নবুওতের ৭ম বৎসরের মুহাররম মাস’ থেকে মক্কায় অবস্থানরত মুসলমানদেরকে সামাজিক ভাবে বয়কট করে “শে’বে আবু তালেব” এলাকায় অবরুদ্ধ জীবনযাপনে বাধ্য করে রাখে। সেসময় কষ্টের মাত্রা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেঁকেছিল যে, মুসলমানদের কেউ কেউ দুই-তিন দিন পর মুখে কিছু দেয়ার সুযোগ পেতো, এমনকি তারা বাবলা গাছের পাতা খেয়ে কোনো মতে জীবন ধারণের চেষ্টা করেছেন, ক্ষুধার যন্ত্রনায় বাচ্চাদের ক্রন্দনের রোল পড়ে যেতো। কেউ কেউ খুবই গোপনে গোপনে তাদের কারোর কারোর কাছে খাবার দাবার সরবরাহ করতো, ওগুলোই যে যতটুকু পারতো খেয়ে কোনো রকমে জীবন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতো। এধারা সুদীর্ঘ তিন বছরের মতো চলার পর তথা নবুওতের ৯ম বছর পূর্ণ  হওয়ার আগেই মুসলমানরা ওই বয়কট থেকে মুক্তি লাভ করে। [আত-ত্ববাকাত, ইবনে সাদ- ১/১৩৯; সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/১২২; যাদুল মাআদ, ইবনুল কাইয়্যেম- ২/৩৬; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৭/১৪৭; উয়ূনুল আছার, ইবনু সায়্যিদিন নাস- ১/১১৫; তারিখে তাবারী- ২/২২৯]
 
শে’বে আবু তালেব”-এর ৩ বছরের শ্বাসরুদ্ধ অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি লাভের পর ‘নবুওতের ১০ম বৎসরের’- প্রথম থেকেই মুসলমানদের উপরে কাফেরদের নজরদারী আরো বেড়ে যায়, যাতে আর নতুন কেউ ইসলাম কবুল করতে না পারে এবং যাতে পুরাতন মুসলমানরাও কোনঠাসা হয়ে থাকে। কিন্তু মুসলমারা যতটা সম্ভব নিজেদের ইসলামকে গোপনে গোপনে মেনে চলা এবং গোপনে গোপনে দ্বীনের প্রচার প্রসারের কাজ চালাতে থাকে। কিন্তু কোনো না কোনো ভাবে এইসবক বিষয় আর গোপন হয়ে থাকে না, বরং ঠিকই তা কাফের সর্দারদের কানে যেতে থাকে। তখন কাফেররা উপলব্ধি করতে থাকে যে, এত জুলুম নির্যাতন চালানোর পরও ইসলাম ও মুসলমানদের প্রসারের গতি কোনো ভাবে রুদ্ধ করাতো দূরের কথা, বরং দিনকে দিন মুসলমানদের সংখ্যা শঙ্কাজনক ভাবে বেড়েই চলেছে, পাছে না তাদের নিজেদের সর্দারগীরী ও বাপ-দাদা-পূর্বপুরুষদের ধর্মই মক্কায় হুমকির ‍মুখে পড়ে!!! এরপর ‘নবুওতের ১০ম বৎসরের রমজান অথবা শাওয়াল মাস’-এর মধ্যেই যখন মক্কার কুরায়েশ গোত্রের মান্যবর ব্যাক্তিত্ব ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা আবু ত্বালেব এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ স্ত্রী খাদিজাহ রা. মৃত্যুবরন করেন, যার কারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপরে থেকে গোত্রিয় দিক থেকে সাপোর্ট করার মতো বাহ্যত: আর কেউ অবশিষ্ট না থাকায় মক্কার কাফেররা এবারে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তাঁর প্রচারিত দ্বীন ইসলাম সহ সমূলে রুদ্ধ করে দেয়ার মতো একটি যুৎসই মওকা হাতে পেয়ে যায়।
 
