হারাম ঠেকায় পড়ে জায়েয হওয়ার শরয়ী দলিল – কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে

Spread the love
image_pdfimage_print

হারাম ঠেকায় পড়ে জায়েয হওয়ার শরয়ী দলিল – কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে

ইসলামী শরীয়ত যে সমস্ত জিনিসকে অকাট্যভাবে হারাম ও নাজায়েয বলে ঘোষনা দিয়েছে, সেগুলো প্রত্যেক আকেল (জ্ঞানবোধ সম্পন্ন) বালেগ (প্রাপ্ত বয়ষ্ক) মুসলমানের জন্য কেয়ামত পর্যন্ত হারাম ও নাজায়েয হিসেবে বিবেচিত; তবে শরীয়ত নিজেই যদি কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে তা জায়েয হওয়ার শর্ত এঁটে দেয়, তবে তা ভিন্ন কথা।

 হারাম ঠেকায় পড়ে জায়েয হওয়ার শরয়ী দলিল - কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে islamযেমন, ইসলামী শরীয়তে মৃত প্রাণীর গোশত, শুয়র খাওয়া, কিংবা মাদক সেবন, জুয়া, সূদ ইত্যাদি কেয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলমানের জন্য হারাম ও নাজায়েয -চাই নারী হোক বা পুরুষ। কিন্তু শরীয়তে স্বর্ণের অলঙ্কার ও রেশমী পোশাক পরিধান করা শুধুমাত্র মুসলীম পুরুষের জন্য কেয়ামত পর্যন্ত নাজায়েয হিসেবে বিবেচিত; নারীর জন্য স্বর্ণের অলঙ্কার বা রেশমী পোশাক কোনোটিই নাজায়েয নয়।

ইসলামী শরীয়তে যে সব জিনিসকে শর্তযুক্ত বা শর্তমুক্ত ভাবে হারাম ও নাজায়েয হিসেবে অবিহিত করেছে, সেগুলোকে নিছক বিবেক প্রসূত যুক্তি তর্কের ভাওতায় কিংবা ‘মানব উন্নয়নে’র নাম করে ‘হালাল’ বানিয়ে দেয়ার এখতিয়ার কোনো মুসলমানের নেই; একদমই নেই।

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ ۗ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا
‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যখন কোনো বিষয়ে কোনো ফয়সালা দিয়ে দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিনা নারীর জন্য তাদের নিজেদের বিষয়গুলোতে (ভিন্ন ফয়সালা দানের) কোনো এখতিয়ার থাকে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অমান্য করলো, সে মূলতঃ সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ঠতায় নিমজ্জিত হয়ে গেল’। [সূরা আহযাব ৩৬]
 
 তবে এই উম্মতের উপরে আল্লাহ তাআলার একটি বিশেষ দয়া ও করুনা এই যে, তিনি এই উম্মতের জন্য ‘সহজতা’ দান করতে চান, কাঠিন্যতা সৃষ্টি করতে চান না। যেমন তিনি নিজেই এরশাদ করেছেন-
 
يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلْعُسْرَ 
‘আল্লাহ তোমাদের সাথে সহজতা করতে চান এবং তিনি তোমাদের সাথে কাঠিন্যতা (কঠোরতা) করতে চান না’। [সূরা বাকারাহ ১৮৫]

يُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ ۚ وَخُلِقَ ٱلْإِنسَٰنُ ضَعِيفًا 

‘আল্লাহ তোমাদের থেকে বোঝা হালকা করে দিতে চান। আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দূর্বলরূপে’। [সূরা নিসা ২৮]

বিশ্বনবী মুহাম্মাদ মুস্তফা সা.-এরও এই গুণ ছিল যে, তিনি পারতপক্ষে এই উম্মতকে কষ্টের বোঝা থেকে দূরে রাখতে চাইতেন, যাবৎ না শরীয়তের কোনো ওজর বিদ্যমান থাকে।

لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِٱلْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ

‘(আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে) তোমাদের নিকট তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসুল এসছে। তোমরা যে কষ্ট ভাগ করো তাতে সেঁ মর্মপিড়াঅনুভবকারী; তোমাদের একান্ত কল্যানকামী; মুমিনদের প্রতি সেঁ সহানুভীতিশীল মেহেরবান’। [সূরা তাওবা ১২৮]

এজন্য আমরা কুরআন-হাদীসের বহু জায়গায় দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল এই উম্মতের সহজতার জন্য -নিরূপায় বা ঠেকার পরিস্থিতিতে- অনেক নাজায়েয ও হারাম জিনিসকে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। এসম্পর্কে নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হল-

উদাহরণ: ১

إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ ٱلْمَيْتَةَ وَٱلدَّمَ وَلَحْمَ ٱلْخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ بِهِۦ لِغَيْرِ ٱللَّهِ ۖ فَمَنِ ٱضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَآ إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

‘অবশ্যই তিনি তোমাদের জন্য হারাম করেছেন মৃত প্রাণী (-র গোশত), রক্ত, শুয়োরের গোশত এবং যে প্রাণীর উপর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নাম নেয়া হয়েছে- তা। তবে যে ব্যক্তি অনন্যোপায় হয়ে পড়ে (এমতাবস্থায় যে, সে আসলে এসব হারাম জিনিস ভক্ষনের ব্যপারে মোটেই আগ্রহী নয়। তদুপরি বাধ্যহয়ে ভক্ষন করতে গিয়ে ভক্ষনে জরুরতের তুলনায়) বাড়াবাড়িও করে না, সীমালঙ্ঘনও করে না, তাহলে তার উপর কোনো গোনাহ বর্তাবে না। নিশ্চই আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু’।[সূরা বাকারাহ ১৭৩]