এর দু মাস পর তথা নবুওতের ১০ম বৎসরের জ্বিলহজ্জ মাসে হজ্জের মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে আগতদের কাছে মুসলমানরা দ্বীন ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। ফলে মদিনা থেকে আগত খাযরায গোত্রের কিছু ব্যাক্তি সেখানে ইসলাম কবুল করেন। এ বছরই আরো কিছু যুবক মদিনা থেকে এসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে ইসলাম কবুল করে পূণরায় মদিনায় ফিরে যান। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাছির- ৩/১৪৩; রাউযুল উনফ- ১/৪৬৪; উসদুল গাবাহ- ৪/৪০৯; আল ইসাবাহ- ১/৯১; মাজমাউয যাওয়ায়ীদ, হাইছামী- ৬/৩৬০] এরপর নবুওতের ১১তম বছরে হজ্জের মৌসুমে মদিনার ৬ জন ব্যাক্তি ইসলাম কবুল করেন এবং মদিনায় ফিরে গিয়ে সেখানে প্রতিটি ঘরে ঘরে মজলিশে মজলিশে ব্যাপক ভাবে ইসলামের দাওয়াত পৌছাতে থাকেন। [সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/৫০; যুরকানী- ১/৩১১; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাছির- ৩/১৪৮] এরপর নবুওতের ১২তম বছরে হজ্জের সময় মক্কায় অবস্থিত মিনা’র আক্বাবাহ নামাক স্থানে মদিনার ১২ জন ব্যাক্তি (যাদের মধ্যে ৫ জন গত বছরে হজ্জের সময় ইসলাম কবুল করেছিলেন) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে বায়াত হন, (যেটাকে ‘আক্বাবাহ’র ১ম বায়াত বলে অবিহিত করা হয়ে থাকে)। তাঁরা মদিনায় ফিরে গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের মাঝে ব্যাপক ভাবে ইসলামের দাওয়াত পৌছাতে থাকেন। [সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/৫০; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাছির- ৩/১৪৮] এরপর নবুওতের ১৩তম বছরে মদিনার প্রায় ৯০ জনের একটি জামাআত মক্কায় এসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে বায়াত হন, (যেটাকে ‘আক্বাবাহ’র ২য় বায়াত বলে অবিহিত করা হয়ে থাকে)। [তালকীহ, ইবনুল জাওযী- ১/২১৫]
 
এভাবে নবুওতের ১১তম, ১২ তম এবং ১৩তম বছরে’র মধ্যে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলাম কবুলের ধারা অব্যাহত থাকে এবং সেখানে দিনকে দিন মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। এক পর্যায়ে মদিনা ভূমিটি মুসলমানদের জন্য একটি ‘দারুল আমান’ (নিরাপদ বাসস্থান)-এ পরিণত হয়ে যায়। সেখানে শুত্রবার করে মুসলমানদের জুমআর জামাআত অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এরই মধ্যে একসময় মদিনার মুসলমানগণ চিন্তা করেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ আর কতদিন এভাবে ভীত পরিশ্রান্ত হয়ে মক্কায় ঘোরফেরা করবেন, তার চাইতে বরং তাঁকে মদিনায় নিয়ে আসা যায় কিনা। এ উদ্দেশ্যে মদিনার মুসলমানদের প্রায় ৭০ জনের একটি জামাআত মক্কায় আসেন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে বায়াত হন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে নসিহত করেন যে, মক্কার মুসলমানগণ যদি কখনো মদিনায় যায় তাহলে তারা যেন তাদেরকে নিজেদের পরিবার পরিজনের মতোই দেখভাল করে। পরে ভোর হবার আগেই তারা মক্কা থেকে প্রস্থান করেন। সকাল হতেই মক্কার কাফেররা যখন এ খবর জানতে পরলো, তখন তাদের কেউ কেউ মদিনার দিকে গমনকারী মুসলমানদের পিছু ধাওয়া করার জন্য রওনা হয়, কিন্তু ততক্ষনে ওইসকল মুসলমানগণ নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় সেবারের মতো তাদেরকে আর ধরা সম্ভব হল না। তারা শুধুমাত্র সা’দ ইবনে উবাদাহ রা.-কে ধরতে সমর্থ হয় এবং তাকে তারা বেদম প্রহার করে। পরে যুবায়েল ইবনে মুতইম রা. এসে তাকে কাফেরদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। [সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/১৫৬; আত-ত্ববাকাত, ইবনে সাদ- ১/১৫০; রাউযুল উনফ- ১/২৭৭; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাছির- ৩/১৫৯;  যুরকানী- ১/৩১৭]
 