এ আয়াতে পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে, একজন মুসলমানের জন্য কী কী হারাম। বলা বাহুল্য, এ হারাম জিনিসগুলো কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মুসলমানের জন্যই হারাম। এ ব্যপারে মুসলীম উম্মাহ’র ইজমা রয়েছে। তবে দয়াময় আল্লাহ তাআলা আমাদের সহজতার দিকে তাকিয়ে এই সুযোগটুকুও দিয়েছেন যে, কেউ যদি কখনো এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে পড়ে যে, খাদ্যবিহীন তার জীবন বিপন্ন জীবন ওষ্ঠাগত, সে কোনো উপায়ে এমন কোনো হালাল খাদ্যও জোগাড় করতে পারেনি, যাতে তার জীবনটুকু কোনো মতে বেঁচে যেতে পারে, এই অনন্যোপায় অবস্থায় সে যদি উল্লেখীত হারাম জিনিসগুলো থেকে এতটুকু পরিমাণ খেয়ে নেয়, যা দ্বারা তার জীবনটা কোনো মতে বেঁচে যায়, আর খেতে গিয়ে নূন্যতম প্রয়োজনের অতিরিক্ত না খায় এবং অন্তরে আল্লাহ’র হারামকৃত বিধান লঙ্ঘন করার সামান্যতম ইচ্ছাও বাস্তবে না থাকে, তাহলে তার ওই জরুরত/শরয়ী প্রয়োজন পরিমাণ ‘হারাম’ খাদ্যটুকু ভক্ষনের কারণে তার উপর কোনো গোনাহ বর্তাবে না।

এখানে হারাম জিনিসগুলোকে ভক্ষন করার উল্লেখীত শর্ত তিনটি বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্যঃ-

১. এমন অনন্যোপায় হয়ে পড়া, যখন উক্ত হারাম জিনিসগুলো ছাড়া কোনো হালাল খাদ্য পাওয়া না যাওয়ার মত সঙ্কটাবস্থা বিদ্যমান।
২. জিনিসগুলোকে হারাম’ই মনে করা এবং আল্লাহ’র এ বিধান লঙ্ঘন করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকা।
৩. খেতে গিয়ে নূন্যতম যতটুকু খেলে তার জীবনটা কোনো মতে বেঁচে যায়, তা খাওয়ার পর অতিরিক্ত খাওয়ার দিকে পা না বাড়ানো।

এই তিনটি শর্তে ‘হারাম’ খাদ্য ভক্ষনের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

উদাহরণ: ২

বিভিন্ন হাদীসে পুরুষের জন্য রেশমী পোষাক পরিধান করার উপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যেমন, হযরত আলী রা.-এর সূত্রে এক হাদীসে এসেছে – رأيت رَسُول اللَّهِ ﷺ أخذ حريراً فجعله في يمينه وذهباً فجعله في شماله ثم قال: إن هذين حرام على ذكور أمتي- رواه أبو داود بإسناد حسن – ‘আমি দেখেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ রেশমী পোষাককে তার ডান হাতে নিয়ে এবং স্বর্ণকে তার বাম হাতে নিয়ে বললেন- এ দুটো জিনিস আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম’। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪০৫৭; মুসনাদে আহমাদ-১/৯৬; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ৩৫৯৫] আবু মুসা আশআরী রা.-এর সূত্রে আরেক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন- حرم لباس الحرير والذهب على ذكور أمتي وأحل لإناثهم – رَوَاهُ التِّرمِذِيُّ وَقَالَ حَدِيثٌ حَسَنٌ صحيح. রেশরী পোশাক ও স্বর্ণ আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং তাদের নারীদের জন্য হালাল। [জামে তিরমিযী; হাদিস ১৭২০; মুসনাদে আহমাদ-৪/৩৪৯, ৪০৭; সুনানে নাসায়ী-৮/১৬০; শারহু মাআনীল আছার, ত্বাহাবী-৪/২৫১]

বলা বাহুল্য, মুসলমান পুরুষদের জন্য এদুটো জিনিস কেয়ামত পর্যন্ত পরিধান করা হারাম। কিন্তু আমরা এও দেখতে পাই যে, সহীহ হাদিসে হযরত আনাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে- أن النبي صلى الله عليه وسلم رخص لعبد الرحمن بن عوف والزبير في قميص من حرير من حكة كانت بهما রাসুলুল্লাহ সা হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ এবং হযরত যুবাইর বিন আওয়াম’ রা-কে তাঁদের উভয়ের (একপ্রকার) খোঁচপাঁচড়া (জাতীয় চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়া)র কারণে রেশমী কামিছ পরিধান করার অনুমতি দিয়েছিলেন[সহীহ বুখারী, হাদিস ২৯১৯; সহীহ মুসলীম, হাদিস ২০৭৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪০৫৬; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ৩০৯২; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ১৭২২; সুনানে নাসায়ী-৮/২০২]

সম্ভবতঃ এর কারণ এই ছিল যে, এসব চর্মরোগের পুঁজ বা আঁঠা অন্যান্য মোটা কাপড়ের ঘসাঘসি কিংবা শরীরের ঘাম দ্বারা বেশি ছড়ায় অথবা দেড়িতে শুকায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে রেশমী পোশাক তুলনামূলক কোমল, আরাম দায়ক এবং ঘাম ও ঘসাঘসির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কম, যা দ্রুত আরোগ্য লাভের সহায়ক।

উদাহরণ- ৩

রাসুলুল্লাহ সা.-এর বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, স্বাভাবিক অবস্থায় বাড়িতে ও নিজের সাথে কুকুর রাখা বা পোষা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয ও গুনাহ’র কাজ। যেমন এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন-  لاَ تَدْخُلُ المَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ صُورَةُ – যে ঘরে কুকুর ও (প্রাণির) ছবি থাকে, তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [সহীহ মুসলীম, হাদিস ২১০৬; সহীহ বুখারী, হাদিস ৩২২৫; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ৩৬৪০; মুসনাদে বাযযার, হাদিস ৮৮০; শারহু মাঅআনিল আছার, ত্বাহাবী, হাদিস ৬৪০৬; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস ৬১৬; হাদিস; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস ১৯৯৫৩] হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন-  مَنْ أَمْسَكَ كَلْبًا فَإِنَّهُ يَنْقُصُ كُلَّ يَوْمٍ مِنْ عَمَلِهِ قِيرَاطٌ  – যে ব্যাক্তি কুকুর সাথে রাখে, তার আমল থেকে প্রতিদিন এক কিরআত (পরিমান সওয়াব) কেটে নেয়া হয়’। [সহীহ বুখারী, হাদিস ২১৪৫]

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কুকুর রাখার অনুমতি খোদ্ রাসুলুল্লাহ -এর হাদিস থেকেই প্রমাণিত হয়। যেমন হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ এরশাদ করেন-  مَنِ اتَّخَذَ كَلْبًا ، إِلَّا كَلْبَ مَاشِيَةٍ ، أَوْ صَيْدٍ ، أَوْ زَرْعٍ ، انْتَقَصَ مِنْ أَجْرِهِ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطٌ  – যে ব্যাক্তি গবাদীপশু রক্ষাকারী কুকুর কিংবা শিকারী কুকুর অথবা ফসল রক্ষাকারী কুকুর ছাড়া (এমনি স্বাভাবিক শখের কারণে) কুকুর সাথে রাখে, তার (আমলের) পুরষ্কার থেকে প্রতিদিন এক কিরআত কেটে নেয়া হয় । [সহীহ মুসলীম, হাদিস ১৫৭৫; বুখারী, হাদিস ২৩২২]

এই জাতীয় বিভিন্ন হাদিসসমূহ থেকে বাড়ি-ঘর রক্ষা, জিনিসপত্র রক্ষা করা, শিকার করা প্রভৃতি প্রয়োজনে কুকুর পালন জায়েয প্রমাণিত হয়। 

ফায়দা

উপরোক্ত উদাহরণগুলো থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, শরীয়তে বহু জিনিস হারাম ও নাজায়েয হওয়া সত্ত্বেও কখনো কথনো নিরুপায় বা প্রচন্ড ঠেঁকা বসতঃ আবার কখনো কখনো কিছু শর্ত সাপেক্ষে তা ব্যবহারের অনুমতিও রয়েছে মুসলমানদেও জন্য।

উসূল (মূলনীতি)

এসব বিষয় এবং এজাতীয় আরও অনেক বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আইম্মায়ে মুজতাহিদীন ও ফুকাহায়ে কেরাম শরীয়তের বহু মাসআলাহ ও উসূল (মূলনীতি) নির্ধারণ করেছেন। যেমন:

الضرورة تقدر بقدرها

১. এর মর্মার্থ হল, জরুরত (প্রচন্ড ঠেঁকা)-ই নির্ধারণ করে দিবে (জরুরত পূরণার্থে ব্যবহৃত) উপকরণের পরিসীমা কী হবে।

অর্থাৎ, কখন কোন পর্যায়ে কোন হারাম ও নাজায়েয জিনিসটি কতটুকু কিভাবে ব্যাবহারে আনা সঙ্গত হবে তা তখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতি, অবস্থা, স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে নির্ণীত হবে। শরীয়তে এর নির্দিষ্ট ও স্থায়ী কোনো সীমা-পরিসীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয় নি। উদাহরণ স্বরূপ, যে ব্যক্তি কোথাও হারাম খাদ্য গ্রহনে বাধ্য হয়ে পড়ে, তার প্রাণে বেঁচে যাওয়া পরিমান’ খাদ্যের পরিমাপ তখনকার পরিবেশ, স্থান, কাল এবং তার শারীরীক ও মানসিক অবস্থা প্রভৃতির উপর নির্ভর করে নির্ণীত হবে। কাজেই একেক ব্যাক্তির বেলায় একেক রকম ফাতওয়া/হুকুম হতে পারে। 

من ابتلى ببليتين فليختر اهونهما

২. এর মর্মার্থ হল, ‘যে ব্যক্তি দু’টি বিপদের সম্মুখীন হবে, সে ওই দুটোর মধ্য থেকে কম বিপদটিকে গ্রহন করে নিবে’।

উদাহরণস্বরূপ: শরীয়ত অনুমোদন করেনি -এমন যে কারো জীবন নেয়া হারাম। কিন্তু কখনো যদি এমন জটিল পরিস্থিতির সম্মুখিন হতে হয় যে, পেটের বাচ্চাটি -যে এখনো ভুমিষ্ট হয়নি- তাকে বাঁচাতে গেলে বাচ্চা’র মা’র জীবন চলে যেতে পারে, আবার বাচ্চার মা’কে বাঁচাতে গেলে বাচ্চার জীবন চলে যেতে পারে, এমতাবস্থায় যেহেতু বাচ্চার মা’র জীবন বাঁচানোটি বাহ্যতঃ সুনিশ্চিৎ এবং অপরদিকে যে বাচ্চাটি এখনো ভুমিষ্টই হয়নি তার জীবন সহকারে ভুমিষ্ট হওয়াটাই বাহ্যতঃ অনিশ্চিৎ, এক্ষেত্রে মা’র জীবন নেয়াটা হবে বড় বিপদ এবং অভুমিষ্ট বাচ্চাটির জীবন নেয়াটা হবে কম বিপদ। তাই এক্ষেত্রে মা’র জীবন বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং অভুমিষ্ট বাচ্চাটিকে যত সহজে মৃত্যুমুখে পৌছানো সম্ভব হয় তার ব্যাবস্থা করতে হবে। 