বলাই বাহুল্য, এ অবস্থার পর মক্কায় মুসলমানদের জীবন অনেক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়, এরই মধ্যে রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হিজরতের ইশারা পেয়ে মক্কা’র মুসলমানদেরকে মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেন। [যুরকানী- ১/৩১৮; সিরাতুল মুস্তফা, ইদ্রিস কান্দলভী- ১/৩৫১-৩৫৬] হিজরতের অনুমতি পাওয়ার পর মক্কার মুসলমানগণ একে একে যে যখন যেভাবে সুযোগ পেয়েছেন, তিনিই মদিনায় হিজরত করে চলে যেতে থাকেন। মদিনার পানে হিজরতের এধারা চলতেই থাকে। মক্কার অবস্থা তখন এমন হয় যে, কিছু সংখ্যক মুসলমান কাফেরদের কবজায় আটোক অবস্থায় থাকে এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে শুধুমাত্র আবু বকর সিদ্দিক রা. এবং আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-ই রয়ে যান। [সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/১৬৩] কাফেররা যখন দেখতে পেল যে, মুসলমানরা গোপনে গোপনে মক্কা ছেড়ে মদিনায় গিয়ে বিরাট এক জামাআতে পরিণত হচ্ছে এবং এভাবে তাদের সংখ্যা বাড়তে দিলে একসময় মদিনার মুসলমানরাই মক্কার উপরে প্রভাব বিস্তার করে ফেলবে, তখন বিশেষ করে কুরায়েশ নেতারা মক্কার ‘দারুন নাদওয়া’তে একত্রিত হয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ‘যেহেতু মুহাম্মাদ (ﷺ)ও এখানে তার রয়ে যাওয়া কয়েকজন সাথিকে সঙ্গে নিয়ে যে কোনো সুযোগে মদিনায় হিজরত করে চলে যেতে পারে, তাই এটাই সুবর্ণ সুযোগ যে, খোদ্ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কেই হত্যা করে ফেলা হোক, এতে করে ইসলামের শিকড়ই উপড়ে যাবে। আরো সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, মক্কার সকল গোত্রের একজন করে প্রতিনিধি একেত্রে মিলে তাকে হত্যা করবে, যাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কুরাইশী গোত্র ‘বনী আব্দে মানাফ’ কখনো এর প্রতিশোধ নিতে চাইলে এতগুলো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোনো সাহস কখনো না দেখাতে পারে। সিদ্ধান্ত হয়, ওই রাত্রেই মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলা একথা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেন। ফলে তিঁনি ওই দিনই দুপুরে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-কে নিয়ে মদিনায় হিজরত করার পরিকল্পনা নকশা ঠিক করেন। [আত-ত্ববাকাত, ইবনে সা’দ- ১/১৫২; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৭/১৮৩; উয়ূনুল আছার, ইবনু সায়্যিদিন নাস- ১/১৭৭; খাসায়েসুল কুবরা, ইমাম সুয়ূতী- ১/১৮৫ সিরাতুল মুস্তফা, ইদ্রিস কান্দালভী- ১/৩৫১-৩৬০]
 
আল্লাহ তাআলা  এরশাদ করেন-
وَ إِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ ۚ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ ۖ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
 “আর (হে নবী! স্মরণ করো) যখন কাফেররা তোমাকে -(হয়) বন্দিকরা, নাহয় কতল করা অথবা (দেশ থেকে) তোমাকে বের করে দেয়ার উদ্দেশ্যে তোমার বিরুদ্ধে ষঢ়যন্ত্র করছিল। তারা (তোমার বিরুদ্ধে বদ) কৌশল আঁটছিল, আর (এদিকে) আল্লাহ কৌশল করছিলেন (তোমাকে তাদের ষঢ়যন্ত্র থেকে নিরাপদ রাখার)। আর আল্লাহ হলেন কৌশলকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (কৌশলকারী)”[সূরা আনফাল ৩০]
 