يتحمل الضرر الخاص لدفع ضرر عام

৩. এর মর্মার্থ হল, ‘ব্যপক আকারের ক্ষতি প্রতিহত করণার্থে কোনো স্ববিশেষ (ও তুলনামূলক স্বল্প) ক্ষতিকে গ্রহন করে নিবে’।

অর্থাৎ প্রয়োজনবসতঃ যে জিনিসে লিপ্ত হলে বা জড়িয়ে পড়লে -শরয়ী ও পার্থিব -উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে বাহ্যতঃ তার ক্ষতিটাই ব্যপক বলে প্রতিয়মান হয়, সেক্ষেত্রে যদি এমন কোন পথ থাকে যা অবলম্বন করলে বিশেষ ও নির্দিষ্ট একটি ক্ষতি হয়ে যাবে বটে তবে তাতে ওই ব্যপক ক্ষতি থেকে বাঁচা যাবে, তাহলে সেক্ষেত্রে ওই বিশেষ ক্ষতিটিকে গ্রহন করে নিতে হবে। এই ৩ নং উসূলটির সাথে উপরোক্ত ২ নং উসূলের বেশ সামঞ্জস্যতা রয়েছে।

الامور بمقاصدها و الشئ الواحد يتصف بالحل و الحرمة باعتبار ما قصد له

৪. এর মর্মার্থ হল, ‘একটি বিষয়ের পিছনে উদ্দেশ্য কী -তা দিয়েই সেটার বিচার করা হবে। একটি জিনিসের হুকুম কেবলমাত্র তার পিছনের উদ্দেশ্যের কারণে কখনো হালাল আবার কখনো হারাম হতে পারে’।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লোহা ক্রয়-বিক্রয় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটি হালাল ব্যবসা। কিন্তু এমন ব্যক্তির কাছে স্বজ্ঞানে লোহা বিক্রি করা- যার ব্যপারে একথা নিশ্চিত যে, সে উক্ত লোহা দ্বারা সন্ত্রাসী কাজের অস্ত্র তৈরী করবে বা সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র সাপ্লাই দিবে কিংবা অস্ত্রগুলো ইসলাম ও মুসলমানদের বিরূদ্ধেই ব্যবহার করবে, এমতাবস্থায় তার জন্য উক্ত খাতে লোহা বিক্রি করা নাজায়েয। মৌলিকভাবে লোহার তো কোনো দোষ নেই, এটি একটি হালাল বস্তু। কিন্তু ব্যবহারকারীর নিয়ত ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে এই হালাল জিনিসটিই পরিবেশ-পরিস্থিতি, স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে  হারাম ও নাজায়েযও বিবেচিত হতে পারে। 

শরয়ী উসূল প্রয়োগের পাত্র ও ক্ষেত্র

বলাবাহুল্য, এসকল উসূল (মূলনীতি) কখন কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে মাহের/সুদক্ষ আহলে হক্ব ওলামায়ে কেরাম ছাড়া সাধারণ ব্যাক্তির পক্ষে-তো বোঝাই সম্ভব নয়; ব্যবহার করা আরো দূরের কথা। তবে এই আলোচনা থেকে তাদের কমপক্ষে এতটুকু বোঝা উচিৎ যে, শরীয়তে এরকমও একটি ময়দান আছে, যা প্রয়োজনে বিভিন্ন হারাম ও নাজায়েযকে অবস্থাভেদে কিছু শর্ত সাপেক্ষে ব্যবহারে আনার অনুমতি খোদ্ কুরআন সুন্নাহ’য় রয়েছে; আলেমগণ নিজ থেকে বানাননি। আর এই অনুমতি কেবল মৃত প্রাণি বা শুওরের গোশত খাওয়া খাওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর ক্ষেত্রটি শরয়ী প্রয়োজনে ব্যাক্তি-জীবন, পারিবারিক-জীবন, সামাজীক-জীবন এবং রাষ্ট্রিয়-জীবন সর্বক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত হতে পারে।

আমরা এখানে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ে উপরোক্ত উসূলগুলো ব্যাবহারের ব্যাপারে কিছু কথা আরোজ করতে চাই, যাতে যারা সিরাতে মুস্তকিমের উপর চলতে আগ্রহী অন্ততঃ তারা অপরাপর মূর্খ মুনাফেকদের মতো তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আলেমগণের শরয়ী মর্যাদার উপর বেয়াদবী ও অমর্যাদাকর বাক্যের মিসাইল নিক্ষেপ করাকে নিজেদের চর্চার ক্ষেত্র বানিয়ে নেয়া থেকে বাঁচতে পারে।

সাধারণ মানুষজন প্রায়ই এই অভিযোগ উঠায় যে, আলেমগণ বলেন যে- (১) নারী নেতৃত্ব নাজায়েয, (২) বর্তমানকার মুসলীম-অমুসলীম সকলের ভোটে রাষ্ট্রপ্রধান বা অঞ্চলপ্রধান নির্বাচন পদ্ধতি শরীয়তসম্মত নয়, (৩) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি ইসলাম বিরোধী কুফরী মতোবাদ, (৪) সমাজতন্ত্র একটি ইসলাম বিরোধী কুফরী মতোবাদ, (৫) কমিউনিজম একটি ইসলাম বিরোধী কুফরী মতোবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার  আলেমগণই এদের সাথে রাজনীতিতে শরীক হয়, ভোট দেয়, ইলেকশন করে!!! 