আল্লাহ তাআলা’র পক্ষ থেকে ওহী সূত্রে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ মুস্তফা ﷺ-এর কাছে কাফেরদের এসব চক্রান্ত ও ষঢ়যন্ত্রের খবর এবং ওই রাতেই মক্কা ছেড়ে মদিনার পানে হিজরত করে চলে যাওয়ার নির্দেশ আসার পর, নবীজি ﷺ ওই রাতেই নিজের ঘরে চাচাতো ভাই হযরত আলী বিন আবি ত্বালেব রা.-কে অভয় দিয়ে এবং কিছু আমানত তার প্রাপকদের কাছে পৌছে দেয়ার জন্য তাকে দায়িত্ব দিয়ে হিজরতের নিয়তে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। এসময় কাফেররা তাদের পরিকল্পনা মতো ওই রাতেই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাড়ির চারি দিক ঘিরে রাখে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা নিজ কুদরতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কাফেরদের চোখ ও কবজা থেকে বাঁচিয়ে নেন, ফলে রাসুলুল্লাহ ﷺ কাফেলদের চোখে ধুলো দিয়ে সোজা তাঁর প্রিয় সাহাবী হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর বাড়িতে গিয়ে তাকে সহ ওই রাতেই মদিনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে দুজনে সাওর নামক গুহায় তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত আত্বগোপন করে থাকতে বাধ্য হন। কাফেররা সেখানেও তাঁদের দুজনকে খুঁজতে ভুলেনি, কিন্তু আল্লাহ তাআলা নিজ কুদরতে সেখানেও তাঁদের দুজনকে কাফেরদের চোখ ও কবজা থেকে বাঁচিয়ে নেন। ফলে তিন দিন পর গুহা থেকে বের হয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তাহক্বিকপূর্ণ মতানুসারে, আক্বাবা’র বায়াত-এর প্রায় তিন মাস পর পয়লা রবিউল আইয়াল সোমবার গুহা থেকে বের হয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর সিদ্দিক রা. একসঙ্গে মদিনার পানে রওয়ানা দেন। [আত-ত্ববাকাত, ইবনে সা’দ- ১/১৫৪; সিরাতে ইবনে হিশাম- ১/১৭২; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৭/১৮৪-১৮৮; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাছির- ৩/১৮৪; উয়ূনুল আছার, ইবনু সায়্যিদিন নাস- ১/১৭৯; যুরকানী- ১/৩২৫] 
 
কিতাল (সশস্ত্র জিহাদ) -এর প্রথম অনুমতি সহ কুরআনের আয়াত নাজিল হওয়া 
 
সাঈদ বিন যুবায়ের-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন- لَمَّا أُخْرِجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ مَكَّةَ قَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَخْرَجُوا نَبِيَّهُمْ إِنَّا لِلَّهِ، وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ لَيُهْلَكُنَّ، فَنَزَلَتْ {أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ} . فَعَرَفْتُ أَنَّهُ سَيَكُونُ قِتَالٌ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: فَهِيَ أَوَّلُ آيَةٍ نَزَلَتْ فِي الْقِتَالِ . رواه النسائي في السنن الكبرى , كتاب الجهاد , وجوب الجهاد: ٥/٢٨١ رقم ٤٤٨٧ و في كتاب التفسير , سورة الحج , قوله تعالى أذن للذين يقاتلون بأنهم ظلموا: ١١/٢٣٦ رقم ١١٤٥٧، و في السنن الصغرى , كتاب الجهاد , باب وجوب الجهاد : ٢/٦ رقم ٣٠٨٥ ، و قال الألباني في صحيح النسائي : رقم: ٣٠٨٥ : إسناده صحيح ، و الحاكم في المستدرك على الصحيحين , كتاب الجهاد : ٢/٦٢٦ رقم ٣٠٢٢ و قال: هذا حديث صحيح على شرط الشيخين فقد حدثه غير أبي حذيفة و لم يخرجاه و وافقه الذهبي، و البزار في البحر الزخار: ١/١٩٤ إسناده حسن، و الترمذي : رقم ٣١٧١، و أحمد في مسنده: ١/٢١٦ رقم ١٨٦٥ و قال شعيب الارنؤوط : إسناده صحيح على شرط الشيخين – “(মক্কার কাফের মুশরেকরা) যখন নবী ﷺ-কে (তাঁর জন্মভূমি) মক্কা থেকে বের করে দিলো, তখন আবু বকর রা. বলেন: ‘ওরা তাদের নবীকে (তার জন্মভূমি থেকে) বের করে দিলো! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাযিউন। ওদের ধ্বংস অনিবার্য’। এরপরেই নাজিল হয়- أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ  – ‘((তোমাদের মুসলমানদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে) ক্বিতাল (যুদ্ধ) করা হচ্ছে, তাদেরকে (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে ক্বিতাল/যুদ্ধ চালানোর) অনুমতি দেয়া হল। তা এজন্য যে, তারা  (কাফেরদের দ্বারা) নির্যাতিত হচ্ছে। আর নিশ্চই আল্লাহ (তাআলা) তাদেরকে সাহায্য করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান))’। তখন আমার বুঝে আসলো, অচিরেই (মক্কার মুশরেকদের সাথে আমাদের মুসলমানদের) ক্বিতাল (সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হবে)’। (আব্দুল্লাহ) ইবনে আব্বাস বলেন: ‘ক্বিতাল সম্পর্কে নাজিল হওয়া এটিই প্রথম আয়াত”[সুনানুল কুবরা, ইমাম নাসায়ী- ৫/২৮১ হাদিস ৪৪৮৭, ১১/২৩৬ হাদিস ১১৪৫৭; সুনানুস সুগরা, ইমাম নাসায়ী- ২/৬ হাদিস ৩০৮৫; সহিহ ইবনে হিব্বান-৮/১১ হাদিস ৪৭১০; মুসনাদে আহমদ– ১/২১৬ হাদিস ১৮৬৫; সুনানে তিরমিযী- ৮/৩১৬ হাদিস ৩১৭১; মুসতাদরাকে হাকিম– ২/৬২৬ হাদিস ৩০২২; আল-মু’জামুল কাবীর, ইমাম ত্বাবরাণী- ১৬/১২ হাদিস ১২৩৩৬; মুসনাদে বাযযার- ১/১৯৪; জামেউল বায়ান, ইমাম ত্বাবারী- ১৭/১২৩; সুনানুল কুবরা, ইমাম বাইহাকী- ৯/১১]
 
 ইউনুস রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যুহরী রহ. বর্ণনা করেন- فَكَانَ أَوَّلَ آيَةٍ نَزَلَتْ فِي الْقِتَالِ كَمَا أَخْبَرَنِي عُرْوَةُ، عَنْ عَائِشَةَ: {أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ} إِلَى قَوْلِهِ {إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ} ، ثُمَّ أَذِنَ بِالْقِتَالِ فِي آيٍ كَثِيرٍ مِنَ الْقُرْآنِ . رواه النسائي في السنن الكبرى , كتاب التفسير , سورة الحج , قوله تعالى أذن للذين يقاتلون بأنهم ظلموا: ١١/٢٣٧ رقم ١١٤٥٧، قال ابن حجر في فتح الباري , كتاب المغازي برقم ٣٩٤٩ : ٧/٩ : إسناده صحيح – “(উম্মুল মু’মিনীন) আয়েশা’র কাছ থেকে (শুনে) উরওয়াহ আমার কাছে বর্ণনা করেছে যে, ক্বিতাল সম্পর্কে যে আয়াতটি সর্বপ্রথম নাজিল হয় সেটা হল- أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ  – ‘((তোমাদের মুসলমানদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে) ক্বিতাল (যুদ্ধ) করা হচ্ছে, তাদেরকে (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে ক্বিতাল/যুদ্ধ চালানোর) অনুমতি দেয়া হল। তা এজন্য যে, তারা  (কাফেরদের দ্বারা) নির্যাতিত হচ্ছে। আর নিশ্চই আল্লাহ (তাআলা) তাদেরকে সাহায্য করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান))’ থেকে- إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ – ‘((নিশ্চই আল্লাহ অবশ্যই মহা শক্তিমান, মহা পরাক্রমশালী))’ পর্যন্ত। এরপর কুরআনের আরো বহু স্থানে ক্বিতালের অনুমতি দেয়া হয়েছে”[সুনানুল কুবরা, ইমাম নাসায়ী-  ১১/২৩৭ হাদিস ১১৪৫৮; ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার- ৭/৯, কিতাবুল মাগাজী]
 