আলেমগণের উপর ইত্যকার বহু অভিযোগ এনে তারা যেখানেই সুযোগ পায় সেখানেই রটায় -লেখনি, বক্তৃতা, সভা-সমিতি, টক-শো, মিডিয়া -কোথাও বাদ দেয় না তারা। যদি তারা কমপক্ষে এতটুকু বুঝতে পারতো যে, তারা শরীয়ত বোঝে না, তাহলেও তাদের দ্বারা ঘটিত ও রটিত বহু ফেতনার মূলৎপাটন বা প্রসমন অনেকটা সম্ভব হত। বস্তুতঃ আমাদের আলোচ্য বিষয়ের উপর কুরআন-সুন্নাহর সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও তা থেকে উৎসারীত উসূলগুলোই তাদের এজাতীয় অভিযোগগুলোকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। 

একথা কে না বোঝে যে, আজ পৃথিবীর কোথায়ও ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা বিদ্যমান নেই। তুরস্কে ওসমানী খেলাফত নামে যাও-বা টুটাফাটা কিছু ছিল, তাতেও মুসলমানদের শান-শওকত বিদ্যমান ছিল। কাফের ও মুনাফেকদের যৌাথ প্রচেষ্ঠায় ওসমানী খেলাফত ধ্বংসের পর রাজনৈতিক পট সম্পূর্ণ পাল্টে যায় এবং বিশ্ব পুরোটাই কাফের-মুশরেক ও মুনাফেকদের কব্জায় চয়ে যায় এবং তারাই প্রবল হয়ে ওঠে। আজ তারা গোটা বিশ্বে শক্তি-সামর্থে এতটাই প্রবল যে, তারা-তো তাদের দেশগুলিকে শক্ত হাতে কন্ট্রোল করেই, তদুপরি যেসকল দেশগুলোকে আমরা মুসলীমপ্রধান দেশ হিসেবে দেখতে পাই, (দু-একটি ছাড়া) সেগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বশেষ স্তর পর্যন্ত তাদের মনমানসিকথার দালাল দিয়ে ভর্তি। ফলে মুমিনরা সমাজে নিজেদেরকে বড়ই একা ও অসহায় বোধ করে, আর ভয়ে ভয়ে থাকে মুসলমান নামধারীদের মধ্যে যাদেরকে তারা মুসলীম ভাই-বোন বলে বিশ্বাস করার কথা তারাই আবার তাদের সাথে মির্জাফরী করে কখন কাফের-মুনাফেকদের হাতে তুলে দিয়ে যুলুম নির্যাতনের শিকার বানায়। বেশিরভাগ মুমিনদের এরকমই অবস্থা। যাঁরাও বা মর্দে-মুমিন, তাঁরাও কাফের-মুনাফেকদের ঢেউয়ে বড়ই অসহায়-হতদূর্বল। মুমিনদের সামনে কাফের-মুনাফেকরা এখন দু’টি পথ খোলা রেখেছে কিংবা রাখার মরনপণ চেষ্টা চালাচ্ছে – (১) তারা যেভাবে দুনিয়াকে চালাতে চায় সেভাবে নির্বিঘ্নে চলতে দিতে হবে, (২) মুমিনরা বিশ্বের কোথাও একেবারে নিরেট ব্যাক্তি পর্যায়ে ইসলামী শরীয়ত মানা ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে ইসলামী শরীয়তের নাম-নিশানাও রাখতে পারবে না, বরং তাদেরকেও ওদের মতো দুনিয়ার জোয়ারে গা ভাসাতে হবে -মন চাক চাই না চাক। এরই ক্রমধারায় কাফের-মুনাফেকরা বিশ্বে ঐক্যজোট বেঁধে- (১) যেখানেই দেখছে যে, মর্দে-মুমিনরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে চাইছে, সেখানেই তারা গিয়ে মুমিনদের কোমড়ে এত জোরে মাড়ছে যে, মুমিনরা যাও কিছুটা দাঁড়াতে পারতো এখন সে শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলছে। (২) মুসলমানদের বিশুদ্ধ আকিদা বিশ্বাস ও চেতনাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়ার জন্য মুসলীম নামধারী মুনাফেকদের দ্বারা এমন সব শয়তানী মতবাদ মতাদর্শ চিন্তা-চেতনার কালো অন্ধকারচ্ছন্ন ফিতনাহ একটার পর একটা লাগিয়ে দিচ্ছে, যাতে মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে বুঝতেই না পারে যে কোনটা কুরআন-সুন্নাহ’র সহীহ পথ আর কোনটা পথভ্রষ্ঠতা-গোমরাহী। এর ফল দাড়িয়েছে এই যে, মুসলমানরা আজ বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা, মতবাদ-মতাদর্শ গ্রহন করে খন্ডবিখন্ড হয়ে গেছে এবং কাফের-মুনাফেকদের প্ররোচনায় পরষ্পরে খুনাখুনি আর দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়েছে। সকল আহলে হক্ব ওলামায়ে কেরাম ও সাধারণ মুমিনগণ স্পষ্ট দেখতে পচ্ছেন যে, ইমাম মাহদী রা.-এর আভির্ভাবের পূর্বে (যা আমার মতে অতি সন্নিকটে) উম্মাহ’র সংশোধন হওয়ার পক্ষে কোথাও আশার আলো নেই। 

বর্তমান জামানায় দেশে দেশে মুমিন-মুসলমানদের সমস্যা শুধু জটিল নয় বরং জটিলতর ও অভাবনীয় মাত্রার প্রকট-

(১) মুসলমানদের জন্য পৃথকভাবে একদম বিশুদ্ধ শরয়ী কায়দায় ‘ইসলামী খিলাফত’ ব্যবস্থা কায়েম করার কোনো পথ খোলা রাখেনি কাফের-মুনাফেকরা। 

(২) কাফের-মুনাফেকরা তাদের শরীয়ত-বিরোধী কায়দায় চালুকৃত নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অনুসরণ করা ছাড়া কোনো ইসলামী দল ক্ষমতায় আসার কোনো পথও খোলা রাখেনি। তদুপরি কোনো কোনো দেশে-তো ‘ইসলামী দল’ গঠন ও নির্বাচনে অংশ গ্রহনকেও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বা করার চেষ্টা চলছে।

(৩) যেসকল বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের জন্য দাঁড়ায়, তাদের পিছনেই দেশের অধিকাংশ জনগন পাগলের মতো ছোটে, ফলে তাদেরই কেউ নির্বাচনে জয়ী হয়। যেখানে ইসলামী দলগুলোকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়, সেখানে তারা ওই বড় দলগুলোর সাথে নির্বাচনে একাকি মুকাবেলা করতে পারে না।

(৪) এজামানায় যেসকল বড় বড় দলগুলো নির্বাচনে দাঁড়ায়, তাদের প্রায় সবাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মতো কুফরী আকিদায় বিশ্বাসী , আবার কেউ পাক্কা কমিউনিষ্ট বা সোসালিষ্ট (সমাজতন্ত্রী)। রাষ্ট্রে ইসলামের আগমনকে এরা দুচোখে দেখতে পায়না। কাফের-মোশরেকরা তো বটেই তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুসলমান নামধারী বেশিরভাগ জনগণও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ/কমিউনিজম/সমাজতন্ত্র’কে তাদের বিশ্বাস হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছে। এরা কখনই মুসলমানদের দ্বীনী স্বার্থ পূরণ করে না, করবেও না। বলা বাহুল্য, এরা যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের যথাসাধ্য লক্ষ্য থাকে দেশের জনগণকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ/কমিউনিজম/সমাজতন্ত্র বিশ্বাসে বিশ্বাসী করে তোলা, সাথে পরবর্তী প্রজন্মকেও। এজন্য যখনই মর্দে-মুমিনরা রাষ্ট্রে ইসলামের আহবান নিয়ে দাঁড়াতে চায়, তখন এরা একজোট হয়ে মুমিনদের পদক্ষেপকে যখন যেভাবে পারে বাঁধা দেয়, কখনো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জেলে ঢুকায়, আবার কখনো বিভিন্ন ছুতায় অত্যাচার চালায়, কখনো কখনো মেড়েও ফেলে। আর যেখানেও-বা ইসলামের পক্ষের কোনো দল নির্বাচন করে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যায়, তাদের সাথে পশ্চিমা জায়নিষ্ট রানীতিক হায়নারা কি আচরণ করে তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হল মিশর। মুসলীম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমীন)-এর নেতা মুহাম্মাদ মুরসী ২০১২ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ট ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হন। আর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় মুহাম্মাদ মুরসীকে হত্যা মামলায় জড়িত দেখিয়ে এবং ‘মুসলীম ব্রাদারহুড’-কে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে অবিহিত করে মুনাফেক ফাতাহ আল সিসি পেসিডেন্ট হয় পশ্চিমা জায়নিষ্ট রাজনীতিকদের ইশারায় এবং মুরসী সহ অনেককে ২০ বছরের জন্য জেলে ঘুকায়। হালের গণতান্ত্রিক পন্থায় সংখ্যাগরিষ্ট ভোটে জয়ী ও নির্বাচিত তুরষ্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোগান ‘কে সরানোর জন্য পশ্চিমা জায়নিষ্ট রাজনীতিকরা ২০১৬ ইং সালে তুরষ্কের কিছু মুনাফেক আর্মিদের দ্বারা কু’ ঘটানোর চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়। রাষ্ট্রপ্রধানরাই যদি ঘরে-বাইরের চারপাশের এত শত্রু দ্বারা প্রতিনিয়ত আবিষ্ট থাকেন, তাহলে শক্তি-সামর্থহীন হতদূর্বল ওলামায়ে কেরাম ও সর্বসাধারণ মুমিন-মুসলমানরা কি পরিবর্তন আনতে পারবে বলে আপনি মনে করেন। দেখতেই-তো পাচ্ছেন, একটি দেশের নির্বাচন শুধু সেই দেশের জনগণের মাথা বেথা নয়, তার চেয়ে বেশি মাথা ব্যাথার কারণ হল বিশ্ব মোরল যারা, তাদের। 

এমতাবস্থায় বিভিন্ন দেশের আহলে আহলে হক্ব ওলামায়ে কেরাম মনে করেছেন যে, যতদিন পর্যন্ত কাফের-মোশরেক ও মুনাফেকদের দ্বারা চালুকৃত এই ভোট ও নির্বাচনব্যবস্থা পরিবর্তন করে বিশুদ্ধ ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা কায়েম করে মুসলমানদের ইমান ও জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, ততদিন পর্যন্ত তাদের এই নির্বাচনব্যবস্থার মধ্যে নিজেদেরকে শরিক করেই ইসলামের তুলনামূলক ছোট বিপদ/হুমকিগুলোকে সাথে নিয়ে ইসলামবিরোধী বড়  ফিতনা/বিপদ/হুমকিগুলোকে যতদূর সম্ভব মোকাবেলা করা যায় কিনা। 