উপরের এই হাদিস দুটি সম্পূর্ণ সহিহ সনদে বর্ণিত। হাদিস দুটি একথার সুস্পষ্ট দলিল হয় যে- (ক) সুরা হজ্জের ৩৯ এবং ৪০ নয় আয়াত দুটি ক্বিতাল (সশস্ত্র জিহাদ)-এর অনুমতি বিষয়ক নাজিল হওয়া কুরআনের সর্বপ্রথম আয়াত। আর (খ) রাসুলুল্লাহ ﷺ হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হওয়ার পর কোনো এক সময় এই আয়াতটি নাজিল হয়; হিজরতের আগে নয়। আর বিষয়টি এজন্য আরো জোরালো যে, ১ম হাদিসটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একমাত্র হিজরত সঙ্গি ও সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবী হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর নিজের চাক্ষুস বর্ণনা, আর ২য় হাদিসটি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর প্রিয় কন্যা উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রা.-এর বর্ণনা, যা তিঁনি অবশ্যই তার পিতার সূত্রেই জেনে বর্ণনা করে থাকবেন। ‘ক্বিতাল (সশস্ত্র জিহাদ) বিষয়ক নাজিল হওয়া আয়াতসমূহের মধ্যে এই আয়াতটি যে সর্বপ্রথমে নাজিল হয়েছে’ সে মর্মে ইমাম মুজাহিদ, ইবনে যায়েদ, ক্বাতাদাহ, যাহহাক, উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের, আ’মাশ, মুক্বাতিল বিন হাইয়্যান রহ. প্রমুখ থেকেও একই মত বর্ণিত হয়েছে। [জামেউল বায়ান, ইমাম ত্বাবারী- ১৭/১২৩; তাফসীরে ইমাম ছাউরী- ১/২১৪ আছার ৬৯০; তাফসিরে ইবনে কাসির- ৫/৪৩৩; আল-হাউয়ীউল কাবীর, ইমাম সুয়ূতী- ১/২৮৮] নিচে সুরা হজ্জের ৩৯ এবং ৪০ নং আয়াতের সাথে ৪১ নং আয়াতটিরও তরজমা পেশ করে দিলাম, যাতে বোঝা যায় যে, জিহাদের অনুমতির সাথে জমিনে খিলাফত ব্যবস্থার কতটা নিবিড় সম্পর্ক যে, আয়াত তিনটিতে এই দুটি বিষয়কে একই বন্ধনে রাখা হয়েছে।
 
  أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ – الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيَارِهِم بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَن يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ ۗ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا ۗ وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ – الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ ۗ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ  
“‘(৩৯) (তোমাদের মুসলমানদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে) ক্বিতাল (যুদ্ধ) করা হচ্ছে, তাদেরকে (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে ক্বিতাল/যুদ্ধ চালানোর) অনুমতি দেয়া হল। তা এজন্য যে, তারা  (কাফেরদের দ্বারা) নির্যাতিত হচ্ছে। আর নিশ্চই আল্লাহ (তাআলা) তাদেরকে সাহায্য করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। (৪০) যাদেরকে নাহক্ব (অন্যায়) ভাবে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বেড় করে দেয়া হয়েছে, (তাদের দোষ ছিল এই যে,) তারা শুধু বলতো – ‘আল্লাহ আমাদের রব (প্রভু); (কোনো মুর্তিও নয়, কোনো মানুষও নয়; আমরা কেবল আমাদের রব আল্লাহ তাআলার হুকুমই মানবো)। আর আল্লাহ যদি তাদের কতককে কতকের মাধ্যমে প্রতিহত (করার ব্যবস্থা) না করতেন, (তাহলে) তারা অবশ্যই বিধ্বস্ত করে দিতো উপাসনালয়গুলোকে, গীর্জা, ইহুদীদের উপাসনালয়গুলোকে এবং মসজিদগুলোকে -যেগুলোর মধ্যে অধিক পরিমাণে আল্লাহ’র নাম স্মরণ করা হয়। আল্লাহ অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করবে, যারা তাঁকে (তাঁর দ্বীন কায়েমের কাজে) সাহায্য করবে। নিশ্চই আল্লাহ অবশ্যই মহা শক্তিমান, মহা পরাক্রমশালী (৪১) (আর তারা হল আমার সেই সকল মুমিন বান্দা) যারা (এমন গুণের অধিকারী যে,) যদি তাদেরকে জমিনে শাসন-কর্তৃত্ব (খিলাফত) দেয়া হয়, তাহলে তারা নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, মা’রুফ (সৎ বিষয়)-এর নির্দেশ দেয় এবং মুনকার (নাজায়েয ও হারাম বিষয়) থেকে নিষেধ করে। আর সকল বিষয়ের পরিণতি আল্লাহ’র কাছে’। [সূরা হজ্জ ৩৯-৪১]
 