মনে করুন, আপনি এমন বনের পাশে বাস করেন, যেখানে যে কোনো মুহূর্তে নেকড়ে ও হায়নারা দল বেঁধে আপনার পরিবার ও গবাদিপশুগুলোকে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় করে দিতে বারবার আসা-যাওয়া করছে। আর আপনার কাছে, যে কয়টি পাহারাদার কুকুর ছিল তার সব কয়টিই এখন পাগলা-কুত্তা। এখন দু’ দিকেই মহা বিপদ- (১) একদিকে নেকড়ে ও হায়নারা দল দ্বারা আপনার পরিবারের মৃত্যুর সমূহ-সম্ভাবনা, (২) অন্যদিকে পাগলা কুত্তার কামড়ে আপনার পরিবারের ধুকে-ধুকে মৃত্যুর সমূহ-সম্ভাবনা। (৩) হাফ-ছেড়ে বাঁচার তৃতীয় কোনো পথ নেই। আপনি এখন কি করবেন? কারণ যদি পাগলা কুত্তাগুলোকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন বা মেড়ে ফেলেন তাহলে নেকড়ে ও হায়নার দল সর্বদা আপনার বাড়ির আশেপাশে সুযোগরে সন্ধানে ঘুরাফেরা করবে কখন আপনাদের ঘার মটকানো যায়। আর পাগলা কুত্তাগুলোকে রাখলে এতটুকু বিপদ-তো অবশ্যই আছে যে, তাদের কামড়ে আপনার পরিবার জলাতঙ্ক রোগী হয়ে গিয়ে পরে ধুকে ধুকে মড়তে পারে, তবে লাঠি সোটার ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজকারবার কোনো মতে চালানো যেতে পারে বটে তারপরও বিপদের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর একটা সমাধান এই হতে পারে যে, আপনি যেটাকে জীবনের জন্য তুলনামূলক ছোট বিপদ/হুমকি মনে করেন, তা দিয়ে বড় বিপদ/হুমকিটিকে বাঁধা দেয়া যায় কিনা সেই চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে হয়-তো পাগলা কুত্তাগুলোকে তুলনামূলক ছোট বিপদ মনে করে তা বাড়িতে রাখবেন যাতে বড় বিপদ/হুমকি ওই নেকড়ে ও হায়নাগুলো থেকে বাঁচা যায়। এটা-তো একটি সাধারণ ও চিরাচরিত সমাধান যা কেউ-ই অস্বীকার করতে পারে না। উপরের ৪টি উসূলকে আবার ভাল করে পড়ে দেখুন, ওগুলোও এই একই কথা বলছে। 

যারা দুনিয়ার রাজনীতি সম্পর্কে ভাল জানাশোনা রাখেন, তাদের কাছে এটা বেশ পরিষ্কার যে, বিভিন্ন দেশে যেসকল ইসলামবিরোধী রাজনৈতিক দল রয়েছে, ইসলামের ক্ষতি সাধনের প্রশ্নে তারা এক-শরীর হলেও ক্ষতি সাধনের বেলায় তাদের সবার খাসলত, ক্ষতিসাধনের ধরন, ক্ষতিসাধনের মাত্রা এক পর্যায়ের নয়।  যেমন-

(১) কোনো দল অপরাপর দলের চাইতে জনগণের সম্পদ লুটপাট বেশি করে, শারীরীক জুলুম-অত্যাচার ও খুনখারাবীও বেশি করে, আবার ইসলামবিরোধী ফিতনা’র কালো অন্ধকার সৃষ্টি করে মুসলমানদের ইমান নষ্ট করার ক্ষেত্রেও তুলনামূক বেশি দক্ষ। 

(২) কোনো দল অপরাপর দলের চাইতে জনগণের সম্পদ লুটপাট করে কম, শারীরীক জুলুম-অত্যাচার ও খুনখারাবীও করে কম, আবার ইসলামবিরোধী ফিতনা’র কালো অন্ধকার সৃষ্টি করে মুসলমানদের ইমান নষ্ট করার ক্ষেত্রেও তাদের অবদান থাকে কম

(৩) কোনো দল অপরাপর দলের চাইতে জনগণের সম্পদ লুটপাট বেশি করে, জুলুম-অত্যাচার ও খুনখারাবীও করে কম, আবার ইসলামবিরোধী ফিতনা’র কালো অন্ধকার সৃষ্টি করে মুসলমানদের ইমান নষ্ট করার ক্ষেত্রেও তাদের অবদান মাঝারি

(৪)  কোনো দল অপরাপর দলের চাইতে জনগণের সম্পদ লুটপাট করে কম, শারীরীক জুলুম-অত্যাচার ও খুনখারাবীও করে বেশি, কিন্তু ইসলামবিরোধী ফিতনা’র কালো অন্ধকার সৃষ্টি করে মুসলমানদের ইমান নষ্ট করার ক্ষেত্রেও তুলনামূক বেশি দক্ষ।

এভাবে হরেক রকমের দল রয়েছে, যার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া এখানে অসম্ভব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণ তাকেই ভোট দেয়, যার প্রতি তারা অন্ধ -চাই সে যে খাসলতেরই হোক না কেনো। যারা ভাল-মন্দ  কিছুটা বাঁচ-বিচার করে, তারা প্রথমে দেখে কে জুলুম-অত্যাচার ও খুনখারাবী করে কম, তারপর দেখে কে জনগণের সম্পদ তুলনামূলক লুটপাট করে কম। এটা বর্তমান জামানার কাফের-মোশরেক, মুনাফেক এবং মুর্খ মুসলমানদের চিরাচরিত আচরণ। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ এরকম। বাদবাকি দ্বীন-ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস, কুরআন-সুন্নাহ’র আদর্শের ক্ষতি-তো আর এদের ক্ষতি নয়, তাই ইসলাম জাহান্নামে গেল না কোথায় গেল -তা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়।

কিন্তু আলেমগণ জানেন যে, আল্লাহ তাআলা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উসূল (মূলনীতি) শিখিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- 

 وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ

‘ আর ফিতনাহ হল হত্যার চাইতে শক্ত অপরাধ। [সূরা বাকারাহ ১৯১]

وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ

‘ আর ফিতনাহ হল হত্যার চাইতে বড় অপরাধ। [সূরা বাকারাহ ২১৭]

এই আয়াতদ্বয় থেকে বোধা যায়, আল্লাহ’র দৃষ্টিতে -যে ব্যাক্তি জনগণের সম্পদ লুটপাট বেশি করে, জুলুম-অত্যাচার ও খুনখারাবীও বেশি করে, তার চাইতেও ওই ব্যাক্তি বড় অপরাধী যে ফিতনাহবাজ। ফিতনাহ হল ওই চিন্তা-চেতনা-বিশ্বাস-মতবাদ-মতাদর্শ যা মানুষকে আল্লাহ’র দেখানো হক্ব ও বাতিল-এর মধ্যে পার্থক্য করার বোধশক্তির মধ্যে এমন ঘোলাটে ধুম্রজাল সৃষ্টি করে দেয়, যার কারণে মানুষ –তারা সবাই এক আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বান্দা এবং একই পিতা আদমের সন্তান– এই আদর্শ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে শতধাবিভক্ত হয়ে যায়। এযুগের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র (সোসালিজম), কমিউনিজম, ফেমিনিজম (নারীত্ববাদ) ইত্যাদি -এগুলো এক একটি বিরাটাকার ফিতনাহ, যা কোটি কোটি মুসলমানদেরকে দ্বীন ইসলাম থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, বানিয়েছে আল্লাদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী।

আমরা ইসলামী শরীয়ত-এর ৪র্থ মানদন্ড ‘শরয়ী কিয়াস ও ইসতিহাদ’ বিষয়ক  আলোচনায় কুরআন সুন্নাহ’র আলোকে দেখিয়ে এসেছি যে,  শরয়ী ‘কিয়াস’ ইলমী যোগ্যতা অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সুতরাং উপরোক্ত উসূলগুলো পরিবেশ-পরিস্থিতি, স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে ‘কিয়াস ও ইসতিহাদ’ করে ব্যাবহারের সময় আহলে হক্ব ওলামায়ে কেরাম থেকে ভিন্ন ভিন্ন মত সামনে আসা শুধু সম্ভবই নয় বরং শরীয়তের একটি স্বভাবিক বিষয়। এতে ইসলামী শরীয়তের উপর সুদক্ষ আহলে হক্ব আলেমগণ-তো সঠিক মতে উপনিত হতে সমর্থ হলেও সওয়াব পাবেন, আবার অগত্যা যদি ভুলও হয়ে যায় তাহলেও সওয়াব পাবেন, ইনশাআলাহ। যেমন হযরত আমর ইবনুল আস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন– إذا حكم الحاكم فاجتهد ثم أصاب فله أجران وإذا حكم فاجتهد ثم أخطأ فله أجر – যখন কোনো হাকিম (বিচারক) ইসতিহাদ করে ফয়সালা দেন ও ফয়সালাটি সঠিক হয়, তখন তিনি (আমলনামায়) দুটি পুরষ্কার পান। আর তিনি যখন ইসতিহাদ করে ফয়সালা দেন কিন্তু ফয়সালাটা ভুল হয়ে যায়, তখন তিনি একটি পুরষ্কার পান। [সহীহ বুখার, হাদিস ৭৩৫২; সহীহ মুসলীম, হাদিস ১৭১৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৫৭৪; মুসনাদে আহমাদ-৪/১৯৮]

কিন্তু আক্ষেপ হল সর্বসাধারণ লোকজনের জন্য, যারা একে-তো ইসলামী শরীয়ত-এর ইলম থেকে নিজেদেরকে মাহরুম ও বঞ্চিত করে রেখেছে, তদুপরি তাদের এই উপলব্ধিও নেই যে, তারা দ্বীন জানে না বোঝে না। এতদসত্ত্বেও তারা এই জুলুমের মধ্যে লিপ্ত যে, কোনো রকম শরয়ী দলিল ছাড়াই তারা আহলে হক্ব ওলামায়ে কেরামের উপর এমনভাবে অভিযোগ উঠায়, যেন কুরআন-হাদিদের কিছু অনুবাদ পড়ে বা কিছু মাসলা-মাসায়েলের চটি বই পড়ে তারা এত বড় আলেমে দ্বীন হয়ে গেছে যে, আলেমগণ কোন কোন ক্ষেত্রে ভুল করছেন তা তারা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে, তাই তাঁদের মতের সংশোধনে লেগে গেছে। আলী রা. সত্যই বলেছেন- والجَاهِلونَ لأَهْـلِ العِلْـمِ أَعْـدَاءُ – মুর্খরা আহলে-ইলমের শত্রু [আদ-দুররুল মানসুর, সুয়ূতী]

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

‘বলুন, যারা জানে অার যারা জানেনা -তারা কি সমান হতে পারে? [সূরা যুমার ৯]