আলেমগণের মতে, সুরা হজ্জ-এর ৩৯ থেকে ৪০ নং আয়াত দুটিতে জিহাদ ওয়াজিব বা ফরয হওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি; শুধুমাত্র মুবাহ (অনুমোদিত/জায়েয) করা হয়েছিল। [জামে’ লি-আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী- ১২/৬৮; তাফসীরুল কুরআন, ইমাম মানসুর সামআনী- ৩/২৩; ফাতহুল কাদীর, শাওকানী- ৩/৪৫৬; আল-কিতাল ওয়াল জিহাদ- মুহাম্মাদ খায়র হায়কাল- ১/৪৬৩]
 
এরপর আল্লাহ তাআলা মদিনায় ক্বিতাল/স্বসস্ত্র জিহাদ জিহাদ বিষয়ক আয়াত সমূহ একে একে নাজিল করে মুসলমানদেরকে দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন-
 
وَ قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَ لَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
“(হে মুসলমানগণ!) যারা তোমাদের বিরুদ্ধে কিতাল (যুদ্ধ) করে, তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ’র পথে কিতাল (সশস্ত্র যুদ্ধ/ জিহাদ) করো। আর তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না”। [সূরা বাকারাহ ১৯০]
 
 كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ وَهُوَ كُرْهٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“(‘(হে মুসলমানগণ) তোমাদের উপরে ক্বিতাল’কে বিধিবদ্ধ (ফরয) করে দেয়া হল। অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়/কষ্টকর ঠেঁকছে। এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করছো, আর (বাস্তবে) সেটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। আবার এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোনো কিছুকে পছন্দ করছো, আর (বাস্তবে) সেটাই তোমাদের জন্য অমঙ্গলজনক। আর আল্লাহ (সব কিছুর পরিণতি সম্পর্কে খুব ভালকরে) জানেন, আর তোমরা জানো না’। [সূরা বাকারাহ ২১৬]
 
وَ قَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
“তোমরা সকলে মিলে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কিতাল (সশস্ত্র জিহাদ) করো, যেমনি ভাবে তারা সকলে মিলে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আর তোমরা জেনে রেখো, নিশ্চই (তোমাদের প্রভু) আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন”। [সূরা তাওবা ৩৬]
 
আল্লাহ তাআলা পরিত্র কুরআনে মুসলমানদের উপরে ‘ক্বিতাল ফি সাবিলিল্লাহ’ (আল্লাহ’র পথে সশস্ত্র জিহাদ)কে ফরয করে দিয়েছেন। সুতরাং, ‘ক্বিতাল (সশস্ত্র জিহাদ)’ অবশ্যই ‘জরুরিয়াতে দ্বীন (তথা দ্বীনের অত্যাবশ্যক অংগ)-এর অন্তর্ভূক্ত।  আর কোনো মুসলমান যদি কুরআন-সুন্নাহ’র যে কোনো প্রমাণিত ‘জরুরিয়াতে দ্বীন’কে অস্বীকার করে বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল/অপমান করে, তাহলে সে মুরতাদ (ইসলাম পরিত্যাগকারী কাফের) হিসেবে বিবেচিত হয়।
 
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম জাওযী (মৃ: ৭৫১ হি:) রহ. লিখেছেন- أول ما أوحى إليه ربه تبارك وتعالى أن يقرأ باسم ربه الذي خلق وذلك أول نبوته فأمره أن يقرأ في نفسه ولم يأمره إذ ذاك بتبليغ ، ثم أنزل عليه ( يا أيها المدثر قم فأنذر ) فنبأه بقوله اقرأ ، وأرسله بـ يا أيها المدثر . ثم أمره أن ينذر عشيرته الأقربين ، ثم أنذر قومه ، ثم أنذر من حولهم من العرب ، ثم أنذر العرب قاطبة ، ثم أنذر العالمين ، فأقام بضع عشرة سنة بعد نبوته ينذر بالدعوة بغير قتال ولا جزية ويؤمر بالكف والصبر والصفح . ثم أُذن له في الهجرة ، وأذن له في القتال . ثم أمره أن يقاتل مَن قاتله ويكف عمن اعتزله ولم يقاتله . ثم أمره بقتال المشركين حتى يكون الدين كله له . ثم كان الكفار معه بعد الأمر بالجهاد ثلاثة أقسام : أهل صلح وهدنة ، وأهل حرب ، وأهل ذمة – “নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে তার  রব (আল্লাহ) তাবারক ওয়া তাআলা সর্বপ্রথমে যে ওহী পাঠান সেটা এই ছিল যে, তিনি যেন (তার উপরে নাজিল হওয়া ওহীকৃত আয়াতকে) তার সেই রবের নামে পাঠ করেন, যিঁনি (সব কিছুকে) সৃষ্টি করেছেন। আর এটা ঘটেছিল নবুওতের প্রথম দিকে। পরে তিঁনি (তাঁর) নবী ﷺকে নির্দেশ দেন যে, তিনি (কুরআনের যা কিছু ওহী হিসেবে নাজিল হয় তা শুধু) নিজে নিজে পাঠ করবেন। তখনও পর্যন্ত ওর তাবলীগ করার নির্দেশ তাঁকে দেয়া হয়নি। অত:পর তার উপরে নাজিল হয়: يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ قُمْ فَأَنذِرْ“হে কম্বোলধারী, আপনি উঠে (লোকজনকে আল্লাহ ও আখেরাতের ব্যাপারে) সতর্ক করুন’। বস্তুত: আল্লাহ’র বাণী اقْرَأْ -(পাঠ করো)-এর দ্বারা নবুওতের জানান দেয়া হয়েছে এবং يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ – (হে কম্বোলধারী, ….)-এর দ্বারা তাকে রিসালাত দেয়া হয়েছে। এরপর তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তিনি যেন তার নিকট-আত্বীয় স্বজনদেরকে সতর্ক করেন। তারপর (নির্দেশ দেয়া হয়েছে) তাঁর (আরব) কওমকে সতর্ক করতে, তারপর আরবের চারপাশে(র লোকদেরকে) সতর্ক করতে, এরপর গোটা আরবকে সতর্ক করতে, তারপর গোটা বিশ্বকে সতর্ক করতে (বলা হয়েছে)। ফলে তাঁর নবুওতের পর প্রায় দশ বছর এ দায়িত্ব পালন করে যান -(লোকদেরকে দ্বীন ইসলামের দিকে মৌখিক) দাওয়াতের মাধ্যমে; কোনো ক্বিতাল (সমর যুদ্ধ) ও জিজিয়া (গ্রহন) ছাড়াই। তখন তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল (কাফেরদের অন্যায় অত্যাচারের মোকাবেলায় তাঁর) হাতকে সংবরন করা, সবর করা এবং ক্ষমা প্রদর্শন করে চলার। এরপর তাঁকে হিজরত করার অনুমতি দেয়া হয়, অনুমতি দেয়া হয় ক্বিতাল (সমর জিহাদ/যুদ্ধ) করার। এরপর তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়, যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন, আর যারা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন না। এরপর তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়, তিনি মুশরেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন যাবৎ না (জমিনে) দ্বীন সার্বিক ভাবে আল্লাহ’রই হয়ে যায়। (সমর) জিহাদের নির্দেশের পর তাঁর সাথে থাকা কাফেররা মূলত: তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়: أهل صلح وهدنة (সন্ধি-চুক্তিবদ্ধ কাফের), أهل حرب (যুদ্ধরত কাফের), أهل ذمة (আহলে যিম্মা)”। [যাদুল মাআদ, ইবনুল কাইয়্যেম– ৩/১৫৯]
 
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ.-এখানে খুবই চমৎকার ভাবে সংক্ষেপে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওত লাভের পর থেকে নিয়ে জমিনের বুকে আল্লাহ’র দ্বীনকে পরিপূর্ণ রূপে কাায়েম করার জন্য কাফের-মুশরেকদের বিরুদ্ধে ক্বিতাল/সমর-জিহাদের নির্দেশ দানের পর ইসলামের দৃষ্টিতে কাফেরদের যে তিনটি ভাগের কথা বলেছে, তা মাথায় রাখলে আমাদের আলোচনা বোঝা সহজ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। 

 


>>> মূল সূচিপত্র (index) থেকে এ পেজের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী আলোচনা পড়তে [এখানে ক্লিক করুন